Categories
প্রবন্ধ

মানবতা মানুষের উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য – একটি পর্যালোচনা :  দিলীপ রায়।

“মানবতা” শব্দ নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা পাঠক সমাজে ইতিমধ্যে উপহার দিয়েছি । তবুও আমি মনে করি ‘মানবতা’ নিয়ে ঐ কয়েকটা লেখা জন-সচেতনার পক্ষে যথেষ্ট নয় । মানবতা, মানবিকতা, মানবপ্রেমী, ইত্যাদি শব্দগুলি আজকের দিনে খুব প্রাসঙ্গিক । রাস্তা ঘাটে হাঁটলে এবং চারিদিকের মানুষজনের দিকে তাকালে মানবিকতার কথা মনের ভিতর উদ্রেক ঘটলে, মুখে একটা শুকনো হাসি পায় । একটা কথা বার বার ঘুরপাক খায়, “হায় রে মানবিকতা ! তোর এত আকাল !” চোখ বুজে ভাবলে একটা কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ হয়, “নিঃস্বার্থ মানবিকতা কোথায় ?” অথচ আমরা জানি, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে মানবিকতা বিরাজমান । মনুষ্যত্বহীন মানুষকে মানুষ বলা সমাজের দৃষ্টিতে প্রচণ্ড কঠিন । সমাজের দৃষ্টিতে মানবিকতা মানুষের সুপ্ত গুণাবলীর মধ্যে অন্যতম গুণ ।  সুতরাং এটা বলা যায়, মানুষ মানবিকতার অধিকারী । মানুষ্যত্ববোধ, মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানুষের কার্যকর অস্তিত্বের মধ্যেই “মানুষ’এর প্রকাশ । তাই বলা চলে, মানবিকতা  ছাড়া মানুষ নয় । মানবিকতা  আছে বলেই মানুষ অর্থাৎ মানবিকতা ধারন বা লালন করে বলেই মানুষ । কিন্তু দুঃখের বিষয় —  মানব কল্যাণে মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ দূরবীণ দিয়ে দেখার মতো  !
“মানবতা” শব্দের সঙ্গে গভীরভাবে যে শব্দটি জড়িয়ে আছে সেটা হচ্ছে ‘নিঃস্বার্থ’ । কারণ আমরা জানি, যখন কোনো মানুষ, মানুষের কল্যাণে কাজ করবে সেটা থাকতে হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ।  কিন্তু বতর্মানে একেবারে স্বাথের্র বাইরে মানুষ মানবিকতার নিরিখে কতটা কাজ করে বা করছে সেটা স্থিরভাবে বলা খুব কঠিন । কিছু ক্ষেত্রে  প্রত্যক্ষভাবে কোনো স্বার্থ না থাকলেও পরোক্ষভাবে রয়েছে । বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক সংগঠনকেই  মানবসেবা, মানব কল্যাণে কাজ করতে দেখা যায় । তাদের প্রয়াস কতটা  ব্যাপৃত সেটা এখন ভাববার বিষয় ? সমাজে  যারা অভাবী, অসহায়, সম্বলহীন, খেটে খাওয়া অতি সাধারণ মানুষ  প্রয়োজনে ঐসব সংগঠন থেকে  তারা কতটা উপকৃত হচ্ছে — তার কোনো রিপোর্টিং বা সংবাদ মাধ্যমে খবর আমাদের চোখে পড়ছে  না  !  তারা আর্থিক দিক থেকে যেমন দুর্বল তেমনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের  ক্ষেত্রে  অনেক পিছিয়ে । মুখে না বলে বাস্তবে অভাবী, যাকে বলে অভাবগ্রস্থ  মানুষের পাশে দাঁড়ালে মানব কল্যাণ কথাটার  স্বার্থক রূপ  পেতো ।
মানবতাপ্রেমী বলে যারা চিল্লাচ্ছেন তাঁদের কর্মকাণ্ড খানিকটা বিজ্ঞাপনের ন্যায় । বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে  নিজেদেরকে মানবতাপ্রেমী হিসাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে তাদের মুখ্য চিন্তা । চোখের সামনে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আজকের মানুষেরা সেই অসহায় মানুষের হাতে ধরে ওঠানোর সময়টুকু পর্যন্ত পান না, অথচ চলমান সেই (কিছু) মানুষের মুখে অহরহ — তিনি একজন  প্রকৃত মানবতাপ্রেমী মানুষ  । এটা লজ্জার, যেমনি নিজের কাছে তেমনি সমাজের কাছেও ।  তাই মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ আজ বড় অদ্ভূত  ধরনের, বোঝা কঠিন  ! আবার একই মানুষকে দুই ধরনের ভূমিকায় দেখা যায় — কোনো সময় তিনি  জনদরদি আবার কোনো সময় তিনি পশুর চেয়ে হিংস্র । মানবিক দিকের কাজটা দেখাতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে, তিনি তখন আসল রূপ ধারন  করেন । পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠেন । তখন হিতাহিত জ্ঞানের অভাব ঘটে ।
তাই বলি, মনুষ্যত্ব বা মানবিকতা আমাদের অন্তরের বিষয় । আর এই অভ্যন্তরীণ বিষয়কে জাগ্রত করতে আমাদের চাই আন্তরিক ইচ্ছা । এই  মানবতা বা মানবিকতা গড়ে তুলতে আমাদের চাই মানসিক শক্তি, অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস, যা আমাদের প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে ও  বিভিন্ন বিপদের বিরূদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে । এই ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের কথায় আসা যেতে পারে । তিনি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “নীতিপরায়ন ও সাহসী হও ।  কাপুরুষেরা পাপ করিয়া থাকে, বীর কখনও পাপ করে না—এমনকি মনে পর্যন্ত পাপ আনতে দেয় না । সিংহ-গর্জনে আত্মার মহিমা ঘোষণা কর, জীবকে অভয় দিয়ে বল – “উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্‌ নিবোধিত” —ওঠ, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থামিও না ।  এস মানুষ হও । …… নিজেদের সংকীর্ণ গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে গিয়ে দেখ, সব জাতি কেমন উন্নতির পথে চলেছে । তোমরা কি মানুষকে ভালবাস ? তোমরা কি দেশকে ভালবাস ? তাহলে এসে, আমরা ভাল হবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করি ।”
মানবতা ও মানবসেবা একার্থক নয় । মানবসেবার মধ্যে পরোপকার জাতীয় একপ্রকার অনুভূতির জন্ম হয় । সেক্ষেত্রে স্বজ্ঞানে বা অ-জ্ঞানে বিশেষ অহংকারবোধের উদ্রেক হয় । তবে মানবসেবা মানবিক হতে পারে — “যখন মানুষ অন্যের সেবা করে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিকে উপেক্ষা করে, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে, সেবা ও মানবিকতার আদর্শের মিলনকে স্বার্থক করে তোলে ।” মানুষের মানবিকতার উৎকর্ষতা নির্ধারিত হয় জগতে বিরাজমান সমস্ত জীবের প্রতি আচরণের নিরিখে । মানুষের  নৈতিকতা, দায়দায়িত্ব, কর্তব্যপরায়নতার বহিঃপ্রকাশ হয় এই মহান আদর্শের মধ্য দিয়ে । সুতরাং এই কথা বলাই যায় যে, মানবতা কোনো মতবাদ নয়, একটি আদর্শ ।
পরিশেষে এটা পরিষ্কার, মানুষ মানবতার অধিকারী । আর ‘মানবতা’ হচ্ছে মানুষের বৈশিষ্ট্য । মানুষের সেবা করাই হচ্ছে মানব ধর্ম । জীব ঈশ্বরের এক মহান সৃষ্টি । প্রতিটি জীবের মধ্যে ঈশ্বর বর্তমান । জীবের সেবা করার মাধ্যমে ঈশ্বরের সেবা করা যায় । সেইজন্যেই স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “জীবে প্রেম করে যেই জন,  সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” । বাণীটি মানব কল্যাণের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে তাৎপর্যপূর্ণ । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত) ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ থেকে শহীদি: রজত সেনের বীরত্বের কাহিনী।।

