ভ্রমণ মানে শুধু স্থান বদল নয়—ভ্রমণ মানে নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু দূরে রেখে আসা, আর নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করা। এমনই এক অচেনা দুপুরে, ব্যস্ত শহরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম অজানার পথে।
শীতের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দিনটিতে আকাশ ছিল পরিষ্কার। ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুটে চলা মাঠ, খাল আর ছোট ছোট গ্রাম যেন চোখের সামনে এক চলমান ছবির অ্যালবাম খুলে ধরছিল। মাঝে মাঝে কাঁচা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ, কখনো লাল মাটির বাড়ি—সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ সৌন্দর্য।
গন্তব্য ছিল পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট শহর। নাম খুব পরিচিত নয়, কিন্তু শান্তি ভরা। স্টেশন থেকে নামতেই যে জিনিসটা সবচেয়ে আগে টের পেলাম, তা হলো—নীরবতা। শহরের কোলাহলের অভ্যাসে অভ্যস্ত কান যেন কিছুক্ষণের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। বাতাসে ছিল হালকা শীতের গন্ধ, আর রোদের উষ্ণ ছোঁয়া।
হেঁটে চললাম সরু রাস্তা ধরে। রাস্তার ধারে চা-দোকান, যেখানে কেটলিতে ফুটছে দুধ-চা। দোকানদার হাসিমুখে চা বাড়িয়ে দিল—সেই চায়ের স্বাদ যেন শহরের দামি ক্যাফের চেয়েও অনেক বেশি আপন। পাশেই কয়েকজন স্থানীয় মানুষ গল্পে মশগুল, তাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে জীবনের সহজ সত্যগুলো যেন ঝরে পড়ছিল।
দুপুর গড়াতেই পাহাড়ের ছায়া লম্বা হয়ে এল। একপাশে নীলচে পাহাড়, অন্য পাশে সবুজ উপত্যকা। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো—প্রকৃতি যেন নিজেই শিল্পী, আর আমরা কেবল দর্শক। মোবাইল তুলে ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু বুঝলাম—এই অনুভূতি কোনো ক্যামেরায় বন্দি করা যায় না।
ভ্রমণের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো মানুষ। অচেনা হলেও তাদের আন্তরিকতা আপন করে নেয়। এক বৃদ্ধ মানুষ গল্প করছিলেন তাঁর জীবনের কথা—কীভাবে পাহাড় আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই কেটে গেছে তাঁর জীবন। সেই গল্পে ছিল কষ্ট, ছিল ধৈর্য, আর ছিল অদ্ভুত এক শান্তি।
সন্ধ্যা নামার আগেই ফিরে আসার পালা। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ঢুকে পড়ছে, আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে কমলা আর বেগুনিতে। মনে হলো—এই ভ্রমণ শুধু কিছু দৃশ্য নয়, কিছু অনুভূতি জমা করে দিল বুকের ভেতর।
ফিরতি পথে ভাবছিলাম—ভ্রমণ আসলে কোথাও যাওয়া নয়, বরং নিজের কাছে ফিরে আসা। ব্যস্ততার ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে এই কয়েকটা ঘণ্টা আমাকে শিখিয়ে দিল—জীবন আসলে খুব সহজ, যদি আমরা তাকে সহজভাবে দেখতে শিখি।