Categories
গল্প

রোদের নিচে জমে থাকা শীত।

(একটি শীতের দুপুরের প্রেমকাহিনি)

শীতের দুপুরগুলো অদ্ভুত।
সকাল যেমন কুয়াশায় ঢাকা থাকে, সন্ধে যেমন হিম হয়ে আসে—
দুপুর ঠিক তেমন নয়।
দুপুরে রোদ থাকে, অথচ শীত যায় না।
যেমন কিছু মানুষ—ভালোবাসা দেখায়, তবু দূরে থাকে।

সেদিনও এমনই এক শীতের দুপুরে,
কলকাতার উত্তর দিকের ছোট্ট পাড়াটার রাস্তায় হাঁটছিল নীলয়।

রোদ পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বাতাসে এখনো কাঁপুনি।
হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে সে ধীরে হাঁটছিল।
আজ অফিস নেই।
ছুটির দিন—তবু কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই।

হঠাৎ চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল সে।

এই দোকানটা তার খুব পরিচিত।
দু’তলা পুরনো বাড়ির নিচে, কাঠের বেঞ্চ, লোহার কেটলি,
আর সেই চেনা গন্ধ—চা, বিস্কুট, ধোঁয়া আর পুরনো সময়।

“এক কাপ লাল চা,” বলল নীলয়।

চা হাতে নিয়ে বেঞ্চে বসতেই চোখ পড়ল জানালার দিকে।
আর ঠিক তখনই—

সে দেখল মিতালীকে

অনেক বছর পর।

মিতালী জানালার ধারে বসে আছে।
হালকা বাদামি সোয়েটার, খোলা চুল, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা।
হাতের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে,
আর মুখে সেই চেনা নির্লিপ্ত ভাব।

যেন কিছুই বদলায়নি।

নীলয়ের বুকের ভেতর হঠাৎ করে কিছু একটা নড়ে উঠল।
অনেকদিন পর কেউ হঠাৎ পুরনো গান বাজিয়ে দিলে যেমন হয়।

সে নিজেও বুঝল না কেন,
পা দুটো নিজে থেকেই মিতালীর দিকে এগোল।

“মিতালী?”
স্বরে সামান্য দ্বিধা।

মিতালী তাকাল।
চোখের পাতা এক মুহূর্ত কাঁপল।
তারপর ধীরে হাসল।

“নীলয়!”

এই এক শব্দে এত স্মৃতি জমে ছিল—
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“তুমি এখানে?”
মিতালী বলল।

“হ্যাঁ… মানে… মাঝে মাঝে আসি,”
নীলয় হালকা হেসে বলল।

“বসো,”
মিতালী সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে দিল।

নীলয় বসল।
দুজনের মাঝখানে টেবিল, দু’কাপ চা,
আর বহু বছর না বলা কথা।

তাদের শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে।
সেদিনও ছিল শীত।
তবে দুপুর নয়—সন্ধে।

সেই দিনটার কথা দুজনেই মনে রেখেছে।
কারণ সেদিনই সব শেষ হয়েছিল,
কিন্তু কেউ ঠিক করে কিছু শেষ করেনি।

“কেমন আছ?”
মিতালী জিজ্ঞেস করল।

“চলে যাচ্ছে,”
নীলয় বলল।
“তুমি?”

“আমি… ভালোই,”
একটু থেমে যোগ করল,
“মানে, থাকা যায়।”

এই ‘থাকা যায়’ কথাটার ভেতরেই মিতালীর সব কথা লুকিয়ে থাকে।
আগেও থাকত।

নীলয় জানে।

“এখন কোথায় থাকো?”
নীলয় জানতে চাইল।

“সল্টলেকে,”
“অফিস ওখানেই।”

“এখনো লেখালেখি করো?”
নীলয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

মিতালী তাকিয়ে রইল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
“কখনো সখনো।”

এই উত্তরটার মানে নীলয় ভালো করেই বোঝে।
কখনো সখনো মানে—
মন খারাপ হলে,
শীতের দুপুরে,
অথবা পুরনো কেউ হঠাৎ সামনে এসে বসলে।

চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
তবু কেউ খেয়াল করছিল না।

বাইরে রোদ পড়েছে।
রাস্তায় মানুষজন, রিকশা, সাইকেল—সব চলছে।
কিন্তু এই টেবিলটার চারপাশে যেন সময় থেমে গেছে।

“তুমি কি বিয়ে করেছ?”
মিতালী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

নীলয় একটু থমকে গেল।
তারপর মাথা নাড়ল।

“না।”

“আমি… করেছিলাম,”
মিতালী বলল খুব আস্তে।

নীলয় জানত না কেন,
এই কথাটা শুনে তার ভেতর কোনো ব্যথা হলো না।
বরং একরকম শান্তি।

“কেমন?”
নীলয় জানতে চাইল।

মিতালী জানালার বাইরে তাকাল।
রোদের দিকে।

“শেষ হয়ে গেছে,”
বলল সে।
“কিছু জিনিস টেকে না।”

নীলয় চুপ করে থাকল।
এই কথার মানে সে বুঝতে পারে।

তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল কলেজে।
শীতের দুপুরে লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে।

মিতালী তখন কবিতা লিখত।
নীলয় পড়ত, শুনত, বোঝার চেষ্টা করত।

তাদের ভালোবাসা ছিল শান্ত।
কোনো নাটক নেই, কোনো চিৎকার নেই।
শুধু দুপুরের রোদ,
চায়ের কাপ,
আর দীর্ঘ নীরবতা।

সমস্যা এসেছিল তখনই—
যখন জীবনের গতি বদলাতে শুরু করেছিল।

নীলয়ের চাকরি,
মিতালীর লেখালেখি,
দুজনের আলাদা আলাদা স্বপ্ন।

তারা ঝগড়া করেনি।
শুধু কথা বলা কমে গিয়েছিল।
আর একদিন—
কথা বলা পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল।

“তোমার মনে আছে?”
মিতালী হঠাৎ বলল।
“সেই শীতের দুপুরটা?”

নীলয় হাসল।
“যেটাতে তুমি বলেছিলে—
ভালোবাসা মানে চুপ করে পাশাপাশি বসে থাকা?”

“হ্যাঁ,”
মিতালীও হাসল।
“আমি এখনো তাই ভাবি।”

নীলয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমিও।”

দুজনেই জানত—
এই কথাটার ভেতর অনেক কিছু আছে।
কিন্তু সেগুলো আর বের করার দরকার নেই।

বাইরে রোদ একটু ঢলে পড়েছে।
শীতের দুপুর ধীরে ধীরে বিকেল হচ্ছে।

মিতালী উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে যেতে হবে,”
বলল সে।

নীলয় মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”

দুজনেই জানত—
এই যাওয়াটা চূড়ান্ত নয়,
আবার নয়।

দরজার কাছে এসে মিতালী থামল।
একটু ভেবে বলল,
“কখনো… আবার দেখা হবে?”

নীলয় জানত,
এই প্রশ্নটার উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—
কোনোটাই পুরো সত্য নয়।

তবু বলল,
“হতে পারে।”

মিতালী হালকা হাসল।
তারপর চলে গেল।

নীলয় আবার বেঞ্চে বসল।
ঠান্ডা চা হাতে নিল।

শীতের দুপুর তখন শেষের পথে।
রোদ কমছে,
কিন্তু ভেতরের ঠান্ডা একটু কমেছে।

সে বুঝল—
কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না।
শুধু জমে থাকে।

শীতের দুপুরের মতো।
রোদের নিচে,
চুপচাপ।


✨ শেষ ✨

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মরক্কোর হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক শহর ফেজ—যেখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি বাজার যেন একেকটি ইতিহাসের পাতায় লেখা গল্প।

মরক্কোর ফেজ – এক হাজার বছরের ইতিহাসে মোড়া রহস্যময় প্রাচীন নগরী

মরক্কোর হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক শহর ফেজ—যেখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি বাজার যেন একেকটি ইতিহাসের পাতায় লেখা গল্প। অনেকেই এটিকে মরক্কোর “সাংস্কৃতিক রাজধানী” বলেন। আজও ফেজ শহর তার পুরনো ঐতিহ্য, শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। আরব-ইসলামিক বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নগরীকেন্দ্র হিসেবে ফেজ ভ্রমণ মানে এক ধরনের টাইম ট্রাভেল—যেখানে আধুনিকতার মাঝে হাজার বছরের পুরোনো জীবনের স্পর্শ মেলে।


ফেজ—একটি বিশ্ব ঐতিহ্যের শহর

ফেজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো Fes el-Bali, বিশ্বের সবচেয়ে বড় car-free (গাড়িমুক্ত) পুরনো শহর।
এলোমেলো সরু গলি, মসজিদ, প্রাসাদ, মাদ্রাসা, বাজার—সব মিলিয়ে এটি UNESCO World Heritage Site।
পায়ে হেঁটে ঘোরাটাই এখানে প্রধান ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

গলিগুলো এতটাই সরু এবং জটিল যে অনেক পর্যটক মজা করে বলেন, “ফেজে হারিয়ে যাওয়া এক ধরনের শিল্প!”


আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় – বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়

ফেজে এলে অবশ্যই দেখতে হবে University of Al Quaraouiyine

  • প্রতিষ্ঠিত: ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
  • প্রতিষ্ঠাতা: ফাতিমা আল-ফিহরি (একজন অসাধারণ মুসলিম নারী শিক্ষাপ্রশাসক)
  • বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়

চমৎকার মসজিদ, নীল–সবুজ জেলিজ মোজাইক আর শান্ত পরিবেশ এই স্থানটিকে আরও পবিত্র করে।


মেদিনা ও সুক – রঙ, গন্ধ আর জীবনের উন্মুক্ত পাঠশালা

ফেজের পুরনো সুক (বাজার) মরক্কোর ঐতিহ্যের বুকে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
এখানে দেখতে পাবেন—

  • রঙিন মশলার স্তূপ
  • মরোক্কোর ট্যাজিন-পাত্র
  • জাফরান, খেজুর ও বাদামের দোকান
  • হস্তশিল্প, ল্যাম্প, কার্পেট, চামড়াজাত দ্রব্য
  • ঐতিহ্যবাহী মেটাল ও পিতলের কারুকার্য

প্রতিটি দোকান যেন আপনাকে ডাকছে—“এসো, দেখো, স্পর্শ করো, চিনে নাও মরক্কোকে।”


চ্যার ট্যানারি – ফেজের সবচেয়ে বিখ্যাত ভ্রমণস্থল

ফেজের Chouara Tannery বিশ্ববিখ্যাত।
এটি পৃথিবীর অন্যতম পুরনো ট্যানারি, এখনও প্রাচীন পদ্ধতিতে চামড়া রঙ করা হয়।

রঙিন টবগুলো দূর থেকে দেখতে—

  • লাল, হলুদ, বাদামি, নীল
  • যেন রঙের এক বিশাল প্যালেট

এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় আপনি এক বিশাল শিল্পের কর্মশালার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।


বু ইনানিয়া মাদ্রাসা – স্থাপত্যের অপূর্ব সৃষ্টি

১৪শ শতকে নির্মিত Bou Inania Madrasa তার খোদাই করা কাঠের কাজ, সবুজ জেলিজ টাইলস, মিহি মার্বেল ও শান্ত প্রাঙ্গণের জন্য বিখ্যাত।
এখানে স্থাপত্যের নিখুঁত সৌন্দর্য দেখে মুহূর্তেই মন ভরে যাবে।


মেলাহ ও ইহুদি কোয়ার্টার

ফেজের ইতিহাস কেবল ইসলামিক ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এখানে আছে প্রাচীন Jewish Mellah

  • অনন্য স্থাপত্য
  • কাঠের বারান্দা
  • ইহুদি কবরস্থান

এ এক ভিন্ন সংস্কৃতির ছোঁয়া, যা ফেজকে বহুমাত্রিক করে তোলে।


ফেজে খাবার—সুগন্ধে ভরপুর মরক্কো

ফেজ মরক্কোর সেরা খাবারের কেন্দ্রও বলা হয়।
অবশ্যই চেখে দেখুন—

  • বিস্টিলা (B’stilla)—মিষ্টি ও লবণাক্ত স্বাদের মেলবন্ধন
  • ট্যাজিন—মরোক্কোর ঐতিহ্যবাহী ধীর-রান্না
  • কুসকুস
  • পুদিনার চা—মরোক্কান আতিথেয়তার প্রতীক

ভ্রমণের সেরা সময়

ফেজ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়—

  • মার্চ থেকে মে
  • সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর
    এসময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম থাকে।

ফেজ কেন আলাদা?

ফেজ এমন একটি শহর—
যেখানে আধুনিকতা নেই তা নয়, কিন্তু তা কখনই ইতিহাসের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায় না।
এটি মরক্কোর সাংস্কৃতিক আত্মা, যেখানে—

  • সূক্ষ্ম শিল্প
  • সমৃদ্ধ শিক্ষা
  • বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি
  • প্রাচীন জীবনযাত্রা

সবকিছু একই ছাদের নিচে।


শেষ কথা

মরক্কোর ফেজ এমন একটি ভ্রমণ স্থান, যা আপনাকে শুধু ছবি তোলার আনন্দই দেবে না, বরং ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যাবে। প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি কারখানা—সবকিছুই আপনাকে বলবে মরক্কোর অতীতের গল্প।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি – নক্ষত্রের আলোয় হারিয়ে যাওয়ার এক স্বপ্নময় যাত্রা।।

সাহারা মরুভূমির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে—
অসীম বালিয়াড়ি, সোনালি রোদ, উটের কাফেলা, আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারার ঝিলিক।
মরক্কোর সাহারা এমনই এক জায়গা, যেখানে গেলে মনে হয় পৃথিবী যেন থেমে আছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন প্রকৃতির সর্বোচ্চ বিস্ময়ের সামনে।

মরুভূমির বালির ঢেউয়ের ওপর হাঁটলে বুঝবেন—এই নিঃশব্দ ভূমিও কত প্রাণবন্ত, কত রহস্যময়!


সাহারা – মরক্কোর সোনালি রত্ন

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি মূলত দু’টি বড় অংশে ভাগ—

  • মারজুগা (Merzouga) – Erg Chebbi dunes
  • জাতটি (Zagora) – Erg Chigaga dunes

এর মধ্যে মারজুগার বালিয়াড়ি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বিখ্যাত—
১০০–১৫০ মিটার উঁচু বালির পাহাড়গুলো যেন প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভাস্কর্য!


সূর্যাস্ত – জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য

সাহারায় সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি।
মরুভূমির বুকে যখন লাল–কমলা রঙে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, তখন চারপাশ যেন সোনালি পৃথিবীতে রূপান্তরিত হয়।

বালিয়াড়ির চূড়ায় বসে এই দৃশ্য দেখা মানেই—
নিঃশব্দ পৃথিবীর মাঝে নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হওয়া।


উটের কাফেলার সঙ্গে যাত্রা

সাহারার আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে উটের পিঠে চেপে বালিয়াড়ি পেরোনোর সময়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা উটের ছন্দে মনে হবে আপনি কোনো প্রাচীন বাণিজ্যকারবানের অংশ।

গাইডরা সাধারণত নিয়ে যান—

  • সূর্যাস্ত দেখার স্থান
  • বিশেষ পর্যবেক্ষণ dune
  • রাতে ক্যাম্পে পৌঁছানোর রুট

এই যাত্রা যেন পুরোনো আরব্য রজনীর কাহিনির মতো।


তারাভরা রাত – পৃথিবীর সেরা নক্ষত্ররাজি

মরুভূমির রাতই সাহারার সবচেয়ে জাদুকরী সময়।
শহরের আলোর দূষণ নেই, কোলাহল নেই—
শুধু আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি তারার আলো।

এখানে আপনি দেখতে পাবেন—

  • মিল্কি ওয়ে
  • শুটিং স্টার
  • একেবারে স্বচ্ছ গ্যালাক্সির ধারা

ক্যাম্পে বসে মোরোক্কান সঙ্গীত আর আগুনের পাশে গাইডদের গল্প—
এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।


বেডুইন-স্টাইল ক্যাম্পে রাতযাপন

মরুভূমির অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ করে ক্যাম্পে রাত কাটানো।
এগুলো দুই রকম—

  • স্ট্যান্ডার্ড ক্যাম্প
  • লাক্সারি ক্যাম্প

লাক্সারি ক্যাম্পে পাবেন—

  • আরামদায়ক বিছানা
  • ব্যক্তিগত বাথরুম
  • মরোক্কান ডিনার
  • আগুন জ্বালিয়ে সঙ্গীত

এখানে বসে মনে হবে—মরুভূমির রাত আপনারই জন্য সাজানো।


স্যান্ডবোর্ডিং – বালির ঢেউয়ে রোমাঞ্চ

সাহারার বালিয়াড়িতে স্যান্ডবোর্ডিং একটি জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার।
বালির পাহাড় বেয়ে বোর্ডে করে নেমে আসার উত্তেজনা ভোলার নয়।


বেরবার সংস্কৃতির ছোঁয়া

মরক্কোর সাহারা অঞ্চলে বসবাসকারী বেরবার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
এখানে আপনি তাদের—

  • গান
  • লোকগাথা
  • ঐতিহ্যবাহী খাবার
  • নীল টুয়ারেগ পোশাক

সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখতে পারবেন।


ভ্রমণের সেরা সময়

সাহারা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়:

  • অক্টোবর থেকে এপ্রিল
    এই সময় ঠান্ডা থাকে, আর মরুভূমির রাত আরামদায়ক।

অত্যাধিক গরমের সময় (জুন–আগস্ট) ভ্রমণ উপযুক্ত নয়।


সাহারা কেন বিশেষ?

  • পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমির এক অদ্ভুত সুন্দর অংশ
  • রাতের আকাশ পৃথিবীর অন্য যে কোনো জায়গার তুলনায় সবচেয়ে পরিষ্কার
  • উটের কারভান অভিজ্ঞতা
  • বালিয়াড়ির অবিরাম ঢেউ
  • নিস্তব্ধতা, শান্তি, আর প্রকৃতির বিশালতা

এ সব মিলিয়ে সাহারা এমন একটি স্থান—
যেখানে গেলে মনে হয় আপনি প্রকৃতির কোলে ফিরে এসেছেন।


শেষকথা

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি এমন এক ভ্রমণ স্থান, যা মানুষের জীবনে অন্তত একবার অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। এখানে কোনো বিলাসিতা নেই, নেই শহরের কোলাহল—
কিন্তু আছে প্রকৃতির grand beauty, আছে নিস্তব্ধতা, আছে তারাবর্ষার রাত।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ট্যাঙ্গিয়ার (Tangier)— একটি শহর যা একই সঙ্গে রহস্যময়, ঐতিহাসিক, আধুনিক ও রোমান্টিক।

মরক্কোর উত্তরের দরজা, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনে দাঁড়ানো ট্যাঙ্গিয়ার (Tangier)
একটি শহর যা একই সঙ্গে রহস্যময়, ঐতিহাসিক, আধুনিক ও রোমান্টিক।
আফ্রিকার প্রবেশদ্বার বলা হয় এই শহরকে, আবার ইউরোপও এখান থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে!
হাওয়ার সঙ্গে লেগে থাকে সমুদ্রের লবণগন্ধ, আর পুরোনো গলির মোড়ে মোড়ে যেন লুকিয়ে থাকে শত বছরের গল্প।

চলুন, ট্যাঙ্গিয়ারের অলিগলি ঘুরে আসা যাক—একটি ভ্রমণনগরী, যা ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য সত্যিই এক অমূল্য অভিজ্ঞতা।


ট্যাঙ্গিয়ারের ইতিহাস – রাজা, কবি, গুপ্তচর আর অভিযাত্রীদের শহর

ট্যাঙ্গিয়ার ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি বড় সাম্রাজ্যই তার ছাপ রেখে গেছে—
ফিনিশীয়, রোমান, আরব, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, এমনকি ফরাসিরাও।
আর ২০শ শতকে এটি ছিল একটি ইন্টারন্যাশনাল জোন, যেখানে বাস করতেন শিল্পী, লেখক, অনুসন্ধানকারী, গুপ্তচর—সবাই।

পল বাউলস, উইলিয়াম বারোজ, মাতিস–এর মতো শিল্পীদের প্রিয় শহর ছিল ট্যাঙ্গিয়ার।
এখানে আসলে বোঝা যায় – সংস্কৃতি কত স্তর নিয়ে তৈরি হয়।


সমুদ্রকে জড়িয়ে থাকা শহর

ট্যাঙ্গিয়ারের সাদা–নীল রঙের বাড়িগুলো যেন সমুদ্রের সঙ্গে কথোপকথন করছে।
উঁচু পাহাড় থেকে শুরু করে উপকূলের রাস্তাগুলো—সবই মনোরম।

মেডিনা থেকে দূরে তাকালে দেখা যায়—
সামনে নীল আকাশ, নীচে নীল সমুদ্র, আর একসারি নৌকা ভাসছে যেন ছবির মধ্যে।


ট্যাঙ্গিয়ারের প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ

১. কাসবা (Kasbah) – রাজাদের পুরোনো দুর্গ

ট্যাঙ্গিয়ারের মাথার মুকুট এই কাসবা।
এখান থেকে শহর, সমুদ্র, এমনকি দূরের স্পেনও দেখা যায়।

এখানে রয়েছে—

  • প্রাসাদ-পরিবর্তিত Kasbah Museum
  • সুলতানদের বসবাসের নিদর্শন
  • প্রাচীন মুরিশ স্থাপত্য

পুরোনো পাথরের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় আমরা যেন অতীতে ফিরে যাচ্ছি।


২. ট্যাঙ্গিয়ার মেডিনা – গন্ধ, রঙ আর কোলাহলের শহর

মেডিনায় ঢুকলেই শুরু হয় এক অন্যরকম জগৎ।
এখানে পাবেন—

  • কার্পেট
  • ঐতিহ্যবাহী পোশাক
  • মসলা
  • রঙিন লণ্ঠন
  • হস্তশিল্প

প্রতিটি দোকান যেন একেকটা ছোট্ট গল্প।


৩. হারকিউলিস গুহা (Hercules Cave) – ইতিহাস ও মিথের মেলবন্ধন

ট্যাঙ্গিয়ারের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই গুহা মরক্কোর অন্যতম বিখ্যাত প্রত্নস্থান
কথিত আছে, এখানে নাকি বীর হারকিউলিস বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয়—
গুহার মুখটি আফ্রিকা মহাদেশের মানচিত্রের আকৃতির মতো!

