Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

তারাবাই মোদক: ছোটদের শিক্ষায় এক নতুন দিগন্তের পথিকৃৎ মহীয়সী নারী।

শিক্ষার কথা বললে সাধারণত আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, বই, খাতা, পরীক্ষা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা। কিন্তু একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরু তারও অনেক আগে। তিন থেকে ছয় বছর বয়সের একটি শিশু কীভাবে পৃথিবীকে চিনবে, কীভাবে ভাষা শিখবে, কীভাবে খেলতে খেলতে জ্ঞান অর্জন করবে—এই প্রশ্নগুলিই আধুনিক প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে।

ভারতে এই চিন্তাকে অনেক আগেই গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছিলেন এক অসাধারণ শিক্ষাবিদ—তারাবাই মোদক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ছোট শিশুকে শুধু বই মুখস্থ করিয়ে শিক্ষিত করা যায় না। শিশুর নিজের ভাষা, পরিবার, সমাজ, পরিবেশ এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করতে হয়।

আজ যখন ‘child-centred education’, ‘play-based learning’, ‘community participation’ এবং ‘early childhood care and education’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়, তখন তারাবাই মোদকের কাজ নতুন করে মনে পড়ে। ভারতের শিক্ষা মন্ত্রকের National Curriculum Framework for Foundational Stage-এ তাঁকে আধুনিক ভারতে শিশুকেন্দ্রিক প্রারম্ভিক শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শিশুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার ভাবনা

তারাবাই মোদকের শিক্ষাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—শিক্ষার কেন্দ্র হবে শিশু, কেবল পাঠ্যবই নয়।

তাঁর সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা এবং প্রথাগত শ্রেণিকক্ষের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। কিন্তু ছোট শিশুর শেখার পদ্ধতি যে বড়দের থেকে আলাদা, তা তিনি গুরুত্ব দিয়ে বুঝেছিলেন।

একটি শিশু চারপাশের পৃথিবীকে দেখে, স্পর্শ করে, প্রশ্ন করে, খেলতে খেলতে পরীক্ষা করে এবং অনুকরণ করে শেখে। তাই শিশুকে যদি শুধু বেঞ্চে বসিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পড়ানো হয়, তার স্বাভাবিক কৌতূহল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তারাবাই মোদকের শিক্ষাচিন্তায় সেই স্বাভাবিক কৌতূহলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শিক্ষা মন্ত্রকের নথিতেও উল্লেখ রয়েছে যে তারাবাই মোদক ও গিজুভাই বাদেকা শিশুকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষার ধারণা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া এবং তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯২৫: নতুন পথের সূচনা

তারাবাই মোদকের কাজের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ১৯২৫ সালে, যখন তিনি Nutan Balshikshan Sangh বা New Childhood Education Society প্রতিষ্ঠা করেন।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে ছোট শিশুদের জন্য সংগঠিত ও পরিকল্পিত শিক্ষার একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়।

তখন ভারতে প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। শহরের কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শিশুশিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও দেশের বিশাল গ্রামীণ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের কাছে এমন শিক্ষার সুযোগ পৌঁছনো ছিল কঠিন।

তারাবাইয়ের চিন্তার বিশেষত্ব এখানেই।

তিনি শুধু শহরের শিক্ষিত পরিবারের শিশুদের জন্য একটি শিক্ষাব্যবস্থা কল্পনা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন, সমাজের সাধারণ পরিবার এবং প্রান্তিক মানুষের শিশুরাও যেন উপযুক্ত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পায়।

কোসবাডের পরীক্ষা

তারাবাই মোদকের শিক্ষাচিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি ছিল কোসবাদে Vikaswadi কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর কাজ।

এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে ভারতের কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সরকারি National Curriculum Framework-এও কোসবাদের Vikaswadi-কে এমন একটি অনুপ্রেরণাদায়ক কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখান থেকে কমিউনিটি-ভিত্তিক ECCE কর্মসূচির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

এখানে তাঁর চিন্তা ছিল অত্যন্ত বাস্তবধর্মী।

তিনি বুঝেছিলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের জন্য শহরের স্কুলের হুবহু কাঠামো কার্যকর নাও হতে পারে। তাদের জীবনযাত্রা, পরিবেশ, পরিবারের পেশা, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক বাস্তবতাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

অর্থাৎ শিক্ষা হবে শিশুর জীবনের বাইরে কোনও আলাদা জগৎ নয়—শিশুর নিজের জীবনই হয়ে উঠবে শিক্ষার উপকরণ।

খেলতে খেলতে শেখা

বর্তমানে ‘play-based learning’ বা খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষাকে শিশুশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা ভারতীয় শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক আগেই দেখা দিয়েছিল তারাবাই মোদকের কাজে।

একটি শিশু খেলনা নিয়ে খেলছে—বাইরের চোখে হয়তো সেটি নিছক খেলা। কিন্তু শিক্ষকের সঠিক পরিকল্পনায় সেই খেলাই হয়ে উঠতে পারে সংখ্যা শেখার মাধ্যম, ভাষা শেখার মাধ্যম, সামাজিক আচরণ বোঝার মাধ্যম কিংবা সমস্যা সমাধানের অনুশীলন।

তারাবাইয়ের কাজের মধ্যে এই বাস্তবধর্মী শিক্ষাচিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়।

শিশুকে সব সময় নির্দেশ দিয়ে শেখানোর পরিবর্তে তার স্বাভাবিক আগ্রহকে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করার ধারণা ছিল তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের foundational learning-এর আলোচনায় এই ধারণাগুলির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।

মাতৃভাষার গুরুত্ব

শিশুর প্রথম ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, তার চিন্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন।

তারাবাই মোদক বুঝেছিলেন, একটি ছোট শিশুকে এমন ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হলে যা তার ঘরের ভাষা নয়, তখন শেখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই শিশুর মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষাকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁর শিক্ষাচিন্তায়। সরকারি National Curriculum Framework-ও তাঁর এবং গিজুভাই বাদেকার কাজের প্রসঙ্গে মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করেছে।

এই ভাবনার মধ্যে ছিল গভীর মানবিকতা।

কারণ শিক্ষা তখনই শিশুর কাছে সহজ ও আনন্দময় হয়, যখন সে শিক্ষকের কথার মধ্যে নিজের পরিচিত পৃথিবীকে খুঁজে পায়।

পরিবার ও সমাজও শিক্ষার অংশ

তারাবাই মোদকের শিক্ষাদর্শে স্কুল বা শিক্ষাকেন্দ্র একা কোনও বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান নয়।

একটি শিশুর শেখার সঙ্গে তার পরিবার, প্রতিবেশী এবং সামাজিক পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিশুর শিক্ষায় সমাজের অংশগ্রহণকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

এই ধারণা আজকের community-based early childhood education-এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শিক্ষা মন্ত্রকের নথিতে বলা হয়েছে, তারাবাই মোদক প্রারম্ভিক শিশুশিক্ষাকে সংগঠিতভাবে সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে কাজ করেছিলেন।

অর্থাৎ তিনি অনেক আগে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার কথা ভাবছিলেন, যেখানে শিশুর চারপাশের মানুষজনও শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুদের কথা

তারাবাই মোদকের কাজের একটি বড় মানবিক দিক ছিল শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে শিক্ষার সুযোগ কখনওই সব মানুষের কাছে সমান ছিল না। শহর ও গ্রামের মধ্যে যেমন পার্থক্য ছিল, তেমনই অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতেও শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য ছিল।

শিশুশিক্ষাকে সহজ, স্থানীয় পরিবেশভিত্তিক এবং কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত করার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের জন্য শিক্ষার দরজা আরও বাস্তবসম্মতভাবে খোলার সুযোগ তৈরি হয়।

এখানেই তারাবাইয়ের কাজ কেবল শিক্ষাবিদ্যার বিষয় হয়ে থাকে না; এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি অংশ হয়ে ওঠে।

আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় তারাবাইয়ের প্রাসঙ্গিকতা

আজ ভারতের শিক্ষানীতিতে Early Childhood Care and Education বা ECCE বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। National Curriculum Framework-এ ৩ থেকে ৬ বছর বয়সের শিশুদের জন্য প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষাকে foundational stage-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

শিশুর শারীরিক, জ্ঞানীয়, সামাজিক-মানসিক, নৈতিক, ভাষাগত ও সৃজনশীল বিকাশকে একসঙ্গে দেখার ওপরও বর্তমান শিক্ষাচিন্তায় জোর দেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তিত শিক্ষাদৃষ্টির সঙ্গে তারাবাই মোদকের চিন্তার আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তিনি এমন এক সময়ে শিশুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার কথা বলেছিলেন, যখন এই ধারণা আজকের মতো সর্বজনীন আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেনি।

শিক্ষক মানে শুধু পড়ানো নয়

তারাবাই মোদকের কাজ থেকে শিক্ষকের ভূমিকাও নতুনভাবে বোঝা যায়।

শিক্ষক শুধু তথ্য দেওয়ার মানুষ নন। তিনি শিশুর কৌতূহলকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, পরিবেশ তৈরি করেন, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করেন এবং শেখার সুযোগ সৃষ্টি করেন।

একজন ভালো শিক্ষক জানেন কখন শিশুকে নির্দেশ দিতে হবে এবং কখন তাকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে দিতে হবে।

ছোট শিশুর ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তারাবাইয়ের শিক্ষাচিন্তার অন্যতম বড় শিক্ষা এখানেই—শিশুকে শিক্ষার জন্য বদলে দেওয়ার আগে শিক্ষাব্যবস্থাকেও শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে হবে।

সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা এক চিন্তা

কোনও শিক্ষাবিদের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় তাঁর সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে।

তারাবাই মোদক এমন এক সময়ে শিশুশিক্ষা নিয়ে কাজ করেছিলেন, যখন ভারতের বিপুল সংখ্যক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে দূরে ছিল।

তিনি বুঝেছিলেন, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে হলে জীবনের একেবারে প্রথম ধাপ থেকেই শিশুর বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তাই তাঁর কাজ শুধু কয়েকটি বিদ্যালয় বা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল একটি বৃহত্তর প্রশ্ন—

শিক্ষা কাদের জন্য? এবং শিক্ষা কীভাবে শিশুর জীবনের সঙ্গে সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে?

এই প্রশ্ন আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরাধিকার

তারাবাই মোদকের উত্তরাধিকার কোনও একক প্রতিষ্ঠান বা একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ভারতে প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষার বিকাশ, শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা, মাতৃভাষায় শেখা, স্থানীয় পরিবেশকে শিক্ষার অংশ করা এবং কমিউনিটির সঙ্গে শিশুশিক্ষার সম্পর্ক তৈরি—এই বৃহত্তর ধারার ইতিহাসে তাঁর নাম গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি শিক্ষা-নথিতে তাঁকে আধুনিক ভারতের early childhood education-এর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজকের দিনে যখন শিশুদের পড়াশোনায় পরীক্ষার চাপ, মুখস্থবিদ্যা এবং অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তারাবাই মোদকের শিক্ষাদর্শ আমাদের অন্য একটি পথের কথা মনে করিয়ে দেয়—শিশুকে আগে শিশু হিসেবেই দেখতে হবে।

উপসংহার

তারাবাই মোদকের জীবন ও কর্মের সবচেয়ে মূল্যবান দিক হয়তো তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তিনি যে প্রশ্নটি শিক্ষাব্যবস্থার সামনে রেখেছিলেন সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান।

একটি শিশুর শিক্ষা কি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?

নাকি তার চারপাশের প্রকৃতি, পরিবার, সমাজ, ভাষা, খেলা, কৌতূহল এবং অভিজ্ঞতাও শিক্ষার অংশ হবে?

তারাবাই মোদক দ্বিতীয় পথটির পক্ষে কাজ করেছিলেন।

আজ ভারত যখন foundational learning এবং early childhood education-কে শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন বহু দশক আগে একজন নারী শিক্ষাবিদের সেই চিন্তা নতুন তাৎপর্য পায়।

তিনি দেখিয়েছিলেন, শিক্ষার বড় পরিবর্তন সবসময় বড় ভবন বা বিশাল প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আসে না। কখনও কখনও পরিবর্তনের শুরু হয় একটি ছোট শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে একটি সহজ প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে—

“সে কীভাবে সবচেয়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে?”

তারাবাই মোদকের শিক্ষাজীবন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক দীর্ঘ, সাহসী এবং মানবিক প্রচেষ্টা। আর সেই কারণেই ভারতীয় শিশুশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর নাম আজও বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য।

তথ্যসূত্র: ভারতের শিক্ষা মন্ত্রকের National Curriculum Framework for Foundational Stage এবং National Curriculum Framework for School Education।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

জানকীদেবী বাজাজ: স্বাধীনতার লড়াই থেকে গ্রামীণ সমাজসেবায় এক মহীয়সী নারীর যাত্রা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন অনেক নারীর নাম রয়েছে, যাঁরা সরাসরি বড় রাজনৈতিক মঞ্চে না থেকেও আন্দোলনের ভিতকে শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁরা কখনও চরকা কেটেছেন, কখনও বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, কখনও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার স্বাধীনতার পরে গ্রামোন্নয়ন ও নারীকল্যাণের কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

জানকীদেবী বাজাজ ছিলেন সেই ধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি খাদি ও চরকার প্রচার, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩২ সালের Civil Disobedience Movement-এ অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। স্বাধীনতার পরে তাঁর কাজ থেমে যায়নি; তিনি বিনোবা ভাবের ভূমিদান আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।

তাঁর জীবন তাই স্বাধীনতার আগে ও পরে—দুই ভারতকেই দেখার একটি অনন্য জানালা।

ছোটবেলার জীবন

জানকীদেবী বাজাজের জন্ম ৭ জানুয়ারি ১৮৯৩ সালে মধ্যপ্রদেশের জাওরায়। তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী মারওয়ারি পরিবারে জন্মেছিলেন।

তৎকালীন ভারতীয় সমাজে মেয়েদের জীবনের পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত। অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয় জামনালাল বাজাজের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে জামনালাল বাজাজ একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেন।

কিন্তু জানকীদেবীর নিজের পরিচয় শুধু একজন শিল্পপতির স্ত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

স্বামী যখন জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তিনিও ধীরে ধীরে জনজীবন ও সমাজসেবার কাজে প্রবেশ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর নিজের কাজই তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়।

গান্ধীর আদর্শের প্রভাব

জামনালাল বাজাজ মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন। গান্ধীর সরল জীবনযাপন, স্বদেশি, খাদি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ধারণা বাজাজ পরিবারের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

জানকীদেবীও চরকা কাটতে শুরু করেন এবং খাদি ব্যবহারে গুরুত্ব দেন। বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

চরকা তাঁর কাছে শুধু একটি সুতো কাটার যন্ত্র ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় চরকা হয়ে উঠেছিল আত্মনির্ভরতা ও স্বদেশি অর্থনীতির একটি প্রতীক।

তিনি নিজের জীবনযাপনেও সেই আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করেন।

নারীদের সংগঠিত করার কাজ

জানকীদেবী বুঝেছিলেন, স্বাধীনতার আন্দোলনকে সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে পৌঁছে দিতে হলে নারীদেরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

তিনি নারীসমাজের মধ্যে খাদি, স্বনির্ভরতা ও সামাজিক কাজের গুরুত্ব নিয়ে কাজ করেন। নারীকল্যাণ এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

তৎকালীন সময়ে কোনও নারী প্রকাশ্যে সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিলে তাঁকে শুধু বাইরের সামাজিক বাধাই নয়, পারিবারিক ও প্রচলিত রীতিনীতির সঙ্গেও লড়াই করতে হতো।

জানকীদেবীর ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটেছিল।

তিনি নিজের পরিচিত সামাজিক পরিসরকে ব্যবহার করে আরও বেশি নারীকে সামাজিক কাজে যুক্ত করার চেষ্টা করেন।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান

জানকীদেবীর সামাজিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান।

১৯২০-এর দশকে তিনি তথাকথিত ‘হরিজন’ সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক অবস্থার উন্নতির কাজে যুক্ত হন। তাঁদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও তিনি অংশ নেন।

এটি ছিল সেই সময়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল সামাজিক প্রশ্ন।

ভারতীয় সমাজে জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু সমাজকর্মী রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক সংস্কারের কথাও বলেছিলেন।

জানকীদেবীর কাজ সেই বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ধারার অংশ হয়ে ওঠে।

Civil Disobedience Movement এবং কারাবাস

১৯৩০-এর দশকে স্বাধীনতা আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৩২ সালের Civil Disobedience Movement-এ জানকীদেবী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এর জন্য তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

একজন নারী হিসেবে কারাবাসের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় তিনি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের ভূমিকা শুধু মিছিল বা জনসভায় উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; অনেক নারী গ্রেফতার, কারাবাস এবং সামাজিক চাপও সহ্য করেছিলেন।

জানকীদেবীর ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল।

গরুসেবা ও গ্রামীণ সমাজ

জানকীদেবীর সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল গোসেবা।

১৯৪২ সাল থেকে তিনি দীর্ঘ সময় Akhil Bharatiya Goseva Sangh-এর সভাপতি হিসেবে কাজ করেন বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এই কাজের সঙ্গে তাঁর গ্রামীণ ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক ছিল।

ভারতের বহু গ্রামীণ পরিবারের জীবনে গবাদি পশু কৃষি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ফলে গ্রামীণ সমাজে পশুপালন, কৃষি এবং অর্থনৈতিক জীবনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

জানকীদেবীর সমাজসেবার দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই গ্রাম ও সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে নতুন কাজ

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে—কিন্তু গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য কীভাবে কমবে?

জানকীদেবী সেই প্রশ্ন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

স্বাধীনতার পরে তিনি বিনোবা ভাবের ভূমিদান আন্দোলন-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ভূমিদান আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ভূমির মালিকদের কাছ থেকে জমি দান নিয়ে ভূমিহীনদের মধ্যে তা বিতরণের মাধ্যমে গ্রামীণ বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা। জানকীদেবী এই সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

অর্থাৎ তাঁর স্বাধীনতার ধারণা শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসানে শেষ হয়নি।

স্বাধীনতার পরেও তিনি সামাজিক ন্যায় ও গ্রামীণ উন্নয়নের প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন।

নিজের জীবনের কথা নিজেই লিখেছিলেন

জানকীদেবী তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আত্মজীবনী লেখেন—‘মেরি জীবন যাত্রা’।

বইটি ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়।

আত্মজীবনী কোনও ব্যক্তির জীবনের শুধু ঘটনাপঞ্জি নয়। নিজের সময়কে একজন মানুষ কীভাবে দেখেছেন, কোন ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং নিজের কাজের অর্থ কীভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—তাও সেখানে ধরা পড়ে।

জানকীদেবীর আত্মজীবনী তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার একটি মূল্যবান উৎস।

পদ্মবিভূষণে সম্মান

১৯৫৬ সালে জানকীদেবী বাজাজকে পদ্মবিভূষণ প্রদান করা হয়। সরকারি পদ্ম পুরস্কারের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে এবং তাঁকে Social Work-এর ক্ষেত্রে সম্মানিত করা হয়।

এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কাজের একটি জাতীয় স্বীকৃতি ছিল।

তাঁর বিশেষত্ব ছিল—তিনি কোনও একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে ছিলেন না।

স্বাধীনতা আন্দোলন, খাদি, নারীকল্যাণ, সামাজিক সংস্কার, গোসেবা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন—বিভিন্ন ক্ষেত্র তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তাঁর নামে আজও কাজ চলছে

জানকীদেবীর মৃত্যুর পরও তাঁর নাম সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে।

তাঁর স্মৃতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। Jamnalal Bajaj Foundation-এর একটি পুরস্কারও তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা নারী ও শিশুদের শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ করা নারীদের সম্মানিত করে।

অর্থাৎ তাঁর কাজ শুধু অতীতের ইতিহাস হয়ে থাকেনি; তাঁর নাম পরবর্তী প্রজন্মের সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

একজন গৃহবধূ থেকে সমাজকর্মী

জানকীদেবীর জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনগুলির একটি হল তাঁর সামাজিক ভূমিকার বিস্তার।

একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে অল্প বয়সে বিবাহিত একজন নারী ধীরে ধীরে কীভাবে বৃহত্তর সমাজের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন—তাঁর জীবন সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

তিনি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না, বড় কোনও প্রশাসনিক পদেও ছিলেন না। কিন্তু নিজের সামাজিক অবস্থান, পরিচিতি এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হন।

এখানেই তাঁর জীবনের বিশেষত্ব।

স্বাধীনতার অর্থ তাঁর কাছে কী ছিল?

জানকীদেবীর কর্মজীবন দেখলে বোঝা যায়, তাঁর কাছে স্বাধীনতার ধারণা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

খাদি ও স্বদেশি অর্থনীতি তাঁকে আত্মনির্ভরতার দিকে টেনেছিল।

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে কাজ তাঁকে সামাজিক সমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

ভূমিদান আন্দোলন তাঁকে গ্রামীণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিল।

নারীকল্যাণের কাজ তাঁকে সমাজের অর্ধেক মানুষের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিল।

এই বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে তাঁর সামাজিক দর্শনের নানা দিক প্রকাশ পায়।

শেষ অধ্যায়

জানকীদেবী বাজাজ ২১ মে ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

কিন্তু তাঁর জীবনের শেষের সঙ্গে তাঁর কাজের সমাপ্তি ঘটেনি।

যে সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পুরস্কার তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলির মাধ্যমে তাঁর স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উন্নয়ন, শিক্ষা, দক্ষতা এবং গ্রামীণ জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কাজের ক্ষেত্রে তাঁর নাম আজও ব্যবহৃত হয়।

উত্তরাধিকার

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি এমন অসংখ্য মানুষের জীবন রয়েছে, যাঁদের কাজ ছিল সমাজের ভিতরে পরিবর্তন তৈরি করা।

জানকীদেবী বাজাজ তাঁদেরই একজন।

তাঁর জীবনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সমাজসেবা আলাদা দুটি অধ্যায় ছিল না। বরং একটি থেকে অন্যটির জন্ম হয়েছে।

স্বাধীনতার আগে তিনি স্বদেশি ও সামাজিক সংস্কারের কাজে যুক্ত হয়েছেন। আন্দোলনের সময় কারাবরণ করেছেন। স্বাধীনতার পরে গ্রামীণ সমাজের প্রশ্নে কাজ করেছেন। ভূমিদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নারীকল্যাণের কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই দীর্ঘ পথচলা দেখায়, একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরে সেই স্বাধীনতাকে সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তোলার কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জানকীদেবী বাজাজের জীবন তাই ইতিহাসের একটি শান্ত অথচ গভীর অধ্যায়—যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব, আত্মনির্ভরতার সঙ্গে মানবিকতা এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সঙ্গে জনকল্যাণ একসূত্রে গাঁথা।

তাঁর নাম মনে করিয়ে দেয়—দেশ গড়ার কাজ শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে হয় না; গ্রামের উঠোনে, চরকার পাশে, সমাজের প্রান্তিক মানুষের ঘরে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যেও সেই নির্মাণ চলতে থাকে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

প্রফেসর বিমলা বুটি: প্লাজমার রহস্য অনুসন্ধান করা ভারতের এক বিজ্ঞান-অগ্রদূত।

বিজ্ঞানের কিছু ক্ষেত্র সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অদৃশ্য। আমরা বিদ্যুৎ দেখি, আলো দেখি, মহাকাশ দেখি; কিন্তু সেই দৃশ্যমান জগতের পেছনে থাকা অদৃশ্য কণিকা, তরঙ্গ, শক্তি ও ক্ষেত্রের আচরণ বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা যে গভীর গবেষণা করেন, তার অনেকটাই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান তেমনই একটি ক্ষেত্র।

সূর্য, নক্ষত্র এবং মহাকাশের বিভিন্ন পরিবেশে প্লাজমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্লাজমার মধ্যে কণিকার সম্মিলিত আচরণ, তরঙ্গ, অস্থিতিশীলতা এবং শক্তির প্রবাহ বোঝা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র।

এই জটিল জগতে ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাম ছিলেন প্রফেসর বিমলা বুটি। তিনি শুধু একজন তাত্ত্বিক প্লাজমা পদার্থবিদ ছিলেন না; ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্লাজমা গবেষণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন Indian National Science Academy বা INSA-র প্রথম ভারতীয় নারী Physics Fellow এবং The World Academy of Sciences-এরও প্রথম ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী Fellow হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর জীবন ছিল গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চা এবং পরবর্তী জীবনে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য কাজ করার এক দীর্ঘ যাত্রা।

দেশভাগের সময় শৈশব

বিমলা বুটির জন্ম ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে অবিভক্ত ভারতের মুলতানে। তাঁর বাবা ছিলেন বোধরাজ বুটি এবং মা যমুনা দেবী বুটি।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার মুলতান থেকে দিল্লিতে চলে আসে। তখন বিমলার বয়স ছিল মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর।

পরবর্তীকালে Physics Today-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই সেই সময়ের কথা স্মরণ করেছিলেন। দেশভাগের পরে নতুন পরিবেশে তাঁর পড়াশোনা শুরু করতে হয়েছিল। যে স্কুলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন, সেটি মূলত পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি সরকারি স্কুল ছিল এবং সেখানে বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েই তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞানশিক্ষার সুযোগ পান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

একদিকে ছিল দেশভাগের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ।

গণিত থেকে পদার্থবিজ্ঞান

ছোটবেলা থেকেই বিমলা বুটির গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। Physics Today-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, গণিতে তাঁর আগ্রহই তাঁকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়।

তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে Physics নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই Bachelor’s ও Master’s ডিগ্রি অর্জন করেন।

এরপর ভারত সরকারের একটি Fellowship নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান।

গন্তব্য ছিল University of Chicago।

সেই সময় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের একজন ছিলেন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর। পরবর্তীকালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর অধীনেই বিমলা বুটি ডক্টরাল গবেষণা শুরু করেন।

চন্দ্রশেখরের অধীনে গবেষণা

১৯৬২ সালে University of Chicago থেকে বিমলা বুটি Plasma Physics-এ PhD অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল plasma oscillations এবং two-stream instability-এর মতো জটিল সমস্যা।

প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞান তখনও তুলনামূলকভাবে নতুন এবং দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্র।

একটি প্লাজমা পরিবেশে charged particles বা আধানযুক্ত কণিকাগুলি কীভাবে সম্মিলিতভাবে আচরণ করে, কীভাবে তরঙ্গ তৈরি হয় এবং কখন সেই ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা।

বিমলা বুটি সেই গবেষণারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রবেশ করেছিলেন।

চন্দ্রশেখরের মতো একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে গবেষণা তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী জীবনেও তিনি চন্দ্রশেখরকে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকদের একজন হিসেবে স্মরণ করেছেন।

বিদেশের গবেষণা শেষ করে দেশে ফেরা

PhD সম্পন্ন করার পর বিমলা বুটি ভারতে ফিরে আসেন। সরকারি Fellowship-এর শর্ত অনুযায়ী দেশে ফিরে তিনি Delhi University-তে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হন।

কিছুদিন পর তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং NASA-র Goddard Space Flight Center-এ গবেষণার সুযোগ পান।

এখানে তাঁর গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।

মহাকাশের পরিবেশে প্লাজমার আচরণ বোঝার জন্য plasma physics-এর জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁর গবেষণা ধীরে ধীরে পৃথিবীর গবেষণাগার থেকে মহাকাশবিজ্ঞানের বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে তিনি NASA-র Ames Research Center এবং Jet Propulsion Laboratory-তেও কাজ করেন।

ভারতে ফিরে নতুন অধ্যায়

১৯৬৮ সালে বিমলা বুটি ভারতে ফিরে আসেন এবং Indian Institute of Technology Delhi-তে যোগ দেন। সেখানে তিনি প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় যখন তিনি Physical Research Laboratory বা PRL, আহমেদাবাদে যোগ দেন।

তৎকালীন PRL-এর পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই। সারাভাই তাঁকে PRL-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

বিমলা বুটি ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে PRL-এ Associate Professor হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে Professor, Senior Professor ও Dean of Faculty পদে দায়িত্ব পালন করেন।

PRL-এ প্লাজমা গবেষণার ভিত

PRL-এ বিমলা বুটির অন্যতম বড় অবদান ছিল প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী গবেষণা কর্মসূচি গড়ে তোলা।

তিনি সেখানে theoretical এবং experimental—দুই ধারার প্লাজমা গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গবেষণা দল পরবর্তী সময়ে ভারতের plasma physics গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। Astronomical Society of India-র স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, PRL-এ তাঁর গড়ে তোলা plasma physics group পরবর্তীকালে আলাদা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে Institute for Plasma Research (IPR) গঠনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখানেই একজন বিজ্ঞানীর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।

গবেষণা শুধু নিজের গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি নতুন ক্ষেত্রের জন্য গবেষণাগার, ছাত্র, শিক্ষক, প্রযুক্তি এবং গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি করাও বিজ্ঞানীর দীর্ঘমেয়াদি অবদানের অংশ।

বিমলা বুটি সেই কাজটিই করেছিলেন।

প্লাজমা তরঙ্গ, অস্থিরতা ও Chaos

বিমলা বুটির গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল nonlinear plasma waves, solitons এবং chaos।

সহজ ভাষায় বললে, প্লাজমার মধ্যে শক্তি ও কণিকার সম্মিলিত আচরণ সব সময় সরল নিয়ম মেনে চলে না। অনেক সময় ছোট পরিবর্তন জটিল তরঙ্গ বা অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

এই ধরনের nonlinear phenomena বোঝার জন্য গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সূক্ষ্ম পদ্ধতি প্রয়োজন।

