Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের শেষ চিঠি (তৃতীয় পর্ব : যে ছেলেটি নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল)।

অনন্যা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ছবির ছেলেটির চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের পরিচিত। যেন বহু বছর আগে দেখা কোনও মুখ, যা স্মৃতির গভীরে চাপা পড়ে ছিল। তার কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা কাটা দাগ। অনন্যার নিজের কপালেও ঠিক একই জায়গায় এমন একটি দাগ রয়েছে।

ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে এই দাগ হয়েছিল তার। মা বলেছিলেন, জন্মের সময় থেকেই নাকি দাগটা ছিল। কিন্তু ছবির ছেলেটির কপালে একই দাগ এল কীভাবে?

প্রতাপ মুখোপাধ্যায় ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটি ভালো করে দেখলেন।

“ছেলেটার নাম জানো?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

অনন্যা মাথা নাড়ল।

“জানি না। শুধু এই বার্তাটা এসেছে।”

“নম্বরটা দেখাও।”

প্রতাপবাবু নম্বরটি নিজের ফোনে তুলে নিলেন। তারপর কয়েকবার কল করার চেষ্টা করলেন। প্রতিবারই ফোন বন্ধ।

তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, “এই বার্তা যে পাঠিয়েছে, সে তোমার পরিবারের অনেক কিছু জানে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—কেউ যদি তোমাকে বলে অয়ন তোমার ভাই নয়, তার মানেই কথাটা সত্যি নয়।”

অনন্যা চুপ করে রইল।

“কিন্তু যদি সত্যিই অয়ন আমার ভাই না হয়?”

প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “তাহলে এতদিনের পরিচিত জীবনটাকে নতুন করে বুঝতে হবে। তবে তার আগে প্রমাণ দরকার।”

অনন্যা জানলার বাইরে তাকাল। রাতের বৃষ্টির পর রাস্তায় জল জমে আছে। দূরে একটা চায়ের দোকান খুলছে। পৃথিবীটা স্বাভাবিকভাবে জেগে উঠছে, অথচ তার নিজের জীবন যেন এক অচেনা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে।

“আমি বাড়ি যাব,” সে বলল। “মায়ের ডায়েরিটা খুঁজে বের করব।”

প্রতাপবাবু বাধা দিলেন না।

“আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

“না। আপনি গেলে সৌমেন কাকু সন্দেহ করবেন।”

“সৌমেনকে তুমি এখনও বিশ্বাস করো?”

অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“জানি না। ছোটবেলা থেকে উনিই আমাদের দেখেছেন। কিন্তু এখন কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।”

প্রতাপবাবু মাথা নাড়লেন।

“সেটাই ভালো। অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে প্রশ্ন করা ভালো। তবে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে যেয়ো না।”

বাড়ি ফেরার পথে অনন্যা বারবার ছবির ছেলেটির মুখ মনে করার চেষ্টা করল। কেন জানি তার মনে হচ্ছিল, ছেলেটিকে সে শুধু ছবিতে দেখেনি। হয়তো কোনও স্বপ্নে, হয়তো শৈশবের কোনও বিস্মৃত দুপুরে।

কিন্তু যতই মনে করার চেষ্টা করল, ততই স্মৃতিগুলো কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে গেল।

বাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, মূল দরজা খোলা। বসার ঘরে সৌমেন কাকু বসে আছেন। তাঁর চোখ লাল, মুখে ক্লান্তির ছাপ।

অনন্যাকে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

“কোথায় ছিলি সারারাত?”

অনন্যা স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকাল।

“পুরোনো ডাকঘরে।”

সৌমেন কাকুর মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল।

“তুই সেখানে গিয়েছিলি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি তোকে নিষেধ করেছিলাম!”

“কেন? সেখানে কী আছে?”

সৌমেন কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “তোর বাবা।”

অনন্যার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল।

“তুমি জানো বাবা বেঁচে আছে?”

“আমি জানি না সে বেঁচে আছে কি না। কিন্তু আমি জানি, তোর বাবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটা সাধারণ কোনও ঘটনা ছিল না।”

“তাহলে এতদিন আমাকে বলোনি কেন?”

“কারণ তোর মা আমাকে কথা দিয়েছিল, তুই যেন এই বিষয়টা নিয়ে আর কোনও দিন অনুসন্ধান না করিস।”

“মা কেন এমন কথা বলবে?”

সৌমেন কাকু চোখ নামিয়ে নিলেন।

“কারণ তোর মা ভয় পেত।”

“কাকে?”

“যে মানুষগুলো তোর বাবাকে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদের।”

অনন্যা এগিয়ে এল।

“তাহলে তুমি তাদের চেনো?”

সৌমেন কাকু উত্তর দিলেন না।

“তুমি কি দেবব্রত মল্লিককে চেনো?”

এবার তিনি চমকে উঠলেন।

“এই নাম তোকে কে বলেছে?”

“উত্তর দাও।”

সৌমেন কাকু দু’হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “দেবব্রত মল্লিক ছিল তোর বাবার সহকর্মী। কিন্তু সে শুধু সহকর্মী ছিল না। সে এমন কিছু জানত, যা জানলে অনেক বড় মানুষের মুখোশ খুলে যেত।”

“কী জানত?”

“সরকারি টাকা চুরি, জাল নথি তৈরি, আর একটা শিশুকে অন্য পরিবারের কাছে তুলে দেওয়ার কথা।”

অনন্যার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“কোন শিশুকে?”

সৌমেন কাকু এবার তার দিকে তাকালেন।

“তোর ভাইকে।”

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমার ভাই কি সত্যিই ছিল?”

“ছিল।”

“তার কী হয়েছিল?”

সৌমেন কাকুর চোখে জল এসে গেল।

“তোর মা যেদিন হাসপাতালে ছেলেটার জন্ম দিয়েছিল, সেদিন আমি ওখানে ছিলাম। অরিন্দমও ছিল। ছেলেটা সুস্থ ছিল। কিন্তু রাতের মধ্যে হাসপাতালের কাগজপত্র বদলে গেল। সকালে সবাইকে জানানো হলো, শিশুটি মারা গেছে।”

“তাহলে মা তাকে দেখেনি কেন?”

“তোর মাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন তাকে বলা হলো, শিশুটির দেহ দাফন করা হয়েছে।”

“আর বাবা?”

“অরিন্দম সেটা বিশ্বাস করেনি। সে তদন্ত শুরু করেছিল। তারপরই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি কি জানো, আমার ভাই কোথায়?”

সৌমেন কাকু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি জানি না সে এখন কোথায়। কিন্তু আমি জানি, সে বেঁচে ছিল।”

“তুমি কীভাবে জানো?”

“কারণ সেই রাতেই আমি একটা শিশুকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

অনন্যা পিছিয়ে গেল।

“তুমি?”

“হ্যাঁ।”

“কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে?”

সৌমেন কাকু উত্তর দেওয়ার আগে বাইরে একটা মোটরবাইকের শব্দ হলো। তারপর বাড়ির গেট খোলার আওয়াজ।

অয়ন ফিরেছে।

সৌমেন কাকু হঠাৎ অনন্যার হাত ধরে বললেন, “তুই যা-ই শুনিস, অয়নকে ঘৃণা করিস না।”

অনন্যা হাত ছাড়িয়ে নিল।

“কেন? অয়ন কি জানে সে কে?”

“না। অন্তত আমি তাকে কিছু বলিনি।”

“তাহলে অয়ন আমার ভাই নয়?”

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করলেন।

“অয়ন তোর ভাই। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের অর্থ সবসময় একই হয় না।”

এই উত্তর শুনে অনন্যার সমস্ত সন্দেহ আরও গভীর হলো।

সে আর কিছু না বলে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই তার মনে পড়ল প্রতাপবাবুর কথা—মায়ের আলমারির গোপন খোপে ডায়েরি আছে।

মায়ের ঘরটি বহুদিন ধরে বন্ধ। সেখানে ঢুকলে এখনও মায়ের গন্ধ পাওয়া যায় বলে অনন্যা খুব একটা যায় না। আলমারিতে মায়ের শাড়ি, পুরোনো বই, কিছু চিঠি আর একটি কাঠের বাক্স রাখা।

সে আলমারির নিচের তাকে হাতড়াতে লাগল। শাড়ির স্তূপ সরাতেই পেছনের দিকে একটা অস্বাভাবিক ফাঁক চোখে পড়ল। কাঠের পাতটা চাপ দিতেই খুলে গেল একটি গোপন খোপ।

ভেতরে একটি ছোট ডায়েরি, কয়েকটি পুরোনো ছবি আর একটি হাসপাতালের কাগজ।

অনন্যা প্রথমে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েক পাতা সাধারণ লেখা—বাড়ির হিসাব, বাজারের তালিকা, অয়নের ছোটবেলার কথা। তারপর একটি পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল।

তারিখ: ১৮ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমার পৃথিবীটা ভেঙে গেল। অরিন্দম বাড়ি ফেরেনি। পুলিশ বলছে, সে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, আমার স্বামী পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়।

আমার ছেলে কোথায়, কেউ জানে না। সবাই বলছে, সে মারা গেছে। কিন্তু আমি তার মুখটাও দেখতে পাইনি।

সৌমেন বলেছে, সে আমাকে সাহায্য করবে। দেবব্রত মল্লিক নাকি হাসপাতালে ছিল। আমি জানি না, কাকে বিশ্বাস করব।

আজ রাতে জানলার বাইরে একজন দাঁড়িয়ে ছিল। তার মুখ অরিন্দমের মতো। কিন্তু সে আমাকে দেখে পালিয়ে গেল।

যদি সত্যিই অরিন্দম বেঁচে থাকে, তাহলে সে কেন আমার কাছে ফিরে আসে না?”

অনন্যার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে পরের পাতায় গেল।

তারিখ: ২১ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমি এমন একটা সত্যি জেনেছি, যা কাউকে বলতে পারব না। আমার ছেলেকে যে মৃত বলে জানানো হয়েছে, সে আসলে অন্য কোথাও রয়েছে। কিন্তু কোথায়, তা জানি না।

সৌমেন আমাকে বলেছে, ছেলেটিকে নিরাপদে রাখা হয়েছে। আমি তাকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু তার চোখে এমন একটা ভয় দেখেছি, যা আমার বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।

অরিন্দম যদি ফিরে আসে, আমি তাকে সব বলব।

কিন্তু যদি সে না ফেরে, তাহলে আমার মেয়েকে এই সত্যিটা জানতে হবে।”

অনন্যা তাড়াতাড়ি পরের পাতা উল্টে দিল।

তারিখ: ২৯ জুলাই, ২০০৬।

“আজ আমি ছেলেটিকে দেখেছি।

আমার সন্তান বেঁচে আছে।

কিন্তু তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না।

যে মানুষটি তাকে নিয়ে গেছে, সে বলেছে, ছেলেটিকে বাঁচাতে হলে আমাকে তাকে ভুলে যেতে হবে। আমি কীভাবে নিজের সন্তানকে ভুলে যাব?

আমি শুধু চাই, আমার দুই সন্তান একদিন একে অপরকে চিনতে পারুক।

তাদের দু’জনের কপালেই একই দাগ। অরিন্দম বলেছিল, এ দাগ আমাদের পরিবারের চিহ্ন হয়ে থাকবে।

কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি। কারণ যে মানুষটি আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, সে বলেছে, একদিন সে আমার মেয়েকেও নিয়ে যাবে।”

অনন্যা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।

একই দাগ!

ছবির ছেলেটির কপালেও সেই দাগ রয়েছে।

তার মানে ছবির ছেলেটিই কি তার হারিয়ে যাওয়া ভাই?

কিন্তু মায়ের ডায়েরিতে আরেকটি অদ্ভুত কথা লেখা—যে মানুষটি ছেলেকে নিয়ে গেছে, সে একদিন অনন্যাকেও নিয়ে যাবে।

কে সেই মানুষ?

দেবব্রত মল্লিক?

সৌমেন কাকু?

নাকি অন্য কেউ?

ডায়েরির শেষ পাতায় একটি ঠিকানা লেখা ছিল—

নদীর ধারের নীল বাড়ি, শ্মশানঘাটের পাশের রাস্তা, শান্তিপুর।

ঠিকানার নিচে মায়ের কাঁপা হাতে লেখা একটি বাক্য—

“যদি কখনও নিজের ভাইকে খুঁজতে যাও, মনে রাখিস, সে নিজের নাম ভুলে গেছে।”

অনন্যা ঘড়ির দিকে তাকাল।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। অচেনা নম্বরের বার্তায় বলা হয়েছিল বিকেল পাঁচটায় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে যেতে।

এখন তার হাতে সময় খুব কম।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

“দিদি?”

অয়নের গলা।

অনন্যা তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা বন্ধ করে বিছানার নিচে সরিয়ে রাখল।

“কী হয়েছে?”

অয়ন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য।

“তুই আজ কোথায় গিয়েছিলি?”

অনন্যা চুপ করে রইল।

“সৌমেন কাকু আমাকে সব বলেছেন,” অয়ন বলল। “তুই নাকি বাবার খোঁজ করতে গিয়েছিলি।”

“তুই বাবার কথা জানিস?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“না। কিন্তু একটা কথা তোকে বলার আছে।”

সে পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে একটি হাসপাতালের ঘর। বিছানায় শুয়ে এক মহিলা—অনন্যার মা। পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ, যার মুখ অরিন্দম সেনের মতো। তাঁর কোলে একটি নবজাতক।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা তারিখটি দেখে অনন্যা শিউরে উঠল।

১৭ জুলাই, ২০০৬।

সেই দিনই তার ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল।

“ছবিটা তুই কোথায় পেলি?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

অয়ন বলল, “সৌমেন কাকুর ঘরে। আমি একটা ফাইল খুঁজছিলাম। ছবিটা একটা পুরোনো বাক্সের ভেতরে ছিল। আর তার সঙ্গে এই কাগজটা।”

সে আরেকটি কাগজ বের করল।

সেটি ছিল একটি হাসপাতালের জন্মনিবন্ধনের নকল। শিশুটির নামের জায়গায় লেখা—

অয়ন সেন।

কিন্তু কাগজের নিচে আরেকটি নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। অনন্যা আলোয় কাগজটা ধরে দেখল। মুছে যাওয়া কালির নিচে অক্ষরগুলো এখনও অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

নামটি ছিল—

অভ্র সেন।

অয়ন ধীরে ধীরে বলল, “দিদি, আমি জানি না কেন আমার নাম বদলানো হয়েছিল। কিন্তু আজ একটা কথা বুঝেছি। আমার জন্মের গল্পটা আমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, সেটা সত্যি নয়।”

অনন্যা ভাইয়ের হাত ধরল।

“তুই আমার ভাই। তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”

অয়নের চোখে জল এসে গেল।

“কিন্তু আমি যদি সেই শিশু না হই, যাকে মা হারিয়েছিল?”

অনন্যা উত্তর খুঁজে পেল না।

অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদি, তুই কি সত্যিই আরেকজন ভাইকে খুঁজতে যাবি?”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “হ্যাঁ। কারণ মা চেয়েছিল, আমরা একদিন একে অপরকে চিনতে পারি।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“তাহলে আমিও যাব।”

“না, অয়ন। আমি একা যাব।”

“কেন?”

“কারণ যদি বিপদ হয়, অন্তত তুই নিরাপদে থাকবি।”

অয়ন হালকা হেসে বলল, “তুই ছোটবেলা থেকেই আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করিস। কিন্তু দিদি, এবার আমাকেও সত্যিটা জানতে দে।”

অনন্যা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, তাকে আর আটকানো যাবে না।

বিকেল চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

নদীর ধারের পুরোনো বাড়িটা শান্তিপুরের এক নির্জন প্রান্তে। একসময় নীল রঙে রাঙানো ছিল বলে লোকেরা তাকে নীল বাড়ি বলে ডাকে। এখন দেওয়ালের রং উঠে গেছে, জানলায় মরচে, উঠোনে আগাছা।

বাড়ির সামনে পৌঁছে অনন্যা দেখল, দরজার পাশে একটি সাদা ফুল রাখা।

ঠিক সেই ফুল, যা সে আগের রাতে ডাকঘরের সামনে দেখেছিল।

দরজাটা সামান্য খোলা।

অয়ন ফিসফিস করে বলল, “দিদি, ভেতরে কেউ আছে।”

অনন্যা দরজায় ধাক্কা দিল।

“কেউ আছেন?”

ভেতর থেকে একটা গলা এল—

“এসো, অনন্যা।”

দু’জনেই থমকে গেল।

লোকটি অনন্যার নাম জানে।

তারা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। ভেতরে একটা পুরোনো টেবিল, দুটি চেয়ার, দেওয়ালে কয়েকটি বিবর্ণ ছবি। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটি, যার ছবি অনন্যা ফোনে দেখেছিল।

কপালের বাঁ দিকে একই দাগ।

চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

ছেলেটি ঘুরে দাঁড়াল।

তার চোখ প্রথমে অনন্যার দিকে, তারপর অয়নের দিকে গেল।

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।

শেষ পর্যন্ত ছেলেটিই নীরবতা ভাঙল।

“তুমি অনন্যা?”

“হ্যাঁ।”

“আর তুমি অয়ন?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

ছেলেটি মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দের চেয়ে যন্ত্রণা বেশি ছিল।

“তোমাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখার জন্য আমি কুড়ি বছর অপেক্ষা করেছি।”

অনন্যার চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কি আমার ভাই?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার নাম এখন অভ্র। কিন্তু এই নামটাও আমার নিজের কি না, তা আমি জানি না।”

অয়ন এগিয়ে এল।

“তোমাকে ছোটবেলায় কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?”

অভ্র জানলার বাইরে তাকাল।

“একটা আশ্রমে। আমাকে বলা হয়েছিল, আমার বাবা-মা মারা গিয়েছেন। আমি সেখানেই বড় হয়েছি। আমার কাছে শুধু একটা পুরোনো ছবি ছিল—একজন মহিলার কোলে একটা ছোট মেয়ে। সেই ছবির পেছনে লেখা ছিল, ‘অনু আর অভ্র—দুই আলো।’”

অনন্যা কেঁদে ফেলল।

“ওটা মা লিখেছিল!”

অভ্র চোখ বন্ধ করল।

“আমি জানতাম, আমার একটা বোন আছে। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, সে অনেক আগেই মারা গেছে।”

“কে বলেছিল?”

অভ্র উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির বাইরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

একটা তালা লাগানোর শব্দ হলো।

অয়ন ছুটে দরজার দিকে গেল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।

তারপর ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন।

সৌমেন কাকু।

কিন্তু তাঁর হাতে একটা পিস্তল।

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“সৌমেন কাকু?”

সৌমেন কাকু দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে এলেন।

“আমি দুঃখিত, অনু। কিন্তু তোমাদের আর সত্যি জানার সুযোগ দেওয়া যায় না।”

অয়ন চিৎকার করে উঠল, “আপনি কী করছেন?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“তুইও সব জেনে গেছিস। তাই তোকে আর বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।”

অনন্যা ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

“আপনি আমাদের এতদিন আগলে রেখেছেন! আপনি আমাদের পরিবারের মানুষ!”

সৌমেন কাকুর চোখে এক মুহূর্তের জন্য জল দেখা গেল।

“হ্যাঁ। আমি তোমাদের ভালোবাসতাম। কিন্তু ভালোবাসা সব অপরাধ মুছে দিতে পারে না।”

“আপনি কী অপরাধ করেছেন?”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা নামিয়ে একটা চেয়ারে বসলেন।

“তোমার জন্মের আগেই এই গল্প শুরু হয়েছিল। তোমার বাবা অরিন্দম সেন এমন একটি হিসাবের খাতা পেয়েছিল, যেখানে কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের অপরাধের প্রমাণ ছিল। সেই খাতায় শিশু পাচারের একটি চক্রের নামও ছিল। তারা নবজাতকদের হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য পরিবারের কাছে বিক্রি করত।”

অনন্যার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আমার ভাইকেও?”

“হ্যাঁ। তোমার ভাই ছিল সেই চক্রের প্রথম শিকারদের একজন। কিন্তু তোমার বাবা তাকে খুঁজে পেয়েছিল। সে ভেবেছিল, শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তারপরই সবকিছু বদলে গেল।”

“তুমি তাদের সাহায্য করেছিলে?”

সৌমেন কাকু চোখ নামিয়ে বললেন, “প্রথমে করেছিলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার নিজের পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমি হাসপাতালের নথি বদলাতে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু পরে যখন বুঝলাম, তারা শিশুটিকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেবে, তখন আমি তাকে নিয়ে পালাই।”

অভ্র বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

“তাহলে আপনিই আমাকে আশ্রমে রেখে এসেছিলেন?”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। তোমাকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তোমাকে ফিরিয়ে আনার সাহস আমার কোনও দিন হয়নি।”

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমার পরিচয় কী?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“তুইও এই চক্রের শিকার। তোর জন্মের আসল পরিচয় নিয়ে আমি এখনও নিশ্চিত নই। তোর নাম বদলানো হয়েছিল, কাগজপত্র বদলানো হয়েছিল। কিন্তু তুই এই বাড়িতে এসেছিলি যখন তোর বয়স মাত্র তিন। তোমার মা-বাবা তোকে নিজেদের সন্তান হিসেবেই বড় করেছেন।”

“তাহলে আমার আসল বাবা-মা কে?”

সৌমেন কাকু চুপ করে গেলেন।

অনন্যা বলল, “আর আমার বাবা?”

“অরিন্দম সব জানত। সে দেবব্রত মল্লিকের সঙ্গে প্রমাণ নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই রাতে ডাকঘরে একজন মারা যায়। তার দেহের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়। তারপর থেকে অরিন্দমের নামে খুনের অভিযোগ চাপানো হয়।”

“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে বাবা বেঁচে আছে!”

“আমি বলেছিলাম, অরিন্দমকে হয়তো হত্যা করা হয়নি। কারণ আমি তার মৃতদেহ কখনও দেখিনি।”

অভ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“তাহলে আপনি আমাদের এখানে ডেকেছেন কেন?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“কারণ তোমাদের বাবা আমাকে একটা কাজ দিয়ে গিয়েছিল। সে বলেছিল, একদিন যদি তোমরা তিনজন একসঙ্গে হও, তবে তোমাদের কাছে শেষ নীল খামটা পৌঁছে দিতে।”

তিনি পকেট থেকে একটি নীল খাম বের করলেন।

খামের ওপর লেখা—

“অনন্যা, অয়ন ও অভ্রের জন্য।”

অনন্যা কাঁপা হাতে খামটা নিতে গেল। কিন্তু সৌমেন কাকু হাত সরিয়ে নিলেন।

“আগে একটা কথা বলো। তোমরা কি সত্যিটা জানার পরও একে অপরকে ভাইবোন বলে মেনে নেবে? যদি জানতে পারো, তোমাদের মধ্যে একজনের জন্মের পেছনে এমন একটা অপরাধ লুকিয়ে আছে, যা তোমাদের পুরো পরিবারকে ধ্বংস করেছে?”

অনন্যা অভ্রের দিকে তাকাল। তারপর অয়নের দিকে।

“আমরা কেউ এই অপরাধ করিনি। আমাদের জন্ম আমাদের হাতে ছিল না। আমরা একে অপরকে ছেড়ে যাব না।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

অভ্রের চোখে জল এসে গেল।

সৌমেন কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে খামটা টেবিলে রাখলেন।

“তাহলে পড়ো।”

অনন্যা খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র একটি পাতার চিঠি।

লেখাটি তার মায়ের।

“আমার তিন সন্তান,

যদি তোমরা এই চিঠি একসঙ্গে পড়ো, তাহলে বুঝব, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছেটা পূরণ হয়েছে।

অনু, তুমি আমার প্রথম আলো।

অয়ন, তুমি আমার ঘরে এসেছিলে যখন আমার পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল। তোমাকে আমি জন্ম দিইনি, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম নিজের সন্তান হিসেবেই।

অভ্র, তোমাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তোমার মুখের দিকে শেষবার তাকানোর সুযোগও আমাকে দেওয়া হয়নি।

আমি জানি না, তোমাদের জন্মের রহস্য কী। আমি শুধু জানি, তোমরা তিনজন আমার সন্তান।

কিন্তু তোমাদের বাবার একটা সত্যি আমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছি। সে শুধু তোমাদের বাঁচাতে পালিয়ে যায়নি। সে নিজের অপরাধের প্রমাণও লুকিয়ে রেখেছিল।

সেই প্রমাণ রয়েছে এমন একটি জায়গায়, যেখানে তোমরা কেউ কখনও খোঁজ করোনি।

তোমাদের বাড়ির পুরোনো পুকুরঘাটের নিচে।

সেখানে একটি লোহার বাক্স আছে। বাক্সের চাবি রয়েছে তোমাদের বাবার ঘড়ির ভেতরে।

যদি সত্যিই জানতে চাও, কে তোমাদের পরিবারকে ভেঙে দিয়েছিল, তবে সেই বাক্স খুঁজে বের করো।

কিন্তু সাবধান। বাক্স খোলার পর তোমরা বুঝতে পারবে, তোমাদের মধ্যে একজন এমন মানুষের সন্তান, যার নাম শুনলে তোমরা নিজেরাই নিজেদের ঘৃণা করতে শুরু করবে।

তবুও মনে রেখো—অপরাধ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না। অপরাধ করে মানুষ নিজেই।

তোমাদের মা।”

চিঠি পড়া শেষ হলে ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

অনন্যা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“বাবার ঘড়ি কোথায়?”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা টেবিলে রাখলেন। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ঘড়ি বের করলেন।

ঘড়ির কাচ ভাঙা। কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা পাঁচে।

অনন্যা চিনতে পারল।

এটাই সেই ঘড়ি, যা ডাকঘরে অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটির হাতে ছিল।

সৌমেন কাকু ঘড়িটা তার হাতে দিয়ে বললেন, “ঘড়ির পেছনের ঢাকনাটা খুলে দেখো।”

অনন্যা নখ দিয়ে ঢাকনাটা খোলার চেষ্টা করল। প্রথমে খুলল না। তারপর অয়ন একটা ছোট ছুরি দিয়ে আলতো করে চাপ দিতেই ঢাকনা খুলে গেল।

ভেতরে একটি ক্ষুদ্র চাবি।

আর চাবির নিচে ভাঁজ করা কাগজের টুকরো।

অনন্যা কাগজটা খুলে পড়ল।

মাত্র তিনটি শব্দ—

“অয়নকে বিশ্বাস কোরো না।”

অনন্যার চোখ ধীরে ধীরে ভাইয়ের দিকে উঠল।

অয়ন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে।

“দিদি, আমি জানি না এটা কে লিখেছে!”

অভ্র পিছিয়ে গেল।

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করে বললেন, “এবার তোমাদের সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”

“কী সত্যি?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

সৌমেন কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“অয়ন, তোর আসল নাম শুধু অয়ন নয়। তুই সেই শিশুটির পরিচয় নিয়ে বড় হয়েছিস, যাকে কুড়ি বছর আগে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু তুই অরিন্দম সেনের সন্তান কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না।”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“আমি তো কিছুই জানি না!”

“আমি জানি। কিন্তু একটা কথা জানি—তোর জন্মের আসল নথিতে বাবার নাম হিসেবে লেখা ছিল দেবব্রত মল্লিক।”

ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।

অনন্যা ধীরে ধীরে অয়নের দিকে তাকাল।

অয়নের মুখ ফ্যাকাশে।

“না… এটা মিথ্যে!”

অভ্র এক পা পিছিয়ে গেল।

সৌমেন কাকু বললেন, “আমি চাইনি তোমরা এভাবে জানো। কিন্তু এখন আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই।”

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে কি আমি…”

“তুই অপরাধীর সন্তান হতে পারিস,” সৌমেন কাকু বললেন। “কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুই অপরাধী।”

অনন্যা ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল। অয়ন তার হাত সরিয়ে নিল।

“আমাকে ছুঁস না, দিদি।”

“অয়ন!”

“যদি আমার বাবা সেই মানুষ হয়, যে আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছে, তাহলে আমি কীভাবে তোমাদের সামনে দাঁড়াব?”

অনন্যার চোখে জল এসে গেল।

“তোর জন্মের জন্য তুই দায়ী নোস!”

অয়ন মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।

ঠিক সেই সময় বাড়ির বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

সৌমেন কাকু জানলার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন।

“ওরা এসে গেছে!”

“কারা?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

“যারা এত বছর ধরে এই রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। তারা জানে, তোমরা সত্যির কাছাকাছি পৌঁছে গেছ।”

দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল।

“পুলিশ! দরজা খুলুন!”

সৌমেন কাকু পিস্তলটা তুলে নিলেন। কিন্তু এবার তিনি সেটি অনন্যার দিকে তাক করলেন না।

বরং দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, “আমি আত্মসমর্পণ করছি!”

অনন্যা হতভম্ব হয়ে গেল।

“আপনি কী করছেন?”

সৌমেন কাকু ঘুরে তাকালেন।

“আমি অনেক বছর ধরে পালিয়ে বেড়িয়েছি, অনু। আজ আর পালাব না। আমি যে অপরাধ করেছি, তার শাস্তি আমার প্রাপ্য। কিন্তু তোমাদের সত্যিটা জানার অধিকার আছে।”

তিনি দরজা খুলে দিলেন।

পুলিশের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন প্রতাপ মুখোপাধ্যায়।

তাঁর চোখ সরাসরি সৌমেন কাকুর দিকে।

“অবশেষে আপনি স্বীকার করলেন।”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। আমি সব বলব।”

প্রতাপবাবু বললেন, “তাহলে আগে বলুন, অরিন্দম সেন কোথায়?”

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন—

“অরিন্দম মারা যায়নি।”

অনন্যার বুক ধক করে উঠল।

“তাহলে বাবা কোথায়?”

সৌমেন কাকু তার দিকে তাকালেন।

“সে তোমাদের কাছেই ছিল। তোমরা তাকে চিনতে পারোনি।”

“কী বলতে চাইছেন?”

সৌমেন কাকু উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে থেকে একজন পুলিশকর্মী ছুটে এলেন।

“স্যার! একটা খবর আছে। ডাকঘরের যে মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, তার পরিচয় জানা গেছে।”

প্রতাপবাবু দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন, “কার?”

পুলিশকর্মী বললেন—

“দেবব্রত মল্লিকের।”

ঘরের মধ্যে কেউ কথা বলল না।

প্রতাপবাবু ধীরে ধীরে অনন্যার দিকে তাকালেন।

“তাহলে ডাকঘরে যে মানুষটিকে তোমরা অরিন্দম ভেবেছিলে, সে দেবব্রত মল্লিক ছিল।”

অনন্যা ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু তার মুখ তো বাবার মতো ছিল!”

প্রতাপবাবু বললেন, “কারণ অরিন্দম আর দেবব্রত দেখতে প্রায় একই রকম ছিল। কিন্তু আসল অরিন্দম কোথায়, সেটা এখনও অজানা।”

সৌমেন কাকু মাথা নিচু করে বললেন, “আমি জানি সে কোথায়।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায়?” অনন্যা প্রায় চিৎকার করে উঠল।

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে বললেন—

“তোমাদের বাড়ির পুকুরঘাটের কাছে।”

অনন্যার মনে পড়ল, মায়ের চিঠিতে লেখা ছিল পুকুরঘাটের নিচে লোহার বাক্স আছে।

“তাহলে সেখানে গেলেই বাবাকে পাব?”

সৌমেন কাকু মাথা নাড়লেন।

“না। সেখানে পাবে তোমার বাবার শেষ চিঠি। আর সেই চিঠিতে লেখা আছে, সে কেন নিজের পরিচয় বদলে তোমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।”

“কিন্তু তুমি তো বললে বাবা বেঁচে আছে!”

সৌমেন কাকু চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি বলেছি, সে মারা যায়নি। কিন্তু সে এখন কোথায় আছে, সেটা আমি জানি না।”

অনন্যা আর অপেক্ষা করতে পারল না।

সে অয়ন আর অভ্রকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। প্রতাপবাবু কয়েকজন পুলিশকর্মীকে সঙ্গে পাঠালেন।

রাত নামার আগেই তারা পৌঁছে গেল নিজেদের বাড়িতে।

পুকুরঘাটে শ্যাওলা জমেছে। ছোটবেলায় অনন্যা এখানে বাবার সঙ্গে বসে গল্প শুনত। অয়ন এখানে সাঁতার শিখেছিল। মা এখানে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাতেন।

ঘাটের শেষ সিঁড়ির নিচে হাত ঢোকাতেই অনন্যার আঙুলে ধাতব কিছু ঠেকল।

একটা ছোট লোহার বাক্স।

চাবিটা তালায় ঢুকতেই খুলে গেল।

ভেতরে একটি ডায়েরি, কয়েকটি ছবি, একটি পুরোনো পরিচয়পত্র এবং একটি চিঠি।

অনন্যা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

“আমার অনু,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব, আমি আর তোদের কাছে ফিরে যেতে পারিনি।

আমি জানি, তুই আমাকে খুঁজেছিস। জানি, তোর মা আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমি ফিরে আসতে পারিনি, কারণ আমি যে সত্যিটা জেনেছিলাম, সেটা শুধু আমার জীবন নয়, তোদের জীবনও শেষ করে দিতে পারত।

তোর ভাইকে আমি হারাইনি। তাকে আমি নিজের হাতে অন্য এক মানুষের কাছে তুলে দিয়েছিলাম। কারণ সেই মানুষটি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে আমার ছেলেকে বাঁচাবে।

কিন্তু আমি জানতাম না, সেই মানুষটির নিজেরও একটি গোপন উদ্দেশ্য ছিল।

অনু, তুই যদি সত্যিই জানতে চাস, তোর বাবা কে, তাহলে প্রথমে জানতে হবে, কে তোকে জন্ম দিয়েছিল।

কারণ তুই আমার মেয়ে হলেও, তোর জন্মের গল্পটা আমি তোকে কখনও বলিনি।

তোর জন্মের রাতে হাসপাতালের যে নার্স তোকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল, তার নাম ছিল মাধবী দত্ত।

সে এখনও বেঁচে আছে।

তাকে খুঁজে বের করিস।

সে তোকে এমন একটা সত্যি বলবে, যা জানার পর তুই বুঝতে পারবি, কেন আমি তোকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়েছিলাম।

আর একটা কথা—যে মানুষটাকে তুই এতদিন অয়ন বলে চিনেছিস, সে হয়তো তোর ভাই। কিন্তু যে মানুষটি তোর পাশে দাঁড়িয়ে সত্যি খুঁজছে, সেই অভ্রের পরিচয়ও এখনও সম্পূর্ণ জানা যায়নি।

তিনটি নাম, তিনটি জন্ম, আর একটি পরিবার।

শেষ সত্যিটা জানতে হলে মাধবীকে খুঁজে বের করিস।

— তোর বাবা, অরিন্দম সেন।”

চিঠি পড়া শেষ করে অনন্যা মাথা তুলে তাকাল।

অয়ন আর অভ্র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। দু’জনের মুখেই অসংখ্য প্রশ্ন।

অনন্যা বুঝতে পারল, তাদের গল্প এখনও শেষ হয়নি।

বরং আসল রহস্যের দরজা এবার খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাক্সের তলায় রাখা পরিচয়পত্রটি তার চোখে পড়ল।

পরিচয়পত্রে ছবি তার নিজের।

নাম লেখা—

মাধবী দত্ত।

অনন্যার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।

সে ফিসফিস করে বলল, “এটা কী করে সম্ভব?”

