Categories
প্রবন্ধ বিবিধ

২৫ ডিসেম্বর — তুলসী পূজন দিবস: সনাতন সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাসঙ্গিকতা।

ভূমিকা:-  ভারতের সাংস্কৃতিক ভিত্তি যতটা বৈচিত্র্যময়, ততটাই প্রাচীন। এখানকার ঋষি-ঋষিকারা শুধু ধর্মীয় আচরণই গড়ে দেননি—তাঁরা প্রকৃতি, মানবতা, বৈদিক দর্শন, উপনিষদীয় জ্ঞান ও জীবনযাপনের এক চিরন্তন সহাবস্থান তৈরি করেছিলেন। সেই সহাবস্থানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে—তুলসী

ভারতের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি উঠোন, প্রতিটি গ্রাম—একসময় তুলসীর সুগন্ধে ভরে থাকত। তুলসী শুধু গাছ নয়—এ এক বিশ্বাস, এক দর্শন, এক জীবনযাপন পদ্ধতি। তাই তো সনাতনের ঘরে ঘরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলে তুলসীর তলায়। সেই তুলসীকে কেন্দ্র করে হাজার বছরের প্রাচীন একটি বিশেষ দিন পালন করা হয়—২৫ ডিসেম্বর: তুলসী পূজন দিবস (Tulsi Pujan Diwas)

এই দিনটি পশ্চিমা বিশ্বের “ক্রিসমাস”-এর সঙ্গে এক সময়ে পড়লেও, এর উৎস, উদ্দেশ্য, দর্শন, ইতিহাস—সবই সম্পূর্ণ আলাদা। এটি সনাতন সংস্কৃতির এক অসাধারণ পরিচয় বহন করে।


অধ্যায় ১ : তুলসী — সনাতন ধর্মে পবিত্রতার প্রতীক

১.১ তুলসীর নাম ও অর্থ

“তুলসী” শব্দের অর্থ—অতুলনীয়া, যার তুলনা নেই।
আর “বৃন্দা” নামে তাঁকে ডাকা হয়—যার অর্থ—শক্তির আধার।

তুলসীকে সনাতন ধর্মে দেবীরূপে পূজা করা হয়।
কারণ—

  • তিনি বিষ্ণুর অর্ধাঙ্গিনী (বৃন্দাবতীরূপে)
  • তিনি পরিশুদ্ধির প্রতীক
  • তিনি আয়ুর্বেদের মা
  • তিনি পরিবেশের রক্ষক

১.২ বৈদিক শাস্ত্রে তুলসীর গুরুত্ব

স্কন্দ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ, গরুড় পুরাণ—সব পুরাণেই তুলসীর পবিত্রতার বর্ণনা পাওয়া যায়।

স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে:
“তুলসীর স্পর্শ, দর্শন, সেবন বা পূজা — যে কোন একটি করলেও পাপমুক্ত হওয়া যায়।”

ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ (কৃষ্ণজন্ম খণ্ড)-এ বলা হয়:
“যেখানে তুলসী আছে, সেখানে বিষ্ণুর নিজ উপস্থিতি আছে।”


অধ্যায় ২ : তুলসী পূজার ইতিহাস

২.১ তুলসী পূজা কখন শুরু হয়?

তুলসী পূজার সূচনা অতিমাত্রায় প্রাচীন—বৈদিক যুগ থেকেই।
ইতিহাসবিদদের মতে—

  • খ্রিস্টান সভ্যতার প্রাথমিক অস্তিত্বের বহু হাজার বছর আগে
  • মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা রোমান সভ্যতার পূর্বে
  • মিশর বা ব্যাবিলনের বহু আগে থেকেই

ভারতের গৃহে তুলসী ছিল নিয়মিত পূজার অংশ।

বৈদিক যুগ (প্রায় ৫,০০০–১০,০০০ বছর পূর্বে) থেকেই “সমিদা” হিসেবে যজ্ঞে তুলসীর ব্যবহার ছিল।
আর পরে পুরাণ যুগে তুলসীদেবীর পূজা প্রতিষ্ঠা পায়।

২.২ প্রথম কে তুলসী পূজা শুরু করেন?

শাস্ত্রের তথ্য অনুযায়ী:

  1. তুলসী (বৃন্দা)-ই ছিলেন প্রথম দেবী যাঁকে বিষ্ণু নিজেই আশীর্বাদ দেন,
    এবং তাঁর পূজা নির্ধারিত করেন।
  2. ধর্মরাজ, ঋষিমুনিরা—গৃহস্থ আশ্রমে নিয়মিত তুলসী পূজা করতেন।
  3. শ্রীকৃষ্ণ নিজে গোকুলে ব্রজবাসীদের তুলসী সেবার পরামর্শ দিতেন।

অতএব—
তুলসী পূজার প্রতিষ্ঠাতা কোনো মানুষের নাম নয় — দেবতাই এর সূচনা করেন।
বরং ঋষিমুনিরা সেই ঐতিহ্যকে গৃহস্থ জীবনে ছড়িয়ে দেন।


অধ্যায় ৩ : ২৫ ডিসেম্বর — তুলসী পূজন দিবস

৩.১ কেন ২৫ ডিসেম্বরেই তুলসী পূজন দিবস?

অনেকেই মনে করেন, “ক্রিসমাস” এর প্রতিযোগী হিসাবে এই দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব তা নয়।

তুলসী পূজন দিবস পালন করা হয়—

কারণ ১:

মার্গশীর্ষ মাসে তুলসীর বৃদ্ধি ও পবিত্রতম অবস্থা থাকে।

কারণ ২:

এই দিনটি উত্তরের দিকে সূর্যের গতিপথ পরিবর্তনের পূর্বসময়—
অর্থাৎ সূর্য দক্ষিণায়নের শেষ পর্যায়
এই সময়ে তুলসীর ঔষধি-ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে।

কারণ ৩:

পরিবেশ রক্ষার দিক থেকেও ডিসেম্বর মাস ভারতীয় ঋতুচক্রে গাছ লাগানো বা পুনর্নবীকরণের উপযুক্ত সময়।

কারণ ৪:

ক্রিসমাসের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজস্ব সনাতন ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।


অধ্যায় ৪ : তুলসী বনাম ক্রিসমাস — সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা

এখানে কোনো ধর্মবিরোধী আলোচনা নয়—
বরং ভারতীয় সংস্কৃতি বনাম পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভেদ তুলে ধরা।

৪.১ ক্রিসমাস কী?

ক্রিসমাস হল—

  • খ্রিস্টান ধর্মের একটি ধর্মীয় উৎসব
  • যিশু খ্রিস্টের সম্ভাব্য জন্মদিন (বাস্তবে ঐ দিন জন্ম নাও হতে পারে)
  • মূলত মধ্যযুগে রোমান পৌত্তলিক উৎসব “Saturnalia” থেকে রূপান্তরিত

অর্থাৎ এটি তুলনামূলকভাবে নতুন উৎসব, বয়স সর্বোচ্চ ১৫০০–১৭০০ বছর।

৪.২ তুলসী পূজা কী?

তুলসী পূজা—

  • ভারতীয় বৈদিক যুগের বৈশিষ্ট্য
  • বয়স ৫,০০০ বছর নয়—সম্ভবত ১০,০০০+ বছর
  • বৈদিক চিকিৎসা, দর্শন, যোগ, আয়ুর্বেদ ও পরিবেশচেতনার প্রতিনিধিত্ব করে

৪.৩ কীভাবে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা?

