Categories
উপন্যাস

নীল দরজার ওপারে (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — শেষ দরজা

লোকটি কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলেন।

তার মুখে সময়ের গভীর ছাপ।

চুলে পাক ধরেছে।

চোখের কোণে অসংখ্য রেখা।

কিন্তু চোখ দুটো—

অদ্রিজা সেই চোখ বহুবার দেখেছে।

পুরোনো ছবিতে।

মায়ের ডায়েরিতে।

নীলবাড়ির দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিতে।

অদ্রিজার ঠোঁট কাঁপল।

“আপনি…”

লোকটি ধীরে বললেন,

“আমি অমিতাভ।”

সায়ন কয়েক পা এগিয়ে গেল।

“আপনি সত্যিই অমিতাভ সেন?”

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হাসলেন।

“তুমি সায়ন?”

সায়নের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

“তোমাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর।”

সায়নের চোখে জল চলে এল।

“কিন্তু…”

“আমি তোমাকে কখনও ভুলিনি।”

অদ্রিজা এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

“আমাকে কেন ছেড়ে গিয়েছিলেন?”

অমিতাভের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তিনি ধীরে মাথা নিচু করলেন।

“কারণ তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”

“এটা সবাই বলছে।”

“আমি জানি।”

“কিন্তু কেউ সত্যিটা বলছে না।”

অমিতাভ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তাহলে আজ সব বলব।”

তিনজন স্টেশনের পুরোনো প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।

আকাশে মেঘ।

দূরে বৃষ্টির রেখা।

অমিতাভ বলতে শুরু করলেন।

“১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই তোমার জন্মের রাতে আমি বুঝেছিলাম, নীলাদ্রি তোমাকে খুঁজছে।”

অদ্রিজা বলল,

“কেন?”

“কারণ তোমার জন্মের আগে আমি এমন কিছু নথি সংগ্রহ করেছিলাম, যা তার পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারত।”

“কী সাম্রাজ্য?”

“জমি দখল, ভুয়ো কোম্পানি, বেআইনি অর্থ লেনদেন—অনেক কিছু।”

সায়ন বলল,

“তাহলে নীলাদ্রি খুনি?”

অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“সে সরাসরি কাউকে হত্যা করেনি—এমন দাবি সে সবসময় করেছে। কিন্তু তার নির্দেশে মানুষ মরেছে।”

অদ্রিজা শিউরে উঠল।

“তাহলে আমার বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক?”

অমিতাভ বললেন,

“তোমার যে মানুষটি তোমাকে বড় করেছেন, তিনি নীলাদ্রির সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।”

“তাহলে তিনি আমাকে লুকিয়ে রাখলেন কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, নীলাদ্রি তোমাকে ব্যবহার করবে।”

অদ্রিজা চোখ নামিয়ে নিল।

“তাহলে আপনি?”

“আমি পালিয়ে গেলাম।”

তার গলায় তীব্র অনুশোচনা।

“তোমাকে সঙ্গে নিতে পারিনি। কারণ আমার পেছনে লোক ছিল। তোমাকে নিয়ে পালালে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।”

“কিন্তু আপনি অন্তত আমাকে একটা চিঠি লিখতে পারতেন।”

অমিতাভের চোখ ভিজে উঠল।

“আমি লিখেছিলাম।”

অদ্রিজা তাকাল।

“কোথায়?”

“তোমার মায়ের কাছে।”

“মা তো কখনও বলেননি।”

“কারণ সেই চিঠি নীলাদ্রি নিয়ে নিয়েছিল।”

সায়ন বলল,

“আর তারপর?”

“তারপর আমি নিখোঁজ হয়ে যাই।”

অদ্রিজা ধীরে বলল,

“সবাই ভেবেছিল আপনি মারা গেছেন।”

“আমিও চেয়েছিলাম তারা তাই ভাবুক।”

“আপনি কোথায় ছিলেন?”

অমিতাভ জানালেন,

“প্রথমে পাহাড়ে। তারপর সীমান্তের ওপারে। বহু বছর অন্য নামে ছিলাম।”

সায়ন বলল,

“আর আমাকে?”

“তোমাকে খুঁজেছিলাম।”

“পাননি?”

“পেয়েছিলাম।”

সায়ন চমকে তাকাল।

“কখন?”

“তুমি যখন পনেরো বছরের।”

সায়নের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে আমার কাছে আসেননি কেন?”

অমিতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ তখনও নীলাদ্রির লোকেরা তোমাকে নজরে রেখেছিল।”

“তাহলে এত বছর আমি ভাবলাম আমার বাবা-মা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।”

“আমি জানি।”

“আপনি জানতেন?”

“হ্যাঁ।”

সায়নের চোখে জল।

“আপনি জানেন আমি কতবার আপনাকে খুঁজেছি?”

অমিতাভ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“জানি।”

“তাহলে?”

“কারণ কখনও কখনও একজন বাবা তার সন্তানের কাছে থাকতে না পারলেও তার ছায়া হয়ে পাশে থাকে।”

সায়ন আর কিছু বলতে পারল না।

অদ্রিজা এবার প্রশ্ন করল,

“নীলাদ্রি এখন কোথায়?”

অমিতাভের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“সে এখনও বেঁচে আছে।”

“কোথায়?”

“নীলবাড়িতে।”

অদ্রিজা চমকে উঠল।

“কিন্তু আমরা তো…”

“তোমরা যাকে নীলবাড়ির নিচে দেখেছ, সে নীলাদ্রি নয়।”

সায়ন বলল,

“তাহলে কে?”

“তার ছেলে।”

অদ্রিজা স্তব্ধ।

“তার ছেলে?”

“হ্যাঁ।”

“সে কি সব জানে?”

“জানে।”

“তাহলে সে আমাদের কেন ছাড়ল?”

অমিতাভ বললেন,

“কারণ সে তার বাবার মতো নয়।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অমিতাভ পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করলেন।

“এটা নাও।”

অদ্রিজা চাবিটা নিল।

“এটা কী?”

“নীলবাড়ির নীল দরজার চাবি।”

সায়ন বলল,

“কিন্তু ওই দরজা তো আমরা খুলেছি।”

“ওটা বাইরের দরজা।”

অদ্রিজা চমকে তাকাল।

“ভেতরে আরেকটা দরজা আছে।”

অমিতাভ বললেন,

“সেই দরজার ওপারে আছে আসল প্রমাণ।”


তারা তিনজন নীলবাড়িতে ফিরে এল।

রাত নেমেছে।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

বাড়ির ভেতর অদ্ভুত নীরবতা।

অদ্রিজা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল।

সায়ন আর অমিতাভ তার পেছনে।

নীল দরজার ঘরে ঢুকে অদ্রিজা দেয়ালের দিকে তাকাল।

অমিতাভ বললেন,

“ওই ছবিটা সরাও।”

অদ্রিজা ছবিটা সরাতেই একটা ছোট ধাতব তালা দেখা গেল।

সে চাবিটা ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।

দেয়ালের একটা অংশ খুলে গেল।

ভেতরে সরু ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটা লোহার সিন্দুক।

অমিতাভ সিন্দুকের সামনে দাঁড়ালেন।

“এখানেই সব আছে।”

সিন্দুক খুলতেই পুরোনো নথির স্তূপ।

চেক।

ফটোগ্রাফ।

রেকর্ডিং।

জমির কাগজ।

ব্যাংক হিসাব।

আর একটা মোটা ডায়েরি।

অদ্রিজা ডায়েরিটা তুলে নিল।

মলাটে লেখা—

“নীলাদ্রি দত্ত — ব্যক্তিগত হিসাব।”

সায়ন বলল,

“এটাই?”

অমিতাভ মাথা নাড়লেন।

“এখানেই তার সব অপরাধের প্রমাণ।”

অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।

একটা পাতায় তার নিজের নাম।

“অদ্রিজা — ১৭/০৭/১৯৯৮।”

তার নিচে লেখা—

“শিশুটিকে নজরে রাখতে হবে। অমিতাভের দুর্বলতা।”

অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।

আরেক পাতায়—

“সায়ন — ১৭/০৭/১৯৯৮।”

সায়ন এগিয়ে এল।

তার নামের পাশে লেখা—

“অন্য পরিবারে পাঠানো হয়েছে। অমিতাভের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।”

সায়ন চোখ বন্ধ করল।

অমিতাভ বললেন,

“নীলাদ্রি তোমাদের দুজনকে দুইভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।”

“কীভাবে?”

“তোমাকে—আমার বিরুদ্ধে চাপ হিসেবে।”

“আর সায়নকে?”

“আমার কাছে পৌঁছানোর পথ হিসেবে।”

হঠাৎ নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

তিনজনই থেমে গেল।

অমিতাভ ফিসফিস করে বললেন,

“সে এসেছে।”

সায়ন বলল,

“নীলাদ্রি?”

“হ্যাঁ।”

নিচ থেকে ধীর কণ্ঠ ভেসে এল—

“অমিতাভ।”

অদ্রিজার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কণ্ঠটা বয়স্ক।

কঠিন।

আর ভয়ংকর শান্ত।

“আমি জানতাম তুমি একদিন ফিরবে।”

অমিতাভ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

“নীলাদ্রি, এবার সব শেষ।”

নিচ থেকে হাসির শব্দ।

“শেষ?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি এত বছর পালিয়ে থেকেও একই ভুল করছ।”

অমিতাভ বললেন,

“ভুল করেছি। কিন্তু এবার প্রমাণ আছে।”

“প্রমাণ?”

নীলাদ্রি হেসে উঠল।

“প্রমাণ নিয়ে তুমি কী করবে?”

অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,

“পুলিশকে দেব।”

নীলাদ্রির কণ্ঠস্বর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।

“অদ্রিজা।”

সে থেমে গেল।

“তুমি তোমার বাবাকে খুব ভালোবাসো?”

অদ্রিজা কিছু বলল না।

“তাহলে তাকে বলো, নিচে আসতে।”

অমিতাভ সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন।

সায়ন তাকে থামাতে গেল।

“আপনি একা যাবেন না।”

অমিতাভ বললেন,

“আজ আর পালাব না।”

নিচে পৌঁছতেই নীলাদ্রি সামনে এল।

বয়স্ক।

হাতে লাঠি।

কিন্তু চোখে আগের মতোই কঠোরতা।

তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন যুবক।

অদ্রিজা চিনতে পারল।

নীলবাড়িতে যাকে সে প্রথম রাতে দেখেছিল।

নীলাদ্রির ছেলে।

সে অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল।

“আমি তোমাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি।”

নীলাদ্রি তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“চুপ।”

অমিতাভ বললেন,

“তোমার নিজের ছেলে তোমার বিরুদ্ধে গেছে।”

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“তুইও?”

ছেলেটি ধীরে বলল,

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ আমি আপনার মতো হতে চাই না।”

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ তার হাত কাঁপতে শুরু করল।

সে চেয়ারে বসে পড়ল।

অমিতাভ এগিয়ে গেলেন।

“সব শেষ।”

নীলাদ্রি মৃদু হাসলেন।

“না।”

“কী বলতে চাইছ?”

“তুমি একটা জিনিস জানো না।”

অমিতাভ থেমে গেলেন।

“কী?”

নীলাদ্রি অদ্রিজার দিকে তাকাল।

“তোমার মা।”

অদ্রিজার বুক ধক করে উঠল।

“আমার মা?”

“সে তোমাকে কখনও ত্যাগ করেনি।”

অদ্রিজা এগিয়ে গেল।

“তাহলে কোথায় ছিলেন?”

নীলাদ্রি বলল,

“আমার কাছ থেকে লুকিয়ে।”

অদ্রিজা তাকিয়ে রইল।

“সে কি বেঁচে আছেন?”

নীলাদ্রি উত্তর দিল না।

অমিতাভ বললেন,

“নীলাদ্রি।”

“হ্যাঁ, বেঁচে আছে।”

অদ্রিজার চোখে জল।

“কোথায়?”

“শহরের উত্তরে একটা বৃদ্ধাশ্রমে।”

অদ্রিজার মুখ থেকে শব্দ বেরোল না।

এত বছর ধরে যে মানুষটাকে সে মৃত ভেবেছিল—

তার মা বেঁচে আছেন।

অমিতাভ ধীরে বললেন,

“আমি তোমাকে নিয়ে তার কাছে যেতে চেয়েছিলাম।”

“তাহলে যাননি কেন?”

“কারণ নীলাদ্রি তাকে নজরে রেখেছিল।”

নীলাদ্রি এবার আর কিছু বলল না।

তার চোখে প্রথমবার ক্লান্তি দেখা গেল।

সায়ন বলল,

“আপনি আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন।”

নীলাদ্রি মৃদু স্বরে বলল,

“আমি শুধু ভেবেছিলাম, শক্তিশালী হলে সবকিছু নিজের মতো করে রাখা যায়।”

অমিতাভ বললেন,

“কিন্তু মানুষকে নিজের সম্পত্তি ভাবা যায় না।”

নীলাদ্রি মাথা নিচু করলেন।

দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

অদ্রিজা অবাক হয়ে সায়নের দিকে তাকাল।

সায়ন বলল,

“আমি নথিগুলোর ছবি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।”

পুলিশ বাড়িতে ঢুকল।

নীলাদ্রি কোনও প্রতিরোধ করলেন না।

শুধু যাওয়ার আগে অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তোমার জন্মের রাতটা আমি হারিয়ে দিয়েছিলাম।”

অদ্রিজা শান্ত গলায় বলল,

“কিন্তু আমার জীবন আপনি হারিয়ে দিতে পারেননি।”

নীলাদ্রি আর কিছু বললেন না।

তাকে নিয়ে যাওয়া হলো।


দুদিন পর।

শহরের উত্তরের একটি বৃদ্ধাশ্রম।

অদ্রিজা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

তার হাত কাঁপছে।

সায়ন পাশে।

অমিতাভ একটু দূরে।

একজন নার্স দরজা খুলে দিলেন।

“মাধবীদি?”

ভেতর থেকে দুর্বল কণ্ঠ—

“কে?”

অদ্রিজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“মা।”

ঘর নিস্তব্ধ।

বিছানায় বসে থাকা বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন।

চোখে অবিশ্বাস।

তারপর—

“অদ্রি?”

অদ্রিজা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

মাধবী কাঁদতে লাগলেন।

“তুই এত বড় হয়ে গেছিস…”

“তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে কেন?”

“আমি যাইনি।”

“তাহলে?”

“আমাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।”

অদ্রিজা চোখ মুছে বলল,

“বাবা?”

মাধবী অমিতাভের দিকে তাকালেন।

দুজনের চোখে বহু বছরের ইতিহাস।

কেউ কিছু বলল না।

তারপর মাধবী হাত বাড়ালেন।

অমিতাভ এগিয়ে এলেন।

তাদের হাত এক হলো।

কোনও অভিযোগ নেই।

শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।


এক বছর পরে।

নীলবাড়ি আর পরিত্যক্ত নয়।

বাড়িটা সংস্কার করা হয়েছে।

দোতলার সেই নীল দরজাটা এখনও আছে।

অদ্রিজা এখন সেখানে একটা ছোট পাঠাগার চালায়।

নাম দিয়েছে—

“নীল দরজা পাঠাগার।”

সায়ন মাঝে মাঝে আসে।

কখনও বই নিয়ে।

কখনও চা নিয়ে।

আর কখনও শুধু জানালার পাশে বসে থাকার জন্য।

এক বিকেলে অদ্রিজা পুরোনো একটা বাক্স খুলছিল।

তার মধ্যে একটা চিঠি পেল।

সায়নের লেখা।

তারিখ—

১৭ জুলাই ২০১০।

চিঠিটা কখনও পাঠানো হয়নি।

অদ্রিজা পড়তে শুরু করল—

“অদ্রি,

যদি কখনও তুমি আমাকে ভুলে যাও, তবু আমি তোমাকে দোষ দেব না।

কিন্তু যদি কখনও জানতে পারো, আমি কেন চলে গিয়েছিলাম, তাহলে শুধু একটা কথা মনে রেখো—

আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।

আমি শুধু এমন একটা পৃথিবী থেকে তোমাকে দূরে রেখেছিলাম, যেখানে সত্যি বলারও শাস্তি ছিল।

যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, আমি তোমাকে কিছু চাইব না।

শুধু পাশে দাঁড়ানোর অনুমতি চাইব।

—সায়ন।”

অদ্রিজা চিঠিটা পড়ে হাসল।

ঠিক তখন দরজায় সায়ন এসে দাঁড়াল।

“কী পড়ছ?”

অদ্রিজা চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল।

“কিছু না।”

“মিথ্যে।”

“তুমি তো সবসময় সত্যি খুঁজে বেড়াও।”

সায়ন হেসে বলল,

“তোমার ব্যাপারে একটু মিথ্যে চলবে।”

অদ্রিজা জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশে মেঘ জমেছে।

“বৃষ্টি আসবে।”

“ছাতা আছে?”

“নেই।”

“তাহলে?”

অদ্রিজা মৃদু হাসল।

“একসঙ্গে ভিজব।”

সায়ন কিছু বলল না।

শুধু তার পাশে এসে দাঁড়াল।

বাইরে বৃষ্টি নামল।

নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

বারো বছরের বিচ্ছেদ।

অসংখ্য মিথ্যে।

একটা হারিয়ে যাওয়া পরিবার।

একটা অন্ধকার রাত।

আর একটা নীল দরজা—

সবকিছুর শেষে এসে তারা বুঝল,

জীবনের কিছু দরজা যতই বন্ধ করে রাখা হোক,

সত্যি একদিন না একদিন তার চাবি খুঁজে নেয়।

আর ভালোবাসা?

ভালোবাসা হয়তো কখনও হারায় না।

শুধু অপেক্ষা করে—

সঠিক সময়ে আবার ফিরে আসার জন্য।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস

নীল দরজার ওপারে (দ্বিতীয় পর্ব)।

দ্বিতীয় পর্ব — জন্মের রাত

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটেনি।

নীলবাড়ির মাটির নিচের ঘরে অদ্রিজা আর সায়ন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

টেলিফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বর অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে।

কিন্তু শেষ কথাটা এখনও অদ্রিজার কানে বাজছে—

“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার সন্তান নয়।”

সায়ন ধীরে ধীরে বলল,

“ফোনটা আমাকে দাও।”

অদ্রিজা রিসিভারটা এগিয়ে দিল।

“ওটা আমার বাবার গলা ছিল।”

সায়ন মাথা নাড়ল।

“আমি জানি।”

“তুমি জানো?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এতদিন আমাকে কিছু বলোনি কেন?”

সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না।”

“কিসের ব্যাপারে?”

“তোমার জন্ম নিয়ে।”

অদ্রিজা দেয়ালে হেলান দিল।

“সবাই আমার জন্মের কথা জানে। শুধু আমি জানি না।”

সায়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোমার জন্মের রাতটা অদ্ভুত ছিল।”

“কী হয়েছিল?”

“সেটা জানতে হলে আমাদের এই বাড়ির আরেকটা ঘর খুঁজতে হবে।”

“আরেকটা?”

