Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

লাভা : মেঘের ভেতর লুকিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গের নীরব পাহাড়।

পাহাড়ে যাওয়ার কথা উঠলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের নাম। কিন্তু যারা ভিড়ের বাইরে, প্রকৃতির গভীর নীরবতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে নিতে চান, তাঁদের জন্য উত্তরবঙ্গের ছোট্ট হিল স্টেশন লাভা এক অনন্য আশ্রয়। এখানে নেই বড় শহরের কোলাহল, নেই পর্যটনের অতিরিক্ত ব্যস্ততা; আছে শুধু মেঘের ভেসে বেড়ানো, পাইন বনের গন্ধ, আর দূরে তুষারঢাকা শিখরের আবছা হাসি।
পাহাড়ে পৌঁছোনোর অনুভূতি
শিলিগুড়ি ছেড়ে পাহাড়ি পথে গাড়ি যখন ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকে, তখনই বদলে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট। সমতলের গরম হাওয়া মিলিয়ে যায়, তার জায়গায় আসে ঠান্ডা, স্নিগ্ধ বাতাস। বাঁক নিতে নিতে রাস্তা একসময় ঢুকে পড়ে গভীর সবুজের ভেতর। সেই সবুজের মাঝেই কোথাও যেন লুকিয়ে আছে লাভা।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম উঁচু বসতি অঞ্চল। পথের দু’ধারে পাইন, ওক আর শ্যাওলাধরা গাছের সারি, মাঝেমধ্যে কুয়াশা এসে ঢেকে দেয় চারপাশ। মনে হয়, যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে পর্দা টেনে রেখেছে—শুধু ধৈর্য ধরলেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে তার রূপ।
নিওরা ভ্যালির সবুজ রহস্য
লাভার অন্যতম আকর্ষণ হলো পাশেই অবস্থিত নিওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। এই সংরক্ষিত অরণ্য উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারগুলোর একটি। ঘন বন, উঁচু গাছ, অদ্ভুত নীরবতা—সব মিলিয়ে এক রহস্যময় পরিবেশ।
ভোরবেলায় যদি কেউ জঙ্গলের কিনারে দাঁড়ায়, শুনতে পাবে অচেনা পাখির ডাক। ভাগ্য ভালো হলে দেখা মিলতে পারে বিরল লাল পান্ডার, কিংবা দূরে হিমালয়ান কালো ভালুকের উপস্থিতির চিহ্ন। এই অরণ্য শুধু প্রাণীজগতের আশ্রয় নয়, প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্যও এক বিশাল শিক্ষালয়। এখানে দাঁড়ালে বোঝা যায়, মানুষের চেয়ে প্রকৃতির অস্তিত্ব কত বড়, কত গভীর।
ভোরের কাঞ্চনজঙ্ঘা
লাভায় রাত নামে দ্রুত। সন্ধ্যার পর পাহাড়ি হাওয়ায় শীত বাড়তে থাকে, আর আকাশ ভরে যায় তারায়। কিন্তু প্রকৃত বিস্ময় অপেক্ষা করে ভোরবেলায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে দেখা যায় মহিমান্বিত কাঞ্চনজঙ্ঘা।
প্রথম সূর্যালোক যখন তুষারঢাকা চূড়ায় পড়ে, তখন সেই সাদা বরফ সোনালি আভায় ঝলমল করে ওঠে। চারপাশে তখনও মেঘের আস্তরণ, কিন্তু শিখর যেন আলোয় জেগে ওঠে। সেই মুহূর্তে মনে হয়, পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গেছে—শুধু পাহাড় আর আকাশের নীরব সংলাপ চলছে।
লাভা মনাস্ট্রির শান্তি
লাভার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটি বৌদ্ধ মঠ, পরিচিত লাভা মনাস্ট্রি নামে। রঙিন প্রার্থনাধ্বজা বাতাসে উড়তে থাকে, মাঝে মাঝে শোনা যায় প্রার্থনার ঘণ্টাধ্বনি। মঠের ভেতরে প্রবেশ করলে যে প্রশান্তি অনুভূত হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
লাল-হলুদ রঙের দেয়াল, প্রার্থনার চাকা, ধূপের মৃদু গন্ধ—সব মিলিয়ে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ। এখানে বসে অনেকেই ধ্যান করেন, কেউ বা শুধু চুপচাপ বসে থাকেন। পাহাড়ি নীরবতার সঙ্গে এই প্রার্থনাস্থলের মিলন যেন মনকে অন্য এক স্তরে নিয়ে যায়।
গ্রামের জীবন ও মানুষ
লাভার মানুষজন সরল, আন্তরিক এবং অতিথিপরায়ণ। লেপচা, ভুটিয়া ও নেপালি সম্প্রদায়ের মানুষেরাই এখানে প্রধানত বসবাস করেন। তাঁদের জীবন প্রকৃতিনির্ভর। ছোট চাষের জমি, পশুপালন, আর পর্যটকদের জন্য হোমস্টে—এই নিয়েই তাঁদের দৈনন্দিন জীবন।
হোমস্টেতে থাকলে বোঝা যায় পাহাড়ি জীবনের প্রকৃত স্বাদ। সকালের গরম চা, ঘরে তৈরি খাবার, আর পরিবারের সদস্যদের আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে মনে হয় যেন আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি। পাহাড়ের ঠান্ডা রাতে আগুন জ্বালিয়ে গল্প করার আনন্দ শহুরে জীবনে দুর্লভ।
ঋতুর বদলে বদলে লাভা
লাভার রূপ ঋতুভেদে বদলে যায়।
বসন্তকালে রডোডেনড্রনের লাল ফুল পাহাড়কে রাঙিয়ে তোলে। গ্রীষ্মে আবহাওয়া মনোরম, আর কুয়াশা ভোরবেলায় নরম চাদরের মতো ছেয়ে থাকে। বর্ষায় চারদিক সবুজে ভরে ওঠে, যদিও তখন রাস্তা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। শীতে তাপমাত্রা অনেকটাই নেমে যায়; কখনও কখনও হালকা তুষারপাতও হয়, যা পাহাড়কে আরও রূপকথার মতো করে তোলে।
খাবার ও পাহাড়ি স্বাদ
লাভার খাবার সাদামাটা হলেও স্বাদে অনন্য। গরম মোমো, থুকপা, পাহাড়ি সবজির ঝোল—এইসব খাবার ঠান্ডায় শরীর গরম রাখে। চা এখানে শুধু পানীয় নয়, এক অনুভূতি। সকালের কুয়াশার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়ালে মনে হয়, এই মুহূর্তটাই জীবনের সবচেয়ে শান্ত সময়।
নীরবতার মূল্য
লাভার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার নীরবতা। এখানে রাত গভীর হলে শুধু বাতাসের শব্দ শোনা যায়। শহরের হর্ন, যানজট বা কোলাহল নেই। এই নীরবতাই মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
অনেকেই বলেন, পাহাড় মানুষকে বদলে দেয়। লাভায় কয়েকদিন কাটালে বোঝা যায় কথাটা মিথ্যে নয়। এখানে সময়ের গতি ধীর, চিন্তাভাবনা স্বচ্ছ, আর মন অকারণেই হালকা হয়ে যায়।
উপসংহার
লাভা কোনও ঝাঁ-চকচকে পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি এক শান্ত পাহাড়ি গ্রাম, যেখানে প্রকৃতি এখনো তার প্রাচীন রূপ ধরে রেখেছে। যারা সত্যিকারের পাহাড়ের স্বাদ নিতে চান—মেঘের ভেতর হাঁটতে চান, ভোরের আলোয় তুষারশিখর দেখতে চান, কিংবা নিঃশব্দে বসে নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে চান—তাঁদের জন্য লাভা এক অনন্য গন্তব্য।
পাহাড় সবসময় বড় নয়, উঁচু নয়, বিখ্যাতও নয়—কখনও কখনও পাহাড় মানে শুধু শান্তি। আর সেই শান্তির আরেক নাম—লাভা।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *