Categories
প্রবন্ধ

বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে এক অতি পরিচিত নাম অনুপ কুমার।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন——-

বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে এক অতি পরিচিত নাম অনুপ কুমার। তাঁকে চিনেন না এমন বাঙালি পাওয়া খুব দুষ্কর। তিনি তাঁর অভিনয় দক্ষতায় মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
অনুপ কুমার ছিলেন একজন ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র অভিনেতা।  যদিও তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তিনি মূলত একজন থিয়েটার কর্মী ছিলেন।   অনুপকুমার ব্রিটিশ ভারতের উত্তর কলকাতায় ১৯৩০ সালের ১৭ জুন জন্মগ্রহণ করেন।   তার আসল নাম সত্যেন দাস।   পিতা নজরুল সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার ধীরেন্দ্রনাথ দাস এবং মাতা বিজয়া দেবী।   তাদের আদি নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়া।   অনুপকুমার কলকাতার ডাফ স্কুলে পড়াশোনা করেছেন।   তিনি খুব অল্প বয়সে অভিনয় শুরু করেছিলেন এবং তার বাবার দ্বারা হাতেখড়ি হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে যখন তিনি মাত্র আট বছর বয়সে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত “হাল বাংলা” ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন।   শিশিরকুমার ভাদুড়ীর ‘শ্রীরঙ্গম’-এ শিক্ষা শুরু হয়।

অভিনয় জীবন——

চোদ্দ বৎসর বয়সেই পেশাদারি মঞ্চে “টিপু সুলতান” নাটকে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন অনুপ কুমার। শ্রীরঙ্গম, বিশ্বরূপা, কাশী বিশ্বনাথ মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করতেন। পেশাদারি মঞ্চে আনুমানিক ৫০ টি নাটকে অভিনয় করেছেন।অনুপকুমার ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ থেকেই পেশাদার মঞ্চে নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।

তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হল –

ছদ্মবেশী মল্লিকা, অঘটন, নূরজাহান, শ্যামলী, হঠাৎ নবাব, চন্দনপুরের চোর, কী বিভ্রাট, জয় মা কালী বোডিং, রাম শ্যাম যদু।
সময়ের সাথে সাথে তিনি নিজেকে একজন বিশিষ্ট কৌতুক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।   অভিনয়ে খুব ভালো ছিলেন।   বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র ও ‘যাত্রাপালা’ ছবিতে অভিনয় করেন।    “নিমন্ত্রণ” ছবিতে সেরা অভিনেতার জন্য জাতীয় পুরস্কার জিতেছিলেন।   বাংলা চলচ্চিত্রে তার অভিনয় মূলত পার্শ্ব চরিত্রে।   তবে কয়েকটি ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।   তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং অনেক চলচ্চিত্র ইতিহাসে পাতায় স্থান করে নিয়েছেন।

তাঁর অভিনিত উল্লেখযোগ্য ছায়াছবিগুলি হল –

বরযাত্রী, কানামাছি, পলাতক, অমৃতকুম্ভের সন্ধানে, শহর থেকে দূরে, বালিকাবধূ, নিমন্ত্রণ, বসন্ত বিলাপ, এক যে ছিল দেশ, মৌচাক, দাদার কীর্তি, প্রতিশোধ।

হিন্দি সিনেমা-

চন্দ্রশেখর,  পরিবর্তন, কিতনে পাস কিতনে দূর।

পুরস্কার ও সম্মাননা—-

বিএফজেএ’পুরস্কার পান (১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ),   স্টার থিয়েটার থেকে পান রূপার পদক(১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে),  পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি পুরস্কার  ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ),  শিরোমণি পুরস্কার (১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ), দীনবন্ধু পুরস্কার ( ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ),   শ্রেষ্ঠ পরিচালকের স্বীকৃতি (১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ)।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

১৮১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতায় নতুন স্কুল স্থাপনের উদ্দেশ্যে দেশীয় ও ইউরোপীয় শিক্ষানুরাগীদের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয় ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি।

1 সেপ্টেম্বর, 1818-এ, দূরদর্শী ব্যক্তিদের একটি দল কলকাতা স্কুল সোসাইটি গঠনের জন্য একত্রিত হয়েছিল, একটি অগ্রগামী সংগঠন যার লক্ষ্য ছিল ভারতে শিক্ষার বিপ্লব ঘটানো। দেশীয় এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের এই যৌথ উদ্যোগ ভারতীয় শিক্ষায় একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, যার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হবে।

পটভূমি—

19 শতকের গোড়ার দিকে, ভারত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল, এবং শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত অবস্থায়। প্রথাগত ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা, যা রোট লার্নিং এবং ধর্মীয় নির্দেশের উপর জোর দিয়েছিল, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর প্রাসঙ্গিক ছিল না। অন্যদিকে ব্রিটিশরা ভারতে পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষা চালু করতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু সম্পদের অভাব এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার কারণে তাদের প্রচেষ্টা প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়।

কলকাতা স্কুল সোসাইটির প্রতিষ্ঠা—

এই পটভূমিতে কলকাতা স্কুল সোসাইটি গঠিত হয়েছিল। ভারতীয় এবং ইউরোপীয় উভয়ের সমন্বয়ে সমমনা ব্যক্তিদের একটি দল কলকাতায় একটি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য একত্রিত হয়েছিল যা ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আধুনিক, পশ্চিমা-শৈলীর শিক্ষা প্রদান করবে। সমাজের প্রতিষ্ঠাতারা শিক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় জনগণের জীবনকে উন্নত করার এবং আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের সাহায্য করার ইচ্ছা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

উদ্দেশ্য—

ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির বেশ কয়েকটি মূল উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, এটির লক্ষ্য ছিল ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের মতো বিষয়গুলিতে ফোকাস সহ ভারতীয় শিক্ষার্থীদের একটি আধুনিক, পশ্চিমা-শৈলীর শিক্ষা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, এটি ভারতীয় এবং ইউরোপীয়দের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং বিনিময়কে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিল। অবশেষে, এর লক্ষ্য ছিল ভারতীয় জনগণকে আধুনিক বিশ্বে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং জ্ঞান বিকাশে সহায়তা করা।

অর্জন—

কলকাতা স্কুল সোসাইটি তার প্রাথমিক বছরগুলিতে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জন করেছিল। 1819 সালে, এটি তার প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, যা ছেলে এবং মেয়ে উভয়কেই শিক্ষা প্রদান করে। সমাজ শিক্ষকদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কলেজও প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা ভারতীয় স্কুলগুলিতে শিক্ষার মান উন্নত করতে সাহায্য করেছিল। উপরন্তু, এটি পাঠ্যপুস্তক এবং জার্নাল সহ শিক্ষামূলক উপকরণের একটি পরিসর প্রকাশ করেছে, যা শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উন্নীত করতে সাহায্য করেছে।

উত্তরাধিকার—

কলকাতা স্কুল সোসাইটির উত্তরাধিকার অপরিসীম। এটি ভারতে পাশ্চাত্য-শৈলীর শিক্ষা প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এবং শিক্ষাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং বিনিময়ের উপর সমাজের জোর ভারতীয় এবং ইউরোপীয়দের মধ্যে বৃহত্তর বোঝাপড়া এবং সহযোগিতাকে উন্নীত করতে সাহায্য করেছে। আজ, কলকাতা স্কুল সোসাইটি একটি অগ্রগামী সংস্থা হিসাবে স্মরণ করা হয় যা ভারতে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছিল।

উপসংহার—

1818 সালের 1 সেপ্টেম্বর কলকাতা স্কুল সোসাইটির গঠন ভারতীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। এর অগ্রণী প্রচেষ্টা ভারতে পাশ্চাত্য-শৈলীর শিক্ষা প্রবর্তন করতে এবং ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং বিনিময়কে উন্নীত করতে সাহায্য করেছিল। আমরা যখন সমাজের প্রতিষ্ঠা উদযাপন করি, আমরা এর প্রতিষ্ঠাতাদের দৃষ্টি ও উত্সর্গকে সম্মান করি, যারা ভারতীয় শিক্ষার গতিপথকে রূপ দিতে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যেতে সাহায্য করেছিল৷

।। ছবি : প্রতীকী।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ রিভিউ

মধ্যযুগীয় প্রকৌশলের একটি বিস্ময়, পিসার হেলানো টাওয়ার।

1174 সালের 1 সেপ্টেম্বর, ইতালির পিসাতে পিসার হেলানো টাওয়ারের নির্মাণ শুরু হয়। এই আইকনিক টাওয়ারটি বিশ্বের সবচেয়ে স্বীকৃত ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠেছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। কিন্তু পিসার হেলানো টাওয়ারকে কী এত অনন্য করে তোলে? এবং কিভাবে এটা হতে আসা?

টাওয়ারের ইতিহাস—-

পিসার হেলানো টাওয়ারটি পিসা ক্যাথেড্রাল কমপ্লেক্সের অংশ হিসাবে নির্মিত হয়েছিল, এটি একটি বিশাল প্রকল্প যা পিসা প্রজাতন্ত্র কর্তৃক তার সম্পদ এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য কমিশন করা হয়েছিল। টাওয়ারটি ক্যাথেড্রালের জন্য একটি বেল টাওয়ার হওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল এবং এর নির্মাণ স্থপতি দিওতিসালভি দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হয়েছিল।

টাওয়ারের ভিত্তি 1174 সালে স্থাপিত হয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে নির্মাণ দ্রুত অগ্রসর হয়। যাইহোক, এটি শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে টাওয়ারটি মাটিতে ডুবে যাচ্ছে, যার ফলে এটি হেলে পড়েছে। এটি নির্মিত হয়েছিল নরম মাটির কারণে, যা টাওয়ারের ওজনকে সমর্থন করতে অক্ষম ছিল।

দি টিল্ট—-

পিসার হেলানো টাওয়ারটি এর সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। টাওয়ারের ভিত্তিটি মাত্র তিন মিটার গভীর এবং এটি মাটি, বালি এবং শেলগুলির মিশ্রণে নির্মিত হয়েছিল। এই নরম মাটি টাওয়ারের ওজনকে সমর্থন করতে অক্ষম ছিল, যার ফলে এটি ডুবে যায় এবং কাত হয়ে যায়।

বছরের পর বছর ধরে, কাত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এবং 20 শতকের শেষের দিকে, টাওয়ারটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। টাওয়ারটিকে স্থিতিশীল করতে এবং এটিকে আরও কাত হওয়া থেকে রোধ করার জন্য একটি বড় পুনরুদ্ধার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।

স্থাপত্য ও নকশা—-

পিসার হেলানো টাওয়ার মধ্যযুগীয় প্রকৌশলের একটি মাস্টারপিস। এর নকশাটি রোমানেস্ক এবং গথিক শৈলীর সংমিশ্রণ, একটি স্বতন্ত্র সাদা মার্বেল বাহ্যিক অংশ। টাওয়ারের আটটি তলা খিলান এবং কলামগুলির একটি সিরিজ দ্বারা সমর্থিত, যা এর ওজন বিতরণ করতে সহায়তা করে।

টাওয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল এর বেল চেম্বার, যেখানে সাতটি ঘণ্টা রয়েছে। ঘণ্টাগুলি একটি অনন্য এবং সুরেলা শব্দ তৈরি করার জন্য সুর করা হয়, যা শহর জুড়ে শোনা যায়।

পর্যটন ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য—-

পিসার হেলানো টাওয়ার হল ইতালির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ, যেখানে প্রতি বছর পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক আসেন। দর্শনার্থীরা শীর্ষে পৌঁছানোর জন্য টাওয়ারের 294টি ধাপে আরোহণ করতে পারে, যেখানে তারা শহরের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের সাথে পুরস্কৃত হয়।

টাওয়ারটি একটি সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হয়েছে, যা শিল্প, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের অগণিত কাজের বৈশিষ্ট্যযুক্ত। এটি অসংখ্য কবিতা, গান এবং চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু হয়েছে এবং এমনকি জনপ্রিয় ভিডিও গেমগুলিতেও এটি প্রদর্শিত হয়েছে।

উপসংহার–

পিসার হেলানো টাওয়ার মধ্যযুগীয় প্রকৌশলের একটি বিস্ময়, এটির নির্মাতাদের দক্ষতা এবং দক্ষতার প্রমাণ। এর অনন্য কাত ইতালির একটি আইকনিক প্রতীক হয়ে উঠেছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শককে আকর্ষণ করে। 1174 সালের 1 সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া টাওয়ারের নির্মাণ উদযাপনের সময়, আমরা সেই স্থপতি, প্রকৌশলী এবং শ্রমিকদের সম্মান জানাই যারা এই অবিশ্বাস্য ল্যান্ডমার্ক তৈরি করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ দিবস সম্পর্কে কিছূ কথা।

1লা সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ দিবস হিসাবে পালিত হয়, একটি দিন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানানোর দিন। পুলিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এই দিনটি তাদের উত্সর্গ ও সাহসিকতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

*পুলিশ দিবসের ইতিহাস*

পুলিশ দিবসের ধারণাটি প্রথম চালু হয়েছিল 1958 সালে, যখন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (আইপিএস) গঠিত হয়েছিল। IPS সারা দেশে একটি মানসম্মত পুলিশ পরিষেবা প্রদানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, এবং 1লা সেপ্টেম্বরকে এটির গঠনের স্মরণে দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে, পুলিশ দিবসটি পুলিশ বাহিনীর কৃতিত্বের উদযাপন এবং তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

*পশ্চিমবঙ্গে পুলিশের ভূমিকা*

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ বাহিনী রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধ মোকাবিলা থেকে শুরু করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত, পুলিশ সর্বদা সামনের সারিতে থাকে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে। তারা রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, তবুও তারা নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের সাথে সেবা চালিয়ে যাচ্ছে।

*পুলিশের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জ*

পশ্চিমবঙ্গে পুলিশিং এর চ্যালেঞ্জ ছাড়া নয়। রাজ্যের বৈচিত্র্যময় ভূগোল, হিমালয় থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত, পুলিশের জন্য অনন্য চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, রাজ্যের জটিল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জন্য পুলিশকে ক্রমাগত সতর্ক থাকতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ বাহিনী ধারাবাহিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার এবং কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

*পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কৃতিত্ব*

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সংগঠিত অপরাধ দমন থেকে শুরু করে কমিউনিটি পুলিশিং উদ্যোগ বাস্তবায়ন, পুলিশ জনগণের সেবায় তাদের অঙ্গীকার প্রদর্শন করেছে। রাজ্যের পুলিশ বাহিনী তাদের পরিষেবাগুলি উন্নত করতে সোশ্যাল মিডিয়া এবং মোবাইল অ্যাপ সহ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে৷

*উপসংহার*

পুলিশ দিবস হল পশ্চিমবঙ্গের অমিমাংসিত বীরদের উদযাপন – পুরুষ ও মহিলা যারা পুলিশ বাহিনীতে কাজ করে। তাদের উত্সর্গ, সাহসিকতা এবং জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি তাদের সত্যিকারের নায়ক করে তোলে। যখন আমরা পুলিশ দিবস উদযাপন করি, আমরা তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান করি এবং আমাদের রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে তারা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা স্বীকার করি।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

জীবন ঘোষাল – ভারত উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব, একটি বিশেষ পর্যালোচনা।।।।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের কঠোর পরিশ্রম যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত রাজনৈতিক দিক থেকে মুক্তি পেয়েছে। ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়। এই অন্দোলনে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে জীবন ঘোষাল প্রথমসারির একজন অন্যতম বিপ্লবী ছিলেন। জীবন ঘোষাল ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য নাম, যিনি দেশমতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ রূপে।
জীবন ঘোষাল ওরফে মাখনলাল ছিলেন একজন ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন সদস্য, যেটি ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারে অভিযান চালিয়েছিলেন।

বিপ্লবী কার্যক্রম—
ঘোষাল ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রামের সদরঘাটে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  তিনি মাখনলাল নামে পরিচিত ছিলেন।  তাঁর পিতার নাম যশোদা ঘোষাল। ছাত্রজীবনেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেন।  ঘোষাল চট্টগ্রামে পুলিশের অস্ত্রাগার অভিযানে সক্রিয় অংশ নেন।  ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল মধ্যরাত্রে চট্টগ্রামের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার মধ্যদিয়ে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত চারদিন কার্যত স্বাধীন থাকে চট্টগ্রাম। মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সংগঠিত এই বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক বিপ্লবী জীবন ঘোষাল। প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন এবং কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারে হামলা চালায় বিপ্লবীরা। পুলিশের অস্ত্রাগার দখলের জন্য গঠিত দলে ছিলেন জীবন ঘোষাল। তাঁরা সফলভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ হন। এই সময় অতিরিক্ত অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংসের নিমিত্তে আগুন লাগাতে গেলে হিমাংশু সেন আহত হন। তাঁকে নিরাপদে রেখে আসার জন্য গনেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, জীবন ঘোষাল ও আনন্দ গুপ্ত তাকে নিয়ে শহরে গেলে মূল দলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তাঁরা। অস্ত্রাগার দখলের পর সেখানে বিপ্লবীদের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয় এবং ভারতীয় পতাকা উত্তোলন ও ঘোষণাপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় সামরিক সরকার। চট্টগ্রাম ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয় বীর চট্টলার গুটিকয় দামাল তরুণের অসীম সাহসী উদ্যোগে। তাঁদের এই বিদ্রোহ শোষণ-বঞ্চনার আঁধারে ঢাকা ভারতবাসীকে সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
অপারেশনের পর তিনি আরেক তরুণ বিপ্লবী আনন্দ গুপ্তের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতার দিকে পালিয়ে যান।  গ্রুপের দুই সিনিয়র সদস্য, গণেশ ঘোষ এবং অনন্ত সিং তাদের যাত্রায় তাদের সঙ্গে ছিলেন।  পুলিশ ফেনী রেলওয়ে স্টেশনে দলটিকে চ্যালেঞ্জ করলেও শেষ পর্যন্ত ঘোষাল ও অন্যরা একটি সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর পালাতে সফল হয়।  তিনি কলকাতা, মির্জাপুর গলিতে এবং হুগলি জেলার চন্দননগরে আশ্রয় নেন।
মৃত্যু—
পালানোর পর ঘোষাল আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন।  পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট ১৯৩০ সালের ১ সেপ্টেম্বর হুগলির চন্দননগরে গোপন আস্তানায় আক্রমণ করেন এবং পরবর্তী যুদ্ধে ঘোষাল নিহত হন।বিপ্লবী জীবন ঘোষালও দেশের জন্য তাঁর আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রাণিত করেছিল ।
।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

স্বপনের ফেরিওয়ালা নচিকেতা চক্রবর্তী, জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নচিকেতা চক্রবর্তী,  একজন ভারতীয় গায়ক, গীতিকার, সুরকার,  এবং প্লেব্যাক গায়ক যিনি তাঁর আধুনিক বাংলা গানের জন্য পরিচিত।  তিনি ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তার প্রথম অ্যালবাম Ei Besh Bhalo Achi-এর প্রকাশের মাধ্যমে। যুবসমাজে যা আলোড়ন ফেলেছিল। প্রতিটি তরুণ তরুণীর মুখে তখন নচিকেতার গান। এক অন্য সাদের কথা ও সুর নিয়ে গোটা সমাজে সঙ্গীতের জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। গান বলি কেন, জেনো আগুনের গোলা। যেমন কথা, যেমন সুর, তেমন গায়কি। নচিকেতা তখন যেনো স্বপনের ফেরিওয়ালা।

১৯৬৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের বাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের বড়িশালের ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার চেচরীরামপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন সখা রঞ্জন চক্রবর্তী।  তার পৈতৃক শিকড় বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার চেচরি রামপুর গ্রামে।  তাঁর দাদা ললিত মোহন চক্রবর্তী ১৯৪৬ সালের আগে ভারতে এসেছিলেন।

তিনি উত্তর কলকাতার মণীন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করেন। বিএ পাশ করেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়। কারণ হঠাৎই বাবা মারা যান। তাই সংসারের হাল ধরতে জীবিকা হিসেবে বেছে নিলেন গান কে।

ছোটো থেকেই গান লিখতেন, গানের চর্চা করেছেন। তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মহাভারতের কৃষ্ণ চরিত্রের দ্বারা  । এছাড়াও জ্যাক লন্ডন এর লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।  উত্তর কলকাতার শ্যামবাজারের মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজের ছাত্র হিসেবে তিনি গান রচনা এবং লাইভ পরিবেশন শুরু করেছিলেন।  ১৯৯৩ সালে তার প্রথম অ্যালবাম এই আশা ভাল আছি মুক্তি পায়;  এটি একটি তাত্ক্ষণিক আঘাত ছিল.  প্রাথমিকভাবে তার একটি বিশাল যুব ভক্ত অনুগামী ছিল;  কিন্তু ধীরে ধীরে, তিনি সমস্ত বয়সের শ্রোতাদের আকর্ষণ করেছিলেন।  তাঁর কথোপকথন ভাষা অবিলম্বে ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকে বাংলা সঙ্গীতের স্থবিরতাকে আঘাত করে।  কবির সুমন (তখন সুমন চট্টোপাধ্যায়) এর পথ অনুসরণ করে, নচিকেতা বাংলা গানের বহু পুরনো ধারণা বদলে দিয়েছিলেন।  আজ, তিনি কলকাতার একজন প্রখ্যাত গায়ক-গীতিকার এবং সুরকার। তাঁর সুপার ডুপার হিট গান গুলো এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। যার মধ্যে রয়েছে, ‘ বৃদ্ধাশ্রম ‘, ‘একদিন ঝড় থেমে যাবে’,  যখন আমার ক্লান্ত চরণ’, যখন সময় থমকে দাঁড়ায়’, উল্টো রাজার দেশে,সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’, সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা’ ইত্যাদি।
নীলাঞ্জনা সিরিজ আর রাজর্ষি তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়।

নচিকেতার একক অ্যালবাম গুলি হলো–
এই বেশ ভালো আছি (১৯৯৩), কি হবে? (১৯৯৫), চল যাবো তকে নিয়ে (১৯৯৬), কুয়াশা যখন (১৯৯৭), আমি পারি (১৯৯৮), দলছুট (১৯৯৯), দায়ভার (২০০০), একলা চলতে হয় (২০০২), এই আগুনে হাত রাখো (২০০৪), আমার কথা আমার গান (২০০৫), এবার নীলাঞ্জন (২০০৮), হাওয়া বদল (২০১০), সব কথা বলতে নেই (২০১২), দৃষ্টিকোণ (২০১৪), আয় ডেকে যায় (২০১৫)।

তাঁর যৌথ অ্যালবামে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- দুয়ে দুয়ে চার (১৯৯৬), ছোটো বড় মিলে (১৯৯৬), স্বপ্নের ফেরিওয়ালা (১৯৯৯)।

লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ও নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ির দ্বারাও অনুপ্রাণিত হন। তিনি লিখেছেন গল্প । তিনি দুটি উপন্যাস রচনা করেছেন ‘জন্মদিন রাত’ ও ‘ক্যাকটাস’। শুধু উপন্যাস নয়, তিনি লিখেছেন গল্প শর্টকাট, পণ্ডশ্রম, আগুনপাখির আকাশ, সাপলুডো ইত্যাদি।

পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কুয়াশা যখন ‘(১৯৯৭),  ‘এই বেশ ভালো আছি’ (১৯৯৩) ইত্যাদি।

তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ হঠাৎ বৃষ্টি’ (১৯৯৮), সমুদ্র সাক্ষী (২০০৪), কাটাকুটি( ২০১২)।

তিনি বঙ্গভূষণ, সঙ্গীতভূষণ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। এছাড়াও পেয়েছেন আরো পুরষ্কার।  ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ তে গান করার জন্য ১৯৯৯ এ পান আনন্দলোক পুরস্কার। এছাড়া হাওড়ার আমতায় একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে, যার নাম নচিকেতা মঞ্চ। দর্শকরা তাঁকে এতটাই ভালোবাসেন যে তাঁর নামে এই মঞ্চ করেছেন। এই মঞ্চ টি তৈরি ৮০০ টি সিটের।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