University of Chicago-র একটি স্মৃতিচারণে তাঁর কাজকে plasma phenomena বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং nonlinear waves ও chaos নিয়ে তাঁর গবেষণার কথাও বলা হয়েছে।

এই গবেষণার ফলে তিনি আন্তর্জাতিক প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব

বিমলা বুটির কর্মজীবন শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৮৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইতালির Trieste-এ অবস্থিত Abdus Salam International Centre for Theoretical Physics বা ICTP-তে Plasma Physics-এর Director হিসেবে কাজ করেন।

এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিমলা বুটি সেখানে বিভিন্ন দেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যুক্ত করার কাজ করেন।

তিনি বহু Spring College এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লক্ষ্য ছিল উন্নয়নশীল দেশের তরুণ গবেষকদের বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়া।

অর্থাৎ তিনি শুধু নিজে গবেষণা করেননি; নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণার দরজাও খুলতে সাহায্য করেছিলেন।

একজন নারী বিজ্ঞানীর পথ

বিমলা বুটির কর্মজীবনের সময় পদার্থবিজ্ঞান ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র।

বিশেষ করে plasma physics-এর মতো অত্যন্ত বিশেষায়িত গবেষণাক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি ছিল আরও কম।

নিজের একটি লেখায় তিনি পুরুষ-প্রধান বিজ্ঞানক্ষেত্রে একজন নারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। American Physical Society-র একটি আলোচনায় তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, তিনি মনে করতেন নারী বিজ্ঞানীদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বাধা ছিল।

তবে তাঁর পথ শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়।

তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেখানে গবেষণা দল তৈরি করেছেন, ছাত্রছাত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং একটি নতুন গবেষণাক্ষেত্রকে শক্তিশালী করেছেন।

এই কারণে তাঁর উত্তরাধিকার ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞানসম্মান ও পুরস্কার

বিমলা বুটির গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মানের মাধ্যমে।

১৯৭৭ সালে তিনি Vikram Sarabhai Award for Planetary Sciences লাভ করেন।

১৯৯৩ সালে পান Jawaharlal Nehru Birth Centenary Lectureship Award।

১৯৯৪ সালে তিনি পান INSA-Vainu Bappu Award for Astrophysics।

১৯৯৬ সালে University of Chicago তাঁকে Professional Achievement Citation প্রদান করে।

পরবর্তী সময়ে nonlinear waves এবং chaos-এর ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য ২০১০ সালে একটি US Medal-ও পান।

তাঁর বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল Fellowship।

১৯৮১ সালে তিনি Indian National Science Academy-এর Fellow নির্বাচিত হন এবং INSA-র সরকারি উপাদানে তাঁকে প্রথম ভারতীয় নারী Physics Fellow হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি TWAS, National Academy of Sciences India এবং American Physical Society-এরও Fellow ছিলেন।

গবেষণা থেকে সমাজের দিকে

অবসর নেওয়ার পরেও বিমলা বুটির কাজ থেমে যায়নি।

২০০৩ সালে তিনি Buti Foundation প্রতিষ্ঠা করেন।

এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দেওয়া, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং computer literacy-র মতো বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হন। Physics Today-কে তিনি বলেছিলেন, অবসরের পর তিনি সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। STEM ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও তাঁর অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ জীবনের শেষ পর্যায়েও তাঁর মনোযোগ ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে।

যে বিজ্ঞান তিনি একসময় শিখেছিলেন, সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কিছুটা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াই হয়ে ওঠে তাঁর পরবর্তী কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য।

একজন শিক্ষকের উত্তরাধিকার

বিমলা বুটির ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে তাঁর শিক্ষকসুলভ ভূমিকার কথা বারবার উঠে এসেছে।

International Astronomical Union-এর স্মৃতিচারণে তাঁর একজন প্রাক্তন ছাত্র লিখেছেন, বিমলা বুটি শুধু একজন অসাধারণ গবেষক ছিলেন না, তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ mentor-ও ছিলেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে নিজ নিজ গবেষণাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হন।

বিজ্ঞানে একজন শিক্ষক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর জীবন তার একটি উদাহরণ।

একটি গবেষণাপত্র হয়তো একটি নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক বহু মানুষের চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারেন।

বিমলা বুটির ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় উত্তরাধিকারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪-এ বিদায়

প্রফেসর বিমলা বুটি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে ৯০ বছর বয়সে মারা যান। International Astronomical Union, Astronomical Society of India এবং Plasma Science Society of India তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান ও শিক্ষকতার কথা স্মরণ করে।

তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গে ভারতীয় প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজন্মেরও অবসান ঘটে।

কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত গবেষণার ধারাগুলি, ছাত্রছাত্রীদের কাজ এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য তৈরি সুযোগ তাঁর উত্তরাধিকারকে বহন করে চলেছে।

বিমলা বুটির জীবন থেকে যে অধ্যায়টি থেকে যায়

বিমলা বুটির জীবনের গল্পে একাধিক সময় ও ভূগোল একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

মুলতানে জন্ম।

দেশভাগের সময় দিল্লিতে চলে আসা।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চা।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রশেখরের অধীনে PhD।

NASA-তে গবেষণা।

IIT Delhi-তে শিক্ষকতা।

বিক্রম সারাভাইয়ের আমন্ত্রণে PRL-এ যোগদান।

ভারতে plasma physics-এর গবেষণাভিত্তি শক্তিশালী করা।

Trieste-এ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণের নেতৃত্ব।

আর অবসরের পরে তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য Foundation গড়ে তোলা।

এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপে তাঁর কাজের ধরন কিছুটা বদলেছে, কিন্তু একটি বিষয় একই থেকেছে—জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানীর কাজ শুধু নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়। কখনও গবেষণাগার তৈরি করা, কখনও ছাত্র তৈরি করা, কখনও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা, আবার কখনও পরবর্তী প্রজন্মকে সুযোগ করে দেওয়াও বিজ্ঞানেরই অংশ।

শেষ কথা

প্রফেসর বিমলা বুটি এমন এক সময়ে প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যখন এই ক্ষেত্রটি ছিল কঠিন, বিশেষায়িত এবং পুরুষ-প্রধান।

কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল “প্রথম ভারতীয় নারী” হওয়ার মধ্যে আটকে নেই।

তাঁর আসল কৃতিত্ব ছিল একটি গবেষণাক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া এবং বহু তরুণ গবেষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

মহাকাশের প্লাজমা নিয়ে গবেষণা করা এই বিজ্ঞানী শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন—একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার শুধু তাঁর নিজের প্রকাশিত গবেষণাপত্র নয়; তিনি যাঁদের হাতে জ্ঞান তুলে দেন, তাঁদের কাজের মধ্যেও তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা বেঁচে থাকে।

বিমলা বুটির জীবন সেই ধারাবাহিকতারই এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. পূর্ণিমা সিনহা: পদার্থবিজ্ঞান থেকে সংগীত ও শিল্প—বহুমুখী প্রতিভার এক বাঙালি অগ্রদূত।

একজন বিজ্ঞানীর পরিচয় সাধারণত তাঁর গবেষণার বিষয়, আবিষ্কার, গবেষণাপত্র কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে একটি মাত্র পরিচয়ে ধরা যায় না। তাঁরা একইসঙ্গে বিজ্ঞানী, শিল্পী, সংগীতসাধক, লেখক এবং চিন্তক।

ড. পূর্ণিমা সিনহা ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন পদার্থবিজ্ঞান ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান একটি ক্ষেত্র, তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেন পূর্ণিমা সিনহা। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে PhD অর্জনকারী প্রথম নারী। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গঠন নিয়ে X-ray crystallography ও structural analysis। তাঁর গবেষণার পথপ্রদর্শক ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

কিন্তু তাঁর পরিচয় এখানেই শেষ নয়। তিনি সংগীত শিখেছেন, তবলা বাজিয়েছেন, ছবি এঁকেছেন, ভাস্কর্য তৈরি করেছেন, বাংলা ও ইংরেজিতে লিখেছেন এবং বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন।

তাঁর জীবন তাই শুধুমাত্র একজন নারী বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়—এটি এক বহুমাত্রিক মননের গল্প।

একটি উদার পরিবারে বেড়ে ওঠা

পূর্ণিমা সিনহার জন্ম ১২ অক্টোবর ১৯২৭ সালে কলকাতায়। তাঁর বাবা নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ছিলেন আইনজীবী এবং লেখক। তিনি নারীশিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির পক্ষে ছিলেন।

এমন একটি পরিবেশেই পূর্ণিমার বেড়ে ওঠা। পরিবারের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব ছিল প্রবল। তাঁর বড় বোন সুশমা সেনগুপ্ত কলকাতায় মেয়েদের জন্য Lake School প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই পূর্ণিমার সামনে শিক্ষার একটি বিস্তৃত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

তাঁর আগ্রহও ছিল বহুমুখী। বিজ্ঞান তাঁকে আকর্ষণ করত, আবার সংগীত ও শিল্পের প্রতিও ছিল গভীর টান।

পরবর্তী জীবনে এই বহুমুখী আগ্রহই তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

পদার্থবিজ্ঞানের পথে যাত্রা

পূর্ণিমা সিনহা Asutosh College এবং Scottish Church College-এ পড়াশোনা করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Rajabazar Science College-এ পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

তখন ভারতে মেয়েদের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ আজকের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ছিল। বিশেষ করে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে নারীদের উপস্থিতি ছিল বিরল।

তবু পূর্ণিমা নিজের আগ্রহ থেকে এই পথ বেছে নেন।

১৯৫১ সালে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অধীনে PhD গবেষণা শুরু করেন। Bose-এর Khaira Laboratory-তে তখন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষামূলক গবেষণা চলছিল। পূর্ণিমার গবেষণার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মাটির গঠন ও তার X-ray বিশ্লেষণ।

গবেষণাগারে তৈরি যন্ত্র

পূর্ণিমা সিনহার গবেষণার গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক তাঁর হাতে-কলমে বিজ্ঞানচর্চা।

আজকের মতো আধুনিক গবেষণাগার, সহজলভ্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত প্রযুক্তি তখন ছিল না। গবেষকদের নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক যন্ত্র তৈরি বা পরিবর্তন করতে হতো।

পূর্ণিমার গবেষণার জন্যও X-ray equipment-এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই যন্ত্র সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

তাই তিনি কলকাতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিক্রি হওয়া surplus সামরিক সরঞ্জামের অংশ সংগ্রহ করে নিজের গবেষণার প্রয়োজন অনুযায়ী X-ray apparatus তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। Indian Academy of Sciences-এর জীবনীমূলক উপাদানেও তাঁর গবেষণাগারে নিজস্ব X-ray tube তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে।

এই ঘটনাটি তাঁর বিজ্ঞানচর্চার চরিত্রটিকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরে।

তিনি শুধু বই পড়ে বা তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে গবেষণা করেননি; প্রয়োজনে যন্ত্রের কাঠামো বুঝে সেটিকে নিজের গবেষণার উপযোগী করে তুলেছিলেন।

ভারতের মাটির বিজ্ঞান

পূর্ণিমার গবেষণার বিষয় ছিল বিভিন্ন ধরনের clay বা মাটির গঠন।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা মাটির নমুনা নিয়ে X-ray diffraction এবং অন্যান্য বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি তাদের গঠন বোঝার চেষ্টা করেন।

Indian National Science Academy-র প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক লেখায় পূর্ণিমা সিনহার কাজকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গবেষণাগারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের clay sample-এর X-ray structural analysis-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর গবেষণা থেকে বোঝা যায়, পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূপ্রকৃতি ও উপাদানের বৈশিষ্ট্যও অনুসন্ধান করা যায়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিক ডক্টরেট

১৯৫৬ সালে পূর্ণিমা সিনহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেন। ভারত সরকারের India Science and Technology portal তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে PhD অর্জনকারী প্রথম নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। TIFR-এর ২০২৫ সালের একটি অনুষ্ঠানের বিবরণেও তাঁকে একইভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা Physics PhD হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অর্জনের গুরুত্ব বুঝতে হলে সময়টাকে মনে রাখতে হয়।

স্বাধীনতার প্রথম দশকে ভারতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের নতুন কাঠামো তৈরি করছে। সেই সময় একজন নারী পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করে ডক্টরেট অর্জন করেছিলেন।

তিনি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করেননি; পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য একটি সম্ভাবনার দরজাও খুলেছিলেন।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রভাব

পূর্ণিমা সিনহার জীবনে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বোস ছিলেন তাঁর গবেষণা-নির্দেশক। কিন্তু তাঁর প্রভাব শুধু গবেষণার বিষয় নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণার স্বাধীনতা এবং নিজে পরীক্ষা করে দেখার সংস্কৃতি পূর্ণিমার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল।

পূর্ণিমা পরবর্তী জীবনে তাঁর শিক্ষক ও পথপ্রদর্শককে নিয়ে একাধিক লেখা লিখেছেন। বাংলা ভাষায় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবন ও বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে তাঁর লেখাগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বিজ্ঞান সাধনার ধারায় সত্যেন্দ্রনাথ বসু’-র মতো কাজ।

অর্থাৎ তিনি শুধু বসুর ছাত্র ছিলেন না; পরবর্তী সময়ে বসুর বিজ্ঞানচিন্তাকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেছিলেন।

বিজ্ঞানীর পাশাপাশি সংগীতসাধক

পূর্ণিমা সিনহার জীবনের আরেকটি দিক তাঁকে অন্য অনেক বিজ্ঞানীর থেকে আলাদা করে দেয়।

তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছিলেন। সংগীতের পাশাপাশি তিনি তবলা শেখেন। India Science and Technology portal-এর জীবনীতে তাঁর তবলা শেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তখন তবলা ছিল মূলত পুরুষশাসিত বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্র। সেই পরিবেশে একজন নারী বিজ্ঞানীর পাশাপাশি তবলা শেখা এবং সংগীতচর্চা করা ছিল তাঁর বহুমুখী আগ্রহেরই প্রকাশ।

তাঁর সংগীতচর্চা নিছক অবসর বিনোদন ছিল না। সংগীতের গঠন, শব্দ, ছন্দ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্যেও তিনি সম্পর্ক খুঁজে পেতেন।

পরবর্তী সময়ে সংগীতের ওপর তাঁর গবেষণা ও লেখালেখিও হয়।

বিজ্ঞান ও সংগীতের মিলন

পূর্ণিমা সিনহার চিন্তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি জ্ঞানকে আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দি করে দেখতেন না।

পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক হয়েও তিনি সংগীতের গঠন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে Visva-Bharati-তে musical acoustics বা সংগীতের শব্দবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর একটি বক্তৃতা হয়। পরের বছর সেখানে সংগীতে MA কোর্স চালুর ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগের কথা সরকারি জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে বিজ্ঞান ও শিল্পের একটি সুন্দর সংযোগ দেখা যায়।

শব্দের কম্পন পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়, কিন্তু সেই শব্দ যখন সংগীতে রূপ নেয়, তখন তা সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। পূর্ণিমার আগ্রহ ছিল এই দুই জগতের সংযোগস্থলে।

শিল্পী পূর্ণিমা

তাঁর প্রতিভা শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি ছবি আঁকতেন এবং ভাস্কর্যও তৈরি করতেন। মাটির কাজ, কাঠের খেলনা, বাঁশের সামগ্রী, লাক্ষার কাজ, পটারি এবং বিভিন্ন লোকশিল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। Visva-Bharati-র সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি বিভিন্ন শিল্প ও কারুশিল্পের প্রদর্শনী আয়োজন ও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি একজন শিল্পীর চোখে পৃথিবীকে দেখা—এই দ্বৈততা তাঁর জীবনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

একদিকে তিনি মাটির crystal structure বিশ্লেষণ করছেন, অন্যদিকে সেই মাটিকেই শিল্পের উপাদান হিসেবে দেখছেন।

লেখক ও বিজ্ঞান-প্রচারক

পূর্ণিমা সিনহা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তিনি ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। এই পত্রিকাটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাংলা বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলির একটি ছিল।

তিনি ইংরেজি ও বাংলা—দুই ভাষাতেই লিখতেন।

শুধু নিজের গবেষণার বিষয় নয়, বিজ্ঞানী, সংগীত, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র নিয়ে তাঁর লেখালেখি ছিল।

এমনকি Erwin Schrödinger-এর Mind and Matter বইটির বাংলা অনুবাদও তিনি করেন। তাঁর অনুবাদের নাম ছিল ‘মন ও জড়বস্তু’। DNA নিয়ে একটি বইও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।

এভাবে তিনি বিজ্ঞানের জটিল ধারণাগুলিকে বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেন।

গবেষণার পরবর্তী অধ্যায়

পূর্ণিমা সিনহার পেশাগত জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে কলকাতার Central Glass and Ceramic Research Institute (CGCRI)-এ। ১৯৬৪ সালে বিদেশ থেকে ফিরে তিনি সেখানে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৮৬ সালে স্বেচ্ছাবসর নেন।

তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায় দেখায় যে তাঁর গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তির গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও তিনি কাজ করেছেন।

পরিবারেও বিজ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকার

পূর্ণিমা সিনহার পরিবারও পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তাঁর স্বামী ছিলেন নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুরজিতচন্দ্র সিনহা, যিনি Visva-Bharati University-এর উপাচার্যও ছিলেন। তাঁদের দুই কন্যা পরবর্তীতে বিজ্ঞানী হন।

ফলে তাঁর পরিবারে বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার দুই ধারাই পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে।

একটি অন্যরকম উত্তরাধিকার

পূর্ণিমা সিনহার জীবনকে শুধুমাত্র “প্রথম মহিলা পদার্থবিজ্ঞানী” বলে শেষ করে দিলে তাঁর আসল বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়বে না।

তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি বিজ্ঞানকে দেখেছেন অনুসন্ধানের পথ হিসেবে, সংগীতকে দেখেছেন কাঠামো ও অনুভূতির সমন্বয় হিসেবে, শিল্পকে দেখেছেন সৃষ্টির ভাষা হিসেবে এবং লেখাকে দেখেছেন জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে।

তাঁর গবেষণাগারে X-ray diffraction দিয়ে মাটির গঠন বিশ্লেষণ হয়েছে। আবার তাঁর হাতে তবলার বোলও ধ্বনিত হয়েছে। তিনি যেমন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেছেন, তেমনই ছবি এঁকেছেন এবং ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। তিনি যেমন গবেষণাপত্র লিখেছেন, তেমনই সাধারণ পাঠকের জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান নিয়ে লিখেছেন।

এই বহুমাত্রিকতাই পূর্ণিমা সিনহার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

শেষ কথা

বিজ্ঞান ও শিল্পকে আমরা প্রায়ই দুটি আলাদা জগৎ হিসেবে দেখি। একদিকে যুক্তি, পরীক্ষা ও পরিমাপ; অন্যদিকে সৃজনশীলতা, অনুভূতি ও সৌন্দর্য।

পূর্ণিমা সিনহার জীবন এই বিভাজনকে প্রশ্ন করে।

তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন মানুষের কৌতূহলের কোনও নির্দিষ্ট সীমানা থাকতে হয় না। পদার্থবিজ্ঞানের একটি গবেষণাগার থেকে সংগীতের আসর, সেখান থেকে শিল্পের প্রদর্শনী, আবার বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা—সবকিছুই একজন মানুষের জ্ঞানযাত্রার অংশ হতে পারে।

১৯২৭ সালে জন্ম নেওয়া সেই কিশোরী যখন পদার্থবিজ্ঞানের পথ বেছে নিয়েছিলেন, তখন হয়তো তাঁর সামনে এতগুলি পরিচয়ের ভবিষ্যৎ ছিল না। কিন্তু নিজের আগ্রহকে কখনও একটি মাত্র ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে না রাখার কারণেই তিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র নাম হয়ে ওঠেন।

ড. পূর্ণিমা সিনহা তাই শুধু একজন নারী বিজ্ঞানীর গল্প নন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—জ্ঞানকে যত বেশি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, মানুষের চিন্তার জগতও তত বেশি বিস্তৃত হয়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. ইন্দিরা হিন্দুজা: ভারতের IVF চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা করা চিকিৎসক।

একটি শিশুর জন্ম সাধারণত একটি পরিবারের ব্যক্তিগত আনন্দের ঘটনা। কিন্তু কখনও কখনও কোনও শিশুর জন্ম একটি দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৯৮৬ সালের ৬ আগস্ট মুম্বইয়ের KEM Hospital-এ জন্ম নেওয়া হর্ষা চাওদার জন্ম এমনই একটি ঘটনা।

এই ঘটনাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ ড. ইন্দিরা হিন্দুজা। ভারতে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা IVF প্রযুক্তির বিকাশে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর নেতৃত্ব ও চিকিৎসা-গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পের ফলেই ভারতে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্ম হয়। ভারতের Press Information Bureau-র ‘First Ladies’ সংকলনেও তাঁকে এই ঐতিহাসিক চিকিৎসা-অর্জনের সঙ্গে যুক্ত প্রথম ভারতীয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে “ভারতের প্রথম টেস্ট-টিউব বেবি” প্রসঙ্গে ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতাও রয়েছে। কলকাতার চিকিৎসক ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ১৯৭৮ সালের IVF-সংক্রান্ত কাজ এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গা’-কে ঘিরে পরবর্তী সময়ে গবেষণাভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে। তাই ইন্দিরা হিন্দুজার ক্ষেত্রে “ভারতের প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্মের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক”—এই বর্ণনাটি বেশি নির্ভুল।

ছোটবেলার স্বপ্ন থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে

ইন্দিরা হিন্দুজার চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। একটি দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসকদের কাজ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল বলে তাঁর জীবনীভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

সেখান থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার পাশাপাশি বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা ও প্রজননবিজ্ঞানের দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন।

তখন ভারতে infertility বা বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা আজকের মতো উন্নত ছিল না। IVF প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ের। ফলে এই ক্ষেত্রে কাজ করার অর্থ ছিল একই সঙ্গে চিকিৎসা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার নানা সমস্যার মোকাবিলা করা।

IVF নিয়ে গবেষণার সময়

ইন্দিরা হিন্দুজা যখন IVF নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন মানুষের ডিম্বাণু, শুক্রাণু, ভ্রূণ এবং জরায়ুর মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে গর্ভধারণ করানো ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া।

এই গবেষণায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রজননবিজ্ঞানের গবেষক ও চিকিৎসকদের একটি দল। KEM Hospital এবং Institute for Research in Reproduction-এর সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এনে দেয়। গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসে এই শিশুর জন্মকে ভারতের প্রথম “scientifically documented” IVF birth হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৮৬ সালের ৬ আগস্ট মুম্বইয়ের KEM Hospital-এ হর্ষা চাওদার জন্ম হয়।

সেই সময় এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি যে ভারতেও সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব—এই সাফল্য তার বাস্তব প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

হর্ষার জন্মের পেছনের সংগ্রাম

হর্ষার জন্মের আগে একাধিক দম্পতির ক্ষেত্রে IVF-এর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

ভারতের প্রথম নথিবদ্ধ IVF শিশুর জন্মের ঘটনাটি তাই হঠাৎ পাওয়া কোনও সাফল্য ছিল না। এর পেছনে ছিল বহু বছরের গবেষণা, ব্যর্থতা, পরীক্ষা এবং চিকিৎসকদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

India Today-এর একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, হর্ষার আগে বহু দম্পতির ক্ষেত্রে IVF-এর চেষ্টা করা হয়েছিল। অবশেষে মণি ও শ্যাম চাওদার পরিবারে সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে।

একটি চিকিৎসা-প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ যে কতগুলি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর সম্ভব হতে পারে, এই ঘটনাটি তারও একটি উদাহরণ।

‘টেস্ট-টিউব বেবি’ শব্দটির আড়ালে আসল বিজ্ঞান

“টেস্ট-টিউব বেবি” কথাটি জনপ্রিয় হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় IVF বা in vitro fertilization অনেক বেশি নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া।

সাধারণ গর্ভধারণে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন নারীর শরীরের ভেতরে ঘটে। IVF-এ ডিম্বাণু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর সঙ্গে নিষেক ঘটানো হয়। এরপর তৈরি হওয়া ভ্রূণকে জরায়ুতে স্থানান্তর করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম চিকিৎসা-দক্ষতা প্রয়োজন।

১৯৮০-এর দশকে ভারতে এই প্রযুক্তি আরও কঠিন ছিল। আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা, উন্নত embryo culture system এবং বর্তমানের মতো sophisticated reproductive technology তখন সহজলভ্য ছিল না।

এই পরিস্থিতিতে IVF-এর সফল প্রয়োগ ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল।

একটি ঐতিহাসিক বিতর্ক

ইন্দিরা হিন্দুজার কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভারতের IVF-এর ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সামনে আসে—ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

১৯৭৮ সালে কলকাতায় ড. মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি শিশুর জন্ম হয়, যাকে পরবর্তীকালে ‘দুর্গা’ নামে পরিচিত করা হয়। বহু বছর পর তাঁর গবেষণার নথি ও কাজ নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়। গবেষক টি. সি. আনন্দ কুমারও পরবর্তী সময়ে মুখোপাধ্যায়ের কাজ পর্যালোচনা করেছিলেন।

অন্যদিকে, ১৯৮৬ সালের হর্ষা চাওদার জন্মটি KEM Hospital ও Institute for Research in Reproduction-এর যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে হয় এবং সেটিই ভারতের প্রথম scientifically documented IVF birth হিসেবে সরকারি ও চিকিৎসা-ইতিহাসের বহু নথিতে স্থান পেয়েছে।

অতএব ইতিহাসটিকে এক লাইনের “প্রথম” দিয়ে ব্যাখ্যা না করে বলা যায়—ভারতে IVF-এর ইতিহাস একাধিক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফল, আর ইন্দিরা হিন্দুজা সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

IVF-এর বাইরেও তাঁর গবেষণা

ইন্দিরা হিন্দুজার কাজ শুধু IVF-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি infertility treatment-এর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। বিশেষ করে Gamete Intrafallopian Transfer বা GIFT প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রয়োগেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮৮ সালের ৪ জানুয়ারি ভারতে GIFT পদ্ধতির মাধ্যমে প্রথম শিশুর জন্মের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। এই প্রযুক্তি IVF-এর থেকে আলাদা হলেও সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি ছিল।

পরবর্তী সময়ে তিনি menopause বা premature ovarian failure-এর মতো সমস্যায় oocyte donation নিয়ে কাজ করেন। ১৯৯১ সালে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতে একটি শিশুর জন্মের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিকে সফল করা নয়; বরং বিভিন্ন ধরনের বন্ধ্যত্ব সমস্যার চিকিৎসার পথ তৈরি করা।

চিকিৎসা থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে

একজন চিকিৎসকের সাফল্য শুধু নিজের চিকিৎসা-প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রভাব একটি নির্দিষ্ট সময় ও রোগীর মধ্যে আটকে থাকে। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞান যখন পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তার প্রভাব অনেক বিস্তৃত হয়।

ইন্দিরা হিন্দুজা দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। KEM Hospital এবং Seth G.S. Medical College-এ তাঁর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল। বিভিন্ন প্রজন্মের চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রী তাঁর কাছ থেকে reproductive medicine ও infertility treatment সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন।

স্বীকৃতি ও পদ্মশ্রী

ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে।

তিনি Dhanvantari Award-সহ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছেন। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। সরকারি নথিতেও তাঁর IVF ও assisted reproduction ক্ষেত্রে অবদানের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এই সম্মান তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি reproductive medicine-কে ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ইতিহাসেরও অংশ।

একটি শিশুর জন্ম থেকে একটি নতুন চিকিৎসা-যুগ

১৯৮৬ সালের সেই শিশুর জন্মের সময় হয়তো কেউই জানতেন না যে ঘটনাটি ভবিষ্যতের ভারতীয় fertility treatment-কে কতটা বদলে দেবে।

আজ IVF, ICSI, embryo freezing, donor programmes এবং নানা ধরনের assisted reproductive technology নিয়ে মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও চিকিৎসা-পরিকাঠামো তৈরি হতে বহু বছর লেগেছে।

সেই দীর্ঘ পথের প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির একটি ছিল ১৯৮৬ সালের সফল IVF জন্ম।

ড. ইন্দিরা হিন্দুজার কাজ সেই পরিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

ইন্দিরা হিন্দুজার জীবনের তাৎপর্য

ইন্দিরা হিন্দুজার জীবনের গল্প কোনও একক সাফল্যের গল্প নয়। এটি গবেষণার ধৈর্য, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষানিরীক্ষা এবং ব্যর্থতার পরেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার গল্প।

একদিকে ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ছিল অত্যন্ত জটিল একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকদের কাজ ছিল বিজ্ঞানকে বাস্তব চিকিৎসায় রূপ দেওয়া।

হর্ষা চাওদার জন্ম সেই প্রচেষ্টার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

আর ইন্দিরা হিন্দুজার উত্তরাধিকার কেবল সেই একটি শিশুর জন্মে শেষ হয়ে যায়নি। IVF ও assisted reproduction-এর ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা, চিকিৎসা এবং শিক্ষাদানের কাজ পরবর্তী প্রজন্মের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথকে আরও প্রশস্ত করেছে।

ভারতের চিকিৎসা-ইতিহাসে তাই তাঁর নাম উচ্চারিত হয় এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে, যখন আধুনিক reproductive medicine এখনও শৈশব অবস্থায় ছিল। সেই সময়ে গবেষণাগারের একটি সম্ভাবনাকে বাস্তব চিকিৎসায় পরিণত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

একটি শিশুর জন্ম যেমন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, তেমনই কোনও বৈজ্ঞানিক সাফল্য কখনও কখনও একটি গোটা দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। ড. ইন্দিরা হিন্দুজার কর্মজীবন সেই দ্বিতীয় ধরনের পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ভায়োলেট আলভা: আইন, সাংবাদিকতা ও সংসদীয় নেতৃত্বে পথ দেখানো এক অগ্রদূত।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক নেতা, বিপ্লবী বা আন্দোলনকারীদের ইতিহাস নয়। সেই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করেছিলেন এমন বহু নারী, যাঁরা একইসঙ্গে শিক্ষা, আইন, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা এবং জনজীবনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভায়োলেট আলভা ছিলেন এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব।

আইনজীবী হিসেবে আদালতে নিজের পরিচয় তৈরি করা, স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া, সাংবাদিকতা করা, সমাজসেবায় যুক্ত থাকা এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে পৌঁছনো—ভায়োলেট আলভার জীবন ছিল বহুস্তরীয়। তিনি শুধু নিজের সময়ের একজন সফল নারী ছিলেন না; তিনি এমন এক সময়ে জনজীবনে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, যখন আইন ও রাজনীতির মতো ক্ষেত্রগুলিতে নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

ভায়োলেট আলভার জন্ম ২৪ এপ্রিল ১৯০৮ সালে আহমেদাবাদে। তিনি একটি বড় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারানোর পর তাঁর ভাই-বোনেরা তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব নেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি বোম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন এবং উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর Government Law College থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকে নিজের মতো করে কাজও করতে হয়েছিল। তিনি পড়াতেন এবং সেই উপার্জনের সাহায্যে নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়ে যান।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে। উচ্চশিক্ষা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় ছিল না; নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শিক্ষাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন।

শিক্ষকতা থেকে আইন পেশায়

শিক্ষাজীবন শেষ করার পর ভায়োলেট আলভা কিছু সময় শিক্ষকতা করেন। তিনি Indian Women’s University-তে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। একই সময়ে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতিও নেন।

আইনজীবী হিসেবে তাঁর সামনে তখন একাধিক বাধা ছিল। আদালত ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি।

১৯৪৪ সালে তাঁর কর্মজীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। তিনি Bombay High Court-এর একটি Full Bench-এর সামনে মামলা পরিচালনা করেন এবং সফলভাবে সওয়াল করেন। রাজ্যসভার সরকারি নথিতে তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যিনি কোনও High Court-এর Full Bench-এর সামনে সফলভাবে মামলা যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন।

এই ঘটনাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না। এটি ভারতীয় নারীদের আইন পেশায় এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া

আইন পেশার পাশাপাশি ভায়োলেট আলভা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত হন।

১৯৪৩ সালে Quit India Movement-এর সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তাঁর সন্তান খুব ছোট ছিল। সরকারি ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি পাঁচ মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়েই কারাবরণ করেছিলেন।

একজন মা হিসেবে তাঁর কাছে পরিস্থিতিটি নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল। কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি নিজের ব্যক্তিগত অসুবিধাকে আন্দোলনের অংশগ্রহণ থেকে আলাদা করে দেখেননি।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার পরিসরও ক্রমশ বিস্তৃত হয়।

সাংবাদিকতায় নতুন পরিচয়

ভায়োলেট আলভার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকতা।

১৯৪৩ সালের ৯ আগস্ট, তাঁর স্বামী জোয়াকিম আলভার সঙ্গে তিনি FORUM নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। এই পত্রিকা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে বলে সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভায়োলেট আলভা নিজে নারীদের জন্য Begum নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে Indian Woman নামে পরিচিত হয়।

এই কাজটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নারীশিক্ষা ও নারীদের সামাজিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করার জন্য তখন নারীকেন্দ্রিক প্রকাশনার সংখ্যা ছিল খুবই কম।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি শুধু খবর প্রকাশ করেননি; নারীদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, অধিকার ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার একটি পরিসর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা

ভায়োলেট আলভার কর্মজীবন কখনও কেবল আইন বা রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। Bombay-এর Agripada Rehawasi Seva Mandal-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। International Federation of Women Lawyers-এর সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির আন্তর্জাতিক নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন।

নারী আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁকে ভারতের বাইরের নারী অধিকার ও আইন-সংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করেছিল।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রতিনিধিদলে অংশ নেন এবং মানবাধিকার ও আইন নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।

সংসদীয় জীবনের সূচনা

স্বাধীনতার পরে ভারতের নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠছিল। এই সময় ভায়োলেট আলভাও সক্রিয়ভাবে জনজীবনে প্রবেশ করেন।

১৯৪৭ সালে তিনি Bombay Legislative Council-এর সদস্য হন। ১৯৫২ সালে তিনি Rajya Sabha-তে নির্বাচিত হন এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলিতেও সদস্য হিসেবে ফিরে আসেন।

তাঁর স্বামী জোয়াকিম আলভাও সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সরকারি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তাঁরা ভারতীয় সংসদে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রথম দম্পতি হিসেবে পরিচিত হন।

ভায়োলেট আলভার সংসদীয় জীবন কেবল উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংসদীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দল এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব

১৯৫৭ সালে ভায়োলেট আলভা কেন্দ্রীয় সরকারের Deputy Minister of Home Affairs পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়ে দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছিল।

তাঁর আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং সংসদীয় কাজের অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মানবাধিকার, আইন, প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বৈঠক ও প্রতিনিধিদলে তিনি অংশ নেন। সরকারি নথিতে দেখা যায়, তিনি United Nations-এর মানবাধিকার-সংক্রান্ত সেমিনারেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান

ভায়োলেট আলভার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলির একটি শুরু হয় ১৯৬২ সালে।

১৯ এপ্রিল ১৯৬২ সালে তিনি Rajya Sabha-এর Deputy Chairman নির্বাচিত হন। রাজ্যসভার সরকারি ইতিহাসে তাঁকে এই পদে নির্বাচিত প্রথম নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে তিনি আবারও এই পদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

রাজ্যসভার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কক্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে Deputy Chairman-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদে বসে তাঁকে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছিল, বিভিন্ন সদস্যের বক্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়েছিল এবং সংসদীয় নিয়মকানুন মেনে অধিবেশন পরিচালনা করতে হয়েছিল।

সেই সময়ে একজন নারী এই পর্যায়ের সাংবিধানিক দায়িত্বে পৌঁছনো ভারতীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল।

বহুমুখী আন্তর্জাতিক ভূমিকা

ভায়োলেট আলভা ভারতের সংসদীয় প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নেন।

তিনি Commonwealth Parliamentary Conference-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণ করেন। International Federation of Women Lawyers-এর সঙ্গেও তাঁর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল।

তাঁর কর্মজীবনে আইন, সংসদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এই তিনটি ক্ষেত্র একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

শেষ অধ্যায়

১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসে ভায়োলেট আলভার জীবনাবসান ঘটে। রাজ্যসভার সরকারি নথিতে তাঁর মৃত্যুর তারিখ ২০ নভেম্বর ১৯৬৯ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর জীবনকাল দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু কর্মজীবনের পরিধি ছিল বিস্তৃত।

শিক্ষিকা, আইনজীবী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী—একজন মানুষের জীবনে এতগুলি ভূমিকা একত্রে দেখা বিরল।

ভায়োলেট আলভার উত্তরাধিকার

ভায়োলেট আলভার জীবনকে শুধু ‘প্রথম নারী’ হওয়ার তালিকা দিয়ে বিচার করলে তাঁর কাজের পূর্ণতা বোঝা যায় না।

তিনি এমন সময়ে আইন পেশায় এগিয়েছিলেন, যখন আদালতের পরিসর নারীদের জন্য সহজ ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এমন সময়ে, যখন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঝুঁকি জড়িয়ে ছিল। সাংবাদিকতা করেছিলেন এমন একটি সময়ে, যখন নারীদের কণ্ঠকে প্রকাশ্যে আনার সুযোগ সীমিত ছিল।

তারপর স্বাধীন ভারতের সংসদীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সময় তিনি সেই প্রতিষ্ঠানেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

তাঁর জীবন তাই একাধিক দরজা খোলার ইতিহাস। একটি দরজা আইন পেশার দিকে, একটি সাংবাদিকতার দিকে, একটি জনসেবার দিকে এবং আরেকটি ভারতের সংসদীয় নেতৃত্বের দিকে।

ভায়োলেট আলভার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এটাই—তিনি কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। সময়ের সঙ্গে নিজের ভূমিকা বদলেছেন, নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

ভারতের নারী ইতিহাসের আলোচনায় তাই ভায়োলেট আলভার নাম শুধু একটি ঐতিহাসিক তথ্য নয়; এটি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা স্বাধীনতার আগে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছিলেন এবং স্বাধীনতার পরে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে গড়ে তোলার কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

ছবি: প্রতীকী

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. রাজনী এ. ভিসে: তামাক ও ক্যানসারের অদৃশ্য সম্পর্ক খুঁজে বের করা এক ভারতীয় বিজ্ঞানী।

ক্যানসার নিয়ে মানুষের ভয় বহু পুরনো। কিন্তু ক্যানসারের কারণ কী, পরিবেশের কোন উপাদান শরীরের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘদিনের কোনো অভ্যাস কীভাবে শরীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের বহু দশক ধরে গবেষণা করতে হয়েছে।

ভারতের সেই গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ড. রাজনী এ. ভিসে।

তিনি ছিলেন একজন জীবরসায়নবিদ ও ক্যানসার গবেষক। তাঁর বিশেষ গবেষণার ক্ষেত্র ছিল environmental carcinogenesis, molecular epidemiology এবং বিভিন্ন পরিবেশগত ও পেশাগত ঝুঁকির সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক। Indian Medical Association-এর একটি প্রকাশনাতেও তাঁকে পরিবেশগত carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র গবেষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে তাঁর কাজ কেবল গবেষণাগারের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তামাক, পানমশলা এবং অন্যান্য চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের সম্ভাব্য ক্যানসার-ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এবং সেই ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিও তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

বিজ্ঞানের পথে যাত্রা

রাজনী এ. ভিসের জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯৪১ সালে বোম্বাইয়ে, যা বর্তমানে মুম্বই নামে পরিচিত। তিনি University of Bombay থেকে স্নাতক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে Indian Cancer Research Centre-এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

National Book Trust-এর “Women Scientists in India” গ্রন্থে তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি University of Bombay থেকে B.Sc. করার পর Indian Cancer Research Centre-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে সেখান থেকেই উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি Ph.D. লাভ করেন।

এই সময়ে ক্যানসার গবেষণা দ্রুত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছিল। শুধু কোনো অঙ্গের রোগ হিসেবে ক্যানসারকে দেখার পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা কোষ, জিন, পরিবেশ এবং রাসায়নিক পদার্থের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করছিলেন।

রাজনী ভিসের গবেষণার ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে সেই দিকেই বিস্তৃত হয়।

গবেষণাগার থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

উচ্চতর গবেষণার সময় রাজনী ভিসে বিদেশেও কাজের সুযোগ পান।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Philadelphia-র Institute for Cancer Research-এ ড. Jerome J. Freed-এর গবেষণাগারে Research Assistant হিসেবে কাজ করেন। National Book Trust-এর জীবনীতে বলা হয়েছে, সেখানে তিনি আধুনিক গবেষণাগার-পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।

বিদেশের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

কিন্তু তিনি নিজের গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন ভারতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যাকে সামনে রেখে।

ভারতে তামাক ব্যবহার, বিড়ি তৈরি, পানমশালা এবং বিভিন্ন ধরনের চিবোনো তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। ফলে এই অভ্যাসগুলোর সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক বোঝা শুধু বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল না—এটি জনস্বাস্থ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ক্যানসার গবেষণার নেতৃত্বে

বিদেশ থেকে ফিরে রাজনী ভিসে Cancer Research Institute, Mumbai-তে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

National Book Trust-এর জীবনী অনুযায়ী, তিনি সেখানে Carcinogenesis Division-এর প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং গবেষণাগারটির উন্নয়ন ও গবেষণার পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পরে তাঁর নিজের জীবনীতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৬–১৯৯০ সময়কালে Genetic Toxicity Unit-এর দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৯০–২০০১ সাল পর্যন্ত Carcinogenesis Division-এর Head হিসেবে কাজ করেন।

একজন গবেষণা-প্রধানের কাজ শুধু নিজে পরীক্ষা করা নয়। তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, গবেষণার বিষয় নির্বাচন, পরীক্ষার পদ্ধতি তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবেশ তৈরি করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

রাজনী ভিসে এই সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিলেন।

তামাকের ক্ষতি নিয়ে অনুসন্ধান

তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তামাক এবং ক্যানসারের সম্পর্ক।

বিশেষ করে পানমশালা, বিড়ি এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের রাসায়নিক প্রভাব নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।

তাঁর নিজের সংক্ষিপ্ত গবেষণা-জীবনীতে বলা হয়েছে, তিনি তামাক ও পানমশালার cancer-causing effect বোঝার জন্য animal models, tissue culture, mutagenicity এবং biochemical assays ব্যবহার করেছিলেন। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের সঙ্গে জিনগত ক্ষতির সম্পর্কও অনুসন্ধান করেন।

এখানে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কেবল একটি রাসায়নিক পদার্থের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেননি। বরং মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা, পেশা, পরিবেশ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেই ঝুঁকিকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন।

বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা

ভারতে বিড়ি শিল্পের সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত। কিন্তু বিড়ি তৈরির সময় দীর্ঘ সময় তামাকের ধুলো এবং অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজনী ভিসের গবেষণায় এই পেশাগত ঝুঁকিও গুরুত্ব পায়।

Indian Medical Association-এর প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত Genetic Toxicology Laboratory-তে বিড়ি শ্রমিক এবং তামাক প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে পরিবেশগত তামাক-সংস্পর্শের ফলে জিনগত ক্ষতির সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।

এই গবেষণার গুরুত্ব ছিল দ্বিমুখী।

একদিকে এটি তামাকের রাসায়নিক ঝুঁকি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য দিচ্ছিল। অন্যদিকে, কাজের পরিবেশের সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও সামনে আনছিল।

‘জিন’ এবং পরিবেশের সম্পর্ক

ক্যানসারের ক্ষেত্রে সব মানুষ একই ঝুঁকিতে থাকেন না। একই ধরনের পরিবেশগত সংস্পর্শেও ব্যক্তিভেদে ঝুঁকির পার্থক্য থাকতে পারে।

এই প্রশ্নটি বোঝার জন্য molecular epidemiology অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনী ভিসে এই ক্ষেত্রেও গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে gene-environment interaction বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন জিনগত বৈশিষ্ট্য কীভাবে তামাকের মতো পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাবকে পরিবর্তিত করতে পারে—তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।

২০০৭ সালের একটি গবেষণাপত্রে Rajani A. Bhisey-সহ গবেষকরা ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে oral cancer এবং কিছু নির্দিষ্ট genetic polymorphism-এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তামাকের সংস্পর্শকে একটি গুরুত্বপূর্ণ environmental exposure হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

এ ধরনের গবেষণা ক্যানসারকে শুধুমাত্র একটি রোগ হিসেবে না দেখে জিন + পরিবেশ + জীবনযাপন—এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বোঝার পথকে শক্তিশালী করে।

গবেষণাগারে তৈরি হয়েছিল নতুন মডেল

রাজনী ভিসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক কাজ ছিল পরিবেশগত carcinogens-এর প্রভাব বোঝার জন্য পরীক্ষামূলক animal model তৈরি করা।

তাঁর নিজের গবেষণা-জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি environmental agents-এর মাধ্যমে tumor initiation এবং promotion বোঝার জন্য বিশেষ animal models তৈরি ও ব্যবহার করেছিলেন।

এই ধরনের মডেল বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়।

কোনো ক্ষতিকর উপাদান শরীরের কোষে কী পরিবর্তন ঘটায়, সেই পরিবর্তন কীভাবে ধীরে ধীরে tumor formation-এর দিকে যেতে পারে—এসব বিষয় সরাসরি মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক মডেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনী ভিসে সেই গবেষণার ক্ষেত্রকে ভারতের ক্যানসার গবেষণায় আরও শক্তিশালী করতে কাজ করেন।

শুধু গবেষক নন, শিক্ষকও

রাজনী ভিসে গবেষণার পাশাপাশি বহু তরুণ বিজ্ঞানীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

তাঁর নিজের তথ্য অনুযায়ী, তিনি University of Bombay-তে Ph.D. ও M.Sc. গবেষণার guide হিসেবে কাজ করেছেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে ১০ জন Ph.D. ও একজন M.Sc. গবেষক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

এটি তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

একজন বিজ্ঞানীর প্রকাশিত গবেষণাপত্র তাঁর জ্ঞানকে ধরে রাখে। কিন্তু তাঁর ছাত্রছাত্রীরা সেই জ্ঞানকে আরও বহু বছর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

তাই গবেষণাগারের পাশাপাশি একজন ভালো mentor হিসেবেও রাজনী ভিসের অবদান উল্লেখযোগ্য।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় অংশগ্রহণ

তাঁর গবেষণার পরিসর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি International Agency for Research on Cancer-এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। IARC-এর প্রকাশিত নথিতে Rajani A. Bhisey-কে smokeless tobacco এবং tobacco-specific carcinogens নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক Working Group-এর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

NCBI Bookshelf-এ প্রকাশিত IARC-এর আরেকটি নথিতেও তাঁকে একই ধরনের আন্তর্জাতিক গবেষণা আলোচনার সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে ভারতীয় তামাক-সম্পর্কিত গবেষণার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

অবসর মানেই গবেষণার শেষ নয়

প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়নি।

তিনি University of Pune-এর সঙ্গে Adjunct Professor হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা-জীবনীতে ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বের উল্লেখ রয়েছে। পরে Mumbai-র Center for Excellence in Basic Sciences-এর সঙ্গেও তিনি Faculty Member হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

অর্থাৎ তাঁর কাছে গবেষণা ছিল চাকরির নির্দিষ্ট সময়সীমায় আবদ্ধ কোনো কাজ নয়।

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গবেষণা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।

বিজ্ঞান থেকে সমাজের দিকে

রাজনী ভিসের জীবনের বিশেষত্ব এখানেই যে, তাঁর গবেষণার বিষয়টি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ছিল—তামাক ও অন্যান্য চিবোনো পণ্যের সংস্পর্শ কীভাবে শরীরে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত হতে পারত।

তাই তিনি তামাক ও পানমশালার ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজেও গুরুত্ব দিয়েছেন। National Book Trust-এর জীবনীতে তাঁকে oral cancer প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরির সঙ্গে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এখানে বিজ্ঞানীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়।

গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা—এটিও জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পুরস্কারের চেয়েও বড় উত্তরাধিকার

রাজনী ভিসে Indian National Science Academy-র Fellow ছিলেন; একটি সংকলনে তাঁকে environmental carcinogenesis এবং molecular epidemiology-র বিশেষজ্ঞ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, গবেষণা-অধ্যায় এবং পর্যালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নিজের দেওয়া সংক্ষিপ্ত CV-তে ৭৫টি full-length paper, chapter ও review-এর উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু তাঁর কাজের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু প্রকাশনার সংখ্যায় মাপা যায় না।

তিনি এমন একটি সময়ে ভারতে ক্যানসার গবেষণা করেছেন, যখন molecular epidemiology এবং genetic toxicology এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত শব্দ।

তিনি গবেষণার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন—ক্যানসার শুধু ভাগ্যের বিষয় নয়; পরিবেশ, পেশা, জীবনযাপন এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের পারস্পরিক সম্পর্কও রোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এক বিজ্ঞানীর দীর্ঘ পথ

রাজনী এ. ভিসের জীবন একদিকে গবেষণাগারের কঠিন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের গল্প, অন্যদিকে সমাজের জন্য বিজ্ঞানের ব্যবহারিক মূল্য বোঝার গল্প।

বোম্বাইয়ের এক তরুণী ছাত্রী থেকে ক্যানসার গবেষক, বিদেশের গবেষণাগার থেকে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব, Genetic Toxicology Laboratory থেকে আন্তর্জাতিক IARC Working Group—তাঁর পথ ছিল বহুমাত্রিক।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন বিজ্ঞানীর কাজ কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়।

কখনও সেই কাজের অর্থ হলো একটি বিপজ্জনক অভ্যাসের বৈজ্ঞানিক ক্ষতি বোঝানো।

কখনও তার অর্থ শ্রমিকদের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করা।

কখনও আবার তরুণ গবেষকদের হাতে সেই জ্ঞান তুলে দেওয়া।

শেষ কথা

ড. রাজনী এ. ভিসের গবেষণার কেন্দ্রে ছিল এমন এক শত্রু, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না—কোষের ভিতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন।

তামাকের ধোঁয়া বা চিবোনো তামাকের রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর কীভাবে জিনগত ক্ষতি তৈরি করতে পারে, পরিবেশগত সংস্পর্শ কীভাবে carcinogenesis-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে তিনি কয়েক দশক গবেষণা করেছেন।

তাঁর জীবন তাই শুধু একজন ক্যানসার গবেষকের জীবনী নয়।

এটি এমন একজন বিজ্ঞানীর গল্প, যিনি গবেষণাগারের মাইক্রোস্কোপ থেকে সমাজের বাস্তব জীবন পর্যন্ত বিজ্ঞানের সেতু তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

বিজ্ঞান কখনও কখনও খুব নিঃশব্দে মানুষের জীবন বদলে দেয়। একটি গবেষণাগারের পরীক্ষা হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। কিন্তু সেই গবেষণা যদি কোনো রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেয়, ভবিষ্যৎ গবেষণাকে এগিয়ে দেয় কিংবা একটি বিপজ্জনক অভ্যাস সম্পর্কে সমাজকে সতর্ক করে—তাহলে তার প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।

ড. রাজনী এ. ভিসের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক জীবন সেই নীরব অথচ গভীর প্রভাবেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বিভা চৌধুরী: মহাজাগতিক রশ্মির রহস্য খুঁজতে আকাশের দিকে তাকানো এক ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী।

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন অনেক নাম রয়েছে, যাঁরা নিজেদের সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন। তাঁরা গবেষণা করেছেন, নতুন প্রশ্ন তুলেছেন, কঠিন বৈজ্ঞানিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন—কিন্তু জীবদ্দশায় তাঁদের অনেকের অবদান সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত হয়ে ওঠেনি।

ড. বিভা চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন বিজ্ঞানী।

পদার্থবিদ্যার এমন একটি শাখায় তিনি কাজ করেছিলেন, যার বিষয় ছিল পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে আসা অতি উচ্চশক্তির কণা—মহাজাগতিক রশ্মি বা Cosmic Rays। তাঁর গবেষণার সময় আধুনিক কণা-পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশবিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই এখনও বিকাশের পর্যায়ে। সেই সময় একজন ভারতীয় নারী হিসেবে পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করা ছিল নিজেই একটি বিরল ঘটনা।

আজ ভারতীয় বিজ্ঞান ইতিহাসে বিভা চৌধুরীর নাম নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। Tata Institute of Fundamental Research-এর Indian Physics Association-এর প্রকাশনায় তাঁকে TIFR-এর প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞানের পথে এক তরুণীর যাত্রা

বিভা চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯১৩ সালে। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন এমন এক সময়ে কেটেছে, যখন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগতে নারীর সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম।

তিনি পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে তিনি Physics-এ M.Sc. ডিগ্রি অর্জন করেন। TIFR-এর প্রকাশিত গবেষণামূলক জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৩৪–৩৬ সালের M.Sc. শ্রেণিতে ২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছাত্রী।

এই তথ্যটি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়।

এটি সেই সময়ের উচ্চশিক্ষায় নারীদের অবস্থানের একটি ছবি তুলে ধরে।

একটি পুরুষ-প্রধান শ্রেণিকক্ষে একমাত্র নারী শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা শেষ করে গবেষণার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে নিজের দক্ষতা দিয়ে জায়গা তৈরি করতে হয়েছিল।

গবেষণায় প্রবেশের সময় বাধা

M.Sc. শেষ করার পর বিভা চৌধুরী গবেষণা করতে চেয়েছিলেন। তিনি কলকাতার Bose Institute-এ অধ্যাপক ডি. এম. বসের গবেষণা দলে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কিন্তু শুরুতে তাঁকে গবেষণায় নেওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করা হয়েছিল। TIFR-এর গবেষণামূলক ইতিহাসে উল্লেখ আছে, ডি. এম. বসের প্রাথমিক আপত্তির কারণ ছিল সে সময় নারীদের জন্য উপযুক্ত গবেষণা প্রকল্প নেই—এমন ধারণা। শেষ পর্যন্ত বিভা চৌধুরী তাঁকে রাজি করাতে সক্ষম হন।

এই ঘটনা তাঁর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

তিনি সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকেননি।

তিনি নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রটি বেছে নিয়ে সেই ক্ষেত্রের দরজা খুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

মহাজাগতিক রশ্মির সন্ধানে

বিভা চৌধুরীর গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল Cosmic Rays।

মহাজাগতিক রশ্মি আসলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এসে পৌঁছনো উচ্চশক্তির কণা। এগুলোর মধ্যে এমন কণা থাকে, যেগুলোর শক্তি ও আচরণ বিশ্লেষণ করলে মহাবিশ্বের উচ্চশক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

আজ বিজ্ঞানীরা কসমিক রে নিয়ে গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক ডিটেক্টর, স্যাটেলাইট ও বিশাল পরীক্ষাগার ব্যবহার করেন। কিন্তু বিভা চৌধুরীর সময় প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না।

তখন বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের photographic plates এবং cloud chamber ব্যবহার করে উচ্চশক্তির কণার গতিপথ ও সংঘর্ষের চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করতেন।

এই কঠিন পরীক্ষামূলক গবেষণাতেই বিভা চৌধুরী নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

দার্জিলিং থেকে সান্দাকফু

তাঁর গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উচ্চ উচ্চতায় photographic plate ব্যবহার করে cosmic-ray shower পরীক্ষা করা।

TIFR-এর প্রকাশিত গবেষণামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, Bose Institute-এ বিভা চৌধুরী ও ডি. এম. বসের গবেষণায় দার্জিলিং, সান্দাকফু এবং তৎকালীন ফারিজং অঞ্চলের বিভিন্ন উচ্চতায় photographic plates ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মহাজাগতিক রশ্মি থেকে সৃষ্টি হওয়া কণার shower বা কণার ঝরনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

আজকের দিনে কোনো পরীক্ষার জন্য পাহাড়ি অঞ্চলে যন্ত্র বসানো আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে এমন গবেষণা পরিচালনা করা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য।

গবেষকদের শুধু তত্ত্ব জানা থাকলেই চলত না।

তাঁদের যেতে হতো দুর্গম স্থানে, পরীক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করতে হতো, দীর্ঘ সময় ধরে photographic plates সংগ্রহ করতে হতো এবং পরে সেই প্লেটে তৈরি কণার রেখা বিশ্লেষণ করতে হতো।

বিভা চৌধুরী সেই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

একটি কণার রহস্য

তাঁর গবেষণার সময় পদার্থবিদ্যার একটি বড় প্রশ্ন ছিল—মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে থাকা অজানা কণাগুলোর প্রকৃতি কী?

Photographic plate-এ কণার চলার পথের চিহ্ন দেখে বিজ্ঞানীরা তাদের ভর, শক্তি, momentum এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করতেন।

বিভা চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীরা এই ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিলেন।

TIFR-এর গবেষণামূলক নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে, তাঁদের পরীক্ষায় কণার track-এর দৈর্ঘ্য, scattering এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট কণার ভৌত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল।

এই গবেষণা ছিল সেই সময়ের কণা-পদার্থবিদ্যার একেবারে সামনের সারির কাজ।

TIFR-এ যোগদান

১৯৪৯ সালে বিভা চৌধুরী Tata Institute of Fundamental Research (TIFR)-এ যোগ দেন।

TIFR-এর Indian Physics Association-এর প্রকাশনায় তাঁকে TIFR-এর প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, তিনি cosmic-ray গবেষণায় TIFR-এর প্রাথমিক দলকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

তখন TIFR ছিল ভারতের আধুনিক মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

হোমি জে. ভাভার নেতৃত্বে সেখানে পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন নতুন ক্ষেত্র গড়ে উঠছিল।

এই পরিবেশে বিভা চৌধুরীর cosmic-ray গবেষণা ভারতীয় উচ্চশক্তির পদার্থবিদ্যার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বিদেশে গবেষণা

বিভা চৌধুরীর গবেষণাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বিদেশে কাজ ও প্রশিক্ষণ।

TIFR-এর প্রকাশিত স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি TIFR-এ কাজ করার পর ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে École Polytechnique, Paris এবং University of Michigan-এ সময় কাটান।

সেই সময় বিদেশের উন্নত গবেষণাগারে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

পরবর্তীকালে ভারতে ফিরে এসে তিনি গবেষণা চালিয়ে যান।

Physical Research Laboratory-তে নতুন অধ্যায়

১৯৫৮ সালে বিভা চৌধুরী Physical Research Laboratory (PRL), Ahmedabad-এ যোগ দেন।

সেখানে তিনি cosmic-ray গবেষণা চালিয়ে যান এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের প্রশিক্ষণ দেন।

PRL-এ তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল উচ্চশক্তির cosmic rays এবং কণার shower নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা।

তাঁর অধীনে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে পরবর্তীকালে বিশিষ্ট গবেষকরাও ছিলেন। TIFR-এর Physics News-এ প্রকাশিত স্মৃতিচারণে তাঁর একজন প্রাক্তন গবেষক তাঁকে একজন অসাধারণ mentor এবং শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেছেন।

শুধু বিজ্ঞানী নন, শিক্ষকও

বিভা চৌধুরীর বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর শিক্ষকসত্তাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

TIFR-এর স্মৃতিচারণমূলক লেখায় প্রাক্তন সহকর্মী ও ছাত্ররা তাঁর পড়ানোর পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। একজন প্রাক্তন TIFR ডিন তাঁকে এমন একজন শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করেছেন, যিনি খুব যত্ন নিয়ে lecture প্রস্তুত করতেন এবং ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিতেন।

এটি একজন গবেষকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

একজন বিজ্ঞানী একটি গবেষণাপত্র রেখে যেতে পারেন। কিন্তু একজন ভালো শিক্ষক নিজের জ্ঞানকে বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

বিভা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেই উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া নাম

বিভা চৌধুরীর জীবন নিয়ে TIFR-এর একটি বক্তৃতার শিরোনাম ছিল “Bibha Chowdhuri: A Scientist Incognito”—অর্থাৎ এমন একজন বিজ্ঞানী, যিনি দীর্ঘ সময় প্রায় অজ্ঞাতই থেকে গিয়েছিলেন। বক্তৃতার সারাংশে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর বহু বছর পর তাঁর কাজ নতুন করে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।

এটি বিজ্ঞান ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।

কতজন বিজ্ঞানীর কাজ তাঁদের জীবদ্দশায় যথেষ্ট পরিচিতি পায়?

