Categories
প্রবন্ধ

মূল্যবোধ ও মানসিকতা – মানব জীবনে অপরিহার্য অংশ : দিলীপ রায়।

মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি । মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ তার মানবিক গুণাবলি ও নৈতিক চরিত্র । এই মানবিক গুণগুলোর মধ্যে মূল্যবোধ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ । মূল্যবোধ মানুষকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও আদর্শবান হতে সাহায্য করে । মূল্যবোধের মাধ্যমেই একজন মানুষ ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে শেখে । তাই ‘মূল্যবো্‌ধ’কে মানুষের জীবন পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি বলা হয় । অনেকের মতে শিক্ষা শুধু ডিগ্রীধারী নয় । শিক্ষিত শব্দের অর্থ সেই ব্যক্তি যিনি কিনা সুসংস্কৃত অর্থাৎ যাঁর জীবনে মূল্যবোধগুলি পরিস্ফুট । মূল্যবোধগুলি হলোঃ (১) সত্যবাদী, (২) জিতেন্দ্রিয়, (৩) পরোপকারী । আমাদের বর্তমান পদ্ধতিতে এই সদ্‌গুণগুলির পরিমাপের কোনো ব্যবস্থা নেই । যার জন্য শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সুসংস্কারের কোনো যোগাযোগ নেই । তাই সুস্থ, সুন্দর, সমৃদ্ধ আর শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার জন্য সত্যবাদী, জিতেন্দ্রিয় ও পরোপকারী – এই সদ্‌গুণগুলি যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো পরিবেশে অনুশীলন করতে পারে ।
সাধারণত সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে প্রচলিত ভালো-মন্দ, ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা গড়ে ওঠে, তাকেই ‘মূল্যবোধ’ বলে । এটা আবার অন্যভাবে বলতে গেলে, মানুষের চিন্তা-ভাবনা, আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আচরণকে যে নীতি ও মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে, তাই ‘মূল্যবোধ’ । মূল্যবোধ মানুষের আচরণকে সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে এবং তাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে ।
( ২ )
এবার আসছি ‘মানসিকতা’ প্রসঙ্গে। ‘মানসিকতা’ বলতে সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ও আচরণের সামগ্রিক প্রবণতাকে বোঝায় । মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখে, কীভাবে বিভিন্ন ঘটনা বা মতামতকে ব্যাখ্যা করে এবং কোন ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—এসবই তার মানসিকতার পরিচয় বহন করে । অর্থাৎ মানসিকতা কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন চিন্তার সমষ্টি নয়; এটি এমন একটি অন্তর্গত মানসিক কাঠামো (Internal Mental Structure), যেটা কিনা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও কর্মধারাকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে । অন্যভাবে ‘অন্তর্গত মানসিক কাঠামো’ বলতে মানুষের মনের ভিতরের সেই অদৃশ্য ছাঁচ বা সংগঠনকে বোঝায়, যার সাহায্যে সে বাইরের জগৎ থেকে পাওয়া তথ্য গ্রহণ, বিশ্লেষণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার করে ।
একজন মানুষের মানসিকতা গড়ে ওঠে তার শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। ফলে একই ঘটনা ভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে বিচার করে, কারণ তাদের মানসিকতার ধরণ আলাদা । কেউ কোনো বিষয়কে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করে, আবার কেউ তা সুসংস্কার বা কুসংস্কার, আবেগ বা অন্ধ বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে গ্রহণ করে। এখানেই মানসিকতার প্রকৃত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে । (সুসংস্কার (Superstition) বলতে মূলত যুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রমাণহীন কোনো অন্ধ বিশ্বাস বা ভ্রান্ত ধারণাকে বোঝায় যা মানুষের অজ্ঞতা, ভয় বা অলীক কল্পনা থেকে সৃষ্টি হয়) ।
একটি বিষয় পরিষ্কার যে অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার বা প্রশ্নহীন আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে কোনো উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে না । কারণ অন্ধ বিশ্বাস মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং সত্য অনুসন্ধানের পথকে বাধাগ্রস্ত করে । সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন যুক্তি, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ । যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে এবং অন্যের মতামতকে বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রহণ করে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে অগ্রসর ও সভ্য হয়ে উঠতে পারে ।
এই কারণেই বলা যায়, ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্বাস একজন মানুষকে পথ দেখাতে পারে, কিন্তু একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে পরিচালনা করতে হলে যুক্তিই হচ্ছে প্রধান দিশারী । বিশেষত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যুক্তিবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং যৌক্তিক আলোচনা । যুক্তিনির্ভর মানসিকতা মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায় ।
এখানে ‘মানসিকতা’ বলতে শুধু সাধারণ চিন্তাধারাকে বোঝানো হচ্ছে না; বরং এমন এক মানসিক প্রবণতা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝানো হচ্ছে, যা আমাদের চিন্তা ও কাজের ধরন নির্ধারণ করে । এটি আমাদের বিশ্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে গঠন করে এবং সেই মানসিক অভ্যাসগুলিকেও নির্দেশ করে । যার সাহায্যে আমরা বিভিন্ন দাবি, মতবাদ, বিশ্বাস ও যুক্তিকে বিচার করি । অর্থাৎ, মানুষ কোনো বিষয়কে কীভাবে গ্রহণ করবে, কোন তথ্যকে সত্য বলে মেনে নেবে এবং কোন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলবে—সবকিছুই তার মানসিকতার উপর নির্ভর করে ।
আবার যখন এই মানসিকতা যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, প্রমাণ ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘বিজ্ঞানসম্মত মানসিকতা’। বিজ্ঞানসম্মত মানসিকতা কেবল বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এমন এক চিন্তাপদ্ধতি, যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রমাণ ছাড়া, যুক্তি ছাড়া, কোনো কিছু অন্ধভাবে গ্রহণ না করতে শেখায় এবং সত্য অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ থাকতে উৎসাহিত করে ।
