Categories
প্রবন্ধ

ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত, ভারতীর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী এবং বিপ্লবী।।

ভূমিকা—

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল কিছু মানুষের অব্যর্থ পরিশ্রম যার ফলেই ব্রিটিশদের থেকে ভারত রাজনৈতিক দিক থেকে মুক্তি পেয়েছে। ভারত উপমহাদেশের বিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে সশস্ত্র বিপ্লববাদী লড়াই-সংগ্রাম সংগঠিত হয় এবং যার ধারাবাহিকতায় ভারত স্বাধীন হয়, তার মূলে যে সকল বিপ্লবীর নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁদের মধ্যে ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত প্রথমসারির একজন অন্যতম বিপ্লবী ছিলেন। ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক উল্লেখযোগ্য নাম, যিনি দেশমতৃকার শৃঙ্খল মুক্তির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ রূপে। ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অক্লান্ত কর্মী।
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত (৮ অক্টোবর ১৮৯২ – ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭৯) ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন কর্মী এবং একজন ব্রিটিশ শক্তি বিপ্লবী।  তিনি স্বাধীন প্রশাসন থেকে যুদ্ধ করেছেন।  বিপ্লবী বিপ্লব হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলনে তার গভীর প্রভাব ছিল।  ১৯১৭ তারিখে বিলাসপুর জেলে তাঁর ৭৮ দিনের ধর্মঘটের একটি প্রতিবেদন রয়েছে।
জীবনের প্রথমার্ধ—
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত ১৮৯২ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশের যশোর জেলার ঠাকুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  তার পিতা কৈশল চন্দ্র দত্ত পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার একজন খুচরা ব্যবস্থাপক ছিলেন।  তাঁর মা বিমলাসুন্দরী ছিলেন একজন দানশীল মহিলা।  কমলিনী, যাদুগোপাল, স্নেহলতা, সুপ্রভা নামে তাঁর চার বোন ছিল।
কথিত আছে যে একবার রামায়ণ পড়ার সময় তিনি লক্ষনের বীরত্বের কাহিনী জানতে পেরেছিলেন এবং ব্রহ্মচর্যের বিষয়ে তাঁর ব্যস্ততার কথা পড়েছিলেন।  মায়ের কাছ থেকে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে জানার পর তিনি নিজেই সেই পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন।  এবং সারা জীবন ব্রহ্মচারী হয়ে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।  ফরিদপুর হাইস্কুলে থাকাকালীন তিনি প্র্যাকটিস সোসাইটিতে যোগদান করেন এবং পরে বিভিন্ন মানবিক কর্মকান্ড এবং ১৯০৫ সালের দেশভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।  ভগবদ্গীতা পড়া এবং বঙ্কিম চন্দ্র চ্যাটার্জি এবং স্বামী বিবেকানন্দের সাথে কাজ করা তাকে তাদের অনুসারী হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
লেখা—
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত একজন ক্যালিগ্রাফার ছিলেন।  তাঁর বই ‘বিপ্লব পদচিহনা’, ‘ভারতীয় বিপ্লব এবং গঠনমূলক কর্মসূচি’।  তিনি বহু বিপ্লবীর জীবনীও লিখেছেন।
বিপ্লবী জীবন—
বিপ্লবী বাঘা ছিলেন যতীনের শিষ্য।  তিনি জার্মান অস্ত্রের সাহায্যে ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী অভ্যুত্থানের প্রস্তুতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।  খুলনা ও যশোরে বিপ্লবের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত হয়।  যতীনের মৃত্যুর পরও বাঘা আত্মগোপনে কাজ চালিয়ে যান।  আর্মেনীয়রা রাস্তায় ডাকাতির সাথে জড়িত ছিল।  ১৯১৭ সালে গ্রেফতার হন। বিলাসপুর জেলে ৭৮ দিন অনশন করেন।  ১৯২০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর, তিনি গান্ধীজির সাথে দেখা করেন।  গণ যোগাযোগের উদ্দেশ্যে কংগ্রেসে যোগদান।  এরপর তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিতে কাজ করেন।  তিনি ১৯২৩ সালে ব্রহ্মদেশে (মিয়ানমার) বন্দী হন। ১৯২৮ সালে মুক্তি পেলেও তিনি সশস্ত্র বিপ্লবের পথ ত্যাগ করেননি।  অস্ত্র সংগ্রহ, বোমা তৈরি ইত্যাদির সাথে জড়িত থাকার জন্য পুলিশ তাকে বহুবার গ্রেফতার করেছিল। ১৯৩০ সালে, যখন তিনি বিপ্লবী সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সম্পর্কে শ্রী সরস্বতী প্রেসে ‘ধন্য চট্টগ্রাম’ নিবন্ধটি লেখেন।  সরকার তৎক্ষণাৎ পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাকে আবার কারারুদ্ধ করে এবং ৮ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করে।  ১৯৪১ সালে পুনরায় গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ফরওয়ার্ড’ সম্পাদনা করেন। দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানের নাগরিক হন এবং সেখানে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।  তিনি পাকিস্তানের সংসদ সদস্যও হন।  তিনি ১৯৬১ সালে ভারতে ফিরে আসেন এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপ রোধ করার জন্য সামরিক আইন জারি করা হলে সরাসরি রাজনীতি থেকে অবসর নেন।
।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মূল্যবান মনুষ্য জীবনে দুর্গাপূজা :: স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)।

ॐ সর্বমঙ্গল- মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ -সাধিকে।
শরণ‍্যে ত্র‍্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে।।

শ্রীশ্রী চণ্ডী এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে ও রামায়ণ অনুযায়ী ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীকে আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয় করে সীতাকে উদ্ধারের জন্য। কিন্তু, আসল দূর্গা পূজা হলো বসন্তে, সেটাকে বাসন্তি পূজা বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে দেবির অকাল-বোধন বলা হয়। বোধন অর্থ জাগরণ। তাই মহালয়ার পর দেবীপক্ষের (শুক্লপক্ষের) প্রতিপদে ঘট বসিয়ে শারদীয়া দুর্গা পুজার সূচনা করা হয়। প্রসঙ্গতঃ শ্রাবণ থেকে পৌষ ছয় মাস দক্ষিণায়ন, দক্ষিণায়ন দেবতাদের ঘুমের কাল। তাই বোধন অবশ্যই প্রয়োজন হয়। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের আগে এমনই অকাল-বোধন করেছিলেন। তবে সাধারণত আমরা ষষ্ঠি থেকে পূজার প্রধান কার্যক্রম শুরু হতে দেখি যাকে বলা হয় ষষ্ঠাদিকল্পরম্ভা। কিছু প্রাচীন বনেদী বাড়ি এবং কিছু মঠ মন্দিরে প্রতিপদ কল্পরম্ভা থেকে ও পুজো হয়। যদিও প্রতিপদ কল্পরম্ভা থেকে শুরু পুজোতেও আনুষ্ঠানিক মূল কার্যক্রম শুরু হয় ষষ্ঠি থেকেই এবং সপ্তমী থেকে বিগ্রহতে। প্রতিপদ থেকে শুধু ঘটে পূজো ও চণ্ডী পাঠ চলে।

সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “দুর্গাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। শ্রীশ্রী চণ্ডী এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে মেধস মুনির আশ্রমেই পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপুজো আয়োজিত হয়েছিল। এটি পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমার কাঁকসার গড় জঙ্গলে অবস্থিত। দুর্গাপুর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে গড় জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে ২-৩ কিলোমিটার গেলেই পাওয়া যাবে মেধসাশ্রম। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের নিকটবর্তী গড় জঙ্গলে মেধসাশ্রমে ভূভারতের প্রথম দুর্গাপূজা হয়। এখানেই রাজা সুরথ বাংলা তথা মর্তে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। কাঁকসার গড় জঙ্গলের গভীর অরণ্যের মেধাশ্রম বা গড়চণ্ডী ধামে কোনও এক সময়ে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ‍্য পুজো শুরু করেন। বসন্তকালে সূচনা হয় পুজোর৷ বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক বা বসন্তকালীন দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। তারপর থেকেই বাংলা তথা ভূভারতে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়।

মহর্ষি মেধস মুনি বলিলেন, “মহামায়া পরমা জননী অর্থাৎ আদিমাতা৷ যখন এই জগৎ ছিল না, তখন তিনি ছিলেন। যখন সূর্য্য ছিল না, চন্দ্র ছিল না, তারা নক্ষত্র এই পৃথিবী কিছুই ছিল না, তখন তিনি ছিলেন। তাঁহা হইতেই এই জগৎ সৃষ্ট হইয়াছে৷ তিনি এই জগৎকে মোহিত করিয়া রাখিয়াছেন বলিয়া তাঁহার নাম মহামায়া। জগৎকে তিনি সৃষ্টি করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জগৎকে ধরিয়া আছেন, এই জন্য তাঁহার আর এক নাম জগদ্ধাত্রী। তিনি ধারণ করিয়া না থাকিলে উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গেই এ জগতের- লয় হইয়া যাইত।শক্তিরূপা সনাতনী আপনার বিশ্ব বিমোহিনী মায়া দ্বারা আপনাকে আচ্ছাদিত করিয়া নানারূপে আমাদের মধ্যে লীলা করিতে আসেন। কখনও তিনি পিতা মাতার কাছে নন্দিনী, ভ্রাতার কাছে ভগিনী, পতির কাছে জায়া, পুত্র কন্যার কাছে জননী। কখনও তিনি দীনের কাছে দয়া; তৃষিতের কাছে জল, রোগীর কাছে সেবা, ক্ষুধিতের কাছে ফল। কখন কত মূর্তিতে যে মা আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হন তাহা আর কি বলিব ? তাঁহার গুণ বর্ণনা করিয়া শেষ করিতে পারে, এমন শক্তি এ জগতে কার আছে ? তিনি আসিলেই জীবের সকল দুর্গতির অবসান হয়। এইজন্য তাঁহার আর এক নাম দুর্গা। দুর্গতিনাশিনী শ্রীদুর্গাই ভুবনমোহিনী ত্রিজগৎ প্রসবিনী আদ্যাশক্তি মহামায়া।