আর কতজনের অবদান পরে নতুন প্রজন্মের গবেষকরা আবিষ্কার করেন?

বিভা চৌধুরীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঘটনাটিই অনেক বেশি স্পষ্ট।

নক্ষত্রের নামে স্মরণ

বহু বছর পর তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানকে নতুনভাবে স্মরণ করা হয়।

ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-সংক্রান্ত একটি প্রকাশনায় বিভা চৌধুরীকে ভারতের প্রথম দিকের নারী উচ্চশক্তির পদার্থবিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রকাশনায় বলা হয়েছে, International Astronomical Union তাঁর নামে একটি নক্ষত্রের নামকরণ করেছে।

একজন বিজ্ঞানীর নাম একটি নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রতীকী অর্থেও অসাধারণ।

যিনি জীবনের বড় অংশ মহাজাগতিক কণার রহস্য অনুসন্ধান করেছেন, তাঁর নাম শেষ পর্যন্ত মহাকাশের একটি নক্ষত্রের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেল।

নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসা

বিভা চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখতে TIFR ও Homi Bhabha Centre for Science Education-এর বিভিন্ন উদ্যোগও দেখা যায়।

২০২২ এবং ২০২৩ সালের Vigyan Vidushi কর্মসূচিতে Bibha Chowdhury Memorial Lecture অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল তরুণী পদার্থবিদদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের উন্নত পদার্থবিদ্যার গবেষণার সঙ্গে পরিচিত করা।

এ যেন তাঁর বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারের একটি নতুন অধ্যায়।

একসময় যে নারীকে গবেষণার সুযোগ পাওয়ার জন্য নিজেকেই দরজা খুলতে হয়েছিল, তাঁর নাম এখন তরুণী বিজ্ঞানীদের সামনে অনুপ্রেরণার অংশ হিসেবে ফিরে আসছে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

বিভা চৌধুরীর গল্পে কোনো একক মুহূর্তকে তাঁর সাফল্যের কারণ বলা যায় না।

ছিল কঠিন পড়াশোনা।

ছিল গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ।

ছিল সামাজিক বাধা।

ছিল গবেষণাগারে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম।

ছিল দেশের বাইরে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন।

ছিল দেশে ফিরে আবার গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করা।

আর ছিল দীর্ঘদিন পরিচিতির আড়ালে থেকে কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা।

তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের ইতিহাস শুধু সেইসব মানুষের ইতিহাস নয়, যাঁদের নাম পাঠ্যবইয়ের প্রথম পাতায় লেখা থাকে। অনেক সময় গবেষণার প্রকৃত অগ্রগতি তৈরি হয় এমন বিজ্ঞানীদের হাত ধরে, যাঁদের নাম পরে আবিষ্কার করতে হয়।

উত্তরাধিকার

আজ মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা মহাকাশবিজ্ঞান, কণা-পদার্থবিদ্যা এবং astroparticle physics-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতেও এই গবেষণার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের প্রাথমিক অধ্যায়ে বিভা চৌধুরীর কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

তিনি এমন এক সময়ে বিজ্ঞানকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যখন একজন ভারতীয় নারীর পক্ষে পদার্থবিদ্যার গবেষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু তিনি সেই কঠিন পথেই এগিয়েছিলেন।

দার্জিলিং ও সান্দাকফুর পাহাড়ে photographic plate নিয়ে cosmic ray-এর চিহ্ন খোঁজা থেকে শুরু করে TIFR ও PRL-এর গবেষণাগার—তাঁর পথ ছিল দীর্ঘ এবং বৈজ্ঞানিক কৌতূহলে ভরা।

আজ তাঁর নাম একটি নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত আলো সেই নক্ষত্রে নয়—তাঁর রেখে যাওয়া বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকারে।

ড. বিভা চৌধুরী প্রমাণ করে গেছেন, বিজ্ঞানের আকাশে আলো তৈরি করার জন্য সবসময় নিজের নাম পৃথিবীর মানুষকে জানাতে হয় না। কখনও কখনও একজন গবেষকের কাজই যথেষ্ট—সময়ের বহু পরে হলেও সেই আলো একদিন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

রোশিনি শর্মা: একা মোটরবাইকে কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর—সাহসের অন্য নাম।

ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য আজ আমাদের হাতে রয়েছে বিমান, ট্রেন, বাস কিংবা অসংখ্য আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা। কিন্তু কেউ যদি নিজের মোটরবাইকে একা দেশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই যাত্রা শুধুই ভ্রমণ থাকে না—তা হয়ে ওঠে নিজের সীমাবদ্ধতাকে পরীক্ষা করার এক কঠিন অভিযান।

আর সেই অভিযান যখন একজন তরুণী একাই করেন, তখন তার তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।

রোশিনি শর্মার নাম সেই কারণেই আলাদা করে মনে রাখার মতো। তিনি মোটরবাইকে একা কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত যাত্রা করে ভারতীয় নারী বাইকারদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নজির তৈরি করেন। India Today এবং Times of India—দুই সূত্রই তাঁকে এই যাত্রার প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে তাঁর গল্প কেবল একটি দীর্ঘ বাইকযাত্রার গল্প নয়। এর শুরু হয়েছিল অনেক ছোটবেলায়—একটি মোটরসাইকেলের প্রতি গভীর আকর্ষণ থেকে।

ছোটবেলাতেই মোটরসাইকেলের প্রতি টান

রোশিনি শর্মার শৈশব কেটেছে উত্তরপ্রদেশের নারোরা অঞ্চলে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই মোটরসাইকেল তাঁর কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় ছিল।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেন। তাঁর বাবা তাঁকে বাইক চালানো শেখানোর ক্ষেত্রে উৎসাহ দিয়েছিলেন। একটি সাক্ষাৎকারে রোশিনি জানিয়েছেন, পরিবারের সমর্থন তাঁর আত্মবিশ্বাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

সেই বয়সে অনেকের কাছে মোটরসাইকেল ছিল নিছক যাতায়াতের মাধ্যম। কিন্তু রোশিনির কাছে সেটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে স্বাধীনতার প্রতীক।

রাস্তার সঙ্গে পরিচয় যত বাড়তে থাকে, ততই তাঁর মনে জন্ম নেয় আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা।

প্রথম বাইক, প্রথম স্বাধীনতা

মোটরসাইকেল শেখার সময় প্রত্যেক নতুন চালকের মতো রোশিনিকেও গিয়ার, ক্লাচ, ব্যালান্স এবং বাঁক নেওয়ার মতো বিষয় আয়ত্ত করতে হয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছেন, শেখার একেবারে শুরুতেই একদিন বাবার অনুপস্থিতিতে নিজেই বাইক নিয়ে টিউশনে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখনও বাইক ঘোরানোর ব্যাপারে তাঁর যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি। কিন্তু সেই প্রথম স্বাধীন যাত্রাই তাঁর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

এরপর আর পিছনে তাকাননি তিনি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইকের প্রতি তাঁর আগ্রহও বাড়তে থাকে। ছোট শহরের সামাজিক পরিবেশে একজন মেয়ের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকলেও পরিবারের সমর্থন তাঁকে নিজের আগ্রহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা ও বেঙ্গালুরু

রোশিনি শর্মা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন এবং পরে বেঙ্গালুরুতে যান। তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে মোটরসাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়।

বেঙ্গালুরুর ব্যস্ত রাস্তায় বাইক চালানো প্রথমদিকে তাঁর কাছেও সহজ ছিল না। কিন্তু নতুন শহরের রাস্তা, ট্রাফিক এবং ব্যস্ততার সঙ্গে ধীরে ধীরে তিনি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।

একটি Women’s Day মোটরসাইকেল র‍্যালিতে অংশ নেওয়া তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। সেখানে অন্য নারী বাইকারদের দেখে তাঁর নিজের মধ্যেও আরও বড় যাত্রার ইচ্ছা তৈরি হয়। র‍্যালিতে তিনি একটি ৩৫০ সিসি মোটরসাইকেলও চালান, যা তাঁর আগের অভিজ্ঞতার তুলনায় বড় ছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

তারপর থেকেই বড় কোনো বাইক-অভিযানের চিন্তা তাঁর মনে জায়গা করে নিতে শুরু করে।

উত্তর থেকে দক্ষিণ—এক বন্ধুর গল্পে নতুন স্বপ্ন

রোশিনির জীবনে কন্যাকুমারী-কश्मीर যাত্রার ভাবনাটি হঠাৎ আসেনি।

এক বন্ধুর উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত মোটরসাইকেল ভ্রমণের কথা শুনে তাঁর নিজের মধ্যেও একই ধরনের একটি দীর্ঘ যাত্রার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু তিনি শুধু অন্যের পথ অনুসরণ করতে চাননি। বরং এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা নিজের কাছে নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং।

তখনই জন্ম নেয় Kanyakumari to Kashmir, অর্থাৎ দেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত মোটরবাইকে একা যাওয়ার পরিকল্পনা।

একজন নারীর পক্ষে এত দীর্ঘ পথ একা বাইকে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা সেই সময়ে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী ছিল।

চাকরি ছেড়ে অভিযানে

বড় স্বপ্নের সঙ্গে বড় সিদ্ধান্তও আসে।

রোশিনি একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যাত্রার জন্য তাঁকে চাকরি ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। কারণ এত দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় থাকার জন্য সাধারণ চাকরির ছুটি যথেষ্ট ছিল না।

চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত একটি যাত্রায় বেরিয়ে পড়া সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

একদিকে ছিল পেশাগত ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে ছিল নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

শেষ পর্যন্ত তিনি যাত্রার পথকেই বেছে নেন।

কন্যাকুমারী থেকে যাত্রা শুরু

ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারী থেকে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।

দক্ষিণ ভারতের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে ধীরে ধীরে মধ্য ভারত, উত্তর ভারত এবং শেষ পর্যন্ত হিমালয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের মুখোমুখি হওয়া।

একই যাত্রায় বদলে যায়—

  • আবহাওয়া,
  • রাস্তার ধরন,
  • ভূপ্রকৃতি,
  • খাবার,
  • ভাষা,
  • মানুষের জীবনযাপন।

একজন একাকী বাইকারের জন্য প্রতিটি পরিবর্তনই নতুন অভিজ্ঞতা।

আর রোশিনিকে এগোতে হয়েছে নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের প্রস্তুতির ওপর ভরসা করে।

পথ সবসময় পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি

দীর্ঘ বাইকযাত্রার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—কাগজে যে পরিকল্পনা করা যায়, বাস্তব রাস্তা সবসময় সেই পরিকল্পনা মেনে চলে না।

রোশিনির নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রার সময় একাধিকবার তিনি দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিলেন। কখনও পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিও এসেছিল যখন তাঁকে রাত পর্যন্ত বাইক চালাতে হয়েছিল।

অর্থাৎ তাঁর যাত্রা কোনো সাজানো পর্যটনভ্রমণ ছিল না।

ছিল বাস্তব রাস্তা, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা।

এই কারণেই তাঁর যাত্রাকে শুধুমাত্র একটি ‘রেকর্ড’ হিসেবে দেখলে গল্পটির আসল দিকটি বাদ পড়ে যায়।

পাহাড়ের পথে নতুন পরীক্ষা

দেশের উত্তর দিকে যেতে যেতে রাস্তার চরিত্র বদলে যায়। সমতল থেকে পাহাড়ি পথে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল চালানোর কৌশলও বদলাতে হয়।

পাহাড়ি রাস্তায় বাঁক, ঢাল, আবহাওয়া এবং রাস্তার অবস্থার দিকে আরও বেশি নজর রাখতে হয়।

রোশিনির যাত্রার শেষ অংশ ছিল উত্তর ভারতের কঠিন ভূপ্রকৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর।

একটি মোটরসাইকেল নিয়ে একা এতটা পথ অতিক্রম করার মধ্যে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক স্থিরতাও প্রয়োজন।

সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন

রোশিনির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সামাজিক মানসিকতা।

তিনি যে পরিবেশ থেকে এসেছিলেন, সেখানে মেয়েদের মোটরসাইকেল চালানো নিয়ে প্রশ্ন উঠত। তাঁর নিজের বক্তব্যে উঠে এসেছে, পরিবারের বাইরের কিছু মানুষ মনে করতেন, মেয়েদের পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পরে বিয়ে করাই যেন স্বাভাবিক পথ।

রোশিনি সেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে না গিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন।

তিনি কাউকে বোঝানোর জন্য মোটরসাইকেলে ওঠেননি।

তিনি উঠেছিলেন কারণ বাইক চালানো তাঁর ভালো লাগত এবং দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নিজের একটি স্বপ্ন ছিল।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

একা পথ চলার মানে

একজন একাকী নারী বাইকার যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন, তখন তাঁকে একই সঙ্গে অনেক বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।

নিজের নিরাপত্তা, মোটরসাইকেলের অবস্থা, রাস্তার পরিস্থিতি, থাকার জায়গা, খাবার, আবহাওয়া—প্রতিটি বিষয়ের দায়িত্ব নিজের।

কেউ পাশে থাকলে সিদ্ধান্ত ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু একা যাত্রায় ভুলের সুযোগ অনেক কম।

রোশিনির কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান তাই তাঁর আত্মনির্ভরতারও একটি পরীক্ষা ছিল।