“হ্যাঁ।”

সায়ন টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল।

বাক্সের নিচে হাত ঢুকিয়ে সে একটা লুকোনো লিভার টানল।

দেয়ালের একটা অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।

তার পেছনে ছোট একটা ঘর।

ঘরের মধ্যে একটা লোহার আলমারি।

অদ্রিজা অবাক হয়ে বলল,

“এটা আগে দেখিনি।”

“কারণ এটা কেউ দেখতে পাবে না বলেই বানানো হয়েছিল।”

সায়ন পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।

আলমারি খুলতেই অসংখ্য ফাইল।

পুরোনো হাসপাতালের কাগজ।

জন্মনিবন্ধন।

ছবি।

আর একটা কালো ডায়েরি।

ডায়েরির মলাটে লেখা—

“১৭ জুলাই ১৯৯৮।”

অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।

“এটাই?”

“হ্যাঁ।”

সে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখা।

“আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”

অদ্রিজা পড়তে শুরু করল।

“রাত ১টা ৪০ মিনিট। হাসপাতালে পৌঁছলাম।

মাধবীর অবস্থা খুব খারাপ।

ডাক্তার বললেন, শিশুটিকে বাঁচানো যাবে কি না নিশ্চিত নন।”

অদ্রিজা নিঃশ্বাস আটকে পড়ছিল।

পরের পাতায়—

“রাত ২টা ১৭ মিনিট।

শিশুটি জন্মেছে।

মেয়ে।

সুস্থ।”

অদ্রিজা থেমে গেল।

“মেয়ে?”

সায়ন তার দিকে তাকাল।

“তুমি।”

অদ্রিজা পরের পাতা উল্টাল।

“অমিতাভ এসেছে।

সে শিশুটিকে কোলে নিয়েছে।

তার চোখে এমন আনন্দ দেখলাম, যা আগে কখনও দেখিনি।”

অদ্রিজার চোখ ভিজে উঠল।

“তাহলে বাবা… অমিতাভ?”

“ডায়েরি তাই বলছে।”

আরেকটি পাতা।

“রাত ৩টা ১০ মিনিট।

অমিতাভ বলল, শিশুটিকে নিয়ে সে চলে যাবে।

আমি তাকে বাধা দিলাম।”

তারপর লেখাটা কাঁপা।

“কারণ আমি জানি, নীলাদ্রি তাকে খুঁজছে।”

অদ্রিজা থমকে গেল।

“নীলাদ্রি আবার?”

সায়ন মাথা নাড়ল।

“এই নামটাই সব জায়গায়।”

অদ্রিজা পড়তে লাগল।

“রাত ৩টা ৪৫।

অমিতাভ চলে গেছে।

শিশুটি আমার কাছে।

মাধবী অজ্ঞান।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, অদ্রিজাকে আমি নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করব।”

অদ্রিজার হাত কেঁপে উঠল।

“তিনি আমাকে নিজের মেয়ে করেছিলেন।”

সায়ন বলল,

“হ্যাঁ।”

“তাহলে উনি আমার বাবা ছিলেন না?”

“রক্তের সম্পর্কের বাবা নয়।”

অদ্রিজা ডায়েরির পরের পাতা খুলল।

কিন্তু সেখানে শুধু একটা বাক্য—

“আমি জানতাম না, সেই রাতেই আরেকটি শিশু জন্মেছিল।”

অদ্রিজা তাকাল।

“আরেকটি শিশু?”

সায়নও বিস্মিত।

“আমি জানতাম না।”

অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।

পরের পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়া।

শুধু শেষ পাতায় লেখা—

“যদি কখনও সত্যি জানতে চাও, পুরোনো নার্সিংহোমে যাও। রুম নম্বর ১৭।”

অদ্রিজা বলল,

“কোন নার্সিংহোম?”

সায়ন উত্তর দিল,

“আমি জানি।”

“কোথায়?”

“শহরের বাইরে। এখন আর হাসপাতাল নেই।”

অদ্রিজা ডায়েরিটা বন্ধ করল।

“তাহলে চল।”

সায়ন বলল,

“এখন?”

“হ্যাঁ।”

“বাইরে যারা আছে?”

“তারা আমাদের খুঁজছে।”

“তাহলে আরও সাবধানে যেতে হবে।”

অদ্রিজা তাকিয়ে বলল,

“সায়ন, তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

প্রশ্নটা হঠাৎ।

সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“উত্তরটা শুনতে চাও?”

“হ্যাঁ।”

“আমি পাহাড়ে ছিলাম।”

“কেন?”

“একজন মানুষ আমাকে লুকিয়ে রেখেছিল।”

“কে?”

সায়ন জানালার বাইরে তাকাল।

“নীলাদ্রি।”

অদ্রিজা স্তব্ধ।

“তাহলে সে তোমাকে বাঁচিয়েছিল?”

“কখনও বাঁচিয়েছে। কখনও বন্দি রেখেছে।”

“কেন?”

“কারণ আমি যা দেখেছিলাম, সেটা সে জানত।”

“খুন?”

“হ্যাঁ।”

“কাকে খুন করতে দেখেছিলে?”

সায়ন ধীরে বলল,

“একজনকে।”

“কে?”

“অমিতাভ সেনকে।”

অদ্রিজার শরীর অবশ হয়ে গেল।

“তুমি… আমার আসল বাবাকে খুন হতে দেখেছিলে?”

সায়ন মাথা নাড়ল।

“আমি ভেবেছিলাম তিনি মারা গেছেন।”

“আর এখন?”

“এখনও জানি না।”

অদ্রিজা বলল,

“তাহলে তুমি এতদিন কেন বলোনি?”

“কারণ আমি পুরো ঘটনা দেখিনি।”

“কী দেখেছিলে?”

সায়ন বলল,

“আমি দেখেছিলাম অমিতাভকে একটা গাড়িতে তোলা হচ্ছে।”

“তারপর?”

“গাড়িটা নদীর দিকে গিয়েছিল।”

“তারপর?”

“একটা বিস্ফোরণ।”

অদ্রিজার গলা শুকিয়ে গেল।

“কিন্তু কোনও দেহ পাওয়া যায়নি?”

“না।”

“তাহলে?”

সায়ন বলল,

“এই কারণেই আমি আজও মনে করি, অমিতাভ হয়তো বেঁচে ছিলেন।”


সকাল আটটা।

নীলবাড়ি থেকে তারা বেরিয়ে পড়ল।

সায়ন একটা পুরোনো মোটরবাইক নিয়ে এসেছিল।

অদ্রিজা পিছনে বসে।

রাস্তা ভিজে।

আকাশ মেঘলা।

শহর পেরিয়ে তারা গ্রামাঞ্চলের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে একটা পরিত্যক্ত ভবনের সামনে পৌঁছল।

ভাঙা সাইনবোর্ডে এখনও লেখা—

“মাধবী নার্সিংহোম।”

অদ্রিজা সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মাধবী?”

সায়ন মাথা নাড়ল।

“তোমার মায়ের নাম।”

অদ্রিজা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার মা কি এই নার্সিংহোমেই ছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

দরজাটা ভাঙা।

ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

দেয়ালে পুরোনো পোস্টার।

এক পাশে ভাঙা রিসেপশন।

সায়ন একটা পুরোনো রেজিস্টার বের করল।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে থামল।

১৭ জুলাই ১৯৯৮।

অদ্রিজা তার পাশে দাঁড়াল।

রেজিস্টারে লেখা—

মাধবী সেন — কক্ষ ১৭।

অদ্রিজা চমকে উঠল।

“সেন?”

“তোমার মায়ের বিয়ের আগের পদবি।”

সায়ন বলল।

আরেকটু নিচে—

সহযোগী ব্যক্তি: অমিতাভ সেন।

অদ্রিজা চোখ বন্ধ করল।

সবকিছু যেন ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।

তারপর রেজিস্টারের শেষ লাইনে—

দ্বিতীয় প্রসূতি: রীনা দত্ত।

অদ্রিজা তাকাল।

“রীনা দত্ত কে?”

“জানি না।”

রেজিস্টারের পাশে একটা ছোট নোট।

“শিশু—পুরুষ।”

অদ্রিজা স্তব্ধ।

“একই রাতে আরেকটা ছেলে জন্মেছিল।”

সায়ন বলল,

“হ্যাঁ।”

“এই ছেলেটার কী হয়েছিল?”

রেজিস্টারের পাতা ছিঁড়ে নেওয়া।

কোনও তথ্য নেই।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ হলো।

দুজনেই চমকে উঠল।

সায়ন অদ্রিজাকে পিছনে সরিয়ে দিল।

“কে ওখানে?”

কোনও উত্তর নেই।

সে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল।

ঘরের মধ্যে একটা পুরোনো কাঠের আলমারি।

আর মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ছবি।

অদ্রিজা ছবিটা তুলে নিল।

ছবিতে চারজন।

তার মা।

অমিতাভ।

একজন নার্স।

আর একজন পুরুষ।

অদ্রিজা পুরুষটির মুখ দেখে স্থির হয়ে গেল।

“এই লোকটা…”

সায়ন ছবিটা নিল।

তার মুখও বদলে গেল।

“নীলাদ্রি।”

অদ্রিজা বলল,

“কিন্তু উনি এখানে কেন?”

সায়ন ছবির পেছনটা দেখল।

সেখানে লেখা—

“রাত ৩টা ৩০ — শিশুকে বদলানো হলো।”

অদ্রিজার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“শিশুকে বদলানো?”

“মানে?”

সায়ন ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“অদ্রিজা… সম্ভবত তোমার জন্মের রাতেই তোমাকে অন্য একটা শিশুর সঙ্গে বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কেন?”

“কারণ কাউকে একটা শিশুকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল।”

“কাকে?”

সায়ন উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ।

দুজনেই জানালার কাছে গেল।

একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে।

গাড়ি থেকে তিনজন লোক নামল।

সায়ন বলল,

“আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে।”

“কিন্তু সত্যিটা?”

“সত্যি এখানেই আছে।”

সে আলমারির পেছনে একটা গোপন খোপ খুঁজে পেল।

ভেতরে একটা ছোট ধাতব বাক্স।

বাক্স খুলতেই একটা পুরোনো অডিও ক্যাসেট।

সায়ন সেটাকে হাতে নিল।

“এটা নিয়ে চল।”

“কিন্তু এটা শুনব কোথায়?”

“যেখানে কেউ আমাদের শুনতে পাবে না।”

তারা পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে দৌড়ল।

কিছুদূর গিয়ে একটা পুরোনো গুদামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

বাইরে লোকগুলো নার্সিংহোমে ঢুকেছে।

সায়ন ক্যাসেটটা বের করল।

তার ব্যাগে ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল।

সে চালু করল।

প্রথমে নার্সের কণ্ঠ।

“সময় রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ।”

তারপর অমিতাভের গলা।

“তুমি নিশ্চিত?”

নার্স বলল,

“হ্যাঁ।”

অমিতাভ—

“তাহলে শিশুটাকে এখনই নিয়ে যাও।”

নার্স—

“কিন্তু মাধবী?”

অমিতাভ—

“ওকে কিছু জানানো যাবে না।”

তারপর আরেকটা কণ্ঠ।

নীলাদ্রি।

“শিশুটাকে আমার হাতে দাও।”

অমিতাভ বলল,

“না।”

নীলাদ্রি—

“তুমি জানো না তুমি কী করছ।”

অমিতাভ—

“আমি জানি। আর আমি এটাও জানি, তুমি ওকে খুঁজে পেলে ও বাঁচবে না।”

তারপর হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ।

একটা শিশুর।

অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।

তারপর অমিতাভ বলল—

“এই শিশুটাকে বাঁচাতে হলে ওকে আমার সন্তান হিসেবে দেখানো যাবে না।”

নীলাদ্রি বলল,

“তাহলে?”

অমিতাভ—

“ওকে অন্য পরিবারের হাতে দাও।”

অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,

“আমাকে…”

ক্যাসেট চলতে থাকে।

নীলাদ্রি বলল,

“আর দ্বিতীয় শিশুটার?”

অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“ওকে আমি নিয়ে যাব।”

সায়ন হঠাৎ প্লেয়ার বন্ধ করে দিল।

অদ্রিজা তার দিকে তাকাল।

“দ্বিতীয় শিশুটি কে?”

সায়ন বলল,

“আমরা এখনও জানি না।”

ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।

অজানা নম্বর।

সায়ন ফোন ধরল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর এক বৃদ্ধ কণ্ঠ—

“দ্বিতীয় শিশুটাকে খুঁজছ?”

সায়ন উঠে দাঁড়াল।

“আপনি কে?”

“যে মানুষটা তোমাদের জন্মের রাতটা দেখেছিল।”

অদ্রিজা ফোনের দিকে তাকাল।

“আপনি কোথায়?”

“পুরোনো রেলস্টেশনে।”

“কোনটা?”

“যেখানে তোমার বাবা শেষবার গিয়েছিল।”

কল কেটে গেল।

অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।

“চলো।”


পুরোনো রেলস্টেশন।

বছরের পর বছর ট্রেন দাঁড়ায় না এখানে।

প্ল্যাটফর্মে আগাছা।

ভাঙা বেঞ্চ।

দূরে একটা সিগন্যাল এখনও দাঁড়িয়ে।

একজন বৃদ্ধ বেঞ্চে বসে ছিলেন।

অদ্রিজা কাছে যেতেই তিনি মাথা তুললেন।

“তুমি অদ্রিজা?”

“হ্যাঁ।”

“তোমার চোখ তোমার মায়ের মতো।”

অদ্রিজা চুপ।

বৃদ্ধ বললেন,

“আমি সেই রাতের নার্স।”

অদ্রিজার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“দ্বিতীয় শিশুটার কী হয়েছিল?”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“তাকে নিয়ে গিয়েছিল অমিতাভ।”

“কোথায়?”

“আমি জানি না।”

“আর প্রথম শিশুটি?”

“তোমাকে।”

অদ্রিজা চুপ করে গেল।

“কিন্তু কেন বদলানো হয়েছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“কারণ নীলাদ্রি তখন তোমার মাকে খুঁজছিল। সে জানত মাধবীর সন্তান অমিতাভের দুর্বলতা।”

“তাহলে?”

“অমিতাভ তোমাকে বাঁচাতে নিজের সন্তান পরিচয় ছেড়ে দিয়েছিল।”

“কিন্তু দ্বিতীয় শিশুটি?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“সেটাই আসল রহস্য।”

সায়ন বলল,

“আপনি জানেন?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“জানি।”

“কে সে?”

বৃদ্ধ অদ্রিজার দিকে তাকালেন।

তারপর বললেন—

“সায়ন।”

অদ্রিজা স্থির।

সায়নও।

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমরা যে দুজনকে এত বছর ধরে আলাদা মানুষ ভেবেছ, সেই রাতেই তোমাদের ভাগ্য এক হয়ে গিয়েছিল।”

সায়ন ধীরে বলল,

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আমি তো…”

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমাকে অন্য পরিবারে দেওয়া হয়েছিল। পরে নীলাদ্রি তোমাকে খুঁজে পায়।”

অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।

সবকিছু যেন এক মুহূর্তে নতুন অর্থ পেল।

সায়নের চোখে জল।

“তাহলে…”

বৃদ্ধ বললেন,

“তুমি অমিতাভের ছেলে।”

অদ্রিজা স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার নিজের জন্মের রাতের রহস্যের সঙ্গে সায়নের জীবন জড়িয়ে আছে।

কিন্তু এখনও একটা প্রশ্ন।

অদ্রিজা বলল,

“তাহলে আমরা…”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“না। তোমরা ভাই-বোন নও।”

অদ্রিজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“তাহলে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“তুমি মাধবীর সন্তান। আর সায়ন রীনা দত্তের সন্তান।”

“কিন্তু অমিতাভ?”

“অমিতাভ সায়নকে নিজের সন্তানের মতো বড় করতে চেয়েছিল।”

সায়ন ফিসফিস করে বলল,

“তাহলে আমার বাবা কে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,

“রীনা দত্তের স্বামী।”

“অমিতাভ নন?”

“না।”

সায়ন চোখ বন্ধ করল।

এত বছরের রহস্যের একটা বড় অংশ খুলে গেল।

অদ্রিজা আর সায়ন রক্তের সম্পর্কে জড়িত নয়।

কিন্তু অমিতাভ তাদের দুজনের জীবনেই ছিলেন।

হঠাৎ দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।

“আমার কাজ শেষ।”

“কোথায় যাবেন?”

“যেখানে সব সত্যি একদিন শেষ হয়।”

তিনি হাঁটতে শুরু করলেন।

অদ্রিজা চিৎকার করে বলল,

“অমিতাভ কোথায়?”

বৃদ্ধ থামলেন।

পেছন ফিরে বললেন—

“যাকে তোমরা মৃত ভেবেছ, সে হয়তো তোমাদের সামনে আসতে চলেছে।”

তারপর তিনি অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।

অদ্রিজা সায়নের পাশে এসে দাঁড়াল।

সায়ন তার দিকে তাকাল।

“অদ্রি…”

“হ্যাঁ?”

“এত বছর আমি ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়েছি।”

অদ্রিজা মৃদু হাসল।

“আমিও।”

“কিন্তু এখন?”

অদ্রিজা তার হাত ধরল।

“এখন মনে হচ্ছে, আমরা আসলে কখনও একে অপরকে হারাইনি।”

ঠিক তখনই দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল।

গাড়ি ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে থামল।

দরজা খুলল।

একজন মানুষ নেমে এলেন।

বয়স হয়েছে।

চুলে পাক।

মুখে ক্লান্তি।

কিন্তু চোখ—

অদ্রিজা সেই চোখ ছবিতে দেখেছে।

সায়নও তাকিয়ে রইল।

লোকটি কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলেন।

তারপর কাঁপা গলায় বললেন—

“অদ্রি…”

অদ্রিজার চোখে জল এসে গেল।

সায়ন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে।

লোকটি বললেন—

“আমি অমিতাভ।”

দূরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো।

আর বারো বছর ধরে হারিয়ে থাকা একটি মানুষের ফিরে আসার সঙ্গে—

অদ্রিজার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের শেষ দরজাটিও খুলে গেল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

নীল দরজার ওপারে (প্রথম পর্ব)।

রাত তখন এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।

শহরের শেষ বাসটাও অনেকক্ষণ আগে চলে গেছে। রাস্তার দু’পাশে বন্ধ দোকানের শাটার। মাঝে মাঝে দূরের কোনো গলিতে কুকুরের ডাক, আর তারও দূরে কোনো অচেনা ট্রেনের হুইসেল।

অদ্রিজা ছাতাটা মাথার ওপর ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

তার হাতে একটা পুরোনো চাবি।

চাবিটা সে পেয়েছিল আজ বিকেলে।

একটা অচেনা খামের ভিতরে।

খামের ওপর শুধু লেখা ছিল—

“অদ্রিজার হাতে পৌঁছবে।”

কোনও ঠিকানা নেই।

কোনও প্রেরকের নাম নেই।

শুধু নিচে ছোট করে একটা তারিখ—

১৭ জুলাই, ২০১৪।

অদ্রিজা চিঠিটা পড়ে প্রথমে হেসেছিল।

তারপর হাসিটা আর থাকেনি।

কারণ চিঠির প্রথম লাইনটা ছিল—

“তুমি যদি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে আমি আর ফিরতে পারিনি।”

চিঠির লেখাটা সে চিনতে পেরেছিল।

অনেক বছর পরেও।

সায়নের হাতের লেখা।

সায়ন।

তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

আবার সবচেয়ে দূরের মানুষও।

বারো বছর আগে যে মানুষটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

যার কোনও মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।

কোনও শেষ খবর পাওয়া যায়নি।

কোনও বিদায়ও ছিল না।

শুধু একদিন সকালে অদ্রিজার ফোনে একটা ছোট্ট মেসেজ এসেছিল—

“আমাকে আর খুঁজো না।”

তারপর থেকে সায়ন নেই।

কিন্তু আজ—

বারো বছর পরে—

তার হাতের লেখা আবার ফিরে এসেছে।

আর সেই লেখার সঙ্গে এসেছে একটা চাবি।

অদ্রিজা চাবিটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরল।

তার সামনে এখন যে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।

বাড়িটার নাম—

নীলবাড়ি।

শহরের একেবারে প্রান্তে, পুরোনো রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দোতলা বাড়ি।

বছরের পর বছর কেউ এখানে থাকে না।

অদ্রিজা ছোটবেলায় একবার এই বাড়িটা দেখেছিল।

সায়নের সঙ্গে।

সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।

সায়ন বলেছিল,

“একদিন আমরা এখানে থাকব।”

অদ্রিজা হেসে বলেছিল,

“ভূতের বাড়িতে?”

সায়ন বলেছিল,

“ভূত থাকলে থাকুক। তুমি থাকলে আমি ভয় পাব না।”

সেই কথাটা মনে পড়তেই অদ্রিজার চোখ জ্বালা করে উঠল।

বারো বছর।

কত কিছু বদলে গেছে।

শুধু কিছু স্মৃতি বদলায়নি।

অদ্রিজা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল।

লোহার গেটটা অর্ধেক ভাঙা।

ভেতরে আগাছা।

দোতলার জানালাগুলো কালো।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

একটা জানালায় নীল আলো জ্বলছে।

অদ্রিজার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল।

এই বাড়িতে কেউ থাকে না।

তাহলে আলো জ্বলছে কেন?

সে ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

গেটটা কড়াৎ করে শব্দ করতেই অদ্রিজা থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড চারপাশে তাকিয়ে রইল।

কেউ নেই।

সে আবার হাঁটতে শুরু করল।

বাড়ির দরজায় একটা পুরোনো তালা ঝুলছে।

চাবিটা বের করল।

একবার চেষ্টা করতেই—

ক্লিক।

তালা খুলে গেল।

অদ্রিজা কিছুক্ষণ চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

ঘরের ভিতর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।

দেয়ালে পুরোনো ছবি।

মেঝেতে ধুলো।

কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ হচ্ছে।

অদ্রিজা মোবাইলের টর্চ জ্বালাল।

সামনের দেওয়ালে একটা ছবি দেখে তার পা থেমে গেল।

ছবিটা সায়নের।

অনেক ছোটবেলার।

সম্ভবত দশ-এগারো বছর বয়স।

ছবির পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন বৃদ্ধ।

অদ্রিজা লোকটাকে চিনতে পারল না।

ছবির নিচে লেখা—

“সায়ন ও নীলাদ্রি — ২০০১।”

নীলাদ্রি?

এই নামটা অদ্রিজা কখনও শোনেনি।

হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল।

ঠক।

অদ্রিজা চমকে উঠল।

তারপর—

ঠক… ঠক…

কেউ যেন কাঠের মেঝেতে হাঁটছে।

সে মোবাইলটা শক্ত করে ধরল।

“কে?”

কোনও উত্তর নেই।

“কে ওখানে?”

আবার নীরবতা।

তারপর ওপর থেকে খুব ধীরে একটা শব্দ ভেসে এল—

“অদ্রিজা…”

অদ্রিজার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে গেল।

এই কণ্ঠস্বর—

অসম্ভব।

সে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

“সায়ন?”

কোনও উত্তর নেই।

অদ্রিজা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল।

প্রতিটি ধাপে কাঠ কেঁপে উঠছে।

দোতলায় উঠে সে দেখল করিডোরের শেষে একটা দরজা।

দরজাটা নীল।

ঠিক সেই নীল—

যে নীল রঙের কথা সায়ন একদিন বলেছিল।

“জানো অদ্রি, আমার একটা ঘর থাকবে। দরজা হবে নীল।”

অদ্রিজার বুকের মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল।

সে দরজার সামনে দাঁড়াল।

চাবিটা বের করল।

তারপর থেমে গেল।

ভেতর থেকে হালকা আলো বেরোচ্ছে।

কেউ আছে।

অদ্রিজা দরজার হাতল ধরল।

ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দিল।

দরজা খুলে গেল।

ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল।

টেবিলের ওপর একটা কেরোসিন বাতি।

তার পাশে একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার।

আর একটা চেয়ার।

চেয়ারে কেউ বসে নেই।

অদ্রিজা কয়েক পা এগিয়ে গেল।

টেবিলের ওপর একটা খাম।

খামের ওপর লেখা—

“অদ্রি, এটা শোনার পর তুমি যা বিশ্বাস করেছ, তার সবকিছু বদলে যাবে।”

অদ্রিজার হাত কাঁপছিল।

সে টেপ রেকর্ডারটা চালু করল।

কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর—

একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।

“অদ্রি…”

অদ্রিজা চোখ বন্ধ করে ফেলল।

সায়ন।

কোনও ভুল নেই।

সায়নই।

“যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তাহলে বুঝবে পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।”

অদ্রিজা চোখ খুলল।

পরিকল্পনা?

সায়ন বলতে শুরু করল—

“আমি জানি তুমি ভাবছ, আমি তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ভাবছ, আমি তোমাকে ভালোবাসিনি। তুমি হয়তো আমাকে ঘৃণাও করো।”

অদ্রিজার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“কিন্তু সত্যিটা অন্য।”

টেপে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর সায়ন বলল—

“বারো বছর আগে যেদিন আমি অদৃশ্য হয়েছিলাম, সেদিন আমি মরিনি।”

অদ্রিজার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

“আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।”

তারপর একটা শব্দ।

মনে হল সায়ন খুব কাছে এসে ফিসফিস করছে।

“কারণ আমি একটা ঘটনা দেখেছিলাম।”

টেপ হঠাৎ কেঁপে উঠল।

“একটা খুন।”

অদ্রিজার হাত থেকে মোবাইল প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

“আমি সেই খুনের সাক্ষী ছিলাম। আর যে মানুষটা খুন করেছিল, সে জানত আমি তাকে দেখেছি।”

অদ্রিজা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

সায়নের কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু।

“লোকটা তোমার পরিচিত।”

অদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“তুমি তাকে খুব বিশ্বাস করো।”

টেপ আবার কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।

তারপর সায়ন বলল—

“অদ্রি, তোমার বাবাকে বিশ্বাস কোরো না।”

অদ্রিজা যেন বজ্রাহত।

তার বাবা?

তার বাবা তো মারা গেছেন আট বছর আগে।

হৃদরোগে।

অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,

“বাবা?”

টেপে সায়নের কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল—

“তোমার বাবা যেদিন মারা যান, তার আগের রাতেই তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।”

অদ্রিজা চেয়ারটা ধরে দাঁড়াল।

“তিনি আমাকে বলেছিলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।”

তারপর—

“কিন্তু সবকিছু শেষ হয়নি।”

টেপের শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে গেল।

তারপর সায়নের শেষ কথাটা শোনা গেল—

“নীলবাড়ির নিচে যা আছে, সেটা খুঁজে বের করো। সেখানে তোমার বাবার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে।”

টেপ বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরে আবার নীরবতা।

অদ্রিজা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর টেবিলের ওপর রাখা খামটা খুলল।

ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিতে তার বাবা।

সায়ন।

আর সেই অচেনা বৃদ্ধ—নীলাদ্রি।

তিনজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।

ছবির পেছনে লেখা—

“১৭ জুলাই ২০১৪ — শেষ সাক্ষাৎ।”

অদ্রিজার মাথা ঘুরে উঠল।

১৭ জুলাই।

যেদিন সায়ন অদৃশ্য হয়েছিল।

আর আজও—

১৭ জুলাই।

বারো বছর পর ঠিক একই তারিখে তাকে এখানে ডাকা হয়েছে।

এটা কাকতালীয় হতে পারে না।

হঠাৎ করিডোর থেকে একটা শব্দ এল।

কারও পায়ের শব্দ।

অদ্রিজা ঘুরে দাঁড়াল।

“কে?”

কেউ উত্তর দিল না।

তারপর ধীরে ধীরে নীল দরজার বাইরে একটা ছায়া দেখা গেল।

অদ্রিজা পিছিয়ে গেল।

ছায়াটা থামল।

তারপর একজন পুরুষ ঘরে ঢুকল।

অদ্রিজা প্রথমে তাকে চিনতে পারল না।

লোকটির চুলে পাক ধরেছে।

মুখে দাড়ি।

চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।

কিন্তু চোখদুটো—

অদ্রিজা সেই চোখ চেনে।

বারো বছর ধরে।

সে ফিসফিস করে বলল—

“সায়ন?”

লোকটা কিছু বলল না।

অদ্রিজা এক পা এগিয়ে গেল।

“তুমি… সত্যিই সায়ন?”

লোকটি মাথা তুলল।

তার চোখে জল।

“হ্যাঁ।”

অদ্রিজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল।

“তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

সায়ন উত্তর দিল না।

“আমাকে একটা মেসেজ করে বলেছিলে তোমাকে খুঁজতে না। কেন?”

“কারণ তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”

“কিসের থেকে?”

সায়ন ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

“যে মানুষটাকে তুমি তোমার বাবা বলে চিনতে, তার থেকে।”

অদ্রিজা মাথা নাড়ল।

“অসম্ভব।”

“আমি জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না।”

“আমার বাবা আমাকে ভালোবাসতেন।”

“হ্যাঁ।”

সায়ন বলল,

“তোমাকে তিনি সত্যিই ভালোবাসতেন।”

অদ্রিজা কিছুটা থমকে গেল।

“তাহলে?”

সায়ন জানালার দিকে তাকাল।

“কিন্তু ভালোবাসা আর সত্যি সবসময় একই জিনিস নয়।”

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ।

সায়ন ধীরে ধীরে বলল,

“তোমার বাবা খুনি ছিলেন না।”

অদ্রিজা চুপ।

“কিন্তু তিনি এমন একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করতেন, যে খুন করেছিল।”

“কে?”

সায়ন তার দিকে তাকাল।

“নীলাদ্রি।”

অদ্রিজা ছবির বৃদ্ধটির দিকে তাকাল।

“কে উনি?”

সায়ন উত্তর দিল,

“তোমার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।”

“আর তুমি?”

“আমি ছিলাম তাদের দুজনের কাছে একটা ভুল।”

অদ্রিজা বুঝতে পারল না।

সায়ন টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো ডায়েরি বের করল।

“এটা তোমার বাবার।”

অদ্রিজা ডায়েরিটা হাতে নিল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যদি অদ্রিজা কখনও সত্য জানতে পারে, তাহলে তাকে সবকিছু বলবে। কিন্তু সায়নকে নয়।”

অদ্রিজা থমকে গেল।

“কেন?”

সায়ন বলল,

“কারণ তোমার বাবা জানতেন, আমি সত্যিটা জানলে তোমার জীবন বিপদে পড়বে।”

অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।

এক জায়গায় এসে তার হাত থেমে গেল।

সেখানে লেখা—

“নীলাদ্রি আমার ভাই নয়। সে আমার শত্রু। কিন্তু অদ্রিজার জন্য আমাকে তার সঙ্গেই থাকতে হয়েছে।”

অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।

“কেন?”

সায়ন বলল,

“কারণ তোমার জন্মের পর থেকেই তোমাকে নিয়ে একটা গোপন বিষয় ছিল।”

“কী বিষয়?”

সায়ন উত্তর দেওয়ার আগেই—

নিচতলা থেকে প্রচণ্ড শব্দ হল।

ধাম!

দুজনেই চমকে উঠল।

তারপর দরজা ভাঙার শব্দ।

সায়ন সঙ্গে সঙ্গে বাতি নিভিয়ে দিল।

“ওরা এসেছে।”

“কারা?”

“যারা বারো বছর আগে আমাকে খুঁজছিল।”

“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে সব শেষ।”

সায়ন অন্ধকারে তার হাত ধরল।

“আমি ভুল বলেছিলাম।”

বাইরে ভারী পায়ের শব্দ।

একজন বলল—

“সায়ন! আমরা জানি তুমি এখানে!”

অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।

সায়ন তার কানে ফিসফিস করে বলল—

“আমার সঙ্গে এসো।”

“কোথায়?”

“নীলবাড়ির নিচে।”

সে ঘরের এক কোণে গিয়ে দেওয়ালের একটা পুরোনো কাঠের প্যানেল সরাল।

তার পেছনে একটা সরু সিঁড়ি।

অদ্রিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

“এটা কোথায় যায়?”

সায়ন বলল,

“যেখানে তোমার বাবার আসল সত্যি লুকিয়ে আছে।”

দুজনেই নিচে নামতে শুরু করল।

সিঁড়ির শেষে একটা বিশাল লোহার দরজা।

দরজার মাঝখানে তালা।

সায়ন অদ্রিজার হাতে সেই পুরোনো চাবিটা দিল।

“এটা তুমি খুলবে।”

অদ্রিজা চাবিটা তালায় ঢোকাল।

ঘুরল না।

আবার চেষ্টা করল।

না।

সায়ন বলল,

“চাবিটা উল্টো করে ধরো।”

অদ্রিজা চাবিটা উল্টে দিল।

ক্লিক।

দরজা খুলে গেল।

ভেতরে একটা ছোট ঘর।

দেয়ালে অসংখ্য ছবি।

ফাইল।

পুরোনো সংবাদপত্র।

আর মাঝখানে একটা বড় টেবিল।

টেবিলের ওপর একটা বাক্স।

বাক্সের ওপর লেখা—

“অদ্রিজার জন্য।”

অদ্রিজা ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল।

ভেতরে ছিল—

একটা পুরোনো জন্মসনদ।

একটা ছোট্ট রূপার লকেট।

আর একটা চিঠি।

চিঠিটা তার বাবার হাতের লেখা।

অদ্রিজা চিঠিটা খুলল।

প্রথম লাইন—

“অদ্রি, তুমি যাকে তোমার বাবা বলে জানো, সে তোমার বাবা নয়।”

অদ্রিজার চোখ স্থির হয়ে গেল।

তারপর দ্বিতীয় লাইন—

“তোমার আসল বাবা এখনও বেঁচে আছেন।”

সায়ন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।

অদ্রিজা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।

“তুমি জানো উনি কে?”

সায়ন মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“কে?”

সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল—

“নীলাদ্রি।”

অদ্রিজার হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে আবার দরজা ভাঙার শব্দ এল।

আর অন্ধকার ঘরের কোথাও—

একটা পুরোনো ফোন বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

সায়ন ফোনটার দিকে তাকিয়ে বলল—

“অদ্রি… ফোনটা ধরো না।”

অদ্রিজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ফোনটা বাজতেই থাকল।

শেষ পর্যন্ত সে এগিয়ে গেল।

রিসিভার তুলল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর একটা বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর—

“অদ্রিজা?”

অদ্রিজার চোখ বড় হয়ে গেল।

এই কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারে।

এই কণ্ঠস্বর—

তার বাবার।

ওপাশ থেকে আবার বলা হল—

“আমি জানি তুমি এখন নীলবাড়ির নিচে।”

অদ্রিজা কিছু বলতে পারল না।

“আর সায়ন তোমার সঙ্গে আছে।”

সায়ন ধীরে ধীরে অদ্রিজার কাছ থেকে ফোনটা নিতে এগিয়ে এল।

কিন্তু তার আগেই ওপাশ থেকে শেষ কথাটা ভেসে এল—

“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার সন্তান নয়।”

লাইন কেটে গেল।

ঘর নিস্তব্ধ।

অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।

সায়নও তার দিকে তাকিয়ে।

দুজনের চোখে একই প্রশ্ন—

তাহলে আসল সত্যিটা কী?

বাইরে তখন ঝড় শুরু হয়ে গেছে।

আর নীলবাড়ির বহু বছরের বন্ধ দরজার ওপারে—

তাদের অতীত আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : বৃষ্টিভেজা চিঠি (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — শেষ চিঠি

অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

হাতে ধরা টর্চের আলো কাঁপছিল।

ছবির চারজন মানুষ।

একজন যুবক।

একজন তরুণী।

একটি নবজাতক শিশু।

আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে নীলার বাবা।

ছবির পেছনে তারিখ লেখা—

১২ জুন, ১৯৯৮।

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।

১৯৯৮।

তার জন্মের বছর।

সে ছবিটা আরও কাছে নিয়ে এল।

যুবকটির মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।

এই মুখ সে কোথায় যেন দেখেছে।

পুরনো একটা অ্যালবামে।

তার মায়ের ঘরে।

মায়ের ডায়েরির পাতায়।

অমিতাভ সেন।

তাহলে এটাই কি সেই মানুষ?

তার আসল বাবা?

কিন্তু ছবিতে নীলার বাবার হাতে শিশুটি কেন?

আর নীলার বাবা কেন তাকে এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন?

হঠাৎ সুড়ঙ্গের বাইরে একটা শব্দ হলো।

ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।

দরজার ওপাশে কেউ যেন হাঁটছে।

“নীলা?”

কোনও উত্তর নেই।

সে দরজার কাছে গেল।

কান পেতে শুনল।

নীরবতা।

তারপর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ—

“ঋদ্ধি…”

নীলার গলা।

ঋদ্ধি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

নীলা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে।

তার কপালে সামান্য রক্ত।

কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে।

“তুমি ঠিক আছ?”

ঋদ্ধি ছুটে গেল।

নীলা মাথা নাড়ল।

“আমি ঠিক আছি।”

“গুলিটা?”

“দেয়ালে লেগেছে।”

ঋদ্ধি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“তোমার বাবা?”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“চলে গেছে।”

“কোথায়?”

“জানি না।”

ঋদ্ধি তার হাত ধরে বলল,

“আমাদের এখন এখান থেকে বেরোতে হবে।”

নীলা মাথা নাড়ল।

“না।”

“কেন?”

“কারণ এত বছর আমরা সত্যি থেকে পালিয়েছি। এবার পালালে আর কখনও শেষ হবে না।”

ঋদ্ধি ছবিটা দেখাল।

“এটা কী?”

নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“এটাই সেই রাতের শুরু।”

“১৯৯৮ সালের ১২ জুন?”

“হ্যাঁ।”

“আমার জন্মের রাত?”

নীলা মাথা নাড়ল।

“তোমার জন্মের রাত।”

ঋদ্ধি গভীর শ্বাস নিল।

“সব বলো।”

নীলা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল।

“তোমার মা—মাধবী—অমিতাভ সেনকে ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধি চুপ করে শুনছিল।

“অমিতাভ তখন সাংবাদিক ছিলেন। দুর্নীতি আর বেআইনি জমি দখলের বিরুদ্ধে লিখতেন। তোমার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বহুদিনের।”

“তাহলে?”

“কিন্তু অমিতাভের শত্রু ছিল অনেক।”

নীলা একটু থামল।

“তোমার মায়ের পরিবার সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। পরে পরিস্থিতির চাপে তোমার মা অন্য একজনকে বিয়ে করেন।”

ঋদ্ধি বলল,

“যাকে আমি বাবা বলে জেনেছি।”

“হ্যাঁ।”

“তিনি কি জানতেন আমি অমিতাভের ছেলে?”