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত একটি প্রধান উৎসব। বর্তমানে এটি সারা বিশ্বে পালিত হয়, তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ওড়িশা, বিহার, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ (পূর্বাঞ্চল) এবং বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এটি বাংলা বর্ষপঞ্জির আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব, যার মধ্যে শেষ পাঁচটি দিন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্বিনের নবরাত্রির পূজা শারদীয় পূজা এবং বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক বা বসন্তকালীন দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর (UNESCO) অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়। কলকাতা শহর এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবকে (UNESCO) আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে মাদুর্গার আগমন আর গমন দশমীতে। এই দুই দিন সপ্তাহের কোন বারে পড়ছে, তার উপরই নির্ভর করে দেবী কিসে আসবেন বা কিসে যাবেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে “রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া,ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ, গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং নৌকায়াং বুধ বাসরে।।” শুরুতেই বলা হচ্ছে, ‘রবৌ চন্দ্রে গজারূঢ়া’ অর্থাৎ, সপ্তমী যদি রবিবার বা সোমবার হয়, তাহলে দুর্গার আগমন হবে গজে বা হাতিতে। একই ভাবে, দশমীও রবি বা সোমে পড়লে দুর্গার গমন বা ফেরা হবে গজে। এরপর বলা হচ্ছে, ‘ঘোটকে শনি ভৌময়োঃ’ অর্থাৎ শনি বা মঙ্গলবার সপ্তমী পড়লে দেবীর আগমন হবে ঘোটকে বা ঘোড়ায়। দশমীও শনি বা মঙ্গলে পড়লে ফিরবেন ঘোড়ায়। তারপর রয়েছে, ‘গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং’ অর্থাৎ বৃহস্পতি বা শুক্রবারে সপ্তমী পড়লে দেবী দোলায় আসবেন আর দশমী পড়লে দেবী দোলায় ফিরবেন। সব শেষে বলা হচ্ছে, ‘নৌকায়াং বুধবাসরে’ অর্থাৎ, বুধবার সপ্তমী পড়লে দেবীর নৌকায় আগমন এবং দশমী পড়লে নৌকায় গমন। এই হল সপ্তাহের সাত দিনের নিয়ম। যেমন, এই বছর দুর্গাপুজোর সপ্তমী পড়েছে বৃহস্পতি, অর্থাৎ হিসেব মতো এ বার দেবীর আগমন দোলায়। আবার, দশমী পড়েছে শনিবার, ফলে দেবীর গমন হবে ঘোটকে।

দুর্গাপুজোর সন্ধিপূজা মহাঅষ্টমীর শেষদন্ড ও মহানবমীর প্রথমদণ্ডে অনুষ্ঠিত খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত গুরুত্বপূর্ণ হবার কারণ পুরাণে পাওয়া যায়। অষ্টমীতিথির শেষ ২৪মিনিট ও নবমীতিথির প্রথম ২৪মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮মিনিট সময়ের যে মহাসন্ধিক্ষণ সেই সময়ে সন্ধিপূজা করা হয়। বলা হয়ে থাকে ঠিক এই সময়েই দেবী দুর্গা চন্ড ও মুন্ড নামে দুই ভয়ঙ্কর অসুরের নিধন করেছিলেন। এই ঘটনাটি মনে রাখার জন্যই প্রতি বছর অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে এই সন্ধিপূজা করা হয়। দুর্গা পুজোর এই মহাসন্ধিক্ষনে মহাশক্তিশালী “চামুন্ডা কালিকা” দেবীরই আরাধনা করা হয়। সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নিয়মটি চিরাচরিত, এর কোনো অন্যথা করা হয় না। বলা হয় পদ্ম হল ভক্তির প্রতীক এবং প্রদীপ জ্বালানো জ্ঞানের প্রতীক। আর এই যে চণ্ড এবং মুণ্ড হল যথাক্রমে মানুষের মনের প্রবৃত্তি বা নিবৃত্তি এর প্রতীক। প্রবৃত্তি অর্থে ভোগ এবং নিবৃত্তি অর্থে ত্যাগ। মোক্ষলাভের জন্য এই দুইকেই বধ করার মাধ্যমে দেবী চণ্ডীর পূজা করা হয় এবং তা করা হয় এই সন্ধিপূজায়।

দুর্গাপুজোর যেটি বহুল প্রচলিত রূপ- তা হল ষষ্ঠাদি কল্প। এই নিয়ম অনুযায়ী মহানবমীর পুজা অন্তিম পুজা। সংকল্পে ‘মহানবমী যাবৎ’ এর সংকল্প গ্রহণ করা হয়। চণ্ডিপাঠ, দুর্গানাম জপ মহানবমী অবধি অনুষ্ঠানের সংকল্প নেওয়া হয় বোধনের দিন। সেই মতো হোমের মাধ্যমে মহানবমীতে দেবীর সংকল্পিত মহাপুজার ইতি ঘটে। এরপর দশমী পুজা শুধুমাত্র দেবী বিদায়ের আচরিত সংক্ষিপ্ত পুজা। মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী এবং বিজয়া দশমী হিসেবে পরিচিত। তবে বিজয়া দশমীর দিন চারিদিকে বাজে বিষাদের সুর। কারণ উমার ফিরে যাওয়ার পালা। বিজয়া দশমী দুর্গাপুজোর উৎসবের শেষ দিন। প্রতিমাগুলি বরণ করে মহিলারা ‘সিঁদুর খেলা’-এ মেতে ওঠেন। এরপর জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়ার হয় প্রতিমাগুলি। ঘট বিসর্জনের অর্থ, পুজো সমাপ্তি। বিসর্জনের সময় লম্বা শোভাযাত্রা বের করে। যেখানে নাচে-গানে, হাসি-কান্না মুখে সকলে বিদায় জানান উমাকে। এদিন বরণ, সিঁদুর খেলা, বিসর্জনের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর ও বিজয়া উৎসবের সমাপ্তি হয়।

আবার বারো ইয়ার বা বন্ধু মিলে ওই পুজো ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ পূজা নামে খ্যাত হয়। সেই থেকেই আজকের বারোয়ারি পুজোর বিবর্তন। সেদিনের সেই ‘বারোয়ারি’ কথাটি ধীরে ধীরে বর্তমানে আপামর বাঙালির ‘সর্বজনীন’ কিংবা ‘সার্বজনীন’ এ রূপান্তরিত। সার্বজনীন পূজা ছাড়া ও বর্তমানে রাজবাড়ী, জমিদার বাড়ি, কিছু প্রাচীন বনেদী বাড়ি এবং কিছু মঠ মন্দিরে এছাড়া ও বিভিন্ন আশ্রম, মঠ ও মিশনে সন্ন্যাসীরা দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। কিন্তু, *বাংলায় অসুরদের দ্বারা মা অভয়ার মর্মান্তিক পরিণতির জন্য এই বছর সব যেন কেমন বিষণ্ণ, মলিন, কোথাও যেন প্রাণের ছোঁয়া নেই।* আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, আর মা দূর্গার মর্ত্যে অবতরণ সকল মর্ত্যবাসীর জন্য সুসংবাদ ও আনন্দ নিয়ে আসুক, অসুরদের বধ হোক, জয় মা দুর্গা-জয় মা দূর্গা-জয় মা দূর্গা দূর্গতিনাশিনী… জগৎ জননী মাদূর্গা তোমার আশির্বাদ সকলের মস্তকে বর্ষিত হোক। জগৎ গুরু ভগবান স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের শুভ ও মঙ্গলময় আশির্বাদ আপনাদের সকলের শিরে বর্ষিত হোক, পিতা-মাতার আশির্বাদ সকলের শিরে বর্ষিত হোক, এই প্রার্থনা করি.!
ওঁ গুরু কৃপা হি কেবলম্ ।l
স্বামী আত্মভোলানন্দ (পরিব্রাজক)

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং এর গুরুত্ব।।।

১৯৯৫ সাল থেকে, প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।  শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করতে এই দিনটি পালন করা হয়।
ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।
বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়।  এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল এবং এর ৪০১টি সদস্য সংস্থা এই দিবসটি উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  দিবসটি উপলক্ষে, জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার অবদান স্মরণ করতে ইআই প্রতি বছর একটি থিম নির্বাচন করে।
ইতিহাস—
৫ অক্টোবর, 1966-এ UNESCO/ILO শিক্ষকদের মর্যাদা বিস্তারিত করার জন্য ফ্রান্সের প্যারিসে একটি আন্তঃসরকারি সম্মেলনের আয়োজন করে এবং সম্মেলনের শেষে ইউনেস্কো এবং ILO-এর প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনের সুপারিশে স্বাক্ষর করেন।  প্রথমবারের মতো, এই সুপারিশটি বিশ্বজুড়ে শিক্ষকদের অধিকার, এবং দায়িত্ব এবং শিক্ষকতা পেশার বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেছে।
১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর, UNESCO শিক্ষকদের অংশগ্রহণ ও উন্নয়নে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার জন্য এবং শিক্ষার বিষয়ে শিক্ষকদের সমস্যা এবং অগ্রাধিকারগুলি তুলে ধরার জন্য প্রথম বিশ্ব শিক্ষক দিবস তৈরি করে।  ৫অক্টোবর তারিখটিকে আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষক দিবস উদযাপনের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল কারণ এটি ছিল ১৯৬৬ ILO/UNESCO সুপারিশ গ্রহণের বার্ষিকী।  এই সুপারিশ গ্রহণ করার সময়, সরকার যোগ্য, যোগ্য এবং অনুপ্রাণিত শিক্ষকের গুরুত্ব উপলব্ধি করে।
১১ নভেম্বর, ১৯৯৭-এ, ইউনেস্কোর ২৯ তম অধিবেশন চলাকালীন, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকতা ও গবেষণা কর্মীদের কভার করার জন্য একটি সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৩ থিম—
এই বছর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনের মূল প্রতিপাদ্য কেন্দ্রীভূত হবে, ‘আমাদের যে শিক্ষার জন্য শিক্ষক প্রয়োজন: শিক্ষক ঘাটতি দূর করার জন্য বিশ্বব্যাপী অপরিহার্য।’  থিমটির লক্ষ্য বিশ্বে শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যার উন্নতি করা।
শিক্ষক দিবসের গুরুত্ব—-
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের সেবা এবং শিক্ষায় তাদের অবদানকে স্বীকৃত করা হয় এবং ছাত্র ও সমাজের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা ও গুরুত্বের প্রশংসা করা হয়।
শিক্ষক দিবস এমন একটি উপলক্ষ যা শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং তাদের পেশা সম্পর্কিত কিছু সমস্যা সমাধানের প্রবণতা রাখে এবং তাই এই পেশার প্রতি উজ্জ্বল তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।
বিভিন্ন সংস্থা যেমন UNESCO, Education International (EI), UNICEF, UNDP, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), ইত্যাদি এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচারাভিযান এবং সম্মেলনের আয়োজন করে।  ইউনেস্কো প্রতি বছর এই দিবসের জন্য একটি থিম বরাদ্দ করে এবং এই থিমের উপর প্রচারণা চালায়।
UNESCO হামদান বিন রশিদ আল-মাকতুম পুরস্কার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রতি দুই বছর পর পর অসাধারণ শিক্ষকদের জন্য US$300,000 প্রদান করা হয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৩  বৃহস্পতিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৩—-
শিক্ষক দিবস একটি বিশ্বব্যাপী পালনীয় এবং এটি সরকারি ছুটির দিন নয়।  বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনের তারিখ দেশ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।  উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘ (UN) বেশ কয়েকটি দেশের সাথে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর এই দিনটি উদযাপন করে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার মে মাসের প্রথম পূর্ণ সপ্তাহে এবং অস্ট্রেলিয়া অক্টোবরের শেষ শুক্রবার এটি পালন করে।
১০০ টিরও বেশি দেশ বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে স্মরণ করে এবং প্রতিটি দেশ এই অনুষ্ঠান উদযাপনের জন্য নিজস্ব তারিখ রাখে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—-
বিশ্ব শিক্ষক দিবস একটি বিশ্বব্যাপী পালন।  এটা সরকারি ছুটির দিন নয়।
ইউনেস্কো প্রতি বছর এই দিবসের জন্য একটি থিম বরাদ্দ করে।
১০৯ টিরও বেশি দেশ বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে স্মরণ করে এবং প্রতিটি দেশ নিজস্ব উদযাপন করে।
প্রথম বিশ্ব শিক্ষক দিবস ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর, শিক্ষকদের মর্যাদা সম্পর্কিত ILO/UNESCO সুপারিশের ১৯৬৬ সালের বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  এই সুপারিশটি শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, মান, নিয়োগ, এবং শিক্ষাদান ও শেখার শর্ত বর্ণনা করে।
১৯৯৭ সালে, ইউনেস্কোর ২৯ তম অধিবেশন চলাকালীন, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষকতা ও গবেষণা কর্মীদের কভার করার একটি সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল।
ইউনেস্কো সু-প্রশিক্ষিত এবং যোগ্য শিক্ষকের সরবরাহকে তার শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলির মধ্যে একটি করে তুলেছে।
ইউনেস্কোর মতে, একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক হলেন সেই ব্যক্তি যার নির্ধারিত যোগ্যতা রয়েছে এবং তিনি ন্যূনতম সংগঠিত শিক্ষাগত শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, যা একটি প্রদত্ত দেশে প্রাসঙ্গিক স্তরে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষকতা পেশাকে প্রচার করার একটি সুযোগ।
২০০২ সালে, কানাডা একটি ডাকটিকিট জারি করে বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে সম্মানিত করে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য কী?
শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের অবদানের জন্য শিক্ষকদের সম্মান ও প্রশংসা করার জন্য বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়।  এদিন স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের সম্মানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং গুরুত্ব।

