Categories
প্রবন্ধ

মূল্যবান মনুষ্য জীবনে দেবীপক্ষ ও দুর্গাপূজা : স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)।

ॐ সর্বমঙ্গল- মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ -সাধিকে।
শরণ‍্যে ত্র‍্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে।।

আমাদের সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে বাংলা ৫-ই আশ্বিন সোমবার -১৪৩২ বঙ্গাব্দ ইং- 22.09.2025. প্রতিপদ তিথি ও দেবীপক্ষের শুভ সূচনা, ও জগৎ জননী শ্রীশ্রীদূর্গা পূজার বোধন। মহালয়ার পরের দিন দেবীপক্ষ শুরু হয়, যা আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথি দিয়ে শুরু হয়ে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে। মহালয়ার অমাবস্যা পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবীপক্ষের সূচনা করে, যা দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সময়কাল। আমাদের সত্য সনাতন ধর্মে ১২ মাসে ২৪টি পক্ষ রয়েছে, তার মধ্যে ২টি পক্ষ বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ। প্রথমটি পিতৃপক্ষ ও দ্বিতীয়টি দেবীপক্ষ। অর্থাৎ শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা পর্যন্ত চলা পনেরো দিনব্যাপী সময়কাল হল দেবীপক্ষ। বছরভর যার জন্য অপেক্ষা করে থাকে বাঙালি। কারণ, এই পক্ষে পূজিতা হন দেবী দুর্গা। ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবিকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য, আসল দূর্গা পূজা হলো বসন্তে, সেটাকে বাসন্তি পূজা বলা হয় । শ্রীরামচন্দ্র অকালে অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে দেবির *অকালবোধন* বলা হয়।

মহালয়া অমাবস্যায় পিতৃপূজা সেরে পরের পক্ষে দেবীপূজায় প্রবৃত্ত হতে হয়। তাই দেবীপূজার পক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষ বা মাতৃপক্ষ, মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের শুরুর পূর্ব দিন, পিতৃপক্ষে আত্নসংযম করে দেবী পক্ষে শক্তি সাধনায় প্রবেশ করতে হয়। দেবী শক্তির আদিশক্তি, তিনি সর্বভূতে বিরাজিত। তিনি মঙ্গল দায়িনী করুনাময়ী। সাধক সাধনা করে দেবীর বর লাভের জন্য, দেবীর মহান আলয়ে প্রবেশ করার সুযোগ করেন বলেই এ দিনটিকে বলা হয় মহালয়া।

তাই মহালয়ার পর দেবীপক্ষের বা শুক্লপক্ষের প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শারদীয়া দুর্গা পুজার সূচনা বোধন করা হয়। প্রসঙ্গতঃ যে শ্রাবণ থেকে পৌষ ছয় মাস দক্ষিণায়ন, দক্ষিণায়ন দেবতাদের ঘুমের কাল। তাই বোধন অবশ্যই প্রয়োজন, আরও বলা দরকার যে মহালয়ার পর প্রতিপদে যে বোধন হয় সে সময়ও সংকল্প করে দুর্গা পূজা করা যায়। একে বলে *প্রতিপদ কল্পরম্ভা,* তবে সাধারণত আমরা ষষ্ঠি থেকে পূজার প্রধান কার্যক্রম শুরু হতে দেখি যাকে বলা হয় *ষষ্ঠাদিকল্পরম্ভা।* কিছু প্রাচীন বনেদী বাড়ি এবং কিছু মঠ মন্দিরে *প্রতিপদ কল্পরম্ভা* থেকে পুজো হয়। যদিও প্রতিপদ কল্পরম্ভা থেকে শুরু পুজোতেও মূল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ষষ্ঠি থেকেই এবং সপ্তমী থেকে বিগ্রহতে। প্রতিপদ থেকে শুধু ঘটে পূজো ও চণ্ডী পাঠ চলে।

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “দুর্গাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। শ্রীশ্রী চণ্ডী এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে মেধস মুনির আশ্রমেই পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপুজো আয়োজিত হয়েছিল। এটি পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমার কাঁকসার গড় জঙ্গলে অবস্থিত। দুর্গাপুর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে গড় জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে ২-৩ কিলোমিটার গেলেই পাওয়া যাবে মেধসাশ্রম। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের নিকটবর্তী গড় জঙ্গলে মেধসাশ্রমে ভূভারতের প্রথম দুর্গাপূজা হয়। এখানেই রাজা সুরথ বাংলা তথা মর্তে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। কাঁকসার গড় জঙ্গলের গভীর অরণ্যের মেধাশ্রম বা গড়চণ্ডী ধামে কোনও এক সময়ে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ‍্য পুজো শুরু করেন। বসন্তকালে সূচনা হয় পুজোর৷ বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক বা বসন্তকালীন দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। তারপর থেকেই বাংলা তথা ভূভারতে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়।

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত একটি সত্য সনাতন ধর্মে প্রধান ধর্মীয় উৎসব। বর্তমানে এটি সারা বিশ্বে পালিত হয়, তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ওড়িশা, বিহার, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ (পূর্বাঞ্চল) এবং বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এটি বাংলা বর্ষপঞ্জির আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব, যার মধ্যে শেষ পাঁচটি দিন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্বিনের নবরাত্রির পূজা শারদীয় পূজা এবং বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক বা বসন্তকালীন দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর (UNESCO) অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়। কলকাতা শহর এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবকে (UNESCO) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে মাদুর্গার আগমন আর গমন দশমীতে। এই দুই দিন সপ্তাহের কোন বারে পড়ছে, তার উপরই নির্ভর করে দেবী কিসে আসবেন বা কিসে যাবেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে “রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া, ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ, গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং নৌকায়াং বুধ বাসরে।।” শুরুতেই বলা হচ্ছে, ‘রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া’ অর্থাৎ, সপ্তমী যদি রবিবার বা সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন হবে গজে বা হাতিতে। একই ভাবে, দশমীও রবি বা সোমে পড়লে দুর্গার গমন বা ফেরা হবে গজে। এরপর বলা হচ্ছে, ‘ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ’ অর্থাৎ শনি বা মঙ্গলবার সপ্তমী পড়লে দেবীর আগমন হবে ঘোটকে বা ঘোড়ায়। দশমীও শনি বা মঙ্গলে পড়লে ফিরবেন ঘোড়ায়। তারপর রয়েছে, ‘গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং’ অর্থাৎ বৃহস্পতি বা শুক্রবারে সপ্তমী পড়লে দেবী দোলায় আসবেন আর দশমী পড়লে দেবী দোলায় ফিরবেন। সব শেষে বলা হচ্ছে, ‘নৌকায়াং বুধবাসরে’ অর্থাৎ, বুধবার সপ্তমী পড়লে দেবীর নৌকায় আগমন এবং দশমী পড়লে নৌকায় গমন। এই হল সপ্তাহের সাত দিনের নিয়ম।