বিষয় তুলসী পূজা ক্রিসমাস
উৎপত্তি বৈদিক যুগ মধ্যযুগীয় রোমান সংস্কৃতি
ভিত্তি আয়ুর্বেদ, পরিবেশ, প্রকৃতি ধর্মীয় বিশ্বাস
প্রধান প্রতীক তুলসী গাছ ক্রিসমাস ট্রি
উদ্দেশ্য শুদ্ধতা, প্রকৃতির পূজা, পরিবেশ সুরক্ষা যিশুর জন্মোৎসব
বয়স ১০,০০০+ বছর ~১৭০০ বছর
দর্শন প্রকৃতি-মানবের ঐক্য একেশ্বরবাদ

ভারতের প্রেক্ষাপটে—
তুলসী পূজন দিবস আমাদের আত্মপরিচয়, আর ক্রিসমাস বিদেশি সাংস্কৃতিক আমদানী।
দুটো পালন করা ভুল নয়, কিন্তু নিজের শিকড় ভোলা ঠিক নয়।


অধ্যায় ৫ : তুলসীর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

৫.১ আয়ুর্বেদে তুলসীকে “ঘরোয়া হাসপাতাল” বলা হয়

তুলসীতে প্রায় ২০০টিরও বেশি ঔষধি রাসায়নিক আছে—

  • উজেনল
  • কারভিওল
  • লিনালুল
  • β–caryophyllene
  • অ্যাপিজেনিন
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
  • ভিটামিন K
  • অ্যান্টিবায়োটিক গুণ

৫.২ তুলসীর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
  • শ্বাসযন্ত্র সুস্থ রাখে
  • ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
  • হজম শক্তি বৃদ্ধি
  • মানসিক চাপ কমানো
  • ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ
  • হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা
  • বায়ুদূষণ কমানোর বিশেষ ক্ষমতা

অধ্যায় ৬ : তুলসীর ধর্মীয়-দর্শনগত তাৎপর্য

৬.১ তুলসী ও বিষ্ণুভক্তি

বলা হয়—
“তুলসী ছাড়া বিষ্ণু পূজা অসম্পূর্ণ।”

৬.২ তুলসী বিবাহ

কার্তিক মাসে দেব-দেবীর বিয়ের যে উৎসব হয়, তার শীর্ষে থাকে—
তুলসী বিবাহ, যা ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সামাজিক-ধর্মীয় রীতি।

এটি প্রমাণ করে—
ভারতে নারীর পূজা ছিল হাজার বছরের প্রথা।


অধ্যায় ৭ : ভারত কেন বলছে— “২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস”

কারণ ১ : বিদেশি উৎসবের আধিপত্য থেকে মুক্তি

ভারতের শহরগুলোতে ২৫ ডিসেম্বর মানেই—

  • লাল টুপি
  • সান্তা
  • কেক
  • পার্টি
  • বিদেশি পোশাক
  • শপিংমল সংস্কৃতি

এগুলো ভারতীয় নয়।
তাই নিজের ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন।

কারণ ২ : পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন

২৫ ডিসেম্বর তুলসী লাগানো মানে—

  • প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা
  • বাস্তুসামঞ্জস্য
  • বায়ুদূষণ রোধ
  • ঔষধি গাছ সংরক্ষণ

কারণ ৩ : ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় প্রকাশ

যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়—
সে জাতি টিকে থাকে না।

কারণ ৪ : তুলসীর প্রকৃত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা

নতুন প্রজন্ম বিদেশি উৎসব সম্পর্কে জানে—
কিন্তু তুলসী সম্পর্কে জানে না।
তাই এই দিন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।


অধ্যায় ৮ : ২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস পালন করার পদ্ধতি

  1. ঘরের উঠোন বা বারান্দায় তুলসী রোপণ
  2. প্রদীপ জ্বালানো
  3. গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে তুলসী পূজা
  4. ধূপ-দীপ-ফুল
  5. তুলসীর প্রণাম ও সংকল্প
  6. তুলসীপত্র মন্দির বা গৃহদেবতার কাছে নিবেদন
  7. পরিবেশ রক্ষার শপথ
  8. পরিবারসহ জ্ঞানচর্চা—তুলসীর ইতিহাস আলোচনা