অয়ন কাগজটা তুলে নিল।

“দিদি, এই ছবিটা তো তোর!”

অভ্র কাগজের পেছনটা উল্টে দেখল। সেখানে হাতে লেখা একটি বাক্য—

“অনন্যা সেনের আসল জন্মপরিচয়: মাধবী দত্তের কন্যা।”

অনন্যা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়ল।

তার বাবা কে, সে জানে না।

তার ভাই কে, সে জানে না।

এমনকি যে মাকে সে নিজের মা বলে জেনেছে, তাঁর সঙ্গে তার জন্মের সম্পর্কও হয়তো অন্যরকম।

কুড়ি বছরের জীবনটা কি তবে এক বিশাল মিথ্যে?

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে ফোন বেজে উঠল।

অনন্যা দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর—

“অনন্যা? আমি মাধবী দত্ত বলছি।”

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“আপনি… আপনি আমাকে চেনেন?”

বৃদ্ধা কেঁদে ফেললেন।

“চিনি, মা। তোর জন্মের সময় আমি তোকে নিজের হাতে কোলে নিয়েছিলাম।”

“তাহলে আমার আসল মা কে?”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর বৃদ্ধা বললেন—

“তোর আসল মা সেই নারী, যাকে তুই কুড়ি বছর ধরে মৃত বলে জানিস।”

অনন্যার শরীর অবশ হয়ে গেল।

“কী বলছেন?”

মাধবী দত্ত কাঁপা গলায় বললেন—

“তোর মা মারা যায়নি, অনন্যা। সে বেঁচে আছে। আর আজ এত বছর পর সে নিজেই তোকে খুঁজছে।”

ফোনের ওপাশে একটা দরজা খোলার শব্দ হলো।

তারপর আরেকটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।

সেই কণ্ঠস্বর অনন্যার কাছে অচেনা নয়।

কারণ সেই কণ্ঠস্বরই একদিন তাকে ঘুম পাড়াত।

“অনু… মা…”

অনন্যার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

সে কাঁপতে কাঁপতে বলল—

“মা?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“হ্যাঁ, মা। আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তুই যদি আমাকে খুঁজতে আসিস, তাহলে একা আসবি না। কারণ তোর বাবাকে যারা মেরেছিল, তারা এবার তোকে মারতে আসবে।”

ফোন কেটে গেল।

অনন্যা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে অয়ন ও অভ্রের দিকে তাকাল।

তিনজনের জীবন জড়িয়ে গেছে এমন এক রহস্যে, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

কিন্তু অনন্যা এবার আর পিছিয়ে যাবে না।

সে তার বাবাকে খুঁজবে।

তার মাকে খুঁজবে।

তার দুই ভাইয়ের সত্যিকারের পরিচয় জানবে।

আর যে মানুষগুলো এত বছর ধরে তাদের পরিবারকে মিথ্যের আড়ালে আটকে রেখেছে, তাদের মুখোশ খুলবেই।

কারণ এবার আর কোনও নীল খাম তার জীবন নির্ধারণ করবে না।

এবার সে নিজেই সত্যির দরজা খুলবে।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের শেষ চিঠি (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের পরিচয়)।

অন্ধকারের মধ্যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও যেন অনন্যার কাছে অপরিচিত লাগছিল।

এক মুহূর্ত আগে যে মানুষটিকে সে নিজের বাবা ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই মানুষটি এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে। বাইরে সৌমেন কাকু দরজা ভাঙার চেষ্টা করছেন। আর তার পেছনে, অন্ধকারের মধ্যে, কেউ একজন নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলছে।

অনন্যা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

“কে?”

কোনও উত্তর এল না।

মোবাইলের টর্চ জ্বালানোর চেষ্টা করল সে। প্রথমবার আলো জ্বলল না। দ্বিতীয়বারও না। তৃতীয়বার আলো জ্বলতেই ঘরের কোণটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

সেখানে কেউ নেই।

শুধু মেঝের ওপর পড়ে আছে একটি নীল খাম।

অনন্যা ঝুঁকে খামটি তুলল। খামের ওপর তার নাম। হাতের লেখাটি প্রথম চিঠির মতোই, কিন্তু এবার অক্ষরগুলো আরও কাঁপা, যেন লেখার সময় লেখকের হাত স্থির ছিল না।

সে খাম খুলতেই একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।

তাতে লেখা—

“যে মানুষটি তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোর বাবার স্মৃতি জানে। তোর বাবার অভ্যাস জানে। এমনকি তোর শৈশবের ঘটনাও জানে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে অরিন্দম সেন।

সত্যি জানতে চাইলে তাকে তিনটি প্রশ্ন করিস।

প্রথম প্রশ্ন: তোর জন্মের দিন তোর মা কী বলেছিল?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: তোর বাবা শেষবার বাড়ি ছাড়ার আগে কোন গানটি গেয়েছিল?

তৃতীয় প্রশ্ন: যে শিশুটিকে তোর বাবা একদিন নিজের হাতে কবর দিয়েছিল, তার নাম কী?”

অনন্যার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

প্রথম দুটি প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি তার মাথার ভেতর বিস্ফোরণের মতো আঘাত করল।

কোন শিশুকে কবর দিয়েছিলেন তার বাবা?

তাদের তো মাত্র দু’জন ভাইবোন—অনন্যা আর অয়ন।

তবে কি তাদের আরও কোনও ভাই বা বোন ছিল?

নাকি এই চিঠি তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য লেখা?

সে দ্রুত সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে তাকাল।

“তুমি আমার বাবা হলে, আমার তিনটে প্রশ্নের উত্তর দাও।”

লোকটি নিশ্চুপ।

“আমার জন্মের দিন মা কী বলেছিল?”

অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটি চোখ বন্ধ করলেন।

“তোর মা বলেছিল, তুই আমাদের জীবনে আলো হয়ে এসেছিস।”

অনন্যা স্থির হয়ে গেল।

এ কথাটা সত্যি। ছোটবেলায় মা তাকে বহুবার বলেছিলেন।

“দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দাও। বাবা শেষবার বাড়ি ছাড়ার আগে কোন গান গেয়েছিল?”

লোকটি এবার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “তোর মা যে গানটা খুব ভালোবাসত—‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।’”

অনন্যার চোখে জল এসে গেল।

সেই গানটাই তার বাবা প্রায়ই গাইতেন।

কিন্তু নীল খামের শেষ প্রশ্নটির উত্তর?

অনন্যা ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল, “যে শিশুটিকে বাবা নিজের হাতে কবর দিয়েছিল, তার নাম কী?”

এই প্রশ্ন শুনে লোকটির মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি বদলে গেল।

তিনি পিছিয়ে গেলেন।

“কে তোকে এসব বলেছে?”

“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও!”

“অনু, এসব কথা বিশ্বাস করিস না। কেউ তোকে ভুল পথে চালিত করছে।”

“তুমি যদি সত্যিই আমার বাবা হও, তবে উত্তর দিতে পারছ না কেন?”

লোকটি এবার তার দিকে এগিয়ে এলেন।

“কারণ কিছু স্মৃতি মানুষকে বাঁচতে দেয় না।”

“আর কিছু মিথ্যে মানুষকে সারাজীবন অন্ধকারে রাখে!”

অনন্যার নিজের গলার দৃঢ়তা শুনে সে নিজেই অবাক হয়ে গেল।

ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে থেকে সৌমেন কাকুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“অনু! তুই যদি আমার কথা শুনতে পাস, তাহলে মনে রাখিস—তোর মায়ের আলমারির গোপন খোপে একটা ডায়েরি আছে। তোর বাবা নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ডায়েরি। সেখানে সব লেখা আছে।”

তারপরই একটা বিকট শব্দ হলো।

দরজার পুরোনো কাঠ ভেঙে পড়ল।

অনন্যা চমকে উঠল।

কিন্তু দরজার ওপারে সৌমেন কাকু দাঁড়িয়ে ছিলেন না।

দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ পোশাক পরা একজন বৃদ্ধ। তাঁর চুল সাদা, চোখের নিচে গভীর কালি। হাতে একটি রিভলভার।

তিনি ঘরে ঢুকেই অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটির দিকে তাকালেন।

“শেষ পর্যন্ত ফিরে এলে, অরিন্দম?”

লোকটি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

বৃদ্ধ পুলিশ অফিসার ঠান্ডা গলায় বললেন, “কুড়ি বছর ধরে তোমাকে খুঁজেছি। ভেবেছিলাম, তুমি দেশ ছেড়ে পালিয়েছ। কিন্তু তুমি এখানেই ছিলে।”

অনন্যা হতভম্ব হয়ে বলল, “আপনি কে?”

“আমার নাম প্রতাপ মুখোপাধ্যায়। আমি তখন এই জেলার পুলিশ বিভাগের তদন্তকারী অফিসার ছিলাম। তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার মামলাটা আমার হাতেই ছিল।”

“তাহলে আপনি জানেন, আমার বাবা কোথায়?”

প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তোমার বাবা কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তোমাকে জানতে হবে, তোমার বাবা কে ছিলেন।”

তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র বের করে অনন্যার হাতে দিলেন।

পরিচয়পত্রে ছবি ছিল অরিন্দম সেনের। কিন্তু ছবির নিচে নাম লেখা—

দেবব্রত মল্লিক।

অনন্যার মাথা ঘুরে উঠল।

“এটা কী করে সম্ভব?”

প্রতাপবাবু বললেন, “কুড়ি বছর আগে অরিন্দম সেন আর দেবব্রত মল্লিক একই মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দু’জনের মুখের মিল ছিল অবিশ্বাস্য। একজন ছিলেন ডাকঘরের হিসাবরক্ষক, অন্যজন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। সেই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছিল।”

“কিন্তু এই লোকটি তো আমার বাবার মতো দেখতে!”

“এই কারণেই মামলাটা এত জটিল হয়েছিল। সেদিন রাতে ডাকঘরে একজন মারা গিয়েছিলেন। মৃতদেহের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কাগজপত্রে নাম বদলানো হয়। সাক্ষীদের মুখ বন্ধ করা হয়। আর শেষ পর্যন্ত অরিন্দম সেনকে খুনি ঘোষণা করা হয়।”

অনন্যা লোকটির দিকে তাকাল।

“তুমি কে? তুমি কি দেবব্রত মল্লিক?”

লোকটি এবার ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

“আমি অরিন্দম।”

প্রতাপবাবু হেসে উঠলেন। সে হাসিতে আনন্দ ছিল না।

“এখনও একই মিথ্যে বলছ! তুমি যদি অরিন্দম হও, তাহলে সেই শিশুটির নাম বলো, যাকে নিজের হাতে কবর দিয়েছিলে।”

লোকটির চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

অনন্যা আবার সেই প্রশ্নের কথা মনে করল।

একটি শিশুকে কবর দিয়েছিলেন তার বাবা।

কে ছিল সে?

কেন তার অস্তিত্বের কথা পরিবারের কেউ জানে না?

প্রতাপবাবু এবার অনন্যার দিকে ফিরলেন।

“তোমার মা মৃত্যুর আগে আমার কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, একদিন নীল খাম তোমার কাছে পৌঁছবে। তখন তোমাকে সত্যিটা জানতে দিতে হবে।”

“আপনি এতদিন অপেক্ষা করলেন কেন?”

“কারণ তোমার মা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছিলেন, তুমি নিজে সত্যির সন্ধান না করা পর্যন্ত আমি কিছু বলব না।”

“কিন্তু মা তো মারা গিয়েছেন!”

“হ্যাঁ। আর তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে তিনি যে কথাটা আমাকে বলেছিলেন, সেটা আজও ভুলতে পারিনি।”

প্রতাপবাবু থামলেন।

“তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মেয়েকে বাঁচাবেন। ও যেন কখনও সেই মানুষের মুখোমুখি না হয়, যে নিজের অপরাধ ঢাকতে একটি শিশুর পরিচয় মুছে দিয়েছিল।’”

অনন্যা ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“কোন শিশুর পরিচয়?”

প্রতাপবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটি চিৎকার করে উঠলেন।

“চুপ করুন! আপনি জানেন না, আপনি কী বলছেন!”

প্রতাপবাবু রিভলভারটা তার দিকে তাক করলেন।

“আর একটা শব্দ নয়!”

লোকটি পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে দাঁড়ালেন।

“অনু, আমার কথা শোন। এই মানুষগুলো সবাই মিথ্যে বলছে। আমি তোর বাবা। তোর মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল, আমি যেন তোকে একবার দেখতে পাই।”

“তাহলে এতদিন আসোনি কেন?”

লোকটি চুপ।

“মা যখন অসুস্থ ছিল, তখন আসোনি কেন? আমি যখন বাবার ছবি বুকে নিয়ে কেঁদেছি, তখন আসোনি কেন? অয়ন যখন স্কুলে বাবার নাম বলতে গিয়ে চুপ করে যেত, তখন আসোনি কেন?”

লোকটির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি পারিনি, অনু।”

“কেন?”

“কারণ আমি যদি ফিরে আসতাম, তোরাও বাঁচতিস না।”

অনন্যা স্তব্ধ।

“কে তোমাদের মারতে চাইত?”

লোকটি উত্তর দিলেন না।

প্রতাপবাবু এবার বললেন, “এখন আর সময় নেই। আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে। যারা এত বছর ধরে এই সত্যি চাপা দিয়ে রেখেছে, তারা জানে তুমি আজ রাতে এখানে এসেছ।”

“কারা তারা?”

“দেবব্রত মল্লিক একা ছিল না। তার সঙ্গে আরও দু’জন ছিল। একজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন নিখোঁজ। আর তৃতীয়জন এখনও জীবিত।”

“কে?”

প্রতাপবাবু সরাসরি উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু বললেন, “তোমার বাড়ির সবচেয়ে কাছের মানুষ।”

অনন্যার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

সৌমেন কাকু?

অয়ন?

নাকি অন্য কেউ?

ঠিক তখনই বাইরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল। একসঙ্গে একাধিক গাড়ি এসে থামল ডাকঘরের সামনে।

প্রতাপবাবু জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন।

“ওরা এসে গেছে।”

“কারা?”

“যাদের হাতে এই মামলার আসল নথি আছে। তারা চায় না তুমি সেই নথি খুঁজে পাও।”

তিনি অনন্যার হাত ধরে পেছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু অরিন্দমের মতো দেখতে লোকটি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন।

“তুমি যাবে না?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

লোকটি মাথা নাড়লেন।

“আমার যাওয়ার পথ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।”

“কিন্তু তুমি তো আমার বাবা!”

তিনি মৃদু হেসে বললেন, “বাবা হওয়া শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, অনু। কখনও কখনও সত্যিটা জেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় সম্পর্ক।”

অনন্যা তাঁর হাত ধরতে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে গুলির শব্দ হলো।

প্রতাপবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “নিচু হও!”

অনন্যা মেঝেতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জানলার কাচ ভেঙে টুকরো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের ভেতর।

পরের মুহূর্তেই দরজা দিয়ে তিনজন কালো পোশাক পরা লোক ঢুকে পড়ল।

তাদের মধ্যে একজনের হাতে পিস্তল।

“মেয়েটাকে নিয়ে চলো!”

প্রতাপবাবু পাল্টা গুলি চালালেন। ঘরের মধ্যে ধোঁয়া আর চিৎকারে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

অনন্যা হামাগুড়ি দিয়ে পেছনের দরজার দিকে এগোল। কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।

অরিন্দমের মতো দেখতে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন ঘরের মাঝখানে। তাঁর সামনে পিস্তল তাক করা।

“এত বছর পরও তুমি বেঁচে আছ, দেবব্রত?” একজন আক্রমণকারী বলল।

লোকটি উত্তর দিলেন, “আমি দেবব্রত নই।”

“তাহলে তোমার নাম কী?”

লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন—

“আমি সেই মানুষ, যার পরিচয় তোমরা কুড়ি বছর আগে চুরি করেছিলে।”

তারপর গুলির শব্দ।

অনন্যা চিৎকার করে উঠল।

লোকটি মেঝেতে পড়ে গেলেন।

প্রতাপবাবু অনন্যাকে টেনে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে আনলেন। দু’জনে একটা সরু গলির মধ্যে ছুটতে লাগলেন। পিছনে পায়ের শব্দ, চিৎকার, আরও কয়েকটি গুলির আওয়াজ।

শেষ পর্যন্ত তাঁরা একটা পুরোনো বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন।

অনন্যা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ওঁকে বাঁচাতে হবে! উনি আমার বাবা!”

প্রতাপবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।

“এখন ফিরে গেলে তুমিও মরবে।”

“কিন্তু আমি ওঁকে এভাবে ফেলে যেতে পারি না!”

“অনু, তুমি এখনও বুঝতে পারছ না। ওঁকে গুলি করা হয়েছে, কিন্তু ওঁর পরিচয়টাই আসল রহস্য। তুমি যদি এখনই জানতে চাও তোমার বাবা কে, তাহলে তোমাকে তোমার মায়ের ডায়েরি খুঁজে বের করতে হবে।”

“কোথায় পাব?”