দুর্গাপুজোর মহাঅষ্টমীর শেষদন্ড ও মহানবমীর প্রথমদণ্ডে অনুষ্ঠিত *সন্ধিপূজা* খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণ পুরাণে পাওয়া যায়। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮মিনিট সময়ের যে মহাসন্ধিক্ষণ সেই সময়ে সন্ধিপূজা করা হয়। বলা হয়ে থাকে ঠিক এই সময়েই দেবী দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরের নিধন করেছিলেন। এই ঘটনাটি মনে রাখার জন্যই প্রতি বছর অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে এই সন্ধিপূজা করা হয়। দুর্গা পুজোর এই মহাসন্ধিক্ষনে মহাশক্তিশালী “চামুন্ডা কালিকা” দেবীরই আরাধনা করা হয়। সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নিয়মটি চিরাচরিত, এর কোনো অন্যথা করা হয় না। বলা হয় পদ্ম হল ভক্তির প্রতীক এবং প্রদীপ জ্বালানো জ্ঞানের প্রতীক। আর এই যে চণ্ড এবং মুণ্ড হল যথাক্রমে মানুষের মনের প্রবৃত্তি বা নিবৃত্তি এর প্রতীক। প্রবৃত্তি অর্থে ভোগ এবং নিবৃত্তি অর্থে ত্যাগ। মোক্ষলাভের জন্য এই দুইকেই বধ করার মাধ্যমে দেবী চণ্ডীর পূজা করা হয় এবং তা করা হয় এই সন্ধিপূজায়।

দুর্গাপুজোর যেটি বহুল প্রচলিত রূপ- তা হল ষষ্ঠাদি কল্প। এই নিয়ম অনুযায়ী মহানবমীর পুজা অন্তিম পুজা। সংকল্পে ‘মহানবমী যাবৎ’ এর সংকল্প গ্রহণ করা হয়। চণ্ডিপাঠ, দুর্গানাম জপ মহানবমী অবধি অনুষ্ঠানের সংকল্প নেওয়া হয় বোধনের দিন। সেই মতো হোমের মাধ্যমে মহানবমীতে দেবীর সংকল্পিত মহাপুজার ইতি ঘটে। এরপর দশমী পুজা শুধুমাত্র দেবী বিদায়ের আচরিত সংক্ষিপ্ত পুজা। মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত। তবে বিজয়া দশমীর দিন চারিদিকে বাজে বিষাদের সুর। কারণ উমার ফিরে যাওয়ার পালা। বিজয়া দশমী দুর্গাপুজোর উৎসবের শেষ দিন। প্রতিমাগুলি বরণ করে মহিলারা ‘সিঁদুর খেলা’-এ মেতে ওঠেন। এরপর জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়ার হয় প্রতিমাগুলি। ঘট বিসর্জনের অর্থ, পুজো সমাপ্তি। বিসর্জনের সময় লম্বা শোভাযাত্রা বের করে। যেখানে নাচে-গানে, হাসি-কান্না মুখে সকলে বিদায় জানান উমাকে। এদিন বরণ, সিঁদুর খেলা, বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর ও বিজয়া উৎসবের সমাপ্তি হয়।

জগৎ গুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের ও জগৎ জননী শ্রী শ্রী দূর্গা মাতার শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ আপনাদের সকলের শিরে বর্ষিত হোক…পিতা-মাতার আশির্বাদ সকলের শিরে বর্ষিত হোক ….! এই প্রার্থনা করি……
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ।
স্বামী আত্মভোলানন্দ *পরিব্রাজক*

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

রাজস্থানের জয়সলমের নিয়ে একটি সুন্দর ও তথ্যবহুল ভ্রমণ কাহিনী।

🏜️ রাজস্থানের জয়সলমের – মরুর সোনার শহর

রাজস্থানের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত জয়সলমের (Jaisalmer) ভারতীয় মরুভূমির এক অদ্বিতীয় রত্ন। সোনালি বালির পাহাড়, রজত-সুন্দর স্থাপত্য, রাজকীয় দুর্গ এবং মরুভূমির বিস্ময়কর পরিবেশের জন্য জয়সলমেরকে বলা হয় “গোল্ডেন সিটি”।


🏯 ইতিহাস ও পরিচিতি

জয়সলমের শহর প্রতিষ্ঠা করেন রাও জয়সল ১ম 1156 সালে। এটি প্রাচীন সময়ে কারওয়ান সারাই ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এটি বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিলনস্থল ছিল। জয়সলমেরের স্থাপত্য ও দুর্গ আজও তার ঐতিহাসিক গৌরবকে প্রতিফলিত করে।


🌟 প্রধান দর্শনীয় স্থান

1️⃣ জয়সলমের ফোর্ট (Sonar Qila / Golden Fort)

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো এই দুর্গ সোনালি বেলেপাথরের তৈরি। এটি এক জীবন্ত শহর, কারণ এখনও এখানে বহু মানুষ বসবাস করেন।

  • পাটওয়ারী প্যালেস এবং মেহরানগড়ের মতো ছোট প্রাসাদ দুর্গের ভেতরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
  • সূর্যাস্তের সময় দুর্গের সোনালি আভা সত্যিই চোখ জুড়ে রাখে।

2️⃣ পাটওয়ানি হাভেলিস (Patwon Ki Haveli)

পাঁচটি সংযুক্ত হাভেলি যা প্রাচীন ধনীদের গৌরবের নিদর্শন। সূক্ষ্ম খোদাই, দৃষ্টিনন্দন বারান্দা ও বড় উঠোন পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

3️⃣ সালিম সিং হাভেলি (Salim Singh Haveli)

অদ্বিতীয় স্থাপত্য এবং বাঁকা চিমনির জন্য বিখ্যাত।

4️⃣ সমধিয়া হ্রদ ও বালুকার সৈকত (Sam Sand Dunes)

মরুভূমির বেলাভূমি যেখানে ঘোড়া বা উটের পিঠে সূর্যাস্তের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা উপভোগ করা যায়।

5️⃣ ফিসার ঝরণা ও ট্র্যাডিশনাল বাজার

স্থানীয় হস্তশিল্প, জুয়েলারি, রঙিন কাপড় এবং মাটির সামগ্রী কেনার জন্য সমৃদ্ধ বাজার।


🐪 মরুভূমির অভিজ্ঞতা

জয়সলমের ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হল মরুভূমির সাহারা অভিযান। উটের পিঠে ভ্রমণ, মরুভূমিতে স্যান্ড বর্ডিং এবং রাতের সময় ক্যাম্প ফায়ার ও রাজস্থানির লোকসংগীত এই অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তোলে।


🍲 রাজস্থানি খাবার

জয়সলমেরের স্বাদ-ভ্রমণও সমান রোমাঞ্চকর।

  • দাল-বাটি-চুরমা
  • গট্টে-কি-সবজি
  • কচৌরি, ঘেভর ও মালপুয়া
    এখানকার রাস্তার ধারের ছোট ছোট রেস্তোরাঁ ভ্রমণকারীদের মন জয় করে।

🛍️ কেনাকাটা

  • স্থানীয় হস্তশিল্প, লেদার ব্যাগ, নকশা করা কাপড়, পট্রি (Pottery) ও রাজস্থানি পাগড়ি কেনার জন্য বিখ্যাত।
  • সোনার কাসবাহ বাজার ও বাজারে হ্যান্ডিক্রাফট শপ পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়।

🚌 কীভাবে পৌঁছাবেন

  • ✈️ বিমানপথে: জয়সলমের বিমানবন্দর থেকে দিল্লি, মুম্বাই ও জয়পুরের সঙ্গে সংযোগ।
  • 🚉 রেলপথে: জয়সলমের জংশন ভারতের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে যুক্ত।
  • 🚗 সড়কপথে: জয়পুর, পুণ্ডুয়া ও বীকানের থেকে সহজ ড্রাইভে পৌঁছানো যায়।

🌄 উপসংহার

জয়সলমের শুধু একটি শহর নয়, এটি মরুভূমির স্বর্ণালী রূপকথা। সোনালি বেলেপাথরের দুর্গ, বালুকার বেলাভূমি, রাজকীয় হাভেলি, রাজস্থানি খাবার ও সংস্কৃতি মিলিয়ে এই শহর ভ্রমণকারীদের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে। যারা মরুর জাদু এবং রাজপুত ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য জয়সলমের এক অপরিহার্য গন্তব্য।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

রাজস্থানের আম্বের ফোর্ট নিয়ে একটি সুন্দর ও তথ্যবহুল ভ্রমণ কাহিনী।

🏰 রাজস্থানের আম্বের ফোর্ট – রাজকীয় ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের জয়পুর শহরের প্রায় ১১ কিমি দূরে অবস্থিত আম্বের ফোর্ট (Amber Fort) রাজপুত স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। পাহাড়ের গা ঘেঁষে তৈরি এই দুর্গের সৌন্দর্য, ইতিহাস ও কারুকাজ প্রত্যেক ভ্রমণপ্রেমীর মনে এক স্থায়ী ছাপ ফেলে। জয়পুর ভ্রমণে যারা যান, তাদের জন্য আম্বের ফোর্ট এক অবশ্যই দেখার মতো স্থান।


🏯 ইতিহাসের পাতায় আম্বের ফোর্ট

আম্বের ফোর্টের ইতিহাস শুরু হয় ১৬শ শতকে। রাজপুত রাজা মান সিং প্রথম (Raja Man Singh I) ১৫৯২ সালে এই দুর্গ নির্মাণ শুরু করেন এবং পরবর্তী শাসকরা এর সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। এই দুর্গ ছিল কচ্ছওয়া রাজপুত রাজাদের প্রধান আবাসস্থল এবং এখান থেকেই জয়পুরের রাজারা শাসন করতেন।


🎨 স্থাপত্যের বৈভব

আম্বের ফোর্টের স্থাপত্যে রাজপুত ও মুঘল স্টাইলের মিশ্রণ দেখা যায়। এখানে রয়েছে সাদা মার্বেল, লাল বেলেপাথর এবং জটিল জালি কাজের এক অপূর্ব সমাহার।

🔸 প্রধান অংশগুলো

  • দিল-ই-আরাম বাগান: দুর্গের প্রবেশমুখেই রয়েছে এই সুন্দর উদ্যান।
  • দেওয়ান-ই-আম: যেখানে রাজা সাধারণ প্রজাদের অভিযোগ শুনতেন।
  • শীশ মহল (Mirror Palace): দুর্গের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ। দেয়াল ও ছাদে ছোট ছোট আয়না বসানো, যার ফলে একটি ছোট আলোও হাজার গুণ প্রতিফলিত হয়।
  • গণেশ পোল: সূক্ষ্ম চিত্রকলায় সজ্জিত প্রবেশদ্বার, যা দুর্গের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
  • সুখ নিভাস: যেখানে শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য পানির ধারা ব্যবহার করা হতো।

🐘 হাতি চড়ে দুর্গে ওঠা

আম্বের ফোর্টে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হল হাতি চড়ে দুর্গে ওঠা। যদিও এখন প্রাণী কল্যাণের কারণে অনেকেই এই রাইড এড়িয়ে যান, তবুও এটি একসময় রাজকীয় যাতায়াতের অংশ ছিল।


🌅 লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো

সন্ধ্যাবেলা আম্বের ফোর্টে অনুষ্ঠিত লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। রাজপুত বীরদের কাহিনি, যুদ্ধের গল্প এবং দুর্গের নির্মাণ ইতিহাস আলো ও শব্দের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়।


🛍️ আশেপাশের বাজার

দুর্গের বাইরে ছোট ছোট দোকানে হস্তশিল্প, রাজস্থানি গয়না, কাঁচের কাজ, ব্লক প্রিন্টেড কাপড় ও রাজস্থানি পাগড়ি পাওয়া যায়।


🍲 স্থানীয় খাবারের স্বাদ

আম্বের ভ্রমণে এসে রাজস্থানি খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। দাল-বাটি-চুরমা, গট্টে কি সবজি, মির্চি বড়া, লাল মাংস এখানে বিশেষ জনপ্রিয়।


🚌 কীভাবে পৌঁছাবেন

  • ✈️ বিমান পথে: জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি বা গাড়িতে প্রায় ৪৫ মিনিটে পৌঁছানো যায়।
  • 🚉 রেল পথে: জয়পুর রেলস্টেশন থেকে সহজেই ট্যাক্সি বা অটোতে যাওয়া যায়।
  • 🚗 সড়ক পথে: NH48 ধরে দিল্লি থেকে প্রায় ৫ ঘণ্টার ড্রাইভ।

🌄 উপসংহার

আম্বের ফোর্ট শুধু একটি দুর্গ নয়, এটি এক রাজকীয় ইতিহাসের জ্যান্ত সাক্ষী। এর প্রতিটি করিডর, প্রতিটি আঙিনা যেন অতীতের বীরত্বগাথা ও রাজকীয় জাঁকজমকের গল্প বলে। স্থাপত্যের সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক কাহিনি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে আম্বের ফোর্ট ভ্রমণ প্রতিটি পর্যটকের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

বিদেশে পুজোর আনন্দ।

ভূমিকা:-

দুর্গা পুজো বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। একসময় কেবল কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, আসাম কিংবা বাংলাদেশের বাঙালিরাই এই উৎসব ঘিরে মাতোয়ারা থাকত। কিন্তু আজ প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে। ফলে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো, দুবাই, সিডনি, টোকিও কিংবা সিঙ্গাপুর—বিশ্বের নানা প্রান্তে আজ দুর্গা পুজো পালিত হয় মহাধুমধামে। বিদেশে এই পুজো শুধুই ধর্মীয় আচার নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির পরিচয়, মিলনমেলা ও শিকড়ের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষার এক অনন্য মাধ্যম।


বিদেশে দুর্গা পুজোর সূচনা

প্রবাসে দুর্গা পুজোর ইতিহাস প্রায় শতবর্ষ পুরনো।

  • প্রথম উদ্যোগ: ১৯০৯ সালে লন্ডনে প্রথম দুর্গা পুজোর আয়োজন হয় কিছু ভারতীয় ছাত্রছাত্রী ও ব্যবসায়ীর উদ্যোগে।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে: ভারত থেকে প্রচুর মানুষ পড়াশোনা ও চাকরির জন্য বিদেশে যান, তখন থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় পুজোর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
  • বর্তমান সময়ে: আজ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ২০০টির বেশি দুর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও বহু বড় ক্লাব পুজো আয়োজন করে।

বিদেশে পুজোর প্রস্তুতি

বিদেশে পুজোর আয়োজন করা একেবারে সহজ নয়।

  • প্রতিমা: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা অর্ডার দিয়ে পাঠানো হয়, কখনো কখনো স্থানীয় শিল্পীরাও মাটির প্রতিমা বানান।
  • স্থান নির্বাচন: কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল অডিটোরিয়াম, এমনকি বড় কনভেনশন হল ভাড়া করা হয়।
  • আর্থিক দিক: সব খরচ চলে সদস্যদের সাবস্ক্রিপশন, স্পনসরশিপ এবং ডোনেশন দিয়ে।
  • খাবার ও ভোগ: ভারতীয় রেস্টুরেন্ট থেকে খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজা, চাটনি ইত্যাদি প্রস্তুত করা হয়, যাতে ভোগের স্বাদ বাঙালির মতোই থাকে।

বিদেশে দুর্গা পুজোর সামাজিক গুরুত্ব

প্রবাসে এই পুজো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির বার্ষিক উৎসব।

  • সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: রবীন্দ্রসঙ্গীত, নাটক, ধুনুচি নাচ, ফ্যাশন শো, এমনকি কুইজ প্রতিযোগিতাও হয়।
  • নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করানো: যারা বিদেশে জন্মেছে, তাদের জন্য এটি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দুর্দান্ত সুযোগ।
  • মিলনমেলা: পড়াশোনা বা চাকরির চাপে একে অপরের সঙ্গে দেখা না হলেও পুজোর সময় সবাই মিলে একত্র হন।

কিছু উল্লেখযোগ্য বিদেশি দুর্গা পুজো

  • নিউ ইয়র্কের সার্বজনীন দুর্গা পুজো: যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পুজো, যেখানে হাজার হাজার বাঙালি একত্রিত হন।
  • লন্ডনের ক্যামডেন টাউন পুজো: ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় দুর্গা পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম।
  • টরন্টোর বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি পুজো: কানাডায় অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান।
  • সিঙ্গাপুর ও কুয়ালালামপুরের পুজো: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জমজমাট পুজো, যেখানে ভারতীয় ও স্থানীয় জনগণ অংশ নেন।
  • দুবাই ও আবুধাবির পুজো: মধ্যপ্রাচ্যের বাঙালিরা সীমিত পরিসরে হলেও যথাযথভাবে উৎসব পালন করেন।

বিদেশে পুজোর চ্যালেঞ্জ

  • লজিস্টিক সমস্যা: প্রতিমা আনা, পুজোর সামগ্রী জোগাড় করা, বড় হল বুকিং—সবই সময়সাপেক্ষ।
  • ভিসা ও ছুটি: পুজোর তারিখ অনুযায়ী অনেককে ছুটি নিতে হয়, যা সবসময় সহজ নয়।
  • সংস্কৃতির পার্থক্য: স্থানীয় আইন মেনে শব্দদূষণ, আগুন বা ধূপ-ধুনো ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

বিদেশে পুজোর আনন্দ

সব কষ্ট সত্ত্বেও বিদেশে দুর্গা পুজোর আবেগ আলাদা।

  • প্যান্ডেল ছোট হলেও উৎসাহ বিশাল।
  • সবার অংশগ্রহণ: রান্না থেকে শুরু করে সজ্জা, পূজা, গান—সব কাজ মিলেমিশে করা হয়।
  • নস্টালজিয়া: অনেকে কলকাতার পুজো মিস করলেও এখানে নতুন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, মনে হয় যেন ছোট্ট কলকাতা তৈরি হয়েছে বিদেশের মাটিতে।

উপসংহার

বিদেশে দুর্গা পুজো আজ কেবল উৎসব নয়, এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক মহা প্রচেষ্টা। বাঙালি যেখানেই থাকুক না কেন, মহালয়ার ভোর থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলা পর্যন্ত তার হৃদয়ে দেবীর আবাহন একইভাবে বেজে ওঠে। বিদেশে পুজো বাঙালিকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে, নতুন প্রজন্মকে তার পরিচয়ের গর্ব শেখায় এবং বিশ্বমঞ্চে বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয় তুলে ধরে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

উত্তরাখণ্ডের রহস্যময় ভ্রমণ কাহিনী।

এই উত্তরাখণ্ডের ভ্রমণ স্থানগুলোকে একত্র করে একটি সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী তৈরি করছি। এখানে আপনি পাবেন আধ্যাত্মিকতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অ্যাডভেঞ্চারের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

সন্ধ্যা নামতে নামতেই অরুণ তাঁর ব্যাগে শেষ কয়েকটি জিনিস ঢুকিয়ে দিল। আজ তিনি শুরু করতে যাচ্ছিলেন উত্তরাখণ্ডের এক অনন্য ভ্রমণ, যা তাঁকে নিয়ে যাবে হিমালয়ের সৌন্দর্য, পবিত্র নদী, হিল স্টেশন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষিত স্থানগুলোতে।


১️⃣ হরিদ্বার – গঙ্গার তীরে প্রথম পদক্ষেপ

হরিদ্বার পৌঁছেই অরুণের চোখ পড়ল ঘাটে জ্বলতে থাকা দীপাবলি আলোতে। গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে সারা শহরের কীর্তন এবং আরতিগুলো মনকে শান্তি দিচ্ছিল। হার-কি-পৌরি থেকে পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি অনুভব করলেন আধ্যাত্মিকতার গভীরতা।


২️⃣ ঋষিকেশ – অ্যাডভেঞ্চার ও ধ্যানের মিলন

পরের দিন তিনি রওনা দিলেন ঋষিকেশের পথে। নদীর তীরে হোয়াইট ওয়াটার রাফটিং করলেন। এরপর লক্ষ্মণ ঝুলন্ত সেতু পার হয়ে যোগ আশ্রমে ধ্যান করলেন। নদীর ঝর্ণার শব্দ এবং পাহাড়ের শীতল বাতাস এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিচ্ছিল।


৩️⃣ কেদারনাথ – আধ্যাত্মিকতার উচ্চশিখরে

কেদারনাথের পবিত্র মন্দিরে পৌঁছালে অরুণ অনুভব করলেন নিঃশব্দ ভক্তির আবহ। বরফে ঢাকা পাহাড় এবং মন্দিরের ভিড়, সব মিলিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।


৪️⃣ বদ্রিনাথ – ভগবান বিষ্ণুর ধাম

কেদারনাথ থেকে এগিয়ে তিনি পৌঁছালেন বদ্রিনাথ। গঙ্গা এবং আলকানন্দা নদীর সংযোগস্থলে স্থাপিত এই মন্দিরে ভক্তদের প্রার্থনা এবং আরতি তাঁকে আলাদা এক আনন্দ দিল। পাহাড়ের শীতল বাতাস ও নদীর শব্দ ভ্রমণকে আরও স্মরণীয় করে তুলল।