অধ্যায় ৯ : তুলসী — ভারতীয় সভ্যতার আত্মা

তুলসী আমাদের—

  • ঘরের সুরক্ষা
  • মন-শরীরের আরোগ্য
  • পরিবেশের পরিচর্যা
  • দেবতার প্রতি ভক্তি
  • নারীত্বের সম্মান
  • প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা

সবকিছুর প্রতীক।

যেখানে তুলসী—
সেখানে সনাতন।
সেখানে ভারতীয়ত্ব।


উপসংহার

২৫ ডিসেম্বর তুলসী পূজন দিবস শুধু একটি উৎসব নয়—
এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ,
মাটির প্রতি ভালবাসা,
ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব,
আর প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।

ক্রিসমাস হয়তো পাশ্চাত্যের নিজস্ব ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব—
তবে
সনাতন সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য এর চেয়ে অসীম পুরোনো, বৈচিত্র্যময় ও গভীর।

আমাদের শিকড় হলো—
বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, আয়ুর্বেদ, যোগ, আর তুলসী

তাই ২৫ ডিসেম্বর—
তুলসীর তলায় প্রদীপ জ্বালানো মানে
নিজেকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনা।

 

Share This
Categories
অনুগল্প

গল্প : ছবিওয়ালা প্রেম।

ঋচি ফটোগ্রাফার। ক্যামেরা হলো তার প্রথম প্রেম।
একদিন নদীর ধারে ছবি তুলতে গিয়ে দেখল—একজন ছেলে দাঁড়িয়ে স্কেচ আঁকছে। নাম—অর্পণ।

ঋচি বলল—“তুমি আঁকো, আমি ছবি তুলি… দু’জনের কাছেই পৃথিবী ফ্রেমবন্দী।”

অর্পণ হেসে বলল—
“সবচেয়ে সুন্দর ফ্রেমটা আজ পেলাম—তুমি।”

দু’জনই হাসল।
ধীরে ধীরে দেখা বাড়ল।
একদিন অর্পণ তার স্কেচবুক খুলে দেখাল—
সেখানে ঋচির বিভিন্ন ভঙ্গির বহু স্কেচ—

“তুমি না জানলেও, আমি অনেকদিন ধরে তোমাকেই আঁকছি।”

ঋচির গলা কাঁপল—
“আমি তো তোমাকে ক্যামেরায় ধরতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি তো আমাকে আগে থেকেই ধরে রেখেছ।”

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দু’জনের হাত এক হলো—
ছবি আর স্কেচ এক হয়ে গলধঃকরণ হলো তাদের ভালোবাসার গল্পে।

Share This
Categories
অনুগল্প

গল্প : চশমাওয়ালা ছেলে।

ইরা সবসময়ই শান্ত, বইপড়া আর স্বপ্নময় মেয়ে।
ক্লাসে সবসময়ই প্রথম বেঞ্চে বসত।
একদিন নতুন ছাত্র আসে—সামান্য অগোছালো, কিন্তু মিষ্টি—নাম তন্ময়।
চশমা পরে, চুল এলোমেলো, আর সবসময় গিটার সঙ্গে নিয়ে আসে।

তন্ময় প্রথম দিনই বলল—
“আমি পড়ায় তেমন ভালো না, কিন্তু গান খুব ভালোবাসি। আমায় একটু নোটস দিয়ে দেবে?”

ইরা অবাক—এভাবে কেউ কখনো তার কাছে আসেনি।
ইরা নোটস দিল, তন্ময় গান শুনাল।
এভাবেই একদিন দেখা হল, আর দেখা থেকেই শুরু হল অনুভূতি।

একদিন বৃষ্টি। ক্লাস শেষে ইরা ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফিরছে। তন্ময় ছাতা নিয়ে এসে বলল—
“তোমার সাথে হাঁটলে বৃষ্টি এত খারাপ লাগে না।”

ইরা আস্তে বলল—
“তুমি কি জানো? তোমাকে প্রথম দেখেই আমার ভালো লেগেছিল।”

তন্ময় মৃদু হেসে বলল—
“আমি তো প্রথম দিনই বুঝেছিলাম—আমার গান যদি কেউ মন থেকে শুনে থাকে, সেটা তুমি।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : দোতলা বাস আর প্রথম প্রেম।

কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে দোতলা বাস ধরত রিয়া।
একদিন উপরের সিটে বসে দেখল—একটা ছেলে তাকে দেখে হাসছে। নাম—সমর।

ধীরে ধীরে প্রতিদিন একই বাসে দেখা হতে হতে তারা কথা বলতে শুরু করল।
একদিন বাস খুব ভিড়। সামান্য ধাক্কায় রিয়ার হাত থেকে বই পড়ে গেল।
সমর ঝুঁকে বই তুলে দিয়ে বলল—“তোমার বই, কিন্তু কাহিনীটা আমার মতো মনে হচ্ছে—তুমিও আমাকে পছন্দ করো, তাই না?”

রিয়া লজ্জায় বলল—
“তুমি সবকিছু এত সহজে কিভাবে বলো?”

সমর মুচকি হেসে বলল—
“সত্যি কথা বলতে সাহস লাগে, কিন্তু চেষ্টা করলে কঠিন না।”

সেদিন থেকে বাসের সিটটাই হয়ে উঠল তাদের ছোট্ট পৃথিবী।
নগরীর শব্দ, মানুষের ভিড়—সবকিছু ম্লান হয়ে দুইজনের হাসি আর কথা।
একদিন সমর বলল—“বাসের ভিড়ের চেয়ে তোমাকে হারানোর ভয়টাই বড়।”

রিয়া হাসল—“তাহলে হারিয়ো না আমাকে।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : আধখানা গল্প।

লেখক অভিজিৎ বছরের পর বছর ধরে নিজের উপন্যাস লিখছে—কিন্তু শেষ অধ্যায়টা লিখতেই পারছে না।
কারণ? গল্পে যে মেয়েটি আছে—মীরা—তার বাস্তব রূপকে সে হারিয়েছে পাঁচ বছর আগে।

এক সন্ধ্যায় বইমেলায় গিয়ে অভিজিৎ চমকে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মীরা—হুবহু একই।
মীরা বলল—“তোমার লেখা পড়েছি। সেখানে আমি কেন হারিয়ে যাই?”

অভিজিৎ বলল—
“কারণ বাস্তবে তুমিই হারিয়ে গিয়েছিলে… কারণ না জানিয়েই।”

মীরা চোখ নামিয়ে বলল—
“পরিস্থিতি ছিল… তুমি বুঝতে না।”

দু’জনই চুপ। বইমেলার ভিড়, আলো এবং গন্ধ যেন দূর হয়ে গেল।

মীরা বলল—
“এখন যদি বলি—আবার শুরু করতে চাই… তুমি রাখবে?”

অভিজিৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলল—
“আমার গল্প তো আধখানা হয়ে বাকি আছে। শেষটা লিখব কী করে? যা হারিয়েছিলাম তা যদি ফিরেই আসে… তাহলে হয়তো শেষটা লিখতে পারব।”

মীরা ধীরে অনিকের হাত ধরল—
“শেষটা তবে আমাদের দু’জনের লেখা হোক।”

Share This
Categories
গল্প

গল্প : ভুল নামের নোটবুক।

অনিকের অফিসে নতুন ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিল তির্থা। প্রথম দিনেই সে ভুল করে অনিকের ডেস্কে নিজের নোটবুক রেখে চলে যায়। নোটবুকের ওপরে বড় করে লেখা—“তির্থার ডায়েরি – কেউ খুলবে না।”
অনিক প্রথমে ফেরত দিতে চাইছিল, কিন্তু কৌতূহলে একটু উঁকি মারতেই দেখল প্রথম পাতায় লেখা—