“তোমাদের বাড়িতে। আলমারির গোপন খোপে।”

অনন্যা হঠাৎ থেমে গেল।

“সৌমেন কাকু কেন আমাকে ডায়েরির কথা বললেন? উনি কি আমাদের সাহায্য করছেন?”

প্রতাপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সৌমেন তোমাদের সাহায্য করেছে, কারণ সে অপরাধবোধে ভুগছে। কিন্তু সে পুরো সত্যি বলেনি। সে জানে, তোমার বাবা নিখোঁজ হওয়ার রাতে কী ঘটেছিল।”

“তাহলে ওঁকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়!”

“না। কারণ তোমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার রাতে সৌমেন সেখানে ছিল না।”

অনন্যা হতবাক হয়ে তাকাল।

“তাহলে সে কী করে জানে?”

প্রতাপবাবু জানলার বাইরে তাকালেন।

“কারণ সেই রাতে যে শিশুটিকে কবর দেওয়া হয়েছিল, সেই শিশুটিকে সৌমেন নিজের হাতে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।”

অনন্যার মনে হলো, চারপাশের দেওয়ালগুলো ঘুরছে।

“কোন শিশু?”

প্রতাপবাবু এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তোমার জন্মের আগে তোমার বাবা-মায়ের একটি ছেলে হয়েছিল। শিশুটি জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায় বলে সবাইকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তার মৃতদেহ কখনও তোমার মা দেখেননি। আর সেই শিশুটির নাম লেখা ছিল এমন একটি জন্মনিবন্ধনে, যেখানে বাবার নাম অরিন্দম সেন নয়।”

অনন্যার মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।

“তাহলে আমার কি আরেকজন ভাই ছিল?”

“হ্যাঁ।”

“সে কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?”

প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন—

“না। অন্তত আমরা যে নথি পেয়েছি, তাতে তার মৃত্যুর কোনও প্রমাণ নেই।”

অনন্যার চোখে জল জমল।

“সে কোথায়?”

প্রতাপবাবু পকেট থেকে আরেকটি নীল খাম বের করলেন।

“এই প্রশ্নের উত্তর তোমার মা লিখে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিঠিটা তোমাকে এখনই পড়তে দেব না।”

“কেন?”

“কারণ এই চিঠি পড়ার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

“কী সিদ্ধান্ত?”

প্রতাপবাবু বললেন, “তুমি কি তোমার বাবাকে খুঁজতে চাও, নাকি তোমার ভাইকে?”

অনন্যা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। দূরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।

তার জীবনের কুড়ি বছরের অন্ধকার যেন এক রাতেই ভেঙে পড়েছে। বাবা হয়তো বেঁচে আছেন, হয়তো মৃত। তার পরিচয় নিয়ে মিথ্যে বলা হয়েছে। তার মায়ের মৃত্যুর পেছনে অজানা রহস্য। আর তার নিজের একটি ভাই ছিল, যার অস্তিত্ব তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

সে ধীরে ধীরে বলল, “আমি দু’জনকেই খুঁজব।”

প্রতাপবাবু মাথা নাড়লেন।

“তাহলে প্রস্তুত হও। কারণ তুমি যাকে খুঁজছ, সে তোমার আশপাশেই আছে।”

“কে?”

প্রতাপবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।

তিনি ফোন ধরলেন।

ওপাশ থেকে কয়েকটি কথা শুনে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“কী বলছেন? অরিন্দম সেনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে?”

অনন্যা চমকে উঠল।

প্রতাপবাবু ধীরে ধীরে ফোন নামালেন।

“ডাকঘরের ভেতর থেকে একটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। মুখ দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কিন্তু তার পকেটে তোমার মায়ের লেখা একটা চিঠি পাওয়া গেছে।”

“কী লেখা আছে তাতে?”

প্রতাপবাবু কাঁপা গলায় বললেন—

“যদি অরিন্দমের মৃত্যু হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আসল অরিন্দম এখনও বেঁচে আছে।”

অনন্যার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।

তাহলে ডাকঘরে যে মানুষটিকে গুলি করা হলো, তিনি কে?

আর আসল অরিন্দম সেন কোথায়?

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।

“তোমার ভাইকে খুঁজতে হলে আজ বিকেল পাঁচটায় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িতে এসো। একা আসবে। আর কাউকে বিশ্বাস কোরো না। এমনকি প্রতাপ মুখোপাধ্যায়কেও নয়।”

বার্তার শেষে একটি ছবি।

ছবিতে একটি তরুণ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক বাইশ। চোখ, নাক, মুখের গড়নে অদ্ভুত মিল অনন্যার সঙ্গে।

ছবির পেছনে লেখা—

“তোমার ভাই অয়ন নয়।”

অনন্যার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।

অয়ন যদি তার ভাই না হয়, তাহলে সে কে?

আর যে ছেলেটি ছবিতে দাঁড়িয়ে আছে, সে কি সত্যিই তার হারিয়ে যাওয়া ভাই?

সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি তখনও অনন্যার অজানা—

যদি অয়ন তার ভাই না হয়, তবে কুড়ি বছর ধরে সে কার সঙ্গে একই বাড়িতে বড় হয়েছে?

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : নীল খামের শেষ চিঠি (প্রথম পর্ব: যে চিঠি কুড়ি বছর পরে এল)।

বৃষ্টির রাত। জানলার কাচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকালেই এক মুহূর্তের জন্য আলোয় ভেসে উঠছে পুরোনো বাড়িটার ছাদ, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল আর সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা।

রাত তখন সাড়ে দশটা।

অনন্যা সেন নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। কলকাতার একটি প্রকাশনা সংস্থায় সম্পাদকের কাজ করে সে। দিনের অধিকাংশ সময় কাটে অন্যের লেখা পড়ে, ভুল সংশোধন করে, গল্পের চরিত্রের সুখ-দুঃখ নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু নিজের জীবনের গল্পটা যে এতদিন ধরে কেউ আড়াল থেকে লিখে চলেছে, তা সে কল্পনাও করেনি।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

“দিদি, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে।”

ছোট ভাই অয়ন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা নীল রঙের খাম।

অনন্যা অবাক হয়ে তাকাল।

“চিঠি? আমার নামে?”

“হ্যাঁ। ডাকপিয়ন দিয়ে গেছে। আজকাল আবার কে চিঠি লেখে বল তো!”

অয়ন হেসে খামটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল।

অনন্যা প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। ভেবেছিল, হয়তো কোনও প্রকাশকের চিঠি কিংবা কোনও পুরোনো পরিচিতের পাঠানো নিমন্ত্রণপত্র। কিন্তু খামটা হাতে তুলতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

খামের ওপর সাদা কালিতে লেখা—

অনন্যা সেন, ১৭/বি, দক্ষিণের বাড়ি, শান্তিপুর, নদিয়া।

লেখাটা অদ্ভুত পরিচিত।

এই হাতের লেখা সে শেষ দেখেছিল কুড়ি বছর আগে। তখন তার বয়স মাত্র এগারো। ছোট্ট একটি মেয়ে, যে প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির পেছনের পুকুরঘাটে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করত।

যে মানুষটি একদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কোনও দিন তাকে ছেড়ে যাবে না।

তারপর এক বর্ষার রাতে মানুষটি নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

অনন্যার হাত কাঁপতে শুরু করল।

খামের পেছনে প্রেরকের নাম লেখা ছিল না। শুধু ছোট্ট একটি বাক্য—

“যদি সত্যিটা জানতে চাও, তবে আজ রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে এসো।”

অনন্যা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

পুরোনো ডাকঘর!

শান্তিপুরের সেই পরিত্যক্ত ডাকঘর, যেখানে কুড়ি বছর আগে তার বাবা শেষবার গিয়েছিলেন। তারপর আর কখনও ফিরে আসেননি।

বাড়ির সবাই বলেছিল, তার বাবা অরিন্দম সেন হয়তো নদীতে পড়ে মারা গিয়েছেন। কেউ বলেছিল, তিনি সংসার ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ ফিসফিস করে বলেছিল, তিনি নাকি এমন কিছু জেনে গিয়েছিলেন, যা জানা তাঁর উচিত ছিল না।

কিন্তু কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শুধু পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ভেজা ছাতা। পুরোনো ডাকঘরের সামনের ভাঙা সিঁড়িতে পড়েছিল সেটি।

অনন্যার মা সেই ঘটনার পর থেকে আর কখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। কয়েক বছর আগে অসুস্থতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি শুধু একটি কথাই বলতেন—

“তোর বাবা খারাপ মানুষ ছিল না, অনু। ওকে ভুল বুঝিস না।”

কিন্তু কেন ভুল বুঝতে নিষেধ করতেন, তা কোনও দিন বলেননি।

অনন্যা আবার খামটা খুলল।

ভেতরে একটি হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ। তাতে লেখা—

“অনু,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তার মানে আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারলাম না। এতদিন তোকে সত্যি বলতে পারিনি। তোর মায়ের কাছে আমি অপরাধী, তোর কাছেও। কিন্তু যে অপরাধের জন্য আমাকে দোষী করা হয়েছিল, সেই অপরাধ আমি করিনি।

আজ রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে আসিস। একা আসবি। কাউকে বিশ্বাস করিস না।

বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে এতদিন তোকে বাবার মতো আগলে রেখেছে।

— বাবা।”

চিঠির শেষ শব্দটা পড়ে অনন্যার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

বাবা!

এটা কি সত্যিই তাঁর বাবার লেখা?

আর যদি তাই হয়, তবে তিনি কোথায় ছিলেন এতগুলো বছর?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে মানুষটি এতদিন তাকে বাবার মতো আগলে রেখেছে, সে কে?

অনন্যার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি মুখ।

সৌমেন কাকু।

বাবার ছোটবেলার বন্ধু। বাবার নিখোঁজ হওয়ার পর তিনিই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অনন্যার পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে মায়ের চিকিৎসা—সবকিছুতেই তাঁর অবদান ছিল। অয়ন তাঁকে নিজের বাবার মতোই ভালোবাসে। অনন্যাও তাঁকে কখনও সন্দেহ করেনি।

কিন্তু চিঠিতে কেন তাঁর কথা লেখা?

অনন্যা ফোন তুলে সৌমেন কাকুকে কল করতে গিয়েও থেমে গেল।

চিঠিতে স্পষ্ট লেখা—কাউকে বিশ্বাস করিস না।

বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে এতদিন তোকে বাবার মতো আগলে রেখেছে।

তার মানে কি সৌমেন কাকু কিছু জানেন?

নাকি তিনিই সবকিছুর পেছনে?

ঠিক তখনই বাড়ির নিচে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

অনন্যা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বৃষ্টির পর্দার আড়ালে কালো রঙের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির হেডলাইট নিভে গেছে, কিন্তু ভেতরে কেউ একজন বসে আছে বলে মনে হচ্ছে।

কয়েক সেকেন্ড পর গাড়ির দরজা খুলল।

একজন লোক ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে এল।

লোকটিকে চিনতে অনন্যার এক মুহূর্তও লাগল না।

সৌমেন কাকু!

এত রাতে তিনি এখানে কেন?

অনন্যা তাড়াতাড়ি চিঠিটা বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রাখল। তারপর দরজা খুলে নিচে নামল।

বসার ঘরে পৌঁছতেই সৌমেন কাকু ভেজা ছাতা বন্ধ করে সোফায় বসলেন। তাঁর মুখে স্বাভাবিক হাসি, কিন্তু চোখদুটো যেন অস্বাভাবিক স্থির।

“কী রে অনু, ঘুমাসনি এখনও?”

“না। কাজ করছিলাম। তুমি এত রাতে?”

“একটু দরকার ছিল।”

সৌমেন কাকু পকেট থেকে মোবাইল বের করে টেবিলে রাখলেন। তারপর চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, “আজ ডাকপিয়ন এসেছিল?”

অনন্যার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

“হ্যাঁ। কেন?”

“কোনও চিঠি দিয়েছে?”

“কেন বলো তো?”

সৌমেন কাকু কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হেসে বললেন, “এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। আজকাল অনেক প্রতারক চিঠি পাঠিয়ে টাকা আদায় করে। সাবধানে থাকিস।”

অনন্যা নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল।

“চিঠিতে কী লেখা আছে, সেটা না জেনে সাবধান হব কী করে?”

কথাটা শুনে সৌমেন কাকুর হাসি মিলিয়ে গেল।

“চিঠি খুলেছিস?”

অনন্যা কোনও উত্তর দিল না।

বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল, সৌমেন কাকুর ডান হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।

সৌমেন কাকু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“অনু, একটা কথা মনে রাখিস। অতীতের কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো। সব সত্যি জানলে মানুষ শান্তি পায় না। অনেক সময় সত্যিই মানুষের জীবন নষ্ট করে দেয়।”

“তুমি কি আমার বাবার কথা বলছ?”

প্রশ্নটা শুনে সৌমেন কাকু স্থির হয়ে গেলেন।

দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড পর তিনি বললেন, “তোর বাবার কথা আর তুলিস না।”

“কেন?”

“কারণ মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না।”

“কিন্তু আমার বাবা কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন?”

সৌমেন কাকুর মুখের রং বদলে গেল।

তিনি কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। বাইরে বেরোনোর আগে একবার ঘুরে তাকালেন।

“আজ রাতে কোথাও যাবি না, অনু। বিশেষ করে পুরোনো ডাকঘরের দিকে নয়।”

অনন্যার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল।

সে তো এখনও কাউকে বলেনি যে চিঠিতে পুরোনো ডাকঘরে যাওয়ার কথা লেখা আছে!

সৌমেন কাকু কি চিঠিটা পড়েছেন?

নাকি তিনি আগেই জানতেন?

গাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর অনন্যা ছুটে নিজের ঘরে গেল। বইয়ের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে আবার পড়ল।

তারপর ফোনে সময় দেখল।

রাত এগারোটা পনেরো।

বারোটা বাজতে আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

অনন্যা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

সে যাবে।

যদি এ চিঠি প্রতারণা হয়, তবে সত্যিটা জেনে ফিরে আসবে। আর যদি সত্যিই তার বাবা বেঁচে থাকেন, তবে কুড়ি বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে অয়নকে জানানো দরকার।

সে ভাইয়ের ঘরে গেল। অয়ন তখন হেডফোন কানে দিয়ে কম্পিউটারে কিছু দেখছিল।

“অয়ন, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”

“এখন? এই বৃষ্টির রাতে?”

“একটা জরুরি কাজ আছে। ফিরতে দেরি হতে পারে।”

অয়ন হেডফোন খুলে তাকাল।

“কী হয়েছে দিদি? তোর মুখটা এমন লাগছে কেন?”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুই কি বাবাকে মনে করতে পারিস?”

অয়ন হেসে ফেলল।

“আমার বয়স তখন মাত্র তিন। বাবার মুখটাও ঠিক মনে নেই। কেন হঠাৎ এসব জিজ্ঞেস করছিস?”

“এমনিই।”

অয়ন তার হাত ধরে বলল, “দিদি, তুই চিন্তা করিস না। বাবা নেই, কিন্তু সৌমেন কাকু তো আছেন। মা-ও বলত, উনি আমাদের কখনও বিপদে পড়তে দেবেন না।”

অনন্যা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

যদি অয়ন জানত, সেই মানুষটিকে নিয়েই আজ তার মনে সবচেয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে!

“অয়ন, আমি যদি তোকে বলি, আমাদের বাবার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে এমন কিছু আছে, যা আমরা জানি না?”

অয়ন গম্ভীর হয়ে গেল।

“তাহলে সেটা খুঁজে বের করব। কিন্তু তুই একা কোথাও যাবি না। আমিও যাব।”

“না। তুই বাড়িতে থাক। আমি একটু পরেই ফিরে আসব।”

অয়ন আর কিছু বলল না। তবে অনন্যা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন বুঝতে পারছে দিদি তাকে কিছু লুকোচ্ছে।

রাত এগারোটা চল্লিশ।

অনন্যা একটি কালো রেইনকোট পরে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টিতে ঝাপসা। দু-একটি দোকান বন্ধ করার সময় হয়েছে। রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই।

পুরোনো ডাকঘরটা বাড়ি থেকে প্রায় কুড়ি মিনিটের পথ।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কতবার সেখানে গিয়েছে সে! বাবা তখন ডাকঘরের কর্মচারী ছিলেন না, কিন্তু ডাকঘরের পুরোনো ভবনটির সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত একটা সম্পর্ক ছিল। মাঝে মাঝে কাজের কথা বলে সেখানে যেতেন। অনন্যাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে তাকে একটি কাঠের বেঞ্চে বসিয়ে গল্প শোনাতেন।

একবার অনন্যা জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, তুমি এখানে এত আসো কেন?”