“জানতেন।”

“তাহলে আমাকে নিজের ছেলে হিসেবে বড় করলেন কেন?”

নীলা চোখ নামিয়ে বলল,

“প্রথমে তোমার জন্য।”

“আর পরে?”

“পরে ভয় থেকে।”

ঋদ্ধি চুপ করে রইল।

নীলা বলল,

“অমিতাভ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছিলেন। একটা বড় জমি দখল চক্রের বিরুদ্ধে। সেই নথিতে তোমার বাবার নামও ছিল।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“আমার বাবার?”

“হ্যাঁ।”

“তিনি তাহলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?”

“তিনি সরাসরি সবকিছুর পরিকল্পনাকারী ছিলেন না। কিন্তু তিনি এমন কিছু লোকের সঙ্গে কাজ করতেন, যাদের বিরুদ্ধে অমিতাভ প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন।”

“তাহলে অমিতাভ?”

“অমিতাভ সেই প্রমাণ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।”

নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“কিন্তু তার আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।”

ঋদ্ধি বলল,

“মারা গিয়েছিলেন?”

“না।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“তুমি নিশ্চিত?”

নীলা বলল,

“আমি জানি।”

“কীভাবে?”

“কারণ তিনি আমাকে একবার চিঠি লিখেছিলেন।”

ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।

“কোথায় সেই চিঠি?”

নীলা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাম বের করল।

খামটা বহু বছরের পুরোনো।

কাগজের রং হলদে হয়ে গেছে।

ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।

লেখা—

“নীলা, যদি কখনও ঋদ্ধি সত্য জানতে চায়, তাকে বলবে আমি তাকে ছেড়ে যাইনি। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য দূরে আছি।”

ঋদ্ধির চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

চিঠির শেষে লেখা—

“তার জন্মের রাতে যে মানুষটি তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিল, সে একদিন বুঝবে—একটি শিশুকে নিজের সন্তান বলে দাবি করলেই সে তার বাবা হয়ে যায় না।”

ঋদ্ধি চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

“অমিতাভ কোথায়?”

নীলা বলল,

“আমি জানি না।”

“তাহলে এত বছর ধরে তুমি কীভাবে নিশ্চিত ছিলে তিনি বেঁচে আছেন?”

নীলা তার দিকে তাকাল।

“কারণ প্রতি বছর আমার জন্মদিনে কেউ একজন আমার কাছে একটা চিঠি পাঠাত।”

“অমিতাভ?”

“হয়তো।”

“চিঠিগুলো কোথায়?”

“আমার কাছে নেই।”

“কেন?”

নীলা মৃদু হাসল।

“কারণ তোমার বাবা সবগুলো নিয়ে নিয়েছিলেন।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত থেকে একটা শব্দ এল।

লোহার দরজা খোলার শব্দ।

দুজনেই তাকাল।

কেউ আসছে।

নীলা দ্রুত বলল,

“আমাদের যেতে হবে।”

“কোথায়?”

“পুরনো ছাপাখানায়।”

“ছাপাখানা?”

“তোমার বাবার পুরনো ব্যবসা।”

“সেখানে কী আছে?”

“অমিতাভের শেষ প্রমাণ।”


বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে।

নীলা আর ঋদ্ধি নীলকুঠির পেছনের জঙ্গল পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে।

প্রায় আধঘণ্টা পর তারা একটা পরিত্যক্ত ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল।

ভাঙা সাইনবোর্ডে লেখা—

“সেন প্রেস।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে তাকাল।

“এটা কি অমিতাভের?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু এতদিন বন্ধ?”

“প্রায় তিরিশ বছর।”

নীলা একটা ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরে পুরোনো মেশিন।

ধুলো।

ছেঁড়া কাগজ।

আর দেয়ালে পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।

ঋদ্ধি একটা কাটিং তুলে নিল।

শিরোনাম—

“তরুণ সাংবাদিক অমিতাভ সেন নিখোঁজ।”

তার নিচে ছবি।

সেই একই মুখ।

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

“এটা কত বছরের?”

“আটাশ।”

“তাহলে আমার জন্মের আগে।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে অমিতাভ আমাকে চিনতেন কীভাবে?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই একটা শব্দ হলো।

টিক।

তারপর—

টিক।

একটা পুরোনো দেয়ালঘড়ি চলতে শুরু করেছে।

ঘড়িটা এত বছর বন্ধ থাকার কথা।

ঋদ্ধি ঘড়িটার দিকে তাকাল।

কাঁটা থেমে আছে—

রাত ২টা ১৭ মিনিটে।

নীলা বলল,

“তোমার জন্মের সময়।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তুমি কীভাবে জানো?”

“তোমার জন্মসনদে এই সময়টাই লেখা।”

ঘড়ির নিচে একটা ছোট্ট কাঠের তাক।

সেখানে একটা বাক্স।

ঋদ্ধি বাক্সটা নামাল।

ভেতরে একটা ক্যাসেট।

আর একটা চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“ঋদ্ধির জন্য।”

ঋদ্ধির হাত কাঁপতে লাগল।

সে চিঠিটা খুলল।

“ঋদ্ধি,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে সম্ভবত আমি তোমার সামনে নেই।

কিন্তু মনে রেখো—তোমাকে কেউ চুরি করেনি।

তোমাকে কেউ ত্যাগও করেনি।

তোমাকে বাঁচানোর জন্য তোমাকে অন্য নামে বড় হতে হয়েছে।

আমি তোমার বাবা।

আমার নাম অমিতাভ সেন।

তোমার জন্মের রাতে আমি হাসপাতালে ছিলাম।

তোমাকে প্রথমবার কোলে নিয়েছিলাম।

তারপর আমি জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যারা আছে তারা তোমাকে ব্যবহার করে আমাকে চুপ করাতে চায়।

তোমার মাকে নিয়ে আমি পালাতে পারতাম।

কিন্তু তোমাকে নিয়ে পারতাম না।

তাই তোমার মা সিদ্ধান্ত নেন, তুমি অন্য পরিবারের সন্তান হিসেবে বড় হবে।

যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনেছ, সে তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

তার অপরাধ ছিল—সে সত্যিটা লুকিয়েছিল।

কিন্তু তোমার প্রতি তার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না।

তাকে ঘৃণা কোরো না।

একদিন যদি সত্যি জানতে পারো, তাকে বিচার করার আগে মনে রেখো—ভয় মানুষকে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

আর নীলার কথা—

তাকে কখনও ছেড়ে দিও না।

কারণ এই মেয়েটা তোমার বোন নয়।

সে আমার সন্তান নয়।

তাকে ছোটবেলায় তার মা আমার বন্ধু সুশীলের কাছে রেখে যান। সুশীল তাকে নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করেন।

তোমাদের মধ্যে কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই।

যদি কখনও তোমাদের দুজনের পথ আবার এক হয়, তাহলে অতীতের মিথ্যেগুলোকে তোমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে দিও না।

—অমিতাভ।”

ঋদ্ধি চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইল।

তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।

নীলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

“তাহলে…”

ঋদ্ধি মাথা তুলল।

“তুমি আমার বোন নও।”

নীলার চোখেও জল।

“না।”

“তোমার বাবা অমিতাভ নন।”

“না।”

“আমাদের বাবা আলাদা?”

নীলা মৃদু হাসল।

“আমাদের বাবা-মায়ের গল্পও আলাদা।”

ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সাত বছর ধরে যে সম্পর্ককে পাপ ভেবে দুজনেই নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল—

সেটা ছিল একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো।

কিন্তু এখনও একটা প্রশ্ন বাকি।

ঋদ্ধি বলল,

“আমার যে বাবা আমাকে বড় করেছেন?”

নীলা বলল,

“তোমার পালক বাবা।”

“তিনি এখন কোথায়?”

“আমি জানি।”

“কোথায়?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই ছাপাখানার দরজা খুলে গেল।

দুজনেই ঘুরে তাকাল।

দরজায় দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ।

চোখে ক্লান্তি।

চুল সাদা।

হাতে একটা লাঠি।

ঋদ্ধির শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

“বাবা?”

বৃদ্ধ লোকটি মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ।”

ঋদ্ধি তার দিকে এগিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে রইল।

তারপর ঋদ্ধি বলল,

“আপনি বেঁচে আছেন।”

“হ্যাঁ।”

“আপনি আমাকে কেন মিথ্যে বলেছিলেন?”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।

“কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম।”

ঋদ্ধি চুপ।

“আমি অমিতাভকে থামাতে পারিনি। তাকে রক্ষা করতে পারিনি। তোমাকে রক্ষা করার জন্য তোমার পরিচয় বদলেছিলাম।”

“আর নীলাকে?”

বৃদ্ধ নীলার দিকে তাকালেন।

“আমি ওকেও ব্যবহার করেছি।”

নীলা বলল,

“আপনি আমাকে বলেছিলেন ঋদ্ধির কাছ থেকে দূরে থাকতে।”

“হ্যাঁ।”

“বলেছিলেন আমরা ভাই-বোন।”

বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”

ঋদ্ধির গলা কেঁপে উঠল।

“কেন?”

“কারণ আমি জানতাম, তুমি যদি অমিতাভের সত্য জানতে পারো, তাহলে তুমি তাকে খুঁজবে। আর যারা অমিতাভকে শেষ করতে চেয়েছিল, তারা তোমাকে খুঁজে পাবে।”

“তাহলে অমিতাভ কোথায়?”

বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“আমি জানি না।”

ঋদ্ধি অবাক।

“আপনি জানেন না?”

“না।”

“তিনি বেঁচে আছেন?”

“আমি শেষবার তাকে দেখেছিলাম তোমার জন্মের কয়েক মাস পর।”

“কোথায়?”

“রেলস্টেশনে।”

“তারপর?”

“সে চলে গিয়েছিল।”

“কোথায়?”

“আমি জানি না।”

হঠাৎ বৃদ্ধের পকেটের ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

কয়েক সেকেন্ড শুনলেন।

তারপর ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।

তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।

ঋদ্ধি বলল,

“কী হয়েছে?”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“অমিতাভের খবর পাওয়া গেছে।”

ঘর নিস্তব্ধ।

“কোথায়?”

“দক্ষিণের একটা ছোট শহরে।”

“কে খবর দিয়েছে?”

“একজন ডাক্তার।”

নীলা এগিয়ে এল।

“তিনি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“সম্ভবত।”

ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।

এত বছর ধরে যে মানুষটির অস্তিত্ব শুধু চিঠি, ছবি আর স্মৃতিতে ছিল—

তিনি হয়তো সত্যিই বেঁচে আছেন।

কিন্তু তার আগেই আরেকটা কাজ বাকি।

নীলা বলল,

“তোমার পালক বাবা?”

ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।

“আমি তাকে ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না।”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“ক্ষমা চেয়ো না।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“কেন?”

“আগে সত্যিটা বুঝে নাও। তারপর সিদ্ধান্ত নিও।”

ঋদ্ধি কিছু বলল না।

বাইরে তখন বৃষ্টি একটু কমেছে।

ভোরের আলো আকাশে ফুটতে শুরু করেছে।


সকালে তারা নদীর ধারে ফিরে এল।

সেই বৃদ্ধা এখনও সেখানে বসে ছিলেন।

ঋদ্ধি তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।

“আপনি বেঁচে আছেন!”

বৃদ্ধা হাসলেন।

“বলেছিলাম না, যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”

ঋদ্ধি তার পাশে বসে পড়ল।

“আপনি সব জানতেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“সব না। যতটা দরকার ছিল, ততটা।”

“আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছিলেন?”

“কারণ তোমার নিজের গল্প তোমাকেই জানতে হতো।”

“নীলা?”

বৃদ্ধা নীলার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

“ওরও।”

ঋদ্ধি নদীর দিকে তাকাল।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

জলে ভোরের আলো পড়ছে।

নীলা তার পাশে এসে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ দুজনেই কিছু বলল না।

তারপর নীলা ধীরে বলল,

“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”

ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।

“কিসের জন্য?”

“সাত বছর চলে যাওয়ার জন্য।”

“তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি।”

নীলা চোখ নামিয়ে নিল।

“তাহলে?”

ঋদ্ধি মৃদু হাসল।

“তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো?”

ঋদ্ধি উত্তর দিতে একটু সময় নিল।

তারপর বলল,

“সাত বছর ধরে আমি তোমাকে ভুলতে চেষ্টা করেছি।”

“পারোনি?”

“না।”

নীলা মৃদু হেসে বলল,

“আমিও না।”

ঋদ্ধি তার হাত ধরল।

কোনও প্রতিশ্রুতি দিল না।

কোনও বড় কথা বলল না।

শুধু হাতটা ধরে রাখল।

কারণ কখনও কখনও বহু বছরের বিচ্ছেদের পরে মানুষকে নতুন করে ভালোবাসতে হয় না।

শুধু বুঝতে হয়—

ভালোবাসাটা আসলে কোথাও যায়নি।


ছয় মাস পরে।

শহরের একটা ছোট প্রকাশনা সংস্থার অফিস।

ঋদ্ধি জানালার পাশে বসে পুরোনো চিঠিগুলো সাজাচ্ছিল।

তার সামনে একটা খাম।

দক্ষিণের সেই শহর থেকে আসা।

চিঠির ওপর লেখা—

“ঋদ্ধির জন্য।”

সে খাম খুলল।

ভেতরে অমিতাভ সেনের চিঠি।

“ঋদ্ধি,

তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকে আমার একটা আফসোস ছিল—তোমার হাত ধরে হাঁটতে পারিনি।

কিন্তু তোমার জীবনে যারা ছিল, তারা প্রত্যেকে তাদের মতো করে তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে।

তোমার পালক বাবা ভুল করেছে।

তোমার মা ভয় পেয়েছে।

আমি পালিয়ে গেছি।

আর নীলা তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে।

কেউই সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়।

কেউই সম্পূর্ণ দোষীও নয়।

জীবন কখনও সাদা-কালো হয় না।

তুমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচো।

আর যদি কখনও বৃষ্টির দিনে পুরোনো চিঠির গন্ধ পাও, মনে রেখো—

কিছু চিঠি মানুষের কাছে পৌঁছতে অনেক বছর সময় নেয়।

কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা—

তার থেকেও বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারে।

—তোমার বাবা, অমিতাভ সেন।”

ঋদ্ধি চিঠিটা ভাঁজ করল।

জানালার বাইরে তাকাল।

বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

ঠিক সেই সময় নীলা দরজা খুলে ভেতরে এল।

হাতে একটা পুরোনো নীল খাম।

“এটা তোমার জন্য।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,

“আবার চিঠি?”

নীলা হাসল।

“হ্যাঁ।”

“কার?”

“আমার।”

ঋদ্ধি খামটা খুলল।

ভেতরে মাত্র দুটো লাইন—

“সাত বছর অপেক্ষা করেছি। এবার সারাজীবন পাশাপাশি হাঁটতে চাই।”

ঋদ্ধি চিঠিটার দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর নীলার দিকে তাকাল।

জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।

শহর ভিজছে।

আর বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি, ভয়, গোপনীয়তা আর বিচ্ছেদের পরে—

দুজন মানুষ অবশেষে নিজেদের সত্যিটাকে ফিরে পেয়েছে।

সেই দিন ঋদ্ধি বুঝেছিল—

সব চিঠির উত্তর শব্দে দিতে হয় না।

কিছু চিঠির উত্তর হয়—

কারও হাত শক্ত করে ধরে থাকা।

আর কিছু ভালোবাসার শেষ হয় না।

শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার পর—

তার নতুন শুরু হয়।

— সমাপ্ত —

 

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস :: বৃষ্টিভেজা চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব)।।।

দ্বিতীয় পর্ব — নীলকুঠির পথে

রাত তখন সাড়ে দশটা।

শিউলি বাড়ির পেছনের সরু পথ ধরে ঋদ্ধি আর বৃদ্ধা এগিয়ে চলেছে।

বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু চারপাশে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। গাছের পাতায় জমে থাকা জল টুপটাপ করে পড়ছে।

ঋদ্ধির হাতে সেই কাগজ।

“শিউলি নদীর ওপারে, নীলকুঠি।”

নিচে নীলার হাতের লেখা—

“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”

সাত বছর পর প্রথমবার ঋদ্ধির মনে হলো, নীলা হয়তো সত্যিই তার জন্য অপেক্ষা করছে।

কিন্তু তার বাবার কী ভূমিকা?

যে মানুষটাকে সে সাত বছর ধরে মৃত বলে জেনে এসেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে এতদিন কোথায় ছিল?

আর কেনই বা তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?

পেছন থেকে হঠাৎ একটা শব্দ এল।

পাতা মাড়ানোর শব্দ।

ঋদ্ধি ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

“কী হয়েছে?” বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।

“কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।”

বৃদ্ধা থেমে গেলেন।

কিছুক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“হয়তো করছে।”

“আপনি জানেন কে?”

“জানি।”

“কে?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন,

“তুমি যদি সত্যিই নীলাকে খুঁজতে চাও, তাহলে এখন আর পেছনে তাকাবে না।”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“কারণ কিছু মানুষকে সামনে থেকে দেখা যায় না। তাদের ছায়া আগে আসে।”

ঋদ্ধি কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।

তারা এগিয়ে চলল।

প্রায় দশ মিনিট পর একটা ছোট নদীর ধারে পৌঁছল।

বর্ষায় নদী ফুলে উঠেছে।

জলের স্রোত প্রবল।

ওপারে কালো অন্ধকারের মধ্যে একটা পুরনো বাড়ির ছায়া দেখা যাচ্ছে।

বৃদ্ধা বললেন,

“ওটাই নীলকুঠি।”

ঋদ্ধি তাকিয়ে রইল।

বাড়িটা নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।

দোতলা।

দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ ভেঙে পড়েছে।

কিছু জানালায় এখনও কাঠের পাল্লা।

বাড়ির সামনে একটা বিশাল বটগাছ।

“ওখানে নীলা থাকে?”

“থাকত।”

ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।

“থাকত মানে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তুমি গিয়ে নিজেই দেখো।”

নদী পার হওয়ার জন্য একটা ছোট নৌকা বাঁধা ছিল।

ঋদ্ধি নৌকায় উঠল।

বৃদ্ধা বললেন,

“আমি যাব না।”

“কেন?”

“এই গল্পের শেষটা তোমাদের দুজনকেই লিখতে হবে।”

“আপনি ফিরবেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”

ঋদ্ধি চমকে উঠল।

“এমন কথা বলছেন কেন?”

বৃদ্ধা কোনো উত্তর দিলেন না।

নৌকাটা ধীরে ধীরে নদী পার হতে লাগল।

মাঝনদীতে পৌঁছতেই ঋদ্ধি হঠাৎ পেছনে তাকাল।

বৃদ্ধা এখনও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে।

তার পাশে একটা ছায়ামূর্তি।

ঋদ্ধি চোখ কুঁচকে তাকাল।

লোকটা লম্বা।

কালো ছাতা হাতে।

বৃদ্ধা যেন তার সঙ্গে কথা বলছেন।

তারপর হঠাৎ লোকটা ঋদ্ধির দিকে তাকাল।

বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ দেখা গেল।

ঋদ্ধির বুক কেঁপে উঠল।

সে মুখ—

তার বাবার মতো।

নৌকা তখন নদীর ওপারে পৌঁছে গেছে।

ঋদ্ধি দ্রুত নৌকা থেকে নেমে পড়ল।

পেছনে তাকাতে সাহস করল না।


নীলকুঠির দরজা আধখোলা।

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

“নীলা?”