“লাইব্রেরি” নিয়ে দুটি কথা : দিলীপ রায়।

১৮৩৫ সালের ৩১শে আগস্ট তৎকালীন বিদ্ধদ্‌জনদের উপস্থিতিতে কলকাতার টাউন হলে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় । এই সভাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, সর্বসাধারণের জন্য একটি গ্রন্থাগার বা পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ করা হবে । সেই সিদ্ধান্তক্রমে গড়ে ওঠে “ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি” । অনেক জায়গায় সেই থেকে ৩১শে আগস্ট দিনটিকে গ্রন্থাগার দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে ।
তারপর ১৮৩৬ সালে “ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি” নামে প্রথম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় । সেই সময় এটি ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এই লাইব্রেরির প্রথম মালিক। ভারতের তদনীন্তন গভর্নর- জেনারেল “লর্ড মেটকাফ” ফোর্ট উইলিয়াম কলেজর ৪৬৭৫টি বই দান করেন, যেটা দিয়ে এই লাইব্রেরী গোড়াপত্তন ।
সেই সময় বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষার বই গ্রন্থাগারের জন্য ক্রয় করা হত । কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রন্থাগারকে অর্থসাহায্য করতেন । এমনকি সরকারের কাছ থেকেও অনুদান পাওয়া যেত । সেই সময় এই গ্রন্থাগারে বহু দেশি ও বিদেশি দুষ্প্রাপ্য বই সংগৃহীত হয়েছিল, যা আজও সংরক্ষিত আছে । উল্লেখ থাকে যে, ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ছিল শহরের প্রথম নাগরিক পাঠাগার ।
তারপর ১৮৯১ সালে কলকাতার একাধিক সচিবালয় গ্রন্থাগারকে একত্রিত করে গঠিত হয় “ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি” । এই গ্রন্থাগারের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল গৃহ মন্ত্রকের গ্রন্থাগার ।
পরবর্তী সময়ে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ও ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির সংযুক্তিকরণ ঘটে । জানা যায়, ১৯০৩ সালের ৩০ জানুয়ারি লর্ড কার্জনের প্রচেষ্টায় ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ও ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিকে সংযুক্ত করে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয় । সেই সময় সংযুক্ত লাইব্রেরিটি ‘ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি’ নামেই পরিচিত হয় । এই সময় গ্রন্থাগারটি উঠে আসে আলিপুরের বেলভেডিয়ার রোডস্থ মেটকাফ হলের বর্তমান ঠিকানায় । এখানে উল্লেখ থাকে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাইব্রেরিটি এসপ্ল্যানেডের জবাকুসুম হাউসে স্থানান্তরিত হয়েছিল ।
এবার আসছি জাতীয় গ্রন্থাগার সম্বন্ধে …………?
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি পুনরায় মেটকাফ হলে উঠে আসে এবং লাইব্রেরির নতুন নামকরণ হয় জাতীয় গ্রন্থাগার বা ন্যাশানাল লাইব্রেরি । ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ জাতীয় গ্রন্থাগারকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেন ।
স্বাধীনতার পর ভারত সরকার “ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (নাম পরিবর্তন) অ্যাক্ট, ১৯৪৮” চালু করে । তারপর “ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার আইন, ১৯৭৬”এর ১৮ ধারা মোতাবেক ন্যাশনাল লাইব্রেরির নাম পরিবর্তন করে “ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার” করা হয় ।
গ্রন্থাগার কার্যত সমস্ত ভারতীয় ভাষায় বই, সাময়িকী, শিরোনাম, ইত্যাদির সংগ্রহশালা । জানা যায়, ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের সংগ্রহগুলি অনেকগুলি ভাষায় । হিন্দি বিভাগে বই রয়েছে যেগুলি উনবিংশ শতাব্দীর পুরো সময়কার এবং সেই ভাষায় ছাপা হওয়া প্রথম বই ।
আগেই বলেছি, ১৮৩৬ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি নামে প্রথম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় । সেই সময় লাইব্রেরিটি ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন লাইব্রেরির প্রথম মালিক । ভারতের তদনীন্তন গভর্নর-জেনারেল ‘লর্ড মেটকাফ’ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরির ৪,৬৭৫টি বই গ্রন্থাগারে দান করেছিলেন । এই দানের ফলেই গ্রন্থাগারের গোড়াপত্তন । বর্তমানে এই গ্রন্থাগারে কমপক্ষে ২০ লক্ষ বা তারও বেশী বই রয়েছে । “ভারত সরকারের পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রক”এর অধীনে “কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি” এখন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত ।
এবার আসছি লাইব্রেরির গুরুত্ব প্রসঙ্গে —
‘বই’ মানুষের নিত্যসঙ্গী । জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বই । এখানে একটা কথা পরিষ্কার, লেখক লেখেন, প্রকাশক সেই লেখা ছাপেন, প্রকাশক ও বিক্রেতা উভয়েই বই বিক্রি করেন । আর অন্যদিকে গ্রন্থাগারিক সেই বই সংগ্রহ করে যথাযথ বিন্যাস করেন এবং পাঠক সমাজ ঐসব উপাদান থেকে মনের খোরাক এবং জ্ঞানলাভে সমর্থ হন ।
শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তেমনি জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য । গ্রন্থাগারে থাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন বিষয়ের বই । আগ্রহী পাঠকের জন্যে গ্রন্থাগার জ্ঞানার্জনের যে সুযোগ করে দেয়, সেই সুযোগ অন্য কোথাও পাওয়া দুর্লভ । গ্রন্থাগার গ্রন্থের বিশাল সংগ্রহশালা, যা মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম । গ্রন্থাগারের মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহন করে জ্ঞানের মণিমুক্তা সংগ্রহের সুযোগ পায়। গ্রন্থাগারের সংগৃহীত বই সর্বসাধারণের জন্যে অবারিত । চিন্তাশীল মানুষের কাছে এমনকি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রন্থাগারের উপযোগিতা অনেক বেশি । গ্রন্থাগার হচ্ছে জ্ঞান আহরণের উপযুক্ত মাধ্যম । আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গ্রন্থাগারের উপযোগিতা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি । কারণ সংসারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে আমরা হিমশিম খাই । সেখানে বই কিনে পড়া অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় ! সুতরাং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে লাইব্রেরির গুরুত্ব অপরিসীম । অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক প্রতিদিনের টিফিন পিরিয়ড বা অন্য অবসর সময়টা আড্ডা ও গল্পগুজবের মধ্যে না কাটিয়ে লাইব্রেরি থাকলে সময়টা পড়ালেখায় কাটাতে পারেন । এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, শিক্ষা বিকাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি বা লাইব্রেরির অবস্থান অপরিহার্য ।
গণতন্ত্রের সাফল্যে গ্রন্থাগারের ভূমিকা গণমাধ্যমের চেয়ে কম নয় । আধুনিক বিশ্বে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা দিনে দিনে বাড়ছে । গ্রন্থাগার সকলের জন্য উন্মুক্ত । ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা নেই এখানে, নেই হানাহানি কলহ । সুতরাং প্রতিটি সুশীল নাগরিকের নিয়মিত গ্রন্থাগারে উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া ও জ্ঞানার্জন করা, তাঁদের নিয়মমাফিক রুটিনে আসুক ।
প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, “আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে । আমার মনে হয়, এদেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি ।“
পরিশেষে আমি মনে করি, লাইব্রেরি হচ্ছে শিক্ষা বিকাশের ও জ্ঞানার্জনের উপযুক্ত পীঠস্থান । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত) ।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও জন্মাষ্টমী : স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)।

জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি। তিনি নিজেই ভগবদ্গীতায় বলেছেন:-
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত|
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজম্যহম্ ||
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম্ |
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ||
(গীতা-৪/৭-৮)
অনুবাদ: “যখনি পৃথিবীতে অধর্ম বেড়ে যায় সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।” শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, রোহিণী নক্ষত্র যোগে বৃষ লগ্ন ও বুধবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মধুরায় (বর্তমান উত্তর প্রদেশ,ভারত) কংসের কারাগারে, মাতা দেবকীর অষ্টম সন্তান রূপে রাত বারোটার পর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর এই জন্মদিনকে জন্মাষ্টমী বলা হয়। এই বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণ পক্ষের অষ্টমী তিথি পড়ছে ২৬ অগস্ট ২০২৪। ২৬ তারিখ সোমবার জন্মাষ্টমী পালিত হবে।আমরা হিন্দু সনাতন ধর্বাবলম্বীরা দিনটিকে বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে পালন করে থাকি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাতা হলেন দেবকী, পিতা বসুদেব, যশোদা পালক-মাতা, নন্দ পালক-পিতা। সহোদর ভাই বলরাম, বোন সুভদ্রা, যোগমায়া হলেন পালক-বোন।

পৌরাণিক ব্যাখ্যা মতে, কংসের বোন দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতে নিজের বিনাশের দৈববাণী শুনে সে সর্বদাই আতঙ্কে থাকত। ফলে সে তার বোনের গর্ভে সদ্যভূমিষ্ট প্রতিটি সন্তানকেই নৃশংসভাবে হত্যা করত। তবে গর্ভ স্থানান্তরিত করায় রোহিনীর গর্ভে জন্ম নেয় দেবকীর সপ্তম সন্তান বলরাম। সবশেষে অধর্মের বিনাশ ঘটাতে জন্ম হয় কৃষ্ণের। তবে তার প্রাণরক্ষার্থে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ অনুসারে বাসুদেব কৃষ্ণপক্ষের সেই দুর্যোগ পূর্ণ প্রলয়ের রাতে সদ্যভূমিষ্ট সন্তানকে মা যশোদার কাছে রেখে আসেন। পাশাপাশি মা যশোদার কন্যাকে নিয়ে আসেন। এদিকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের ভুমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ পেয়ে কারাগারে ছুটে আসেন কংস। তারপর যখনই সেই কন্যা সন্তানকে আছাড় মারার উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেন, তখনই সেই কন্যা মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে দৈববাণী হয় “কংস, তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!” এই কন্যাসন্তান ছিলেন স্বয়ং দেবী যোগমায়া। তার পর থেকেই আমাদের সমাজে যে কোনো অন্যায়কারী ও অপশাসককে উদ্দেশ করে বলা হয়, “তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!” এটা আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় প্রবচন।

যাই হোক, কৃষ্ণের সন্ধান না পাওয়ায় রাজা কংস কুখ্যাত পুতনা রাক্ষসীকে ছয়মাস বয়সী সব শিশুকে হত্যার আদেশ দেন। রাজা কংসের নির্দেশমতো রাক্ষসী পুতনা বিষাক্ত স্তন পান করানোর ছলে একের পর এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করতে থাকে। অবশেষে যখন পুতনা কৃষ্ণের সন্ধান পান এবং তাকে স্তন পান করাতে যান, তখন মাত্র ছয়মাস বয়সেই কৃষ্ণ স্তনপানের মাধ্যমে সব বিষ শুষে নিয়ে পুতনার প্রাণনাশ করেন। এরপর একে একে তিনি কালীয়া নাগ, রাজা কংস সহ জগতের নানা দুষ্টকে তাঁর অসীম লীলার মাধ্যমে নিঃশেষ করেন।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় চারিদিকে অরাজকতা, নিপীড়ন, অত্যাচার ছিল চরম পর্যায়ে। মানুষের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সর্বত্র ছিল অশুভ শক্তির বিস্তার। শ্রীকৃষ্ণ সব অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে সমাজকে কলুষমুক্ত করেন। জন্মাষ্টমী অশুভের উপর শুভবুদ্ধির জয় হিসাবে পালিত হয়।

কিংবদন্তি অনুযায়ী বর্তমান বছরটি বাংলার ১৪৩১ (২০২৪ সাল) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫০ তম জন্মাষ্টমী। কারণ, বিভিন্ন পুরাণ ও প্রাচীন গ্রন্থ মতে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর ধরাধামে লীলা করেন। ১২৫ বছর ধরাধামে অবস্থান করে বৈকুন্ঠে গমন করেন। মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে তিনি ইহধাম ত্যাগ করে অন্তর্ধান করেন। সেই দিনই কলি প্রবেশ করে। সেই দিন ছিল শুক্রবার। খ্রিস্টপূর্ব ৩১০১ সালে কলিযুগ আরম্ভ হয়। বর্তমান ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। তা হলে কলির বয়স ৩১০১+২০২৪ =৫১২৫ বছর। শ্রীকৃষ্ণের অর্ন্তধানের দিন কলির আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণ ১২৫ বছর ধরাধামে লীলা করেছেন। তা হলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ৫১২৫+১২৫=৫২৫০ বছর পূর্বে হয়েছিল। জন্ম ১৮ জুলাই, ৩২২৮ খ্রিস্টপূর্ব মথুরা, শূরসেন রাজ্য (বর্তমান উত্তর প্রদেশ, ভারত) মৃত্যু ১৮ ফেব্রুয়ারি, ৩১০২ খ্রিস্টপূর্ব ভালকা, সৌরাষ্ট্র রাজ্য, (বর্তমান ভেরাভাল, গুজরাত, ভারত)। ভগবদ্গীতায জন্মাষ্টমী অশুভের উপর শুভবুদ্ধির জয় হিসাবে পালিত হয়। পূর্ণব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ মথুরার যাদববংশের বৃষ্ণি গোত্রের মানুষ, তিনি ছিলেন পরোপকারী, রাজনীতিজ্ঞ ও প্রেমিক।

মাঘ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ ইহধাম ত্যাগ করে অন্তর্ধান করেন। সেই দিনই শ্রীকৃষ্ণের অর্ন্তধানের দিন কলির আবির্ভাব। আর এই কলি যুগের অবতার জগৎ গুরু স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের আবির্ভাব ও মাঘ মাসের পূর্ণিমা, ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ পুণ্যময়ী মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে৷ তিনি ও সব অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে সমাজকে কলুষমুক্ত করার চেষ্টা করে গেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুভবুদ্ধির জয়ের চেষ্টা করে গেছেন। হিন্দুর সংহতি চেতনা জাগাবার জন্যে স্বামী প্রণবানন্দ ও বলেছিলেন -“হিন্দুর বিদ্যা বুদ্ধি, অর্থ ও সামর্থ যথেষ্ট আছে, কিন্তু নেই সংহতি শক্তি। এই সংহতি শক্তি জাগিয়ে দিলে হিন্দু আবার জাগ্রত হবে”। আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ বলেছিলেন, আমি হিন্দুকে “হিন্দু হিন্দু” জপ করাব, তবেই তাদের মধ্যে মহাশক্তির সঞ্চার হবে। জাতিভেদ প্রথাকে হাতিয়ার করে হিন্দুসমাজকে টুকরো করার যে বিষবৃক্ষ তৈরি করা হয়েছিল, তার মূলে কুঠারাঘাত করতে এগিয়ে এলেন যুগপুরুষ স্বামী প্রণবানন্দ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন হিন্দুবাদে বাকি ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীরা সঙ্ঘবদ্ধ ও সুরক্ষিত। কিন্তু ভারতের হিন্দু জনগণ অরক্ষিত, বিচ্ছিন্ন, ছিন্নভিন্ন, বিবাদমান, দুর্বল। হিন্দুদের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেওয়ার তাগিদে স্বামী প্রণবানন্দ বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছিলেন-“যে যা, তাকে তাই বলে ডাকলে সে সাড়া দেয়। মুসলমানকে মুসলমান বলে ডাক দেওয়া হচ্ছে, তাই সে সাড়া দিচ্ছে। খ্রিষ্টানকে খ্রিষ্টান বলে ডাক দেবার লোক আছে, তাই সে ডাকে সাড়া দিচ্ছে, নিজেদের অস্তিত্বও সেভাবে অনুভব করছে। কিন্তু, হিন্দুকে হিন্দু বলে ডাক দেবার লোক নেই। গত একশ বছর ধরে কেউ ডাক দিয়েছে-‘ব্রাহ্ম’ বলে, কেউ ডেকেছে ‘আর্য্য’ বলে, কেউ ডেকেছে ‘ভারতীয় জাতি’ বলে, কোন পক্ষ তাকে আখ্যা দিয়ে রেখেছে অমুসলমান। বিরাট ভারতীয় জাতটা অসাড়, অবশ হয়ে আত্মভোলা হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। আজ সময় এসেছে হিন্দুকে হিন্দু বলে ডাক দেবার।” হিন্দুর সংহতি, হিন্দু ধর্মের জাগরণের লক্ষ্যে স্বামী প্রণবানন্দ ও তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও পবিত্র রক্ষাবন্ধন (ঝুলন) : স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক)।