একটি যাত্রা, অনেক অনুপ্রেরণা

২০১৬ সালের India Today এবং ২০২১ সালের Times of India—উভয় প্রকাশনাই রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর মোটরবাইক যাত্রাকে নারী অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তাঁর গল্পের প্রভাব শুধু সেই সময়ের সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে বাইকিং নিয়ে সাক্ষাৎকার ও পডকাস্টও হয়েছে। ২০২২ সালে BIG FM-এর ‘Biker Divas’ সিরিজে তাঁর যাত্রা নিয়ে একটি পূর্ণ পর্ব প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি তাঁর শৈশব, বাবার কাছ থেকে বাইক শেখা, বেঙ্গালুরুতে বাইকিং শুরু করা এবং Kanyakumari-to-Kashmir যাত্রার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন।

অর্থাৎ তাঁর অভিযান পরবর্তী সময়েও নারী বাইকারদের গল্পের অংশ হয়ে থেকেছে।

রাস্তাকে ভয় না করে রাস্তা বোঝা

রোশিনি শর্মার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এই যে, তিনি বাইককে শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর যন্ত্র হিসেবে দেখেননি।

বাইক তাঁর কাছে ছিল নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম।

দীর্ঘ রাস্তা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। কোথাও রাস্তা মসৃণ, কোথাও ভাঙাচোরা। কোথাও দ্রুত এগোনো যায়, কোথাও ধীরে চলতে হয়। কখনও পরিকল্পনা বদলাতে হয়, কখনও থামতে হয়।

জীবনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।

সব রাস্তা আগে থেকে জানা থাকে না।

কিছু পথ চলতে চলতেই তৈরি হয়।

নারী বাইকারদের জন্য নতুন দিগন্ত

আজ ভারতের রাস্তায় নারী মোটরসাইকেল চালকদের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। দীর্ঘ দূরত্বের বাইকিং, মোটরসাইকেল ট্রাভেল এবং অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়েও বহু নারী অংশ নিচ্ছেন।

এই পরিবর্তনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। রোশিনি শর্মার কন্যাকুমারী-কश्मीर অভিযান সেই ধারার একটি স্মরণীয় উদাহরণ।

তাঁর যাত্রা দেখিয়েছিল—দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য একজন নারীকে অবশ্যই কারও সঙ্গী হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।

নিজের প্রস্তুতি, দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে একজন নারীও নিজের পথ নিজেই বেছে নিতে পারেন।

শেষ কথা

রোশিনি শর্মার গল্পে কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, কোনো বড় মঞ্চ নেই, নেই প্রচলিত অর্থে কোনো পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকাও।

আছে একটি মোটরসাইকেল।

আছে একটি দীর্ঘ রাস্তা।

আর আছে এক তরুণীর নিজের ওপর বিশ্বাস।

কন্যাকুমারীর সমুদ্রতট থেকে উত্তরের পাহাড়ি পথ পর্যন্ত তাঁর যাত্রা আসলে ভারতের ভূগোলের মধ্য দিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নের যাত্রা।

তিনি দেখিয়েছেন, সাহস মানে ভয় না থাকা নয়। বরং ভয়, অনিশ্চয়তা এবং বাধা থাকা সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াই সাহস।

একসময় যে প্রশ্ন উঠেছিল—“একজন মেয়ে একা বাইক নিয়ে এত দূর যাবে কীভাবে?”—তার উত্তর রোশিনি কথায় দেননি।

তিনি উত্তর দিয়েছিলেন রাস্তায়।

আর সেই রাস্তাই আজ তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর—হাজার হাজার কিলোমিটারের সেই যাত্রা তাই শুধু একটি মোটরবাইক অভিযান নয়; এটি নিজের স্বপ্নকে নিজের হাতে স্টার্ট দিয়ে অজানা পথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অসাধারণ কাহিনি।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. আবান মিস্ত্রী: তবলার তালে ইতিহাস গড়া ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল জগতে কিছু বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে এমন কিছু সামাজিক ধারণা জড়িয়ে ছিল, যা বহুদিন ধরে ভাঙা সহজ ছিল না। তবলা তার অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে তবলা বাদক হিসেবে পুরুষ শিল্পীদেরই বেশি দেখা যেত। সেই পরিবেশে একজন নারী যখন তবলাকে নিজের সাধনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিলেন, তখন সেটি নিছক সংগীতচর্চা ছিল না—ছিল এক ধরনের সামাজিক বাধা অতিক্রমের ঘটনাও।

সেই সাহসী শিল্পীর নাম ড. আবান এ. মিস্ত্রী। সরকারি ‘First Ladies’ সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘First Lady of India’ সম্মানেও ভূষিত করা হয়। তাঁর একক তবলা পরিবেশনা ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল।

তবে আবান মিস্ত্রীর পরিচয় শুধু ‘প্রথম মহিলা তবলা বাদক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন সংগীতশিল্পী, গবেষক, শিক্ষিকা, লেখক এবং সংগীতশাস্ত্রের একজন নিবেদিত সাধক।

সংগীতময় পরিবারে শৈশব

আবান মিস্ত্রীর জন্ম ৬ মে ১৯৪০ সালে মুম্বইয়ে। তাঁর পরিবারেও সংগীতের পরিবেশ ছিল। তাঁর বাবা এরচশাহ পি. মিস্ত্রী ছিলেন বেহালাবাদক এবং মা সরশেদ মিস্ত্রী দিলরুবা বাজাতেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীত তাঁর পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।

মাত্র চার বছর বয়সে তিনি সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রথমে তাঁর মাসি মেহরু ওয়ার্কিংবক্সওয়ালার কাছে তিনি হিন্দুস্তানি কণ্ঠসংগীত শেখেন। পরবর্তীকালে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছেও দীর্ঘদিন সংগীত শিক্ষা নেন।

শৈশব থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল নানা ধরনের শিল্পকলায়। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর শিল্পীসত্তার সামনে একটি বড় মোড় এসে দাঁড়ায়।

নৃত্য থেকে তবলার পথে

আবান মিস্ত্রীর সংগীতজীবনের শুরু তবলা দিয়ে হয়নি। তিনি নৃত্য শেখার প্রতিও আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর নৃত্যচর্চার স্বপ্নে বাধা আসে।

সেই সময় তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা। তিনি আবানকে তবলার দিকে এগিয়ে আসতে উৎসাহ দেন। ধীরে ধীরে তবলাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান সাধনার ক্ষেত্র।

এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে।

উস্তাদ আমির হুসেন খানের কাছে শিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর তবলা শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম উস্তাদ আমির হুসেন খান। তিনি পণ্ডিত কেকি এস. জিজিনা এবং উস্তাদ আমির হুসেন খানের মতো গুরুদের কাছ থেকে তালবাদ্যের গভীর শিক্ষা গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে পণ্ডিত লক্ষ্মণরাও বডাসের কাছ থেকেও সংগীতের শিক্ষা চালিয়ে যান।

তবলার মতো একটি কঠিন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য দীর্ঘ অনুশীলন, তাল-লয়ের গভীর জ্ঞান এবং অসাধারণ ধৈর্য দরকার। আবান মিস্ত্রী এই তিনটিকেই নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন।

তাঁর বাদনে বিভিন্ন ঘরানার প্রভাবও দেখা যায়। তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি দিল্লি, ফরুকাবাদ, আজরাড়া এবং বেনারসের তবলা-পরম্পরার নানা বৈশিষ্ট্য আত্মস্থ করেছিলেন। পখাওয়াজের শিক্ষাও তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

যে সময়ে নারী তবলা বাজানো ছিল ব্যতিক্রম

আজকের দিনে নারী তবলা শিল্পী দেখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আবান মিস্ত্রীর কর্মজীবনের শুরুর সময়টা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

তখন মঞ্চে একজন নারীকে তবলা বাজাতে দেখা অনেকের কাছেই নতুন বিষয় ছিল। এমনকি সংগীতজগতের কিছু মানুষও প্রথম দিকে নারী তবলা বাদককে সহজে গ্রহণ করতে পারেননি।

মারাঠি বিশ্বকোষে প্রকাশিত তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে, কর্মজীবনের শুরুর দিকে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল যখন মহিলা গায়িকারা তাঁকে সঙ্গতশিল্পী হিসেবে নিতে দ্বিধা করতেন। কিন্তু সেই বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি।

তিনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সংশয় দূর করেন।

এখানেই আবান মিস্ত্রীর বিশেষত্ব। তিনি শুধু অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেননি; বরং এমন একটি ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারীর উপস্থিতিই তখন ছিল ব্যতিক্রম।

মঞ্চ থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর

আবান মিস্ত্রী একক তবলা পরিবেশনায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, তাঁর একক পরিবেশনা ভারত এবং বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২০০২ সালে ‘Times of India’-র একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা তবলা বাদক হিসেবে উল্লেখ করে ধারওয়াড়ে তাঁর পরিবেশনার কথা লেখা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে তাঁকে উচ্চমানের তবলা শিল্পী, সংগীতশাস্ত্রবিদ এবং পণ্ডিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাঁর বাদনে শুধু দ্রুততা বা কারিগরি দক্ষতা ছিল না; তাল, লয় এবং সংগীতের কাঠামো সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়াও ছিল।

শিল্পীর পাশাপাশি গবেষক

আবান মিস্ত্রীর জীবনকে অন্য অনেক শিল্পীর জীবন থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো তাঁর গবেষণামূলক কাজ।

তিনি তবলা ও পখাওয়াজের ইতিহাস, ঘরানা এবং পরম্পরা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “Pakhawaj and Tabla: History, Schools and Traditions”। তাঁর এই কাজ তবলা-পখাওয়াজের ঐতিহ্য, ঘরানা এবং বিকাশকে নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

তিনি ‘Tabley ki Bandishein’ নামেও একটি কাজ করেছিলেন। সংগীতশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণামূলক অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সংগীতের পাঠ্যসূচিতেও তাঁর নাম ও কাজ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

অর্থাৎ তিনি শুধু মঞ্চে তবলা বাজিয়ে থেমে থাকেননি; তবলার জ্ঞানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করার কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

শিক্ষিকা আবান মিস্ত্রী

একজন শিল্পীর প্রকৃত উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের পরিবেশনার চেয়েও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আবান মিস্ত্রী এই দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, ভিজিটিং প্রফেসর, প্রশিক্ষক ও বিচারক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

মুম্বইয়ের ওয়াডিয়া মিউজিক ক্লাসে তিনি প্রায় ২৫ বছর শিক্ষাদান করেছিলেন বলে মারাঠি বিশ্বকোষে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সপল জিজিনা, আদিল মিস্ত্রী এবং সুরেশ শিংগাড়ের নাম পাওয়া যায়।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিনি কর্মশালাও পরিচালনা করতেন। ফলে তাঁর সংগীতচর্চা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যেও সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

একাধিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা

আবান মিস্ত্রীর শিক্ষাজীবনও ছিল বহুমাত্রিক।

তবলার পাশাপাশি তিনি কণ্ঠসংগীত, সেতার এবং সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। সরকারি জীবনীতে তাঁকে তবলায় ‘Sangeet Praveen’, কণ্ঠসংগীতে ‘Sangeet Alankar’, সেতারে ‘Sangeet Visharad’ এবং হিন্দি ও সংস্কৃতে ‘Sahitya Ratna’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ডক্টরেটও ছিল সংগীত ও পারকাশন নিয়ে।

এই শিক্ষার ব্যাপ্তি দেখায় যে তাঁর কাছে সংগীত কেবল মঞ্চে পরিবেশনের বিষয় ছিল না। সংগীতের ইতিহাস, তত্ত্ব, সাহিত্য এবং বাদ্যযন্ত্র—সবকিছুকে মিলিয়ে তিনি একটি বৃহত্তর জ্ঞানভুবন তৈরি করেছিলেন।

সংগীতের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ

আবান মিস্ত্রী সংগীতচর্চার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি Swar Sadhna Samiti-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বলে প্রকাশিত জীবনীমূলক তথ্য থেকে জানা যায়।

এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি শিল্পীদের পরিবেশনা, শিক্ষার সুযোগ এবং সংগীতচর্চার পরিসর তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

তাঁর কাছে সংগীত ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম নয়; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যাকে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়ও শিল্পীর রয়েছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

দীর্ঘ সংগীতজীবনে আবান মিস্ত্রী বিভিন্ন সম্মান অর্জন করেন। তাঁর পরিচিত সম্মানগুলোর মধ্যে ‘Taal Mani’, ‘Sangeet Setu’ এবং ‘Sangeet Kala Ratna’-র মতো উপাধির উল্লেখ পাওয়া যায়।

২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও সংগীতমহলে তাঁর অবদানের স্মরণ অব্যাহত থাকে। ২০১৮ সালে ভারত সরকারের ‘First Ladies’ উদ্যোগে তাঁকে মরণোত্তর সম্মান দেওয়া হয়।

আজ তাঁর নাম সংগীতশিক্ষার বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতেও পড়ানো হয়। অর্থাৎ তাঁর কাজ কেবল অতীতের একটি স্মৃতি হয়ে নেই; সংগীতের শিক্ষার্থীরা এখনও তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে পড়াশোনা করে।

তবলার প্রতিটি বোলের মধ্যে এক নতুন ইতিহাস

আবান মিস্ত্রীর গল্প আসলে একটি বাদ্যযন্ত্রের গল্পের থেকেও বড়।

তিনি এমন একটি সময়ে তবলা হাতে নিয়েছিলেন, যখন নারীকে এই ক্ষেত্রের কেন্দ্রে দেখা খুব স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে নিজের দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে তাল ও লয়ের কোনো লিঙ্গ নেই।

তাঁর হাতে তবলা হয়ে উঠেছিল আত্মপ্রকাশের ভাষা। কখনও একক পরিবেশনার মাধ্যমে, কখনও শিক্ষাদানের মাধ্যমে, কখনও গবেষণার পাতায়—তিনি একই সঙ্গে শিল্পী এবং জ্ঞানসাধকের ভূমিকা পালন করেছেন।

আর তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই—তিনি পরবর্তী প্রজন্মের নারী শিল্পীদের জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।

উত্তরাধিকার

আজ ভারতের বিভিন্ন মঞ্চে অসংখ্য নারী তবলা শিল্পীকে দেখা যায়। তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা। কিন্তু এই পথকে আরও প্রশস্ত করার জন্য যাঁরা অনেক আগে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ড. আবান মিস্ত্রীর নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।

একজন নারী শিল্পী যখন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর সাফল্য ব্যক্তিগত থাকে না। তা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠে।

আবান মিস্ত্রী সেই পরিবর্তনেরই এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

তাঁর হাতে তবলার বোল শুধু “ধা”, “তিন”, “না”, “ধিন” হয়ে থাকেনি—সেগুলো হয়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাসের ভাষা। তাঁর জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো শিল্পক্ষেত্রকে যদি সত্যিকারের ভালোবাসা যায়, তবে সেই শিল্পের দরজা একদিন না একদিন আরও অনেক মানুষের জন্য খুলে যায়।

ড. আবান মিস্ত্রী তাই শুধু ভারতের প্রথম মহিলা তবলা-মাস্টার নন; তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমন এক পথপ্রদর্শক, যাঁর সাধনা পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হয়ে রয়েছে।

Share This