কোনো উত্তর নেই।

বাড়ির ভেতর অন্ধকার।

দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে।

মেঝেতে শুকনো পাতা।

একটা পুরনো কাঠের সিঁড়ি দোতলার দিকে উঠে গেছে।

ঋদ্ধি আবার ডাকল—

“নীলা?”

হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা গানের সুর ভেসে এল।

খুব আস্তে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত।

ঋদ্ধি গানটা চিনতে পারল।

এই গানটা নীলা প্রায়ই গাইত।

সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।

দোতলার শেষ ঘরের দরজা খোলা।

ভেতরে একটা মেয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।

লম্বা চুল।

নীল শাড়ি।

বাইরে বৃষ্টি।

ঋদ্ধির পা থেমে গেল।

“নীলা…”

মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন সাত বছর জমে থাকা সব কথা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।

নীলা।

একই চোখ।

একই হাসি।

শুধু মুখে এখন একটা গভীর ক্লান্তি।

নীলা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“তুমি এসেছ।”

ঋদ্ধির চোখ ভিজে গেল।

“তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।”

নীলা চুপ।

“কেন?”

“কারণ আমাকে যেতে হয়েছিল।”

“আমাকে একটা কথাও বলোনি।”

“বললে তুমি যেতে দিতে না।”

“আমি তোমাকে যেতে দিতাম না।”

“জানি।”

“তাহলে?”

নীলা ধীরে ধীরে তার কাছে এল।

“তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম না?”

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,

“আমি সাত বছর ধরে নিজেকে এই প্রশ্নটাই করেছি।”

নীলা তার চোখের দিকে তাকাল।

“আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।”

ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করল।

সাত বছর ধরে বুকের মধ্যে চাপা থাকা একটা ব্যথা যেন হঠাৎ জেগে উঠল।

“তাহলে কেন?”

নীলা বলল,

“তোমার বাবা।”

ঋদ্ধি চোখ খুলল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“তিনি আমাকে কী করেছিলেন?”

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর একটা পুরনো কাঠের বাক্স খুলল।

ভেতরে বেশ কয়েকটা চিঠি।

নীলা একটা চিঠি ঋদ্ধির হাতে দিল।

“এটা তোমার বাবার লেখা।”

ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।

প্রথম লাইন—

“নীলা, যদি তুমি ঋদ্ধিকে ভালোবাসো, তাহলে তাকে কখনও সত্যিটা বলবে না।”

ঋদ্ধির চোখ স্থির হয়ে গেল।

“এটা কবে লেখা?”

“তোমার যাওয়ার তিন মাস আগে।”

“কেন?”

“পড়ো।”

চিঠিতে লেখা—

“ঋদ্ধি আমার ছেলে নয়।”

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

চিঠি পড়া বন্ধ হয়ে গেল।

“এটা মিথ্যে।”

নীলা চুপ।

“এটা মিথ্যে, তাই তো?”

নীলা ধীরে বলল,

“তোমার বাবা নিজেই লিখেছেন।”

“তাহলে আমার বাবা কে?”

নীলা উত্তর দিল না।

ঋদ্ধি চিৎকার করে উঠল,

“কে আমার বাবা?”

নীলা বলল,

“নীলার বাবা।”

ঋদ্ধি স্থির হয়ে গেল।

“মানে?”

“তোমার আর আমার জন্মের গল্প এক নয়।”

“তাহলে?”

নীলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“তোমার মা আর আমার বাবা একসময় একে অপরকে ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধির মাথা ঘুরে উঠল।

“কী বলছ?”

“তোমার মা যখন তোমার জন্ম দিতে চলেছেন, তখন আমার বাবা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন।”

“কিন্তু আমার বাবা?”

“তখন তিনি তোমার মায়ের স্বামী ছিলেন না।”

ঋদ্ধি কিছুই বুঝতে পারছিল না।

নীলা বলল,

“তোমার জন্মের পর তোমার মা তোমাকে নিয়ে চলে যান। পরে তোমার বাবার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।”

“তাহলে আমার জৈবিক বাবা—”

“আমার বাবা।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা।

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে বসে পড়ল।

“তাহলে তুমি…”

“হ্যাঁ।”

নীলা চোখ নামিয়ে বলল,

“আমি তোমার সৎবোন নই।”

ঋদ্ধি তাকাল।

“তুমি আমার বোন?”

“না।”

“তাহলে?”

নীলা কাঁপা গলায় বলল,

“আমরা একই বাবার সন্তান।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“না।”

“ঋদ্ধি—”

“না!”

সে পিছিয়ে গেল।

“এটা হতে পারে না।”

“আমি জানি।”

“তাহলে তুমি আমাকে এতদিন ভালোবাসার কথা বললে কীভাবে?”

নীলার চোখে জল।

“কারণ আমি এই সত্যিটা তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে জানতাম না।”

“কখন জানতে?”

“যেদিন তুমি আমাকে সেই চিঠিটা দিয়েছিলে।”

“কোন চিঠি?”

“যেটা তুমি পাঠাওনি।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ।

নীলা বলল,

“তোমার বাবা সেটা আমাকে দিয়েছিলেন।”

“তারপর?”

“তিনি বলেছিলেন—যদি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাহলে আমাকে তোমার জীবন থেকে চলে যেতে হবে।”

ঋদ্ধির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি চলে গেলে।”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তুমি আমাকে সত্যিটা বলতে পারতে।”

“পারতাম না।”

“কেন?”

নীলা বলল,

“কারণ তোমার বাবা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিলেন।”

“কী শর্ত?”

“আমি যদি সত্যিটা বলি, তাহলে তিনি তোমার মাকে মেরে ফেলবেন।”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

“আমার মা?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু মা তো—”

“তোমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”

ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।

“কোথায়?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

ধাম!

নীলা হঠাৎ চুপ করে গেল।

“ও এসেছে।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“কে?”

“তোমার বাবা।”

“তিনি এখানে?”

নীলা জানালার বাইরে তাকাল।

“হ্যাঁ।”

নিচ থেকে পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল—

“নীলা।”

ঋদ্ধির শরীর কেঁপে উঠল।

সেই কণ্ঠ সে চেনে।

তার বাবা।

“আমি জানি ঋদ্ধি এসেছে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—

“তাকে নিয়ে নিচে এসো।”

নীলা ঋদ্ধির হাত ধরল।

“পেছনের ঘরে যাও।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা শুধু তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি।”

“তাহলে?”

নীলা ফিসফিস করে বলল,

“সে তোমাকে মেরে ফেলতে এসেছে।”

ঋদ্ধির বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।

“কেন?”

নীলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ তুমি তোমার বাবার ছেলে নও।”

“আমি জানি।”

“না।”

নীলা মাথা নাড়ল।

“তুমি জানো না।”

“তাহলে?”

“তুমি তার শত্রুর ছেলে।”

ঋদ্ধি স্তব্ধ।

“কোন শত্রু?”

নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে গুলির শব্দ হলো।

ধাঁই!

দুজনেই চমকে উঠল।

নীলা দ্রুত আলো নিভিয়ে দিল।

বাইরে বৃষ্টি।

ঘরের মধ্যে অন্ধকার।

নিচ থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ উঠছে।

এক ধাপ।

দুই ধাপ।

তিন ধাপ।

তারপর সেই কণ্ঠ—

“ঋদ্ধি…”

“আমি জানি তুমি ওপরে আছ।”

পায়ের শব্দ আরও কাছে।

নীলা ঋদ্ধিকে একটা গোপন দরজার সামনে নিয়ে গেল।

“এর ভেতরে যাও।”

“তুমি?”

“আমি আসছি।”

“না, আমি তোমাকে রেখে যাব না।”

নীলা তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,

“সাত বছর আগে তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম। এবার আর যাব না।”

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থেমে গেল।

কেউ দরজার হাতলে হাত রাখল।

নীলা ঋদ্ধিকে ভেতরে ঠেলে দিল।

দরজা বন্ধ করার আগে সে ফিসফিস করে বলল—

“তোমার আসল বাবার নাম অমিতাভ সেন।”

ঋদ্ধি থমকে গেল।

এই নামটা সে চেনে।

তার মায়ের পুরনো ডায়েরিতে এই নামটা ছিল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

বাইরে দাঁড়িয়ে নীলা।

আর দরজার ওপাশে—

তার বাবা।

ঋদ্ধি অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল—

তার বাবার কণ্ঠ,

“নীলা, শেষবারের মতো বলছি। ছেলেটাকে আমার হাতে দাও।”

নীলার উত্তর—

“না।”

তারপর—

একটা গুলির শব্দ।

ঋদ্ধি দরজা খুলতে ছুটে গেল।

কিন্তু তার আগেই সুড়ঙ্গের ভেতর কোথা থেকে একটা আলো জ্বলে উঠল।

সামনে দেয়ালে লেখা—

“অমিতাভ সেনের সত্য জানতে হলে নিজের জন্মের রাতটা মনে করো।”

আর তার নিচে একটা পুরনো ছবি।

ছবিতে—

একজন যুবক।

একজন মহিলা।

একটা নবজাতক শিশু।

আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে—

নীলার বাবা।

ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল—

তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা এবার খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু সেই দরজার ওপারে যে সত্যি আছে—

তা হয়তো তার ভালোবাসার থেকেও বড়।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : বৃষ্টিভেজা চিঠি (প্রথম পর্ব)।

প্রথম পর্ব — যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি

শহরটা বৃষ্টিতে ভিজছিল।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ। সারাদিনের গরমের পর সন্ধ্যা নামতেই আকাশ কালো হয়ে এসেছিল। তারপর হঠাৎ এমন বৃষ্টি নামল, যেন আকাশের বহুদিনের জমে থাকা অভিমান একসঙ্গে ঝরে পড়ছে।

কলকাতার পুরনো উত্তর শহরের সরু গলিগুলো জলমগ্ন।

রাস্তার দু’পাশের বাড়িগুলোর পুরনো দেওয়াল বেয়ে জল নামছে। কোথাও জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা, কোথাও বারান্দায় ভেজা জামাকাপড় বাতাসে দুলছে।

সেই বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা মাথায় নিয়ে হাঁটছিল ঋদ্ধি।

বয়স আটাশ।

হাতে একটা পুরনো বাদামি রঙের ব্যাগ।

ব্যাগের ভেতর কয়েকটা বই, একটা নোটবুক, একটা কলম আর একটা চিঠি।

চিঠিটা তার নিজের লেখা।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—

চিঠিটা সে কখনও পাঠায়নি।

আর আজ, সাত বছর পর, সেই চিঠিটাই তাকে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটা বাড়ির সামনে, যেখানে যাওয়ার কথা সে কোনোদিন ভাবেনি।

বাড়িটার নাম—

শিউলি বাড়ি।

ঋদ্ধি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

লোহার গেটের গায়ে মরচে।

উপরে একটা ছোট্ট ফলক—

৪৭/বি, শিউলি লেন।

ঋদ্ধি গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।

বাড়িটা অদ্ভুত সুন্দর।

পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি।

সামনে একটা শিউলি গাছ।

বর্ষার কারণে ফুল নেই, কিন্তু গাছটার নিচে সাদা ফুলের শুকনো পাপড়ি জমে আছে।

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দরজায় কড়া নাড়ল।

একবার।

দু’বার।

তৃতীয়বার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা।

সাদা শাড়ি।

চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।

বৃদ্ধা ঋদ্ধির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি ঋদ্ধি?”

ঋদ্ধি অবাক হয়ে গেল।

“আপনি আমার নাম জানেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“তোমাকে দেখতে অনেকটা তোমার বাবার মতো হয়েছে।”

ঋদ্ধির মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”

“চিনতাম।”

“কীভাবে?”

বৃদ্ধা দরজা আরও খুলে দিলেন।

“ভেতরে এসো। অনেক কথা বলার আছে।”

ঋদ্ধি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢুকে পড়ল।


সাত বছর আগে।

তখন ঋদ্ধির বয়স একুশ।

কলেজের শেষ বছর।

সেই সময় তার জীবনে এসেছিল নীলা।

নীলা ছিল তার সহপাঠী নয়।

একই পাড়ায় থাকত।

প্রথম দেখা হয়েছিল বইয়ের দোকানে।

ঋদ্ধি একটা পুরনো উপন্যাস খুঁজছিল।

দোকানের শেষ তাক থেকে একটা বই নামাতে গিয়ে তার হাত আরেকজনের হাতের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল।

ঋদ্ধি বলেছিল,

“সরি।”

মেয়েটি বলেছিল,

“আপনি আগে নিন।”

“না, আপনি নিন।”

“কিন্তু বইটা আমি আগে ধরেছি।”

ঋদ্ধি হেসেছিল।

“তাহলে তো আপনি জিতে গেলেন।”

মেয়েটিও হেসেছিল।

সেই হাসিটা ঋদ্ধির মনে থেকে গিয়েছিল।

মেয়েটার নাম—

নীলা।

নীলার সঙ্গে পরিচয় বাড়তে সময় লাগেনি।

প্রথমে বই নিয়ে কথা।

তারপর সিনেমা।

তারপর গান।

তারপর বৃষ্টি।

তারপর—

ভালোবাসা।

ঋদ্ধি কখন যে নীলাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে নিজেও জানত না।

নীলাও তাকে ভালোবাসত।

কিন্তু তাদের ভালোবাসায় একটা অদ্ভুত সমস্যা ছিল।

নীলা নিজের পরিবার সম্পর্কে খুব কম কথা বলত।

বিশেষ করে তার বাবা সম্পর্কে।

একদিন ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করেছিল,

“তোমার বাবা কী করেন?”

নীলা চুপ করে গিয়েছিল।

অনেকক্ষণ পর বলেছিল,

“আমার বাবা নেই।”

“মানে?”

“তিনি মারা গেছেন।”

“কবে?”

নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,

“অনেক বছর আগে।”

ঋদ্ধি আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

কিন্তু কয়েকদিন পর সে জানতে পেরেছিল—

নীলার বাবা মারা যাননি।

তিনি নিখোঁজ।

সতেরো বছর আগে।

তারপর আর কোনো খবর নেই।

নীলার মা এই বিষয় নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন না।

ঋদ্ধি তখনও বুঝতে পারেনি, এই নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে তার নিজের পরিবারের একটা সম্পর্ক আছে।


বৃদ্ধা একটা কাঠের চেয়ার দেখিয়ে বললেন,

“বসো।”

ঋদ্ধি বসে পড়ল।

বৃদ্ধা সামনে এসে একটা পুরনো অ্যালবাম রাখলেন।

“এটা তোমার জন্য।”

ঋদ্ধি অ্যালবাম খুলল।

প্রথম কয়েকটা পাতায় পুরনো ছবি।

একটা পরিবার।

একটা ছোট মেয়ে।

একজন যুবক।

আর—

ঋদ্ধির বাবা।

ঋদ্ধির হাত থেমে গেল।

“এটা কী?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার বাবা আর নীলার বাবা একসঙ্গে কাজ করতেন।”

“কোথায়?”

“একটা প্রকাশনা সংস্থায়।”

ঋদ্ধি ছবিগুলো উল্টাতে লাগল।

একটা ছবিতে তার বাবা আর আরেকজন যুবক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

পেছনে লেখা—

“শারদীয়া পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগ — ২০০৫।”

ঋদ্ধি ধীরে বলল,

“নীলার বাবা কি লেখক ছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন?”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তোমাকে এখানে ডেকেছি।”

ঋদ্ধি চমকে তাকাল।

“আপনি আমাকে ডেকেছেন?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আমি তো—”

বৃদ্ধা তাকে থামিয়ে দিলেন।

“তুমি ভাবছ, তুমি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছ?”

ঋদ্ধি চুপ।

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার কাছে যে চিঠিটা আছে, সেটা দেখাও।”

ঋদ্ধির বুক ধক করে উঠল।

সে ব্যাগ খুলল।

চিঠিটা বের করল।

সাদা কাগজ।

সাত বছর পুরনো।

চিঠির ওপর লেখা—

“নীলার জন্য।”

কিন্তু চিঠিটা কখনও নীলার হাতে পৌঁছায়নি।

কারণ যেদিন ঋদ্ধি চিঠিটা লিখেছিল, সেদিনই নীলা হঠাৎ শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

কোনো বিদায় নেই।

কোনো ফোন নেই।

কোনো মেসেজ নেই।

শুধু একটা ছোট্ট কাগজ রেখে গিয়েছিল—

“আমাকে খুঁজো না।”

ঋদ্ধি চিঠিটা কখনও পাঠায়নি।

সাত বছর ধরে নিজের কাছে রেখেছিল।

আজ সকালে তার বাড়িতে একটা খাম এসেছিল।

খামের ভেতর ছিল একটা মাত্র লাইন—

“যে চিঠি তুমি পাঠাওনি, তার উত্তর জানতে চাইলে শিউলি বাড়িতে এসো।”

নিচে কোনো নাম ছিল না।

ঋদ্ধি বৃদ্ধার দিকে তাকাল।

“আপনি এই চিঠি সম্পর্কে কীভাবে জানেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কারণ চিঠিটা নীলার কাছে পৌঁছেছিল।”

ঋদ্ধি যেন শুনতেই পেল না।

“কী?”

“তুমি চিঠিটা পাঠাওনি। কিন্তু সেটা তার কাছে গিয়েছিল।”

“কে দিয়েছিল?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার বাবা।”

ঋদ্ধি উঠে দাঁড়াল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু তিনি তো জানতেনই না যে আমি নীলাকে ভালোবাসি।”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

“তুমি যতটা ভাবো, তোমার বাবা তার চেয়ে অনেক বেশি জানতেন।”

ঋদ্ধির মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।

“আমার বাবা নীলাকে চিনতেন?”

“খুব ভালো করে।”

“কী সম্পর্ক ছিল?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।

তিনি অ্যালবামের একটা ছবি খুলে দেখালেন।

ছবিতে নীলার বাবা, ঋদ্ধির বাবা এবং আরেকজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

মহিলার কোলে ছোট্ট নীলা।

ছবির পেছনে লেখা—

“আমাদের তিনজনের গোপন চুক্তির দিন।”

ঋদ্ধি বলল,

“তিনজন?”

“হ্যাঁ।”

“তৃতীয় মানুষটি কে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তোমার মা।”

ঋদ্ধির বুক কেঁপে উঠল।

“আমার মা?”

“তোমার বাবা, তোমার মা আর নীলার বাবা—তিনজন মিলে একটা গোপন বিষয় লুকিয়ে রেখেছিলেন।”

“কী বিষয়?”

বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।

“সেটা জানতে হলে তোমাকে ওপরের ঘরে যেতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ সেই ঘরটা তোমার মায়ের।”

ঋদ্ধি ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোল।

প্রতিটি ধাপে পায়ের শব্দ হচ্ছে।

পুরনো বাড়ি।

দেয়ালে পুরনো ছবি।

একটা ছবির সামনে এসে সে থেমে গেল।

ছবিতে তার মা।

কিন্তু তার পাশে—

নীলা।

ছোট্ট নীলা।

ঋদ্ধি অবাক হয়ে গেল।

“এটা কবে?”

বৃদ্ধা বললেন,

“তুমি জন্মানোর অনেক আগে।”

“আমার মা নীলাকে চিনতেন?”

“শুধু চিনতেন না।”

বৃদ্ধা নিচু গলায় বললেন,

“তিনি নীলাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন।”

ঋদ্ধি আর কিছু বলতে পারল না।

দোতলার একটা ঘরের সামনে এসে বৃদ্ধা থামলেন।

“এই ঘরে ঢুকো।”

দরজা খুলতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ।

একটা কাঠের টেবিল।

একটা আলমারি।

জানালার পাশে একটা চেয়ার।

সবকিছুর ওপর ধুলো।

ঋদ্ধি টেবিলের কাছে গেল।

সেখানে একটা ডায়েরি রাখা।

ডায়েরির ওপর তার মায়ের নাম।

“মাধুরী সেন।”

ঋদ্ধি ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা সাধারণ কথা।

তারপর একটা তারিখ—

১২ আগস্ট, ২০০৫।

নিচে লেখা—

“আজ আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নীলাকে সত্যিটা জানানো যাবে না।”

ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।

পরের পৃষ্ঠা—

“অরুণ বলছে, একদিন সত্যি প্রকাশ করতেই হবে। কিন্তু এখন নয়।”

অরুণ—

তার বাবার নাম।

আরেক পৃষ্ঠা—

“নীলার বাবার কাছে যে চিঠিগুলো আছে, সেগুলো যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে শুধু আমাদের নয়, ঋদ্ধির জীবনও বিপদে পড়বে।”

ঋদ্ধি হঠাৎ ডায়েরি বন্ধ করে দিল।

তার বুক ধড়ফড় করছে।

“আমার জীবন কেন বিপদে পড়বে?”

বৃদ্ধা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তিনি বললেন,

“কারণ তুমি সেই রহস্যের উত্তরাধিকারী।”

“কীসের?”

“একটা সত্যির।”

“কোন সত্যি?”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বললেন,

“নীলার বাবা নিখোঁজ হননি।”

ঋদ্ধি স্থির হয়ে গেল।

“তাহলে?”

“তাকে নিখোঁজ করা হয়েছিল।”

“কে?”

বৃদ্ধা জানালার বাইরে তাকালেন।

“যে মানুষটা গত সাত বছর ধরে তোমাকে নজরে রেখেছে।”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।

“কে?”

বৃদ্ধা এবার তার দিকে তাকালেন।

“তোমার নিজের বাবা।”

ঋদ্ধি পিছিয়ে গেল।

“অসম্ভব।”

“তোমার বাবা সাত বছর আগে মারা যাননি।”

ঋদ্ধির মুখ সাদা হয়ে গেল।

“কিন্তু… আমার বাবা তো—”

“যে মানুষটাকে তুমি মৃত ভেবেছ, সে এখনও বেঁচে আছে।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি কীভাবে জানেন?”

বৃদ্ধা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে একটা শব্দ এল।

ঠক।

তারপর আরেকটা।

ঠক।

কেউ দরজায় কড়া নাড়ছে।

বৃদ্ধা হঠাৎ ভয় পেয়ে গেলেন।

“ও এসে গেছে।”

“কে?”

বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,

“যাকে তুমি এতদিন মৃত বলে জানো।”

ঋদ্ধি সিঁড়ির দিকে তাকাল।

নিচে অন্ধকার।

দরজায় আবার শব্দ।

ঠক।

ঠক।

তারপর একটা পুরুষের কণ্ঠ—

“মাধুরী…”

ঋদ্ধির শরীর অবশ হয়ে গেল।

এই কণ্ঠ সে চেনে।

শৈশবের অসংখ্য রাত থেকে চেনে।

তার বাবার কণ্ঠ।

কিন্তু তার বাবা তো—

সাত বছর আগে মারা গেছেন।

নিচ থেকে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

“দরজা খোলো।”

ঋদ্ধি বৃদ্ধার দিকে তাকাল।

বৃদ্ধা ঠোঁটে আঙুল রাখলেন।

তারপর ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলে দিলেন।

শেষ পাতায় মাত্র একটা বাক্য—

“ঋদ্ধি যদি কখনও জানতে পারে তার বাবা বেঁচে আছেন, তাকে নীলার কাছে পাঠিও। কারণ সত্যিটা একমাত্র নীলাই জানে।”

ঋদ্ধির বুকের মধ্যে ঝড় বয়ে গেল।

নীলা বেঁচে আছে?

সাত বছর ধরে যার কোনো খবর নেই—

সে কি সত্যিই কোথাও আছে?

আর যদি থাকে—

তাহলে কেন তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল?

নিচে দরজায় এবার প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।

ধাম!

বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন,

“পেছনের দরজা দিয়ে বেরোতে হবে।”

ঋদ্ধি বলল,

“নীলা কোথায়?”

বৃদ্ধা উত্তর দিলেন—

“যেখানে তোমার পাঠানো সেই চিঠির শেষ লাইনটা লেখা হয়েছিল।”

“কোথায়?”

বৃদ্ধা একটা কাগজ তার হাতে দিলেন।

কাগজে একটা ঠিকানা।

ঋদ্ধি পড়ল—

“শিউলি নদীর ওপারে, নীলকুঠি।”

তারপর নিচে লেখা—

“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”

আর লেখাটা—

নীলার হাতের লেখা।

ঋদ্ধি কাগজটা শক্ত করে ধরে দরজার দিকে তাকাল।

নিচে তখন কেউ চিৎকার করছে—

“ঋদ্ধি! আমি জানি তুমি ভেতরে আছ!”

কণ্ঠটা তার বাবার।

কিন্তু এবার সেই কণ্ঠে একটা অদ্ভুত হাসি।

ঋদ্ধি বুঝতে পারল—

সাত বছর আগে যে গল্পটা শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে সে ভেবেছিল,

সেটা আসলে সেদিনই শুরু হয়েছিল।

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব )।

তৃতীয় পর্ব — যে ফিরে এসেছিল

“তোমার নাম অর্ণব। আর আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগে তুমি এই বাড়িতে মারা গিয়েছিলে।”

মেঘলার কথাটা যেন ঘরের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বারবার ফিরে আসছিল।

অর্ণব।

মারা গিয়েছিল।

পঁচিশ বছর আগে।

অর্ক কিছুতেই কথাগুলোর অর্থ মিলিয়ে নিতে পারছিল না।

সে মেঘলার হাতটা সরিয়ে দিল।

“এসব কী বলছ তুমি?”

মেঘলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“আমার নাম অর্ক। আমার জন্ম—”

“তোমার জন্মের কথা তুমি নিজে জানো?”

প্রশ্নটা শুনে অর্ক থেমে গেল।

মেঘলা ধীরে ধীরে বলল,

“তুমি তোমার জন্মের কোনো স্মৃতি মনে করতে পারো?”

অর্ক উত্তর দিতে পারল না।

“তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে তোমার ছোটবেলার কোনো ছবি আছে?”

অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।

“আছে।”

“কোথায়?”

অর্ক চোখ নামিয়ে নিল।

তার নিজের কাছেই উত্তরটা পরিষ্কার নয়।

তার কাছে শৈশবের কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি ছাড়া তেমন কিছু নেই। সে জানে তার বাবা-মা তাকে বড় করেছেন। জানে ছোটবেলায় তারা শহরের অন্য প্রান্তে থাকতেন। কিন্তু তার জন্ম কোথায়—সে কখনও ভেবে দেখেনি।

মেঘলা বলল,

“কারণ তোমার জীবনটা যেভাবে তুমি জানো, তার অনেকটাই তোমাকে বলা হয়েছে।”

“কে বলেছে?”

“যারা চেয়েছিল তুমি সত্যিটা কখনও জানতে না পারো।”

অর্ক এবার রেগে গেল।

“তাহলে সত্যিটা বলো!”

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে আগুন লেগেছিল।”

“আমি জানি না।”

“তখন তোমার বয়স ছিল পাঁচ।”

“আর তুমি?”

“আমি চার।”

অর্ক স্তব্ধ।

“আমরা ভাই-বোন ছিলাম না,” মেঘলা বলল। “কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিলাম।”

অর্ক আয়নার দিকে তাকাল।

সেই ছোট ছেলেটার মুখ এখনও তার চোখে ভাসছে।

“তারপর আগুন লাগল?”

“হ্যাঁ।”

“আমি মারা গেলাম?”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

“সবাই তাই ভেবেছিল।”

“তাহলে আমি বেঁচে গেলাম কীভাবে?”

মেঘলা এবার জানালার দিকে তাকাল।

বৃষ্টির ফোঁটা কাচ বেয়ে নেমে আসছে।

“তোমাকে কেউ বাড়ির পেছনের গোপন দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে গিয়েছিল।”

“কে?”

মেঘলা উত্তর দিল না।

“কে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল?”

মেঘলা বলল,

“আমার বাবা।”

অর্ক চমকে উঠল।

“তোমার বাবা?”

“যাকে তুমি তিন বছর আগে আমার বাবা বলে চিনেছিলে।”

অর্কের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“কিন্তু তুমি বলেছিলে তিনি তোমার বাবা নন।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে?”

“তিনি আমার কাকা ছিলেন।”

ঘরটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল।

মেঘলা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—

“আমাদের বাবা-মায়েরা মারা যাওয়ার পর তিনি আমাকে নিয়ে চলে যান। তোমাকেও নিয়ে যান। কিন্তু তোমাকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেননি। তোমাকে অন্য এক পরিবারের কাছে দিয়ে দেন।”

“কেন?”

“কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন।”

“কিসের?”

“এই বাড়ির।”

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল,

“একটা বাড়িকে মানুষ ভয় পায় কেন?”

মেঘলা এবার আয়নার দিকে তাকাল।

“কারণ এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।”

“কী ঘটনা?”

“আগুন লাগার আগের রাতে আমাদের বাবা একটা ঘড়ি পেয়েছিলেন।”

অর্ক থমকে গেল।

“ঘড়ি?”

“পুরনো একটা পকেট ঘড়ি। তাতে কাঁটা ছিল না। কিন্তু সেটা সবসময় টিকটিক করত।”

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

ঘরের কোথাও আবার টিকটিক শব্দ শোনা গেল।

টিক…

টিক…

টিক…

মেঘলা বলল,

“আগুন লাগার পর থেকে ঘড়িটা আর কখনও থামেনি।”

“ঘড়িটা কোথায়?”

মেঘলা ঘরের এক কোণে ইশারা করল।

সেখানে একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

অর্ক বাক্সটার কাছে গেল।

ঢাকনা খুলতেই তার ভেতর থেকে একটা কালো পকেট ঘড়ি বেরিয়ে এল।

ঘড়িতে কোনো কাঁটা নেই।

তবু—

টিক…

টিক…

টিক…

অর্ক ঘড়িটা হাতে নিতেই মাথার ভেতর একটা তীব্র ব্যথা শুরু হলো।

তারপর—

একটা স্মৃতি।

সে ছোট।

বয়স পাঁচ।

তার সামনে মেঘলা দাঁড়িয়ে।

মেঘলা কাঁদছে।

“অর্ণব, তাড়াতাড়ি!”

“কোথায় যাব?”

“কাকা বলেছে পেছনের দরজা দিয়ে যেতে।”

“তুমি যাবে?”

“আমি আসছি।”

“মিথ্যে বলছ!”

“না।”

তারপর আগুন।

একজন পুরুষের চিৎকার—

“মেঘলা! অর্ণবকে নিয়ে যাও!”

তারপর—

একটা বিস্ফোরণের শব্দ।

অন্ধকার।

অর্ক হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল।

ঘড়িটা তার হাত থেকে পড়ে গেল।

সে হাঁপাতে লাগল।

মেঘলা তাকে ধরে ফেলল।

“তুমি মনে করতে পেরেছ?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“আমি… আমি এখানে ছিলাম।”

“হ্যাঁ।”

“তুমি ছিলে।”

“হ্যাঁ।”

“তারপর?”

মেঘলা চুপ।

“তারপর কী হয়েছিল?”

মেঘলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলে।”

“আমি?”

“না। তোমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“কে নিয়ে গিয়েছিল?”

মেঘলা বলল,

“যে মানুষটাকে তুমি এতদিন তোমার বাবা বলে জেনেছ।”

অর্কের বুকের মধ্যে যেন কিছু ভেঙে পড়ল।

“আমার বাবা?”

“তিনি তোমার আসল বাবা ছিলেন না।”

“তাহলে আমার আসল বাবা?”

মেঘলা উত্তর দিল,

“তিনি এই বাড়ির আগুনে মারা যান।”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

“আর আমার মা?”

“তিনিও।”

ঘরে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

শুধু বাইরে বৃষ্টি।

তারপর অর্ক ধীরে ধীরে বলল,

“তাহলে এত বছর আমাকে মিথ্যে বলা হয়েছে?”

মেঘলা বলল,

“তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

“কিসের হাত থেকে?”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“যে মানুষ আগুন লাগিয়েছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কে?”

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

ধাম!

দুজনেই চমকে উঠল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল,

“সে এসেছে।”

“কে?”

“যে আমাদের খুঁজে বের করেছে।”

পায়ের শব্দ।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে কেউ ওপরে উঠছে।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মেঘলা অর্কের হাত ধরে বলল,

“লুকোতে হবে।”

“কোথায়?”

“এই ঘরের পেছনে।”

দুজনেই একটা পুরনো কাঠের আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

পায়ের শব্দ আরও কাছে এল।

তারপর দরজা খুলল।

একজন বৃদ্ধ ঘরে ঢুকলেন।

অর্ক তাকে দেখে জমে গেল।

সে লোকটাকে চিনতে পারছে না।

কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত একটা পরিচিতি।

বৃদ্ধ ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।

তার হাতে একটা লণ্ঠন।

তিনি চারপাশে তাকালেন।

“মেঘলা?”

কোনো উত্তর নেই।

“আমি জানি তুমি এখানে।”

মেঘলা অর্কের হাত শক্ত করে ধরে রইল।

বৃদ্ধ এবার আয়নার সামনে গেলেন।

আয়নায় তাকিয়ে বললেন,

“অর্ণব ফিরে এসেছে।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে হাসলেন।

“পঁচিশ বছর পর।”

মেঘলা আর থাকতে পারল না।

সে আলমারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।

“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি জানো কেন।”

“ওকে আর ছুঁবেন না।”

“আমি ওকে ছুঁতে আসিনি।”

“তাহলে?”

বৃদ্ধ অর্কের দিকে তাকালেন।

“আমি সত্যিটা শেষ করতে এসেছি।”

অর্ক সামনে এগিয়ে এল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে আগুনের রাত থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল।”

অর্ক স্তব্ধ।

“আপনি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমার বাবা-মা…”

বৃদ্ধ চোখ নামিয়ে বললেন,

“তোমার বাবা-মা আগুনে মারা যাননি।”

অর্কের চোখ বড় হয়ে গেল।

“কী?”

মেঘলাও যেন প্রথমবার কথাটা শুনল।

“আপনি কী বলছেন?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আগুনটা ছিল সাজানো।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন, যেটা অনেক মানুষের জন্য বিপজ্জনক ছিল।”

অর্ক বলল,

“কী জিনিস?”

বৃদ্ধ বললেন,

“একটা পুরনো নথি।”

“কিসের নথি?”

“নির্ভয়পুরের জমি, পাহাড় আর সেই পাহাড়ের নিচে থাকা খনিজ সম্পদের নথি।”

অর্ক কিছু বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমার বাবা জানতে পেরেছিলেন, বহু বছর ধরে একটা বড় চক্র বেআইনিভাবে পাহাড়ের জমি দখল করছে। তিনি প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। সেই প্রমাণের একটা অংশ ছিল এই বাড়িতে।”

“আর আগুন?”

“প্রমাণ নষ্ট করার জন্য।”

মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,

“তাহলে অর্ণবকে কেন বাঁচানো হয়েছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“কারণ তোমার বাবা জানতেন, প্রমাণের শেষ অংশটা কোথায় আছে—শুধু অর্ণব জানে।”

অর্কের মাথা ঘুরে উঠল।

“আমি?”

“তুমি ছোট ছিলে। কিন্তু তোমার বাবা শেষ মুহূর্তে তোমাকে একটা কথা বলেছিলেন।”

“কী কথা?”

বৃদ্ধ বললেন,

“তিনি বলেছিলেন—‘ঘড়ির নিচে যা আছে, অর্ণব একদিন সেটা খুঁজে পাবে।’”

অর্কের চোখ ঘরের দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে গেল।

ঘড়িটা থেমে আছে ১২টা ০৫ মিনিটে।

সে ধীরে ধীরে ঘড়িটা নামাল।

পেছনে কাঠের একটা গোপন খোপ।

অর্ক হাত ঢোকাতেই একটা ধাতব বাক্স পেল।

বাক্স খুলতেই ভেতরে পুরনো কাগজপত্র।

একটা ছবি।

একটা পেনড্রাইভ।

আর একটা চিঠি।

চিঠিটা খুলতেই অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

প্রথম লাইনে লেখা—

“আমার ছেলে অর্ণবের জন্য।”

অর্ক পড়তে শুরু করল।

“তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর তোমার মা তোমার কাছে থাকব না। কিন্তু মনে রেখো, সত্যিকে কখনও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা যায় না। আমি জানি যারা আমাদের বিরুদ্ধে, তারা একদিন তোমাকে খুঁজবে। তাই তোমাকে দূরে পাঠানো হবে। তুমি তোমার নাম ভুলে যাবে। কিন্তু একদিন মেঘলা তোমাকে খুঁজে নেবে।”

অর্কের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

শেষ লাইনে লেখা—

“আর যদি কখনও ফিরে আসো, মনে রেখো—শেষ ট্রেনটাই তোমাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনবে।”

অর্ক চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

মেঘলা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

“তাহলে তুমি আমাকে সত্যিই খুঁজেছিলে,” অর্ক বলল।

মেঘলা মৃদু হাসল।

“আমি তিন বছর ধরে অপেক্ষা করেছি।”

“কিন্তু তুমি আমাকে এতদিন কেন কিছু বলোনি?”

“কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুমি সত্যিই অর্ণব কি না।”

“তাহলে আজ?”

মেঘলা ঘড়িটার দিকে তাকাল।

“আজ রাত ১২টা ০৫ মিনিটে ঘড়িটা আবার চলেছে।”

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।

কাঁটা নড়ছে।

১২টা ০৬।

১২টা ০৭।

বৃদ্ধ হঠাৎ জানালার দিকে তাকালেন।

“আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ ওরা জেনে গেছে তুমি ফিরে এসেছ।”

দূরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

একটা নয়।

দুইটা।

তারপর আরও কয়েকটা।

মেঘলা বলল,

“পুলিশ?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“না।”

অর্ক জানালার কাছে গেল।

নিচে কয়েকজন লোক গাড়ি থেকে নামছে।

তাদের হাতে টর্চ।

একজন বাড়ির দিকে তাকিয়ে ফোনে বলল—

“ওরা ভেতরেই আছে।”

অর্ক পিছিয়ে এল।

“এখন কী করব?”