আমাদের মূল্যবান মনুষ্য জীবনে ভারতীয় সংস্কৃতি সভ্যতায় ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সত্য সনাতন হিন্দু ধর্মে এই উৎসবটি ভাই ও বোনের শুভ রাখীবন্ধন উৎসব। ভারতবর্ষে এই উৎসব শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন পালন করা হয়। এজন্য অনেক সময় রাখী বন্ধন উৎসব কে রাখী পূর্ণিমা ও বলা হয়। আবার ঝুলন পূর্ণিমা ও বলা হয়। ঝুলন পূর্ণিমা কিছু মন্দিরে শুধুমাত্র একদিনের জন্য ঝুলন যাত্রা উৎসব পালন করা হলেও, কিছু মন্দিরে একাদশীর দিন থেকে পূর্ণিমার দিন পর্যন্ত পালন করা হয়, যা শ্রাবণ মাসে পাঁচ দিন ধরে চলে। ঝুলন যাত্রা একটি ধর্মীয় উৎসব যা ভগবান কৃষ্ণ এবং ভগবান জগন্নাথকে উৎসর্গ করা হয়। ঝুলন যাত্রা উত্তর প্রদেশের মথুরা এবং বৃন্দাবন শহরগুলির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপ ধাম ও মায়াপুরে অত্যন্ত আড়ম্বর ও আনন্দের সাথে উদযাপিত হয়। সারা দেশে ভগবান কৃষ্ণ মন্দির, ভগবান জগন্নাথ মন্দির এবং অন্যন্য মন্দিরেও ঝুলন যাত্রা পালিত হয়। সারা বিশ্ব এবং সারা দেশ থেকে ভক্তরা এই মন্দিরগুলিতে উৎসব উদযাপন করতে সমবেত হন।

রক্ষাবন্ধন পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী দৈত্যরাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বলির রাজ্য রক্ষা করতে চলে এসেছিলেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। লক্ষ্মী বলিরাজের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষ্মীকে আশ্রয় দিতে রাজি হন। শ্রাবণ পূর্ণিমা উৎসবে লক্ষ্মী বলিরাজার হাতে একটি রাখী বেঁধে দেন। বলিরাজা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী আত্মপরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। এতে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। বলিরাজা বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিটি বোনেরা রাখীবন্ধন উৎসব হিসেবে পালন করে।

মহাভারতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী একবার যুদ্ধে ভগবান কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলে পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এতে ভগবান কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর পরে, পাশাখেলায় কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। এইভাবেই রাখীবন্ধনের প্রচলন হয়।

ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী ৩২৬ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের ক্ষতি না করার জন্য। পুরু ছিলেন কাটোচ রাজা। তিনি রাখীকে সম্মান করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিজে আলেকজান্ডারকে আঘাত করেননি।

ঐতিহাসিক মর্যাদায় সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মেওয়ারের রাজপুত রাণী কর্ণাবতী ও সম্রাট হুমায়ুনের ইতিহাস।
১৫৩৫ সালে গুজরাটের সুলতান বাদশা চিতোর আক্রমণ করলে চিতোরের রানী কর্ণাবতী হুমায়ুনের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং তার কাছে একটি রাখী পাঠান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন চিতোর রক্ষা করতে পারেননি কারণ তিনি চিতোর পৌঁছানোর আগেই বাহাদুর শাহ চিতোর জয় করে নিয়েছিলেন। বিধবা রানী কর্ণাবতী নিজেকে রক্ষা করতে না পেরে এবং বাহাদুর শাহ এর হাত থেকে বাঁচার জন্য ১৩০০০ স্ত্রীকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জহর ব্রত পালন করেন। পরে হুমায়ুন চিতোর জয় করে কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রম সিংহ কে রাজা ঘোষণা করেন। রাণী কর্ণাবতী ও সম্রাট হুমায়ুনের সম্পর্কের বুনিয়াদ ছিল শুধুই একটি রাখি আর সাথে থাকা একটি চিঠি। ভিন্ন ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্ক কিছুই মুখ্য হয়নি ভাইকে পাঠানো বোনের রক্ষাবার্তায়। বোনকে রক্ষায় ছুটে এসেছেন ভাই। শেষ রক্ষা না হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছেন অপরাধীকে।

পরবর্তী কালে আমরা জানি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখী বন্ধন উৎসব পালন করেছিলেন। আজ কাল আমরা সবাই রাখী বন্ধন উৎসবে মেতে উঠি। কিন্তু অনেক সময় তা উৎসব হয়েই থেকে যায়। অনেক সময় দামী ও রংচঙে রাখীর নিচে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে পবিত্র রাখি বন্ধন উৎসব এর সেই পুরোনো মহিমাময় ঐতিহ্য ও গৌরব।

এই রাখীবন্ধন উৎসব ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব। ভাই ও বোন,দাদা,দিদি এই উৎসব পালন করেন। এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে পবিত্র রাখী বেঁধে দেয়। এই রাখীটি ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালবাসা ও ভাইয়ের মঙ্গলকামনা এবং দিদি বা বোনকে আজীবন রক্ষা করার ভাই বা দাদার শপথের প্রতীক হিসাবে পরিগণিত হয়। এই বছর রাখি পূর্ণিমা তিথি পড়েছে পঞ্জিকা অনুযায়ী বাংলা ২রা ভাদ্র সোমবার,১৪৩১। ইংরেজি 19ই আগস্ট 2024. আপনাদের সবাইকে শুভ ঝুলন পূর্ণিমা ও রক্ষাবন্ধনের শুভেচ্ছা। আজ এই শুভ দিনে জগৎগুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ সবার শিরে বর্ষিত হোক এই প্রার্থনা করি।
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ….!
স্বামী আত্মভোলানন্দ(পরিব্রাজক) l

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ক্ষুদিরাম বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বাঙালি বিপ্লবীর ফাঁসির মঞ্চে আত্মবলিদান।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের অব্যর্থ পরিশ্রম যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত রাজনৈতিক দিক থেকে মুক্তি পেয়েছে। ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়, তার মূলে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে ক্ষুদিরাম বসু  প্রথমসারির একজন অন্যতম বিপ্লবী ছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য নাম, যিনি দেশমতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ রূপে।

 

ক্ষুদিরাম বসু, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর নাম। দেশের স্বাধীনতার জন্য ফাঁসির মঞ্চে যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথম বিপ্লবী ছিলেন তিনি। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে ক্ষুদিরাম বসুর এই আত্মত্যাগ আজও অনুপ্রেরণা যোগায় এবং উৎসাহিত করে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রে শপথ নিতে। এখন জেনে নেব ক্ষুদিরাম বসু সম্পর্কে কিছু কথা।

ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি (বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা) কেশপুর থানার অন্তর্গত মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার। তার মার নাম লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর তিনি তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড়ো দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের (চালের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল বলে শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়।ক্ষুদিরামের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি তার মাকে হারান।45