অন্যভাবে বলতে গেলে, বিজ্ঞানসম্মত মানসিকতার ক্ষেত্রে আমরা কী জানি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কীভাবে চিন্তা করি । কারণ তথ্য ও জ্ঞান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু যুক্তিনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী চিন্তার অভ্যাস মানুষকে সবসময় নতুন সত্যের সন্ধান করতে সাহায্য করে । তাই বিজ্ঞানসম্মত মানসিকতা হলো এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানুষকে মুক্তমনা, যুক্তিবাদী, মানবিক ও প্রগতিশীল করে তোলে । আর এই মানসিকতার বিকাশই একটি আলোকিত সমাজ ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করে ।
জওহরলাল নেহরু’র ‘The Discovery of India’ বইতে তিনি বিজ্ঞানসম্মত মানসিকতাকে “জীবনের অঙ্গ, চিন্তার প্রক্রিয়া, কাজ করার পদ্ধতি এবং সহনাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ধরণ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন । তাই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা রুপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করে । যুক্তি, নৈতিক অনুসন্ধান এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজ প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীল্ভাবে কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ করে । তাই অগ্রগতিকে কেবল উদ্ভাবন নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তার উপরও ভিত্তি করে গড়ে উঠতে হবে ।
( ৩ )
মানবিক মূল্যবোধ একটি সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত । যে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ বেশি, সেই সমাজে অপরাধ, হিংসা ও অন্যায় কম থাকে। কারণ মূল্যবোধ মানুষকে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায় । ন্যায়পরায়ণতা, সততা, শিষ্টাচার, দয়া, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ মানবিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তি । বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্য কথা বলা এবং অন্যের ক্ষতি না করা, মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সমাজভেদে ও ব্যক্তিভেদে মূল্যবোধ ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু মৌলিক মূল্যবোধ হলোঃ সততা ও ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা ও পরোপকার, শৃঙ্খলাবোধ ও সময়ের সঠিক ব্যবহার, দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যবোধ, শ্রমের মর্যাদা ও সহনশীলতা ।
মূল্যবোধ নিয়ে অনেক কথা । মূল্যবোধ হলো – মানুষের আচরণ পরিচালনাকারী নীতি ও মানদণ্ড । মূল্যবোধ হলো – অকৃত্রিম ও অর্জিত আপোষহীন নীতি যা কিনা দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় । এটি জীবনে ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে এবং ব্যক্তি ও সমাজের যথাযথ সম্পর্ক নির্ণয় করে । সমাজের সদস্যদের আচরণগত ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে, অখণ্ডতা ও সংহতি বজায় রেখে উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে এই “মূল্যবোধ” । মূল্যবোধের উপাদান, আমরা জানি, নীতি, মান ও বিশ্বাস । এই উপাদানগুলি আবার ব্যক্তি , সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থান স্পষ্ট করে – ভালো-মন্দ, দোষ-গুণ, ন্যায়পরায়ণতা ও নৈতিকতার বিচার করে এবং নৈতিক অধিকারের ভিত্তিতে কাজের দিক নির্দেশনা প্রদান করে । স্থান, কাল পাত্রভেদে মূল্যবোধ বিভিন্ন রূপ । উল্লেখ থাকে যে, মূল্যবোধ পরিবর্তনশীল । সামাজিক পরিবর্তনের ফলে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে ।
( ৪ )
একজন মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ জন্মগতভাবে আসে না । বরং পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ও পরিবেশের মাধ্যমে তা গড়ে ওঠে। পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । শিশুরা পরিবার থেকেই শিষ্টাচার, সম্মানবোধ, দায়িত্ববোধ ও সততার শিক্ষা লাভ করে । এরপর বিদ্যালয়, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, ধর্মীয় শিক্ষা ও সমাজের বিভিন্ন রীতি-নীতি মানুষের মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ভালো পরিবেশ ও সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষ আদর্শ নাগরিক হয়ে উঠতে পারে।
মানবিক মূল্যবোধ মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ সমাজে সম্মান লাভ করে এবং সবার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মূল্যবোধহীন মানুষ স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারে। বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো মানবিক মূল্যবোধের অভাব। তাই সমাজকে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ করতে হলে মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া মূল্যবোধ ধর্মীয় ও নৈতিক চেতনাকেও জাগ্রত করে। মানবিক মূল্যবোধ মানুষের মনে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহনশীলতা সৃষ্টি করে। এর ফলে সমাজে সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি উন্নত রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজ গঠনের জন্য মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিকের বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলা যায়, মূল্যবোধ মানুষের জীবনের অমূল্য সম্পদ। এটি মানুষকে মানবিক, সৎ ও আদর্শবান হতে সাহায্য করে । ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম । মানসিকতা মানব জীবনে ভীষণ প্রাসঙ্গিক । উন্নত মানসিকতার মানুষ সমাজে সত্যিই খুবই প্রয়োজন। এ ধরনের মানুষ শুধু নিজের স্বার্থ নিয়ে ভাবেন না; তারা সমাজ, দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য নিরলস কাজ করেন । তাঁদের চিন্তাভাবনায় থাকে মানবতা, দায়িত্ববোধ, সততা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ! (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত ছাড়া যোজনা-৪/২৬, উদ্বোধন-আ/১৪২৩) ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *