Categories
অনুগল্প গল্প

শেষ বাসের আগে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

শহরের প্রান্তের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডটা প্রায় ফাঁকা। দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু একটি চায়ের দোকানে ম্লান আলো জ্বলছে।

দোকানদার নিতাই হিসেব করছিলেন।

ঠিক তখনই তিনি দেখলেন, বেঞ্চের এক কোণে একটা ছোট্ট নীল ব্যাগ পড়ে আছে।

চারপাশে তাকালেন।

কেউ নেই।

ব্যাগটা হাতে নিয়ে ডাকলেন,

—“কার ব্যাগ? কারও ব্যাগ পড়ে গেছে?”

কোনও উত্তর এল না।

শেষ বাসটা আসতে আর দশ মিনিট।

নিতাই ব্যাগটা দোকানের ভেতর রেখে দিলেন। ভাবলেন, সকালে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই খুঁজতে আসবে।

ব্যাগটা তুলতেই তাঁর মনে হল, ভেতরে যেন কিছু ভারী জিনিস আছে।

তিনি ব্যাগ খোলেননি।

কিছুক্ষণ পর একটি বাস এসে দাঁড়াল।

একজন তরুণী ছুটে এসে বাসের দরজার কাছে দাঁড়িয়েই হঠাৎ থেমে গেল।

তার মুখ ফ্যাকাশে।

সে নিজের কাঁধে হাত দিয়ে ব্যাগ খুঁজল।

তারপর চারদিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

—“আমার ব্যাগটা… এখানে ছিল…”

নিতাই সঙ্গে সঙ্গে বুঝলেন।

—“নীল ব্যাগ?”

মেয়েটি দৌড়ে এল।

—“হ্যাঁ! হ্যাঁ, নীল ব্যাগ!”

নিতাই ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।

মেয়েটি ব্যাগ খুলে ভেতরের জিনিস দেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল।

—“সব আছে?”

নিতাই জিজ্ঞেস করলেন।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

তারপর ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করে বুকে চেপে ধরল।

নিতাই বললেন,

—“এটার জন্য এত চিন্তা করছিলেন?”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“এটা আমার বাবার শেষ চিঠি।”

নিতাই আর কিছু বললেন না।

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,

—“বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে এই চিঠিটা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যেদিন খুব একা লাগবে, পড়িস।’”

তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

—“আজ প্রথমবার বাড়ি ছেড়ে অন্য শহরে যাচ্ছি। বাবার চিঠিটা সঙ্গে না থাকলে মনে হচ্ছিল… আমি যেন একেবারেই একা হয়ে যাব।”

নিতাই মৃদু স্বরে বললেন,

—“তাই বুঝি এত তাড়াহুড়ো?”

মেয়েটি হেসে মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ।”

বাসের হর্ন বাজল।

মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।

তারপর পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে নিতাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।

—“আপনি এটা রাখুন।”

নিতাই হাত সরিয়ে নিলেন।

—“কেন?”

—“আপনি আমার ব্যাগটা রেখে দিয়েছেন।”

নিতাই হেসে বললেন,

—“আমি শুধু আমার কাজ করেছি।”

মেয়েটি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল,

—“আপনার মতো মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা এখনও নিরাপদ মনে হয়।”

বাস ছেড়ে দিল।

নিতাই অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

পরদিন সকালে দোকান খুলতে এসে দেখলেন, তাঁর দোকানের সামনে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে আছে।

তাতে লেখা—

“কাকু, বাবার চিঠিটা গত রাতে পড়েছিলাম। সেখানে বাবা লিখেছিলেন—‘মানুষকে বিশ্বাস করতে শিখিস, কারণ পৃথিবীতে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষ এখনও বেশি।’ কাল রাতে আপনার সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো কথাটা বিশ্বাস করতে পারতাম না। — মেঘলা”

নিতাই কাগজটা ভাঁজ করে তাঁর পুরনো হিসেবের খাতার মধ্যে রেখে দিলেন।

সেদিন থেকে দোকান বন্ধ করার আগে তিনি প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে নিতেন।

কোনও হারানো ব্যাগ পাওয়ার আশায় নয়।

বরং এই বিশ্বাসটা মনে রাখার জন্য—

কখনও কখনও আমরা কারও জীবনে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য আসি, অথচ সেই কয়েক মিনিটই তার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসটাকে আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : মাটির নিচে চাপা পড়া ঘণ্টাধ্বনি।

বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতি বছর বর্ষার পর অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা যেত।

সন্ধ্যার দিকে মাটির নিচ থেকে ভেসে আসত—

ঢং… ঢং… ঢং…

গ্রামের লোকেরা বলত, ওটা নাকি মাটির নিচে চাপা পড়া মন্দিরের ঘণ্টা।

কিন্তু কেউ কখনও সেই ঘণ্টা দেখেনি।

গ্রামের স্কুলশিক্ষক সৌরভ এসব গল্পে বিশ্বাস করতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তিনিও সেই শব্দ শুনলেন।

কিন্তু শব্দটা এবার অন্যরকম।

যেন খুব গভীর মাটি থেকে আসছে।

পরদিন সৌরভ স্কুলের কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করতে গেলেন।

এক ছাত্র রাকেশ বলল,

“স্যার, এখানে মাটি অন্য জায়গার থেকে নরম।”

সৌরভ লাঠি দিয়ে মাটি খুঁচিয়ে দেখলেন।

সত্যিই নিচে ফাঁপা শব্দ।

কয়েকজন গ্রামবাসীকে ডেকে মাটি সরানোর কাজ শুরু হল।

প্রায় চার ফুট নিচে একটি পাথরের কাঠামো বেরিয়ে এল।

আর তার মধ্যে একটি লোহার দরজা।

দরজা খুলতেই সবাই অবাক।

নিচে নামার জন্য সরু সিঁড়ি।

সৌরভ টর্চ জ্বালিয়ে নামলেন।

সিঁড়ির শেষে একটি ছোট ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল পুরোনো ঘণ্টা।

কিন্তু ঘণ্টাটি নড়ার কোনো সুযোগ নেই।

তাহলে শব্দ আসে কীভাবে?