রজত কুমার সেন ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একজন বিশিষ্ট বিপ্লবী নেতা। ব্রিটিশ আধিপত্য থেকে ভারতের রাজনৈতিক মুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রমাণ তাঁর অবদান। ভারতীয় উপমহাদেশে বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম, যা ভারতের স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করেছিল, রজত কুমার সেনকে সেই স্বীকৃত বিপ্লবীদের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে একজন শহীদ হিসেবে সেনকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। ১৯১৩ সালে চট্টগ্রামে, তার পিতার নাম ছিল রঞ্জন লাল সেন। তিনি গোপন বিপ্লবী দল ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির’ সদস্য ছিলেন। তিনি ১৮ এপ্রিল, ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর পরে, ২২ এপ্রিল, সেন জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে বিজয়ী বাহিনীর অংশ ছিলেন। ৬ মে, তিনি, পাঁচজন কমরেডের সাথে, চট্টগ্রামের ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু কঠোর নিরাপত্তা দেখে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তবে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে এবং গ্রামবাসীদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করে।

পুলিশ তাড়া করে, সেন এবং তার দল জুলধা গ্রামে আশ্রয় নেয়, যেখানে একটি ভয়ঙ্কর অগ্নিসংযোগ হয়। যখন তাদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, তখন তারা ঘৃণ্য শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করে একে অপরের দিকে বন্দুক ঘুরিয়ে শাহাদাত বরণ করতে বেছে নেয়। এই প্রতিবাদে রজত সেন শহীদ হন। তাঁর পাশাপাশি স্বদেশ রায়, মনোরঞ্জন সেন, দেবপ্রসাদ গুপ্তও প্রাণ দিয়েছেন। জুলধায় আশ্রয় নেওয়ার আগে, তাদের দুই কমরেড, সুবোধ চৌধুরী এবং ফণীন্দ্র নন্দী, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

১৯৩০ সালের ৬ মে রজত কুমার সেনের আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি মর্মান্তিক অধ্যায় হিসাবে রয়ে গেছে। তার গল্প শুধু সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের নয় বরং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সম্মিলিত চেতনার প্রতিফলন যা অবশেষে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

