Categories
গল্প

মাটির নিচে লুকোনো শব্দ।

নদীর ধারে একটা ছোট্ট গ্রাম—শিমুলিয়া।

গ্রামের একপাশে ধানের জমি, অন্যপাশে পুরোনো পুকুর। পুকুরের ধারে একটা ভাঙাচোরা মাটির ঘর। সেই ঘরেই থাকতেন হরনাথ কুমোর।

সারা জীবন মাটি দিয়ে জিনিস বানিয়েছেন তিনি।

হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ভাঁড়—যা চাইবেন, হরনাথ বানিয়ে দিতে পারতেন।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমে গিয়েছিল।

প্লাস্টিক আর অ্যালুমিনিয়ামের জিনিস বাজার দখল করে নিয়েছিল।

হরনাথের ছেলে শহরে চলে গেছে।

বউমাও যেতে চায়।

শুধু নাতনি মেঘলা দাদুর সঙ্গে থেকে গেছে।

মেঘলার বয়স চৌদ্দ।

সে পড়াশোনায় ভালো।

কিন্তু তার সবচেয়ে ভালো লাগত দাদুর কাজ দেখতে।

দাদু যখন কাদা মাটি নিয়ে চাকার ওপর বসতেন, মেঘলা পাশে বসে তাকিয়ে থাকত।

চাকা ঘুরত।

মাটি ঘুরত।

আর ধীরে ধীরে একটা আকার তৈরি হতো।

মেঘলার মনে হতো, দাদু যেন মাটির ভিতর থেকে কোনো গল্প বের করে আনছেন।

একদিন মেঘলা জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, মাটি কথা বলতে পারে?”

হরনাথ হেসে বললেন,

—“সব মাটি কথা বলে না।”

—“কোন মাটি কথা বলে?”

—“যে মাটিকে মন দিয়ে ছোঁয়া যায়।”

মেঘলা কথাটা মনে রাখল।

কয়েকদিন পর স্কুলে একটা বিজ্ঞান প্রদর্শনী হওয়ার কথা ঘোষণা হল।

সবাইকে নিজেদের তৈরি কোনো জিনিস নিয়ে যেতে হবে।

কেউ আগ্নেয়গিরি বানাবে।

কেউ সৌরজগত।

কেউ বৈদ্যুতিক সার্কিট।

মেঘলা বাড়ি ফিরে দাদুকে বলল,

—“আমি কী বানাব?”

দাদু বললেন,

—“তুই যা খুশি বানাস।”

মেঘলা বলল,

—“আমি মাটির কিছু বানাব।”

দাদু মাথা নাড়লেন।

—“মাটির জিনিস বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে?”

মেঘলা বলল,

—“কেন নয়?”

সে দাদুর কাছে জানতে চাইল, মাটির পাত্র কীভাবে তৈরি হয়।

দাদু মাটি দেখালেন।

মাটি প্রথমে ভিজিয়ে রাখতে হয়।

তারপর কাদা মাখতে হয়।

তারপর মাটি থেকে পাথর, কাঁকর সরাতে হয়।

তারপর চাকার ওপর বসিয়ে আকার দিতে হয়।

তারপর শুকোতে হয়।

শেষে আগুনে পোড়াতে হয়।

মেঘলা হঠাৎ বলল,

—“দাদু, মাটির হাঁড়ি ঠান্ডা থাকে কেন?”

হরনাথ বললেন,

—“মাটির গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। জল সেই ছিদ্র দিয়ে খুব সামান্য বাইরে বেরোয়। সেই জল বাষ্প হয়ে যাওয়ার সময় তাপ নিয়ে যায়।”

মেঘলার চোখ বড় হয়ে গেল।

—“তাহলে মাটির হাঁড়ি একটা প্রাকৃতিক ঠান্ডা রাখার পাত্র!”

দাদু হেসে বললেন,

—“তুই তো আমার থেকেও বেশি বুঝে ফেলেছিস।”

মেঘলা সেদিন থেকেই কাজ শুরু করল।

সে একটা ছোট মাটির পাত্র বানাল।

পাত্রের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র রাখল।

তারপর তার ওপর একটা ঢাকনা তৈরি করল।

ভিতরে জল রাখল।

পাশে একটা সাধারণ কাচের বোতলে একই পরিমাণ জল রাখল।

দুটোই একই জায়গায় রাখল।

এক ঘণ্টা পর তাপমাত্রা মাপল।

দেখল মাটির পাত্রের জল তুলনামূলক ঠান্ডা।

সে সব তথ্য খাতায় লিখে রাখল।

পরদিন স্কুলে নিয়ে গেল।

বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন,

—“তুমি এটা নিজে পরীক্ষা করেছ?”

মেঘলা বলল,

—“হ্যাঁ স্যার। দাদুর কাছ থেকে মাটি সম্পর্কে শিখেছি।”

শিক্ষক বললেন,

—“তাহলে প্রদর্শনীতে তুমি শুধু জিনিসটা দেখাবে না। এর পেছনের বিজ্ঞানও বোঝাবে।”

মেঘলা খুব খুশি হল।

কিন্তু প্রদর্শনীর আগের দিন বড় সমস্যা হল।

মেঘলার বানানো পাত্রটা ভেঙে গেল।

সে সেটাকে হাতে নিয়ে বসে পড়ল।

চোখে জল।

দাদু কাছে এসে বললেন,

—“কী হয়েছে?”

মেঘলা পাত্রটা দেখাল।

—“সব শেষ।”

দাদু বললেন,

—“মাটি ভেঙেছে। তোর কাজ ভাঙেনি।”

—“কিন্তু কাল প্রদর্শনী।”

হরনাথ চাকার কাছে বসে বললেন,

—“আবার বানাবি।”

—“আজ রাতে?”

—“রাত যতই হোক।”

মেঘলা দাদুর পাশে বসল।

চাকা ঘুরতে শুরু করল।

মাটি নরম করা হল।

আবার পাত্র তৈরি হল।

কিন্তু এবার দাদু মেঘলাকে বললেন,

—“আগেরটার ভুল কোথায় হয়েছিল?”

মেঘলা ভালো করে দেখল।

—“দেয়াল খুব পাতলা করেছিলাম।”

—“তাহলে?”

—“এবার একটু মোটা করব।”

দাদু হাসলেন।

—“এই তো বিজ্ঞান।”

রাত অনেক হল।

পাত্র তৈরি হয়ে গেল।

কিন্তু শুকোনোর সময় খুব কম।

দাদু চুল্লির পাশে বসে রইলেন।

সকালে পাত্রটা আগুনে পোড়ানো হল।

মেঘলা ভয়ে দাঁড়িয়ে।

যদি আবার ভেঙে যায়?

কিছুক্ষণ পর চুল্লি ঠান্ডা হল।

দাদু ধীরে ধীরে পাত্রটা বের করলেন।

অক্ষত।

মেঘলা আনন্দে দাদুকে জড়িয়ে ধরল।

পরদিন স্কুলে প্রদর্শনী।

অনেক সুন্দর মডেল এসেছে।

মেঘলা তার মাটির পাত্রটা টেবিলে রাখল।

তার পাশে কাচের বোতল।

একজন বিচারক এসে জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা কী?”

মেঘলা বলল,

—“প্রাকৃতিকভাবে জল ঠান্ডা রাখার একটা সহজ পদ্ধতি।”

তারপর সে পরীক্ষার ফল দেখাল।

কীভাবে মাটির ছিদ্র দিয়ে সামান্য জল বাইরে বেরিয়ে বাষ্পীভূত হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাপ কমে—সহজ ভাষায় বোঝাল।

বিচারকরা মন দিয়ে শুনলেন।

একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই পাত্র কোথা থেকে শিখলে?”

মেঘলা বলল,

—“আমার দাদুর কাছ থেকে।”

—“তোমার দাদু কী করেন?”

—“কুমোর।”

বিচারক হেসে বললেন,

—“তাহলে তোমার বিজ্ঞান বইয়ের একটা অংশ তোমার বাড়িতেই আছে।”

মেঘলা হাসল।

প্রদর্শনী শেষে মেঘলা পুরস্কার পেল।

কিন্তু সে পুরস্কারটা নিজের কাছে রাখল না।

বাড়ি ফিরে দাদুর হাতে তুলে দিয়ে বলল,

—“এটা তোমার।”

হরনাথ অবাক।

—“আমার কেন?”

—“কারণ মাটির কথা তুমি না শেখালে আমি এটা জানতে পারতাম না।”

দাদু পুরস্কারটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“জানিস, আমি এতদিন ভাবতাম আমার কাজ একদিন শেষ হয়ে যাবে।”

মেঘলা বলল,

—“কেন?”

—“কারণ সবাই এখন অন্য জিনিস ব্যবহার করে।”

মেঘলা বলল,

—“কাজ শেষ হয় না দাদু। শুধু কাজের নতুন ব্যবহার খুঁজে নিতে হয়।”

হরনাথ নাতনির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“তুই তাহলে আমার কাজ বাঁচিয়ে দিলি?”