সৌরভ চারপাশ পরীক্ষা করতে লাগলেন।

দেয়ালে খোদাই করা কিছু লেখা দেখতে পেলেন।

বাংলা অক্ষরে লেখা—

“বিপদের দিনে এই ঘণ্টা বাজবে।”

আরেক পাশে একটি সাল—

১৮৯৮।

সৌরভ বুঝলেন, এটি কোনো সাধারণ মন্দির নয়।

এটি ছিল গ্রামের পুরোনো সতর্কবার্তা কেন্দ্র।

ঠিক তখন রাকেশ চিৎকার করে বলল,

“স্যার! এখানে আরেকটা দরজা!”

দরজার ওপারে আরও একটি সরু পথ।

পথটি মাটির নিচ দিয়ে গ্রামের পুরোনো বাঁধের দিকে গিয়েছে।

হঠাৎ সৌরভের মনে পড়ল, গত কয়েকদিন ধরে গ্রামের নদীর জল অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।

সে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এসে বাঁধ পরীক্ষা করতে গেল।

বাঁধের একটি অংশে বড় ফাটল।

যদি রাতের বৃষ্টিতে নদীর জল আরও বাড়ে, তাহলে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।

সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চায়েত ও প্রশাসনকে খবর দিলেন।

কিন্তু গ্রামের মানুষ প্রথমে গুরুত্ব দিল না।

তখন সৌরভ তাদের ভূগর্ভস্থ ঘণ্টাটি দেখালেন।

এক বৃদ্ধ বললেন,

“আমার ঠাকুরদা বলতেন, এই ঘণ্টা একবার বাজলে গ্রামের সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে হতো।”

“কিন্তু এখন তো ঘণ্টা বাজে না।”

বৃদ্ধ বললেন,

“হয়তো আমরা ভুলে গেছি কীভাবে বাজাতে হয়।”

সৌরভ ঘণ্টাটির কাঠামো পরীক্ষা করলেন।

দেখলেন, মাটির নিচে একটি পুরোনো লোহার দড়ি চলে গেছে বাঁধের কাছে।

সম্ভবত নদীর জল নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠলে জলচাপের কারণে দড়িটি টানত এবং ঘণ্টা বাজত।

কিন্তু বহু বছর ধরে ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে।

সৌরভ সেই পুরোনো ব্যবস্থাটি মেরামত করার চেষ্টা করলেন।

সেই রাতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।

নদীর জল দ্রুত বাড়তে লাগল।

মাঝরাতে হঠাৎ—

ঢং!

তারপর—

ঢং!

ঢং!

পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল।

মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বৃদ্ধরা বুঝে গেলেন—এটি সতর্কবার্তা।

সৌরভ মাইক নিয়ে সবাইকে উঁচু জায়গায় চলে যেতে বললেন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাঁধের সেই অংশ ভেঙে গেল।

জল গ্রামে ঢুকল।

কিন্তু ততক্ষণে প্রায় সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।

সকাল হলে দেখা গেল, গ্রামের নিচু এলাকার অনেক বাড়ি জলে ডুবে গেছে।

কিন্তু প্রাণহানি হয়নি।

প্রশাসনের লোকেরা এসে পুরোনো ভূগর্ভস্থ ঘরটি দেখতে চাইল।

সৌরভ তাদের সব দেখালেন।

একজন ইতিহাসবিদ বললেন,

“এটি শুধু ঘণ্টাঘর নয়। এটি একশো বছরেরও বেশি পুরোনো একটি স্থানীয় দুর্যোগ-সতর্কতা ব্যবস্থা।”

গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল, জায়গাটি আর মাটির নিচে চাপা থাকবে না।

ঘণ্টাটি তুলে এনে গ্রামের উঁচু জায়গায় স্থাপন করা হল।

তার পাশে একটি ফলক লাগানো হল—

“যে ঘণ্টা একদিন মানুষকে বাঁচাত, তাকে ভুলে গেলে বিপদও একদিন আমাদের ভুলে যায়।”

রাকেশ একদিন সৌরভকে জিজ্ঞেস করল,

“স্যার, ঘণ্টাটা কি সত্যিই নিজে নিজে বাজে?”

সৌরভ হাসলেন।

“না। ঘণ্টা নিজে কাউকে বাঁচাতে পারে না।”

“তাহলে?”

“মানুষকে সতর্ক করে। বাঁচায় মানুষই।”

রাকেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“তাহলে আমরা ঘণ্টাটাকে মনে রাখব।”

সৌরভ মাথা নাড়লেন।

দূরে তখন পুরোনো ঘণ্টাটি ঝুলছে।

হাওয়ায় সামান্য দুলছে।

কিন্তু এবার তার শব্দ শুধু ভয়ের নয়।

এটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, সতর্কতা আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার প্রতীক।।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : শেষ ট্রেনের যাত্রী।

 

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ছোট্ট স্টেশনটির নাম শিমুলতলা। দিনের বেলায় স্টেশনটিতে বেশ ভিড় থাকে, কিন্তু রাত বাড়তেই চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের দু’টি হলুদ আলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর তার সঙ্গে মিশে ছিল হালকা বৃষ্টির শব্দ।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিলেন অরুণবাবু।

বয়স প্রায় ষাট। হাতে পুরনো একটি চামড়ার ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।

শেষ ট্রেনটি আসার কথা রাত এগারোটায়।

অরুণবাবু জানতেন, এই ট্রেনটিই তাঁকে সেই গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর আগে চলে এসেছিলেন।

কেন ফিরছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেও ঠিক জানতেন না।

চল্লিশ বছর আগে এই স্টেশনেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছিল।

তখন তিনি তরুণ। সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। চাকরির জন্য শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর জীবনে এসেছিল মেঘলা।

মেঘলা ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে। খুব সাধারণ, শান্ত স্বভাবের। অরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল গ্রামের লাইব্রেরিতে।

দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।

কিন্তু অরুণের বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি।

তিনি চেয়েছিলেন অরুণ শহরে গিয়ে ভালো চাকরি করুক, বড়লোক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করুক।

একদিন অরুণকে শহরে যাওয়ার জন্য জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন স্টেশনে মেঘলা এসেছিল।

অরুণের ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে মেঘলা বলেছিল,

“তুমি যদি আজ চলে যাও, আমি অপেক্ষা করব।”

অরুণ কিছু বলতে পারেননি।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল।

আর তারপর?

জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

চাকরি, বিয়ে, সংসার, সন্তান—সবই হয়েছিল।

কিন্তু মেঘলার কথা কখনও পুরোপুরি ভুলতে পারেননি তিনি।

বছর দশেক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একদিন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে অরুণ একটি চিঠি পেয়েছিলেন।

মেঘলার লেখা।

চিঠিটি তিনি কখনও পাননি।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি কথা ছিল—

“অরুণ, তুমি যদি ফিরে আসো, আমি এখনও অপেক্ষা করব। তবে তোমার জন্য নয়, তোমার সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য।”

চিঠির তারিখ ছিল আজ থেকে তিরিশ বছর আগের।

চিঠিটি পড়ার পর অরুণ বহুবার মেঘলাকে খুঁজেছিলেন।

কিন্তু পারেননি।

কেউ বলেছিল, মেঘলা বিয়ে করে অন্য শহরে চলে গেছে।

কেউ বলেছিল, সে নাকি বিয়েই করেনি।

কেউ আবার বলেছিল, মেঘলা বহু বছর আগে মারা গেছে।

কোনটা সত্যি, অরুণ জানতেন না।

আজ হঠাৎ কেন যেন তাঁর মনে হল—একবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়া দরকার।

হয়তো মেঘলা নেই।

হয়তো সবকিছু বদলে গেছে।

তবুও যেতে হবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার দিক থেকে একটি ছোট্ট ছেলে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল।

ছেলেটির বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।

পরনে ভেজা জামা।

সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি অরুণকাকু?”

অরুণ চমকে উঠলেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমাকে চেনো?”

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,

“চিনি না। তবে আপনাকে চিনতে বলেছে।”

“কে?”

ছেলেটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল।

“এটা আপনাকে দিতে বলেছে।”

অরুণ কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।

খামের ওপর লেখা—

অরুণের জন্য।

হাতের লেখাটা তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললেন।

মেঘলা।

চোখ ঝাপসা হয়ে এল তাঁর।

“মেঘলা কোথায়?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমার ঠাকুমা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

অরুণের বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল।

“তোমার ঠাকুমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল,

“মেঘলা।”

কথাটা শুনে অরুণ যেন পাথর হয়ে গেলেন।

এত বছর পরও?

মেঘলা বেঁচে আছে?

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ছেলেটি বলল,

“চলুন। ঠাকুমা বলেছে, শেষ ট্রেনটা যেন আপনি মিস না করেন।”

অরুণ ব্যাগটা তুলে দাঁড়ালেন।

চল্লিশ বছর আগে যে ট্রেনে তিনি মেঘলাকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই একই রকম একটি শেষ ট্রেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়ল।

জানালার পাশে বসে অরুণ খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

মাত্র এক লাইন লেখা—

“এবার আর তোমাকে যেতে দেব না—তবে এবার তোমাকে আমার কাছে থাকতে হবে না, শুধু একবার সত্যিটা শুনে যেও।”

অরুণের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

বাইরে অন্ধকার ছুটে চলছিল।

আর তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু ট্রেন দেরিতে এলেও, তাদের গন্তব্য কখনও হারিয়ে যায় না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : পুরনো ছাতাটা।

বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল রতন।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান চালায় সে। সারাদিন দোকানে বসে থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরাই তার প্রতিদিনের নিয়ম।

সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল।

রতনের হাতে ছিল একটা পুরনো কালো ছাতা।

ছাতাটার একটা শিক বাঁকা, কাপড়ের কয়েক জায়গায় সেলাই করা। দেখতে এতটাই পুরনো যে কেউ দেখলে হয়তো ফেলে দিতে বলত।

কিন্তু রতন ছাতাটা ফেলতে পারত না।

কারণ ছাতাটা তার বাবার।

বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর ঘরের আলমারি থেকে এই ছাতাটাই শুধু নিজের কাছে রেখেছিল রতন।

বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রতন দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।

বৃদ্ধার হাতে কোনও ছাতা নেই।

বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে।

রতন নিজের ছাতাটা একটু এগিয়ে ধরল।

“মাসিমা, কোথায় যাবেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“আর একটু সামনে। ওই বাঁশবাগানের পরেই আমার বাড়ি।”

রতন বলল,

“চলুন, আমি দিয়ে আসছি।”

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ছাতাটা খুব পুরনো দেখছি।”

রতন হেসে বলল,

“হ্যাঁ। অনেক পুরনো।”

“ফেলে দেননি কেন?”

রতন একটু চুপ করে থেকে বলল,

“যার ছিল, সে আমার কাছে খুব দামি ছিল।”

বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।

বাঁশবাগান পেরিয়ে তাঁরা একটি ছোট্ট মাটির বাড়ির সামনে পৌঁছলেন।

বৃদ্ধা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে বললেন,

“কাল একবার আমার বাড়িতে এসো।”

রতন অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“একটা জিনিস দেখাব।”

পরদিন বিকেলে রতন সত্যিই গেল।

বৃদ্ধা তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন।

দেয়ালের পাশে রাখা ছিল একটি পুরনো কাঠের বাক্স।

বৃদ্ধা বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি, একটি ঘড়ি আর কয়েকটি সাদা-কালো ছবি।

তারপর একটি ছবি রতনের হাতে দিলেন।

ছবিটা দেখে রতন স্তব্ধ হয়ে গেল।

ছবিতে তার বাবা।

আর বাবার পাশে এই বৃদ্ধা।

রতন কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি… আমার বাবাকে চিনতেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

“চিনতাম না। তোমার বাবাই একদিন আমাকে চিনেছিলেন।”

রতন কিছু বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি খুব কষ্টে দিন কাটাতাম। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বাজার থেকে ফিরছিলাম। তখন তোমার বাবা আমাকে নিজের ছাতা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন।”

রতন চুপ করে শুনছিল।

“আমি ছাতাটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা বলেছিলেন, ‘আপনার দরকার বেশি। রেখে দিন।’”

বৃদ্ধা একটু থামলেন।

“কিন্তু আমি রাখিনি। পরদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে ছাতাটা দিয়ে এসেছিলাম।”

রতন নিজের হাতে থাকা ছাতাটার দিকে তাকাল।

“তারপর?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কয়েক বছর পর তোমার বাবা আবার আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছাতাটা কি এখনও আছে?’”

“আমি বলেছিলাম, নেই।”

“তখন তিনি হেসে বলেছিলেন—‘থাক, ছাতা না থাকলেও স্মৃতিটা থাকুক।’”

রতনের চোখ ভিজে গেল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন যে ছাতাটাকে সে শুধু বাবার স্মৃতি বলে জানত, তার সঙ্গে আরও একটি মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধা বাক্স থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।

“এটা তোমার বাবার লেখা।”

রতন কাগজটি খুলল।

সেখানে লেখা—

“মানুষের জীবনে বড় কিছু করার সুযোগ সবসময় আসে না। কিন্তু বৃষ্টির দিনে কারও মাথার ওপর নিজের ছাতাটা ধরার সুযোগ প্রায়ই আসে।”

রতন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

চোখের জল মুছে সে বলল,

“মাসিমা, আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।”

বৃদ্ধা হেসে বললেন,

“তোমার বাবা ভালো ছিলেন বলেই তো তুমি আজ এই পুরনো ছাতাটা নিয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছ।”

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রতন ছাতাটা খুলে বৃদ্ধার মাথার ওপর ধরল।

বৃদ্ধা বললেন,

“আজ ছাতাটা তোমার।”

রতন মৃদু হেসে উত্তর দিল,

“না মাসিমা। এটা আমার বাবার ছিল। এখন থেকে এটা আমাদের।”

দু’জন ধীরে ধীরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করল।

পুরনো ছাতাটার নিচে দু’জন মানুষ।

আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল একজন মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

জানালার ওপাশে আলো।

প্রতিদিন রাত ঠিক দশটায় নীলার বাড়ির পাশের পুরনো বাড়িটিতে একটি আলো জ্বলে উঠত।

তারপর রাত বারোটায় ঠিক একইভাবে আলোটি নিভে যেত।

বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনা।

বাড়িটা বহুদিন ধরে তালাবন্ধ। জানালাগুলো ধুলোয় ঢাকা, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, উঠোনে আগাছা।

নীলা ছোটবেলা থেকেই বাড়িটাকে দেখে আসছে।

তার ঠাকুমা বলতেন,

“ও বাড়ির দিকে বেশি তাকাস না।”

“কেন?”

“কিছু বাড়ির দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।”

কিন্তু নীলার কৌতূহল বরাবরই বেশি।

বিশেষ করে সেই আলোটা নিয়ে।

কারণ আলোটা কোনও সাধারণ আলো ছিল না।

প্রতিদিন রাত দশটায় ঠিক একটি জানালার ভেতর থেকে হলুদ আলো দেখা যেত।

কেউ যেন ঘরের মধ্যে বসে আছে।

এক রাতে নীলা সাহস করে বাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

লোহার গেট তালাবন্ধ।

ভেতরে কেউ নেই।

কিন্তু জানালায় আলো জ্বলছে।

নীলা ফোনের টর্চ জ্বেলে জানালার কাছে গেল।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টক… টক… টক…

কেউ যেন জানালায় হাত দিয়ে টোকা দিচ্ছে।

নীলা ভয়ে পিছিয়ে এল।

তারপর আবার শব্দ।

টক… টক… টক…

সে দৌড়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গেল।

পরদিন সকালে পাশের বাড়ির বৃদ্ধ হরিপদ কাকুকে ঘটনাটা বলল।

হরিপদ কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“তুই আলোটা দেখেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“জানালায় কাউকে দেখেছিস?”

“না।”

হরিপদ কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এই বাড়িতে একসময় একজন শিক্ষক থাকতেন। নাম ছিল অনিরুদ্ধবাবু।”

“তারপর?”

“একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন।”

“কোথায়?”

“কেউ জানে না।”

নীলা জিজ্ঞেস করল,

“আর ওই আলো?”

হরিপদ কাকু বললেন,

“অনিরুদ্ধবাবু প্রতিদিন রাত দশটায় পড়ার টেবিলের বাতি জ্বালিয়ে বসতেন। রাত বারোটায় আলো নিভিয়ে ঘুমোতেন।”

নীলার শরীর শিউরে উঠল।

“কিন্তু উনি তো নেই!”

হরিপদ কাকু বললেন,

“সেটাই তো রহস্য।”

সেদিন রাতে নীলা আর ঘুমোতে পারল না।

রাত দশটা বাজতেই আবার আলো জ্বলে উঠল।

কিছুক্ষণ পর জানালায় আবার—

টক… টক… টক…

নীলা এবার জানালার কাছে গেল।

কিন্তু এবার সে ভয় পেল না।

জানালার কাঁচে কুয়াশার মতো একটা আস্তরণ জমেছিল।

তার ওপর ধীরে ধীরে আঙুলের দাগ ফুটে উঠল।

তারপর তিনটি শব্দ—

“বইটা খুঁজে দেখো।”

নীলা হতভম্ব হয়ে গেল।

পরদিন সে হরিপদ কাকুকে সব বলল।

তিনি অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললেন,

“অনিরুদ্ধবাবুর একটা পুরনো লাইব্রেরি ছিল।”

দু’জনে মিলে বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়ে তালা খুললেন।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ।

একটি ঘরে শত শত বই।

নীলা বইয়ের তাকগুলো দেখতে লাগল।

হঠাৎ একটি মোটা বই মেঝেতে পড়ে গেল।

বইটির নাম—

“মানুষের কাছে মানুষের ঋণ”

বইটি খুলতেই মাঝখান থেকে একটি পুরনো খাম পড়ে গেল।

খামের ওপর লেখা—

“যে এই চিঠি পাবে, সে যেন সত্যিটা জানে।”

চিঠিতে লেখা ছিল—

অনিরুদ্ধবাবু শিক্ষকতা করার পাশাপাশি গ্রামের দরিদ্র শিশুদের পড়াতেন।

কিন্তু গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মানুষ তাঁর এই কাজ পছন্দ করত না। কারণ তিনি গ্রামের গরিব মানুষের জমি দখলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।

এক রাতে তাঁকে মারধর করে দূরের একটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

তিনি কোনওভাবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।

কিন্তু ফিরে আসেননি।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা—

“আমি ফিরে আসতে পারব না। কিন্তু আমার বইগুলো যেন গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পৌঁছয়।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

কিন্তু রহস্য তখনও শেষ হয়নি।

হরিপদ কাকু হঠাৎ বললেন,

“নীলা, তোর হাতে যে বইটা আছে, সেটা একটু দেখ।”

বইয়ের ভেতরের শেষ পাতায় একটি পুরনো ছবি আটকানো।

ছবিতে অনিরুদ্ধবাবু দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন শিশুর সঙ্গে।

ছবির একেবারে সামনে ছোট্ট একটি মেয়ে।

নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।

মেয়েটি তার মা।

নীলা বাড়ি ফিরে মাকে ছবিটা দেখাল।

মা অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“আমি যখন ছোট ছিলাম, উনি আমাকে পড়াতেন।”

“তুমি জানতেও?”

মা মাথা নাড়লেন।

“তোর দাদু মারা যাওয়ার পর সংসারে খুব কষ্ট ছিল। অনিরুদ্ধ স্যার আমাকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছিলেন।”

নীলা বলল,

“তাহলে এত বছর ধরে ওই আলো…?”

মা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“হয়তো আলোটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে এসেছে—কেউ চলে গেলেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।”

সেই রাতেও দশটায় আলো জ্বলল।

কিন্তু এবার নীলা ভয় পেল না।

সে নিজের পড়ার টেবিলে একটি বাতি জ্বালিয়ে বই খুলে বসল।

পরদিন থেকে নীলা গ্রামের কয়েকজন দরিদ্র শিশুকে পড়াতে শুরু করল।

আর আশ্চর্যের বিষয়—

যেদিন প্রথম শিশুটি এসে তার কাছে পড়তে বসল, সেদিন রাত দশটায় সেই পুরনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলল না।

চল্লিশ বছরের মধ্যে সেই প্রথম।

নীলা বুঝল—

আলোটা হয়তো কখনও বাড়ির ভেতরে ছিল না।

আলোটা ছিল একজন মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নে।

আর সেই স্বপ্ন যখন নতুন কারও হাতে পৌঁছে গেল, তখন জানালার ওপাশের আলোটির আর প্রয়োজন রইল না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

যে চিঠির ঠিকানা ছিল না।

বিনোদবাবু ডাকপিয়নের চাকরি করতেন।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি একই এলাকার বাড়ি-বাড়ি চিঠি বিলি করেছেন। কারও চাকরির নিয়োগপত্র, কারও বিয়ের নিমন্ত্রণ, কারও বিদেশে থাকা ছেলের চিঠি—হাজার হাজার চিঠি তাঁর হাত ঘুরে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

চিঠি বিলি করা তাঁর কাছে শুধু চাকরি ছিল না।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি চিঠির মধ্যে কখনও কখনও একটা মানুষের পুরো পৃথিবী লুকিয়ে থাকে।

সেদিন দুপুরে অফিসে ঢুকেই বিনোদবাবুর নজরে পড়ল একটি অদ্ভুত খাম।

খামের ওপর প্রাপকের নাম লেখা—

“যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”

কোনও বাড়ির নম্বর নেই।

রাস্তার নাম নেই।

শহরের নাম নেই।

এমনকি প্রেরকের নামও নেই।

ডাকঘরের কর্মীরা চিঠিটা দেখে হাসাহাসি করছিল।

একজন বলল,

“এটা নিশ্চয়ই কারও মজা।”

বিনোদবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“যে পাঠিয়েছে, নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে।”

সেদিন সারাদিন তিনি চিঠিটা ব্যাগে নিয়ে ঘুরলেন।

কিন্তু কাকে দেবেন?

শেষ বিকেলে রাস্তার পাশে একটি বৃদ্ধ লোককে বসে থাকতে দেখলেন।

লোকটির সামনে একটি পুরনো লাঠি।

বিনোদবাবু হঠাৎ ভাবলেন, “হয়তো এই মানুষটিরই দরকার।”

কিন্তু খামটা হাতে নিয়ে আবার থেমে গেলেন।

“না।”

লোকটির কাছে ইতিমধ্যে তার পরিবারের একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে।

চিঠি তার জন্য নয়।

পরদিন সকালে তিনি দেখলেন, স্টেশনের পাশে এক তরুণী বসে কাঁদছে।

তার হাতে একটি হাসপাতালের রিপোর্ট।

বিনোদবাবু এগিয়ে গেলেন।

“কী হয়েছে?”

মেয়েটি বলল,

“বাবার অপারেশন হবে। টাকা জোগাড় করতে পারছি না।”

বিনোদবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল।

তিনি খামটির দিকে তাকালেন।

হয়তো এটাই সেই মানুষ!

কিন্তু আবারও থেমে গেলেন।

তিনি জানতেন, নিজের অনুমানে কারও হাতে চিঠি দেওয়া যায় না।

চিঠির ঠিকানা খুঁজে বের করতেই হবে।

এভাবে তিন দিন কেটে গেল।

চতুর্থ দিন রাতে বাড়ি ফিরে বিনোদবাবু চিঠিটা টেবিলের ওপর রাখলেন।

তাঁর স্ত্রী বললেন,

“এত চিন্তা করছ কেন?”

বিনোদবাবু বললেন,

“চিঠির ঠিকানা নেই। কিন্তু প্রাপক আছে। শুধু আমি তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

স্ত্রী হেসে বললেন,

“হয়তো চিঠিটা তোমার জন্যই।”

বিনোদবাবু হেসে উড়িয়ে দিলেন।

“আমার জন্য আবার কেন?”

“তুমি সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছ। কখনও কি কেউ তোমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে?”

বিনোদবাবু উত্তর দিলেন না।

সেদিন রাতে তিনি অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি।

পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে খামটি আবার হাতে নিলেন।

হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল খামের পেছনে খুব ছোট করে একটি তারিখ লেখা।

৩০ বছর আগে।

বিনোদবাবু অবাক।

ত্রিশ বছর আগে পাঠানো চিঠি এতদিন ডাকঘরে কীভাবে পড়ে ছিল?

তিনি পুরনো রেকর্ড খুঁজতে শুরু করলেন।

দুপুরে একটি পুরনো রেজিস্টার পাওয়া গেল।

সেখানে চিঠিটির কোনও প্রাপকের নাম ছিল না।

শুধু লেখা ছিল—

“বিনোদ দত্তের হাতে পৌঁছলে প্রদান করবেন।”

বিনোদবাবু স্তব্ধ।

চিঠিটা তাঁর জন্যই ছিল!

কিন্তু কে পাঠিয়েছিল?

কাঁপা হাতে খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

লেখা—

“বিনোদ,

তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি।

ত্রিশ বছর আগে এক শীতের রাতে রেললাইনের পাশে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাছে টাকা ছিল না। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না।

তুমি আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলে।

তোমার মা আমাকে খেতে দিয়েছিলেন।

পরদিন নিজের টাকায় আমাকে বাসে তুলে দিয়েছিলে।

আমি বলেছিলাম, একদিন তোমার টাকা ফেরত দেব।

তুমি বলেছিলে, ‘টাকা ফেরত দিতে হবে না। জীবনে যখন কাউকে অসহায় দেখবে, তখন তাকে সাহায্য করবে।’

আমি সেই কথা রেখেছি।

এই চিঠি লিখেছিলাম ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু তোমার ঠিকানা জানতাম না।

আজ তোমার গ্রামের এক পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে ঠিকানা পেলাম।

চিঠিটা হয়তো দেরিতে পৌঁছেছে।

কিন্তু কথাটা দেরি করে পৌঁছায়নি।

—অমল”

বিনোদবাবু চেয়ারে বসে রইলেন।

অমল!

নামটা তাঁর মনে পড়ল।

ত্রিশ বছর আগে সত্যিই এক যুবককে তিনি বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

কিন্তু সেই ঘটনাটা তিনি বহু আগেই ভুলে গিয়েছিলেন।

চিঠির সঙ্গে আরও একটি কাগজ ছিল।

একটি ব্যাংকের রসিদ।

বিনোদবাবুর নামে একটি ছোট্ট মাসিক তহবিল খোলা হয়েছে।

নিচে লেখা—

“যে মানুষ সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছে, তার অবসরের পর যেন কোনও চিঠির অপেক্ষায় থাকতে না হয়।”

বিনোদবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার পাশে সেই তরুণীটিকে আবার দেখলেন।

মেয়েটি এখনও হাসপাতালের রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে।

বিনোদবাবু কাছে গিয়ে বললেন,

“আপনার বাবার চিকিৎসার জন্য কত টাকা লাগবে?”

মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।

বিনোদবাবু মৃদু হেসে বললেন,

“সবটা দিতে পারব না। কিন্তু যতটা পারি, দেব।”

মেয়েটির চোখে জল।

সে বলল,

“আপনি কেন করবেন?”

বিনোদবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কারণ আজ আমি একটা চিঠি পেয়েছি।”

“কী চিঠি?”

বিনোদবাবু হাসলেন।

“যে চিঠির ঠিকানা ছিল না, কিন্তু ঠিক মানুষটার কাছে পৌঁছে গেছে।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন।

তাঁর ডাকপিয়নের ব্যাগটা সেদিনও কাঁধে ছিল।

তবে ব্যাগের ভেতরে আর কোনও চিঠি ছিল না।

ছিল শুধু একটি বিশ্বাস—

ভালো কাজ কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও না কখনও, কোনও না কোনও পথে, তা মানুষের কাছে ফিরে আসে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

ঘড়িটা থেমে ছিল।

সুব্রত বাবার ঘরটা পরিষ্কার করছিল।

বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এতদিন ঘরটা খোলেনি। দরজা খুললেই পুরনো কাঠ, বই আর চন্দনের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করত।

সুব্রত খুব বেশি কথা বলত না।

বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কও শেষ কয়েক বছর ভালো ছিল না।

বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। নিয়মকানুনের ব্যাপারে কঠোর। আর সুব্রত ছোটবেলা থেকেই একটু স্বাধীনচেতা।

কলেজে পড়ার সময় একদিন বাবার সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে।