বাংলা আবৃত্তির জগতে পার্থ ঘোষের অসামান্য যাত্রা ও তার অবিস্মরণীয় কৃতিত্ব।।।

পার্থ ঘোষ ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি আবৃত্তিকার তথা বাচিক শিল্পী। বাচিকশিল্পের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। আজ কিংবদন্তি এই বাচিক শিল্পীর জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে অবধরিত ভাবে চলে তার স্ত্রী গৌরী ঘোষের নাম। করান তিনি ও তার স্ত্রী গৌরী ঘোষ বাংলা আবৃত্তি জগতে ছিলেন অন্যতম জুটি। এই দম্পত্তি বাঙালিকে অনেক উপভোগ্য আবৃত্তি-সন্ধ্যা উপহার দিয়েছেন। গৌরী দেবী স্বামী পার্থ ঘোষের সঙ্গে মিলে বহু শ্রুতিনাটক উপস্থাপনা করেছেন। তাঁদের যৌথ ভাবে উপস্থাপিত ‘কর্ণকুন্তি সংবাদ’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পার্থ ঘোষ এবং গৌরী ঘোষের ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ এখনও বাঙালির মজ্জায় মজ্জায়৷ বাংলা কবিতা আবৃত্তিতে এক অন্য ধারা এনেছিলেন পার্থ ঘোষ। রবীন্দ্র কবিতা পাঠে তার কণ্ঠ ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আবৃত্তিশিল্পী হিসাবে সমাদৃত হয়েছেন দেশে বিদেশে সর্বত্র।

পার্থ ঘোষের জন্ম ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর বৃটিশ ভারতের কলকাতায়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই বাংলা কবিতা আবৃত্তি তার প্রধান আগ্রহের বিষয় হয়ে যায়।


১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে উপস্থাপক-ঘোষক হিসাবে যোগদানের পর ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি তিনি স্থায়ী কর্মী হিসাবে নিযুক্ত হন। নিয়মিত অন্যান্য অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি শিশু ও কিশোরদের জন্য “গল্পদাদুর আসর” পরিচালনা করতেন। দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন শিশু ও কিশোরদের ‘গল্পদাদু’। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আকাশবাণীরই উপস্থাপিকা-ঘোষক আবৃত্তিকার গৌরী মজুমদারকে বিবাহ করেন।১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আকাশবাণীর “বিবিধ ভারতী” বিভাগে যোগদান করেন এবং ২০০০ খ্রিস্টাব্দে অবসরের আগে পর্যন্ত ওই বিভাগে কর্মরত ছিলেন। প্রায় তিন দশকের বেশী সময় ধরে কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত আকাশবাণীর অনেক অনুষ্ঠানে বাংলার শ্রোতারা শুনেছেন সুস্নাত ব্যক্তির কণ্ঠে সুরম্য উপস্থাপনা।

১৯৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দ হতেই তিনি ও তার স্ত্রী গৌরী ঘোষ আবৃত্তিচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। জনপ্রিয় জুটি দীর্ঘ কয়েকদশক ধরে দেশে বিদেশে সুনামের সঙ্গে আবৃত্তি পরিবেশন করেছেন। তারা আবৃত্তি ও শ্রুতিনাটককে এক অনন্য মাত্রায় পৌছে দেন। তাঁদের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথেরই ‘দেবতার গ্রাস’, ‘বিদায়’ বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছিল। প্রবাদপ্রতীম এই আবৃত্তি দম্পতি দশকের পর দশক ধরে বাংলার শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। এ রাজ্যের পাশাপাশি তাঁদের আবৃত্তি সমাদর কুড়িয়েছে বাংলাদেশেও।
পার্থ ঘোষের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ বসন্ত’ খুবই  জনপ্রিয় হয়েছিল। স্ত্রী গৌরীর সঙ্গে তার শ্রুতিনাটক ‘প্রেম’, ‘স্বর্গ থেকে নীল পাখি’, ‘জীবনবৃত্ত’ বাংলার শ্রোতাদের হৃদয়ে অম্লান। বাংলা কবিতা নিয়ে তাদের একাধিক সিডি-ক্যাসেট রয়েছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও ছিলেন।


রবীন্দ্র গবেষণায় তার আগ্রহ ছিল। সম্পাদনা করেছেন কবিতা বিষয়ক গ্রন্থ। এছাড়া পার্থ ঘোষের শখ ছিল পুতুল সংগ্রহের। দেশ বিদেশের নানান পুতুল ছিল তার সংগ্রহে।
তার অনবদ্য আবৃত্তি বাংলার শ্রোতাদের হৃদয়ে যে অনুভূতি জাগ্রত করে তারই স্বীকৃতি স্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে “বঙ্গভূষণ” সম্মাননা প্রদান করে।
আগেই (২০২১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট) না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁর সহধর্মীনি কিংবদন্তী আবৃত্তিকার গৌরী ঘোষ। ভেঙে গিয়েছিল বিখ্যাত পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষের জুটি।
স্ত্রী প্রয়াত হলে প্রায়শই অসুস্থতার মধ্যেই ছিলেন পার্থ ঘোষ।গলায় অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এরপর অকস্মাৎ ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে’র ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি এই বাচিক শিল্পী পার্থ ঘোষ।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবপেজ।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাসন্তী দেবী: ব্রিটিশ শাসন বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়িকা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য নাম বাসন্তী দেবী। বাসন্তী দেবী  ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ কারাগারে কারারুদ্ধ প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী নারী। বাসন্তী দেবী মন ও মানসিকতায় পৌরাণিক সতীনারীদের চারিত্রিক মহত্বটি যেমন অনুকরণীয় মনে করতেন; তেমনি গার্গী, মৈত্রেয়ীদের মতো চারিত্রিক দৃঢ়তায় বুদ্ধি দিয়ে আপন যুক্তি তুলে ধরার ক্ষমতাও রাখতেন। এ-দুইয়ের মেলবন্ধনে তিনি অনন্যা।তিনি একাধারে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্নী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় সংগ্রামী। সংগ্রামের জন্য কারাবরণ করেছেন। অন্দর ছেড়ে অবগুন্ঠণ ছেড়ে উপনিষদের বিদুষীদের মতো পুরুষের সমকক্ষ হয়ে সহকর্মী হয়ে দেশমুক্তির সাধনা করে গেছেন।