বৃদ্ধ বললেন,

“যে পথে তোমাকে পঁচিশ বছর আগে বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই পথেই যেতে হবে।”

মেঘলা বলল,

“কিন্তু সেই সুড়ঙ্গ তো বন্ধ।”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

“বন্ধ ছিল।”

তারপর তিনি মেঝের একটা কাঠের পাটাতন সরালেন।

নিচে অন্ধকার গর্ত।

সিঁড়ি নেমে গেছে মাটির নিচে।

অর্ক নিচে তাকাল।

সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—

এই পথটা সে আগে দেখেছে।

অনেক আগে।

খুব ছোটবেলায়।

সে মেঘলার হাত ধরল।

“চলো।”

তিনজন অন্ধকার সুড়ঙ্গে নামতে শুরু করল।

উপরে তখন দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ছে।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

“দরজা খুলুন!”

কেউ চিৎকার করছে।

অর্ক, মেঘলা আর বৃদ্ধ অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে এগিয়ে চলল।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর তারা একটা ছোট্ট ভূগর্ভস্থ ঘরে পৌঁছল।

বৃদ্ধ একটা লোহার দরজা খুললেন।

তার ওপারে পাহাড়ের অন্য প্রান্ত।

বৃষ্টি এখনও পড়ছে।

অর্ক বাইরে এসে গভীর শ্বাস নিল।

কিন্তু মেঘলা কোথায়?

সে পিছনে তাকাল।

বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে।

মেঘলা নেই।

“মেঘলা?”

কোনো উত্তর নেই।

অর্ক আবার সুড়ঙ্গে ঢুকতে যাবে—

বৃদ্ধ তার হাত ধরে বললেন,

“ও আসবে।”

“কোথায় গেল?”

“ওকে যেতে হয়েছে।”

“কোথায়?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“যেখানে পঁচিশ বছর আগে ওর মা শেষবার গিয়েছিল।”

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

“কোথায়?”

বৃদ্ধ পাহাড়ের ওপারের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

“পুরনো খনি।”

অর্ক বলল,

“ও একা গেছে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“না।”

“কার সঙ্গে?”

বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“যে মানুষটা পঁচিশ বছর ধরে তোমাকে খুঁজছে।”

“কে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

শুধু অর্কের হাতে সেই পুরনো পকেট ঘড়িটা দিয়ে বললেন—

“এবার তোমার নিজের অতীতের শেষ দরজাটা খুলবে।”

অর্ক ঘড়িটার দিকে তাকাল।

হঠাৎ ঘড়ির ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা শব্দ এল।

টিক…

তারপর—

মেঘলার কণ্ঠ।

“অর্ক…”

অর্ক স্তব্ধ।

ঘড়ির ঢাকনার ভেতর থেকে যেন একটা রেকর্ডিং বাজছে—

“তুমি যদি এটা শুনতে পাও, তাহলে আমি হয়তো আর তোমার কাছে নেই। কিন্তু মনে রেখো…”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেঘলার কণ্ঠ—

“আমি তোমাকে যে সত্যিটা বলেছি, সেটাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়।”

অর্কের চোখ বড় হয়ে গেল।

রেকর্ডিং চলতে থাকল—

“কারণ তুমি অর্ণব নও।”

ঘড়িটা অর্কের হাত থেকে পড়ে গেল।

বৃদ্ধও স্থির হয়ে গেলেন।

আর পাহাড়ের ওপারে, দূরে কোথাও, একটা বন্দুকের গুলির শব্দ শোনা গেল।

ধাঁই!

অর্ক ছুটতে শুরু করল।

মেঘলার দিকে।

পুরনো খনির দিকে।

আর তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“আমি অর্ণব নই।”

কিন্তু যদি সে অর্ণব না হয়—

তাহলে সে কে?

আর মেঘলা এতদিন ধরে কাকে খুঁজছিল?

শেষ ট্রেন কি সত্যিই তাকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল?

নাকি তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এমন এক সত্যির কাছে, যেটা জানার পর তার নিজের জীবনটাই আর আগের মতো থাকবে না?

পাহাড়ের অন্ধকারের মধ্যে অর্ক দৌড়ে চলল।

তার পিছনে বৃষ্টি।

সামনে পুরনো খনি।

আর সেই খনির গভীরে অপেক্ষা করছে—

মেঘলা।

শেষ ট্রেনের যাত্রী।

—উপন্যাস  সমাপ্ত—

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস :: শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব )।।।

দ্বিতীয় পর্ব — নির্ভয়পুরের বাড়ি

রাত তখন প্রায় একটা।

ট্রেনটা অন্ধকার পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে।

জানালার বাইরে তাকিয়ে অর্ক শুধু কালো পাহাড়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে দূরে কোনো অজানা গ্রামের দু-একটা আলো দেখা যাচ্ছিল, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু অর্কের চোখ বাইরে ছিল না।

তার চোখ আটকে ছিল সামনের সিটে।

সেই সিটে কিছুক্ষণ আগেও বসেছিল মেয়েটি।

মেঘলা।

অথবা যে মেয়েটিকে সে মেঘলা ভেবেছিল।

এখন সেখানে কেউ নেই।

শুধু পড়ে আছে সেই নীল খাম।

অর্ক খামটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।

তার হাত কাঁপছিল।

তিন বছর ধরে যে মানুষটাকে সে খুঁজে বেড়িয়েছে, সেই মানুষ হঠাৎ তার সামনে এসে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।

এটা কি সত্যিই ঘটেছে?

নাকি সবটাই তার কল্পনা?

অর্ক নিজের গালে চিমটি কাটল।

ব্যথা পেল।

না, সে জেগেই আছে।

তারপর সে আবার খামের দিকে তাকাল।

খামের ওপর লেখা—

“অর্কের জন্য—তিন বছর আগে যে সত্যিটা বলা হয়নি।”

সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।

ভেতরে একটা মাত্র কাগজ।

কাগজটা বের করতেই একটা পরিচিত গন্ধ পেল সে।

জুঁই ফুলের গন্ধ।

অর্কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এই গন্ধটা সে চিনত।

মেঘলার গায়ে সবসময় এই গন্ধ থাকত।

চিঠিতে লেখা—

“অর্ক,

যদি তুমি এই চিঠিটা পড়ো, তার অর্থ তুমি শেষ পর্যন্ত নির্ভয়পুরে পৌঁছেছ।

তোমাকে অনেক কথা বলা দরকার ছিল। কিন্তু সেই সময় আমি বলতে পারিনি।

তুমি যাকে আমার বাড়ি বলে জানো, সেটা আসলে আমার বাড়ি নয়।

আর যাকে তুমি আমার বাবা বলে চিনেছিলে, তিনি আমার বাবা নন।

সবচেয়ে বড় কথা—

তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা তিন বছর আগে হয়নি।

আমাদের দেখা হয়েছিল তারও অনেক আগে।

তুমি শুধু সেটা মনে করতে পারছ না।

নির্ভয়পুরে পৌঁছে পুরনো পাহাড়ি রাস্তার শেষে যে বাড়িটা দেখবে, সেখানে যেও।

বাড়ির দরজা খোলা থাকবে।

কিন্তু ভেতরে ঢোকার আগে একটা কথা মনে রেখো—

যে ঘরে ঘড়ি নেই, সেই ঘরে কখনও আয়নায় নিজের মুখ দেখবে না।

—মেঘলা”

অর্ক চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে গেল।

তার মাথায় যেন একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন আছড়ে পড়ল।

“আমাদের দেখা তিন বছর আগে হয়নি।”

তাহলে কবে?

সে কি মেঘলাকে আগে থেকেই চিনত?

কিন্তু কেন তার কিছুই মনে নেই?

আর মেঘলার বাবা তার বাবা নন—এর অর্থ কী?

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

তার মাথার ভেতর হঠাৎ কিছু অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠল।

একটা পুরনো বাড়ি।

একটা কাঠের দরজা।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছোট্ট ছেলে।

আর তার পাশে একটা মেয়ে।

মেয়েটার হাতে লাল ফিতা বাঁধা।

ছেলেটা বলছে—

“তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”

মেয়েটা হাসছে।

তারপর একটা প্রচণ্ড শব্দ।

আগুন।

চিৎকার।

অন্ধকার।

অর্ক হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।

সে হাঁপাচ্ছিল।

কপালে ঘাম।

“আমি এসব কী দেখলাম?”

ঠিক তখনই কামরার দরজার কাছে একটা শব্দ হলো।

ঠক।

অর্ক তাকাল।

কেউ নেই।

আবার শব্দ।

ঠক।

ঠক।

কেউ যেন বাইরে থেকে দরজায় আঘাত করছে।

অর্ক উঠে দাঁড়াল।

“কে?”

কোনো উত্তর নেই।

সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।

হাত বাড়িয়ে দরজা খুলতে যাবে—

ঠিক তখনই পাশের কামরা থেকে একজন বৃদ্ধ ছুটে এসে তার হাত চেপে ধরলেন।

“খুলবেন না!”

অর্ক চমকে গেল।

বৃদ্ধের বয়স ষাটের বেশি।

চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়।

“কেন?”

বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন,

“ওটা যাত্রী নয়।”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“তাহলে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

দরজার ওপাশে আবার শব্দ হলো।

ঠক।

তারপর একটা নারীকণ্ঠ—

“অর্ক…”

অর্কের শরীর জমে গেল।

মেঘলার গলা!

“অর্ক, দরজা খোলো।”

অর্ক বৃদ্ধের দিকে তাকাল।

বৃদ্ধ এবার তার হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।

“যে-ই ডাকুক, খুলবেন না।”

“কিন্তু—”

“আপনি নির্ভয়পুর যাচ্ছেন?”

অর্ক অবাক।

“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“তাহলে এখন থেকেই সাবধান হন।”

“কীসের?”

বৃদ্ধ নিচু গলায় বললেন,

“নির্ভয়পুরে রাতের পর কেউ কাউকে নিজের নামে ডাকে না।”

অর্ক কিছু বুঝতে পারল না।

“মানে?”

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

দরজার ওপাশ থেকে আবার মেঘলার কণ্ঠ এল—

“অর্ক… আমি ভয় পাচ্ছি।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

সে দরজা খুলতে যাচ্ছিল।

বৃদ্ধ চিৎকার করে বললেন,

“না!”

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেন একটা টান দিয়ে থেমে গেল।

বাইরে নিস্তব্ধতা।

দরজার ওপাশেও কোনো শব্দ নেই।

অর্ক আর বৃদ্ধ দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কয়েক সেকেন্ড পর ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নিজের সিটে ফিরে গেলেন।

অর্ক তার পিছু নিল।

“আপনি নির্ভয়পুর সম্পর্কে এত কিছু জানেন কীভাবে?”

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“আমি সেখানেই থাকি।”

“তাহলে আপনি আমাকে বলুন—মেঘলা কে?”

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।

তিনি অর্কের দিকে তাকালেন।

“আপনি মেঘলার নাম জানেন?”

“হ্যাঁ।”

“কে আপনাকে এই নাম বলেছে?”

“সে নিজে।”

বৃদ্ধের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“অসম্ভব।”

“কেন?”

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

“নির্ভয়পুরে পৌঁছলে স্টেশন থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাবেন। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আর যদি কেউ আপনাকে বলে—‘মেঘলা নেই’—তাহলে তার সঙ্গে কথা বলবেন না।”

অর্ক এবার রীতিমতো বিরক্ত।

“সবাই মেঘলার কথা শুনলেই এমন আচরণ করছে কেন?”

বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।

তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট পুরনো ছবি বের করে অর্কের হাতে দিলেন।

“এটা দেখুন।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিল।

ছবিটা পুরনো।

ধুলো জমে গেছে।

তাতে একটা বাড়ির সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন পুরুষ।

একজন মহিলা।

একটা ছোট ছেলে।

আর—

একটা ছোট মেয়ে।

অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

ছোট মেয়েটার মুখ মেঘলার মতো।

কিন্তু তার পাশের ছোট ছেলেটা—

অর্কের মতো দেখতে।

ছবির পেছনে লেখা—

“নির্ভয়পুর, ১৭ জুলাই ২০০১।”

অর্কের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“এটা কী?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আপনি এই ছবির ছেলেটাকে চেনেন?”

অর্ক ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,

“না।”

বৃদ্ধ ধীরে বললেন,

“ছেলেটার নাম ছিল অর্ণব।”

অর্ক মাথা তুলল।

“অর্ণব?”

“হ্যাঁ।”

“তারপর?”

“সে মারা যায়।”

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কবে?”

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“২০০১ সালের সেই রাতেই।”

অর্কের চোখ ছবিতে আটকে গেল।

“কীভাবে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আগুনে।”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

“আর মেয়েটা?”

বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকালেন।

“মেয়েটার নাম মেঘলা।”

অর্কের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

“সে বেঁচে ছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“হ্যাঁ।”

“তাহলে এখন কোথায়?”

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত একটা ছায়া পড়ল।

“সেটাই তো রহস্য।”

ট্রেনের গতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল।

দূরে একটা সাইনবোর্ড দেখা গেল।

নির্ভয়পুর — ২ কিলোমিটার।

অর্কের বুকের মধ্যে যেন ঢাক বাজতে লাগল।

আরও কয়েক মিনিট পর ট্রেন স্টেশনে ঢুকল।

নির্ভয়পুর স্টেশন অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ।

একটাও যাত্রী নেই।

কোনো চায়ের দোকান নেই।

কোনো কুলি নেই।

শুধু একটা পুরনো বাতি দুলছে।

অর্ক ট্রেন থেকে নামল।

পিছনে তাকিয়ে দেখল বৃদ্ধও নামছেন।

“আপনি কোথায় যাবেন?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধ বললেন,

“আমার বাড়ি।”

“আমি কি আপনার সঙ্গে যেতে পারি?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“আপনি যদি আমার সঙ্গে যান, তাহলে হয়তো আজ রাতটা বেঁচে যাবেন।”

অর্ক থমকে গেল।

“আর যদি না যাই?”

বৃদ্ধ বললেন,

“তাহলে আপনি সেই বাড়িতে যাবেন।”

“কোন বাড়ি?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন—

“যে বাড়ির কথা মেঘলা আপনাকে বলেছে।”

অর্ক কিছু না বলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি।

পাহাড়ি রাস্তা অন্ধকার।

একটা পুরনো ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল।

ড্রাইভার অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কোথায় যাবেন?”

অর্ক বলল,

“পুরনো পাহাড়ি রাস্তা।”

ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

“ওদিকে গাড়ি যায় না।”

“কেন?”

“রাস্তা খারাপ।”

“আমি যাব।”

ড্রাইভার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“আপনি কি অর্ক?”

অর্কের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

“আপনি আমার নাম জানেন?”

ড্রাইভার কোনো উত্তর দিল না।

শুধু গাড়ির দরজা খুলে দিল।

অর্ক উঠে বসল।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

প্রায় বিশ মিনিট পর শহর শেষ হয়ে গেল।

তারপর শুধু পাহাড়।

গাছ।

কুয়াশা।

আর বৃষ্টি।

হঠাৎ ড্রাইভার বলল,

“সাহেব, একটা কথা বলব?”

“বলুন।”

“আপনি যে বাড়িতে যাচ্ছেন, সেখানে আগে কখনও গেছেন?”

অর্ক চুপ করে বলল,

“না।”

ড্রাইভার আয়নায় তার দিকে তাকাল।

“আপনি নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ।”

ড্রাইভার মৃদু হেসে বলল,

“কিন্তু বাড়িটা আপনাকে চিনবে।”

অর্ক কিছু বলল না।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামল।

সামনে বিশাল একটা লোহার গেট।

গেটের ওপারে পুরনো দোতলা বাড়ি।

দেয়ালে শ্যাওলা।

জানালার কাচ ভাঙা।

বাড়িটাকে দেখে অর্কের বুকের মধ্যে হঠাৎ অদ্ভুত একটা পরিচিত অনুভূতি হলো।

সে যেন এই বাড়িটাকে চেনে।

অনেক বছর ধরে চেনে।

গাড়ি চলে গেল।

অর্ক একা দাঁড়িয়ে রইল।

গেটটা নিজে থেকেই কঁক করে খুলে গেল।

সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

দরজা সত্যিই খোলা।

চিঠিতে যেমন লেখা ছিল।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধা করল।

তারপর ভেতরে ঢুকল।

বাড়ির ভেতর অন্ধকার।

কিন্তু কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ হচ্ছে।

টিক…

টিক…

টিক…

অর্ক থেমে গেল।

চিঠির কথা মনে পড়ল—

“যে ঘরে ঘড়ি নেই…”

সে চারপাশে তাকাল।

একটা ঘড়িও নেই।

কিন্তু টিকটিক শব্দ স্পষ্ট।

শব্দটা আসছে ওপরতলা থেকে।

অর্ক সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপ।

তৃতীয় ধাপ।

হঠাৎ ওপর থেকে একটা মেয়ের গলা—

“অর্ক?”

সে জমে গেল।

“মেঘলা?”

কোনো উত্তর নেই।

আবার—

“অর্ক…”

সে দৌড়ে ওপরে উঠল।

দোতলায় একটা লম্বা করিডর।

করিডরের শেষে একটা দরজা।

দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।

অর্ক এগিয়ে গেল।

দরজার পাশে একটা পুরনো ঘড়ি ঝুলছে।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে—

রাত ১২টা ০৫ মিনিটে।

অর্কের বুকের মধ্যে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজা খুলে গেল।

ভেতরে কেউ নেই।

শুধু একটা বড় আয়না।

অর্ক চিঠির কথা মনে করল।

“আয়নায় নিজের মুখ দেখবে না।”

সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কিন্তু তখনই আয়নার ভেতর থেকে একটা শব্দ এল—

“অর্ক…”

সে চোখ বন্ধ করল।

“কে?”

উত্তর এল—

“তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?”

অর্কের চোখের সামনে হঠাৎ আগুনের ছবি ভেসে উঠল।

একটা ছোট মেয়ে চিৎকার করছে।

একটা ছোট ছেলে তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

পেছনে আগুন।

তারপর একটা পুরুষের গলা—

“ওকে নিয়ে পালাও!”

অর্ক মাথা চেপে ধরল।

“না… না…”

তারপর সে ভুল করে আয়নার দিকে তাকিয়ে ফেলল।

আয়নায় সে নিজের মুখ দেখল না।

দেখল—

একটা ছোট ছেলে।

তার পাশে ছোট্ট মেঘলা।

দুজনেই আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

মেঘলা কাঁদছে।

ছেলেটা তার হাত ধরে আছে।

তারপর আয়নার ভেতরের ছোট ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে অর্কের দিকে তাকাল।

ছেলেটার মুখ—

অর্কের মুখ।

অর্ক পিছিয়ে গেল।

আয়নার ভেতর থেকে শিশুটির ঠোঁট নড়ল।

সে বলল—

“আমি মরিনি।”

অর্কের শরীর অবশ হয়ে গেল।

ঠিক তখনই তার পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ধপ্!