তারপর শহরে চাকরি।

বিয়ে।

সংসার।

বছরে দু-একবার বাড়ি আসা।

বাবার সঙ্গে কথা হতো, কিন্তু আগের মতো নয়।

বাবা কখনও বলেননি, “আমাকে দেখতে এসো।”

সুব্রতও কখনও বলেনি, “বাবা, তোমাকে মিস করি।”

এই না-বলা কথাগুলোই হয়তো তাদের মধ্যে একটা দেওয়াল তৈরি করেছিল।

ঘর পরিষ্কার করতে করতে সুব্রতের হাতে পড়ল একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটি হাতঘড়ি।

ঘড়িটা বহু পুরনো।

কালো চামড়ার বেল্ট।

কাঁচে ছোট্ট একটি আঁচড়।

সুব্রত ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখল।

কাঁটা থেমে আছে—

রাত ৮টা ১৭ মিনিটে।

সে অবাক হলো।

এই সময়টা কি কোনও বিশেষ সময়?

ঘড়ির পেছনে ছোট্ট করে খোদাই করা—

“S-এর জন্য।”

সুব্রত ভাবল, S মানে হয়তো তার নাম—সুব্রত।

কিন্তু বাবা তাকে এই ঘড়ি কখনও দেননি।

পরদিন সে পাশের বাড়ির পুরনো বন্ধু অশোককাকুর কাছে গেল।

ঘড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কাকু, এটা বাবার ছিল?”

অশোককাকু কিছুক্ষণ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তুই এটা কোথায় পেলি?”

“বাবার বাক্সে।”

অশোককাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোর বাবার একটা অভ্যাস ছিল।”

“কী?”

“প্রতি বছর তোর জন্মদিনের রাতে এই ঘড়িটা বের করে দেখতেন।”

সুব্রত অবাক।

“কেন?”

অশোককাকু বললেন,

“ওটা তোর বাবার ঘড়ি ছিল না।”

“তাহলে?”

“তোর জন্মের দিন হাসপাতালের এক নার্স তাঁকে ঘড়িটা দিয়েছিলেন।”

সুব্রত কিছু বুঝতে পারল না।

“কেন?”

অশোককাকু এবার ধীরে ধীরে বললেন,

“তুই জন্মানোর সময় তোর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তাররা বলেছিলেন, দু’জনের মধ্যে একজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।”

সুব্রত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

“শেষ পর্যন্ত তোর মা বাঁচেননি।”

তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

“আর তুই?”

অশোককাকু বললেন,

“তুই বেঁচে গিয়েছিলি।”

সুব্রত ঘড়িটার দিকে তাকাল।

“তাহলে ৮টা ১৭ মিনিট…?”

অশোককাকু বললেন,

“তুই জন্মেছিলি ওই সময়।”

সুব্রত কিছু বলতে পারল না।

বাড়ি ফিরে সে আবার বাবার ঘরে গেল।

বাক্সটা খুলে ঘড়িটার নিচে রাখা পুরনো কাগজগুলো বের করল।

একটি ডায়েরি।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—

“আজ আমার ছেলে পৃথিবীতে এল। আর একই দিনে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারালাম।”

সুব্রতের বুকটা ভার হয়ে গেল।

সে পড়তে লাগল।

“আজ ডাক্তার বললেন, ওকে বাঁচাতে হলে ওর মাকে বাঁচানো যাবে না।

আমি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব?

একজন আমার স্ত্রী।

আর একজন আমার সন্তান।

শেষ পর্যন্ত ডাক্তাররা যা করার করলেন।

সুমিতা চলে গেল।

আমার ছেলে রয়ে গেল।

আমি জানি না, কোনও বাবা কীভাবে এই শূন্যতা নিয়ে বাঁচে।”

পরের পাতায় লেখা—

“আজ ও প্রথমবার আমাকে বাবা বলেছে।

আমি ওকে কিছুতেই বুঝতে দেব না, ওর জন্মের সঙ্গে তার মায়ের মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক আছে।

ও যেন কোনওদিন নিজেকে দোষী না ভাবে।”

সুব্রতের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

আরও কয়েক পাতা পরে—

“আজ সুব্রত আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

ও হয়তো মনে করছে আমি ওকে বুঝি না।

আসলে আমি ওকে এতটাই ভালোবাসি যে, নিজের কষ্টটাও ওকে বলতে পারি না।”

সুব্রত ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

এত বছর সে ভেবেছে, বাবা তাকে ভালোবাসতেন না।

অথচ বাবা নিজের সমস্ত কষ্ট লুকিয়ে তাকে বড় করেছেন।

ঘড়িটা হাতে নিয়ে সে বাবার চেয়ারে বসে পড়ল।

রাত ৮টা ১৭ মিনিট।

সুব্রত মোবাইলের দিকে তাকাল।

হঠাৎ মনে হল, ঘড়িটা ঠিক করার দরকার নেই।

এটা যেমন থেমে আছে, তেমনই থাকুক।

কারণ ওই মুহূর্তটাই ছিল তার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ এবং সবচেয়ে বড় দুঃখের মুহূর্ত।

পরদিন সুব্রত ঘড়িটা একজন ঘড়িওয়ালার কাছে নিয়ে গেল।

লোকটি বলল,

“ঘড়িটা ঠিক করে দেব?”

সুব্রত মাথা নাড়ল।

“না।”

“কেন?”