ভূমিকা—–

 

আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস হল একটি আন্তর্জাতিক দিন যা অনুবাদ পেশাদারদের স্বীকৃতি দেয়।  এটি ৩০ সেপ্টেম্বর, যেটি সেন্ট জেরোমের ভোজের দিন, বাইবেল অনুবাদক যাকে অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক বলে মনে করা হয়।

 

আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস কবে—

 

প্রতি বছর ৩০শে সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস পালিত হয় অনুবাদক, ভাষা পেশাজীবীদের কাজকে উদযাপন করার জন্য যারা বিশ্ব শান্তির উন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণে অবদানকারী দেশগুলোর মধ্যে সংলাপ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

বিশ্ব অনুবাদক সম্প্রদায়ের সংহতি প্রদর্শন এবং অনুবাদের পেশাকে উন্নীত করার জন্য আন্তর্জাতিক অনুবাদক ফেডারেশন (এফআইটি) দ্বারা ১৯৯১ সালে দিবসটি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।  ফেডারেশন হল অ্যাসোসিয়েশনগুলির একটি সমষ্টি যা অনুবাদক, দোভাষী এবং পরিভাষাবিদদের প্রতিনিধিত্ব করে।  এটি ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 

দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ এটি একই দিনে সেন্ট জেরোমের পরব উদযাপিত হয়।  সেন্ট জেরোম অনুবাদ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসাবে বিবেচিত এবং অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক সন্ত।  তিনি একজন খ্রিস্টান পণ্ডিত এবং পুরোহিত ছিলেন যিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি বাইবেলটিকে মূল হিব্রু থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন যাতে এটি পাঠকদের কাছে আরও সহজলভ্য হয়।

 

আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস সম্প্রতি বিশ্ব ইভেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।  জাতিসংঘ (ইউএন), ২৪ মে, ২০১৭ তারিখে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস হিসাবে ঘোষণা করার জন্য একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

 

জাতিসংঘের প্রস্তাব—-

 

২৪ মে ২০১৭-এ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৭১/২৮৮ রেজোলিউশন পাশ করে ৩০ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস ঘোষণা করে, যা জাতিকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে পেশাদার অনুবাদের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়।  খসড়া রেজোলিউশন A/71/L.68 এগারোটি দেশ স্বাক্ষর করেছে: আজারবাইজান, বাংলাদেশ, বেলারুশ, কোস্টা রিকা, কিউবা, ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে, কাতার, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান এবং ভিয়েতনাম।  ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ট্রান্সলেটরস ছাড়াও, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ কনফারেন্স ইন্টারপ্রেটার্স, ক্রিটিক্যাল লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রফেশনাল ট্রান্সলেটরস অ্যান্ড ইন্টারপ্রেটার্স, রেড টি, ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অফ সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার্স সহ আরও কয়েকটি সংস্থার দ্বারা এই রেজোলিউশনটি গ্রহণের পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছিল।  .
জাতিসংঘ আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান, স্প্যানিশ এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদের জন্য একটি বার্ষিক সেন্ট জেরোম অনুবাদ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

 

 ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ট্রান্সলেটর—

 

১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই উদযাপনগুলিকে International Federation of Translators (FIT) দ্বারা প্রচার করা হয়েছে৷ ১৯৯১ সালে, FIT একটি পেশা হিসেবে অনুবাদকে প্রচার করার প্রয়াসে বিশ্বব্যাপী অনুবাদক সম্প্রদায়ের সাথে সংহতি দেখানোর জন্য একটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসের ধারণা চালু করে৷  যা বিশ্বায়নের যুগে ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

 

 আমেরিকান অনুবাদক সমিতি—

 

২০১৮ সাল থেকে আমেরিকান ট্রান্সলেটর অ্যাসোসিয়েশন প্রফেশনাল অনুবাদক এবং দোভাষীদের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার এবং জনসাধারণকে শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলির একটি সিরিজ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস উদযাপন করেছে।  ATA ছয়টি ইনফোগ্রাফিকের একটি সেট প্রকাশ করে ITD 2018 উদযাপন করেছে যা পেশা সম্পর্কে তথ্য চিত্রিত করে।  ২০১৯ সালে, ATA “অনুবাদক বা দোভাষীর জীবনে একটি দিন” চিত্রিত একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসের তাৎপর্য—-

 

বিশ্ব বিশ্বায়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে অনুবাদকদের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।  ভাষা পেশাদাররা একটি ইতিবাচক পাবলিক বক্তৃতা এবং আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগে সাহায্য করে।

 

অনুবাদকরা সাহিত্যিক কাজ, বৈজ্ঞানিক কাজ, প্রযুক্তিগত কাজ সহ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় স্থানান্তর করতে সহায়তা করে যা একটি উন্নত বিশ্বের দিকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে।  তারা একে অপরের সংস্কৃতি বুঝতে সাহায্য করে যা অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে উৎসাহিত করে।

 

তারা সঠিক অনুবাদ, ব্যাখ্যা এবং পরিভাষায় সাহায্য করে যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

অনুবাদক এবং ভাষা পেশাদারদের কাজ কেবলমাত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যখন আমরা আরও আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের দিকে অগ্রসর হব।

 

২০২৩ সালে, আমরা স্পিচ-টু-স্পিচ এবং স্পিচ-টু-টেক্সট অনুবাদে আরও উন্নয়নের মাধ্যমে অনুবাদ শিল্পে আরও উন্নতির আশা করতে পারি।  AI মেশিন অনুবাদ প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে, এটিকে আরও দক্ষ এবং নির্ভুল করে তুলবে৷ অনুবাদের ভবিষ্যত মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং AI-চালিত মেশিন অনুবাদের মধ্যে সহযোগিতার মধ্যে নিহিত৷  মানব অনুবাদকরা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং নির্দিষ্ট শ্রোতাদের জন্য অনুবাদকে অভিযোজিত করার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করে, যখন AI পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলি স্বয়ংক্রিয় করার জন্য আদর্শ।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