বাবা হেসে বলেছিলেন, “কিছু চিঠি আছে, যেগুলো ঠিক ঠিকানায় পৌঁছয় না, মা। সেগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।”

তখন সে কথাটার মানে বুঝতে পারেনি।

আজ মনে হচ্ছে, বাবা হয়তো সত্যিই কোনও চিঠির অপেক্ষা করতেন।

পুরোনো ডাকঘরের কাছে পৌঁছে অনন্যা থামল।

বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। মূল দরজার কাঠ পচে গেছে, জানলার কাচ ভাঙা। ছাদের কার্নিশ থেকে জল পড়ছে। আশপাশে ঝোপঝাড় বেড়ে উঠেছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দরজার সামনে একটা নতুন সাদা ফুল রাখা।

ফুলটা ভিজে যায়নি।

অর্থাৎ কেউ খুব সম্প্রতি এখানে এসেছে।

অনন্যা দরজায় হাত দিতেই সেটি কিঁচকিঁচ শব্দ করে খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকে সে মোবাইলের টর্চ জ্বালাল।

ধুলো জমা কাউন্টার, ভাঙা চেয়ার, ছাদের কোণে মাকড়সার জাল। সবকিছু আগের মতোই। শুধু দেয়ালের পুরোনো ঘড়িটা এখনও ঝুলছে।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা পাঁচে।

অনন্যা ধীরে ধীরে ভেতরে এগোল।

“কেউ আছেন?”

তার কণ্ঠস্বর ফাঁকা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।

কোনও উত্তর এল না।

ঠিক তখনই পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ধড়াম!

অনন্যা চমকে ঘুরে দাঁড়াল। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করা হয়েছে কি না বোঝার উপায় নেই। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাতল টানল। দরজা খুলল না।

“কে আছেন? দরজা খুলুন!”

কোনও উত্তর নেই।

হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“অনু?”

অনন্যার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

এই কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারে।

এ কণ্ঠস্বর তার শৈশবের গল্পে, ঘুমপাড়ানি গানে, বহু রাতের কান্নায় মিশে আছে।

“বাবা?”

অন্ধকারের শেষ প্রান্তে একটা দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে ক্ষীণ হলুদ আলো বেরিয়ে এল। সেই আলোর সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ।

মুখে পাকা দাড়ি, মাথার চুল এলোমেলো, পরনে পুরোনো ধূসর পাঞ্জাবি। মুখে বয়সের ছাপ গভীর, কিন্তু চোখদুটো ঠিক একই রকম।

অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেল।

“বাবা… তুমি?”

লোকটি এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখে জল।

“অনু, তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।”

অনন্যা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। কুড়ি বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।

“তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? মা তোমার জন্য কেঁদে কেঁদে মারা গেল! আমি কত খুঁজেছি তোমাকে! সবাই বলেছিল তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ!”

লোকটি চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

“আমি তোকে ছেড়ে যাইনি, মা। আমি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ফিরতে দেওয়া হয়নি।”

অনন্যা মুখ তুলে তাকাল।

“কে তোমাকে ফিরতে দেয়নি?”

লোকটি উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তিনি অনন্যার কাঁধ ধরে তাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলেন।

“তুই এখানে একা এসেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“কেউ তোকে অনুসরণ করেনি তো?”

“না। কিন্তু সৌমেন কাকু জানত আমি এখানে আসব।”

বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“সৌমেন?”

“হ্যাঁ। তুমি চিঠিতে লিখেছিলে, কাউকে বিশ্বাস না করতে। বিশেষ করে সেই মানুষটাকে নয়, যে আমাকে বাবার মতো আগলে রেখেছে। তুমি কি সৌমেন কাকুর কথা বলেছিলে?”

অরিন্দম সেন ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ।”

অনন্যা পিছিয়ে গেল।

“কেন? উনি তো আমাদের সাহায্য করেছেন। মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। আমার পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন। অয়নকে নিজের ছেলের মতো দেখেছেন!”

“সেই কারণেই তো ওকে কেউ সন্দেহ করেনি।”

“কিন্তু উনি তোমার বন্ধু ছিলেন!”

অরিন্দমের চোখে হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা ফুটে উঠল।

“বন্ধু? সব বিশ্বাসঘাতক শত্রুর মুখোশ পরে আসে না, অনু। কিছু মানুষ বন্ধুর মুখোশ পরে সারাজীবন পাশে থাকে।”

অনন্যার মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগে পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে—অরিন্দম, সৌমেন এবং আরেকজন অচেনা ব্যক্তি। পেছনে সেই পুরোনো ডাকঘর।

ছবির নীচে তারিখ লেখা—১৭ জুলাই, ২০০৬।

অনন্যা ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

অচেনা মানুষটির মুখ সে চেনে।

কুড়ি বছর ধরে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে যে লোকটি তাদের বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতেন, যে লোকটি নিজেকে বাবার পুরোনো সহকর্মী বলে পরিচয় দিতেন, যে লোকটির নাম শুনলেই মা দরজা বন্ধ করে দিতেন—

তিনি ছবিতে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির পেছনে তাঁর নাম লেখা।

দেবব্রত মল্লিক।

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“এই লোকটা কে?”

অরিন্দম মৃদু স্বরে বললেন, “এই মানুষটার জন্যই আমার জীবন শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর তোর মায়ের মৃত্যুর পেছনেও এমন একটি সত্যি আছে, যা তুই এখনও জানিস না।”

অনন্যা ছবিটা আঁকড়ে ধরল।

“মায়ের মৃত্যু? মা তো অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল!”

“তোর মা অসুস্থ ছিল, এটা সত্যি। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণ কী ছিল, সেটা তুই জানিস না।”

“তুমি সব খুলে বলো, বাবা। আমি আর কিছু অন্ধকারে রাখতে চাই না।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন—

“কুড়ি বছর আগে এই ডাকঘরে একটা খাম এসেছিল। খামের ভেতরে এমন কিছু নথি ছিল, যা কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের অপরাধ প্রমাণ করতে পারত। সেই নথি আমি পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই সবকিছু বদলে গেল। আমাকে চোর, প্রতারক আর খুনের আসামি বানানো হলো।”

“খুন?”

“হ্যাঁ, অনু। সেই রাতে একজন মানুষ মারা গিয়েছিল। আর তার মৃত্যুর দায় আমার ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল।”

“কে মারা গিয়েছিল?”

অরিন্দম ঠোঁট খুললেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটা গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ হলো।

দুজনেই চমকে উঠলেন।

তারপর দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ।

একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

“অনু, আমি জানি তুই ভেতরে আছিস। দরজা খুলে দে।”

সৌমেন কাকু!

অনন্যা বাবার দিকে তাকাল। অরিন্দমের চোখে আতঙ্ক।

“ও এখানে কীভাবে এল?”

“আমি জানি না!”

বাইরে আবার ধাক্কা পড়ল।

“অনু, শোন! লোকটা তোর বাবা নয়!”

অনন্যা জমে গেল।

অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরলেন।

“ওর কথা শুনবি না!”

বাইরে থেকে সৌমেন কাকুর গলা আরও জোরে শোনা গেল—

“তুই যার সঙ্গে কথা বলছিস, সে অরিন্দম সেন নয়! তোর বাবা কুড়ি বছর আগেই মারা গিয়েছে!”

অনন্যা বাবার মুখের দিকে তাকাল।

লোকটির চোখে জল। তিনি ফিসফিস করে বললেন—

“অনু, ওকে দরজা খুলতে দিস না। ও যদি ভেতরে ঢোকে, তাহলে আজ রাতেই তুই সত্যিটা জানার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে।”

বাইরে তখন দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ছে।

ধড়াম! ধড়াম! ধড়াম!

অনন্যা একবার দরজার দিকে, একবার বাবার দিকে তাকাল।

তারপর হঠাৎ অরিন্দমের কবজির দিকে চোখ পড়তেই সে চমকে উঠল।

সেখানে একটি পুরোনো ঘড়ি বাঁধা।

ঘড়িটার কাচ ভাঙা। কাঁটা থেমে আছে ঠিক রাত বারোটা পাঁচে।

ছোটবেলায় বাবার হাতে এই ঘড়িটাই দেখেছিল সে।

কিন্তু ছবিতে, যেখানে বাবাকে শেষবার জীবিত দেখা গিয়েছিল, সেই ছবিতেও ঘড়িটা ছিল।

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “বাবা… তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

অরিন্দম উত্তর দিলেন না।

শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তুই কি সত্যিই জানতে চাস, তোর বাবা কোথায় ছিল?”

ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অনন্যা অনুভব করল, কেউ একজন তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলছে—

“কারণ যে মানুষটাকে তুই বাবা বলে ডাকছিস, সে তোকে চেনে কুড়ি বছর আগের নামেও না…”

অনন্যা চিৎকার করতে গিয়েও পারল না।

দরজার বাইরে সৌমেন কাকুর গলা থেমে গেছে।

আর তার ঠিক পেছনে, অন্ধকারের মধ্যে, আরেকজনের নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে।

কেউ একজন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

যে মানুষটিকে সে দেখতে পাচ্ছে না।

কিন্তু যার হাতে ধরা আছে আরেকটি নীল খাম।

খামের ওপর লেখা—

“অনন্যা সেনের জন্য। খুলবে শুধু তখনই, যখন প্রথম চিঠির মানুষটিকে চিনতে পারবে।”

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে স্টেশনে ভোর হয় না)।

ট্রেনের শেষ কামরায় পা রাখতেই অর্কের মনে হল, সে যেন কোনও ঘরে নয়, বরং একটা গভীর কবরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

কামরার দেওয়াল কালচে। জানলার কাচে জমে আছে কুয়াশা। মেঝের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুরোনো টিকিট, ছেঁড়া চিঠি, ভাঙা ঘড়ি আর শিশুদের খেলনা। প্রতিটি জিনিসের গায়ে ধুলো জমলেও অর্কের মনে হল, এগুলো যেন কেউ কিছুক্ষণ আগেই ব্যবহার করেছে।

পিউ তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলার চোখে এখনও আতঙ্ক।

“এই কামরাটা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?” তিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।

অর্ক উত্তর দিতে পারল না।

কারণ কামরার একেবারে শেষ প্রান্তে, জানলার পাশে, একজন মানুষ বসে ছিলেন।

ধূসর শার্ট। পরিচিত কাঁধ। ডান হাতের কবজিতে পুরোনো ঘড়ি।

অর্কের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।

“বাবা?”

লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

সেই মুখ—যে মুখ বহু বছর আগে শেষবার দেখেছিল অর্ক। বাবার চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে মৃদু হাসি।

“এত দেরি করলি কেন, অর্ক?”

অর্কের পা যেন মেঝেতে আটকে গেল।

“কিন্তু তুমি তো… তুমি তো মারা গেছ!”

বাবা মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ, আমি মারা গেছি। কিন্তু তোর মনে আমার যে অংশটা রয়ে গেছে, সেটা তো মরেনি।”

অর্ক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

“তাহলে তুমি এখানে কী করে?”

“আমি এখানে নেই, বাবা। তুই যে স্মৃতিগুলো এত বছর ধরে এড়িয়ে গিয়েছিস, তার মধ্যেই আমি আটকে আছি।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

“সেই রাতে কী হয়েছিল? তুমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জানলার বাইরে তাকালেন।

“সেদিন আমি তোকে খুঁজতে গিয়ে এই স্টেশনে নেমেছিলাম। তুই যখন ওই লোকটার সঙ্গে চলে গেলি, আমি বুঝেছিলাম কিছু একটা ঠিক নেই। আমি তোকে খুঁজতে গিয়ে একটা দরজার সামনে পৌঁছেছিলাম। দরজার ওপারে তুই আর পিউ ছিলি।”

“তাহলে তুমি আমাদের উদ্ধার করোনি কেন?”

বাবার মুখে গভীর বেদনা ফুটে উঠল।

“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই লোকটা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিল—আমি যদি তোর স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাই, তাহলে তোকে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”

অর্ক হতবাক হয়ে গেল।

“তুমি রাজি হয়েছিলে?”

“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”

“কিন্তু তুমি তো আমাকে বলোনি!”

“বলতে পারিনি। তোর মনে আমার স্মৃতি যতদিন ছিল, ততদিন এই ট্রেন তোকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। তুই বাড়ি ফিরে গিয়েছিলি। কিন্তু তোর মনের একটা অংশ এই স্টেশনে আটকে রইল। তুই বড় হলি, জীবন শুরু করলি, বিয়ে করলি। আর আমি তোর স্মৃতির গভীরে অপেক্ষা করলাম।”

অর্কের মাথা ঘুরতে লাগল।

তাহলে এত বছর ধরে যে অপরাধবোধ তাকে তাড়া করেছে, তার পিছনে ছিল আরও বড় একটা সত্যি। তার বাবা তাকে ফেলে যাননি। বরং তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের অস্তিত্বের একটা অংশ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

“তাহলে তুমি এখন আমার সামনে এসেছ কেন?”

বাবা অর্কের হাত ধরলেন।

“কারণ তুই অবশেষে ফিরে এসেছিস। তুই পিউকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিস। তুই নিজের অপরাধবোধকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া বন্ধ করেছিস। এখন তুই চাইলে এই যাত্রার শেষ করতে পারিস।”

“কী করতে হবে?”

বাবা জানলার দিকে ইশারা করলেন।

“ওই লোকটার কাছ থেকে শেষ টিকিটটা নিতে হবে।”

“কোথায় পাব সেটা?”

“যেখানে সব হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি জমা থাকে।”

ঠিক তখনই ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই মুখোশধারী রেলকর্মী।

তার হাতে একটা কালো টিকিট।

“যাত্রা শেষ করতে চাস, অর্ক?”

অর্ক বাবার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

“হ্যাঁ।”

লোকটি হেসে উঠল।

“তাহলে একটা জিনিস মনে রাখিস—ফেরার টিকিটের দাম দিতে হয়। তুই যদি বাড়ি ফিরতে চাস, তবে তোর বাবার সব স্মৃতি ভুলে যেতে হবে।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

“সব স্মৃতি?”

“হ্যাঁ। তোর শৈশব, বাবার সঙ্গে কাটানো দিন, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর মুখ—সব। তুই আর কোনওদিন তাঁকে মনে করতে পারবি না। তোর কাছে তিনি এমন একজন মানুষ হয়ে যাবেন, যাঁর অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ নেই।”

বাবা শান্ত গলায় বললেন, “অর্ক, তুই চাইলে রাজি হতে পারিস। আমি চাই তুই বেঁচে থাকিস।”

অর্ক বাবার দিকে তাকাল।

“তাহলে তোমাকে হারিয়ে ফেলব?”

“আমাকে ভুলে গেলেও তুই যে ভালোবাসা পেয়েছিস, সেটা তোর জীবনের অংশ হয়ে থাকবে।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“না। আমি তোমাকে ভুলে বাড়ি ফিরতে চাই না।”

মুখোশধারী লোকটি হেসে উঠল।

“তাহলে তুই চিরকাল এই ট্রেনে আটকে থাকবি!”

অর্ক দৃঢ় গলায় বলল, “তুমি একটা কথা বুঝতে পারছ না। কাউকে ভালোবাসা মানে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখা নয়। আর কাউকে মনে রাখা মানে সারাজীবন তার মৃত্যুর মধ্যে আটকে থাকা নয়।”

সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভুলব না। কিন্তু তোমার জন্য আমার জীবনটাও থামিয়ে রাখব না।”

কামরার মধ্যে হঠাৎ একটা অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল।

বাবার মুখে হাসি ফুটল।

“এই কথাটাই তোকে এতদিন ধরে বলতে চেয়েছিলাম।”

মুখোশধারী লোকটি পিছিয়ে গেল।

“না! এই স্মৃতিগুলো আমার!”

অর্ক বুঝতে পারল, লোকটির শক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের শোক, অপরাধবোধ আর বিচ্ছেদের ভয় থেকে। মানুষ যখন অতীতকে ছেড়ে সামনে এগোতে পারে না, তখনই সে সেই যন্ত্রণাকে নিজের শিকল বানিয়ে ফেলে।

অর্ক বাবার দিকে হাত বাড়াল।

“চলো, বাবা। এবার বাড়ি ফিরি।”

বাবা মাথা নাড়লেন।

“আমি তোর সঙ্গে যেতে পারব না, অর্ক। আমার সময় শেষ হয়েছে।”

“কিন্তু—”

“তুই আমাকে মনে রাখিস। শুধু আমার শেষ দিনটাকে নয়, আমার সঙ্গে কাটানো সব দিনকে মনে রাখিস। তোর প্রথম সাইকেল চালানো, বৃষ্টির দিনে একসঙ্গে ভিজে বাড়ি ফেরা, তোর পরীক্ষার ফল দেখে আমার হাসি—এসবই তো আমার জীবন। শুধু আমার মৃত্যু দিয়ে আমাকে চিনিস না।”

অর্ক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বাবার শরীর ক্রমশ আলোর মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল।

“বাবা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”

“আমিও তোকে ভালোবাসি, বাবা।”

তারপর বাবার অবয়ব ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

কামরার মেঝেতে পড়ে রইল তাঁর পুরোনো ঘড়িটা।

অর্ক ঘড়িটা তুলে নিল।

ঘড়ির কাঁটা এতদিন থেমে ছিল এগারোটা চল্লিশে।

এবার কাঁটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলতে শুরু করল।


মুখোশধারী লোকটি এবার আর রেলকর্মীর পোশাকে রইল না। তার শরীরের ওপরের পোশাক ছিঁড়ে পড়ল। মুখের সব চামড়া মিলিয়ে গেল। অন্ধকারের মধ্যে দেখা গেল একটা কঙ্কালসার অবয়ব, যার বুকের ভেতর অসংখ্য টিকিট ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রতিটি টিকিটে লেখা একেকটি নাম।

একেকটি তারিখ।

একেকটি অসমাপ্ত যাত্রা।

“তুই ভাবছিস, আমাকে হারিয়ে দিয়েছিস?” সে গর্জে উঠল। “আমি এই স্টেশনের প্রতিটি দরজায় আছি। প্রতিটি হারানো স্মৃতিতে আছি। কেউ কাউকে হারালেই আমি ফিরে আসব!”

অর্ক শান্তভাবে বলল, “হয়তো তুই আবার আসবি। কিন্তু আমার অপরাধবোধকে আর তোর অস্ত্র হতে দেব না।”

পিউ সামনে এগিয়ে এল।

“আমার মাকেও তুই আর আটকে রাখতে পারবি না।”

পিউয়ের মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

তখনই কামরার সব যাত্রী একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ তাঁর ভাঙা ঘড়িটা খুলে মেঝেতে রাখলেন। যুবতী সাদা কাপড়ে মোড়া জিনিসটি বুকের কাছে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন। অন্য যাত্রীরা নিজেদের পকেট থেকে পুরোনো চিঠি, ছবি আর টিকিট বের করে মেঝেতে রাখতে লাগলেন।

অর্ক বুঝতে পারল, এই মানুষগুলোও তাদের স্মৃতির বন্দি।

সে উচ্চস্বরে বলল, “আপনারা সবাই আপনাদের নাম মনে করুন! আপনারা কোথা থেকে এসেছেন, কাকে ভালোবেসেছেন, কাকে হারিয়েছেন—সব মনে করুন। কিন্তু নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের জন্য নিজেদের জীবনকে শাস্তি দেবেন না!”

প্রথমে কেউ উত্তর দিল না।

তারপর বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, “আমার নাম নীরদ সেন। আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু আমি শুধু একজন শোকাহত বাবা নই। আমি নীরদ সেন।”

যুবতী চোখের জল মুছে বললেন, “আমার নাম মধুরিমা। আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়ের স্মৃতি আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছিল।”

একজন একজন করে সবাই নিজেদের নাম বলতে লাগলেন।

কামরার আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

মুখোশধারী লোকটি চিৎকার করে উঠল। তার বুকের ভেতর ঘুরতে থাকা টিকিটগুলো একে একে আগুনের মতো আলো ছড়িয়ে ছাই হয়ে গেল।

“থামো! তোমরা সবাই আমাকে ভুলে যাবে!”

অর্ক তার দিকে তাকাল।

“আমরা তোকে ভুলে যাব না। কিন্তু তোকে আমাদের জীবন চালাতে দেব না।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

দীর্ঘ, গভীর, অদ্ভুত এক শব্দ।

স্টেশনের নামফলক কেঁপে উঠল। “স্মৃতিপুর” লেখা অক্ষরগুলো একে একে খসে পড়ল। তার জায়গায় ফুটে উঠল নতুন নাম—

ফেরার পথ।

মুখোশধারী লোকটি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার শরীরের অন্ধকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

শেষবারের মতো সে অর্কের দিকে তাকাল।

“তুই কি জানিস, আমি কেন এত মানুষকে আটকে রেখেছিলাম?”

অর্ক চুপ করে রইল।

লোকটি ফিসফিস করে বলল, “কারণ আমি নিজেও বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়ের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, সবাইকে আটকে রাখলে কেউ আর কাউকে হারাবে না।”

তার কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

“আমি ভুল করেছিলাম।”

অর্কের মনে তার জন্য সামান্য দুঃখ জাগল। কিন্তু সে জানত, দুঃখ মানেই অন্যায়কে ক্ষমা করে দেওয়া নয়।

লোকটির অবয়ব সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে একবার বলল, “শেষ ট্রেনটা এবার সত্যিই বাড়ি ফিরবে।”

তারপর সব নীরব।


ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

কিন্তু এবার জানলার বাইরে অন্ধকার মাঠের বদলে দেখা যাচ্ছিল ভোরের আকাশ। দূরে গাছের মাথায় আলো ফুটছে। কোথাও কোথাও ছোট ছোট বাড়ির জানলা খুলছে। মানুষজন দিনের কাজ শুরু করছে।

অর্ক জানলার পাশে বসে ছিল। তার হাতে বাবার পুরোনো ঘড়ি।

পিউ তার পাশে বসে মায়ের হাত ধরে আছে।

“কাকু,” পিউ বলল, “আমরা কি সত্যিই বাড়ি ফিরছি?”

অর্ক মৃদু হাসল।

“হ্যাঁ। এবার সত্যিই।”

“আপনি কি আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন?”

“কথা দিয়েছিলাম। এবার কথা রাখব।”

পিউ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “আমার মনে হয়, মা আমাকে চিনতে পারবেন না। এত বছর কেটে গেছে।”

তার মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“মায়েরা সন্তানকে শুধু মুখ দেখে চেনে না, মা। তুই আমার কাছে যত দিনই হারিয়ে থাকিস, তুই আমার মেয়েই থাকবি।”

পিউ মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।

অর্ক তাদের দেখে নিজের মায়ের কথা ভাবল। কত দিন মাকে ফোন করা হয়নি! কতবার কাজের ব্যস্ততায় তাঁর কথা এড়িয়ে গেছে! বাড়ি ফিরে সে প্রথমেই মাকে ফোন করবে বলে ঠিক করল।

হঠাৎ ট্রেনের স্পিকারে ঘোষণা ভেসে এল—

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, পরবর্তী স্টেশন—বারাসত। যাঁদের যাত্রা শেষ হয়েছে, তাঁরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নামবেন।”

অর্ক জানলার বাইরে তাকাল।

স্টেশনটা পরিচিত। চায়ের দোকান, লাল বেঞ্চ, প্ল্যাটফর্মের পুরোনো ঘড়ি—সব যেন আগের মতোই আছে।

ট্রেন থামল।

দরজা খুলে গেল।

অর্ক প্রথমে নামল। তারপর পিউ আর তার মা।

প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই পিউ থমকে দাঁড়াল। সে মাটিতে হাত ছুঁয়ে দেখল, তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।

“মা, আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি!”

মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

অর্ক একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল। তার বুকের মধ্যে বহু বছর ধরে জমে থাকা একটা ভার যেন নেমে গেল।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে মেঘলার নাম।

অর্ক তাড়াতাড়ি ফোন ধরল।

“হ্যালো, মেঘলা!”

ওপাশ থেকে কান্না আর রাগ মেশানো গলা ভেসে এল।

“তুমি কোথায়? সারারাত ফোন বন্ধ! আমি থানায় ফোন করতে যাচ্ছিলাম!”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

“আমি ঠিক আছি। বাড়ি ফিরছি।”

“কোথায় আছ?”

অর্ক প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল।

“বারাসত স্টেশনে।”

মেঘলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

“তুমি তো শিয়ালদহ থেকে বারাসত লোকাল ধরেছিলে। এত রাত হয়ে গেল কেন?”

অর্ক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।

তার মনে হল, পুরো রাতের কথা বললে মেঘলা বিশ্বাস করবে কি না সে জানে না। কিন্তু আজ সে আর সত্যি থেকে পালাবে না।

“একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। বাড়ি ফিরে সব বলব।”

মেঘলা এবার নরম গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি এসো। আমি অপেক্ষা করছি।”

ফোন কেটে অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।

ঘড়ির কাঁটা এবার সকাল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশে থেমে আছে।

সে হেসে ফেলল।

হয়তো কিছু সময় আর কখনও ফিরে আসে না। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে আটকে থাকা মানুষও একদিন মুক্তি পেতে পারে।


কয়েক দিন পর অর্ক পিউ আর তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেল।

বারাসতের সেই নীল দরজার বাড়িটা এখনও আছে। ছোট্ট উঠোনে তুলসীগাছ, বারান্দায় শুকোতে দেওয়া জামাকাপড়, আর জানলার পাশে পুরোনো একটা কাঠের চেয়ার।

পিউ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করছে। সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার আগে অর্ক তাকে একটা নতুন ব্যাগ উপহার দিল।

পিউ ব্যাগটা খুলে দেখে অবাক হয়ে গেল।

ভেতরে একটা ছোট্ট ট্রেনের খেলনা।

“এটা কী, কাকু?”

“মনে রাখার জন্য।”

পিউ ভয় পেয়ে গেল।

“আমি আবার ওই ট্রেনে যেতে চাই না!”

অর্ক তার মাথায় হাত রাখল।

“ওই ট্রেনটার কথা মনে রাখার জন্য নয়। মনে রাখার জন্য যে, কোনও পথ যত দীর্ঘই হোক, একদিন বাড়ি ফেরা যায়।”

পিউ একটু ভেবে খেলনাটা হাতে নিল।

তারপর হেসে বলল, “আমি বড় হয়ে রেলগাড়ির চালক হব।”

“কেন?”

“যাতে কোনও ছোট্ট মেয়ে বা ছেলে ভুল ট্রেনে উঠে হারিয়ে না যায়।”

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

“তাহলে তুই খুব ভালো চালক হবি।”

সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ক মায়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলল। ছোটবেলার গল্প, বাবার কথা, নিজের ভয়, নিজের অপরাধবোধ—সব খুলে বলল।

মা তার হাত ধরে বললেন, “তুই ছোট ছিলি, অর্ক। সবকিছু তোর দোষ ছিল না।”

এই কথাটা সে জীবনে বহুবার শুনেছে। কিন্তু এবার যেন সত্যিই বিশ্বাস করতে পারল।

রাতে মেঘলার পাশে শুয়ে অর্ক জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূরে কোনও ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

তার বুকের মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এল।

মেঘলা তার হাত ধরল।

“কী হয়েছে?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“কিছু না। একটা ট্রেন যাচ্ছে।”

“ভয় লাগছে?”

অর্ক কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “একটু। কিন্তু এবার আমি জানি, সব ট্রেনেই হারিয়ে যেতে হয় না।”

মেঘলা তার কাঁধে মাথা রাখল।

ঘরের আলো নিভে গেল।

বাইরে ভোরের আগে সেই গভীর নীরবতা।

আর বহু বছর পর অর্ক প্রথমবার কোনও দুঃস্বপ্ন ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়ল।


তারপর কেটে গেল আরও ছয় মাস।

একদিন সকালে অর্ক অফিস যাওয়ার জন্য স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল। প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড়, চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, ঘোষণায় ট্রেনের সময় জানানো হচ্ছে।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটি বেঞ্চের ওপর।

সেখানে পড়ে আছে একটা পুরোনো কাগজ।

অর্ক কাগজটা তুলে নিল।

সেটা একটা রেলওয়ের টিকিট।

টিকিটের তারিখ—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।

যাত্রীর নামের জায়গাটা ফাঁকা।

কিন্তু গন্তব্যের জায়গায় লেখা—

“বাড়ি।”

অর্কের বুকের মধ্যে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

সে চারদিকে তাকাল।

কেউ তাকে দেখছে না। কেউ টিকিটটার খোঁজও করছে না।

তারপর প্ল্যাটফর্মের লাউডস্পিকারে একটা অচেনা কণ্ঠস্বর শোনা গেল—

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ ট্রেনটি আর কোনওদিন এই স্টেশনে ফিরবে না। যাঁরা এখনও কাউকে হারিয়ে খুঁজছেন, তাঁদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজেদের জীবনে ফিরে যান।”

অর্ক ধীরে ধীরে টিকিটটা ভাঁজ করল।

তারপর প্ল্যাটফর্মের পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিল।

টিকিটটা বাতাসে উড়ে মাটিতে পড়ল।

কিন্তু এবার সেটি আর অদৃশ্য হল না।

সেটি সেখানেই রইল—একটি পুরোনো কাগজের মতো, যার আর কাউকে আটকে রাখার ক্ষমতা নেই।

অর্ক ট্রেনে উঠল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

জানলার বাইরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়ল শহরের ওপর।

আর অর্ক বুঝল, জীবনের সব যাত্রার গন্তব্য কোনও স্টেশন নয়। কখনও কখনও গন্তব্য হল সেই মুহূর্ত, যখন মানুষ নিজের অতীতকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শেখে।

সেদিন থেকে অর্ক আর শেষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেনি।

কারণ সে অবশেষে বুঝেছিল—কিছু ট্রেন আমাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কাছে নিয়ে যায়, আর কিছু ট্রেন আমাদের ফিরিয়ে আনে জীবনের কাছে।

— সমাপ্ত —

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: বারো বছর আগের সেই প্রতিশ্রুতি)।

অর্কের মনে হল, কেউ যেন তার মাথার ভেতর থেকে একে একে সব দরজা খুলে দিচ্ছে।

প্রথমে ফিরে এল একটা শব্দ—ট্রেনের চাকার সঙ্গে রেললাইনের ধাতব সংঘর্ষ।

তারপর একটা গন্ধ—ভেজা মাটি, কয়লার ধোঁয়া আর পুরোনো কাঠের গন্ধ।

তারপর একটা দৃশ্য।

রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট স্টেশন। প্ল্যাটফর্মের অর্ধেক আলো জ্বলছে, অর্ধেক নিভে গেছে। স্টেশনের নামফলকে লেখা—স্মৃতিপুর।

বারো বছরের অর্ক একটা বেঞ্চে বসে কাঁদছে।

তার পাশে বসে আছে একটি মেয়ে। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, কাঁধে ছেঁড়া ব্যাগ। মেয়েটির কপালে রক্তের দাগ।

সেই মেয়েটিই পিউ।

অর্ক দুহাতে মাথা চেপে ধরল।

“না… না, এটা সত্যি নয়!”

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অদ্ভুত মুখের লোকটি হেসে উঠল। তার মুখের চামড়া অর্ধেক ঝুলে আছে, কিন্তু সেই বিকৃত মুখের মধ্যেও অর্ক চিনতে পারল—এ লোকটিই সেই রেলকর্মী, যাকে সে বারো বছর বয়সে অনুসরণ করেছিল।

“মনে পড়ছে, অর্ক?”

অর্ক পিছিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

লোকটি উত্তর দিল না। তার মুখের চামড়া আবার বদলে গেল। এবার সেখানে ফুটে উঠল অর্কের বাবার মুখ।

“আমাকে চিনতে পারছিস না, বাবা?”

অর্কের বুকের মধ্যে হাহাকার উঠল। তার বাবা মারা যাওয়ার আগে ঠিক এইভাবেই তাকে ডাকতেন।

কিন্তু পিউ তার হাত টেনে ধরল।

“ওর দিকে তাকাবেন না, কাকু। ও আপনার বাবা নয়।”

লোকটির মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল।

“তুই এখনও বেঁচে আছিস, পিউ? এত বছর ধরে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। এবারও কি আমার পথ আটকাবি?”

পিউ ভয়ে কাঁপছিল। তবু সে অর্কের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “ওকে ছেড়ে দাও।”

লোকটি হেসে উঠল।

“ছেড়ে দেব? এই ছেলেটা নিজেই তো আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ওর নিজের মুখে বলা কথা আমি কী করে ভুলে যাই?”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “কী প্রতিশ্রুতি?”

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “তুই বলেছিলি, তুই ফিরে আসবি। তুই বলেছিলি, তুই পিউকে বাড়ি পৌঁছে দিবি। আর তুই ফিরে আসিসনি।”

অর্কের চোখের সামনে আবার সেই রাতের দৃশ্য ভেসে উঠল।


বারো বছর আগে, ১৭ অক্টোবর, ২০০৪।

অর্ক তখন বারাসতের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। দুর্গাপুজোর ছুটি কাটাতে সে বাবার সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিল। ফেরার সময় রাত হয়ে গিয়েছিল বলে তারা শেষ লোকাল ধরেছিল।

ট্রেন মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়।

বাবা জানলার পাশে বসে ছিলেন। অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পরে তার ঘুম ভাঙতেই সে দেখতে পায়, বাবা কামরায় নেই।

অর্ক ভেবেছিল বাবা হয়তো দরজার কাছে গেছেন।

ঠিক তখনই একজন রেলকর্মী এসে বলেছিল, “তোমার বাবা পরের স্টেশনে নেমেছেন। তোমার মা ওখানে অপেক্ষা করছেন। আমার সঙ্গে এসো।”

বারো বছরের অর্ক ভয় পেয়েছিল। কিন্তু লোকটির পোশাক দেখে বিশ্বাস করেছিল।

সে লোকটির সঙ্গে নেমে পড়ে।

স্টেশনটি ছিল অদ্ভুত। চারদিকে কুয়াশা, কোনও দোকান খোলা নেই, ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে বসে কাঁদছিল পিউ।

পিউ জানিয়েছিল, সে তার মায়ের সঙ্গে ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে মাকে হারিয়ে ফেলেছে। সে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে, কেউ তাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে না।

অর্ক তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল।

“কাঁদিস না। আমি তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”

পিউ জিজ্ঞেস করেছিল, “সত্যি?”

“সত্যি। আমার বাবাও এখানে কোথাও আছেন। আমরা সবাই মিলে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব।”

কিন্তু তখনই স্টেশনের অন্ধকার থেকে সেই রেলকর্মী বেরিয়ে এসেছিল।

“বাড়ি যেতে চাস?”

পিউ মাথা নেড়েছিল।

“তাহলে টিকিট দেখাও।”

পিউ নিজের পকেট হাতড়ে কিছুই পায়নি।

লোকটি বলেছিল, “টিকিট নেই? তা হলে এই স্টেশন থেকে কেউ বেরোতে পারে না।”

অর্ক প্রতিবাদ করেছিল, “কিন্তু ও তো ছোট মেয়ে! ওর মা ওকে খুঁজছে!”