সুব্রত মৃদু হেসে বলল,

“এটা থেমেই থাকুক।”

তারপর ঘড়িটা সে নিজের হাতে পরে নিল।

বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল—

বাবার সঙ্গে শেষবার যখন কথা হয়েছিল, তখন সে শুধু বলেছিল,

“তুমি কিছুই বোঝো না।”

আজ সে বুঝতে পারছে—

বাবা হয়তো সবকিছুই বুঝতেন।

শুধু নিজের ভালোবাসাটা কখনও মুখে বলতে পারেননি।

সুব্রত আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

“বাবা, আমিও তোমাকে ভালোবাসতাম।”

কথাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

কিন্তু তার কবজিতে তখনও ঘড়িটা চলছে না।

কাঁটা থেমে আছে—

৮টা ১৭ মিনিটে।

আর সেই থেমে থাকা সময়ের মধ্যেই সুব্রত খুঁজে পেল তার বাবার সারাজীবনের ভালোবাসা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প

নীরবতার ভাষা।

কলেজের লাইব্রেরির শেষ কোণের টেবিলটায় প্রতিদিন এসে বসত মেয়েটা। সাদা সালোয়ার, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, আর সামনে সবসময় একটা খোলা খাতা।
অর্ণব প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করেছিল তাকে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটা কারও সঙ্গে কথা বলত না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ত।
একদিন লাইব্রেরিয়ান কাকু বললেন,
— “ওর নাম তৃষা। ছোটবেলায় অসুস্থতার পর থেকে কথা বলতে পারে না।”
সেদিন থেকে অর্ণবের কেমন যেন আলাদা টান জন্মাল।
প্রতিদিন সে দূর থেকে তৃষাকে দেখত। কখনো বই খুঁজে দিত, কখনো চুপচাপ টেবিলের ওপর একটা চকোলেট রেখে চলে যেত।
তৃষাও ধীরে ধীরে ছোট ছোট কাগজে উত্তর দিতে শুরু করল।
“ধন্যবাদ।”
“আজ বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।”
“তোমার পছন্দের বই কোনটা?”
একদিন প্রবল বৃষ্টি। পুরো কলেজ প্রায় ফাঁকা।
অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখন তৃষা এসে তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল।
কাগজ খুলতেই সে থমকে গেল।
তাতে লেখা—
“সব অনুভূতি শব্দে বলতে হয় না। কিছু মানুষ নীরবতাতেই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।”
অর্ণব ধীরে ধীরে তৃষার দিকে তাকাল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভিতরে দুটো নীরব মন প্রথমবার একে অপরের ভাষা বুঝে ফেলেছিল।

Share This
Categories
অনুগল্প

চাঁদের আলোয় প্রতিশ্রুতি।

গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট নদীর ধারে একটা পুরোনো ঘাট ছিল। পূর্ণিমার রাতে সেখানে বসতে খুব ভালোবাসত নীল আর ঐশী।
দু’জনেই স্বপ্ন দেখত— একদিন শহরে গিয়ে নিজেদের মতো একটা জীবন গড়বে।
সেদিনও আকাশভরা চাঁদ। নদীর জলে রুপালি আলো ঝিলমিল করছে।
ঐশী হঠাৎ বলল,
— “যদি কোনোদিন আমরা আলাদা হয়ে যাই?”
নীল মৃদু হেসে তার হাতটা ধরল।
— “তাহলে পূর্ণিমার রাতে এখানেই ফিরে আসবো। তুমি থাকো বা না থাকো… আমি আসব।”
তারপর সময় বদলালো।
চাকরির জন্য নীল শহরে চলে গেল। প্রথমে ফোন, চিঠি— সবই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে লাগল।
একদিন খবর এলো, ঐশীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
নীল আর ফিরে আসেনি।
কেটে গেল আট বছর।
সেদিন আবার পূর্ণিমা। বহুদিন পর নীল গ্রামের সেই ঘাটে এসে দাঁড়াল। চারপাশ নিঃশব্দ। শুধু নদীর জলে চাঁদের আলো ভাসছে।
নীল মৃদু হেসে বলল,
— “দেখো, আমি কথা রেখেছি।”
ঠিক তখনই পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আমি জানতাম তুমি আসবে।”
নীল ঘুরে দাঁড়াল।
সাদা শাড়ি পরে ঐশী দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল, ঠোঁটে সেই পুরোনো হাসি।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ কিছু প্রতিশ্রুতি সময় ভাঙতে পারে না…
সেগুলো শুধু চাঁদের আলোয় নীরবে অপেক্ষা করে।

Share This
Categories
অনুগল্প

শেষ ট্রেনের যাত্রী।

রাত তখন প্রায় বারোটা। শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ লোকাল ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা।
অভ্র জানালার পাশে বসে ছিল। ক্লান্ত চোখে বাইরে অন্ধকার শহরটা দেখছিল সে। সারাদিনের কাজের পর এই নিঃশব্দ ট্রেনযাত্রাটুকুই যেন তার নিজের সময়।
হঠাৎ পরের স্টেশনে এক মেয়ে উঠে এসে তার সামনের সিটে বসল।
কালো শাল জড়ানো, ভেজা চুল, আর হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। মেয়েটা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
— “এই ট্রেনটা কি কৃষ্ণনগর যাবে?”
অভ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “না, এর আগেই শেষ স্টপেজ।”
মেয়েটার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— “তাহলে আমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছি…”
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। রাতও অনেক।
অভ্র একটু দ্বিধা করে বলল,
— “আপনি চাইলে শেষ স্টপেজ পর্যন্ত যান। তারপর আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব।”
মেয়েটা মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানাল।
ট্রেন চলতে লাগল। দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা হতে লাগল— পছন্দের বই, বৃষ্টি, পুরোনো গান…
অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন তারা বহুদিনের পরিচিত।
শেষ স্টেশনে পৌঁছে অভ্র ঘুরে বলল,
— “চলুন, নেমে—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে থেমে গেল।
সামনের সিটটা খালি।
মেয়েটা নেই।
অভ্র অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল। পুরো কামরা ফাঁকা।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এসে বললেন,
— “কাউকে খুঁজছেন?”
অভ্র বলল,
— “এই তো একটা মেয়ে ছিল…”
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “পাঁচ বছর আগে এই একই ট্রেনে এক মেয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝে শেষ ট্রেনে তাকে দেখা যায়…”
অভ্র কিছু বলল না।
শুধু দেখল, সামনের সিটে এখনও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল পড়ে আছে।

Share This