✨ ভূমিকা
সুইজারল্যান্ডের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বরফে ঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, নীল হ্রদ আর কাঠের ছোট ছোট বাড়ি। আর এই সব সৌন্দর্যকে একসঙ্গে ধারণ করে আছে Zermatt — সুইস আল্পসের কোলে অবস্থিত এক অপূর্ব পাহাড়ি শহর।
Zermatt এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপ মেলে ধরেছে। চারদিকে তুষারঢাকা পাহাড়, শান্ত পরিবেশ, ঠান্ডা বাতাস এবং মেঘে ঢাকা আকাশ এই শহরটিকে রূপকথার মতো করে তুলেছে।
বিশ্ববিখ্যাত Matterhorn পর্বতের জন্য Zermatt পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে ভ্রমণে আসেন। কেউ আসেন বরফ দেখতে, কেউ স্কিইং করতে, আবার কেউ শুধু প্রকৃতির মাঝে কিছুটা শান্ত সময় কাটাতে।
🏔️ Zermatt-এর ভৌগোলিক অবস্থান
Zermatt সুইজারল্যান্ডের দক্ষিণাংশে Valais অঞ্চলে অবস্থিত। এটি আল্পস পর্বতমালার মাঝে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ি শহর।
শহরটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বিখ্যাত Matterhorn। পিরামিড আকৃতির এই বরফঢাকা পর্বত পৃথিবীর অন্যতম পরিচিত পাহাড়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত Zermatt পুরো বছরজুড়েই ঠান্ডা ও মনোরম আবহাওয়ার জন্য পরিচিত।
⛰️ Matterhorn — সুইজারল্যান্ডের প্রতীক
Matterhorn শুধু একটি পাহাড় নয়; এটি সুইজারল্যান্ডের প্রতীক।
৪,৪৭৮ মিটার উচ্চতার এই পাহাড় পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত শৃঙ্গ। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় Matterhorn-এর চূড়ায় আলো পড়লে পুরো পাহাড় সোনালি রঙে ঝলমল করে ওঠে।
এই দৃশ্য এতটাই সুন্দর যে অনেকেই একে পৃথিবীর সেরা পাহাড়ি দৃশ্যগুলোর একটি বলে মনে করেন।
🚆 Zermatt যাওয়ার ট্রেন যাত্রা
Zermatt ভ্রমণের অন্যতম সেরা অংশ হলো এখানকার ট্রেন যাত্রা।
এই শহরে সাধারণ গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ। তাই এখানে পৌঁছাতে হয় ট্রেনে।
Glacier Express হলো বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ট্রেন রুট, যা Zermatt-এর সঙ্গে যুক্ত।
ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা যায়—
বরফঢাকা পাহাড়
সবুজ উপত্যকা
ঝরনা
ছোট পাহাড়ি গ্রাম
কাঠের বাড়ি
এই যাত্রা যেন একটি চলন্ত সিনেমা।
❄️ শীতের Zermatt — বরফের রাজ্য
শীতকালে Zermatt পুরোপুরি বরফে ঢেকে যায়।
চারদিকে শুধু সাদা তুষার, ঠান্ডা বাতাস আর নিস্তব্ধ পরিবেশ। এই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা এখানে স্কিইং করতে আসেন।
Zermatt পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্কি রিসোর্ট হিসেবে পরিচিত।
এখানে রয়েছে—
Skiing
Snowboarding
Ice Climbing
Snow Hiking
Winter Photography
🎿 স্কিইং-এর স্বর্গ
Zermatt স্কিইং প্রেমীদের কাছে স্বপ্নের জায়গা।
এখানে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ স্কি ট্র্যাক রয়েছে। নতুন ও অভিজ্ঞ—উভয় ধরনের স্কিয়ারদের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
বরফের পাহাড় বেয়ে নিচে নামার সময় চারপাশের দৃশ্য এতটাই সুন্দর যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
🚠 Gornergrat Railway — মেঘের ওপরে ভ্রমণ
Gornergrat Railway ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত পাহাড়ি ট্রেন।
এই ট্রেনে করে উপরে উঠলে দেখা যায়—
Matterhorn
বরফঢাকা আল্পস
বিশাল হিমবাহ
মেঘের সমুদ্র
উপরে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন আকাশের খুব কাছে চলে এসেছি।
🌨️ Glacier Paradise — ইউরোপের সর্বোচ্চ কেবল কার স্টেশন
Matterhorn Glacier Paradise Zermatt-এর অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ।
এটি ইউরোপের সর্বোচ্চ কেবল কার স্টেশনগুলোর একটি।
এখানে রয়েছে—
বরফের গুহা
Glacier Palace
Observation Deck
সারা বছর বরফের অভিজ্ঞতা
উপরে থেকে ইতালি, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের আল্পস দেখা যায়।