সমুদ্রের ঢেউ গুহার ভিতরে আছড়ে পড়ার দৃশ্য সত্যিই অবিস্মরণীয়।


৪. Cap Spartel – যেখানে দুই সাগরের মিলন

এখানে দাঁড়ালে দেখা যায়—
ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনরেখা।

উঁচু খাড়া পাহাড় থেকে নীচের নীল সাগর দেখতে দেখতে মনে হবে–
প্রকৃতি যেন তার সব নীল রঙ এখানে ঢেলে দিয়েছে।


৫. গ্র্যান্ড সোকার (Grand Socco) – জীবনমুখর শহরচত্বর

সন্ধ্যার দিকে এ জায়গা জমজমাট হয়ে ওঠে।
লোকজনের চলাফেরা, রাস্তার চা, তাজা খেজুর, বাদাম, আর ফুডস্টলগুলো—সব মিলিয়ে চমৎকার জীবন্ত পরিবেশ।


ট্যাঙ্গিয়ারের খাবার – সাগরের স্বাদ

এই শহরে খাবারের মূল আকর্ষণ সীফুড
তাজা মাছ, শুঁটকি ভাজার সুবাস, গ্রিল করা সার্ডিন, অক্টোপাস—এখানে সবই অসাধারণ।

অবশ্যই চেখে দেখা উচিত—

  • মরোক্কান ট্যাজিন
  • কুসকুস
  • নানান রকম সীফুড গ্রিল
  • পুদিনা চা

সামুদ্রিক বাতাসের সঙ্গে এই খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ আনন্দ দেয়।


ট্যাঙ্গিয়ারের সৈকত – শান্ত জলের আহ্বান

Tangier Beach

শহরের কাছাকাছি, পরিষ্কার বালু ও নানা ক্যাফের উপস্থিতি পর্যটকদের কাছে এটি জনপ্রিয়।

Achakar Beach

হারকিউলিস গুহার কাছে অবস্থিত।
চমৎকার ঢেউ, কম ভিড়, আর ফটোগ্রাফারদের স্বর্গ।


ট্যাঙ্গিয়ারের শিল্প ও সংস্কৃতি

এটি এমন একটি শহর, যাকে বলা হয়—
“Artists’ Muse”

বিভিন্ন যুগের শিল্পী ও লেখকেরা এখানে এসে বসবাস করেছেন, সৃষ্টি করেছেন তাদের শ্রেষ্ঠ কাজ।
মেডিনার গলি, কাসবার দেয়াল, সাগরবাতাস—সবই সৃষ্টিশীল মনকে স্পর্শ করে।


ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

ট্যাঙ্গিয়ার ঘোরার সেরা সময়—

  • মার্চ থেকে জুন
  • সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর

গরম কম থাকে, আবহাওয়া থাকে মনোরম।


ট্যাঙ্গিয়ার কেন বিশেষ?

  • আফ্রিকা ও ইউরোপের মিলনবিন্দু
  • ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমুদ্রের অনন্য মেলবন্ধন
  • রহস্যময় গুহা, পাহাড় ও মেডিনা
  • উভয় সাগরের সংযোগস্থল
  • শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণার উৎস

এক কথায়, এটি এমন একটি শহর—
যা আপনার মনে দীর্ঘদিন ধরে ছাপ রেখে যাবে।


শেষ কথা

মরক্কোর ট্যাঙ্গিয়ার এমন এক ভ্রমণস্থান, যেখানে ইতিহাস, সমুদ্র, পাহাড়, গলি, সংস্কৃতি—সবকিছুই যেন একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এ শহর একদিকে শান্ত, আবার অন্যদিকে উজ্জীবিত।
এখানে আসলে আপনি একই সঙ্গে আফ্রিকার মায়া ও ইউরোপের ছোঁয়া একসঙ্গে অনুভব করবেন।

Share This
Categories
প্রবন্ধ বিবিধ

২৫ ডিসেম্বর — তুলসী পূজন দিবস: সনাতন সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাসঙ্গিকতা।

ভূমিকা:-  ভারতের সাংস্কৃতিক ভিত্তি যতটা বৈচিত্র্যময়, ততটাই প্রাচীন। এখানকার ঋষি-ঋষিকারা শুধু ধর্মীয় আচরণই গড়ে দেননি—তাঁরা প্রকৃতি, মানবতা, বৈদিক দর্শন, উপনিষদীয় জ্ঞান ও জীবনযাপনের এক চিরন্তন সহাবস্থান তৈরি করেছিলেন। সেই সহাবস্থানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে—তুলসী

ভারতের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি উঠোন, প্রতিটি গ্রাম—একসময় তুলসীর সুগন্ধে ভরে থাকত। তুলসী শুধু গাছ নয়—এ এক বিশ্বাস, এক দর্শন, এক জীবনযাপন পদ্ধতি। তাই তো সনাতনের ঘরে ঘরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলে তুলসীর তলায়। সেই তুলসীকে কেন্দ্র করে হাজার বছরের প্রাচীন একটি বিশেষ দিন পালন করা হয়—২৫ ডিসেম্বর: তুলসী পূজন দিবস (Tulsi Pujan Diwas)

এই দিনটি পশ্চিমা বিশ্বের “ক্রিসমাস”-এর সঙ্গে এক সময়ে পড়লেও, এর উৎস, উদ্দেশ্য, দর্শন, ইতিহাস—সবই সম্পূর্ণ আলাদা। এটি সনাতন সংস্কৃতির এক অসাধারণ পরিচয় বহন করে।


অধ্যায় ১ : তুলসী — সনাতন ধর্মে পবিত্রতার প্রতীক

১.১ তুলসীর নাম ও অর্থ

“তুলসী” শব্দের অর্থ—অতুলনীয়া, যার তুলনা নেই।
আর “বৃন্দা” নামে তাঁকে ডাকা হয়—যার অর্থ—শক্তির আধার।

তুলসীকে সনাতন ধর্মে দেবীরূপে পূজা করা হয়।
কারণ—

  • তিনি বিষ্ণুর অর্ধাঙ্গিনী (বৃন্দাবতীরূপে)
  • তিনি পরিশুদ্ধির প্রতীক
  • তিনি আয়ুর্বেদের মা
  • তিনি পরিবেশের রক্ষক

১.২ বৈদিক শাস্ত্রে তুলসীর গুরুত্ব

স্কন্দ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ, গরুড় পুরাণ—সব পুরাণেই তুলসীর পবিত্রতার বর্ণনা পাওয়া যায়।

স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে:
“তুলসীর স্পর্শ, দর্শন, সেবন বা পূজা — যে কোন একটি করলেও পাপমুক্ত হওয়া যায়।”

ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ (কৃষ্ণজন্ম খণ্ড)-এ বলা হয়:
“যেখানে তুলসী আছে, সেখানে বিষ্ণুর নিজ উপস্থিতি আছে।”


অধ্যায় ২ : তুলসী পূজার ইতিহাস

২.১ তুলসী পূজা কখন শুরু হয়?

তুলসী পূজার সূচনা অতিমাত্রায় প্রাচীন—বৈদিক যুগ থেকেই।
ইতিহাসবিদদের মতে—

  • খ্রিস্টান সভ্যতার প্রাথমিক অস্তিত্বের বহু হাজার বছর আগে
  • মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা রোমান সভ্যতার পূর্বে
  • মিশর বা ব্যাবিলনের বহু আগে থেকেই

ভারতের গৃহে তুলসী ছিল নিয়মিত পূজার অংশ।

বৈদিক যুগ (প্রায় ৫,০০০–১০,০০০ বছর পূর্বে) থেকেই “সমিদা” হিসেবে যজ্ঞে তুলসীর ব্যবহার ছিল।
আর পরে পুরাণ যুগে তুলসীদেবীর পূজা প্রতিষ্ঠা পায়।

২.২ প্রথম কে তুলসী পূজা শুরু করেন?

শাস্ত্রের তথ্য অনুযায়ী:

  1. তুলসী (বৃন্দা)-ই ছিলেন প্রথম দেবী যাঁকে বিষ্ণু নিজেই আশীর্বাদ দেন,
    এবং তাঁর পূজা নির্ধারিত করেন।
  2. ধর্মরাজ, ঋষিমুনিরা—গৃহস্থ আশ্রমে নিয়মিত তুলসী পূজা করতেন।
  3. শ্রীকৃষ্ণ নিজে গোকুলে ব্রজবাসীদের তুলসী সেবার পরামর্শ দিতেন।

অতএব—
তুলসী পূজার প্রতিষ্ঠাতা কোনো মানুষের নাম নয় — দেবতাই এর সূচনা করেন।
বরং ঋষিমুনিরা সেই ঐতিহ্যকে গৃহস্থ জীবনে ছড়িয়ে দেন।


অধ্যায় ৩ : ২৫ ডিসেম্বর — তুলসী পূজন দিবস

৩.১ কেন ২৫ ডিসেম্বরেই তুলসী পূজন দিবস?

অনেকেই মনে করেন, “ক্রিসমাস” এর প্রতিযোগী হিসাবে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব তা নয়।

তুলসী পূজন দিবস পালন করা হয়—

কারণ ১:

মার্গশীর্ষ মাসে তুলসীর বৃদ্ধি ও পবিত্রতম অবস্থা থাকে।

কারণ ২:

এই দিনটি উত্তরের দিকে সূর্যের গতিপথ পরিবর্তনের পূর্বসময়—
অর্থাৎ সূর্য দক্ষিণায়নের শেষ পর্যায়
এই সময়ে তুলসীর ঔষধি-ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে।

কারণ ৩:

পরিবেশ রক্ষার দিক থেকেও ডিসেম্বর মাস ভারতীয় ঋতুচক্রে গাছ লাগানো বা পুনর্নবীকরণের উপযুক্ত সময়।

কারণ ৪:

ক্রিসমাসের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজস্ব সনাতন ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।


অধ্যায় ৪ : তুলসী বনাম ক্রিসমাস — সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা

এখানে কোনো ধর্মবিরোধী আলোচনা নয়—
বরং ভারতীয় সংস্কৃতি বনাম পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভেদ তুলে ধরা।

৪.১ ক্রিসমাস কী?

ক্রিসমাস হল—

  • খ্রিস্টান ধর্মের একটি ধর্মীয় উৎসব
  • যিশু খ্রিস্টের সম্ভাব্য জন্মদিন (বাস্তবে ঐ দিন জন্ম নাও হতে পারে)
  • মূলত মধ্যযুগে রোমান পৌত্তলিক উৎসব “Saturnalia” থেকে রূপান্তরিত

অর্থাৎ এটি তুলনামূলকভাবে নতুন উৎসব, বয়স সর্বোচ্চ ১৫০০–১৭০০ বছর।

৪.২ তুলসী পূজা কী?

তুলসী পূজা—

  • ভারতীয় বৈদিক যুগের বৈশিষ্ট্য
  • বয়স ৫,০০০ বছর নয়—সম্ভবত ১০,০০০+ বছর
  • বৈদিক চিকিৎসা, দর্শন, যোগ, আয়ুর্বেদ ও পরিবেশচেতনার প্রতিনিধিত্ব করে

৪.৩ কীভাবে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা?

বিষয় তুলসী পূজা ক্রিসমাস
উৎপত্তি বৈদিক যুগ মধ্যযুগীয় রোমান সংস্কৃতি
ভিত্তি আয়ুর্বেদ, পরিবেশ, প্রকৃতি ধর্মীয় বিশ্বাস
প্রধান প্রতীক তুলসী গাছ ক্রিসমাস ট্রি
উদ্দেশ্য শুদ্ধতা, প্রকৃতির পূজা, পরিবেশ সুরক্ষা যিশুর জন্মোৎসব
বয়স ১০,০০০+ বছর ~১৭০০ বছর
দর্শন প্রকৃতি-মানবের ঐক্য একেশ্বরবাদ

ভারতের প্রেক্ষাপটে—
তুলসী পূজন দিবস আমাদের আত্মপরিচয়, আর ক্রিসমাস বিদেশি সাংস্কৃতিক আমদানী।
দুটো পালন করা ভুল নয়, কিন্তু নিজের শিকড় ভোলা ঠিক নয়।


অধ্যায় ৫ : তুলসীর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

৫.১ আয়ুর্বেদে তুলসীকে “ঘরোয়া হাসপাতাল” বলা হয়

তুলসীতে প্রায় ২০০টিরও বেশি ঔষধি রাসায়নিক আছে—

  • উজেনল
  • কারভিওল
  • লিনালুল
  • β–caryophyllene
  • অ্যাপিজেনিন
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
  • ভিটামিন K
  • অ্যান্টিবায়োটিক গুণ

৫.২ তুলসীর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
  • শ্বাসযন্ত্র সুস্থ রাখে
  • ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
  • হজম শক্তি বৃদ্ধি
  • মানসিক চাপ কমানো
  • ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ
  • হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা
  • বায়ুদূষণ কমানোর বিশেষ ক্ষমতা

অধ্যায় ৬ : তুলসীর ধর্মীয়-দর্শনগত তাৎপর্য

৬.১ তুলসী ও বিষ্ণুভক্তি

বলা হয়—
“তুলসী ছাড়া বিষ্ণু পূজা অসম্পূর্ণ।”

৬.২ তুলসী বিবাহ

কার্তিক মাসে দেব-দেবীর বিয়ের যে উৎসব হয়, তার শীর্ষে থাকে—
তুলসী বিবাহ, যা ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সামাজিক-ধর্মীয় রীতি।

এটি প্রমাণ করে—
ভারতে নারীর পূজা ছিল হাজার বছরের প্রথা।


অধ্যায় ৭ : ভারত কেন বলছে— “২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস”

কারণ ১ : বিদেশি উৎসবের আধিপত্য থেকে মুক্তি

ভারতের শহরগুলোতে ২৫ ডিসেম্বর মানেই—

  • লাল টুপি
  • সান্তা
  • কেক
  • পার্টি
  • বিদেশি পোশাক
  • শপিংমল সংস্কৃতি

এগুলো ভারতীয় নয়।
তাই নিজের ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন।

কারণ ২ : পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন

২৫ ডিসেম্বর তুলসী লাগানো মানে—

  • প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা
  • বাস্তুসামঞ্জস্য
  • বায়ুদূষণ রোধ
  • ঔষধি গাছ সংরক্ষণ

কারণ ৩ : ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় প্রকাশ

যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়—
সে জাতি টিকে থাকে না।

কারণ ৪ : তুলসীর প্রকৃত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা

নতুন প্রজন্ম বিদেশি উৎসব সম্পর্কে জানে—
কিন্তু তুলসী সম্পর্কে জানে না।
তাই এই দিন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।


অধ্যায় ৮ : ২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস পালন করার পদ্ধতি

  1. ঘরের উঠোন বা বারান্দায় তুলসী রোপণ
  2. প্রদীপ জ্বালানো
  3. গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে তুলসী পূজা
  4. ধূপ-দীপ-ফুল
  5. তুলসীর প্রণাম ও সংকল্প
  6. তুলসীপত্র মন্দির বা গৃহদেবতার কাছে নিবেদন
  7. পরিবেশ রক্ষার শপথ
  8. পরিবারসহ জ্ঞানচর্চা—তুলসীর ইতিহাস আলোচনা

অধ্যায় ৯ : তুলসী — ভারতীয় সভ্যতার আত্মা

তুলসী আমাদের—

  • ঘরের সুরক্ষা
  • মন-শরীরের আরোগ্য
  • পরিবেশের পরিচর্যা
  • দেবতার প্রতি ভক্তি
  • নারীত্বের সম্মান
  • প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা

সবকিছুর প্রতীক।

যেখানে তুলসী—
সেখানে সনাতন।
সেখানে ভারতীয়ত্ব।


উপসংহার

২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস শুধু একটি উৎসব নয়—
এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ,
মাটির প্রতি ভালবাসা,
ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব,
আর প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।

ক্রিসমাস হয়তো পাশ্চাত্যের নিজস্ব ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব—
তবে
সনাতন সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য এর চেয়ে অসীম পুরোনো, বৈচিত্র্যময় ও গভীর।

আমাদের শিকড় হলো—
বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, আয়ুর্বেদ, যোগ, আর তুলসী

তাই ২৫ ডিসেম্বর—
তুলসীর তলায় প্রদীপ জ্বালানো মানে
নিজেকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনা।

 

Share This
Categories
অনুগল্প

গল্প : ছবিওয়ালা প্রেম।

ঋচি ফটোগ্রাফার। ক্যামেরা হলো তার প্রথম প্রেম।
একদিন নদীর ধারে ছবি তুলতে গিয়ে দেখল—একজন ছেলে দাঁড়িয়ে স্কেচ আঁকছে। নাম—অর্পণ।

ঋচি বলল—“তুমি আঁকো, আমি ছবি তুলি… দু’জনের কাছেই পৃথিবী ফ্রেমবন্দী।”

অর্পণ হেসে বলল—
“সবচেয়ে সুন্দর ফ্রেমটা আজ পেলাম—তুমি।”

দু’জনই হাসল।
ধীরে ধীরে দেখা বাড়ল।
একদিন অর্পণ তার স্কেচবুক খুলে দেখাল—
সেখানে ঋচির বিভিন্ন ভঙ্গির বহু স্কেচ—

“তুমি না জানলেও, আমি অনেকদিন ধরে তোমাকেই আঁকছি।”

ঋচির গলা কাঁপল—
“আমি তো তোমাকে ক্যামেরায় ধরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি তো আমাকে আগে থেকেই ধরে রেখেছ।”

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দু’জনের হাত এক হলো—
ছবি আর স্কেচ এক হয়ে গলধঃকরণ হলো তাদের ভালোবাসার গল্পে।

Share This
Categories
অনুগল্প

গল্প : চশমাওয়ালা ছেলে।

ইরা সবসময়ই শান্ত, বইপড়া আর স্বপ্নময় মেয়ে।
ক্লাসে সবসময়ই প্রথম বেঞ্চে বসত।
একদিন নতুন ছাত্র আসে—সামান্য অগোছালো, কিন্তু মিষ্টি—নাম তন্ময়।
চশমা পরে, চুল এলোমেলো, আর সবসময় গিটার সঙ্গে নিয়ে আসে।

তন্ময় প্রথম দিনই বলল—
“আমি পড়ায় তেমন ভালো না, কিন্তু গান খুব ভালোবাসি। আমায় একটু নোটস দিয়ে দেবে?”

ইরা অবাক—এভাবে কেউ কখনো তার কাছে আসেনি।
ইরা নোটস দিল, তন্ময় গান শুনাল।
এভাবেই একদিন দেখা হল, আর দেখা থেকেই শুরু হল অনুভূতি।

একদিন বৃষ্টি। ক্লাস শেষে ইরা ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরছে। তন্ময় ছাতা নিয়ে এসে বলল—
“তোমার সাথে হাঁটলে বৃষ্টি এত খারাপ লাগে না।”

ইরা আস্তে বলল—
“তুমি কি জানো? তোমাকে প্রথম দেখেই আমার ভালো লেগেছিল।”

তন্ময় মৃদু হেসে বলল—
“আমি তো প্রথম দিনই বুঝেছিলাম—আমার গান যদি কেউ মন থেকে শুনে থাকে, সেটা তুমি।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : দোতলা বাস আর প্রথম প্রেম।

কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দোতলা বাস ধরত রিয়া।
একদিন উপরের সিটে বসে দেখল—একটা ছেলে তাকে দেখে হাসছে। নাম—সমর।

ধীরে ধীরে প্রতিদিন একই বাসে দেখা হতে হতে তারা কথা বলতে শুরু করল।
একদিন বাস খুব ভিড়। সামান্য ধাক্কায় রিয়ার হাত থেকে বই পড়ে গেল।
সমর ঝুঁকে বই তুলে দিয়ে বলল—“তোমার বই, কিন্তু কাহিনীটা আমার মতো মনে হচ্ছে—তুমিও আমাকে পছন্দ করো, তাই না?”

রিয়া লজ্জায় বলল—
“তুমি সবকিছু এত সহজে কিভাবে বলো?”

সমর মুচকি হেসে বলল—
“সত্যি কথা বলতে সাহস লাগে, কিন্তু চেষ্টা করলে কঠিন না।”

সেদিন থেকে বাসের সিটটাই হয়ে উঠল তাদের ছোট্ট পৃথিবী।
নগরীর শব্দ, মানুষের ভিড়—সবকিছু ম্লান হয়ে দুইজনের হাসি আর কথা।
একদিন সমর বলল—“বাসের ভিড়ের চেয়ে তোমাকে হারানোর ভয়টাই বড়।”

রিয়া হাসল—“তাহলে হারিয়ো না আমাকে।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : আধখানা গল্প।

লেখক অভিজিৎ বছরের পর বছর ধরে নিজের উপন্যাস লিখছে—কিন্তু শেষ অধ্যায়টা লিখতেই পারছে না।
কারণ? গল্পে যে মেয়েটি আছে—মীরা—তার বাস্তব রূপকে সে হারিয়েছে পাঁচ বছর আগে।

এক সন্ধ্যায় বইমেলায় গিয়ে অভিজিৎ চমকে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীরা—হুবহু একই।
মীরা বলল—“তোমার লেখা পড়েছি। সেখানে আমি কেন হারিয়ে যাই?”

অভিজিৎ বলল—
“কারণ বাস্তবে তুমিই হারিয়ে গিয়েছিলে… কারণ না জানিয়েই।”

মীরা চোখ নামিয়ে বলল—
“পরিস্থিতি ছিল… তুমি বুঝতে না।”

দু’জনই চুপ। বইমেলার ভিড়, আলো এবং গন্ধ যেন দূর হয়ে গেল।

মীরা বলল—
“এখন যদি বলি—আবার শুরু করতে চাই… তুমি রাখবে?”

অভিজিৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলল—
“আমার গল্প তো আধখানা হয়ে বাকি আছে। শেষটা লিখব কী করে? যা হারিয়েছিলাম তা যদি ফিরেই আসে… তাহলে হয়তো শেষটা লিখতে পারব।”

মীরা ধীরে অনিকের হাত ধরল—
“শেষটা তবে আমাদের দু’জনের লেখা হোক।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : ভুল নামের নোটবুক।

অনিকের অফিসে নতুন ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিল তির্থা। প্রথম দিনেই সে ভুল করে অনিকের ডেস্কে নিজের নোটবুক রেখে চলে যায়। নোটবুকের ওপরে বড় করে লেখা—“তির্থার ডায়েরি – কেউ খুলবে না।”
অনিক প্রথমে ফেরত দিতে চাইছিল, কিন্তু কৌতূহলে একটু উঁকি মারতেই দেখল প্রথম পাতায় লেখা—

“নিজের মনের কথা কারও কাছে বলতে পারি না…
তাই ডায়েরির কাছে বলি।
যদি কখনো কেউ এই ডায়েরি পড়ে…
জেনে নিও—আমি খুব একাকী।”

এটা পড়ার পর থেকেই তির্থাকে আর সাধারণ ইন্টার্ন মনে হলো না তার কাছে।
পরের দিন নোটবুক ফেরত দিতে গিয়ে সে দেখল তির্থা একটু অগোছালো, একটু চঞ্চল, একটু মিষ্টি।

ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে কথা বাড়ল।
তির্থা ধীরে ধীরে নিজের মন খুলতে লাগল—তার একজন ছিল, যে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
অনিক মন দিয়ে শুনত, শুধু বলত—“সব হারানো মনে রেখে বসে থাকলে নতুন আলো তো আসবে না।”

একদিন লাঞ্চ ব্রেকে তির্থা বলল—
“তুমি জানো, তুমি প্রথম যে মানুষ—যার সাথে কথা বললে আমার ভয় লাগে না।”

অনিক হেসে বলল—“তাহলে ভয়হীন থাকার অনুশীলনটা আমার সঙ্গেই করে যাও।”

তির্থা চুপ করে অনিকের দিকে তাকালো। যেন বুঝে গেল—একাকীত্ব থেকে বের হওয়ার পথ হয়তো এ মানুষটাই।

মাসখানেক পরে, অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে তির্থা বলল—
“অনিক, তুমি যদি সত্যি মনে করো… আমরা একসঙ্গে হাঁটতে পারি… তাহলে আমি রাজি।”

অনিক বলল—
“আমি তো প্রথম দিনই নোটবুক খুলেই বুঝেছিলাম—আমি তোমাকে সামলাবো।”

Share This