৫️⃣ গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী – হিমালয়ের উত্স

ভ্রমণ আরও এগোতেই অরুণ পৌঁছালেন গঙ্গোত্রী। হিমালয়ের কোলাহলময় নদীর উত্সস্থান তাকে প্রকৃতির রহস্যময় সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচয় করাল। এরপর যমুনোত্রী যাওয়া এক আলাদা অনুভূতি দিল – বরফে ঢাকা পাহাড় এবং শান্ত নদীর মিলন সত্যিই হৃদয়স্পর্শী।


৬️⃣ নৈনিতাল ও মুসৌরি – হিল স্টেশন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

নৈনিতালে নয়নাভিরাম হ্রদ এবং পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করল। এরপর মুসৌরির ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ও ট্রম লাইন দিয়ে পাহাড়ের পথ ঘুরে তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলেন।


৭️⃣ আলমোড়া – ঐতিহ্য ও সবুজের মিলন

আলমোড়ায় পৌঁছালে তিনি দেখলেন পাহাড়ের উপত্যকা, সবুজ বন এবং ঐতিহ্যবাহী পাথরের বাড়ি। ছোট ছোট চায়ের দোকান এবং স্থানীয় হস্তশিল্প তাকে স্থানীয় জীবনধারার সঙ্গে পরিচয় করাল।


৮️⃣ জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক – বন্যপ্রাণীর অভিজ্ঞতা

শেষদিনে অরুণ গেলেন জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে। বাঘ, হরিণ, হাতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সাফারি চলাকালীন পাহাড়ের রোদের ছায়া এবং সবুজ বন তাকে প্রকৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করল।


🌄 ভ্রমণের সমাপ্তি

ভ্রমণ শেষে অরুণ হোটেলের বারান্দায় বসে ভাবলেন – হরিদ্বারের আধ্যাত্মিকতা, ঋষিকেশের অ্যাডভেঞ্চার, কেদার-বদ্রিনাথের পবিত্রতা, হ্রদ ও হিল স্টেশন, বনভূমি সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ ছিল এক অসাধারণ জীবনদর্শন। প্রতিটি স্থান তার মনে ছাপ ফেলেছে, যা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে স্মৃতির মতো থাকবে।

Share This
Categories
রিভিউ

টলিউড তারকা দর্শনা বণিক পাপাকাতের পুজো প্রতিযোগিতার মুখ।

এই দুর্গাপুজোয়, শহরের উৎসবমুখর পরিবেশে পাপাকাত তাদের আকর্ষণীয় ট্যাগলাইন “ফুচকা খাও, ফুকেট যাও” সহ পুজো ফুচকা অফারটি উন্মোচন করেছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতা খাদ্যপ্রেমীদের তাদের প্রিয় ফুচকা উপভোগ করার এবং থাইল্যান্ডের ফুকেটের বিদেশী সমুদ্র সৈকতে একটি অবিস্মরণীয় ছুটি জেতার সুযোগ দেয়।

এই উৎসব উদযাপনটি গ্ল্যামারাস হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় টলিউড অভিনেত্রী দর্শনা বণিককে প্রতিযোগিতার দূত হিসেবে ঘোষণা করায়। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং স্টাইলিশ ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত দর্শনা এই অনন্য প্রচারণায় আকর্ষণ এনেছেন যা কলকাতার প্রিয় স্ট্রিট ফুডকে স্বপ্নের ছুটি কাটানোর সুযোগের সাথে মিলিয়ে দিয়েছে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মূল্যবান মনুষ্য জীবন ও প্রকৃত সাধু-সন্ন্যাসী : স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)।

আমাদের সুন্দর মূল্যবান মনুষ্য জীবনে, পরম সৌভাগ্যবশত আধ্যাত্মিক দেশ ভারতবর্ষে আমরা জন্মেছি। প্রাচীন কাল হতে এই পবিত্রভূমি, পূণ্যভূমি ভারতবর্ষে শত শত মহাপুরুষ সাধু-মহাত্মার আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের কঠোর তপস্যা ও সাধনার ফলে ভারতভূমি আজ সারা বিশ্বের দরবারে পুণ্যভূমি, পবিত্রভূমি, সাধনা ও তপস্যার কেন্দ্রবিন্দু। ভারতভূমি তার স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাই ভারত মাতার পদপ্রান্তে ঘুরে ঘুরে, ভারতমাতাকে দর্শন করতে করতে, সাধু-সন্ন্যাসী কি? একটু জানার চেষ্টা করা। যেমন:-

১) জটাজুট ধারণ করলেই সাধু হওয়া যায় না, মহাত্মা তৈলঙ্গস্বামীর জট ছিল না।
২) গলায় বা হাতে রুদ্রাক্ষ ধারণ করলেই সাধু হওয়া যায় না, রামকৃষ্ণদেবের গলায় বা হাতে রুদ্রাক্ষ ধারণ করা ছিল না।
৩) মঠ-মন্দির-মিশন থাকলেই সাধু হওয়া যায় না, বাবা বামদেবের কোন মঠ-মন্দির-মিশন ছিল না।
৪) গেরুয়া-লাল-কালো বস্ত্র পরলেই সাধু হওয়া যায় না, লোকনাথ বাবার পরনে লাল, গেরুয়া বা কালো বস্ত্র থাকতো না।
৫) সঙ্ঘ বা সংগঠন করলেই বা আশ্রমে যোগদান করলেই সাধু হওয়া যায় না। লাহিড়ী মহাশয়ের কোনও সঙ্ঘ বা সংগঠন ছিল না।
৬) বেনারসের কিনারাম বাবার গলায় ‘নাদি’ ছিল না, তবুও তিনি অঘোরী সাধকদের গুরু ছিলেন।

*সাধু হতে গেলে প্রকৃত অর্থে অন্তঃশৌচ ও বহিঃশৌচ করার দরকার হয়……মনটাকে সাধু করতে হয়।* বসনে-ভূষণে সাধু হয় না, বসনে-ভূষণে সাধু সাজা হয়।

*অখণ্ড ভারতবর্ষে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অনেক স্বনামধন্য পরিবার থেকে বহু ভারত মাতার সুসন্তান এই সন্ন্যাসী লাইনে এসেছিলেন। তারা অনেক সন্ন্যাসী সংস্থাকে, আশ্রমকে মহিমাময় করে তুলেছেন। অনেক গৌরবময় ধার্মিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, অনেক মঠ, আশ্রম, জনহিতকর প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। মঠ, আশ্রমকে, সংঘকে, সাধু সমাজকে জনমানসে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন।*

আবার খন্ডিত ভারতে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক তরতাজা যুবক যেমন স্বেচ্ছায় সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তেমনি অনেক পূর্ব-পাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) হতে পাকিস্তানি সেনাদের ভয়ে ভীত হয়ে আশ্রয় ও নিরাপত্তার স্বার্থে, অনেক আশ্রমে, সংঘে, মঠে, সংস্থায় আশ্রয় নিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন। তারা নিজের জীবন জীবিকার জন্য ভয়ে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন, ভক্তিতে নয়।