লোকটি অর্কের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চাস? তা হলে একটা কাজ কর। তুই ট্রেনে ফিরে যা। তোর বাবা তোকে খুঁজছেন। আর আমি এই মেয়েটাকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেব।”

অর্ক দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল।

পিউ তার হাত ধরে বলেছিল, “আমাকে একা রেখে যেও না।”

অর্ক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, “আমি ফিরে আসব। কথা দিচ্ছি।”

তারপর সে ট্রেনে উঠে পড়েছিল।

কিন্তু ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানলার বাইরে দেখতে পেয়েছিল—পিউ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আর সেই রেলকর্মী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্ক চিৎকার করে উঠেছিল।

কিন্তু ট্রেনের গতি বেড়ে গিয়েছিল।

পরের মুহূর্তে সব অন্ধকার।


বর্তমানে ফিরে এসে অর্কের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আমি তোকে ফেলে চলে গিয়েছিলাম…”

পিউ মাথা নাড়ল।

“আপনি তখন ছোট ছিলেন, কাকু। আপনাকে ওরা ভুল বুঝিয়েছিল।”

“কিন্তু আমি কথা দিয়েছিলাম!”

“আপনি ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। ট্রেন আপনাকে আর নামতে দেয়নি।”

অর্ক নিজের হাতের পুরোনো টিকিটটার দিকে তাকাল। টিকিটে লেখা তারিখটি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। ১৭ অক্টোবর, ২০০৪-এর বদলে সেখানে ফুটে উঠল আজকের তারিখ।

তারপর নতুন একটি লাইন দেখা গেল—

ফেরার টিকিট: নেই।

অর্কের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আমি কি এখানেই আটকে যাব?”

পিউ উত্তর দেওয়ার আগেই লোকটি গর্জে উঠল।

“অবশ্যই! এই ট্রেন থেকে কেউ নিজের ইচ্ছায় নেমে যেতে পারে না। যারা নিজেদের কথা রাখতে পারে না, তাদের জন্য এই যাত্রা শেষ হয় না।”

অর্ক দাঁত চেপে বলল, “তুমি আমাদের আটকে রেখেছ কেন?”

লোকটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল।

“কারণ আমি হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পথ দেখাই। যারা কাউকে হারিয়েছে, যারা কোনও প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি, যারা নিজেদের অতীত থেকে পালাতে চায়—তাদের সবাইকে আমি এই ট্রেনে তুলে নিই। তারা তাদের স্মৃতি ভুলে যায়। তারপর আমার হয়ে অন্যদের নিয়ে আসে।”

“তুমি কে?”

লোকটি থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত তার মুখে কোনও অভিব্যক্তি রইল না।

তারপর সে বলল, “আমি সেই মানুষ, যাকে কেউ কোনওদিন খুঁজতে ফিরে আসেনি।”

তার কণ্ঠে এবার রাগের চেয়ে গভীর বিষাদ শোনা গেল।

“বহু বছর আগে আমিও এই লাইনের এক যাত্রী ছিলাম। এক রাতে আমার মেয়ে হারিয়ে যায়। আমি তাকে খুঁজতে খুঁজতে এই স্টেশনে এসে পৌঁছই। স্টেশনের লোকেরা আমাকে বলেছিল, আমার মেয়েকে ফিরে পেতে হলে অন্য একজনকে এখানে রেখে যেতে হবে। আমি রাজি হইনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার মেয়ে আর ফিরে আসেনি। আমিও আর বাড়ি ফিরতে পারিনি।”

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তাই বলে তুমি অন্যদের জীবন নষ্ট করবে?”

লোকটির মুখ শক্ত হয়ে উঠল।

“মানুষ আমাকে ভুলে গেছে। তাই আমিও চাই, কেউ যেন নিজের জীবনে ফিরে যেতে না পারে। সবাই যদি হারিয়ে যায়, তবে কেউ কাউকে ভুলতে পারবে না।”

পিউ কেঁদে ফেলল।

“তুমি আমার মাকেও আটকে রেখেছ।”

লোকটি কোনও উত্তর দিল না।

পিউ এবার অর্কের হাত ধরে বলল, “কাকু, আমার মা এখনও বেঁচে আছেন। আমি জানি। এই ট্রেন আমাকে বারবার তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, কিন্তু কখনও পৌঁছে দেয় না।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল, “তুই কী করে জানিস তোর মা বেঁচে আছেন?”

পিউ তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট লাল কাপড়ের পুঁটলি বের করল। পুঁটলির মধ্যে ছিল একটি পুরোনো ফটোগ্রাফ। ছবিতে এক মহিলা পিউকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির পিছনে লেখা—

“পিউ, যেখানেই থাকিস, মা তোকে খুঁজবে।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল, ছবির কোণে একটা ঠিকানা লেখা রয়েছে। ঠিকানাটা বারাসতের একটি পুরোনো বাড়ির।

“এটা তোর বাড়ি?”

পিউ মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। কিন্তু আমি ঠিকানাটা পড়তে পারি না। শুধু জানি, মা আমাকে একটা নীল দরজার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর আমরা ট্রেনে উঠেছিলাম।”

অর্কের মনে হল, এই ঠিকানাটাই হয়তো তাদের মুক্তির পথ।

কিন্তু তার আগেই ট্রেনের আলো নিভে গেল।

একটা দীর্ঘ শিস শোনা গেল।

তারপর স্পিকারে ঘোষণা এল—

“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, পরবর্তী স্টেশন—ভুলে যাওয়া মানুষের শেষ ঠিকানা। যাঁদের স্মৃতি অসম্পূর্ণ, তাঁরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ আসনে বসে থাকুন। কোনও যাত্রী ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করবেন না।”

কামরার অন্য যাত্রীরা একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।

বৃদ্ধ তাঁর ভাঙা ঘড়িটা বুকে চেপে ধরলেন।

যুবতী সাদা কাপড়ে মোড়া জিনিসটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।

অর্ক দেখল, সবার চোখে একই আতঙ্ক।

পিউ ফিসফিস করে বলল, “এই স্টেশনে নামলে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিটা আবার দেখতে পায়। কেউ যদি সেই স্মৃতি সহ্য করতে না পারে, সে চিরদিনের মতো এই ট্রেনের যাত্রী হয়ে যায়।”

অর্ক জিজ্ঞেস করল, “আর যদি সহ্য করতে পারে?”

পিউ তার দিকে তাকাল।

“তাহলে হয়তো সে বাড়ি ফেরার রাস্তা দেখতে পায়।”

“হয়তো?”

পিউ চোখ নামিয়ে বলল, “এত বছর ধরে কাউকে ফিরতে দেখিনি।”


ট্রেন থামতেই দরজা খুলে গেল।

প্ল্যাটফর্মে নামার সঙ্গে সঙ্গে অর্ক বুঝতে পারল, জায়গাটা কোনও সাধারণ স্টেশন নয়। সেখানে কোনও আলো নেই, তবু চারপাশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য দরজা সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি দরজার ওপর লেখা একেকটি নাম।

একটি দরজায় লেখা—“বাবার শেষ দিন।”

অন্যটিতে—“যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি।”

আরেকটিতে—“শেষ দেখা।”

অর্কের পা থমকে গেল।

একটি দরজার ওপর লেখা—

“অর্ক মুখোপাধ্যায়—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।”

দরজার ওপার থেকে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“অর্ক, তুই কোথায় গেলি?”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

বাবা সেই রাতের পর তাকে কখনও বকেননি। কিন্তু অর্ক বহুবার ভেবেছে, বাবা হয়তো তাকে হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে নিজের ওপর রাগ করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর আগেও সে কখনও জানতে পারেনি, সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল।

দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরে দেখা গেল সেই পুরোনো ট্রেনের কামরা। বাবা জানলার পাশে বসে আছেন। তাঁর মুখে উদ্বেগ।

বারো বছরের অর্ক দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

বাবা তাকে দেখে ছুটে এলেন।

“কোথায় ছিলি তুই? আমি তোকে কত খুঁজেছি!”

ছোট্ট অর্ক বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বর্তমানের অর্ক নিঃশব্দে দৃশ্যটা দেখতে লাগল।

তারপর বাবা ছেলেকে নিয়ে বসে পড়লেন।

“শোন, অর্ক। কাউকে সাহায্য করতে চাইলে তাকে একা ফেলে আসবি না। কথা দিলে সেই কথা রাখার চেষ্টা করবি। কিন্তু কেউ তোকে ভুল পথে নিয়ে যেতে চাইলে, তার কথায় বিশ্বাস করবি না।”

অর্কের চোখের জল থামছিল না।

সে বাবাকে বলতে চাইল, “আমি চেষ্টা করেছিলাম। আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম।”

কিন্তু দৃশ্যের বাবা তার কথা শুনতে পেলেন না।

হঠাৎ কামরার জানলার বাইরে সেই মুখোশধারী রেলকর্মী দেখা দিল। সে কাচে হাত রাখল।

দৃশ্যের বাবা ঘুরে তাকালেন।

“কে আপনি?”

লোকটি হাসল।

“আপনার ছেলেকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছি।”

বাবা সঙ্গে সঙ্গে অর্ককে নিজের পিছনে সরিয়ে দিলেন।

“আমার ছেলেকে আপনার দরকার নেই।”

তারপর তিনি দরজা বন্ধ করতে গেলেন।

কিন্তু লোকটি কাচের ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে।

ছোট্ট অর্ক চিৎকার করে উঠল।

বর্তমানের অর্কও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“বাবা!”

সে দরজার ভেতরে ঢুকতে গেল।

পিউ তাকে শক্ত করে ধরে ফেলল।

“না, কাকু! ওটা স্মৃতি। আপনি বদলাতে পারবেন না!”

“কিন্তু বাবা—”

“ও আপনাকে ফিরে যেতে বলছেন। দেখুন!”

দৃশ্যের বাবা অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকালেন।

তিনি বললেন, “অর্ক, বেঁচে থাকিস। নিজের জীবনটা বাঁচিস।”

তারপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

এত বছর ধরে সে যে অপরাধবোধ বয়ে বেড়িয়েছে, তার মধ্যে একটা সত্যি ছিল—সে পিউকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে ইচ্ছা করে পিউকে ফেলে গিয়েছিল। সে ছিল একটা শিশু, যে একজন অপরিচিত লোকের মিথ্যে কথায় বিশ্বাস করেছিল।

বাবার শেষ কথাটা যেন তার বুকের মধ্যে নতুন করে জায়গা করে নিল।

নিজের জীবনটা বাঁচিস।

অর্ক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“চল, পিউ।”

পিউ অবাক হয়ে তাকাল।

“কোথায়?”

“তোর মাকে খুঁজতে। আর এই ট্রেনের শেষ যাত্রাটাও আজ শেষ করতে হবে।”


স্টেশনের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট ঘর ছিল। ঘরের দরজায় কোনও নাম লেখা নেই। দরজার নিচ দিয়ে হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।

পিউ বলল, “ওই ঘরটা কখনও খোলে না।”

অর্ক দরজার কাছে যেতেই ভেতর থেকে একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।

তারপর একজন মহিলার কণ্ঠস্বর—

“পিউ, মা কোথায় তুই?”

পিউ স্থির হয়ে গেল।

“মা?”

সে দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“মা! আমি এখানে!”

ভেতরের কান্না থেমে গেল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে মহিলাটি বললেন, “পিউ? আমার পিউ?”

পিউ কাঁদতে কাঁদতে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।

অর্ক হাতল ঘোরানোর চেষ্টা করল। দরজা নড়ল না।

দরজার ওপর হঠাৎ অক্ষর ফুটে উঠল—

“দরজা খুলবে সেই ব্যক্তি, যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ছেড়ে দিতে পারবে।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

“সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি?”

পিউ তার দিকে তাকাল।

“কাকু, আপনার কী এমন স্মৃতি আছে, যা আপনি ছেড়ে দিতে পারবেন?”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ছিল বাবার সঙ্গে কাটানো ছোটবেলার দিনগুলো। বাবা তাকে সাইকেল চালানো শিখিয়েছিলেন, প্রথম বই কিনে দিয়েছিলেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করলে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিগুলোই বাবার মৃত্যুর পর তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

সেগুলো ছেড়ে দেওয়া মানে বাবাকে দ্বিতীয়বার হারানো।

কিন্তু দরজার ওপাশে পিউয়ের মা অপেক্ষা করছেন।

অর্ক ধীরে ধীরে দরজায় হাত রাখল।

“আমি আমার বাবার স্মৃতি ছেড়ে দিতে পারব না,” সে বলল। “কিন্তু আমি এই স্মৃতিগুলোকে আমার শাস্তি হিসেবেও বাঁচিয়ে রাখব না। আমি বাবাকে ভালোবেসেছি। তিনি আমাকে ভালোবেসেছেন। সেই ভালোবাসা আমাকে এগিয়ে যেতে শেখাবে।”

দরজার অক্ষরগুলো কেঁপে উঠল।

অর্ক আবার বলল, “আমি আমার অতীত ভুলতে চাই না। আমি শুধু অতীতের বন্দি হয়ে থাকতে চাই না।”

হঠাৎ দরজার তালা খুলে গেল।

ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। তাঁর চোখে জল, চুলে পাক ধরেছে, মুখে দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।

পিউ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।

তারপর ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

“মা!”

মহিলা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

“তুই কোথায় ছিলি, মা? আমি তোকে কত খুঁজেছি!”

অর্ক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার মনে হল, এই প্রথম সে সত্যিকারের কোনও স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে ভালোবাসা কাউকে আটকে রাখে না, বরং ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।

কিন্তু তাদের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।

স্টেশনের সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

দূরে সেই মুখোশধারী লোকটির কণ্ঠস্বর গর্জে উঠল—

“কেউ এই স্টেশন ছেড়ে যেতে পারবে না!”

প্ল্যাটফর্মের মেঝে কেঁপে উঠল। দরজাগুলো একে একে বন্ধ হতে লাগল।

পিউয়ের মা মেয়েকে আঁকড়ে ধরলেন।

অর্ক বুঝতে পারল, লোকটি তাদের মুক্তি দিতে রাজি নয়।

সে পিউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর মাকে নিয়ে ট্রেনে ফিরে যা।”

পিউ মাথা নাড়ল।

“আপনাকে ছেড়ে যাব না।”

“আমাকে যেতে হবে।”

“কিন্তু আপনি তো আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন!”

অর্ক তার হাত ধরল।

“হ্যাঁ। আর এবার আমি কথা রাখব। তবে তার আগে আমাদের সবাইকে এই ট্রেন থেকে বেরোতে হবে।”

ঠিক তখনই দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

স্টেশনের শেষ প্রান্তে একটি দরজা খুলে গেল। দরজার ওপারে দেখা যাচ্ছে অন্ধকার রেললাইন, আর সেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেনের শেষ কামরা।

কামরার জানলায় অর্ক নিজের মুখ দেখতে পেল।

প্রতিচ্ছবিটি এবার হাসছিল না।

সে কেবল ঠোঁট নেড়ে বলল—

“তুমি যদি বাড়ি ফিরতে চাও, তবে জানতে হবে—সেই রাতে তোমার বাবা আসলে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন।”

অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

কারণ তার বাবা তো আট বছর আগে মারা গেছেন।

তাহলে সেই রাতের পর বাবার সঙ্গে কী ঘটেছিল?

আর কেনই বা ট্রেনের প্রতিচ্ছবি এখনও তাঁর কথা বলছে?

অর্ক পিউয়ের হাত ধরে শেষ কামরার দিকে এগিয়ে গেল।

তাদের পিছনে স্টেশনটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে গেল।

আর ট্রেনের ভেতর থেকে আবার সেই ঘোষণা ভেসে এল—

“পরবর্তী স্টেশন—ফেরার অসম্ভব ঠিকানা। যাত্রী অর্ক মুখোপাধ্যায়, অনুগ্রহ করে প্রস্তুত হোন। আপনার যাত্রার শেষ সিদ্ধান্ত বাকি।”

চলবে…

Share This
Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী (প্রথম পর্ব: যে ট্রেনটি সময়মতো ফেরেনি)।

রাত তখন এগারোটা পঞ্চান্ন।

শিয়ালদহ স্টেশনের প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অর্ক বারবার ঘড়ি দেখছিল। শেষ ট্রেনটা ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল এগারোটা চল্লিশে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, স্টেশনের ঘোষণায় এখনও বলা হচ্ছে—ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছে।

অর্ক বিরক্ত হয়ে ফোন বের করল। ব্যাটারি মাত্র সাত শতাংশ। স্ত্রী মেঘলা ইতিমধ্যে চারবার ফোন করেছে। পঞ্চমবার ফোনটা বেজে উঠতেই সে ধরল।

“কোথায় তুমি? রাত প্রায় বারোটা বাজতে চলল!”

“স্টেশনে আছি। শেষ ট্রেনটা দেরি করছে।”

“কোন ট্রেন?”

“বারাসত লোকাল।”

ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

তারপর মেঘলা খুব নিচু গলায় বলল, “অর্ক, তুমি এখনই স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসো।”

“কেন?”

“আজ ওই ট্রেনে উঠবে না।”

অর্ক হেসে ফেলল। “তুমি কি পাগল হয়েছ? বাড়ি ফিরব কী করে?”

“ট্যাক্সি নাও। বাস না পেলে রাতটা কোথাও কাটিয়ে দাও। কিন্তু ওই ট্রেনে উঠবে না।”

মেঘলার গলায় এমন একটা আতঙ্ক ছিল, যা অর্ক আগে কখনও শোনেনি।

“হঠাৎ কী হয়েছে তোমার?”

“আমি স্বপ্ন দেখেছি।”

“স্বপ্ন?”

“একটা ট্রেন। জানলার পাশে তুমি বসে আছ। তোমার সামনে একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার জামা ভেজা, চুল থেকে জল পড়ছে। সে তোমাকে একটা টিকিট দিচ্ছে। আর তুমি টিকিটটা হাতে নেওয়ার পর—”

মেঘলা থেমে গেল।

“তারপর কী?”