বাসন্তী দেবী ২৩ মার্চ ১৮৮০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বরদানাথ হালদার ও মাতার নাম হরিসুন্দরী দেবী। তার পিতা ছিলেন আসামের বিজনি ও অভয়াপুরী এস্টেটের দেওয়ান।  দশ বছর বয়েসে তিনি দার্জিলিংয়ের লরেটে কনভেন্টে শিক্ষার জন্যে ভর্তি হন। ১৮৯৬ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে বিবাহ হয়।
১৮৯৪ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে দুজনের তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দেশবন্ধু ও তার তিন সন্তান- দুই কন্যা, অপর্ণা ও কল্যাণী ও একপুত্র চিররঞ্জন।


তার স্বামীর অনুসরণে, বাসন্তী দেবী আইন অমান্য আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনের মতো বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরের বছর, তিনি দাসের বোন ঊর্মিলা দেবী এবং সুনিতা দেবীর সাথে যোগ দেন।  নারী কর্মীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র “নারী কর্ম মন্দির” প্রতিষ্ঠা করুন।  ১৯২০-২১ সালে, তিনি জলপাইগুড়ি থেকে তিলক স্বরাজ ফান্ডের জন্য স্বর্ণের অলঙ্কার এবং ২০০০ টি স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ধর্মঘট এবং বিদেশী পণ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়।  কলকাতায়, পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবকের ছোট দলকে কলকাতার রাস্তায় খাদি, হাতে কাটা কাপড় বিক্রি করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল।  দাস, যিনি স্থানীয় আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তার স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে এমন একটি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  সুভাষ চন্দ্র বসুর সতর্কতা সত্ত্বেও দেবী রাস্তায় নেমেছিলেন যে এটি তাকে গ্রেফতার করতে ব্রিটিশদের উস্কে দেবে।  যদিও তাকে মধ্যরাতে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তার গ্রেপ্তার ব্যাপক আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছিল।  কলকাতার দুটি কারাগার বিপ্লবী স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা পূর্ণ ছিল এবং আরও সন্দেহভাজনদের আটক করার জন্য দ্রুত আটক শিবির তৈরি করা হয়েছিল।  ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর পুলিশ দাস ও বসুকে গ্রেপ্তার করে।


দাসের গ্রেপ্তারের পর, বাসন্তী দেবী তার সাপ্তাহিক প্রকাশনা বাঙ্গালার কথা (বাংলার গল্প) এর দায়িত্ব নেন।  তিনি ১৯২১-২২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন।  ১৯২২ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম সম্মেলনে তার বক্তৃতার মাধ্যমে,  তিনি তৃণমূল আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিলেন।  ভারতের চারপাশে ভ্রমণ, তিনি ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা করার জন্য শিল্পের সাংস্কৃতিক বিকাশকে সমর্থন করেছিলেন।
দাস যেহেতু সুভাষ চন্দ্র বসুর রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন, বসন্তী দেবীর প্রতি বসন্তের খুব শ্রদ্ধা ছিল।  ১৯২৫ সালে দাসের মৃত্যুর পর, বসু দেবীর সাথে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সন্দেহ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়।  সুভাষ চন্দ্র বসুর ভ্রাতৃপ্রতিম ভাতিজি কৃষ্ণ বোস বাসন্তী দেবীকে তাঁর “দত্তক মা” এবং তাঁর জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহিলার একজন হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, বাকি তিনজন হলেন তাঁর মা প্রভাবতী, তাঁর ভগ্নিপতি বিভাবতী (শেরতের স্ত্রী)  চন্দ্র বসু) এবং তার স্ত্রী এমিলি শেঙ্কল।
তার স্বামীর মতো, বাসন্তী দেবীও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।  ১৯২৮ সালে, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রায় তার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলের বিরুদ্ধে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হওয়ার কয়েকদিন পর মারা যান।  এর পর বাসন্তী দেবী লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ভারতীয় যুবকদের উদ্বুদ্ধ করেন।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর, বাসন্তী দেবী সামাজিক কাজ চালিয়ে যান।  বাসন্তী দেবী কলেজ, কলকাতার প্রথম মহিলা কলেজ যা সরকারের অর্থায়নে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার নামে নামকরণ করা হয়েছিল।  ১৯৭৩ সালে, তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন।
বাসন্তী দেবী ৭ মে ১৯৭৪ মৃত্যুবরণ করেন।

।।তথ্য ঋণ : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবপেজ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

উচ্চ রক্তচাপ এবং শ্রবণ ক্ষতি: শব্দ দূষণের অজানা প্রভাব।

শব্দ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।  একটি নির্দিষ্ট ডেসিবেলের উপরে শব্দ কানের ড্রাম এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।  আমরা যাতে মানুষকে প্রভাবিত না করি তা নিশ্চিত করার জন্য শব্দ এবং সঙ্গীত বাজানোর সময় একটি নির্দিষ্ট সাজসজ্জা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।  শব্দ দূষণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, বক্তৃতা বাধা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, ঘুমের ব্যাঘাত এবং উত্পাদনশীলতা হারানোর মতো স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে।  দীর্ঘ সময়ের জন্য শব্দের সংস্পর্শে থাকা মানুষের পাশাপাশি প্রাণীদের জন্যও মারাত্মক হতে পারে।  প্রতি বছর, আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালিত হয় যাতে আমরা আমাদের স্বাস্থ্যের উপর শব্দের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারি।  আমরা এই বছরের গুরুত্বপূর্ণ দিনটি উদযাপন করার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সাথে সাথে এখানে কয়েকটি বিষয় রয়েছে যা আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।
তারিখ—-
প্রতি বছর, ২৫ এপ্রিল আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। এই বছর, আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস বৃহস্পতিবার পড়ে।
ইতিহাস—
১৯৯৬ সালে, সেন্টার ফর হিয়ারিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন (CHC) শব্দ দূষণের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস ঘোষণা করে।  এই দিনটি মানুষকে একত্রিত হওয়ার এবং শব্দ দূষণ কমানোর উপায় খুঁজে বের করার এবং একটি স্বাস্থ্যকর গ্রহে অবদান রাখার আহ্বান জানায়।
তাৎপর্য—
শব্দ দূষণের সবচেয়ে সাধারণ প্রভাবগুলির মধ্যে একটি হল শ্রবণশক্তি হ্রাস।  ফিটনেস ক্লাস হোক বা বিনোদনের মাধ্যম হোক বা কনসার্ট, দীর্ঘ সময়ের জন্য শব্দের সংস্পর্শে আসা আমাদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।  শব্দের প্রভাব সম্পর্কে নিজেদেরকে শিক্ষিত করা এবং শব্দ কমাতে আমরা যে উপায়গুলি নিযুক্ত করতে পারি সে সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ৷  বেশির ভাগ মানুষ তাদের শরীরে শব্দের প্রভাব বুঝতে পারে না যতক্ষণ না অনেক দেরি হয়ে যায়।  আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস উদযাপনের সর্বোত্তম উপায় হ’ল মানুষের স্বাস্থ্যের উপর শব্দের প্রভাব সম্পর্কে নিজেদেরকে শিক্ষিত করা এবং আমাদের উপর শব্দের প্রভাব কমানো নিশ্চিত করার উপায়গুলি অন্বেষণ করার জন্য অন্যদের সাথে চিন্তাভাবনা করা।
।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাংলা থিয়েটারে তারা সুন্দরীর অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

তারা সুন্দরী, একজন খ্যাতনামা বাঙালি মঞ্চ অভিনেত্রী, গায়িকা এবং নৃত্যশিল্পী, থিয়েটারের জগতে একটি অমোঘ ছাপ রেখে গেছেন। ১৮৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন, মঞ্চে তার যাত্রা শুরু হয় সাত বছর বয়সে। স্টার থিয়েটারে “চৈতন্য লীলা” নাটকে একটি ছেলের চরিত্রে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই প্রথম দিকের সূচনা হয়েছিল বিনোদিনী দাসীর পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলা থিয়েটারের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, যা একটি উজ্জ্বল কর্মজীবনের সূচনা করে।
তেরো বছর বয়সে, তারা সুন্দরী ইতিমধ্যে “চৈতন্য লীলা” এবং গোপীতে চৈতন্যের ভূমিকা সহ উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলি চিত্রিত করেছিলেন। তার অভিনয়গুলি কেবল অভিনয় নয় বরং তিনি যে চরিত্রগুলি অভিনয় করেছিলেন তার একটি মূর্ত প্রতীক, তার অতুলনীয় অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি নাট্যসমরাগিনী উপাধি অর্জন করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে “চন্দ্রশেখর” নাটকে তার সবচেয়ে প্রশংসিত ভূমিকাগুলির মধ্যে একটি ছিল শৈবালিনী, যা তাকে ব্যাপক খ্যাতি এনে দেয়।
১৮৯৭ সালে, তিনি অমরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে ক্লাসিক থিয়েটারে যোগ দেন এবং এর প্রধান অভিনেত্রী হন। এই পরিবর্তনটি তার কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা তাকে অমৃতলাল মিত্রের কাছ থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দত্তের নির্দেশনায় তার অভিনয় দক্ষতা পরিমার্জিত করার সুযোগ দিয়েছিল। তার নৈপুণ্যের প্রতি তারা সুন্দরীর নিবেদন তাকে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করতে দেখেছিল, ১৯২২ সাল পর্যন্ত তার অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মোহিত করেছিল।
যাইহোক, ১৯২২ সালে তার ছেলের মৃত্যুর সাথে একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পরে, তারা সুন্দরী মঞ্চ থেকে অবসর নেন এবং একটি আশ্রমে ধর্মীয় কার্যকলাপে জড়িত থাকার জন্য ভুবনেশ্বরে চলে যান। বাংলা থিয়েটারের একজন অকুতোভয় গিরিশ চন্দ্র ঘোষ তাকে ফিরে আসতে রাজি না করা পর্যন্ত তিনি কলকাতার মঞ্চে ফিরে আসেন। অবসর থেকে বেরিয়ে আসার পর তার প্রথম ভূমিকা ছিল “দুর্গেশনন্দিনী” নাটকে।
উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক—
চৈতন্য লীলা, সরলা, চন্দ্রশেখর, দুর্গেশনন্দিনী,হরিশচন্দ্র, রিজিয়া, বলিদান, জানা, শ্রী দুর্গা।
বাংলা মঞ্চে তারা সুন্দরীর অবদান ছিল গভীর। তিনি বাংলা মঞ্চ নাটকের প্রথম দিকে শিশির কুমার ভাদুড়ির মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের সাথে কাজ করেছেন, থিয়েটারে শ্রেষ্ঠত্বের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তারা সুন্দরী ১৯ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে মারা যান, কিন্তু বাংলা থিয়েটারে একজন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার উত্তরাধিকার প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

অনুরূপা দেবী : বাঙালি নারী সাহিত্যিক ও সংস্কারকের চিরায়িত অবদান।

অনুরূপা দেবী, ৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৮২ সালে কলকাতার শ্যামবাজার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন, ব্রিটিশ ভারতে একজন অগ্রগামী বাঙালি নারী ঔপন্যাসিক, ছোট গল্প লেখক, কবি এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হন। তার সাহিত্যিক অবদান, ১৯১১ সালে তার প্রথম উপন্যাস “পশ্যপুত্র” প্রকাশের দ্বারা চিহ্নিত, তাকে লাইমলাইটে ছড়িয়ে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে “মন্ত্রশক্তি” (১৯১৫), “মহনিষা” (১৯১৯), এবং “মা” (১৯২০), যা তাকে প্রথম নারী কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে একজন করে তোলে যিনি বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব অর্জন করেন। সেই সময়ের সাহিত্য ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের গভীরে প্রোথিত একটি পরিবারে প্রস্থ দেবীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তার বাবা মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং লেখক, আর তার মা ছিলেন ঘনসুন্দরী দেবী। ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকরা ছিলেন তার পিতৃপুরুষ এবং তার খালা ইন্দিরা দেবী ছিলেন আরেকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব।

শৈশবে শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, প্রস্থ দেবীর শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতে, তার পরিবারের তত্ত্বাবধানে। তার খালা সুরুপা দেবীর আবৃত্তির মাধ্যমে তিনি মহাকাব্য, রামায়ণ এবং মহাভারতের সাথে পরিচিত হন, যা তার সাহিত্য সাধনার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। সাহিত্যের এই প্রথম দিকের এক্সপোজার, শেখার জন্য তার সহজাত আবেগের সাথে মিলিত হয়ে, তাকে সংস্কৃত এবং হিন্দিতে আয়ত্ত করতে এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনে প্রবেশ করতে সক্ষম করে। রাণী দেবী ছদ্মনামে প্রকাশিত তার প্রথম গল্পের মাধ্যমে প্রস্থ দেবীর সাহিত্য জীবন শুরু হয়, কুন্টলিন পুরস্কার জিতেছিল। তার প্রথম উপন্যাস, “তিলকুঠি”, ১৯০৪ সালে নাভানুর ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এটি ছিল ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত “পশ্যপুত্র”, যা তাকে সাহিত্য জগতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তার সাহিত্যিক কৃতিত্বের বাইরে, প্রস্থ দেবী গভীরভাবে সামাজিক সংস্কারের সাথে জড়িত ছিলেন, বিশেষ করে নারীর অধিকার এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে। তিনি কাশী এবং কলকাতায় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মহিলা কল্যাণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৩০ সালে, তিনি মহিলা সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তাকে বাংলায় নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে চিহ্নিত করে। প্রস্থ দেবীর জীবন ১৯ এপ্রিল, ১৯৫৮ সালে শেষ হয়েছিল, কিন্তু একজন লেখক এবং সংস্কারক হিসাবে তার উত্তরাধিকার অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

অনুরূপা দেবীর প্রারম্ভিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ভারতীয় মহাকাব্যের সমৃদ্ধিতে ভরা সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারে তার উল্লেখযোগ্য অবদান তাকে বহুমুখী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখায়। নারীর মর্যাদা উন্নীত করার জন্য তার নিবেদনের সাথে মিলিত হয়ে তার সময়ের সামাজিক অবস্থার প্রতিফলনকারী আখ্যান বুনতে তার ক্ষমতা তার গল্পকে শুধু ব্যক্তিগত বিজয়ের গল্প নয় বরং সামাজিক অগ্রগতির আখ্যান করে তোলে। অনুরূপা দেবীর জীবন এবং কাজ উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক এবং সমাজ সংস্কারকদের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হিসাবে রয়ে গেছে, যা পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য এবং সক্রিয়তার শক্তিকে চিত্রিত করে।

অনুরূপা দেবী ৩৩টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার অন্যান্য জনপ্রিয় উপন্যাসগুলি হল বাগ্দত্তা (১৯১৪), জ্যোতিঃহারা (১৯১৫), মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), মহানিশা (১৯১৯), মা (১৯২০), উত্তরায়ণ ও পথহারা (১৯২৩)। তার লেখা মন্ত্রশক্তি, মহানিশা, মা, পথের সাথী (১৯১৮) ও বাগ্দত্তা নাটকে রূপান্তরিত হয়েছিল। জীবনের স্মৃতিলেখা তার অসমাপ্ত রচনা।তার অন্যান্য বইগুলি হল: রামগড় (১৯১৮), রাঙাশাঁখা (১৯১৮) বিদ্যারত্ন (১৯২০), সোনার খনি (১৯২২), কুমারিল ভট্ট (১৯২৩), সাহিত্যে নারী, স্রষ্ট্রী ও সৃষ্টি (১৯৪৯), বিচারপতি ইত্যাদি।

সম্মাননা—–

প্রথম প্রকাশিত গল্পের জন্য কুন্তলীন পুরস্কার লাভ; শ্রীভারতধর্ম মহামন্ডল থেকে “ধর্মচন্দ্রিকা” উপাধি লাভ (১৯১৯); শ্রীশ্রীবিশ্বমানব মহামন্ডল থেকে “ভারতী” উপাধি লাভ (১৯২৩); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ (১৯৩৫); ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক লাভ (১৯৪১); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা লেকচারার পদে অধিষ্ঠিত (১৯৪৪)।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

স্বামী লোকেশ্বরানন্দ : ভারতীয় দর্শন ও শিক্ষায় অমোঘ অবদানের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