মেঘলা মাথা নাড়ল।

—“না। তুমি আমাকে শিখিয়েছ বলে আমি শুধু বুঝলাম—মাটির ভিতরে এখনও অনেক কথা লুকিয়ে আছে।”

কয়েকদিন পর মেঘলা স্কুলে একটা ছোট কর্মশালা করল।

দাদুকে নিয়ে গেল।

হরনাথ ছাত্রছাত্রীদের দেখালেন কীভাবে মাটি দিয়ে পাত্র তৈরি করতে হয়।

বাচ্চারা চাকা ঘুরিয়ে মাটি ধরল।

কেউ পাত্র বানাল।

কেউ বানাল ছোট পাখি।

কেউ বানাল প্রদীপ।

হরনাথের মুখে বহুদিন পর আবার সেই পুরোনো হাসি ফুটে উঠল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে মেঘলা বলল,

—“দাদু, আজ মাটি অনেক কথা বলল।”

হরনাথ বললেন,

—“কী বলল?”

মেঘলা একটু ভেবে উত্তর দিল,

—“বলল, পুরোনো জিনিসকে ফেলে দেওয়ার আগে তার ভিতরের গল্পটা একবার শুনে দেখো।”

দাদু হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

—“ঠিক বলেছিস।”

পুকুরের জলে তখন সন্ধ্যার আকাশের আলো পড়েছে।

দূরে কুমোরের ঘরে চাকা থেমে গেছে।

কিন্তু মাটির গন্ধে যেন নতুন একটা গল্প শুরু হয়েছে।

কারণ কিছু শব্দ মুখে উচ্চারণ করতে হয় না।

কিছু শব্দ—

মাটির নিচেই লুকিয়ে থাকে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

সাইকেলের ঘণ্টি।

বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ছিল চাঁদপুর। গ্রামের শেষ মাথায় একটা ছোট্ট টিনের দোকান। দোকানের সামনে ঝোলানো থাকত কয়েকটা পুরোনো সাইকেলের টায়ার, দু-তিনটে মরচে ধরা চাকা আর একটা লোহার পাম্প।

দোকানের মালিক গোপাল।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।

গ্রামের সবাই তাকে ডাকত—গোপাল মিস্ত্রি বলে।

সাইকেল সারানোই ছিল তার পেশা।

কারও চেন ছিঁড়লে গোপাল।

টায়ার ফুটো হলে গোপাল।

ব্রেক নষ্ট হলে গোপাল।

কিন্তু গোপালের দোকানে একটা জিনিস ছিল, যেটা অন্য কোনো দোকানে ছিল না।

একটা ছোট্ট পিতলের সাইকেলের ঘণ্টি।

ঘণ্টিটা পুরোনো।

রং উঠে গেছে।

তবু শব্দটা ছিল পরিষ্কার—

টিং… টিং…

প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার আগে গোপাল ঘণ্টিটা একবার বাজাতেন।

তারপর কাজ শুরু করতেন।

একদিন গ্রামের স্কুলের ছাত্র রাহুল তার ভাঙা সাইকেল নিয়ে দোকানে এল।

—“কাকু, সাইকেলটা ঠিক করে দিন।”

গোপাল সাইকেলটা উল্টে রেখে বললেন,

—“চেন খুলে গেছে। কাল নিয়ে যাস।”

রাহুল মাথা নিচু করল।

—“কাল হলে হবে না কাকু।”

—“কেন?”

—“কাল পরীক্ষা।”

গোপাল একটু চুপ করে রইলেন।

রাহুল প্রতিদিন এই সাইকেলেই চার কিলোমিটার দূরের স্কুলে যায়।

হেঁটে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে।

গোপাল বললেন,

—“দে দেখি।”

তিনি চেনটা হাতে নিয়ে কাজ শুরু করলেন।

পনেরো মিনিট পর সাইকেল ঠিক।

রাহুল পকেট থেকে টাকা বের করতেই গোপাল হাত তুলে বললেন,

—“রাখ।”

—“কিন্তু টাকা?”

—“পরীক্ষা দিয়ে ভালো করে পাশ করিস। সেটাই টাকা।”

রাহুল হেসে চলে গেল।

সেদিন থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।

যে ছাত্রের সাইকেল নষ্ট, সে গোপালের দোকানে আসত।

কারও টাকার অভাব থাকলে গোপাল বিনা পয়সায় সারিয়ে দিতেন।

কেউ টাকা পরে দেবে বললে বলতেন,

—“আগে পড়াশোনা কর।”

কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষ এটা নিয়ে হাসাহাসি করত।

একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বলল,

—“গোপাল, তোর দোকান না দাতব্য প্রতিষ্ঠান?”

সবাই হেসে উঠল।

গোপালও হাসলেন।

—“সাইকেল সারাই করি, মানুষের ভবিষ্যৎ না।”

লোকটি বলল,

—“তাহলে এত ফ্রি সারাস কেন?”

গোপাল উত্তর দিলেন,

—“কারণ একটা সাইকেল ঠিক করতে যত টাকা লাগে, একটা ছেলের স্কুল ছুটে গেলে তার ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি।”

কথাটা কেউ আর বাড়াল না।

কয়েক বছর কেটে গেল।

রাহুল বড় হল।

স্কুল শেষ করে শহরে পড়তে গেল।

তারপর একদিন সে গোপালের দোকানে ফিরে এল।

গায়ে পরিষ্কার শার্ট, হাতে একটা ব্যাগ।

গোপাল চিনতে একটু সময় নিলেন।

—“কে?”

রাহুল হেসে বলল,

—“কাকু, আমার সাইকেলটা মনে আছে?”

গোপাল হেসে উঠলেন।

—“ওই লাল সাইকেল?”

—“হ্যাঁ।”

রাহুল বলল,

—“আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি।”

গোপালের চোখ চকচক করে উঠল।

—“সত্যি?”

—“হ্যাঁ।”

তারপর রাহুল পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল।

—“এটা আপনার জন্য।”

গোপাল বাক্স খুললেন।

ভেতরে একটা নতুন সাইকেলের ঘণ্টি।

পুরোনোটার মতোই দেখতে।

কিন্তু একেবারে নতুন।

রাহুল বলল,

—“আপনার ওই পুরোনো ঘণ্টিটা অনেকদিন ধরে দেখেছি। ভাবলাম, এবার একটা নতুন ঘণ্টি দিই।”

গোপাল হেসে বললেন,

—“পুরোনোটা ফেলে দেব?”

রাহুল মাথা নাড়ল।

—“না। ওটা থাক।”

গোপাল পুরোনো ঘণ্টিটার দিকে তাকালেন।

—“কেন?”

রাহুল বলল,

—“ওটার শব্দেই তো আমার স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো শুরু হয়েছিল।”

গোপাল কিছু বললেন না।

শুধু চোখ মুছলেন।

তারপর নতুন ঘণ্টিটা দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিলেন।

সেদিন বিকেলে গ্রামের আরও কয়েকজন ছেলে দোকানে এল।

তাদের সাইকেলের অবস্থা খুব খারাপ।

গোপাল বললেন,

—“সবগুলো রেখে যা।”

একজন বলল,

—“কাকু, টাকা নেই।”

গোপাল হেসে বললেন,

—“কে টাকা চাইল?”

ছেলেটা বলল,

—“কিন্তু আপনি তো—”

—“আগে স্কুলে যা।”

তারপর তিনি নতুন ঘণ্টিটা বাজালেন।

টিং… টিং…

শব্দটা পুরো দোকানে ছড়িয়ে পড়ল।

রাহুল পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে বলল,

—“কাকু, আপনি এখনও একই রকম আছেন।”

গোপাল বললেন,

—“মানুষ বদলায়।”

—“আপনি বদলাননি।”

—“বদলেছি।”

রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।

গোপাল বললেন,

—“আগে ভাবতাম সাইকেল সারাই করি। এখন বুঝি, আমি আসলে রাস্তা খুলে দিই।”

—“কীসের রাস্তা?”

—“যে রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে স্কুলে যায়। যে রাস্তা দিয়ে কেউ নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যায়।”

রাহুল চুপ করে গেল।

সন্ধ্যা নেমেছে।

দোকানের সামনে একে একে কয়েকটা সাইকেল দাঁড়িয়ে।

কেউ টায়ার ফুলিয়ে নিচ্ছে।

কেউ ব্রেক পরীক্ষা করছে।

কেউ ঘণ্টি বাজিয়ে দেখছে।

আর গোপাল একটার পর একটা সাইকেল ঠিক করে চলেছেন।

রাহুল যাওয়ার আগে বলল,

—“কাকু, একটা কথা বলব?”

—“বল।”

—“আপনার দোকানের একটা নাম দেওয়া উচিত।”

গোপাল হেসে বললেন,

—“কী নাম?”