“তারপর তোমার মুখটা আর তোমার মতো থাকছে না।”

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“শোনো, তুমি হয়তো সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত। বাড়ি ফিরে কথা বলব। এখন ফোন রাখছি।”

“অর্ক, প্লিজ!”

কিন্তু ততক্ষণে প্ল্যাটফর্মের লাউডস্পিকারে ঘোষণা ভেসে এল—

“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ বারাসত লোকাল তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে।”

অর্ক ফোন কেটে দিল।

দূরে রেললাইনের ওপর দুটি আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। আশ্চর্যের বিষয়, ট্রেনের গায়ে কোনও নম্বর নেই। দরজার ওপরের ডিজিটাল বোর্ডটাও অন্ধকার।

অর্ক ভাবল, হয়তো পুরোনো ট্রেন।

কিন্তু ট্রেন থামতেই তার মনে হল, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।

প্রতিটি কামরা ফাঁকা। কোনও যাত্রী নেই, কোনও হকার নেই, এমনকি চালকের কেবিনেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

শুধু শেষ কামরার জানলার পাশে বসে আছে একটি ছোট মেয়ে।

মেয়েটির বয়স দশ কি এগারো। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, কাঁধে পুরোনো ব্যাগ। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে তার হাঁটুর ওপর।

অর্কের বুকের মধ্যে অকারণ একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।

মেয়েটি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। অর্ক কাছে আসতেই সে মুখ তুলল।

তার চোখ দুটো অদ্ভুত পরিচিত।

“কাকু,” মেয়েটি বলল, “আপনি কি অর্ক মুখোপাধ্যায়?”

অর্ক চমকে উঠল।

“তুমি আমার নাম জানো কী করে?”

মেয়েটি উত্তর দিল না। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।

“এটা আপনার জন্য।”

অর্ক কাগজটা হাতে নিল।

সেটা একটা রেলওয়ের টিকিট।

টিকিটের তারিখ দেখে তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

১৭ অক্টোবর, ২০০৪।

যাত্রার সময় রাত এগারোটা চল্লিশ।

গন্তব্য—বারাসত।

যাত্রীর নাম—অর্ক মুখোপাধ্যায়।

কিন্তু ২০০৪ সালে অর্কের বয়স ছিল মাত্র বারো বছর।

সে কাঁপা গলায় বলল, “এটা তুমি কোথায় পেলে?”

মেয়েটি এবার একটু হাসল।

“আপনি তো সেদিনও এই ট্রেনেই উঠেছিলেন।”

অর্কের মাথার মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল।

“কীসব বলছ তুমি?”

“আপনি সেদিন আপনার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। ট্রেনটা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। তারপর একটা লোক এসে আপনাকে বলেছিল, আপনার মা স্টেশনে অপেক্ষা করছেন।”

অর্কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এমন একটা ঘটনা তার শৈশবে ঘটেছিল। বহু বছর ধরে সে সেটাকে দুঃস্বপ্ন বলে মনে করে এসেছে।

সেদিন দুর্গাপুজোর ছুটি শেষ করে বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিল সে। ট্রেন মাঝপথে থেমেছিল। একজন রেলকর্মীর মতো পোশাক পরা লোক এসে তাকে বলেছিল, তার মা নাকি পরের স্টেশনে অপেক্ষা করছেন।

অর্ক বাবার হাত ছেড়ে সেই লোকটির পিছু নিয়েছিল।

তারপর?

তারপর কিছুই মনে নেই।

শুধু মনে আছে, পরদিন সকালে সে বাড়িতে ঘুম থেকে উঠেছিল। মা বলেছিলেন, সে নাকি ট্রেনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাবা কখনও সেই ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চাননি।

অর্ক মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কে?”

মেয়েটি জানলার বাইরে তাকাল।

“আমার নাম পিউ।”

“তুমি কোথায় যাবে?”

“যেখানে ট্রেনটা শেষবার থেমেছিল।”

“কোন স্টেশন?”

পিউ এবার তার দিকে তাকাল।

“যে স্টেশনের নাম কোনও রেললাইনের মানচিত্রে নেই।”

ঠিক সেই সময় ট্রেনের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক ছুটে দরজার কাছে গেল। দরজা খুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু খুলল না। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্মের আলো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে।

অথচ সে তো এখনও ওঠার সিদ্ধান্তই নেয়নি!

অর্ক দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।

“দরজা খোলো! কেউ আছেন?”

কোনও উত্তর এল না।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। জানলার বাইরে দেখা গেল শুধু কালো মাঠ, ঝোপঝাড় আর মাঝে মাঝে দূরের বাড়ির আলো।

অর্ক ফোন বের করল। স্ক্রিনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।

ব্যাটারি পাঁচ শতাংশ।

সে মেঘলাকে ফোন করার চেষ্টা করল। ফোন লাগল না।

পিউ শান্তভাবে বলল, “আপনি যতই চেষ্টা করুন, এখন আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না।”

“তুমি কী জানো? আমাকে সব বলো!”

“আমি তো বলছি। এই ট্রেনের যাত্রীরা সবাই কিছু একটা ভুলে গেছে। কেউ নিজের নাম, কেউ নিজের বাড়ি, কেউ নিজের মৃত্যুর কথা।”

অর্ক স্থির হয়ে গেল।

“মৃত্যু?”

পিউ মাথা নাড়ল।

“এই ট্রেনে যারা ওঠে, তারা সবাই জীবিত থাকে না।”

অর্ক পিছিয়ে এল।

“তুমি মিথ্যে বলছ।”

“আপনি নিজেই দেখবেন।”

ট্রেনের ভেতরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।

অর্ক এতক্ষণ খেয়াল করেনি, কামরার অন্য প্রান্তে আরও কয়েকজন যাত্রী বসে আছে। একজন বৃদ্ধ, যার হাতে একটা ভাঙা ঘড়ি। একজন যুবতী, যার কোলে সাদা কাপড়ে মোড়া কিছু একটা। আর একটি বয়স্ক লোক, যিনি বারবার নিজের পকেট হাতড়ে যাচ্ছেন।

কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না।

সবার চোখ বন্ধ।

অর্ক এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে ডাকল।

“দাদু, শুনতে পাচ্ছেন?”

বৃদ্ধ চোখ খুললেন।

তার চোখের মণি অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।

“টিকিট আছে?”

“কীসের টিকিট?”

“এই ট্রেনে উঠেছেন, টিকিট আছে তো?”

অর্ক নিজের হাতে থাকা পুরোনো টিকিটটা দেখাল।

বৃদ্ধ টিকিট দেখে হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।

“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

“একটা মেয়ে দিয়েছে।”

বৃদ্ধ পিউয়ের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করলেন, “আবার শুরু হল।”

“কী শুরু হল?”

বৃদ্ধ আর কোনও উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখন ট্রেনের ছাদে একটা ঘণ্টা বাজল।

ঢং।

ঢং।

ঢং।

তারপর স্পিকারে ভেসে এল এক অচেনা কণ্ঠস্বর।

“পরবর্তী স্টেশন—স্মৃতিপুর। যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি সংগ্রহ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।”

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

“স্মৃতিপুর বলে কোনও স্টেশন আছে?”

পিউ মাথা নাড়ল।

“ছিল।”

“কোথায়?”

“আপনার মনে।”

ট্রেন ধীরে ধীরে গতি কমাতে লাগল।

জানলার বাইরে কুয়াশার মধ্যে একটা স্টেশন দেখা গেল। প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে সাদা কাগজ।

স্টেশনের নামফলকে লেখা—

স্মৃতিপুর।

অর্ক জানলার কাচে নিজের মুখ দেখতে পেল।

কিন্তু তার প্রতিচ্ছবি হাসছে।

অর্ক হাসছে না।

সে পিছিয়ে গেল।

প্রতিচ্ছবিটি এবার ঠোঁট নাড়ল।

“অবশেষে ফিরে এলি।”

অর্ক চিৎকার করে উঠল।

কামরার সব যাত্রী একসঙ্গে চোখ খুলল।

আর পিউ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

“কাকু, এবার আপনার মনে পড়বে। সেদিন আপনি শুধু ট্রেনে হারিয়ে যাননি। আপনি এমন একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার জন্য এই ট্রেন বারো বছর ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”

অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “কী প্রতিশ্রুতি?”

পিউয়ের চোখে জল এসে গেল।

“আপনি বলেছিলেন, আপনি ফিরে এসে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন।”

“কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনি না!”

মেয়েটি ব্যাগ থেকে আরেকটি ছবি বের করল।

ছবিতে বারো বছরের অর্ক দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট মেয়ের পাশে। দুজনের পিছনে রেলস্টেশন। ছবির নীচে তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।

অর্ক ছবিটা হাত থেকে ফেলে দিল।

কারণ ছবির মেয়েটি পিউ।

আর অর্কের নিজের মুখের পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল মাত্র তিনটি শব্দ—

“একজন ফিরবে না।”

ট্রেন থামল।

দরজা খুলে গেল।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো একসঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে অর্কের দিকে তাকাল।

তাদের প্রত্যেকের মুখ অর্কের নিজের মুখের মতো।

পিউ তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “নামবেন না, কাকু। ওরা আপনাকে চিনে ফেলেছে।”

কিন্তু ততক্ষণে কামরার দরজায় একজন রেলকর্মী এসে দাঁড়িয়েছে।

তার হাতে টিকিট কাটার যন্ত্র।

মুখে পরিচিত হাসি।

অর্কের বুকের ভেতরটা জমে গেল।

কারণ লোকটি আর কেউ নয়—তার বাবা, যিনি আট বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

বাবা হাত বাড়িয়ে বললেন, “অর্ক, এত দেরি করলি কেন? বাড়ি চল।”

অর্ক এক পা এগিয়ে গেল।

পিউ তার হাত আঁকড়ে ধরে চিৎকার করল—

“ও আপনার বাবা নয়!”

বাবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তারপর তিনি ধীরে ধীরে নিজের মুখের চামড়া খুলে ফেলতে শুরু করলেন।

তার নীচে ছিল সম্পূর্ণ অন্য একটি মুখ।

একটি মুখ, যা অর্ক বারো বছর বয়সে শেষবার দেখেছিল।

আর সেই মুখটি দেখে অর্কের স্মৃতির বন্ধ দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল।

সে মনে করতে পারল—সেদিন ট্রেনে কী ঘটেছিল।

আর কেন পিউ তাকে বারো বছর ধরে খুঁজছে।

চলবে…

Share This
Categories
বিবিধ

জটেশ্বরে খুদে শিল্পীর হাতে দুর্গারূপ, সত্যজিতের তৈরি প্রতিমা দেখতে ভিড় স্থানীয়দের।

আলিপুরদুয়ার, নিজস্ব সংবাদদাতা:- বয়স মাত্র ১৪ বছর। এই বয়সেই নিজের হাতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে ফালাকাটা ব্লকের জটেশ্বর হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সত্যজিৎ হাজরা। জটেশ্বর কলেজপাড়ার বাসিন্দা এই খুদে শিল্পী নিজের হাতে প্রতিমা তৈরি করে নিজেই পুজো করে। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে আজ থেকেই শুরু হয়েছে পুজো। জানা গিয়েছে, ছোট থেকেই মাটি দিয়ে খেলতে খেলতে পুতুল তৈরি করত সত্যজিৎ। সেখান থেকেই প্রতিমা তৈরির প্রতি আগ্রহ জন্মায় তার। বর্তমানে পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি সমান তালে চলে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। মাটি, খড়, সুতো ও কাঠ-সহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছে সে।সত্যজিতের এই কাজে পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। প্রতিমা তৈরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে পাশে থাকেন তাঁরা। ছোট বয়সে নিজের হাতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে নিজেই পুজোর আয়োজন করায় সত্যজিতের প্রতিভা নজর কেড়েছে স্থানীয়দের। তার তৈরি প্রতিমা ও পুজো দেখতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন।

Share This
Categories
বিবিধ

পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিতে উদ্যোগী মহিলারা, দুঃস্থ মেধাবী পড়ুয়াদের শিক্ষা সামগ্রী দেবে বিনায়ক অ্যাপার্টমেন্টের কমিটি।

নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট:- বালুরঘাটের দীপালি নগরের বিনায়ক অ্যাপার্টমেন্টে চতুর্থ বছরে পা দিল মহিলাদের পরিচালিত দুর্গাপুজো। নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাবের বিপরীতে অবস্থিত এই আবাসনে মহাপঞ্চমীর সন্ধ্যায় প্রতিমা এনে বরণ করেন কমিটির সদস্যরা। বাঙালি রীতি মেনে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজো, ভোগ, ধুনুচি নাচ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। প্রায় ৫০ জন মহিলা পুজো পরিচালনায় যুক্ত। দশমীতে সিঁদুর খেলায় যোগ দেন আশপাশের এলাকার মহিলারাও। ঢাকের তালে শোভাযাত্রা করে আত্রেয়ী নদীর সদরঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
দুর্গাপুজোর পাশাপাশি বিশ্বকর্মা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী পুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবস-সহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন আবাসনের বাসিন্দারা। এ বার দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বই, খাতা ও কলম বিতরণের উদ্যোগও নিয়েছে মহিলা দুর্গাপুজো কমিটি। সদস্যদের কথায়, এই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, আবাসনের বাসিন্দাদের একসঙ্গে থাকা এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ারও উপলক্ষ।

Share This
Categories
বিবিধ

দুর্গাপুজোর উদ্বোধন ঘিরে উৎসবের আমেজ বুলবুলচণ্ডীতে, অসহায় মহিলাদের হাতে বস্ত্র তুলে দিল ক্লাব।

মালদা, নিজস্ব সংবাদদাতা:- টেরাকোটা শিল্পের কারুকার্যে সেজে উঠল বুলবুলচণ্ডীর মৃত্যুঞ্জয় মেমোরিয়াল ক্লাবের পুজো মণ্ডপ, ৬৩তম বর্ষে জমকালো উদ্বোধন

মালদা জেলার হবিবপুর ব্লকের বুলবুলচণ্ডী মৃত্যুঞ্জয় মেমোরিয়াল ক্লাবের ৬৩তম বর্ষের দুর্গাপুজো মণ্ডপের শুভ উদ্বোধন হল পঞ্চমীর রাতে। ফিতে কাটা ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় পুজো মণ্ডপের। এবছর টেরাকোটা শিল্পের নান্দনিক কারুকার্যকে কেন্দ্র করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়। এরপর এলাকার অসহায় মহিলাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বস্ত্র। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উৎসবের আনন্দকে একসূত্রে বেঁধে ক্লাবের এই উদ্যোগ নজর কাড়ে। ৬৩ বছরের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে টেরাকোটা শিল্পের কারুকার্য এবং সামাজিক উদ্যোগের মেলবন্ধনে এবছর দর্শনার্থীদের নজর কাড়তে প্রস্তুত বুলবুলচণ্ডী মৃত্যুঞ্জয় মেমোরিয়াল ক্লাবের দুর্গাপুজো।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আদিবাসী উন্নয়ন এবং সেচ ও জলপথ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জয়েল মুর্মু, উত্তর মালদার প্রাক্তন সাংসদ মৌসম বেনজির নূর, হবিবপুর থানার আইসি কৌশিক বিশ্বাস, মালদা জেলা পরিষদের সদস্য তারাশঙ্কর রায় ও রেহানা পারভীন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পুরাতন মালদা পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম, ইংলিশবাজার পুরসভার কাউন্সিলর চৈতালি ঘোষ সরকার, প্রাক্তন কাউন্সিলর প্রসেনজিৎ দাস, বুলবুলচণ্ডী জমিদার বাড়ির সদস্য সাধন কুমার রায়, ক্লাবের সম্পাদক হেমন্ত শর্মা-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও ক্লাব সদস্যরা।

Share This
Categories
বিবিধ

শান্তিপূর্ণ দুর্গোৎসবের লক্ষ্যে বৈষ্ণবনগরে বিশেষ সভা, ৮৬টি পুজো কমিটিকে আর্থিক অনুদান।

বৈষ্ণবনগর, নিজস্ব সংবাদদাতা: আসন্ন দুর্গাপূজাকে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বৈষ্ণবনগরে দুর্গাপূজা কমিটিগুলির হাতে রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হল। মালদা জেলা পুলিশ ও বৈষ্ণবনগর থানার উদ্যোগে সোমবার বৈষ্ণবনগরের প্রমোদ ভবনে এই চেক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে বৈষ্ণবনগর থানা এলাকার প্রায় ৮৬টি স্বীকৃত ও নিবন্ধিত দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকদের হাতে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ১ লক্ষ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি, উৎসবের দিনগুলিতে পুজো পরিচালনা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল রাখতে কমিটির প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশিকা ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।

এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বৈষ্ণবনগর বিধানসভার বিধায়ক রাজু কর্মকার, কালিয়াচক-৩ ব্লকের বিডিও বাপি হালদার, বৈষ্ণবনগর থানার আইসি সুদীপ চক্রবর্তী-সহ স্থানীয় প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকেরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিথিরা বলেন, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম প্রতীক। উৎসবের দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসন সবরকমভাবে পুজো কমিটিগুলির পাশে থাকবে বলেও তাঁরা জানান।

রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদান এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় বৈষ্ণবনগর এলাকার পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গিয়েছে। আসন্ন দুর্গোৎসব যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়, তার জন্য পুজো কমিটি ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

Share This