রথ যাত্রা : শীলা পাল।

শুনেছি সোজা রথ দেখলে নাকি উল্টোরথ দেখতে হয়।মনে বাসনা ছিল অনেকদিনের
সুযোগ এসে গেল।দশ বারো বছর আগে।আমরা ছসাতজন মিলে ঠিক করলাম এবং উল্টোরথের দু দিন আগে পুরী গিয়ে পৌঁছলাম।বাপরে কি ভীড় কি ভীড় ।লোক থৈ থৈ করছে।আমরা গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম ।ভুবনেশ্বর থেকে পুরী ঢুকতে মধ্য রাত হয়ে গেল।গাড়ির ভীড় মানুষের ভীড় দেখে আমার রথ দেখার ইচ্ছে টাই যেন চলে গেল।কেমন যেন বুকের ভেতর টা গুড়গুড় করছে।কি জানি বাবা দর্শন হবে তো।
পরের দিন গাড়ি চলবে সকালে।ঠিক হোলো মাসির বাড়ি গিয়ে জগন্নাথ দর্শন করে আসবো।বেশ ফাঁকায় ফাঁকায় প্রভুর দর্শন হয়ে গেল।মন তৃপ্তিতে ভরে গেল।এবার রথে একবার দর্শন হলেই পুণ্য অর্জন ভালোই হবে।আমাদের দুজন অভিভাবক ছিলেন সঙ্গে ।এক আমার বেয়াইমশাই আর তার বন্ধু ।তিনি পুরীর বাসিন্দা।এবং বেশ নাম আছে ওখানে।আমার বেয়ায়মশাইদের জমিদারি ছিল ।এবং পুরীতে বেশ বড় বাড়ি এবং পরিচিতি দেখলাম ।ঠিক হোলো মন্দিরের কাছাকাছি রথ এলে আমাদের জানাবেন আমরা বাড়ি থেকে একটু আগে বেরিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে রথ যাত্রা দেখবো।
উল্টোরথের দিন প্রভু যাত্রা করেছেন ।আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে রথ আর যাবে না।আমরা রাতে গিয়ে রথে প্রভু জগন্নাথ কে দেখে এলাম ।পান্ডারা বললেন ভোরে রথ মন্দির অভিমুখে যাবে।আমরা ঠিক করলাম ভোরে এসে রথের দড়ি স্পর্শ করে যাবো।আমার বেয়ান খুব হুল্লোড়বাজ।আমাকে কানে কানে বললো দিদি ওরা বলুক আমরা রথ টানবো।আমি ভয়ে বললাম না না এই ভীড়ের মধ্যে মাথা খারাপ ।
ভোরে স্নান টান করে রথ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে এসে দাঁড়ালাম।একটি দোকানের সামনে ভালো দেখা যাবে।সবই ওই অভিজ্ঞ বন্ধু টির পরামর্শ মতো।আমরা রথ তৈরি হচ্ছে সেই সময় দড়ি ধরে দাঁড়ালাম।আস্তে আস্তে যখন চলবে একটু টেনেই চলে আসবো টানাও হবে পুণ্য ও হবে।সেইমতো সবাই গিয়ে রথের দড়ি ধরে দাঁড়ালাম।রথ চলতে শুরু করলো ওরা পেছন থেকে ডাকছে এবার চলে এসো।সুপ্রিয়া আমার হাত চেপে ধরে থাকলো।সবাই বেরিয়ে গেল রথ জোরে ছুটছে আমরা দুজনে ছুটছি।কি জোরে যাচ্ছে আমরাও সেই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ লোকের সঙ্গে দড়ি ধরে ছুটে চলেছি।কি আনন্দ কি আনন্দ ভোরের পবিত্র আলোয় যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছি।কোনও ভয় নেই ভাবনা নেই পিছুটান নেই প্রভুর রথের দড়ি ধরে ছুটে চলেছি।কি উদ্দেশ্যে জানি না কি মনস্কামনা ভুলে গেছি কি প্রার্থনা করবো ভুলে গেছি শুধু সামনে জগন্নাথ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন এই আনন্দে যেন সারা শরীর মন অপার্থিব পরিতৃপ্তি তে ভরে যাচ্ছে ।একবার রথ থামলো।অনেকে ভেতরে ঢুকে মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে বলছে আরতি করো মা আমরা মনের সুখে দুজনে আরতি করলাম ।প্রভু জগন্নাথ তুমি দয়া করো।একটা বাচ্চা ছেলে নারকেল এনে বললো প্রভুকে নিবেদন করো।নারকেল ফাটিয়ে প্রভুকে পথের ধুলোমাখা নৈবেদ্য দিলাম।তুমি তো আজ পথেই আছো প্রভু তাই এই নিবেদন গ্রহণ করো মনে মনে বলি।বাচ্চা টা টাকা চাইলে যা হাতে উঠে এলো দিয়ে দিলাম ।হিসেব করি নি নিজেই যে বেহিসেবি এখন।
রথ আবার চলতে শুরু করলো সুপ্রিয়া বললো দিদি বেরিয়ে পড়ি চলো।এবার জোরে ছুটবে আর বেরোতে পারবো না।ভীড় ঠেলে বাইরে আসি দূরে মন্দিরের চূড়ো ঝকঝক করছে।
অনেক দূরে চলে এসেছি।রাস্তা ফাঁকা ।ওদের খুঁজতে খুঁজতে হাঁটছি।দেখতে পাচ্ছি না ।
এদিকে ওরা রথ যাওয়ার সময় চোখ বুজে সবাই যখন আত্মমগ্ন সেই তালে তো আমরা পালিয়েছি।প্ল্যান তো আগেই করা ছিলো। এদিকে আমাদের না পেয়ে ওখানে তো হুলুস্থুলু কান্ড।নির্ঘাত আমরা হারিয়ে গেছি ঐ ভীড়ের মধ্যে কি করবো কোথায় যাবো ভেবে অস্থির ।শেষ মেশ যখন পুলিশকে জানাতে যাবে আমার দিদি চেঁচিয়ে বললো ওই তো আসছে ওরা।আমরা ভয়ে ভয়ে এসে ওদের কাছে আসতেই আমার বেয়াইমশায়ের উৎকন্ঠিত গলা আপনার ছেলেকে আমি কি বলতাম দিদি।
ভেতরটা হাসিতে ফেটে পড়ছে।বাড়ি ফিরে আগে আমরা দুজনে প্রাণ খুলে হেসে নিলাম।তারপর ভালমানুষের মতো এসে বললাম আমরা বুঝতে পারি নি রথ জোরে ছুটছিল বেরোতে ও পারছিলাম না।উনি আমাদের মন খারাপ দেখে বললেন ঠিক আছে।বিদেশ বিভুঁয়ে চিন্তা হয়।আপনি ভীতু মানুষ ।
জয় জগন্নাথ ক্ষমা করে দিও।
মনে মনে বলতে থাকলাম
জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার, জন্ম দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার । তাঁর পসম্পর্কে বলা যেতে পারে, তিনি লেখক, দার্শনিক, পণ্ডিত, অনুবাদক, প্রকাশক ও মানবহিতৈষী । সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন । সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও অপরবোধ্য করে তোলেন । বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার তিনিই ।
বিদ্যাসাগরের যখন জন্ম (১৮২০), তখন শিক্ষা সংস্কারে ও বাংলা ভাষার আধুনিকরণের একটা ডামাডোল পরিস্থিতি । বিশৃঙ্খলার বাতাবরণ । শিক্ষার লক্ষ্য, পদ্ধতি ও পাঠক্রম নিয়ে চলছিল নানান বিতর্ক । অথচ বাঙালী সমাজ জানে, আধুনিক শিক্ষা ও সমাজ  সংস্কারে বিদ্যাসাগরের গৌরবময় অবদানের কথা ।

তাঁর নির্মিত বাংলা ভাষার ভিত্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম অধ্যায় । বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে বোধগম্য এবং সবরকমের ভাব ও চিন্তা প্রকাশের যোগ্য করে তুলেছিলেন । তাই আজও বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় ।
আটপৌরে বাঙালি পোশাকে বিদ্যাসাগর ছিলেন সর্বত্রগামী । প্রবল জেদ ও আত্নসম্মানবোধ নিয়ে সরকারি চাকরি করেছেন, দ্বিরুক্তি না করে ইস্তফা দিয়েছেন । পাঠ্যবই লিখে ছেপে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন, দানের জন্য ধারও করেছেন ।  উনিশ শতকে সমাজ বদলের সব আন্দোলনেই তিনি ছিলেন পুরোভাগে । এমন ব্যক্তিত্ব সবসময়ে  ব্যতিক্রম ।
বিদ্যাসাগরের একটা আপ্ত বাক্য আজও সমাজজীবনে উজ্জীবিত, “কোনো বিষয়ে প্রস্তাব করা সহজ, কিন্তু নির্বাহ করে ওঠা কঠিন” । অথচ তিনি এককভাবে ধুতিচাদর পরে একটার পর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করে গেছেন, যেমন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ শিক্ষার সংস্কার ও বিধবা বিবাহ প্রচলন । এটা সর্বজনবিদিত, বিদ্যাসাগরের লড়াইটা ছিল একার লড়াই । বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বিশ্বকবি  রবীন্দ্রনাথের  মন্তব্য পরিষ্কার, তিনি গতানুগতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন  স্বতন্ত্র, সচেতন ও পারমার্থিক ।
এটা অনস্বীকার্য যে,  বাঙালী সমাজে আজও বিদ্যাসাগরের প্রদীপ্ত উপস্থিতি ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে । প্রাথমিক শিক্ষায় ‘বর্ণপরিচয়’ এর  মাহাত্ম্য সকলের জানা । মুর্শিদাবাদ  জেলার শক্তিপুর হাই স্কুলের বাংলা ক্লাসের  দিদিমণি আমার রচনা লেখার গঠন অবলোকন করে হঠাৎ তাঁর সম্মুখে তিনি আদর করে ডেকে আমাকে বললেন, “তুই বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থের নাম শুনেছিস” ? মাথা নেড়ে আমি  বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় গ্রন্থটির নাম শুনেছি জানালাম ।  তারপর চুপি চুপি বাংলা বিষয়ের শ্রদ্ধেয়া দিদিমণি বললেন, রোজ রাতে শোওয়ার আগে বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’  বইখানা পড়বি । রচনা লেখার সময়ে তোর বানানের জড়তা কেটে যাবে ।“  সুতরাং শৈশব থেকে বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রেক্ষাপটে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় আজও অমলিন । সেই বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত  । তাই দুশো বছর ধরে শিক্ষা জীবনের বাস্তবতায় ও শিক্ষা বিকাশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যাসাগর আজও প্রাসঙ্গিক ।
বিদ্যাসাগর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন সেই  সময়টা ছিল রামমোহনের যুগ, যিনি একজন শিক্ষিত ও অগ্রণী পুরুষ ছিলেন এবং সমাজ সংস্কারের অন্যতম কারিগর ।  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর  মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা পুরুষ। তিনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধায় কলকাতায় স্বল্প বেতনের চাকরিতে খুব কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করতেন । পরিবার নিয়ে শহরে বাস করা তাঁর সাধ্যের অতীত ছিল। সেই কারণে বালক ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ভগবতী দেবী’র  সঙ্গে বাস করতেন।
পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের পাঠশালায় পাঠানো হয়। ১৮২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে কলকাতার একটি পাঠশালায় এবং ১৮২৯ সালের জুন মাসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির ছ’মাসের মধ্যেই পাঁচ টাকা বৃত্তি পান ।  তাঁর প্রতিভার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে শিক্ষকেরা সকলে স্তম্ভিত । তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্মজীবন শুরু করেন ফোর্ট উইলিয়াম (১৮৪১) কলেজের প্রধান পন্ডিত হিসাবে । ঐসময়েই  তাঁর ইংরেজি শিক্ষার যথাযথ শিক্ষালাভ । কেননা বিদ্যাসাগরকে সকলে জানতেন সংস্কৃতের পণ্ডিত হিসাবে । ইংরেজি হাতের লেখাও ছিল নজরকাড়া । ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পদ লাভ করেন এবং পরের মাসে অর্থাৎ ১৮৫১ সালের ২২শে জানুয়ারী ঐ  কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের অনেক সংস্কার করেন।  ঐ সময়েই ১৮৫১ সালে বিদ্যালয় দেখলেন, সংস্কৃত কলেজে গোড়া থেকেই  শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সন্তানদের পড়বার অধিকার ছিল । কিন্তু বৈদ্যদের আবার ধর্মশিক্ষায় ছিল আপত্তি । স্বভাবতই প্রশ্ন উঠল কায়স্থ ও অন্যান্য হিন্দু বর্ণদের কথা । তখনকার পণ্ডিত সমাজের তোয়াক্কা না করে, বিদ্যাসাগর তদানীন্তন কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারিকে জানিয়ে দিলেন ব্রাম্মণ ও বৈদ্য ছাড়া অন্যান্য বর্ণের বিশেষ করে শূদ্রদের সংস্কৃত কলেজে প্রবেশে তাঁর আপত্তি নেই । যদিও সেই সময় সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকরা বিদ্যাসাগরের মতে গররাজী ছিলেন, তথাপি বিদ্যাসাগরের মতটাকেই মান্যতা দিয়েছিলেন তদানীন্তনকালের কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারি । এবং পর পরই ১৮৫৪ সালের শেষে বিদ্যাসাগর হিন্দুদের সব শ্রেনীর জন্য সংস্কৃত কলেজের দরজা খুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন এবং সেই প্রস্তাব যথাসময়ে অনুমোদিত হয়েছিল ।
সংস্কৃত কলেজের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ এবং বাংলা ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়া,  শিক্ষা প্রসারে তাঁর আরও অবদান সর্বজনবিদিত ।  ১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এবং মেদিনীপুর জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে বাংলা ভাষাকে সহজবোধ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন । ১৮৫৫ সালে বাংলা নববর্ষের দিনে  বর্ণপরিচয়ের প্রথমভাগ  প্রকাশ করে তিনি বাঙালীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর  এশিয়াটিক সোসাইটি (কলকাতা) ও বেথুন সোসাইটিসহ আরও কিছু সংগঠনের সম্মানিত সভ্য ছিলেন। ১৮৫৮ সালে যাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফেলো নির্বাচিত হন,  তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।  ১৮৫৯ সালে তিনি “ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল” স্থাপনে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। ১৮৬৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় “হিন্দু মেট্রেপলিটন ইসস্টিটিউট”। ইংরাজ অধ্যাপকের সাহায্য ছাড়া এবং কোনোরকম সরকারি সাহায্য ছাড়া, বিদ্যাসাগর স্কুলটিকে ১৮৭২ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত করেছিলেন । বর্তমানে এর নাম “বিদ্যাসাগর কলেজ”। এটি দেশের প্রথম কলেজ যার প্রতিষ্ঠাতা – পরিচালক – শিক্ষক স্কলেই ভারতীয় ।  এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন লাভ করেন।
ব্রাম্মণ হয়েও বিদ্যাসাগর ত্রিসন্ধ্যা জপ করেননি । কোনো  মন্দিরে যাননি এবং ঈশ্বর  বিষয়ক কোনো লেখা তিনি লেখেননি । বিদ্যাসাগর ছিলেন নাস্তিক । ধর্ম সম্বন্ধে  তিনি শুধু মনে করতেন জগতের কল্যাণসাধন ও বিদ্যাচর্চা । এপ্রসঙ্গে কবি শঙ্খ ঘোষের উক্তিটি প্রনিধাযোগ্য, ধর্মের কোন বহিরঙ্গ মানতেন না । তিনি, আচরণও করতেন না । এখন যেমন অনেকে বলেন, ধর্মটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, অনেকটা সেইরকম ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ, বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন । সেদিনের সমাজে প্রচলিত প্রথার নির্মম পরিণতির জন্য নারীদের ভাগ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন আপামর জনতা অবলোকন করেছিলেন । শোনা যায়, একসময় রাজা  রাজবল্লভ নিজের বালবিধবা কন্যাকে পুনর্বিবাহ দেওয়ার অনুমতি সমাজের পণ্ডিতদের কাছ থেকে পেয়েও সেই বিবাহ কারও কারও বাধায় দিতে পারেননি ।  বিদ্যাসাগরের “বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা” বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ ও সমাজ চমকে উঠেছিল । শেষ পর্য্যন্ত ১৮৫৫ সালের ১৬ই  জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়  । তারপর ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই বিধবা বিবাহ আইন স্রকারিভাবে আইন হিসাবে মঞ্জর হয় ।   বিদ্যাসাগরের দরদী হৃদয় কেঁদেছিল সেকালের সমগ্র হিন্দু নারী সমাজের দুর্গতি দুর্দশায় । বিধবা বিবাহ আইন নামে পরিচিত ১৮৫৬ সালের আইনটি কেবলমাত্র বিধবা নারীর দ্বিতীয় বিবাহের স্বীকৃতি দেয়নি, আইনটি যেমন বিবাহকে আইনসিদ্ধ করে তেমনই মৃত স্বামীর এবং দ্বিতীয় বিবাহের এবং পৈত্রিক বিষয় সম্পত্তিতে অধিকার সুনিদ্দিষ্ট করে ।  বিভিন্নভাবে জানা যায়, ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত মোট ৬০টি বিধবা বিবাহ সংঘটিত   হয়  ।  আরও      জানা   যায়,   বিদ্যাসাগর     ও  তাঁর বন্ধুরা মিলে ১৮৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রক্ষণশীল সমাজের বিক্ষোভ এবং প্রচণ্ড বাধার মুখে ঘটা করে এক বিধবার বিবাহ দেন। পাত্র ছিল সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের একজন সহকর্মী। তা ছাড়া নিজের একমাত্র পুত্রের সঙ্গে বিধবার বিবাহ দিতে তিনি কুণ্ঠিত হননি। এতে একটা জিনিস পরিস্কার,  বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে বিদ্যাসাগরের দৃঢ় সংকল্প শতভাগ সফল ।
তিনি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন, যাকে পরবর্তীতে বেথুন কলেজ নামকরণ করা হয়। নারীদের শিক্ষার দিকে আনার জন্য তিনি একটি অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন, যা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য যাবতীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হতো। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাস অবধি সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে বিদ্যাসাগর ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের দয়া এবং মানবিকতার জন্যে তিনি করুণাসাগর নামে পরিচিত । দরিদ্রদের দানে তিনি সর্বদাই মুক্তহস্ত ছিলেন ।  তিনি তাঁর দান এবং দয়ার জন্যে বিখ্যাত হয়েছিলেন । এখানে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র উক্তি প্রনিধানযোগ্য,
“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে,
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু ! উজ্জ্বল জগতে
হেমাদ্রির হেম কান্তি অম্লান কিরণে” ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি ঐতিহ্যিক এবং রক্ষণশীল পরিবারে এবং সমাজ সংস্কারের জন্যে তিনি যুক্তিও দিতেন হিন্দু শাস্ত্র থেকে কিন্তু তিনি ছিলেন ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে সন্দিহান মনের। তাঁর বোধোদয় গ্রন্থ যেমন তিনি শুরু করেছেন পদার্থের সংজ্ঞা দিয়ে । পরে সংজ্ঞা দিয়েছেন ঈশ্বরের,  যাঁকে তিনি বলেছেন সর্বশক্তিমান, সর্বত্র বিরাজমান চৈতন্যস্বরূপ।
তিনি তাঁর একক ও সহযোগীর উদ্যোগে রেখে গেলেন আধুনিক ব্যবহারযোগ্য একটি (উচ্চারণ অনুযায়ী ও মুদ্রণযোগ্য) বাংলা ভাষা, প্রাথমিক ও নীতিশিক্ষার বহু জনপ্রিয় গ্রন্থ, বাংলা মাধ্যম স্কুলব্যবস্থা ও নারীশিক্ষার পাকা বুনিয়াদ । মাতৃ/বাংলা ভাষার শিক্ষার আর একটি প্রাক শর্ত হল ভাল পাঠ্যপুস্তকের সুলভতা । বিদ্যাসাগরের সময় তার যথেষ্ট অভাব ছিল । বিদ্যাসাগরকেও অবতীর্ণ হতে দেখা যায় এক দিকে, বাংলায় ব্যকরণসিদ্ধ মুদ্রণযোগ্য অক্ষর ও বানান সংস্কার করে, নানা পাঠ্যপুস্তক রচনা, ছাপা ও বিপণনের আয়োজন । পাঠ্যপুস্তক রচনার পাশাপাশি ছাপা  বইয়ের সম্পাদনা ও সম্মার্জনার প্রতি তাঁর অখণ্ড মনোযোগ চিরদিন বজায় ছিল । একবার  তিনি হতদরিদ্র সাঁওতালদের মাঝে দিন কাটাচ্ছেন তিনি, সেই সময় (১৮৭৮) চর্যাপদের আবিস্কর্তা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও তাঁর এক সঙ্গী লখনউ যাওয়ার পথে এক রাত বিদ্যাসাগরের আতিথ্যগ্রহণ করেন । রাত্রে বিশ্রামের পর সকালে উঠে শাস্ত্রী মশাই দেখলেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয় বারান্দায় পাইচারি করিতেছেন এবং মাঝে মাঝে টেবিলে বসিয়া কথামালা কি বোধোদয়ের প্রূফ দেখিতেছেন । প্রূফে  বিস্তর কাটকুটি  করিতেছেন । যেভাবে প্রূফগুলি পড়িয়া আছে, বোধ হইল, তিনি রাত্রেও প্রূফ দেখিয়াছেন । আমি বলিলাম, কথামালার প্রূফ আপনি দেখেন কেন ? তিনি বলিলেন, ভাষাটা এমন জিনিস, কিছুতেই মন  স্পষ্ট হয় না ; যেন আর একটা শব্দ পাইলে ভাল হইত ; — তাই সর্বদা কাটকুটি করি । ভাবিলাম — বাপ রে, এই বুড়ো বয়সেও ইহার বাংলার ইডিয়ামের ওপর এত নজর ।“ (সূত্রঃ অ-বা-প,পৃঃ৪/ ২৭-৯-১৯) ।
এই অনন্য ও  বিরাট ব্যক্তিত্বের মানুষটি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ধর্মের কোনও বহিরঙ্গ মানতেন না এমনকি, আচরণও করতেন না ।   অথচ চালচলনে তিনি ছিলেন নিতান্তই সাদাসিধে ।  খুব বিনয়ী  এবং জীবনে  দৃঢ় সংকল্প এবং উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ছিলেন  তিনি দৃঢ় মনোভাবাপন্ন । তিনি ছিলেন  একাধারে মহান সমাজ সংস্কারক  অন্যদিকে এক জন শিক্ষাবিদ  এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন অবিরাম । ভারতে শিক্ষার প্রতি তার অবদান এবং নারীর অবস্থার পরিবর্তন জন্য তিনি চিরস্বরণীয়। তাঁর অবর্ণনীয় মাতৃ ভক্তি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও চর্চিত ।
হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারের বিরোধী, বিধবা বিবাহের প্রচলনকারী, নারী শিক্ষার প্রবর্তক, উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সমাজ সংস্কারক, বর্ণপরিচয় ও বহু গ্রন্থের রচয়িতা, মহান শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনের প্রাক্কালে তাঁর মহান স্মৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য ।

 

কলমে : দিলীপ  রায়।
————————-০——————————

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস : একটি অনন্য অ্যান্টার্কটিক ল্যান্ডমার্ক।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রত্যন্ত কোণগুলির মধ্যে একটিতে অবস্থিত, অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস একটি আকর্ষণীয় আকর্ষণ যা বন্যপ্রাণী, ফিলাটেলি এবং অ্যাডভেঞ্চারকে একত্রিত করে। এই অদ্ভুত ফাঁড়িটি পর্যটক, গবেষক এবং স্ট্যাম্প সংগ্রহকারীদের জন্য একইভাবে একটি প্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

*ইতিহাস*

পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস, আনুষ্ঠানিকভাবে পোর্ট লকরয় পোস্ট অফিস নামে পরিচিত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় 1944 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে, এটি একটি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি হিসাবে কাজ করেছিল, কিন্তু 1996 সালে, এটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল এবং একটি পোস্ট অফিস এবং যাদুঘর হিসাবে পুনরায় চালু করা হয়েছিল। আজ, এটি অস্ট্রাল গ্রীষ্মকালে (নভেম্বর থেকে মার্চ) কাজ করে এবং যুক্তরাজ্য অ্যান্টার্কটিক হেরিটেজ ট্রাস্ট (ইউকেএএইচটি) এর স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল দ্বারা কর্মরত।

*অনন্য বৈশিষ্ট্য*

1. *দূরবর্তী অবস্থান*: পোস্ট অফিসটি অ্যান্টার্কটিকার পোর্ট লকরয়ের উপকূলে গৌডিয়ার দ্বীপে অবস্থিত। দর্শকদের অবশ্যই নৌকায় করে আসতে হবে, বরফের জল এবং অনাকাঙ্খিত আবহাওয়ার সাহস।
2. *পেঙ্গুইন প্রতিবেশী*: পোস্ট অফিসটি একটি সমৃদ্ধ জেন্টু পেঙ্গুইন কলোনির সাথে তার অবস্থান শেয়ার করে। দর্শনার্থীরা অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার জন্য এই ক্যারিশমাটিক পাখিগুলিকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
3. *হ্যান্ড-স্ট্যাম্পড মেইল*: পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস থেকে পাঠানো চিঠি এবং পোস্টকার্ডগুলি একটি অনন্য হ্যান্ড-স্ট্যাম্প পায়, যা তাদের অত্যন্ত সংগ্রহযোগ্য করে তোলে।
4. *সীমিত অ্যাক্সেস*: এর দূরবর্তী অবস্থান এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে, পোস্ট অফিসে সীমিত অ্যাক্সেস রয়েছে। ভঙ্গুর অ্যান্টার্কটিক ইকোসিস্টেম রক্ষা করার জন্য দর্শকদের অবশ্যই কঠোর নির্দেশিকা মেনে চলতে হবে।

*পর্যটন এবং অপারেশন*

প্রতি মৌসুমে, প্রায় 18,000 পর্যটক পেঙ্গুইন পোস্ট অফিসে যান, বেশিরভাগই ক্রুজ জাহাজের মাধ্যমে। পোস্ট অফিস টিম বছরে প্রায় 70,000 টুকরো মেল প্রক্রিয়া করে, যা UKAHT-এর সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।

*সংরক্ষণ প্রচেষ্টা*

UKAHT অ্যান্টার্কটিকার প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে। পোস্ট অফিস অপারেশন সাপোর্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তহবিল:

1. *বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ*: পেঙ্গুইনের আবাসস্থল রক্ষা করা এবং জনসংখ্যা পর্যবেক্ষণ করা।
2. *ঐতিহাসিক সংরক্ষণ*: পোর্ট লকরয়ের ঐতিহাসিক ভবন এবং নিদর্শন রক্ষণাবেক্ষণ।
3. *শিক্ষা*: অ্যান্টার্কটিক সচেতনতা এবং পরিবেশগত স্টুয়ার্ডশিপ প্রচার করা।

*উপসংহার*

অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস একটি অসাধারণ গন্তব্য যা অ্যাডভেঞ্চার, বন্যপ্রাণী এবং ইতিহাসকে মিশ্রিত করে। এই বিচ্ছিন্ন ফাঁড়িটি পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত কিন্তু শ্বাসরুদ্ধকর অঞ্চলগুলির একটিতে মানব সংযোগ এবং অনুসন্ধানের একটি আইকনিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

*ভিজিটিং তথ্য*

ঠিকানা: পোর্ট লকরয়, গৌডিয়ার দ্বীপ, অ্যান্টার্কটিকা
খোলা: নভেম্বর থেকে মার্চ (অস্ট্রাল গ্রীষ্ম)
অ্যাক্সেস: নৌকা দ্বারা, সংগঠিত ট্যুর বা ক্রুজ জাহাজের মাধ্যমে
যোগাযোগ: UKAHT (লিঙ্ক অনুপলব্ধ))

*বিশ্বের নিচ থেকে একটি পোস্টকার্ড পাঠান!*

যারা পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যাওয়ার সাহস করেন, তাদের জন্য পেঙ্গুইন পোস্ট অফিস একটি অতুলনীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে। অনন্য হ্যান্ড-স্ট্যাম্প সহ একটি পোস্টকার্ড বা চিঠি পাঠান এবং এই অবিশ্বাস্য, হিমায়িত ল্যান্ডস্কেপে সংরক্ষণ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করুন।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস, জানুন দিনটির ইতিহাস ও দিনটি পালনের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু কথা।

প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর, আমরা বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস কে স্মরণ করি ফার্মাসিস্টদের বিশ্ব স্বাস্থ্যের উন্নতিতে তাদের অবদানের জন্য সম্মান জানাতে। ফার্মাসিস্টরা দেশে বিদেশে মানসম্মত ওষুধ তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। প্রতি বছর, ফার্মাসিস্ট দিবস বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ফার্মাসিস্টদের অবদানকে তুলে ধরে এবং রক্ষা করে এমন উদ্যোগগুলিকে সমর্থন করার লক্ষ্যে পালন করা হয়।  বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “ফার্মেসি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।” ফার্মেসি পেশায় কর্মরতদের উৎসাহ প্রদান এবং এই পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ২০১০ সাল থেকে সারাবিশ্বে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষকে এ মহান পেশা সম্পর্কে জানাতে এবং এ পেশার মানকে উচ্চ মর্জাদার আসনে আসীন রাখতে সারাবিশ্বে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে।

 

 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের ইতিহাস–

 

 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে, বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্ট এবং ফার্মাসি পেশাদারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ২০০৯ ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (FIP) কংগ্রেসে, একটি বিশ্বব্যাপী ফার্মাসিস্ট দিবসের ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের উদ্যোগে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ইস্তাম্বুল সম্মেলনে ২৫ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯১২ সালের এই দিনে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশনের প্রথম কার্যনির্বাহী সভা অনুষ্ঠিত হয়, এই কারণে দিবসটিকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফার্মেসি পেশার কর্মরতদের উৎসাহ প্রদান এবং এই পেশা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ২০১০ সাল থেকে সারাবিশ্বে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে।

FIP কাউন্সিল সারা বিশ্বের ফার্মাসি নেতাদের নিয়ে গঠিত, 25শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসকে অনুমোদন করেছে৷
এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ফার্মাসিউটিক্যাল পেশাকে বিশ্বব্যাপী ফার্মাসিস্টদের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একটি ফোরাম দিয়েছে।  সেই থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস পালিত হয়ে আসছে।  স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পেশার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য এই অনন্য দিবসটি প্রতি বছর একটি ফার্মেসি বিষয় তুলে ধরে।

 

 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২৩ থিম—

 

 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস প্রতি বছর তার উৎসব এবং ইভেন্টগুলিকে কেন্দ্র করে একটি বিষয় নির্বাচন করে।  ২০২৩ এর জন্য নির্বাচিত বিষয় হল “ফার্মেসি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।”  এই বিষয় জোর দেয় যে ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য ফার্মেসি পেশাদারদের জন্য সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সমর্থন করা এবং উন্নত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এটি ফার্মাসি পরিষেবা এবং বিদ্যমান বৃহত্তর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলির মধ্যে সংযোগটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেইসাথে তারা কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহের সাধারণ কার্যকারিতা এবং দক্ষতার উন্নতিতে অবদান রাখে তা তুলে ধরে।  এই বিষয়টি মূলত জোর দেয় যে মানুষ এবং সম্প্রদায়ের সুবিধার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং শক্তিশালী করার জন্য ফার্মেসি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের তাৎপর্য—

 

 

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি স্বাস্থ্যসেবা এবং সমাজ উভয়ের জন্য ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য ফার্মাসি পেশাদারদের অত্যাবশ্যক অবদানের স্বীকৃতি এবং প্রশংসা করার জন্য একটি বিশ্বব্যাপী ফোরাম প্রদান করে।ইস্তাম্বুলে ২০০৯ FIP কাউন্সিল সম্মেলনের সময় বিশ্ব ফার্মাসি দিবস তৈরি করা হয়েছিল।  এর প্রধান লক্ষ্য বিশ্ব স্বাস্থ্যে ফার্মাসিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রচার করা।  ফার্মাসিস্টরা হলেন অজ্ঞাত নায়ক যারা ওষুধের সুবিধা সর্বাধিক করেন।
তাদের দক্ষতা, জ্ঞান, এবং অভিজ্ঞতা ফার্মাসিউটিক্যালস অ্যাক্সেস প্রদান করে, তাদের ব্যবহার নির্দেশিকা প্রদান করে এবং আমাদের সুস্থতার উন্নতি করে সকলের জন্য ঔষধ উন্নত করে।  ২০২০ সাল থেকে, FIP বিশ্ব ফার্মেসি সপ্তাহের মাধ্যমে ফার্মেসির সমস্ত দিক উদযাপন করেছে।  এই বার্ষিক উদযাপনটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে তাৎপর্যপূর্ণ:

স্বাস্থ্যসেবা হিরোদের স্বীকৃতি, সচেতনতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যের প্রচার, বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা, পেশার অগ্রগতি, শিক্ষাগত আউটরিচ, হাইলাইট থিম, অনুপ্রেরণামূলক ভবিষ্যত প্রজন্ম।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

“লাইব্রেরি” নিয়ে দুটি কথা : দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।।

১৮৩৫ সালের ৩১শে আগস্ট তৎকালীন বিদ্ধদ্‌জনদের উপস্থিতিতে কলকাতার টাউন হলে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় । এই সভাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, সর্বসাধারণের জন্য একটি গ্রন্থাগার বা পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ করা হবে । সেই সিদ্ধান্তক্রমে গড়ে ওঠে “ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি” । অনেক জায়গায় সেই থেকে ৩১শে আগস্ট দিনটিকে গ্রন্থাগার দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে ।
তারপর ১৮৩৬ সালে “ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি” নামে প্রথম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় । সেই সময় এটি ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এই লাইব্রেরির প্রথম মালিক। ভারতের তদনীন্তন গভর্নর- জেনারেল “লর্ড মেটকাফ” ফোর্ট উইলিয়াম কলেজর ৪৬৭৫টি বই দান করেন, যেটা দিয়ে এই লাইব্রেরী গোড়াপত্তন ।
সেই সময় বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষার বই গ্রন্থাগারের জন্য ক্রয় করা হত । কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রন্থাগারকে অর্থসাহায্য করতেন । এমনকি সরকারের কাছ থেকেও অনুদান পাওয়া যেত । সেই সময় এই গ্রন্থাগারে বহু দেশি ও বিদেশি দুষ্প্রাপ্য বই সংগৃহীত হয়েছিল, যা আজও সংরক্ষিত আছে । উল্লেখ থাকে যে, ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ছিল শহরের প্রথম নাগরিক পাঠাগার ।
তারপর ১৮৯১ সালে কলকাতার একাধিক সচিবালয় গ্রন্থাগারকে একত্রিত করে গঠিত হয় “ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি” । এই গ্রন্থাগারের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল গৃহ মন্ত্রকের গ্রন্থাগার ।
পরবর্তী সময়ে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ও ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির সংযুক্তিকরণ ঘটে । জানা যায়, ১৯০৩ সালের ৩০ জানুয়ারি লর্ড কার্জনের প্রচেষ্টায় ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি ও ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিকে সংযুক্ত করে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয় । সেই সময় সংযুক্ত লাইব্রেরিটি ‘ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি’ নামেই পরিচিত হয় । এই সময় গ্রন্থাগারটি উঠে আসে আলিপুরের বেলভেডিয়ার রোডস্থ মেটকাফ হলের বর্তমান ঠিকানায় । এখানে উল্লেখ থাকে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাইব্রেরিটি এসপ্ল্যানেডের জবাকুসুম হাউসে স্থানান্তরিত হয়েছিল ।
এবার আসছি জাতীয় গ্রন্থাগার সম্বন্ধে …………?
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি পুনরায় মেটকাফ হলে উঠে আসে এবং লাইব্রেরির নতুন নামকরণ হয় জাতীয় গ্রন্থাগার বা ন্যাশানাল লাইব্রেরি । ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ জাতীয় গ্রন্থাগারকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেন ।
স্বাধীনতার পর ভারত সরকার “ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি (নাম পরিবর্তন) অ্যাক্ট, ১৯৪৮” চালু করে । তারপর “ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার আইন, ১৯৭৬”এর ১৮ ধারা মোতাবেক ন্যাশনাল লাইব্রেরির নাম পরিবর্তন করে “ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার” করা হয় ।
গ্রন্থাগার কার্যত সমস্ত ভারতীয় ভাষায় বই, সাময়িকী, শিরোনাম, ইত্যাদির সংগ্রহশালা । জানা যায়, ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারের সংগ্রহগুলি অনেকগুলি ভাষায় । হিন্দি বিভাগে বই রয়েছে যেগুলি উনবিংশ শতাব্দীর পুরো সময়কার এবং সেই ভাষায় ছাপা হওয়া প্রথম বই ।
আগেই বলেছি, ১৮৩৬ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি নামে প্রথম গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় । সেই সময় লাইব্রেরিটি ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান । প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন লাইব্রেরির প্রথম মালিক । ভারতের তদনীন্তন গভর্নর-জেনারেল ‘লর্ড মেটকাফ’ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরির ৪,৬৭৫টি বই গ্রন্থাগারে দান করেছিলেন । এই দানের ফলেই গ্রন্থাগারের গোড়াপত্তন । বর্তমানে এই গ্রন্থাগারে কমপক্ষে ২০ লক্ষ বা তারও বেশী বই রয়েছে । “ভারত সরকারের পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রক”এর অধীনে “কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি” এখন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত ।
এবার আসছি লাইব্রেরির গুরুত্ব প্রসঙ্গে —
‘বই’ মানুষের নিত্যসঙ্গী । জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বই । এখানে একটা কথা পরিষ্কার, লেখক লেখেন, প্রকাশক সেই লেখা ছাপেন, প্রকাশক ও বিক্রেতা উভয়েই বই বিক্রি করেন । আর অন্যদিকে গ্রন্থাগারিক সেই বই সংগ্রহ করে যথাযথ বিন্যাস করেন এবং পাঠক সমাজ ঐসব উপাদান থেকে মনের খোরাক এবং জ্ঞানলাভে সমর্থ হন ।
শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগার যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তেমনি জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য । গ্রন্থাগারে থাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন বিষয়ের বই । আগ্রহী পাঠকের জন্যে গ্রন্থাগার জ্ঞানার্জনের যে সুযোগ করে দেয়, সেই সুযোগ অন্য কোথাও পাওয়া দুর্লভ । গ্রন্থাগার গ্রন্থের বিশাল সংগ্রহশালা, যা মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম । গ্রন্থাগারের মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানসমুদ্রে অবগাহন করে জ্ঞানের মণিমুক্তা সংগ্রহের সুযোগ পায়। গ্রন্থাগারের সংগৃহীত বই সর্বসাধারণের জন্যে অবারিত । চিন্তাশীল মানুষের কাছে এমনকি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রন্থাগারের উপযোগিতা অনেক বেশি । গ্রন্থাগার হচ্ছে জ্ঞান আহরণের উপযুক্ত মাধ্যম । আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে গ্রন্থাগারের উপযোগিতা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি । কারণ সংসারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে আমরা হিমশিম খাই । সেখানে বই কিনে পড়া অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় ! সুতরাং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে লাইব্রেরির গুরুত্ব অপরিসীম । অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-শিক্ষক প্রতিদিনের টিফিন পিরিয়ড বা অন্য অবসর সময়টা আড্ডা ও গল্পগুজবের মধ্যে না কাটিয়ে লাইব্রেরি থাকলে সময়টা পড়ালেখায় কাটাতে পারেন । এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, শিক্ষা বিকাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি বা লাইব্রেরির অবস্থান অপরিহার্য ।
গণতন্ত্রের সাফল্যে গ্রন্থাগারের ভূমিকা গণমাধ্যমের চেয়ে কম নয় । আধুনিক বিশ্বে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা দিনে দিনে বাড়ছে । গ্রন্থাগার সকলের জন্য উন্মুক্ত । ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা নেই এখানে, নেই হানাহানি কলহ । সুতরাং প্রতিটি সুশীল নাগরিকের নিয়মিত গ্রন্থাগারে উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া ও জ্ঞানার্জন করা, তাঁদের নিয়মমাফিক রুটিনে আসুক ।
প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, “আমরা যত বেশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করব, দেশের তত বেশি উপকার হবে । আমার মনে হয়, এদেশে লাইব্রেরির সার্থকতা হাসপাতালের চাইতে কিছু কম নয় এবং স্কুল-কলেজের চাইতে একটু বেশি ।“
পরিশেষে আমি মনে করি, লাইব্রেরি হচ্ছে শিক্ষা বিকাশের ও জ্ঞানার্জনের উপযুক্ত পীঠস্থান । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত) ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

“কান্না” কী বা কেন ? একটি আলোচনা ! :  দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