রাহুল একটু ভেবে বলল,

—“স্বপ্নের সাইকেল।”

গোপাল হেসে মাথা নাড়লেন।

দোকানের পুরোনো টিনের ওপর পরদিন সত্যিই একটা নতুন বোর্ড লাগল—

স্বপ্নের সাইকেল

সাইকেল সারাই হয়, স্বপ্ন থামতে দেওয়া হয় না।

তার নিচে ঝুলতে থাকল সেই পুরোনো পিতলের ঘণ্টি।

আর তার পাশে নতুন ঘণ্টি।

দুটো ঘণ্টিই বাতাসে দুলত।

কখনও পুরোনোটার শব্দ শোনা যেত—

টিং…

কখনও নতুনটার—

টিং… টিং…

আর প্রতিটি শব্দ যেন বলত—

“চলতে থাকো।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

স্কুলের শেষ কলসি।

কাঁকড়াঝোড় গ্রামের প্রাথমিক স্কুলটা ছিল খুব ছোট।

দুটো ঘর, একটা টিনের ছাউনি, সামনে খেলার মাঠ আর মাঠের এক কোণে একটা পুরোনো কুয়ো।

কিন্তু সেই কুয়োটাই ছিল স্কুলের সবচেয়ে বড় ভরসা।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেই কুয়োর জলেই হাত-মুখ ধুত, শিক্ষকরা সেই জল খেতেন, রান্নার জন্যও সেই জল ব্যবহার হতো।

সমস্যা হল, এক বছর বর্ষা ঠিকমতো না হওয়ায় কুয়োর জল কমতে শুরু করল।

শীতের শুরুতেই একদিন সকালে দেখা গেল—

কুয়ো প্রায় শুকিয়ে গেছে।

প্রধান শিক্ষক হরিদাসবাবু সবাইকে ডেকে বললেন,

—“জল খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হবে।”

ক্লাস থ্রি-র ছাত্র অর্ক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

সে হাত তুলে বলল,

—“স্যার, জল আসবে না?”

হরিদাসবাবু একটু হেসে বললেন,

—“আসবে। বৃষ্টি হলে আবার কুয়ো ভরে যাবে।”

অর্ক বলল,

—“কিন্তু বৃষ্টি যদি না হয়?”

প্রধান শিক্ষক কোনো উত্তর দিলেন না।

পরদিন থেকেই স্কুলে জল নিয়ে নিয়ম তৈরি হল।

প্রতিটি ক্লাসে একটা করে কলসি।

কলসির জল শেষ হয়ে গেলে আর জল দেওয়া হবে না।

প্রথম দুদিন সবাই নিয়ম মেনে চলল।

তৃতীয় দিন দুপুরে রান্নাঘরের দিদিমণি এসে বললেন,

—“স্যার, জল নেই।”

হরিদাসবাবু বললেন,

—“কুয়ো থেকে আনুন।”

—“কুয়োতেও নেই।”

সবাই চুপ।

অর্ক তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখল, কয়েকজন ছাত্র খালি বোতল হাতে বাড়ির দিকে যাচ্ছে।

তার মাথায় একটা প্রশ্ন এল—

“স্কুলে জল নেই, কিন্তু আমরা কি কিছু করতে পারি না?”

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অর্ক নিজের মাকে বলল,

—“মা, আমাদের স্কুলে জল নেই।”

মা বললেন,

—“জানি। তোমার স্যার আজ বাজার থেকে জল কিনে এনেছেন।”

অর্ক বলল,

—“জল কিনে তো সবসময় স্কুল চলবে না।”

মা বললেন,

—“তাহলে কী করবে?”

অর্ক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—“জল জমাব।”

পরদিন সে স্কুলে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে গেল।

তার গায়ে লিখল—

“বৃষ্টির জল”।

বন্ধুরা হাসতে লাগল।

—“বৃষ্টি তো নেই!”

অর্ক বলল,

—“আজ নেই। কিন্তু একদিন আসবে।”

তারপর সে প্রধান শিক্ষকের কাছে গেল।

—“স্যার, ছাদের জল জমিয়ে রাখা যায়?”

হরিদাসবাবু অবাক হয়ে বললেন,

—“যায় তো। কিন্তু কীভাবে?”

অর্ক বলল,

—“আমি জানি না। আমরা সবাই মিলে শিখব।”

প্রধান শিক্ষক হাসলেন।

—“ঠিক আছে। শিখে এসো।”

অর্ক বাড়ি গিয়ে বাবার পুরোনো মোবাইলে ইন্টারনেট ঘেঁটে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ছবি দেখতে লাগল।

সে বুঝল, ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে জল নামিয়ে বড় ট্যাঙ্কে জমিয়ে রাখা যায়।

পরদিন সে ছবিগুলো স্কুলে নিয়ে এল।

শিক্ষকরা দেখলেন।

একজন শিক্ষক বললেন,

—“আইডিয়াটা খারাপ নয়।”

কিন্তু সমস্যা হল টাকা।

ট্যাঙ্ক কিনতে হবে।

পাইপ লাগাতে হবে।

ফিল্টার বানাতে হবে।

স্কুলের তহবিলে এত টাকা নেই।

অর্ক বলল,

—“সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে না।”

—“তাহলে?”

—“আগে জল জমাব। পরে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা করব।”

শিক্ষকরা রাজি হলেন।

গ্রামের কয়েকজন অভিভাবকও এগিয়ে এলেন।

কেউ পুরোনো ড্রাম দিলেন।

কেউ পাইপ দিলেন।

কেউ শ্রম দিলেন।

একজন মিস্ত্রি বললেন,

—“টাকা লাগবে না। স্কুলের জন্য কাজ করব।”

কয়েকদিনের মধ্যে স্কুলের ছাদের এক কোণে একটা অস্থায়ী জল সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেল।

কিন্তু তখনও বৃষ্টি নেই।

অর্ক প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকাত।

একদিন দুপুরে হঠাৎ কালো মেঘ জমল।

সবাই ছুটে মাঠে বেরিয়ে এল।

তারপর বৃষ্টি।

প্রথমে টুপটাপ।

তারপর ঝমঝম।

ছাদের জল পাইপ বেয়ে ড্রামে পড়তে শুরু করল।

অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“জল! জল জমছে!”

ছাত্রছাত্রীরা হাততালি দিল।

সেদিন স্কুলে যেন উৎসব হয়ে গেল।

একটা ড্রাম ভরল।

তারপর আরেকটা।

বৃষ্টি থামার পর হরিদাসবাবু ড্রামের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“এই জল কতদিন চলবে?”

অর্ক বলল,

—“যত্ন করে ব্যবহার করলে অনেকদিন।”

কিন্তু অর্ক এখানেই থামল না।

সে বুঝেছিল, শুধু জল জমালেই হবে না।

জল অপচয়ও বন্ধ করতে হবে।

সে স্কুলে একটা নতুন নিয়ম চালু করল—

“শেষ কলসি পর্যন্ত জল বাঁচাও।”

হাত ধোয়ার সময় কল খোলা রাখা যাবে না।

বোতল ধোয়ার জল গাছের গোড়ায় দিতে হবে।

মিড-ডে মিলের বাসন ধোয়ার শেষ জল দিয়ে স্কুলের বাগান পরিষ্কার করতে হবে।

প্রথমে সবাই নিয়ম মানত না।

অর্ক রাগ করত না।

শুধু বলত,

—“একটু জল বাঁচালেও সেটা কারও না কারও কাজে লাগবে।”

কয়েক মাস পর স্কুলের পাশে একটা ছোট বাগান তৈরি হল।

জল সংরক্ষণের কারণে সেই বাগানেও নিয়মিত জল দেওয়া সম্ভব হল।

গাছ বড় হতে লাগল।

একদিন জেলা থেকে একজন আধিকারিক স্কুল পরিদর্শনে এলেন।

তিনি দেখলেন—

স্কুলে বড় কোনো ভবন নেই,

দামী কোনো সরঞ্জাম নেই,

কিন্তু ছাদের পাশে জল সংগ্রহের ব্যবস্থা আছে।

তিনি প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা কে করেছে?”

হরিদাসবাবু অর্ককে সামনে নিয়ে এলেন।

—“ও।”

আধিকারিক অর্ককে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুমি কেন এটা করতে চেয়েছিলে?”

অর্ক বলল,

—“স্যার, জল না থাকলে স্কুলে পড়াশোনা করা যায় না। তাই জলটাকেও পড়াশোনার মতোই গুরুত্ব দিতে হবে।”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”

অর্ক একটু ভেবে বলল,

—“জানি না।”

—“কেন?”

—“আমি আগে বড় হয়ে উঠি। তারপর ঠিক করব।”

সবাই হেসে ফেলল।

কয়েক বছর পর সেই স্কুলে নতুন বড় জলাধার তৈরি হল।

বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা আরও ভালো করা হল।

গ্রামের আরও তিনটি স্কুল সেই পদ্ধতি অনুসরণ করল।

একদিন পুরোনো কুয়োটার পাশে দাঁড়িয়ে হরিদাসবাবু অর্ককে বললেন,

—“মনে আছে, একদিন তুই জিজ্ঞেস করেছিলি—বৃষ্টি না হলে কী হবে?”