স্বামী লোকেশ্বরানন্দ, ১৯ এপ্রিল, ১৯০৯-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন, একজন বিশিষ্ট সন্ন্যাসী ছিলেন যিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সাথে তাঁর যোগসূত্রের মাধ্যমে ভারতীয় শিক্ষা এবং দর্শনের উপর একটি অমোঘ চিহ্ন রেখে গেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতের নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশনের পাথুরিয়াঘাটা শাখা এবং সম্মানিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার বিশাল নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও, মঠ এবং মিশনের মধ্যে তিনি কখনই একটি সরকারী উপাধি ধারণ করেননি। ভারতীয় দর্শন এবং রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সাহিত্যে তার দক্ষতা প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার কারণে তার অবদান জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে প্রসারিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার কেনড়াগাছিতে জন্মগ্রহণ করা, বর্তমানে বাংলাদেশ, স্বামী লোকেশ্বরানন্দের প্রাথমিক জীবনের মূল ছিল পশ্চিমবঙ্গে। শিক্ষাবিদে তার যাত্রা তাকে প্রাথমিকভাবে রাজনীতিতে জড়িত হতে দেখেছিল, শুধুমাত্র তার মা এবং গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার পড়াশোনায় ফিরে আসতে। তিনি ১৯৩৩ সালে মঠে যোগদান করেন এবং বার্মার জেডুবা দ্বীপে একটি ত্রাণ মিশনে যাত্রা করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রামকৃষ্ণ মিশনের দেওঘর স্কুলে, যেখানে তিনি দ্রুত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেন।

১৯৩৬ সালে, চেরাপুঞ্জিতে কাজ করার সময়, তিনি তার উত্সর্গ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে খাসি ভাষা শিখেছিলেন। দেওঘর স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন সহ রামকৃষ্ণ মিশনের মধ্যে বিভিন্ন ভূমিকার পরে, তিনি সম্প্রদায়ের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে, বাংলায় দুর্ভিক্ষের সময়, তিনি পাথুরিয়াঘাটা শাখাকে দরিদ্রদের জন্য একটি কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেন, নিঃস্ব এবং অনাথদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল তৈরি করেন।

১৯৫৬ সালে নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বামী লোকেশ্বরানন্দের উত্তরাধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্দেশনায়, এটি ভারতের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা প্রশাসন ও শিক্ষাদানে তার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পরিচিত। তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয় এবং নরেন্দ্রপুরের রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক কলেজ উভয়ের দায়িত্ব পালন করেন, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের প্রতি তার অঙ্গীকার প্রদর্শন করেন।

নরেন্দ্রপুরে তার মেয়াদের পরে, স্বামী লোকেশ্বরানন্দ দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের দায়িত্ব নেন। এই আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে তার সম্পাদকীয় ভূমিকা তাকে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয়, ভারতীয় দর্শন এবং বিশ্বব্যাপী রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনকে প্রচার করে। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ এবং বার্লিন সহ মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বক্তৃতাগুলি তার শিক্ষার বিশ্বব্যাপী নাগালের উপর আলোকপাত করেছিল।

তার রচিত ও সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল  –

চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ, তব কথামৃতম, শতরূপে সারদা, অনন্য পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ, উপনিষদ (১ম ভাগ, ৮ টি উপনিষদ), ছোটদের সারদাদেবী, বিশ্ববরেণ্য শ্রীরামকৃষ্ণ, যুবনায়ক বিবেকানন্দ, প্র্যাকটিক্যাল স্পিরিচুয়ালিটি, রিলিজিয়ন অ্যান্ড কালচার, রামকৃষ্ণ পরমহংস, লেটারস্ ফর স্পিরিচুয়াল সিকারর্স, উপনিষদস্ (৯ খণ্ড)।

রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্বামী লোকেশ্বরানন্দ 31 ডিসেম্বর, 1998-এ মারা যান। তার জীবন এবং কাজ অনেককে অনুপ্রাণিত করে চলেছে, শিক্ষা, দর্শন এবং সমাজকল্যাণের প্রতি তার উত্সর্গের স্থায়ী প্রভাব প্রতিফলিত করে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

অমর সুরের জাদুকরী : যূথিকা রায়ের সঙ্গীত জীবনের উত্থান ও সাফল্যের কাহিনী।

যুথিকা রায়, একজন প্রখ্যাত বাংলা ভজন গায়ক, ভারতীয় সঙ্গীতের দৃশ্যে একটি অমোঘ চিহ্ন রেখে গেছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে, রয়ের ব্যতিক্রমী প্রতিভা হিন্দি এবং বাংলা উভয় সিনেমাতেই উজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়েছে, যা ভক্তিমূলক স্তোত্র এবং ৩০০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রের পটভূমিতে অবদান রেখেছে। আমতা, হাওড়ায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে মূলত সেনহাটি, খুলনা, বাংলাদেশের, রায়ের সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয় কলকাতার চিৎপুরে, 1930 সালে তার বাবার চাকরির দাবিতে সেখানে স্থানান্তরিত হওয়ার পর। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার অনুরাগকে স্বীকার করে, রায় বরানগরে জ্ঞানরঞ্জন সেনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