“নিজের মনের কথা কারও কাছে বলতে পারি না…
তাই ডায়েরির কাছে বলি।
যদি কখনো কেউ এই ডায়েরি পড়ে…
জেনে নিও—আমি খুব একাকী।”

এটা পড়ার পর থেকেই তির্থাকে আর সাধারণ ইন্টার্ন মনে হলো না তার কাছে।
পরের দিন নোটবুক ফেরত দিতে গিয়ে সে দেখল তির্থা একটু অগোছালো, একটু চঞ্চল, একটু মিষ্টি।

ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে কথা বাড়ল।
তির্থা ধীরে ধীরে নিজের মন খুলতে লাগল—তার একজন ছিল, যে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
অনিক মন দিয়ে শুনত, শুধু বলত—“সব হারানো মনে রেখে বসে থাকলে নতুন আলো তো আসবে না।”

একদিন লাঞ্চ ব্রেকে তির্থা বলল—
“তুমি জানো, তুমি প্রথম যে মানুষ—যার সাথে কথা বললে আমার ভয় লাগে না।”

অনিক হেসে বলল—“তাহলে ভয়হীন থাকার অনুশীলনটা আমার সঙ্গেই করে যাও।”

তির্থা চুপ করে অনিকের দিকে তাকালো। যেন বুঝে গেল—একাকীত্ব থেকে বের হওয়ার পথ হয়তো এ মানুষটাই।

মাসখানেক পরে, অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে তির্থা বলল—
“অনিক, তুমি যদি সত্যি মনে করো… আমরা একসঙ্গে হাঁটতে পারি… তাহলে আমি রাজি।”

অনিক বলল—
“আমি তো প্রথম দিনই নোটবুক খুলেই বুঝেছিলাম—আমি তোমাকে সামলাবো।”

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : হারিয়ে পাওয়া কণিকা।

অরূপ ট্রেনে বসে ছিল। তাকে বিপরীতে বসা মেয়েটির চোখ বারবার কিছু বলতে চাইছিল।
নাম—কণিকা।
দু’জনের কথাবার্তা মিলল, গল্প জমল, হাসি থামছিল না।

স্টেশন এলে কণিকা নেমে গেল। কিন্তু তার ব্যাগে ভুল করে অরূপের দেওয়া বইটা থেকে গেল।
বইয়ের ভিতরে অরূপের নম্বর।

দু’দিন পর অরূপের ফোনে একটি মিষ্টি কণ্ঠস্বর—
“আমি কণিকা… আপনার বইটা আছে আমার কাছে।”

এভাবেই শুরু তাদের নিয়মিত কথা…
একদিন কণিকা বলল—“এবার দেখা হবে?”

সেই দেখা-টাকেই তারা দু’জনই আজীবন মনে রাখল।
মনে হল—যেন একে অপরকে তারা আগেই চিনত… শুধু সময়ই তাদের মিলিয়ে দিল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : ফুলওয়ালার প্রেম।

রাজীব শহরের একটি ফুলের দোকানে কাজ করত। প্রতিদিন সকালে সে ফুল সাজাতে ব্যস্ত থাকত।
একদিন দেখল—একটা মেয়ে প্রতিদিন একই সময় একটা গোলাপ কিনে নিয়ে যায়।
মেয়েটির নাম—মেঘলা।

রাজীবের মনে প্রশ্ন—কার জন্য এত গোলাপ?

একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল—“আপনি কি কারো জন্য ফুল নেন?”
মেঘলা একটু দুঃখ নিয়ে বলল—“না। আমার মা গোলাপ খুব ভালোবাসতেন… তাই তাঁর স্মৃতিতে রাখি।”

রাজীব বুঝল—মেঘলার চোখের হাসির পিছনে লুকানো বিষাদ।
পরের দিন সে তাকে একটা সাদা গোলাপ উপহার দিল।
মেঘলা অবাক—“এর দাম?”
রাজীব বলল—“কখনো কখনো কিছু জিনিস দামের নয়—অনুভূতির।”

সেই দিন থেকে তাদের আলাপ বাড়ল, আর ধীরে ধীরে মেঘলার চোখের দুঃখটা একটু একটু করে কমতে থাকল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প নারী কথা

গল্প : নীল শাড়ির মেয়ে।

অভি প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার পথে বাসস্ট্যান্ডে একই মেয়েটিকে দেখত—নীল শাড়ি, কপালে ছোট টিপ, আর শান্ত দু’টো চোখ।
মেয়েটির নাম ছিল—ঋদ্ধিমা।

অভি সাহস করে কোনও দিন কথা বলেনি, শুধু দূর থেকে দেখেই যেত।
একদিন কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অভি গান গাইছিল। গান শেষে কেউ একজন বলল—
“তুমি খুব সুন্দর গাও।”
অভি তাকিয়ে দেখল—ঋদ্ধিমা!

তারপর থেকেই দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা, হাসি…
একদিন ঋদ্ধিমা বাসে উঠতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যাচ্ছিল। অভি ধরল তাকে।
ঋদ্ধিমা হেসে বলল—“তুমি না থাকলে আজ হাড্ডি ভেঙে যেত।”

অভি সাহস সঞ্চয় করে বলল—“দূর থেকে দেখতাম… কিন্তু বলতে পারিনি—তোমাকে ভালো লাগে।”

ঋদ্ধিমা প্রথমে অবাক, তারপর মুখটা লজ্জায় লাল।
সে বলল—“আমি ভেবেছিলাম শুধু আমিই দেখি তোমাকে।”

সেইদিন প্রথমবার দু’জন একসঙ্গে হাঁটল—ফুটপাতের পাশে কাঁচের দোকানে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে দু’জনই হেসে ফেলল।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : বৃষ্টিভেজা দুপুরে।

মেঘভাঙা বৃষ্টির দুপুরে অফিস ছুটি হয়ে গিয়েছিল। ঝর্ণা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল—ভিজে যাওয়ার ভয় নেই, কিন্তু একা থাকার ভয় ছিল। বৃষ্টি সবসময়ই তাকে অতীতের কোনো অদ্ভুত স্মৃতিতে ফিরিয়ে দিত।

হঠাৎ একটা ছাতা মাথার উপরে থামল।
তপন—ওদের অফিসের নতুন ছেলেটা।
সে হাসলো—“এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তো পুরোপুরি ভিজে যাবে।”

ঝর্ণা একটু অপ্রস্তুত হলেও ছাতার নিচে দাঁড়াল। বৃষ্টির শব্দে কথাগুলো ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো দুই জনের মাঝে।

বাস এল না। রাস্তায় জল জমে গিয়েছে।
তপন বলল—“চলো, ওখানে চায়ের দোকান আছে। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত বসি।”

চায়ের কাপে গরম ধোঁয়া। বাইরে মেঘের গর্জন।
ঝর্ণা আস্তে বলল—“বৃষ্টি আমার ভালো লাগে না।”
তপন জিজ্ঞেস করল—“তবে এতক্ষণ ভিজে দাঁড়িয়ে ছিলে?”
ঝর্ণা উত্তর দিল—“কারো জন্য অপেক্ষা করছিলাম… কিন্তু সে আর আসে না।”

তপন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
“কখনো কখনো যারা আসে না, তাদের জন্য অপেক্ষা করাটাই ভুল। বরং যারা পাশে দাঁড়ায়—তাদের চিনতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

ঝর্ণা তাকাল তপনের দিকে।
এ প্রথম অনুভব করল—কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করছে।

বৃষ্টি থামার পর দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফিরল।
সেদিনের বৃষ্টিটা ঝর্ণার আর খারাপ লাগল না।

Share This