অর্ক হাসল।

—“মনে আছে।”

—“তখন তোকে উত্তর দিতে পারিনি।”

অর্ক বলল,

—“এখন পারেন?”

প্রধান শিক্ষক বললেন,

—“হ্যাঁ।”

—“কী?”

হরিদাসবাবু বললেন,

—“বৃষ্টি কখন হবে, সেটা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বৃষ্টি হলে তার এক ফোঁটাও নষ্ট হতে দেব কি না—সেটা আমাদের হাতে।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

পুরোনো কুয়োর পাশে তখন নতুন একটা কলসি রাখা।

কলসির গায়ে লেখা—

“জল শেষ হওয়ার আগে জলের মূল্য বুঝতে শেখো।”

সেই কলসিটাই ছিল স্কুলের শেষ কলসি নয়।

বরং—

নতুন করে জলকে সম্মান করার প্রথম কলসি।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

বাঁশের ঝুড়ির ভিতর।

নদীর ধারে ছোট্ট একটা গ্রাম—নাম মাধবপুর।

গ্রামটা খুব সুন্দর। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝখানে কাঁচা রাস্তা, আর গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা পুরোনো বটগাছ। সেই বটগাছের নিচেই প্রতিদিন বিকেলে বসতেন গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ।

মাধবপুরের আর একটা পরিচয় ছিল।

এই গ্রামের মানুষ বাঁশ দিয়ে ঝুড়ি, কুলো, ডালা, চালুনি আর নানা ধরনের জিনিস তৈরি করত।

কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল।

প্লাস্টিকের ঝুড়ি বাজার দখল করে নিচ্ছিল।

শহরের সস্তা জিনিসের সঙ্গে গ্রামের হাতে তৈরি বাঁশের জিনিসের প্রতিযোগিতা হচ্ছিল না।

একসময় যে বাড়িগুলো থেকে সকাল-বিকেল বাঁশ কাটার শব্দ শোনা যেত, সেখানে নীরবতা নেমে এল।

সেই গ্রামেই থাকত কেয়া।

বয়স মাত্র উনিশ।

তার বাবা নিতাই ছিলেন বাঁশের কারিগর।

বাবার হাতের কাজ ছিল অসাধারণ।

তিনি একটা সাধারণ বাঁশের টুকরো হাতে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন সুন্দর ঝুড়ি বানিয়ে ফেলতেন যে মনে হতো, বাঁশ নয়—কেউ যেন কাঠের ওপর ছবি এঁকেছে।

কিন্তু সেই কাজ থেকে সংসার চলছিল না।

একদিন বাজার থেকে ফিরে নিতাই একটা ঝুড়ি উঠোনে ছুড়ে রেখে বললেন,

—“আজ সারাদিন বসে থেকেও তিনটে ঝুড়ি বিক্রি হল।”

কেয়া চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

—“কত পেলেন?”

—“দেড়শো টাকা।”

মা বললেন,

—“তুমি আর এই কাজ কোরো না। অন্য কিছু করো।”

নিতাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—“বাঁশের কাজ ছেড়ে দিলে আমার হাত দুটোই যেন অকেজো হয়ে যাবে।”

কেয়া বাবার পাশে বসে বলল,

—“কাজটা খারাপ নয় বাবা। হয়তো আমরা কাজটাকে নতুনভাবে দেখছি না।”

বাবা হেসে বললেন,

—“তুই এখন আমাকে শেখাবি?”

কেয়া বলল,

—“হ্যাঁ। শেখাব।”

বাবা হেসে ফেললেন।

কিন্তু কেয়া কথাটা সত্যিই ভেবে দেখেছিল।

পরদিন সে বাবার বানানো ঝুড়িগুলো ভালো করে দেখতে শুরু করল।

সবগুলোই একই ধরনের।

বড় ঝুড়ি।

মাঝারি ঝুড়ি।

ছোট ঝুড়ি।

কুলো।

ডালা।

চালুনি।

কেয়া বলল,

—“বাবা, এগুলো দেখতে সুন্দর। কিন্তু শহরের মানুষ এগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে?”

বাবা বললেন,

—“ঝুড়ি দিয়ে জিনিস রাখবে।”

—“আর কিছু?”

বাবা মাথা নাড়লেন।

সেই রাতে কেয়া একটা খাতা খুলল।

পাতার ওপর লিখল—

“বাঁশ দিয়ে আর কী কী বানানো যায়?”

তারপর সে ভাবতে শুরু করল।

ফুলের টবের খোলস।

ল্যাম্পশেড।

কলম রাখার পাত্র।

ফলের ঝুড়ি।

চা রাখার বাক্স।

ছোট আয়নার ফ্রেম।

দেয়ালে ঝোলানোর সাজসজ্জা।

মোবাইল রাখার স্ট্যান্ড।

আরও অনেক কিছু।

পরদিন কেয়া বাবাকে বলল,

—“আমরা শুধু ঝুড়ি বানাব না।”

বাবা অবাক।

—“তাহলে?”

—“বাঁশ দিয়ে বাড়ির জিনিস বানাব।”

বাবা কিছু বললেন না।

কেয়া কাজ শুরু করল।

প্রথমে সে একটা ছোট ল্যাম্পশেডের নকশা আঁকল।

বাবা সেটাকে দেখে বললেন,

—“এটা বাঁশ দিয়ে হবে?”

—“চেষ্টা করে দেখুন।”

বাবা বাঁশ কেটে পাতলা করে নিলেন।

কয়েক ঘণ্টা পর তৈরি হল একটা সুন্দর ল্যাম্পশেড।

মাটির প্রদীপের আলো তার ফাঁক দিয়ে বাইরে এসে দেওয়ালে অদ্ভুত নকশা তৈরি করল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এটা তো সত্যিই সুন্দর!”

কেয়া বলল,

—“এবার ছবি তুলব।”

সে মোবাইলে ছবি তুলল।

তারপর ছবিটা গ্রামের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে শহরের একটা অনলাইন পেজে পাঠাল।

কয়েকদিন কোনো উত্তর এল না।

তারপর এক সন্ধ্যায় ফোন এল।

একজন মহিলা বললেন,

—“আপনারা কি এই ধরনের ল্যাম্পশেড তৈরি করেন?”

কেয়া বলল,

—“হ্যাঁ।”

—“আমাদের দশটা লাগবে।”

কেয়া যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

—“দশটা?”

—“হ্যাঁ। আরও ভালো হলে পরে বেশি নেব।”

ফোন রেখে কেয়া ছুটে বাবার কাছে গেল।

—“বাবা!”

নিতাই তখন বাঁশ কাটছিলেন।

—“কী হয়েছে?”

—“দশটা অর্ডার!”

বাবার হাত থেমে গেল।

—“কীসের?”

—“ল্যাম্পশেড।”

নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“সত্যি?”

কেয়া হেসে বলল,

—“মিথ্যে বললে তো এত খুশি হতাম না।”

সেই দশটা ল্যাম্পশেড তৈরি করতে গ্রামের আরও দুজন কারিগরকে ডাকা হল।

তারপর আরও অর্ডার এল।

কেয়া বুঝল—শুধু নিজের পরিবার নয়, পুরো গ্রামের কারিগরদের নিয়ে কাজ করতে হবে।

সে বটগাছের নিচে একটা ছোট বৈঠক ডাকল।

গ্রামের কারিগররা এলেন।

কেয়া বলল,

—“আমরা সবাই আলাদা আলাদা করে কাজ করলে দাম কম পাব। কিন্তু সবাই মিলে কাজ করলে বড় অর্ডার নিতে পারব।”

একজন বৃদ্ধ কারিগর বললেন,

—“কিন্তু আমাদের জিনিস কে কিনবে?”

কেয়া বলল,

—“আমি খুঁজব।”

সে ছবি তুলতে লাগল।

প্রতিটি পণ্যের নাম দিল।

দাম লিখল।

কোন বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে তৈরি হয়েছে—সেটাও লিখল।

সবচেয়ে বড় কথা, সে প্রতিটি কারিগরের নামও লিখে রাখল।

কেয়া বলত,

—“এই জিনিসটা শুধু বাঁশ দিয়ে তৈরি নয়। এর সঙ্গে একজন মানুষের কয়েক ঘণ্টার শ্রম জড়িয়ে আছে।”

ধীরে ধীরে অর্ডার বাড়তে লাগল।

গ্রামের যে যুবকেরা অন্য শহরে কাজের জন্য চলে যেতে চেয়েছিল, তারাও ফিরে এল।

কারও কাজ হল বাঁশ কাটার।

কারও কাজ বাঁশ শুকোনোর।

কারও কাজ বুননের।

কারও কাজ পালিশের।

আর কেয়ার কাজ হল নকশা, ছবি, হিসাব আর ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ।

একদিন শহর থেকে একদল মানুষ গ্রামে এল।

তারা মাধবপুরের কাজ দেখতে চাইল।

বটগাছের নিচে বসে তারা কারিগরদের কাজ দেখল।

একজন শহুরে মহিলা একটা ছোট বাঁশের ঝুড়ি হাতে নিয়ে বললেন,

—“এটার দাম কত?”