তার সম্ভাবনা শীঘ্রই কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা স্বীকৃত হয়, যার ফলে ১৯৩০ সালে তার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড, ‘স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণ’, যা প্রকাশিত না হওয়া সত্ত্বেও, তার চূড়ান্ত সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে। রায়ের কর্মজীবন একটি উল্লেখযোগ্য মোড় নেয় যখন প্রণব রায় ‘রাগা ভোরের যুথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারা আমি পথ হারে’ গানগুলি রচনা করেন, যা ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। এই প্রশংসা একটি সমৃদ্ধ কর্মজীবনের জন্য মঞ্চ তৈরি করে, অবশেষে ভারত সরকার থেকে ১৯৭২ সালে তাকে মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী অর্জন করে।

ভক্তিমূলক ভজন এবং আধুনিক গান সহ রায়ের ভাণ্ডার বিশাল ছিল, যার মধ্যে ১৭৯ টি রেকর্ড রয়েছে। গভীর আধ্যাত্মিক আবেগ জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা তাকে মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর প্রিয় করে তোলে, গান্ধী তাকে ‘মীরাবাই’ উপাধি দিয়েছিলেন। তার অবদান শুধু রেকর্ডিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সিংহলী এবং পূর্ব আফ্রিকা সহ ভারত জুড়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে পারফর্ম করেছেন এবং প্রধান ভারতীয় শহরগুলি থেকে রেডিও সম্প্রচারে অংশ নিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে, রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মশতবর্ষ স্মরণে, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম এবং কমল দাশগুপ্ত দ্বারা রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য ভক্তিমূলক গান গেয়েছিলেন।

তার অসংখ্য রেকর্ডিংয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘এনি বর্ষা চেলা আগল’ এবং ‘তুমি যে রাধা হেদা শ্যাম’-এর মতো গান, যা একজন গায়ক হিসেবে তার বহুমুখীতা এবং গভীরতা প্রদর্শন করে। তার জীবন, ব্রহ্মচর্য এবং সঙ্গীতে নিবেদিত, ৯৩ বছর বয়সে ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪-এ কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্টাতে শেষ হয়েছিল। ভারতে ভজন গানে অগ্রগামী হিসেবে যুথিকা রায়ের উত্তরাধিকার অতুলনীয়, তার কণ্ঠ ভক্ত ও সঙ্গীতপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত ও অনুরণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

একজন বিপ্লবী নারীর গল্প : পারুল মুখার্জির অবদান ও ত্যাগ।

পারুল মুখার্জি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে খোদাই করা একটি নাম, তিনি ছিলেন সাহস ও সংকল্পের আলোকবর্তিকা। পারুলবালা মুখার্জি হিসেবে ১৯১৫ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন, ঢাকায় শিকড় সহ, তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তার জীবনের যাত্রা, সাহসিকতা এবং স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দ্বারা চিহ্নিত, অগ্নি যুগে একজন বিপ্লবী হিসাবে তার ভূমিকার একটি প্রাণবন্ত ছবি আঁকা।

পারুলের পরিবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিমজ্জিত ছিল, তার বাবা গুরুপ্রসন্ন মুখার্জি এবং মা মনোরমা দেবীর সাথে, তার প্রাথমিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। তার ছোট বোন ঊষা মুখার্জি এবং বড় ভাই অমূল্য মুখার্জি সহ তার ভাইবোনরাও স্বাধীনতার লড়াইয়ে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত পরিবেশে এই লালনপালন তার বিপ্লবী উদ্যোগের বীজ বপন করেছিল।

তিনি তার পিতামহের আদর্শ দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা তাকে অল্প বয়সে রাজনীতির জগতে প্ররোচিত করেছিল। পূর্ণানন্দ দাশগুপ্তের নির্দেশনায় গুপ্ত বিপ্লবী পার্টির সাথে তার যোগসাজশ এই কারণে তার প্রতিশ্রুতিকে দৃঢ় করে। পারুল ব্রিটিশ শনাক্তকরণ এড়াতে শান্তি, নীহার, আরতি এবং রানীর মতো বিভিন্ন উপনামের অধীনে কাজ করত, শুধুমাত্র কয়েকজন তার আসল পরিচয় সম্পর্কে অবগত।

1935 সালে, তার গোপন কার্যকলাপের কারণে তাকে উত্তর 24 পরগণার গোয়ালাপাড়ার টিটাগড়ের একটি গোপন অস্ত্রের ঘাঁটিতে গ্রেফতার করা হয়। সেই বছরের শেষের দিকে, টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় তার জড়িত থাকার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পুরুষ সমকক্ষদের পাশাপাশি তিনি বিচারের মুখোমুখি হন। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বোমা এবং বিস্ফোরক তৈরিতে পারুলের দক্ষতা বিপ্লবী কারণের প্রতি তার উত্সর্গ প্রদর্শন করে।

1939 সালে তার মুক্তির পর, পারুল তার বিপ্লবী প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে একাকীত্বের পথ বেছে নেন। তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন, বিপ্লবী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যা তার জীবনকে পরিচালিত করেছিল। পারুল মুখার্জি 20 এপ্রিল, 1990-এ মারা যান, তিনি স্থিতিস্থাপকতা এবং অটুট দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

পারুল মুখার্জির গল্প ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অবদানের একটি প্রমাণ, যা প্রায়শই ছাপিয়ে যায় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন স্বাধীনতার চেতনা এবং ভারতের মুক্তির জন্য অগণিত ব্যক্তিদের দ্বারা করা আত্মত্যাগের উদাহরণ দেয়। আমরা তাকে স্মরণ করার সাথে সাথে, আমরা একজন অমিমাংসিত নায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি যার কর্মগুলি আমাদের জাতির ইতিহাসের গতিপথকে গঠনে সহায়ক ছিল।

Share This