দুঃখে কাঁদি, আঘাতে-ব্যথ্যায় কাঁদি, আবার কখনও খুব আনন্দেও কাঁদি ! প্রতিটি মানুষের জীবনে কখনও না কখনও কান্না পায় ।
( ২ )
(১) গাঁয়ের পুণ্ডরীকাঙ্খের বৌমা নীতাম্বরী, হন্তদন্ত হয়ে পটলডাঙ্গা স্টেশনের দিকে ছুটছে । রাস্তার মধ্যে হঠাৎ পুটির মায়ের সাথে দেখা, “কিগো নীতাম্বরী, হন্তদন্ত হয়ে কোথায় ছুটলে ?”
“আর বলবেন না মাসি, আজ আমার ছোট ছেলে পলাশীপাড়া থেকে বাড়ি ফিরছে । তাকে আনতে রেলওয়ে স্টেশনে যাচ্ছি ।“ উত্তরে নীতাম্বরী জানালো ।
তা বাপু, ছেলেটা হঠাৎ পলাশীপাড়ায় কেন ? বুঝতে পারলাম না ।
মাসি ! আপনাকে বলা হয়নি । ছোট ছেলে সেখানকার হাসপাতালের ডাক্তার !
শুনেছি তোমার দুই ছেলেই ডাক্তার ।
“আর মাসি । কি বলবো আপনাকে ! আপনাকে বলতে আমার দ্বিধা নেই । ছেলেদের মানুষ করতে আমার হিমসিম অবস্থা ! নিজের সখ-আহ্লাদের জলাঞ্জলি । ঠিকমতো ঘুমোতে পারতাম না । সব সময় ছেলেদের পেছনে লেগে থাকতে হতো । তাদের পড়াশুনার দিকে নজর দেওয়াই ছিল আমার ধ্যান জ্ঞান । যার জন্য আপনাদের আশীর্বাদে বড় ছেলেটা নিউরো সার্জেন্ট (এম-ডি), ছোটটা মেডিসিনে এম-ডি ।“ কথাগুলি বলার পরে নীতাম্বরীর চোখে জল ! শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছছে ।
(২) সর্বেশ্বর গাঁয়ের প্রান্তিক চাষি । বিঘে কয়েক জমি চাষ করে তাঁর সংসার । একটা ছেলে ও দুটি মেয়ে । বেচারা খেয়ে না-খেয়ে ছেলে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করেছে । মেয়ে দুটিই স্কুল শিক্ষিকা । বিয়েও দিয়েছে । ছেলেটা বাইরের রাজ্যে মস্ত বড় কোম্পানীর উচ্চ পদে কর্মরত । সর্বেশ্বর একদিন ফাইল খুঁজতে গিয়ে ছেলের ইনকাম ট্যাক্সের রিটার্ন দেখতে পায় । গত বছর যে পরিমান আয়কর দিয়েছে সেটা থেকে সর্বেশ্বর ছেলের মাসিক আয় সম্বন্ধে একটা ধারণা পায় ! অথচ ছেলে মেয়েদের পড়াতে গিয়ে এবং মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে সর্বেশ্বর আর্থিক দিক দিয়ে নিঃস্ব । সবগুলি জমি বিক্রি করতে হয়েছে । তাঁদের বুড়ো-বুড়ির দুবেলার অন্ন জোগানোই এখন ভীষণ সমস্যা । স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ছেলের অন্য রাজ্যেতে বসবাস, ফলে বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময় নেই । সুতরাং তাঁরা কীভাবে বাবা-মাকে পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করবে ? ক্ষুধায় যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে ঠিক তখন সর্বেশ্বর নিজের ভাগ্যের কথা ভেবে গিন্নির চোখের আড়ালে হাউমাউ করে কাঁদে ! শেষ বয়সে এখন তাঁর ভিখারীর ন্যায় অবস্থা !
(৩) ঐ বাংলায় নীরোদ তালিবের ভরা ঘর-সংসার । গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, পরিবারের বাবা-মা সহ ছেলেমেয়ে নিয়ে মোট এগারো জন, জমি জায়গা, খাওয়া দাওয়া, বাড়ি লাগোয়া পুকুর । পুকুরে সারা বৎসর জল থাকে এবং সেখানে অনেক ধরনের মাছ । যাকে বলে অফুরন্ত শান্তির সংসার । হঠাৎ দেশ ভাগ ।
“পালাও, দেশ ছাইরা পালাও ! এই দ্যাশটায় হিন্দুদের ঠাঁই নাই ।“ রাতের অন্ধকারে হাঁটুর উপর ধুতি পরে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও বুড়ো বাবা-মাকে নিয়ে অনেক ছিন্নমূল মানুষের সাথে নীরোদ তালিব ছুটলো অজানা উদ্দেশে । পদ্মা, ভাগীরথী পার হয়ে বাবলা নদীর তীরে বট গাছটার তলায় আশ্রয় নিলো বিনোদ তালিব । সব হারিয়ে ক্ষুধায় তৃষ্ণায় ভয়ে-ভীতিতে আশঙ্কায় বিনোদের চোখে জল । চতুর্দিকে অন্ধকার । অচেনা দেশে রাত্রির অন্ধকারে তাঁর চোখের জল থামানো দায় ! মনের ভিতর সব হারানোর হাহাকার ! বিনোদ তালিবের সে কি কান্না !
উপরের তিনটি ঘটনায় মানুষের তিন রকম কান্না ! এখানকার কান্নাগুলিকে আবেগপূর্ণ কান্না বলা চলে । তাই কান্না হলো একটা আত্ম-উপলব্ধি বা অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম ।
( ৩ )
আবার কান্না শারীরিক ব্যথা-যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়ায় হতে পারে অর্থাৎ চোখে অশ্রু ঝরতে পারে । অন্যদিকে কান্নার কারণ হতে পারে এমন আবেগের মধ্যে, যেখানে রয়েছে দুঃখ , রাগ , আনন্দ এবং ভয় ।
মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় সহানুভূতিশীল প্রতিক্রিয়া কান্নার কারণ হতে পারে । উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে — তমালবাবু শিক্ষকতার চাকরি জীবন থেকে প্রায় দশ বছর হলো অবসর নিয়েছেন । তাঁর দুই ছেলে বিদেশে কর্মরত । বাবা-মাকে দেখার তাদের সময় নেই । পেনশনের টাকায় তাঁদের দুজনের দিনাতিপাত । হঠাৎ গিন্নির কঠিন ব্যামো । বুকে ভীষণ ব্যাথা । এলাকার হাতুড়ে ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন, “অপারেশন জরুরি । তাঁকে অতি সত্বর কলকাতার বড় হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার ।“ তমালবাবুর হাতে একটাও পয়সা নেই । তমালবাবু দুঃখে কষ্টে কপাল চাপড়াচ্ছেন ! এমন সময় দেবদূতের মতো ভোম্বলের আগমন । বিষম বিপদের সময় তাঁর গবেট মার্কা ছাত্র ভোম্বল ছুটে এসে তার প্রিয় স্যারের পাশে দাঁড়ালো । অথচ সাংসারিক জীবনে ভোম্বল কোনোরকমে একটা টী স্টল চালায় । তবুও ভোম্বলের সমস্ত সঞ্চিত টাকা-পয়সা, গিন্নির গহনা, স্যারের পায়ের কাছে রেখে বলল, “স্যার, আর দেরী করবেন না । এক্ষুণি হাসপাতাল চলুন ।“ ভোম্বলের সেই সময়কার চাহনী, কাতর আবেদন, সর্বোপরি তার আন্তরিকতা দেখে তমালবাবু চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না । তাই মনে মনে বললেন, তিনি ছাত্রদের শিক্ষিত করতে পারুক বা না-পারুক, অন্তত একজন ছাত্রকে মানুষ করতে পেরেছেন ।
( ৪ )
এবার জানা যাক, কান্না কেন ঘটে ?
কান্না একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যেখানে আমাদের চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি অশ্রু উৎপন্ন করে । এই অশ্রুগুলি নালীগুলির মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে পড়ে । এগুলি হয় গালের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বা নাসোলেক্রিমাল নালীর মাধ্যমে নাকের মধ্যে জমা হয় ।
সঠিকভাবে, চোখের উপরের প্রান্তে উপস্থিত ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিগুলির নিঃসরণ হল অশ্রু । আমরা যখন কাঁদি তখন কান্নার পরিমাণ বেশি হয় । আমরা যখন স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় অবস্থায় থাকি তখন কান্নার পরিমাণ কম হয় । কান্নার অনুভূতির জন্ম মস্তিষ্কে, ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেকে । এই গ্ল্যান্ড থেকেই প্রোটিন, মিউকাস বা তেলতেলে নোনা জল তৈরি হয় । এগুলি চোখ দিয়ে অশ্রুর আকারে বেরিয়ে আসে । এই তরলকেই কান্না বলে।
মস্তিষ্কে সেরিব্রাম নামে একটা অংশ আছে, সেখানে দুঃখ জমা হয় বা দুঃখের অনুভূতি তৈরি হয় । সেই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হল কান্না । আরও জানা যায়, দুঃখের বা মন খারাপের কারণে শরীরে একধরনের টক্সিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয় । সেগুলি বার করে দেয়ার জন্য কান্নার প্রয়োজন । চোখের জলের সঙ্গে সেই ক্ষতিকর পদার্থ বেরিয়ে আসে ।
সেরিব্রাম অংশ থেকে এন্ডোক্রিন সিস্টেম বা অন্তঃক্ষরা পদ্ধতিতে হরমোন নির্গত হয় । দুঃখের কারণে জমা হওয়া ক্ষতিকর পদার্থগুলি বহন করে চোখের আশপাশের অঞ্চলে নিয়ে যায় এই হরমোনগুলি । সেখান থেকে চোখের জলের সঙ্গে টক্সিনগুলো বেরিয়ে আসে কান্নার আকারে । এটিই আসলে আবেগীয় কান্না । যন্ত্রণার বা খুশির কান্নাও একই পদ্ধতিতে আসে।
( ৫ )
কাঁদার আবার বিভিন্ন ধরন আছে । যেমন দুঃখ, ব্যথা ছাড়াও অনেক সময় আমরা অন্য কারণে কেঁদে ফেলি । আবার চোখে ঝাল বা পেঁয়াজের কষ লাগলে চোখে জল আসে । এটাকে ঠিক কান্না বলা যায় না । কিন্তু কান্নার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল আছে ।
রিফ্লেক্স নামে আরেক ধরনের কান্না আছে । এই কান্না একটু অন্যরকম ! হঠাৎ ব্যথা পেলে, কিংবা ঝাঁঝালো কোনও বস্তু যেমন পেঁয়াজ বা সর্ষের তেলের ঝাঁঝ কিংবা ধুলাবালি নাক বা চোখ দিয়ে ঢুকলে এই ধরনের কান্নার জন্ম । ঝাঁঝালো বস্তু চোখে ঢুকলে, চোখের কর্নিয়ায় যে স্নায়ুতন্ত্র আছে, সেখানে বার্তা পাঠায় । বদলে মস্তিষ্কও প্রতিরক্ষার জন্য হরমোন পাঠিয়ে দেয় চোখের পাতায় । চোখে সেগুলি অশ্রুর মতো জমা হয় । ধুলাবালি বা ক্ষতিকর পদার্থ বয়ে নিয়ে চোখ থেকে বেরিয়ে আসে সেই অশ্রু ।
বেসাল কান্না কাঁদতে হয় না, জানা যায় এরা চোখের মধ্যেই থাকে। বেসাল কান্না এক ধরণের পিচ্ছিল তরল — যেটা আমাদের চোখকে সব সময় ভিজিয়ে রাখে । যার জন্য আমাদের চোখ কখনোই একেবারে শুকিয়ে যায় না ।
আবেগের কান্না শুরু হয় সেরেব্রাম থেকে । সেরেব্রাম হলো মস্তিষ্কের সবচেয়ে বড় অংশ, এজন্য সেরেব্রামকে বলা হয় ‘গুরুমস্তিষ্ক’। সেরেব্রামেই থাকে আমাদের সব ধারণা, কল্পনা, চিন্তা-ভাবনা, মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত ।
পরিশেষে আমরা বলতে “কান্না মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি ।“ কেননা সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে কোনো জীবের আচরণের একটি অংশ ! অন্যদিকে উপকারের কথা ভাবলে ‘কান্না’ একটা মানুষকে উদ্দীপ্ত রাখে, চোখ পরিষ্কার রাখে, মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, আবার বিষণ্ণতা কাটায় ।(তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত) ।

Share This