আবার লিখতে ও বলতে খুবই দুঃখ হয়, খারাপ লাগে। খুব দুঃখের বিষয় যে, আজকাল অনেক আশ্রমে, অনেক সংস্থায়, নুতন সাধু আশ্রমে প্রবেশের ন্যূনতম নিয়মকানুন না থাকাই, অনেক নিম্নমানের, নিম্ন রুচিসম্পন্ন লোক জীবন জীবিকার জন্য সন্ন্যাসী হয়ে যাচ্ছে। *(তারে কিটি ধা মেরে কেটে খা) তারা সন্ন্যাসী হওয়ার বদলে জীবন জীবিকার সন্ধানে এসেছে। তারা ভেকধারি, চিটিংবাজ, ধাপ্পাবাজ, সন্ন্যাসী তৈরি হচ্ছে।*

*আবার অনেক আশ্রমে আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল না থাকায়, সাধু-সন্ন্যাসীগণ আত্মহত্যা করছে। খুনের আসামি, জেলখাটা আসামি, ধর্ষণ কেসের আসামীতে পরিণত হচ্ছে। তারা আবার আশ্রমের অধ্যক্ষ, আশ্রমের পদ অধিকার করে বসে আছে।*

আবার অনেক বিধর্মী ভারতে এসে নিজের নাম-ধর্ম-পরিচয় গোপন করে সাধু সাজছে, ইনারাই বড় বড় সন্ন্যাসী, সাধু হয়ে যাচ্ছে। অনেক সংস্থার আশ্রমের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হচ্ছে। এইসব কারণের ফলে সাধু সমাজ, আশ্রমগুলি ও সত্য সনাতন ধর্মকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে। এই বিষয়ে সত্য সনাতন ধর্মের রক্ষকদের ও প্রকৃত সাধু সন্ন্যাসীদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আবার অনেক সুপ্রতিষ্ঠিত আশ্রমগুলিতে সুন্দর নিয়মমাফিক আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল ও ভাবধারা বিরাজমান। সেখানে প্রকৃত সাধু সন্ন্যাসী হবার মনোভাব নিয়ে আশ্রমে এসেছে কিনা তা যাচাই করার পরই সন্ন্যাস লাইনে প্রবেশ-অধিকার দেয়া হয়। সেখানে ভারত মাতার সুসন্তান ও রুচিবোধ সম্পন্ন, শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন যুবকদের প্রবেশ অধিকার দেওয়া হয়। তাই সেই আশ্রমগুলি সারা বাংলা তথা ভারতবর্ষ ও বিশ্বব্যাপী ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার গৌরবময় ধার্মিক পরিমন্ডল হয়ে উঠেছে।

পরিশেষে ভারত মাতার চরণে, সমস্ত প্রকৃত সাধু-মহাত্মাদের চরণে আমি ভক্তিপূর্ণ ভুমিষ্ঠ প্রণাম নিবেদন করি, ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করি। জগৎগুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজের শ্রীচরণে আমার অনন্ত কোটি প্রণাম নিবেদন করি।
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্।
স্বামী আত্মভোলানন্দ *পরিব্রাজক*
🙏🏻🙏🏻🙏🏻

*কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মানসিক আঘাত দেওয়ার জন্য এ লেখা নয়। এটি চরম সত্য, তাই অনেক দুঃখের সাথে তুলে ধরলাম।*

Share This
Categories
প্রবন্ধ

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল – শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, বরং স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক একতা প্রতিষ্ঠার প্রধান স্থপতি।

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, ভগৎ সিং – এই নামগুলোর সঙ্গে যিনি সমান মর্যাদা পান তিনি হলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। তাঁকে বলা হয় ভারতের লোহপুরুষ (Iron Man of India)। কারণ তিনি শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, বরং স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক একতা প্রতিষ্ঠার প্রধান স্থপতি। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আপসহীন চরিত্রের কারণে আজকের ভারতের মানচিত্র গঠিত হয়েছে।


শৈশব ও শিক্ষাজীবন

বল্লভভাই প্যাটেলের জন্ম ৩১ অক্টোবর ১৮৭৫ সালে গুজরাটের নাডিয়াদ গ্রামে। তাঁর পিতা ঝাভেরভাই একজন কৃষক ছিলেন এবং মাতা লাদবাই ছিলেন এক দৃঢ়চেতা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই বল্লভভাই ছিলেন মেধাবী, সাহসী এবং পরিশ্রমী।

শৈশবে তিনি প্রথাগত শিক্ষা নেন গুজরাটের স্থানীয় বিদ্যালয়ে। আর্থিক অভাব থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের প্রচেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২২ বছর বয়সে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন – যা তখনকার সময়ে গ্রামাঞ্চলের জন্য বিরল ঘটনা।

পরে তিনি আইনজীবী হওয়ার জন্য লন্ডনে যান। লন্ডনের মিডল টেম্পল ইন থেকে তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করেন। দেশে ফিরে তিনি সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং গুজরাটে তাঁর নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে।


পরিবার ও ব্যক্তিজীবন

বল্লভভাই প্যাটেলের বিয়ে হয়েছিল ঝাভেরবাবি প্যাটেলের সঙ্গে। তাঁদের দুটি সন্তান ছিল – কন্যা মনিবেন এবং পুত্র দাহ্যাভাই। কিন্তু স্ত্রী অল্প বয়সেই মারা যান। এরপর প্যাটেল সন্তানদের একা মানুষ করেন। তাঁর কন্যা মনিবেন পিতার ছায়াসঙ্গিনী হয়ে সারা জীবন ছিলেন এবং প্যাটেলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোদ্ধা হিসেবে পাশে থেকেছেন।


রাজনীতিতে প্রবেশ

বল্লভভাই প্রথমে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তিনি একজন সফল আইনজীবী হিসেবে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছিলেন। কিন্তু ১৯১৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় এবং সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু। গান্ধীর আদর্শ – অহিংসা ও সত্যাগ্রহ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

তিনি গুজরাটে খেলাফত আন্দোলন, অহমেদাবাদের মিল শ্রমিকদের ধর্মঘট ও পরে বারদোলি সত্যাগ্রহ (১৯২৮) নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের জন্যই তাঁকে “সর্দার” উপাধি দেওয়া হয়। বারদোলি সত্যাগ্রহ ছিল কৃষকদের উপর অন্যায় কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক অহিংস সংগ্রাম।


স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান

সর্দার প্যাটেল কংগ্রেস দলের এক অনন্য সংগঠক ছিলেন। তিনি

  • নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০–২২)
  • দ্বিতীয় অসহযোগ আন্দোলন ও দান্ডি অভিযান (১৯৩০)
  • ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)
    – প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

তিনি বহুবার ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারাবন্দি হন। কিন্তু তাঁর মনোবল কখনও ভাঙেনি। তিনি গুজরাট ও পশ্চিম ভারতের জনগণকে রাজনীতিতে সক্রিয় করে তোলেন এবং গান্ধীর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে ওঠেন।


অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী পদ বিতর্ক

১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করলে সর্দার প্যাটেল স্বরাষ্ট্র ও তথ্য সম্প্রচার দপ্তরের দায়িত্ব পান। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১৫টি প্রাদেশিক কমিটি তাঁকে মনোনীত করলেও মহাত্মা গান্ধীর ইচ্ছায় তিনি নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন এবং নেহেরুকে সুযোগ দেন।