অর্ক ঘুরে দাঁড়াল।

আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে—

মেঘলা।

কিন্তু এবার তার মুখে সেই পরিচিত হাসি নেই।

চোখ দুটো ভেজা।

সে ধীরে ধীরে বলল—

“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ, অর্ণব।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

“আমার নাম অর্ক।”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

“না।”

সে এক পা এগিয়ে এল।

“তোমার নাম অর্ক নয়।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির নিচতলা থেকে একটা শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এল।

মেঘলা অর্কের হাত শক্ত করে ধরে বলল—

“তোমার নাম অর্ণব। আর আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগে তুমি এই বাড়িতে মারা গিয়েছিলে।”

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস

উপন্যাস :::: শেষ ট্রেনের যাত্রী (প্রথম পর্ব)।।

প্রথম পর্ব — যে মেয়েটি রাত বারোটায় এসেছিল

বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি।

স্টেশনের ঘড়িতে রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

পুরো প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। দূরে স্টেশনমাস্টারের ঘরের জানালা দিয়ে হলুদ আলো বেরিয়ে এসে ভিজে প্ল্যাটফর্মের ওপর একটা লম্বা রেখা তৈরি করেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে চারপাশটা কয়েক মুহূর্তের জন্য দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, তারপর আবার সবকিছু ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।

স্টেশনের নাম—শালবনী রোড।

ছোট্ট একটা স্টেশন। দিনে কিছু লোকজন থাকে, চায়ের দোকান খোলা থাকে, রিকশা-ভ্যানের আনাগোনা দেখা যায়। কিন্তু রাত বাড়লে এই স্টেশন যেন অন্য একটা পৃথিবী হয়ে যায়।

আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

শেষ ট্রেনটা আসার কথা রাত ১২টা ০৫ মিনিটে।

ট্রেনটা শহর থেকে আসবে। তারপর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার পাহাড়ের দিকের ছোট্ট শহর নির্ভয়পুরের উদ্দেশে রওনা দেবে।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিল অর্ক।

বয়স তিরিশের কাছাকাছি।

চোখে চশমা, হাতে একটা পুরনো কালো ব্যাগ। ব্যাগটার ভেতরে কয়েকটা জামাকাপড়, কিছু বই আর একটা ডায়েরি।

অর্ক কলকাতায় একটা প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করত।

গত তিন বছর ধরে শহরে থাকার পর হঠাৎই সে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে।

কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সে কাউকেই দেয়নি।

এমনকি নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করেনি।

তিন বছর আগে ঠিক এই বর্ষার রাতেই তার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার পর থেকে সে আর আগের মানুষটি নেই।

তারপর থেকে প্রতি বছর এই সময়টা এলেই তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়।

আজ সেই অস্থিরতাই তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে শালবনী রোডে।

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।

১১টা ৫২।

আর মাত্র তেরো মিনিট।

সে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা পুরনো কাগজ বের করল।

কাগজটা বহুবার ভাঁজ করা হয়েছে। প্রান্তগুলো ছিঁড়ে গেছে। তবু অর্ক সেটাকে অত্যন্ত যত্ন করে রেখেছে।

কাগজের ওপর মাত্র একটা বাক্য লেখা—

“তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে চাও, শেষ ট্রেনটা ধরো।”

নিচে কোনো নাম নেই।

শুধু একটা তারিখ।

তিন বছর আগের আজকের তারিখ।

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর চোখ বন্ধ করল।

তিন বছর আগের সেই রাতটা আবার মনে পড়ল।


তখন অর্ক কলকাতায় থাকত।

একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একা।

তার জীবনে তখন এসেছিল মেঘলা।

মেঘলা ছিল অদ্ভুত মেয়ে।

প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল খুব সাধারণ। কলেজের অধ্যাপকের মেয়ে, বই পড়তে ভালোবাসে, রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসে, আর বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে থাকতে পছন্দ করে।

কিন্তু অর্ক যত তাকে চিনেছিল, ততই বুঝেছিল মেঘলার ভেতরে একটা গভীর অন্ধকার আছে।

সে নিজের অতীত নিয়ে কখনও কথা বলত না।

কখনও কখনও হঠাৎ কয়েক ঘণ্টার জন্য অর্কের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিত।

ফোন বন্ধ।

মেসেজের উত্তর নেই।

তারপর হঠাৎ ফিরে এসে বলত—

“আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।”

অর্ক জিজ্ঞেস করত,

“কেন?”

মেঘলা হেসে বলত,

“সব প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই।”

সেই হাসির মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা থাকত।

অর্ক তখন বুঝতে পারেনি।

ভালোবাসা মানুষকে অনেক কিছু দেখতে দেয় না।

অর্ক মেঘলাকে ভালোবাসত।

খুব ভালোবাসত।

আর মেঘলাও কি তাকে ভালোবাসত?

অর্ক জানত না।

কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত ছিল, যখন তার মনে হতো পৃথিবীতে মেঘলার চেয়ে আপন আর কেউ নেই।

আবার কিছু কিছু রাত ছিল, যখন মনে হতো মেঘলা যেন তার কাছেই নেই।

যেন সে অন্য কোনো পৃথিবীর মানুষ।

তিন বছর আগে বর্ষার এক রাতে মেঘলা অর্ককে ফোন করেছিল।

রাত তখন ১০টা ৩৮।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেঘলার কাঁপা গলা—

“অর্ক?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি কোথায়?”

“বাড়িতে।”

“আজ রাতে তুমি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?”

“এখন?”

“হ্যাঁ। এখনই।”

অর্ক অবাক হয়েছিল।

“কী হয়েছে?”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেঘলা বলেছিল,

“আমার কাছে বেশি সময় নেই।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠেছিল।

“মানে?”

“তুমি শুধু স্টেশনে চলে এসো।”

“কোন স্টেশন?”

“শালবনী রোড।”

“কিন্তু এত রাতে—”

“অর্ক, প্লিজ।”

তারপর ফোন কেটে গিয়েছিল।

অর্ক আবার ফোন করেছিল।

ফোন বন্ধ।

সে ছুটে বেরিয়ে পড়েছিল।

সেই রাতের কথা তার খুব স্পষ্ট মনে আছে।

বৃষ্টি হচ্ছিল।

রাস্তা জলে ডুবে গিয়েছিল।

অনেক কষ্টে একটা গাড়ি নিয়ে সে স্টেশনে পৌঁছেছিল রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে।

কিন্তু মেঘলা সেখানে ছিল না।

স্টেশন প্রায় ফাঁকা।

সে দৌড়ে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে গিয়েছিল।

কাউকে পেল না।

শেষ ট্রেনটা এসেছিল ১২টা ০৫ মিনিটে।

ট্রেন থামার পর অর্ক প্রতিটি কামরায় খুঁজেছিল মেঘলাকে।

কোথাও নেই।

শেষে ট্রেন চলে গিয়েছিল।

অর্ক সারা রাত স্টেশনে বসে ছিল।

ভোরে বাড়ি ফিরেছিল।

মেঘলা আর কখনও তার জীবনে ফিরে আসেনি।

পরের দিন তার ফোন বন্ধ।

তারপর তার বাড়িতে গিয়েও অর্ক জানতে পেরেছিল—

মেঘলা নাকি কয়েক মাস আগেই বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছে।

কিন্তু অর্ক জানত, সেটা মিথ্যা।

কারণ আগের রাতেই মেঘলা তার সঙ্গে কথা বলেছিল।

তারপর?

কিছুই জানা যায়নি।

তিন বছর ধরে অর্ক মেঘলাকে খুঁজেছে।

কোনো খবর নেই।

তারপর কয়েকদিন আগে সেই চিঠিটা আসে।

একটা অচেনা খাম।

ভেতরে শুধু ওই এক লাইন—

“তুমি যদি সত্যিই আমাকে খুঁজতে চাও, শেষ ট্রেনটা ধরো।”

আজ অর্ক সেই ট্রেনেই উঠবে।


হঠাৎ স্টেশনের লাউডস্পিকারে কড়কড় শব্দ হলো।

অর্ক চোখ খুলল।

তারপর ঘোষণা ভেসে এল—

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে… শালবনী রোড স্টেশনে… শেষ ট্রেনটি… কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রবেশ করবে…”

শব্দটা পরিষ্কার নয়।

বৃষ্টির আওয়াজে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেল।

অর্ক উঠে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই সে দেখল—

প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা পোশাক।

হাতে একটা কালো ছাতা।

মেয়েটা একেবারে স্থির।

অর্ক প্রথমে ভেবেছিল কোনো যাত্রী।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল।

বিদ্যুতের আলো এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে পড়ল।

অর্ক নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

মুখটা—

মেঘলার মতো।

ঠিক মেঘলার মতো।

অর্ক কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর দৌড়ে গেল।

“মেঘলা!”

মেয়েটা দাঁড়িয়ে রইল।

অর্ক কাছে পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“মেঘলা… তুমি?”

মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত।

তারপর খুব ধীরে বলল,

“তুমি এসেছ।”

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

“তুমি আমাকে ডাকলে?”

মেয়েটা মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ।”

“কোথায় ছিলে এতদিন?”

মেয়েটা একটু হাসল।

“তিন বছর ধরে?”

অর্ক থমকে গেল।

“তুমি জানো?”

“আমি সব জানি।”

“তাহলে আমাকে এতদিন একটা খবরও দিলে না কেন?”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

“কারণ আমি পারিনি।”

“কেন?”

“কারণ আমি তখন আর স্বাধীন ছিলাম না।”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“মানে?”

মেয়েটা চারপাশে তাকাল।

তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

“এখানে দাঁড়িয়ে এসব বলা যাবে না।”

“তাহলে কোথায়?”

“ট্রেনে ওঠো।”

“কোথায় যাব?”

“যেখানে তোমাকে তিন বছর আগে যেতে বলা হয়েছিল।”

“কোথায়?”

মেয়েটা অর্কের চোখের দিকে তাকাল।

“নির্ভয়পুর।”

অর্ক চমকে উঠল।

নির্ভয়পুর!

এই নামটা সে আগে কখনও মেঘলার মুখে শোনেনি।

কিন্তু সেই মুহূর্তেই দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

একটা দীর্ঘ, কর্কশ শব্দ।

মেয়েটা বলল,

“ট্রেন আসছে।”

অর্ক বলল,

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”

মেয়েটা হাসল।

“আমি তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি।”

ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

বৃষ্টির মধ্যে হেডলাইটের আলো ছুটে এল।

চাকা ঘষে প্রচণ্ড শব্দ হলো।

ট্রেন থামতেই অর্ক মেয়েটার দিকে তাকাল।

“চলো।”

মেয়েটা মাথা নাড়ল।

দুজনেই একটা ফাঁকা কামরায় উঠে পড়ল।

অর্ক জানালার পাশে বসল।

মেয়েটা তার বিপরীতে।

ট্রেন ছাড়ার আগে অর্ক আবার জিজ্ঞেস করল,

“তোমার নাম মেঘলা তো?”

মেয়েটা তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

“তুমি এখনও আমাকে মেঘলা বলে ডাকো?”

অর্ক অবাক।

“মানে?”

মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।

ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।

শালবনী রোড স্টেশন পিছিয়ে গেল।

বাইরে শুধু অন্ধকার আর বৃষ্টি।

অর্ক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ সে খেয়াল করল—

মেয়েটার পোশাক ভিজে নেই।

অথচ বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি।

তার হাতে থাকা ছাতাটাও সম্পূর্ণ শুকনো।

অর্কের বুকের মধ্যে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

সে কিছু বলতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই মেয়েটা তার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—

“অর্ক, একটা কথা মনে রেখো।”

“কী?”

“নির্ভয়পুরে পৌঁছানোর আগে যদি কেউ তোমাকে বলে আমি মারা গেছি…”

অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

মেয়েটা তার চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটা বলল—

“তুমি বিশ্বাস করবে না।”

ট্রেনের আলো হঠাৎ নিভে গেল।

এক সেকেন্ড।

দুই সেকেন্ড।

তারপর আলো ফিরে এল।

অর্ক সামনে তাকিয়ে দেখল—

সিটটা খালি।

মেয়েটা নেই।

শুধু তার জায়গায় পড়ে আছে একটা পুরনো নীল খাম।

অর্ক কাঁপা হাতে খামটা তুলে নিল।

খামের ওপর লেখা—

“অর্কের জন্য—তিন বছর আগে যে সত্যিটা বলা হয়নি।”

ট্রেন তখন অন্ধকারের মধ্যে ছুটে চলেছে।

আর অর্ক প্রথমবার বুঝতে পারল—

সে হয়তো মেঘলাকে খুঁজতে ট্রেনে ওঠেনি।

বরং মেঘলা তাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।

চলবে…

পরের পর্বে অর্ক পৌঁছবে নির্ভয়পুরে, আর নীল খামের ভেতরের চিঠি খুলতেই তিন বছর আগের সেই রাতের এমন একটি সত্যি সামনে আসবে, যা তার নিজের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।

Share This
Categories
উপন্যাস

অপেক্ষার ছায়া।

অধ্যায় ১: প্রথম দেখা

কলকাতার গরমে হাঁপিয়ে ওঠা এক দুপুর। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় ভিড় জমজমাট।
অরণ্য দাঁড়িয়ে পুরনো বই ঘাঁটছে। হঠাৎ করেই পাশ থেকে এক মেয়ে এসে ধাক্কা দিল।

“সরি!” – মেয়েটি লজ্জায় বলল।
অরণ্য তাকিয়ে দেখল, সাদামাটা সালোয়ার-কামিজ পরা এক মেয়ে, চুল এলোমেলো।

“কিছু হয়নি,” অরণ্য মৃদু হাসল।
এটাই তাদের প্রথম পরিচয়। মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা।


অধ্যায় ২: বন্ধুত্বের শুরু

পরিচয় বাড়ল। অরণ্য জানল মেঘলা সাহিত্য নিয়ে পড়ছে।
দুজনের বইয়ের রুচি এক। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, সেলিঞ্জার—সবই তাদের আলোচনার বিষয়।

ধীরে ধীরে তারা নিয়মিত দেখা করতে শুরু করল।
কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে একসাথে কফি খাওয়া, গঙ্গার ধারে হাঁটা, বইয়ের দোকানে একসাথে ঘুরে বেড়ানো—সবই নতুন স্বাদ এনে দিল অরণ্যের জীবনে।


অধ্যায় ৩: প্রেমের জন্ম

একদিন গঙ্গার ধারে বসে মেঘলা হঠাৎ বলল—
“তুমি জানো অরণ্য, আমি কখনও কাউকে এতটা বিশ্বাস করিনি।”
অরণ্য অবাক হয়ে তাকাল।

সেদিন হাওয়ার ঝাপটায় মেঘলার চুল মুখে এসে পড়ল।
অরণ্য ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটা সরিয়ে দিল।
তাদের চোখে চোখ পড়তেই অরণ্যের বুক ধড়ফড় করে উঠল।

সেই দিন থেকেই তাদের প্রেমের গল্প শুরু হল।


অধ্যায় ৪: ভবিষ্যতের স্বপ্ন

অরণ্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মেঘলা স্বপ্ন দেখত বিদেশে উচ্চশিক্ষার।
তারা প্রায়ই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত।

“যদি আমি বাইরে চলে যাই?” – মেঘলা একদিন জিজ্ঞেস করল।
অরণ্য বলল—
“তাহলেও আমি থাকব। তুমি পড়াশোনা শেষ করে ফিরবে, তারপর আমরা সংসার গড়ব।”


অধ্যায় ৫: দূরত্বের শুরু

মেঘলা বিদেশে পড়তে চলে গেল।
প্রথম কয়েক মাস তারা নিয়মিত ফোনে কথা বলত, ভিডিও কল করত।

কিন্তু ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে এল।
টাইম জোনের পার্থক্য, ব্যস্ততা, নতুন জীবন—সব মিলে মেঘলা কম সময় দিতে লাগল।

অরণ্য কষ্ট পেত, কিন্তু কিছু বলত না।


অধ্যায় ৬: ভুল বোঝাবুঝি

একদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় অরণ্য দেখল মেঘলা তার এক সহপাঠীর সাথে ছবি দিয়েছে।
ছবিতে তারা হাসছে।

অরণ্যের বুকের ভেতর রাগ জমল।
সে মেঘলাকে মেসেজ করল—
“তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?”

মেঘলা উত্তর দিল না।
কয়েকদিনের নীরবতার পর সে লিখল—
“অরণ্য, আমাদের মধ্যে দূরত্ব এত বেড়ে গেছে যে আমি আর টিকিয়ে রাখতে পারছি না।”


অধ্যায় ৭: ভাঙনের রাত

অরণ্য সেই রাতে ঘুমোতে পারেনি।
মেঘলার শেষ মেসেজটা বারবার পড়তে পড়তে চোখে জল এসে গেল।

সকালে উঠে সে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।
ফোন, মেসেঞ্জার, মেইল—সব জায়গা থেকে মেঘলাকে ব্লক করল।


অধ্যায় ৮: সময়ের নির্মমতা

বছর গড়িয়ে গেল।
অরণ্য চাকরি পেল, জীবনে কিছুটা স্থিরতা এল।
কিন্তু মেঘলার স্মৃতি তাকে ছাড়ল না।

রাতের বেলা একা বসে গান শুনলে মনে হত মেঘলা ঠিক পাশেই বসে আছে।


অধ্যায় ৯: অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ

একদিন এক সাহিত্য সভায় অরণ্য মেঘলাকে হঠাৎ দেখল।
সে দেশে ফিরেছে। চুলে সামান্য সাদা, মুখে পরিণত ভাব।

তাদের চোখে চোখ পড়ল।
দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।


অধ্যায় ১০: মুখোমুখি

অরণ্য ধীরে মেঘলার কাছে গেল।
“কেমন আছো?”—তার গলায় কাঁপন।

মেঘলা হেসে বলল—
“ভালো। অনেক কিছু শিখেছি। তোমাকে না পেয়ে শিখেছি, কীভাবে একা বাঁচতে হয়।”

অরণ্য বলল—
“আমি এখনও ভুলতে পারিনি।”

মেঘলা চুপ করে রইল। তারপর বলল—
“কিন্তু অরণ্য, আমরা দুজনেই বদলে গেছি। সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না।”


অধ্যায় ১১: শেষ সিদ্ধান্ত

অরণ্য বাড়ি ফিরে সারারাত জানালার পাশে বসে রইল।
ভোরের আলোয় মনে হল—
মেঘলাকে ছেড়ে দেওয়াটাই হয়তো ভালো।

সে ডায়েরিতে লিখল—
“প্রেম শেষ হয়নি, শুধু রূপ বদলেছে। মেঘলা থাকবে, কিন্তু স্মৃতির মতো।”


অধ্যায় ১২: মুক্তি

অরণ্য মেঘলাকে একটি শেষ মেসেজ পাঠাল—
“ধন্যবাদ আমার জীবনে এসে আমাকে ভালোবাসার মানে শেখানোর জন্য। তোমার সুখী হওয়া ছাড়া আমার আর কিছু চাই না।”

মেঘলা উত্তর দিল না।
কিন্তু অরণ্যের মনে হল, বুকের ভার হালকা হয়ে গেছে।


সমাপ্তি

অরণ্য জানল—প্রেম মানেই সবসময় একসাথে থাকা নয়।
কখনও কখনও ছেড়ে দেওয়াই সত্যিকারের ভালোবাসা।

সে হেসে উঠল।
বছরের পর বছর যে যন্ত্রণা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত, আজ যেন মুক্তির স্বাদ দিল।

 

Share This