নিতাই দাম বললেন।

মহিলা বললেন,

—“এত কম?”

নিতাই অবাক।

কেয়া হেসে বলল,

—“আমরা এতদিন শুধু জিনিসের দাম ভেবেছি। শ্রমের দাম ভাবিনি।”

মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“আজ থেকে আপনারা নিজের কাজের দাম নিজেরাই ঠিক করবেন।”

সেদিনের পর মাধবপুরে একটা পরিবর্তন শুরু হল।

কারিগররা আর নিজেদের কাজ লুকিয়ে রাখত না।

বরং গর্ব করে বলত,

—“আমি বাঁশের কাজ করি।”

যে কাজ একসময় দারিদ্র্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো, সেটাই ধীরে ধীরে গ্রামের পরিচয় হয়ে উঠল।

কয়েক মাস পর কেয়ার বাবা নতুন একটা জিনিস বানালেন।

একটা বড় বাঁশের ঝুড়ি।

কিন্তু ঝুড়িটার ভিতরে তিনি একটা ছোট কাঠের বাক্স বসিয়েছিলেন।

কেয়া জিজ্ঞেস করল,

—“এটা কী?”

বাবা বললেন,

—“তোর জন্য।”

কেয়া বাক্সটা খুলল।

ভিতরে একটা কাগজ।

বাবা লিখেছেন—

“যে জিনিসকে সবাই শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করে, তার ভিতরেও নতুন শুরুর জায়গা থাকে।”

কেয়ার চোখ ভিজে গেল।

সে বাবার হাত ধরে বলল,

—“এই কথাটা কোথা থেকে শিখলেন?”

নিতাই হাসলেন।

—“তুই শিখিয়েছিস।”

সন্ধ্যায় বটগাছের নিচে আবার গ্রামের মানুষ জড়ো হল।

কেউ বাঁশ কাটছে।

কেউ বুনছে।

কেউ নতুন নকশা আঁকছে।

দূরে বাজারের রাস্তা ধরে একটা গাড়ি চলে গেল।

কেয়া তাকিয়ে রইল।

তার মনে হল, বদলে যাওয়ার জন্য সবসময় বড় শহরে যেতে হয় না।

কখনও কখনও নিজের গ্রামের পুরোনো কাজটার ভিতরেই নতুন ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে।

শুধু তাকে খুঁজে বের করার মতো একজন মানুষের দরকার হয়।

মাধবপুরে সেই মানুষটি ছিল কেয়া।

আর একটা সাধারণ বাঁশের ঝুড়ির ভিতরে সে খুঁজে পেয়েছিল—

একটা পুরো গ্রামের নতুন স্বপ্ন।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

লাল মাটির পথ।

শালবনের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা গ্রাম—নাম তার কুসুমডাঙা। গ্রামের একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে লাল মাটির উঁচুনিচু পথ চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। বর্ষায় সেই পথ কাদায় ডুবে যায়, আর গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে হাঁটা কঠিন হয়ে ওঠে।

গ্রামের মানুষজন বহু বছর ধরে একটা সমস্যায় ভুগছিল।

গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। বাজার যেতে হলে আরও তিন কিলোমিটার। কিন্তু কুসুমডাঙা থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার কোনো ভালো পথ ছিল না।

বর্ষায় অসুস্থ মানুষকে বাঁশের খাটিয়ায় তুলে নিয়ে যেতে হতো।

কেউ কেউ মাঝপথেই ফিরে আসত।

গ্রামের সবাই সমস্যাটা জানত। কিন্তু সমস্যাটা যেন সবারই—তাই কারও একার দায়িত্ব ছিল না।

সেই গ্রামেই থাকত মাধবী।

বয়স তার তেইশ। বাবা নেই। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। মাধবী নিজে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে আর পড়তে পারেনি। সংসারের জন্য ছোটবেলা থেকেই কাজ করেছে।

কিন্তু একটা জিনিস সে খুব ভালোবাসত—রাস্তা।

অদ্ভুত শোনালেও সত্যি।

মাধবী প্রায়ই গ্রামের পথ ধরে হাঁটত। কোথায় গর্ত, কোথায় জল জমে, কোথায় রাস্তা সরু—সব তার মুখস্থ।

একদিন বর্ষার দুপুরে গ্রামের বৃদ্ধা কমলা পিসি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

মাধবী ছুটে এল।

—“পিসি, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

দুজন যুবক বাঁশের খাটিয়া নিয়ে এল।

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।

লাল মাটির পথ কাদায় পরিণত হয়েছে।

চারজন মিলে কমলা পিসিকে খাটিয়ায় তুলে রওনা দিল।

কিন্তু আধঘণ্টা পরেই সমস্যা হল।

একটা জায়গায় রাস্তার মাঝখানে এত বড় গর্ত তৈরি হয়েছে যে খাটিয়া নিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল।

কমলা পিসি কষ্ট করে বললেন,

—“আমাকে আর নিয়ে যেও না। বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে চলো।”

মাধবী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখের সামনে যেন শুধু গর্তটা নয়—পুরো গ্রামের ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে ছিল।

সেদিন শেষ পর্যন্ত পাশের গ্রামের একটা ট্রাক্টর ডেকে কমলা পিসিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বেঁচে গেলেন।

কিন্তু মাধবী সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিল।

এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।

পরদিন সকালে সে একটা খাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

প্রথমে গ্রামের সব রাস্তা মেপে নিল।

কোথায় গর্ত, কোথায় কালভার্ট ভাঙা, কোথায় জল জমে—সব লিখে রাখল।

তারপর গ্রামের মানুষজনের বাড়ি বাড়ি গেল।

—“আপনারা সবাই একটা করে সই করবেন?”

একজন হেসে বলল,

—“কী হবে সই করে?”

মাধবী বলল,

—“রাস্তার জন্য আবেদন করব।”

আরেকজন বলল,

—“আগেও তো অনেক আবেদন হয়েছে।”

মাধবী শান্তভাবে বলল,

—“হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা রাস্তার সমস্যার পুরো হিসাব দেব।”

সে শুধু সই সংগ্রহ করল না।

প্রতিটি গর্তের ছবি তুলল।

বর্ষায় কোথায় জল জমে তার ছবি তুলল।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের সমস্যা লিখে রাখল।

অসুস্থ মানুষকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, তারও তথ্য সংগ্রহ করল।

তারপর সব কাগজ সুন্দর করে সাজিয়ে আবেদন করল।

কিন্তু উত্তর এল না।

এক মাস কেটে গেল।

দুই মাস।

তিন মাস।

গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।

একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বলল,

—“মাধবী, এত কাগজপত্র করে কী পেলি?”

মাধবী চা নামিয়ে রেখে বলল,

—“রাস্তা এখনও হয়নি। কিন্তু কাজটা শেষও হয়নি।”

—“তুই একা কী করতে পারবি?”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

—“আমি একা নই। এই গ্রামের সবাই তো আমার সঙ্গে আছে।”

লোকটা চারদিকে তাকিয়ে বলল,

—“কোথায়?”

মাধবী বলল,

—“আজ নেই। কাল থাকবে।”

সেই কথাটা সত্যি হতে শুরু করল।

মাধবী গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে একটা ছোট দল তৈরি করল।

নাম দিল—‘আমাদের পথ’।

বাচ্চারা রাস্তার পাশে প্লাস্টিক পড়ে থাকলে তুলে ফেলত।

কেউ গর্তের পাশে বাঁশ পুঁতে দিত, যাতে রাতে মানুষ পড়ে না যায়।

কেউ রাস্তার জল বের করার জন্য ছোট নালা পরিষ্কার করত।

গ্রামের যুবকরাও ধীরে ধীরে যুক্ত হল।

একদিন পঞ্চাশ বছরের কৃষক হরিপদ এসে বললেন,

—“তুই যখন ছাড়ছিস না, আমরাও ছাড়ব না।”

তারপর শুরু হল গ্রামের মানুষের নিজস্ব উদ্যোগ।

যেখানে বড় গর্ত, সেখানে ইট ফেলা হল।

যেখানে জল দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে নালা কাটা হল।

কেউ শ্রম দিল।

কেউ বাঁশ দিল।

কেউ পুরনো ইট দিল।

কেউ শুধু এক বোতল জল নিয়ে এসে কাজ করা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াল।

মাধবী বুঝতে পারল—একটা রাস্তা শুধু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি হয় না।

মানুষের ইচ্ছা দিয়েও রাস্তা তৈরি হয়।

ছয় মাস পরে একদিন খবর এল—গ্রামের রাস্তা সংস্কারের জন্য সরকারি প্রকল্পে কাজ অনুমোদন হয়েছে।

কাজ শুরু হল।

বড় বড় মেশিন এল।

লাল মাটির পথ ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।

যে পথে বর্ষায় হাঁটা যেত না, সেখানে পাথর বিছানো হল।

নালা তৈরি হল।

কালভার্ট মেরামত হল।

কয়েক মাস পর রাস্তার চেহারা বদলে গেল।

সেদিন সকালে মাধবী একা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার মা এসে বললেন,

—“কী দেখছিস?”

মাধবী বলল,

—“রাস্তা।”

মা হেসে বললেন,

—“রাস্তা তো প্রতিদিনই দেখিস।”

মাধবী মাথা নাড়ল।

—“আজ অন্যরকম লাগছে।”

ঠিক তখনই দূর থেকে একটা অ্যাম্বুল্যান্স এল।

কুসুমডাঙার রাস্তা ধরে সরাসরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে চলে গেল।

মাধবীর চোখে জল এসে গেল।

তার মনে পড়ল কমলা পিসির সেই দিনটার কথা।

কাদায় আটকে থাকা খাটিয়া।

অসহায় মানুষের মুখ।

আর নিজের সেই সিদ্ধান্ত—

এই রাস্তা ঠিক করতেই হবে।

কয়েকদিন পর গ্রামের স্কুলে একটা অনুষ্ঠান হল।

প্রধান শিক্ষক মাধবীকে সামনে ডেকে বললেন,

—“তুমি রাস্তা বানাওনি শুধু। তুমি আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছ।”

মাধবী অবাক হয়ে বলল,

—“কী শিক্ষা?”

প্রধান শিক্ষক বললেন,

—“সমস্যা বড় হলেই মানুষ অসহায় হয় না। মানুষ তখনই অসহায় হয়, যখন সে সমস্যাকে নিজের বলে মনে করা বন্ধ করে দেয়।”

সবাই হাততালি দিল।

মাধবী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

অনুষ্ঠান শেষে ছোট্ট এক ছাত্র তার কাছে এসে বলল,

—“দিদি, বড় হয়ে আমি কী করব জানো?”

মাধবী হাসল।

—“কী করবে?”

ছেলেটা বলল,

—“যেখানে রাস্তা নেই, সেখানে রাস্তা বানাব।”

মাধবী তার মাথায় হাত রেখে বলল,

—“রাস্তা বানানোর আগে একটা কথা মনে রাখবে।”

—“কী?”

—“রাস্তা শুধু গন্তব্যে নিয়ে যায় না। রাস্তা মানুষকে মানুষের কাছেও নিয়ে যায়।”

সন্ধ্যা নেমেছিল।

লাল মাটির পথের ওপর সূর্যের শেষ আলো পড়েছিল।

মাধবী ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

পেছনে পড়ে রইল সেই পথ—

যে পথ একদিন ছিল গ্রামের দুঃখের কারণ,

আর আজ হয়ে উঠেছে

গ্রামের স্বপ্নের পথ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

স্টেশনের লকার নম্বর ১৭।

প্রতিদিন সকালে স্টেশনে এসে একই কাজ করত বিজয়।

প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রি করত সে।

চা, বিস্কুট আর কয়েকটা খবরের কাগজ—এই ছিল তার ছোট্ট সংসার।

এক শীতের সকালে চা দিতে গিয়ে সে দেখল, প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন।

বিজয় জিজ্ঞেস করল,

—“কাউকে অপেক্ষা করছেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“হ্যাঁ। তবে জানি না সে আসবে কি না।”

—“কতক্ষণ ধরে?”

—“বিশ বছর।”

বিজয় অবাক হয়ে গেল।

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

সেদিন সন্ধ্যায় ট্রেন চলে যাওয়ার পর বিজয় দেখল, বেঞ্চের নিচে একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স পড়ে আছে।

বাক্সের ওপর লেখা—

“লকার ১৭।”

স্টেশনের পুরনো লকারঘরে গিয়ে সে ১৭ নম্বর লকারটা খুঁজে পেল।

লকারটি তালাবন্ধ।

কিন্তু পাশে একটি ছোট্ট চাবি পড়ে ছিল।

বিজয় চাবিটা দিয়ে লকার খুলল।

ভেতরে একটি কাপড়ে মোড়ানো বাক্স।

আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—

“যে মানুষ এটি পাবে, সে যেন চিঠিটা পড়ে।”

বিজয় চিঠি খুলল।

“আমি জানি না, এই চিঠি কার হাতে পৌঁছবে।

বিশ বছর আগে আমি এই স্টেশনে আমার ছেলেকে শেষবার দেখেছিলাম। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। সে রাগ করে চলে যায়।

যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘বাবা, কোনওদিন যদি মনে হয় আমি তোমাকে ভুলে গেছি, লকার ১৭ খুলবে।’

কিন্তু আমি কখনও লকারটা খুলিনি।

কারণ মনে হয়েছিল, সে নিজেই একদিন ফিরে এসে খুলবে।

যদি আমি না থাকি, তবে এই বাক্সটা তার হাতে পৌঁছে দিও।”

বিজয়ের বুকটা কেঁপে উঠল।

বাক্স খুলে দেখা গেল—একটি পুরনো ঘড়ি, একটি শিশুর ছবি এবং কিছু টাকা।

আর একটি কাগজ।

তাতে লেখা—

“তোর পড়াশোনার জন্য জমিয়েছিলাম। তুই হয়তো নিতে আসিসনি। কিন্তু টাকা এখনও তোরই।”

বিজয় বুঝল, এই বাক্সটি কোনও সাধারণ বাক্স নয়।

সে পরদিন সেই বৃদ্ধকে খুঁজতে শুরু করল।

দু’দিন পর জানতে পারল, বৃদ্ধের নাম নরেন।

তিনি স্টেশনের কাছেই একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন।

বিজয় ছুটে গেল।

নরেনবাবু চিঠিটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“তুমি লকার খুলেছ?”

—“জি।”

—“আমার ছেলে?”

—“আমি জানি না।”

বৃদ্ধের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

একজন মাঝবয়সি মানুষ দাঁড়িয়ে।

হাতে পুরনো ব্যাগ।

তিনি ভেতরে ঢুকে বললেন,

—“বাবা…”

নরেনবাবু যেন পাথর হয়ে গেলেন।

মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর সামনে বসে পড়ল।

—“আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।”

নরেনবাবু কাঁপা গলায় বললেন,

—“তুই এলি?”

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,

—“আজ লকার ১৭ খুলতে এসেছিলাম।”

বিজয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

ছেলেটি বলল,

—“বাবা, আমি জানতাম না তুমি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ।”

নরেনবাবু হেসে বললেন,

—“বাবারা অপেক্ষা করার জন্য কোনও কারণ খোঁজে না।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

বিজয় বেরিয়ে আসার সময় নরেনবাবু তাকে ডাকলেন।

—“বিজয়।”

—“জি?”

—“তুই না থাকলে হয়তো আমার ছেলে আর আমার দেখা হতো না।”

বিজয় মাথা নাড়ল।

—“আমি শুধু লকারটা খুলেছি।”

নরেনবাবু বললেন,

—“না। তুই একটা দরজা খুলেছিস।”

বিজয় কিছু বুঝতে না পেরে চলে গেল।

পরদিন সকালে স্টেশনে এসে সে নিজের চায়ের দোকান খুলল।

কিছুক্ষণ পর এক তরুণ ছুটে এসে বলল,

—“দাদা, এক কাপ চা দেবেন?”

বিজয় চা এগিয়ে দিল।

তরুণটি হাসল।

—“বাবা বলেছে, আপনার কাছে একদিন চা খেতেই হবে।”

বিজয় তাকিয়ে দেখল—নরেনবাবুর ছেলে।

দু’জনেই হেসে ফেলল।

স্টেশনে তখন ট্রেন ঢুকছে।

মানুষ ছুটছে।

ঘোষণার শব্দ ভেসে আসছে।

আর প্ল্যাটফর্মের এক কোণে, লকার নম্বর ১৭ নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে।

কারণ তার ভেতরের অপেক্ষাটা অবশেষে শেষ হয়েছে।

কিছু তালা চাবি দিয়ে খোলা যায়। আর কিছু তালা খুলতে লাগে শুধু একজন মানুষের একটু সাহস।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

রেডিওর শেষ গান।

বৃদ্ধ অশোকবাবুর ঘরে একটা পুরনো রেডিও ছিল।

রেডিওটা প্রায় ত্রিশ বছরের পুরনো। কাঠের গায়ে আঁচড়, ভলিউমের নবটা একটু বেঁকে গেছে, মাঝেমধ্যে শব্দও কেঁপে উঠত।

তবু অশোকবাবু প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালাতেন।

একই সময়ে।

একই চেয়ারে বসে।

একদিন পাশের বাড়ির রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি প্রতিদিন এই রেডিওটা শোনেন কেন?”

অশোকবাবু হেসে বললেন,

—“কারণ এখানে একটা কণ্ঠস্বর আছে।”

—“কার?”

—“যে কণ্ঠস্বরটা আমাকে একদিন বলেছিল—‘অপেক্ষা করো।’”

রিয়া কিছুই বুঝল না।

অশোকবাবু আর কিছু বললেন না।

পরদিনও সন্ধ্যা সাতটায় রেডিও চালু হল।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ রেডিওটা বন্ধ হয়ে গেল।

অশোকবাবু অনেক চেষ্টা করেও চালু করতে পারলেন না।

তিনি যেন খুব ভেঙে পড়লেন।

রিয়া বলল,

—“আমি ঠিক করে দেব।”

পরদিন সে রেডিওটা নিয়ে গেল তার পরিচিত এক মেকানিকের কাছে।

মেকানিক রেডিও খুলে বলল,

—“এটা ঠিক করা সম্ভব। তবে পুরনো হওয়ায় একটু সময় লাগবে।”

রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—“এর মধ্যে এমন কী আছে?”

মেকানিক একটা ছোট্ট ক্যাসেট বের করল।

—“এটা কোথা থেকে এল?”

রিয়া অবাক হয়ে বলল,

—“রেডিওর ভেতরেই ছিল?”

মেকানিক মাথা নাড়ল।

ক্যাসেটটা অনেক পুরনো।

রিয়া বাড়ি ফিরে অশোকবাবুকে সব বলল।

তিনি ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“চালিয়ে দে।”

রিয়া পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করল।

বোতাম চাপতেই ভেসে এল এক তরুণীর কণ্ঠ—

“অশোক, তুমি যদি কোনওদিন এই কথাগুলো শোনো, তাহলে বুঝবে আমি তোমাকে ভুলিনি।”

অশোকবাবুর হাত কেঁপে উঠল।

রিয়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

কণ্ঠস্বরটি বলছিল,

“বাবা আমাকে অন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না আবার কখন ফিরতে পারব। কিন্তু তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কোনওদিন যদি আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাও, বুঝবে আমি ফিরে এসেছি।”

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

শেষে সেই কণ্ঠ বলল,

“আর যদি আমি ফিরতে না পারি, তবুও রেডিওটা চালিয়ে রেখো। কারণ অপেক্ষা করা মানে শুধু কাউকে পাওয়ার আশা নয়। অপেক্ষা মানে কাউকে ভুলে না যাওয়া।”

ক্যাসেট থেমে গেল।

ঘরে নিস্তব্ধতা।

অশোকবাবুর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।

রিয়া ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

—“তিনি কোথায়?”

অশোকবাবু জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“জানি না।”

—“আপনি খুঁজেছিলেন?”

—“চল্লিশ বছর।”

পরদিন রিয়া পুরনো রেডিও অনুষ্ঠানের আর্কাইভ খুঁজতে শুরু করল।

কণ্ঠস্বরটি কোনও অনুষ্ঠানের ছিল না।

ক্যাসেটটি ব্যক্তিগত রেকর্ডিং।

তবু ক্যাসেটের বাক্সের নিচে একটি পুরনো কাগজ পাওয়া গেল।

একটি নাম।

মাধুরী সেন।

আর একটি হাসপাতালের নাম।

রিয়া অনেক খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারল, মাধুরী সেন নামে একজন বৃদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন।

শহরটা অন্য।

ঠিকানা পাওয়া গেল।

দু’দিন পর অশোকবাবু আর রিয়া সেই ঠিকানায় পৌঁছাল।

দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা।

অশোকবাবুকে দেখে তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।

অশোকবাবু শুধু বললেন,

—“রেডিওটা এখনও চালাই।”

বৃদ্ধার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

—“আমি ভেবেছিলাম তুমি আর অপেক্ষা করবে না।”

অশোকবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“তুমি বলেছিলে অপেক্ষা করতে।”

বৃদ্ধা চোখ মুছে বললেন,

—“এত বছর?”

—“কণ্ঠস্বরটা তো প্রতিদিন শুনতাম।”

দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

রিয়া একটু দূরে সরে গেল।

কারণ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের মধ্যে থাকা যায় না।

সন্ধ্যা সাতটায় অশোকবাবুর বাড়িতে আবার রেডিও বাজল।

এবার পুরনো কাঁপা শব্দের সঙ্গে মিশে গেল দুটি বৃদ্ধ কণ্ঠের হাসি।

রেডিওর গান শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু অপেক্ষার গল্পটা সেদিনই যেন শেষ হল।

কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনে ফিরে আসে দেরিতে—কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আমরা বুঝতে পারি অপেক্ষাটাও ভালোবাসারই একটি রূপ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

করিডরের বেঞ্চ।

হাসপাতালের তৃতীয় তলার করিডরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের বেঞ্চ ছিল।

সকাল থেকে রাত—প্রায় সারাদিনই সেখানে কেউ না কেউ বসে থাকত।

সেদিন রাত দুটোয় বেঞ্চটায় বসে ছিল সমীর।

হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা—

“অপারেশন থিয়েটার—৩।”

তার স্ত্রী ভিতরে।

সমীরের বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপা ভয়।

ঠিক তখন পাশের দরজা দিয়ে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন।

বৃদ্ধের হাতে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ।

তিনি সমীরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,

—“আপনারও?”

সমীর বুঝতে না পেরে বলল,

—“জি?”

—“অপেক্ষা।”

সমীর মাথা নাড়ল।

বৃদ্ধ বললেন,

—“আমার মেয়ে ভিতরে।”

দু’জনেই চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর সমীর জিজ্ঞেস করল,

—“কতক্ষণ হলো?”

—“চার ঘণ্টা।”

সমীর অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি একা?”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

—“আমি আর কে আছি?”

সমীর আর প্রশ্ন করল না।

ভোরের দিকে নার্স এসে সমীরকে ডাকল।

—“আপনার রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের গ্রুপ?”

সমীর বলল।

নার্স চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর আবার এসে বলল,

—“আপনার সঙ্গে কেউ রক্ত দিতে পারবেন?”

সমীর মাথা নিচু করল।

—“আমি নিজেই দিতে পারব।”

বৃদ্ধ পাশ থেকে বললেন,

—“আপনি চাইলে আমি দিতে পারি।”

সমীর অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি?”

—“হ্যাঁ।”

—“কিন্তু আপনার মেয়ে তো ভিতরে!”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“রক্ত দিতে আধঘণ্টা লাগে। মানুষের পাশে থাকতে সারাজীবন লাগে।”

সমীর কিছু বলতে পারল না।

পরীক্ষা করে দেখা গেল, বৃদ্ধের রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে।

রক্ত দেওয়ার পর বৃদ্ধ আবার সেই বেঞ্চে এসে বসলেন।

সমীর তাঁর হাত ধরে বলল,

—“আমি আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।”

বৃদ্ধ বললেন,

—“ঋণী হবেন না।”

—“তাহলে?”

—“কেউ একদিন আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজ আমি আপনার পাশে দাঁড়ালাম। এটাই জীবন।”

সকাল আটটার দিকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে বললেন,

—“অপারেশন সফল হয়েছে।”

সমীর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর বৃদ্ধকে খুঁজতে গেল।

বেঞ্চটা খালি।

কাপড়ের ব্যাগটাও নেই।

শুধু বেঞ্চের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।

সমীর তুলে পড়ল—

“আপনার স্ত্রী ভালো হয়ে উঠুন। আর যদি কোনওদিন কাউকে হাসপাতালে একা বসে থাকতে দেখেন, তার পাশে একটু বসবেন। সব রোগের ওষুধ হয়তো আপনার কাছে থাকবে না, কিন্তু একাকীত্বের ওষুধ আপনার কাছে থাকতেই পারে।”

সমীর কাগজটা বুকপকেটে রেখে দিল।

বছর দুয়েক পর।

একই হাসপাতাল।

একই করিডর।

একই বেঞ্চ।

সমীর এবার একা নয়।

তার সঙ্গে তার স্ত্রী।

দু’জনেই হাসপাতালের করিডরে বসে আছে।

হঠাৎ তারা দেখল, এক তরুণী একা বেঞ্চের কোণে বসে কাঁদছে।

সমীর উঠে তার পাশে গিয়ে বসল।

—“ভয় লাগছে?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

সমীর বলল,

—“ভয় পেলে একা থাকতে হয় না।”

তার স্ত্রী দূর থেকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

করিডরের পুরনো বেঞ্চটা তখনও একই জায়গায় ছিল।

শুধু সেখানে বসা মানুষগুলো বদলে গিয়েছিল।

আর অদৃশ্যভাবে এক মানুষের ছোট্ট মানবিকতা থেকে আরেক মানুষের জীবনে ছড়িয়ে পড়ছিল আরেকটি আলো।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

লাল সাইকেল।

বাড়ির পেছনের ছোট্ট ঘরটায় বহু বছর ধরে পড়ে ছিল লাল সাইকেলটা।

চাকা দুটোয় হাওয়া নেই। লোহার গায়ে মরচে। ঘণ্টাটাও নষ্ট।

তবু অয়ন কখনও সেটাকে ফেলে দিতে পারেনি।

কারণ সাইকেলটা তার বাবার।

বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষবার বলেছিলেন,

—“এটা রেখে দিস। কোনওদিন কাজে লাগবে।”

অয়ন তখন হেসেছিল।

—“এই পুরনো সাইকেল দিয়ে কী হবে বাবা?”

বাবা শুধু বলেছিলেন,

—“সব জিনিসের কাজ টাকা দিয়ে মাপিস না।”

বাবা চলে যাওয়ার পর কথাটা অয়নের মনে বারবার ফিরে আসত।

কয়েক বছর পর অয়ন শহরে চাকরি পেল। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, নতুন জীবন।

পুরনো সাইকেলটা তবু থেকে গেল।

একদিন বাড়ি পরিষ্কার করার সময় অয়নের স্ত্রী বলল,

—“এটা আর রেখে কী হবে? বিক্রি করে দাও।”

অয়ন কিছুক্ষণ সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“না।”

সেদিন বিকেলে সাইকেলটা পরিষ্কার করতে গিয়ে সে সিটের নিচে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স দেখতে পেল।

বাক্স খুলে বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরনো কাগজ।

প্রথম কাগজে লেখা—

“অমলের পড়াশোনার খরচ—৫০০ টাকা।”

দ্বিতীয়টায়—

“রেণুর ওষুধ—৩০০ টাকা।”

তৃতীয়টায়—

“বিপ্লবের পরীক্ষার ফি—৭৫০ টাকা।”

অয়ন অবাক হয়ে গেল।

এই নামগুলো সে চেনে।

পাড়ার মানুষ।

কেউ এখন দোকান চালায়, কেউ অবসর নিয়েছে, কেউ অন্য শহরে চলে গেছে।

কিন্তু তার বাবা তাঁদের জন্য টাকা দিয়েছিলেন?

অয়ন আরও কাগজ বের করল।

প্রায় পঞ্চাশটি নাম।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয়—কোনও কাগজেই বাবার নিজের নাম নেই।

শেষ কাগজে মাত্র একটি লাইন—

“যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত নিতে নেই। একদিন তারা অন্য কাউকে সাহায্য করবে।”

অয়নের চোখ ভিজে উঠল।

পরদিন সে অমলকাকুর বাড়িতে গেল।

সব শুনে অমলকাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“তোর বাবা কাউকে জানতে দিত না।”

—“আপনি টাকা ফেরত দেননি?”

—“দিতে গিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, ‘আমাকে নয়, অন্য কাউকে দিয়ে দিও।’”

অয়ন চুপ করে রইল।

বাড়ি ফেরার পথে তার চোখে পড়ল—একটি ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সাইকেলের দিকে তাকিয়ে আছে।

ছেলেটির স্কুলের পোশাক পুরনো।

অয়ন জিজ্ঞেস করল,

—“সাইকেল চালাতে পারিস?”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

—“আমাদের সাইকেল নেই।”

অয়ন কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বাড়িতে ফিরে সেই লাল সাইকেলটা বের করল।

চাকা ঠিক করাল।

ব্রেক বদলাল।

ঘণ্টা লাগাল।

পরদিন ছেলেটাকে ডেকে বলল,

—“এটা তোর।”

ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,

—“কিন্তু কাকু, আমি টাকা দিতে পারব না।”

অয়ন হেসে বলল,

—“টাকা দিতে হবে না।”

—“তাহলে?”

অয়ন সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলল,

—“যেদিন তুই বড় হবি, আর কাউকে সাহায্য করার সুযোগ পাবি, তখন তাকে সাহায্য করবি।”

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

অয়ন সাইকেলটা তার হাতে তুলে দিল।

সেদিন রাতে অয়ন বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“বাবা, তোমার সাইকেলটা কাজে লেগেছে।”

ছবির মানুষটি অবশ্য কোনও উত্তর দিলেন না।

তবু অয়নের মনে হল, ঘরের কোথাও যেন সেই পুরনো সাইকেলের ঘণ্টা একবার বেজে উঠল।

টিং…

অয়ন হেসে ফেলল।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

কিছু উত্তর শব্দে আসে না। মানুষের ভালো কাজের মধ্যেই তারা বেঁচে থাকে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

নীল দরজার ঘর।

শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে বাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল।

বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা। জানালাগুলোর কাচ ভাঙা। আর সামনের দরজাটা বহু বছর ধরে তালাবন্ধ।

তবু বাড়িটার সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—দোতলায় একটি নীল দরজা।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই দরজার নিচ দিয়ে যেন এক ফালি আলো বেরোত।

পাড়ার সবাই বলত,

—“ও বাড়িতে কেউ থাকে না।”

কিন্তু রাহুল বিশ্বাস করত না।

কারণ সে নিজে বহুবার দেখেছে—রাত বাড়লে নীল দরজার নিচে আলো জ্বলে ওঠে।

একদিন প্রবল বৃষ্টির রাতে কৌতূহল সামলাতে না পেরে রাহুল বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল।

দরজাটা আশ্চর্যজনকভাবে খোলা ছিল।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সে নীল দরজার সামনে দাঁড়াল।

ভেতর থেকে টুপটাপ শব্দ আসছে।

রাহুল দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরের মাঝখানে একটি পুরনো টেবিল।

তার ওপর কেরোসিনের বাতি।

আর পাশে একটি কাঠের চেয়ার।

কিন্তু ঘরে কেউ নেই।

টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটি খাতা।

রাহুল খাতা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যে এই খাতা পড়ছ, দয়া করে শেষ পাতাটা পর্যন্ত পড়বে।”

রাহুল পড়তে শুরু করল।

লেখক একজন স্কুলশিক্ষক—নির্মলবাবু।

তিনি লিখেছিলেন, বহু বছর আগে এই ঘরে বসেই তিনি তাঁর এক ছাত্রকে পড়াতেন। ছেলেটির নাম ছিল শুভ।

শুভ অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। পড়াশোনায় ভালো হলেও একদিন বাবার মৃত্যুর পর তাকে স্কুল ছাড়তে হয়।

নির্মলবাবু তাকে বলেছিলেন,

—“তুই পড়া ছাড়বি না। আমি অপেক্ষা করব।”

কিন্তু শুভ আর ফিরে আসেনি।

দিন কেটে বছর।

নির্মলবাবু অবসর নেন।

তারপরও তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই ঘরে বাতি জ্বেলে বসতেন।

কারণ শুভ একদিন বলেছিল,

“স্যার, আমি একদিন বড় হয়ে আপনার কাছে ফিরব।”

রাহুল শেষ পাতার দিকে এগোল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য—

“শুভ, যদি কখনও ফিরে আসিস, দরজার নিচে আলোটা দেখে বুঝবি—আমি এখনও অপেক্ষা করছি।”

রাহুলের বুকটা কেমন করে উঠল।

খাতার নিচে একটা পুরনো ছবি ছিল।

ছবিতে নির্মলবাবু আর এক কিশোর।

ছবির পেছনে একটি ঠিকানা লেখা।

পরদিন রাহুল সেই ঠিকানা খুঁজতে বেরোল।

অনেক খোঁজার পর জানতে পারল, শুভ নামে একজন মানুষ সত্যিই ওই এলাকায় থাকেন।

এখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট।

রাহুল তাঁকে সব বলল।

বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর কাঁপা গলায় বললেন,

—“স্যার… এখনও অপেক্ষা করছেন?”

রাহুল উত্তর দিতে পারল না।

শুভ পরদিন রাহুলের সঙ্গে সেই বাড়িতে এলেন।

দোতলায় উঠে নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি থমকে গেলেন।

ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর খাতাটা দেখলেন।

তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

—“স্যার, আমি ফিরতে এত দেরি করে ফেললাম…”

ঘরের বাতিটা তখনও জ্বলছিল।

হঠাৎ জানালা দিয়ে আসা বাতাসে শিখাটা কেঁপে উঠল।

শুভ খাতার শেষ পাতায় হাত রাখলেন।

তারপর পকেট থেকে একটি ছোট্ট চিঠি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন।

চিঠিতে লেখা—

“স্যার, আপনি বলেছিলেন আমি একদিন ফিরব। আমি ফিরেছি। শুধু আপনি নেই। কিন্তু আপনার আলোটা এখনও জ্বলছে।”

রাহুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

শুভ উঠে যাওয়ার আগে বাতিটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আজ থেকে এই আলোটা আমি জ্বালাব।”

সেদিনের পর নীল দরজার ঘর আর কখনও অন্ধকার হয়নি।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে একটি বাতি জ্বলত।

কেউ জানত না, সেই আলো কাকে দেখানোর জন্য।

কিন্তু রাহুল জানত—

কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষের জীবনের চেয়েও দীর্ঘ হয়।

সমাপ্ত।

Share This