ইতিহাসবিদরা বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্যাটেলের পক্ষে থাকলেও তিনি দলের ঐক্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন। যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হতেন তবে ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো হয়তো আরও দৃঢ় হাতে পরিচালিত হতো।


স্বাধীন ভারতের লোহপুরুষ

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর তিনি ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো ভারতের ভূখণ্ডগত ঐক্য রক্ষা।

তখন ব্রিটিশ ভারতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল – ভারত ও পাকিস্তান। ব্রিটিশ শাসনের বাইরে ছিল ৫৬২টি দেশীয় রাজ্য। সর্দার প্যাটেল দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে এসব রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে একীভূত করেন।

  • হায়দরাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর – এই তিনটি রাজ্যের একীকরণ ছিল সবচেয়ে জটিল।
  • হায়দরাবাদে “অপারেশন পোলো” চালিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে একীভূত করা হয়।
  • জুনাগড় পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে প্যাটেল গণভোটের মাধ্যমে সেটিকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করেন।

তাঁর এই অবদানের কারণেই তাঁকে বলা হয় “ভারতের একীকরণের স্থপতি”।


অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অবদান

প্যাটেল কেবল রাজ্য একীকরণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS) ও ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (IPS) বজায় রাখেন এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের জন্য একটি দৃঢ় আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলেন।

তাঁর বিশ্বাস ছিল – শক্তিশালী কেন্দ্র ছাড়া দেশ টিকে থাকতে পারবে না। তাই তিনি সংবিধানে কেন্দ্রকে শক্তিশালী করার পক্ষে ছিলেন।


ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ধরণ

সর্দার প্যাটেল ছিলেন দৃঢ়চেতা, বাস্তববাদী ও স্পষ্টভাষী নেতা। তিনি ত্যাগ ও শৃঙ্খলাকে জীবনের মূলমন্ত্র মনে করতেন। তাঁর সাহসী মনোভাবের জন্য তাঁকে “লোহপুরুষ” বলা হয়।

তিনি নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। গান্ধীজির মৃত্যুর পর তিনি কয়েক মাস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, কারণ গান্ধী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পথপ্রদর্শক ছিলেন।


শেষ দিনগুলি

১৯৫০ সালের শেষ দিকে তাঁর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে মুম্বাইয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুরো দেশ শোকাহত হয়।

ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ভারতরত্ন (১৯৯১ সালে) প্রদান করে।


উত্তরাধিকার ও স্মৃতিচিহ্ন

সর্দার প্যাটেলের অবদানের স্মরণে গুজরাটের নর্মদা জেলায় ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উদ্বোধন করেন “স্ট্যাচু অফ ইউনিটি” – বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি (উচ্চতা ১৮২ মিটার)। এটি তাঁর অবিস্মরণীয় ভূমিকার প্রতীক।


উপসংহার

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারতের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন প্রশাসক, সংগঠক, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাষ্ট্রনায়ক – সব মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ দেশনায়ক।

তাঁর জীবনের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক:

  • জাতীয় ঐক্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া
  • প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দৃঢ় নেতৃত্ব
  • ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখা

সত্যিই, তিনি ভারতের “লোহপুরুষ” – যার দৃঢ়তা ছাড়া আজকের ভারতের মানচিত্র এ রকম হতো না।

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস শুধুমাত্র একজন কবি বা ঋষি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগস্রষ্টা।

ভূমিকা

ভারতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে যে কয়েকজন মহামুনি তাঁদের অনন্য অবদানের জন্য যুগে যুগে শ্রদ্ধার আসনে বিরাজমান, তাঁদের মধ্যে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সর্বাগ্রে। তিনি শুধু এক মহাকাব্যকার নন, তিনি ছিলেন ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার স্থপতি। তাঁর রচিত মহাভারত বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য, যার মধ্যে মানবজীবনের প্রায় সমস্ত দিক – ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ – এর শিক্ষা বিদ্যমান। তিনি বেদের বিভাজন করেছিলেন, পুরাণ রচনা করেছিলেন এবং হিন্দুধর্মকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছিলেন। তাই তাঁকে “ব্যাসদেব”, “বেদব্যাস” এবং “হিন্দু সংস্কৃতির মহাগুরু” বলা হয়।

—

জন্ম ও বাল্যজীবন

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের জন্ম ছিল অলৌকিক। তাঁর পিতা মহর্ষি পরাশর, যিনি একজন মহান ঋষি ও যোগী ছিলেন, গঙ্গার তীরে সত্যবতী নামে এক যুবতীর সঙ্গে মিলিত হন। সত্যবতী ছিলেন একজন মৎস্যজীবীর কন্যা, যিনি গঙ্গায় নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরাশর সত্যবতীর গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করেন যে তাঁর গর্ভে এক মহাজ্ঞানী ঋষির জন্ম হবে।

কথিত আছে যে, সত্যবতী তখন এক ছোট দ্বীপে ছিলেন এবং সেখানেই বেদব্যাসের জন্ম হয়। তাঁর জন্মের সময়ই তিনি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিলেন, তাই তাঁর নাম হয় “কৃষ্ণ”। জন্মস্থান দ্বীপ হওয়ায় নাম হয় “দ্বৈপায়ন”। তিনি জন্মের পরেই বড় হয়ে গিয়ে মাকে আশীর্বাদ করে বনবাসে চলে যান। শাস্ত্র মতে তিনি জন্মগত মহাজ্ঞানী ছিলেন।

—

বেদের বিভাজন

বেদব্যাসের সবচেয়ে বড় অবদান হল বেদ বিভাজন। প্রাচীন যুগে একটিমাত্র “বেদ” ছিল, যা আকারে বিশাল এবং জটিল ছিল। সাধারণ মানুষ সেটি আয়ত্ত করতে পারছিল না। তাই বেদব্যাস এটিকে চারটি ভাগে ভাগ করেন –

1. ঋগ্বেদ – স্তোত্র ও দেবতাদের প্রশস্তি।

2. যজুর্বেদ – যজ্ঞের মন্ত্র ও আচারের বিধি।

3. সামবেদ – সুরেলা সঙ্গীত ও স্তোত্র।

4. অথর্ববেদ – চিকিৎসা, তন্ত্র, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার জ্ঞান।

 

এই চারভাগ করার ফলে বেদের জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়। এই বিশাল কাজের জন্যই তিনি “বেদব্যাস” নামে পরিচিত হন।

—

মহাভারতের রচনা

মহাভারত বেদব্যাসের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এটি ১,০০,০০০ শ্লোকের এক মহাকাব্য। এতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, পাণ্ডব ও কৌরবদের কাহিনি, নীতিশিক্ষা, ধর্মসংকট, মানবজীবনের দার্শনিক ব্যাখ্যা সবই আছে।

ভাগবদ্গীতা – মহাভারতের অন্তর্গত একটি অংশ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ধর্ম ও কর্মের জ্ঞান দেন। এই গীতা আজও ভারতীয় দর্শনের মূল ভিত্তি।

নীতিশিক্ষা – মহাভারত শুধুমাত্র যুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি এক জীবন্ত ধর্মশাস্ত্র। এতে রাজনীতি, ন্যায়নীতি, সমাজনীতি, মানবধর্ম সবই শিক্ষা দেয়।

 

—

পুরাণ রচনা

বেদব্যাসকে ১৮টি মহাপুরাণের রচয়িতা বলা হয়। এগুলি হল –
বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ ইত্যাদি। এই পুরাণগুলিতে দেবদেবীর কাহিনি, ধর্মনীতি, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান বর্ণিত আছে।

—

পরিবার ও বংশ

বেদব্যাস নিজে মহাভারতের চরিত্র। তাঁর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল নিয়োগ প্রথা। সত্যবতীর দুই পুত্র বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদ অকালমৃত্যুবরণ করলে, কুরু বংশ নির্বংশ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন সত্যবতীর অনুরোধে বেদব্যাস নিয়োগ প্রথা অনুযায়ী দুই রাণীকে গর্ভবতী করেন। এর ফলে জন্ম নেন –

ধৃতরাষ্ট্র – কৌরবদের পিতা।

পাণ্ডু – পাণ্ডবদের পিতা।

বিদুর – মহাভারতের এক নীতিবাগীশ চরিত্র।

 

—

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি

বেদব্যাসের দর্শন ছিল মানবজীবনের চারটি পুরুষার্থ – ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ – এর মধ্যে সুষমা স্থাপন করা। তিনি শিখিয়েছিলেন –

ধর্ম ছাড়া অর্থ ও কাম অর্থহীন।

সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকাই মুক্তির একমাত্র উপায়।

মানুষের কর্তব্য কর্ম করতে হবে, ফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে।

 

—

গুরুপূর্ণিমা ও বেদব্যাস পূজা

প্রতিবছর আষাঢ় পূর্ণিমার দিনে গুরুপূর্ণিমা পালিত হয়। এই দিনটি ব্যাস পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। সমস্ত শাস্ত্রাচার অনুযায়ী এই দিন গুরুকে সম্মান জানানোর দিন, কারণ বেদব্যাসকে সমগ্র মানবজাতির প্রথম গুরু হিসেবে ধরা হয়।

—

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

বেদব্যাস হিন্দু ধর্মের সংহতিসাধক। তাঁর কারণে ভারতীয় সংস্কৃতি এক সুসংহত আকার পেয়েছে। তাঁর রচনাই পরবর্তী যুগে দর্শন, সাহিত্য, সমাজনীতি, আধ্যাত্মিকতা – সব কিছুর ভিত্তি হয়েছে।

—

উপসংহার

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস শুধুমাত্র একজন কবি বা ঋষি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগস্রষ্টা। তাঁর সৃষ্টি মহাভারত, তাঁর বেদের বিভাজন, তাঁর পুরাণ রচনা – সব মিলিয়ে তিনি ভারতীয় চেতনার শাশ্বত প্রতীক। আজও যখন ভারতীয় সমাজ ধর্ম, নীতি, আধ্যাত্মিকতা নিয়ে চিন্তা করে, তখন বেদব্যাসের নির্দেশনা ও শিক্ষা আলো দেখায়। তাই তাঁকে “অষ্টচিরঞ্জীবী”দের একজন হিসেবে মান্য করা হয় – যিনি যুগে যুগে বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে পুজোর সেরা গন্তব্য।।

পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র দর্শনের নাম এলেই সবার আগে মনে পড়ে দীঘা-র কথা। কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই সমুদ্রসৈকত শহর বছরের সবসময়ই জনপ্রিয়, তবে দুর্গাপুজোর ছুটিতে দীঘার আবহ থাকে একেবারে অন্যরকম।


🏖️ দীঘার সমুদ্রসৈকত – প্রকৃতির খোলা রূপ

দীঘার মূল আকর্ষণ হল তার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত।

  • ওল্ড দীঘা: এখানকার পাথরের বাঁধে বসে ঢেউয়ের শব্দ শোনা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
  • নিউ দীঘা: এখানে রয়েছে প্রশস্ত বালুকাবেলা, যা হাঁটাহাঁটির জন্য আদর্শ। সন্ধ্যায় পুরো সৈকত ভরে ওঠে আলো, দোকান ও মানুষের ভিড়ে।

🪔 পুজোর ছুটিতে দীঘা – উৎসবের বাড়তি রঙ

পুজোর সময় দীঘায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যায়।

  • অনেক হোটেল ও রিসর্ট বিশেষ আলোকসজ্জা করে।
  • সৈকতে প্যান্ডেলও তৈরি হয়, যেখানে ঢাকের বাজনা, ধুনুচি নাচ হয়।
  • পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ মিলে একসাথে পুজোর আনন্দ উপভোগ করে।

🚶 কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান

পুজোর ছুটিতে শুধুই সমুদ্র নয়, দীঘার আশেপাশের কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখা যায় –

  • উদয়পুর সৈকত: নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আদর্শ।
  • শঙ্করপুর: এখানে রয়েছে মৎস্যবন্দর ও নির্জন সৈকত।
  • তাজপুর ও মন্দারমণি: যারা আরও কিছুটা দূরে যেতে চান তাদের জন্য এই সৈকতগুলো দারুণ পছন্দ।
  • আমরাবতী পার্ক: শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা।
  • সায়েন্স সেন্টার: বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য ছোট কিন্তু ইন্টারেস্টিং প্রদর্শনী।

🍤 দীঘার খাবার

সমুদ্রতীরের শহরে এসে সি-ফুড না খেলে ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না।

  • কাঁকড়া, প্রন, পোমফ্রেট – সবই তাজা ও সুস্বাদু।
  • রাস্তার ধারে ভাজা মাছ, পকোড়া ও আইসক্রিমও সমান জনপ্রিয়।

🛍️ কেনাকাটা

দীঘার সৈকতের পাশে ছোট দোকানগুলোতে পাওয়া যায় –

  • ঝিনুক ও শাঁখের তৈরি জিনিস
  • বাঁশ ও কাঠের হস্তশিল্প
  • শাড়ি, গামছা ও ছোট ছোট স্মারক

🚆 কিভাবে পৌঁছবেন

  • ট্রেন: হাওড়া থেকে সরাসরি দীঘার ট্রেন চলে।
  • রাস্তায়: কলকাতা থেকে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টার ড্রাইভ (NH-116B)।
  • পুজোর সময় আগে থেকে হোটেল বুক করে রাখা জরুরি, কারণ ভিড় অনেক বেড়ে যায়।

❤️ উপসংহার

দীঘা শুধুই সমুদ্র দেখার জায়গা নয় – এটি এক আবেগ, এক স্মৃতি। দুর্গাপুজোর ছুটিতে এখানে বেড়াতে গেলে পরিবার, বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে এক অমলিন সময় কাটানো যায়। ঢেউয়ের শব্দ, ঠান্ডা হাওয়া, বালুকাবেলার হাঁটাহাঁটি আর সুস্বাদু সি-ফুড – সব মিলিয়ে দীঘা হল পুজোর ছুটির জন্য একদম পারফেক্ট গন্তব্য।

Share This