এক বছর পর তার পিতার মৃত্যু হয়। তখন তার বড়ো দিদি অপরূপা তাকে দাসপুর থানার এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলএ ভর্তি করে দেন।
১৯০২ এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করেন। তারা স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে ধারাবাহিক বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশন করেন, তখন কিশোর ছাত্র ক্ষুদিরাম এই সমস্ত বিপ্লবী আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্পষ্টভাবেই তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলকাতায় বারীন্দ্র কুমার ঘোষের কর্মতৎপরতার সংস্পর্শে আসেন। তিনি ১৫ বছর বয়সেই অনুশীলন সমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ওঠেন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী পুস্তিকা বিতরণের অপরাধে গ্রেপ্তার হন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম থানার কাছে বোমা মজুত করতে থাকেন এবং সরকারি আধিকারিকদেরকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করেন।
১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন।ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুল এবং মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন।
মেদিনীপুরে তার বিপ্লবী জীবনের অভিষেক। তিনি বিপ্লবীদের একটি নবগঠিত আখড়ায় যোগ দেন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং রাজনারায়ণ বসুর প্রভাবে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সেই সংগঠনের নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন হেমচন্দ্র দাসের সহকারী। এটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্রিটিশবিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই ক্ষুদিরাম তার গুণাবলীর জন্য সবার চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। ক্ষুদিরাম সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে বিপ্লবী দলভুক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় পান। ক্ষুদিরাম তারই নির্দেশে ‘সোনার বাংলা’ শীর্ষক বিপ্লবাত্মক ইশতেহার বিলি করে গ্রেপ্তার হন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কাঁসাই নদীর বন্যার সময়ে রণপার সাহায্যে ত্রাণকাজ চালান। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ তার সহযোগী হেমচন্দ্র কানুনগোকে প্যারিসে নির্বাসনে থাকা একজন রাশিয়ান নিকোলাস সাফ্রানস্কি-এর কাছ থেকে বোমা তৈরির কায়দা শেখার জন্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
কিংসফোর্ডকে গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা
অনুশীলন সমিতি কিংসফোর্ডকে হত্যা করার প্রচেষ্টা জারি রেখেছিল। এপ্রিলে দুই সদস্যের একটা পরিদর্শক দল মুজাফফরপুর সফর করে, যাতে যুক্ত ছিলেন প্রফুল্ল চাকী। তাদের ফিরে আসায় বোমা দিয়েছিলেন হেমচন্দ্র, যেগুলো বানানো হয়ছিল ৬ আউন্স ডিনামাইট, একটা বিস্ফোরক এবং কালো পাউডার ফিউজ। প্রফুল্ল চাকি মুজাফফরপুরে ফিরেছিলেন একটা নতুন ছেলেকে নিয়ে, যার নাম ক্ষুদিরাম বসু।
অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ এবং তাদের সহযোগীদের কাজকর্মে পুলিশের সন্দেহ হতে থাকে।কলকাতা পুলিশ কিংসফোর্ডের জীবন বাঁচানোর জন্যে সচেতন হয়ে ওঠে। কমিশনার এফ এল হলিডে মুজাফফরপুর পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্টের উপেক্ষার বদলে সতর্ক হয়েছিলেন। যাইহোক, চারজন লোককে ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্যে ব্যবস্থা করা হয়।ইতিমধ্যে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি নতুন নাম ধারণ করে যথাক্রমে হরেণ সরকার ও দীনেশ চন্দ্র রায় হয়েছেন, এবং কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত এক দাতব্য সরাইখানায় (ধর্মশালা) তারা বাসা নেন। তাদের অজ্ঞাতবাসের দিনগুলোতে ওই বিপ্লবীদ্বয় তাদের লক্ষ্যের কার্যকলাপ এবং দৈনন্দিন রুটিনের ওপর নজরদারি করতেন। দুই বিপ্লবী সফলভাবে তিন সপ্তাহের ওপর তাদের পরিচয় গোপন রাখতে পেরেছিল। মুজাফফরপুরের সুপারিন্টেন্ডেন্ট আর্মস্ট্রঙের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে সিআইডি অফিসার কলকাতায় ফিরে এসেছিল, যাতে বলা হয়েছিল যে, বিপ্লবীদ্বয় ওখানে পৌঁছায়নি।[১৫] ২৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল তাদের পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্যে জায়গামতো হাজির হয়েছিল। স্কুল ছাত্রের ভান করে মুজাফফরপুর পার্কে তারা সমীক্ষা করেছিলেন যে, এটা ব্রিটিশ ক্লাবের উলটো দিকে, যেখানে কিংসফোর্ড ঘনঘন আসেন। একজন কনস্টেবল তাদের দেখেছিল।
মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা
ভাগ্য ভালোর দিনে, প্রিঙ্গল কেনেডি নামে একজন ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের মেয়ে এবং স্ত্রীর সঙ্গে কিংসফোর্ড এবং তার স্ত্রী ব্রিজ খেলছিলেন। তারা রাত ৮.৩০ নাগাদ বাড়ি ফিরতে মনস্থ করেন। কিংসফোর্ড এবং তার স্ত্রী একটা গাড়িতে ছিলেন যেটা কেনেডি এবং তার পরিবারের গাড়ির মতোই দেখতে ছিল। কেনেডি মহিলাগণ কিংসফোর্ডের বাড়ির চত্বর থেকেই যাচ্ছিলেন। যখন তাদের গাড়ি ওই চত্বরের পূর্ব ফটকে পৌঁছায়, ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল গাড়িটার দিকে দৌড়ে যান এবং গাড়িতে বোমাগুলো ছোড়েন। একট প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং গাড়িটা সঙ্গে সঙ্গে কিংসফোর্ডের বাড়িতে আনা হয়। গাড়িটা ভেঙে গিয়েছিল এবং কেনেডি মহিলাগণ ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। মিস কেনেডি এক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান এবং মিসেস কেনেডি গুরুতর আঘাতের ফলে ২ মে তারিখে প্রয়াত হন।
ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল নিজেদের রাস্তায় পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। মধ্যরাতের মধ্যে সারা শহর ঘটনাটা জেনে গিয়েছিল, এবং খুব সকাল থেকেই সমস্ত রেলস্টেশনে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল যাতে প্রত্যেক যাত্রীর ওপর নজর রাখা যায়। শিমুরিঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্ল যখন জল খাওয়ার জন্যে ট্রেন থেকে নামেন, তখন মিস্টার ব্যানার্জি মুজফফরপুর থানায় একটা টেলিগ্রাম পাঠান। মোকামাঘাট রেল স্টেশনে প্রফুল্লকে পাকড়াও করার চেষ্টা করেন মিস্টার ব্যানার্জি। প্রফুল্ল তার কাছে থাকা রিভলভার দিয়ে নিজের মতো লড়াই করার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষে যখন দেখেন যে, রিভলভারে একটামাত্র গুলি আছে, তখন তিনি নিজের মুখের মধ্যে গুলি করেন।
হাতে হাতকড়ি লাগানো ক্ষুদিরামকে পয়লা মে মুজফফরপুর থেকে আনা হয়। পুরো শহর থানায় ভিড় করেছিল একদল সশস্ত্র পুলিশকর্মীর ঘিরে থাকা একটা কিশোর ছেলেকে শুধু একপলক দেখার জন্যে।
দুজন মহিলাকে হত্যা করার জন্যে তার বিচার হয় এবং চূড়ান্তভাবে তার ফাঁসির আদেশ হয়।
ফাঁসি হওয়ার সময় ক্ষুদিরামের বয়স ছিল ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ১১ দিন, যেটা তাকে ভারতের কনিষ্ঠতম ভারতের বিপ্লবী অভিধায় অভিষিক্ত করেছিল।

তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট

Share This