🌸 গ্রীষ্মের Zermatt
গ্রীষ্মে Zermatt সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
বরফের পাশাপাশি তখন পাহাড়ের নিচে সবুজ ঘাস ও রঙিন ফুল ফুটে ওঠে।
এই সময় জনপ্রিয় কার্যকলাপগুলো হলো—
Hiking
Mountain Biking
Camping
Nature Walk
Photography
🌲 প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গ
যারা শান্ত পরিবেশে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য Zermatt আদর্শ স্থান।
এখানে নেই বড় শহরের কোলাহল। শুধু পাহাড়, বরফ, ঠান্ডা বাতাস এবং পাখির ডাক।
ভোরবেলায় Matterhorn-এর ওপর সূর্যের আলো পড়ার দৃশ্য মানুষের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
🏡 কাঠের বাড়ি ও পাহাড়ি সংস্কৃতি
Zermatt-এর ছোট ছোট কাঠের বাড়িগুলো শহরের অন্যতম সৌন্দর্য।
এই বাড়িগুলো ঐতিহ্যবাহী সুইস স্থাপত্যের নিদর্শন। শীতকালে বরফে ঢাকা কাঠের বাড়িগুলো দেখতে যেন রূপকথার গ্রামের মতো লাগে।
🍫 সুইস খাবার ও চকলেট
Zermatt-এ সুইস খাবারের স্বাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এখানে বিখ্যাত খাবারের মধ্যে রয়েছে—
Cheese Fondue
Rösti
Swiss Chocolate
Alpine Cheese
Hot Chocolate
বরফের মাঝে গরম চকলেট খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।
📷 ফটোগ্রাফারদের স্বপ্ন
Zermatt পৃথিবীর অন্যতম ফটোগ্রাফি-বান্ধব স্থান।
বিশেষ করে Matterhorn-এর ছবি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং তুষারপাতের সময় এখানে প্রতিটি দৃশ্য যেন একটি জীবন্ত পোস্টকার্ড।
🌍 কেন Zermatt এত জনপ্রিয়?
✔ Matterhorn পর্বতের জন্য
✔ পৃথিবীর সেরা স্কি রিসোর্টগুলোর একটি
✔ বরফে ঢাকা আল্পসের অসাধারণ দৃশ্য
✔ শান্ত ও দূষণমুক্ত পরিবেশ
✔ পাহাড়ি ট্রেন ও কেবল কার
✔ সারা বছর বরফ দেখার সুযোগ
✔ ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ স্থান
💰 ভ্রমণের সম্ভাব্য খরচ
Zermatt ভ্রমণ তুলনামূলক ব্যয়বহুল।
সম্ভাব্য খরচ
হোটেল: ১০,০০০–৪০,০০০ টাকা
খাবার: ৪,০০০–১০,০০০ টাকা
ট্রেন ও কেবল কার: ৫,০০০–২৫,০০০ টাকা
স্কিইং: আলাদা খরচ
তবে অভিজ্ঞতা জীবনের অন্যতম সেরা হতে পারে।
❤️ একজন ভ্রমণকারীর অনুভূতি
Zermatt এমন একটি জায়গা যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রকৃতির মহত্ত্ব অনুভব করতে পারে।
এখানে সময় যেন ধীরে চলে। বরফের মাঝে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হয় পৃথিবী কত শান্ত ও সুন্দর হতে পারে।
অনেকেই বলেন, Zermatt-এ একবার গেলে সেই স্মৃতি কখনও ভোলা যায় না।
✨ উপসংহার
Zermatt শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়; এটি প্রকৃতির এক অপার্থিব সৃষ্টি।
বরফঢাকা পাহাড়, Matterhorn-এর মহিমা, শান্ত পরিবেশ এবং আল্পসের সৌন্দর্য এই শহরটিকে পৃথিবীর অন্যতম স্বপ্নের গন্তব্যে পরিণত করেছে।
যারা জীবনে অন্তত একবার প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য Zermatt নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ স্থান।
এখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের মনে চিরকাল বেঁচে থাকে।
Month: May 2026
নীরবতার ভাষা।
কলেজের লাইব্রেরির শেষ কোণের টেবিলটায় প্রতিদিন এসে বসত মেয়েটা। সাদা সালোয়ার, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, আর সামনে সবসময় একটা খোলা খাতা।
অর্ণব প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করেছিল তাকে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটা কারও সঙ্গে কথা বলত না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ত।
একদিন লাইব্রেরিয়ান কাকু বললেন,
— “ওর নাম তৃষা। ছোটবেলায় অসুস্থতার পর থেকে কথা বলতে পারে না।”
সেদিন থেকে অর্ণবের কেমন যেন আলাদা টান জন্মাল।
প্রতিদিন সে দূর থেকে তৃষাকে দেখত। কখনো বই খুঁজে দিত, কখনো চুপচাপ টেবিলের ওপর একটা চকোলেট রেখে চলে যেত।
তৃষাও ধীরে ধীরে ছোট ছোট কাগজে উত্তর দিতে শুরু করল।
“ধন্যবাদ।”
“আজ বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।”
“তোমার পছন্দের বই কোনটা?”
একদিন প্রবল বৃষ্টি। পুরো কলেজ প্রায় ফাঁকা।
অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখন তৃষা এসে তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল।
কাগজ খুলতেই সে থমকে গেল।
তাতে লেখা—
“সব অনুভূতি শব্দে বলতে হয় না। কিছু মানুষ নীরবতাতেই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।”
অর্ণব ধীরে ধীরে তৃষার দিকে তাকাল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভিতরে দুটো নীরব মন প্রথমবার একে অপরের ভাষা বুঝে ফেলেছিল।
চাঁদের আলোয় প্রতিশ্রুতি।
গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট নদীর ধারে একটা পুরোনো ঘাট ছিল। পূর্ণিমার রাতে সেখানে বসতে খুব ভালোবাসত নীল আর ঐশী।
দু’জনেই স্বপ্ন দেখত— একদিন শহরে গিয়ে নিজেদের মতো একটা জীবন গড়বে।
সেদিনও আকাশভরা চাঁদ। নদীর জলে রুপালি আলো ঝিলমিল করছে।
ঐশী হঠাৎ বলল,
— “যদি কোনোদিন আমরা আলাদা হয়ে যাই?”
নীল মৃদু হেসে তার হাতটা ধরল।
— “তাহলে পূর্ণিমার রাতে এখানেই ফিরে আসবো। তুমি থাকো বা না থাকো… আমি আসব।”
তারপর সময় বদলালো।
চাকরির জন্য নীল শহরে চলে গেল। প্রথমে ফোন, চিঠি— সবই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে লাগল।
একদিন খবর এলো, ঐশীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
নীল আর ফিরে আসেনি।
কেটে গেল আট বছর।
সেদিন আবার পূর্ণিমা। বহুদিন পর নীল গ্রামের সেই ঘাটে এসে দাঁড়াল। চারপাশ নিঃশব্দ। শুধু নদীর জলে চাঁদের আলো ভাসছে।
নীল মৃদু হেসে বলল,
— “দেখো, আমি কথা রেখেছি।”
ঠিক তখনই পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আমি জানতাম তুমি আসবে।”
নীল ঘুরে দাঁড়াল।
সাদা শাড়ি পরে ঐশী দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল, ঠোঁটে সেই পুরোনো হাসি।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ কিছু প্রতিশ্রুতি সময় ভাঙতে পারে না…
সেগুলো শুধু চাঁদের আলোয় নীরবে অপেক্ষা করে।
শেষ ট্রেনের যাত্রী।
রাত তখন প্রায় বারোটা। শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ লোকাল ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা।
অভ্র জানালার পাশে বসে ছিল। ক্লান্ত চোখে বাইরে অন্ধকার শহরটা দেখছিল সে। সারাদিনের কাজের পর এই নিঃশব্দ ট্রেনযাত্রাটুকুই যেন তার নিজের সময়।
হঠাৎ পরের স্টেশনে এক মেয়ে উঠে এসে তার সামনের সিটে বসল।
কালো শাল জড়ানো, ভেজা চুল, আর হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। মেয়েটা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
— “এই ট্রেনটা কি কৃষ্ণনগর যাবে?”
অভ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “না, এর আগেই শেষ স্টপেজ।”
মেয়েটার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— “তাহলে আমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছি…”
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। রাতও অনেক।
অভ্র একটু দ্বিধা করে বলল,
— “আপনি চাইলে শেষ স্টপেজ পর্যন্ত যান। তারপর আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব।”
মেয়েটা মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানাল।
ট্রেন চলতে লাগল। দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা হতে লাগল— পছন্দের বই, বৃষ্টি, পুরোনো গান…
অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন তারা বহুদিনের পরিচিত।
শেষ স্টেশনে পৌঁছে অভ্র ঘুরে বলল,
— “চলুন, নেমে—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে থেমে গেল।
সামনের সিটটা খালি।
মেয়েটা নেই।
অভ্র অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল। পুরো কামরা ফাঁকা।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এসে বললেন,
— “কাউকে খুঁজছেন?”
অভ্র বলল,
— “এই তো একটা মেয়ে ছিল…”
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “পাঁচ বছর আগে এই একই ট্রেনে এক মেয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝে শেষ ট্রেনে তাকে দেখা যায়…”
অভ্র কিছু বলল না।
শুধু দেখল, সামনের সিটে এখনও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল পড়ে আছে।
হারিয়ে যাওয়া ডায়েরি।
পুরোনো বইয়ের দোকানটা শহরের এক কোণে আজও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। ধুলো জমা তাক, হলদেটে পাতা আর পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরা ছোট্ট দোকানটায় খুব কম লোকই আসে।
সেদিন বিকেলে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দোকানে ঢুকেছিল ঋতম।
বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা পুরোনো নীল ডায়েরি তার হাতে এলো। মলাটের ওপর ছোট করে লেখা—
“যদি কখনো হারিয়ে যাই, কেউ যেন আমাকে পড়ে।”
কৌতূহল সামলাতে না পেরে ডায়েরিটা খুলল সে।
পাতার পর পাতা জুড়ে এক অচেনা মেয়ের লেখা। তার ছোট ছোট সুখ, অভিমান, ভালোবাসা আর এক মানুষের অপেক্ষার গল্প।
শেষের দিকের এক পাতায় লেখা ছিল—
“আজ আমি শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু যদি কোনোদিন কেউ এই ডায়েরিটা পড়ে, তাকে একটা কথা বলতে চাই— অপেক্ষা কখনো বৃথা যায় না।”
ঋতম অদ্ভুত এক টান অনুভব করল। যেন অচেনা মানুষটার কষ্টগুলোও তার নিজের হয়ে গেছে।
ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ঠিকানা লেখা ছিল।
পরের দিন অনেক খুঁজে সেই ঠিকানায় পৌঁছাল সে। কিন্তু সেখানে এখন ভাঙা এক পুরোনো বাড়ি ছাড়া কিছু নেই।
ফিরে আসার সময় পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা হঠাৎ বললেন,
— “তুমি কি নীলার খোঁজে এসেছো?”
ঋতম থমকে দাঁড়াল।
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
— “ও প্রায়ই বলত, একদিন কেউ ঠিক ওর ডায়েরি পড়ে ওকে খুঁজতে আসবে।”
ঋতম কিছু বলল না। শুধু বুকের কাছে ডায়েরিটা আরও শক্ত করে ধরে রাখল।
মনে হলো, কিছু গল্প হারিয়ে গেলেও… তাদের অপেক্ষা কখনো হারায় না।
এক কাপ চায়ের গল্প।
কলকাতার পুরোনো এক গলির মোড়ে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। দোকানটার নাম কেউ জানত না, সবাই শুধু বলত— “কাকুর দোকান।”
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় সেখানে এসে বসত অর্ণব। এক কাপ লাল চা আর খবরের কাগজ— এটাই ছিল তার অভ্যাস।
আর ঠিক সেই সময়েই আসত একটি মেয়ে। সাদা কুর্তি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি।
মেয়েটা প্রতিদিন একই কথা বলত—
— “কাকু, এক কাপ চা… একটু কম চিনি।”
প্রথম প্রথম অর্ণব শুধু চুপচাপ দেখত। তারপর ধীরে ধীরে সেই কণ্ঠস্বর, সেই হাসি তার বিকেলের অংশ হয়ে গেল।
কিন্তু দু’জনের মধ্যে কোনোদিন কথা হয়নি।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। অর্ণব ভেবেছিল, আজ হয়তো মেয়েটা আসবে না।
ঠিক তখনই ভিজে চুলে দৌড়ে দোকানে ঢুকল সে।
কাকু হেসে বললেন,
— “আজও এলে?”
মেয়েটা হেসে উত্তর দিল,
— “কিছু অভ্যাস ছাড়া যায় না।”
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। দোকানটা অন্ধকার হয়ে গেল মুহূর্তে।
অর্ণব নিজের অজান্তেই বলে ফেলল,
— “আপনার জন্য একটা চা আমি দিতে পারি?”
মেয়েটা একটু অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “তাহলে এক শর্তে… আপনাকেও আমার সঙ্গে বসে খেতে হবে।”
বাইরে তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আর ছোট্ট সেই চায়ের দোকানে দুটো অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছিল এক কাপ চায়ের উষ্ণতায়।
হৃদয়ের গোপন চিঠি।।
তোমাকে লেখা এই চিঠিটা
হয়তো কোনোদিন তোমার হাতে পৌঁছাবে না,
তবুও প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে
আমার অগোচর ভালোবাসা।
অনেকবার ভেবেছি বলবো—
তুমি আমার কতটা প্রিয়,
কিন্তু তোমার সামনে গেলেই
সব কথা এলোমেলো হয়ে যায়।
তখন শুধু হৃদয়টা নীরবে বলে ওঠে,
“এই মানুষটার মাঝেই আমার সমস্ত সুখ।”
জানো,
রাত গভীর হলে আমি আজও তোমার কথা ভাবি।
জানালার পাশে বসে আকাশ দেখি,
আর মনে মনে তোমার নাম লিখে রাখি তারার ভিড়ে।
তুমি হয়তো বুঝতেই পারো না,
তোমার ছোট্ট একটা হাসি
আমার পুরো দিনটা বদলে দিতে পারে।
তোমার কণ্ঠ শুনলেই
মনে হয় পৃথিবীটা হঠাৎ অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।
আমি তোমাকে নিয়ে কোনো বড় স্বপ্ন দেখি না,
শুধু চাই—
একটা বিকেলে তোমার পাশে বসে
চুপচাপ আকাশ দেখতে।
চাই বৃষ্টির দিনে একসাথে ভিজতে,
চাই অভিমানের পর তোমার হাতটা শক্ত করে ধরতে।
তোমার চোখে মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা দেখি,
তখন খুব ইচ্ছে করে
তোমার সব কষ্ট নিজের করে নিতে।
তুমি জানো?
ভালোবাসা আসলে খুব শান্ত একটা অনুভূতি।
এটা চিৎকার করে নয়,
নিঃশব্দে হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে।
ঠিক যেমন তুমি বেঁচে আছো আমার মধ্যে—
অগোচরে, গভীরে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে।
এই চিঠিটা হয়তো কোনোদিন পাঠাবো না,
তবুও লিখে রাখলাম।
কারণ কিছু কথা না বললেও
ভালোবাসা কখনও কমে যায় না।
আর যদি কোনোদিন
তুমি হঠাৎ জানতে চাও—
“কেউ কি সত্যিই আমাকে এতটা ভালোবেসেছিল?”
তাহলে আকাশের দিকে তাকিয়ো,
হয়তো বাতাস নিঃশব্দে বলে দেবে—
কেউ একজন আজও
তোমার নাম হৃদয়ের গোপন চিঠিতে লিখে রাখে।
শেষ বিকেলের প্রেম।
শেষ বিকেলের নরম রোদে তোমায় প্রথম দেখেছিলাম,
আকাশজুড়ে কমলা রঙ, আর বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।
তুমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে ছিলে,
আর আমি নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছিলাম তোমার মায়াভরা চোখে।
সেদিন সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবছিল পশ্চিম আকাশে,
ঠিক যেমন ধীরে ধীরে আমি ডুবে যাচ্ছিলাম তোমার ভালোবাসায়।
চারপাশে পাখিরা ফিরছিল নিজেদের ঘরে,
আর আমার মন খুঁজে নিচ্ছিল তোমাকেই নিজের ঠিকানা করে।
তুমি হেসে বলেছিলে,
“বিকেলগুলো কেন এত সুন্দর জানো?”
আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম,
“কারণ এই সময়টায় তোমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে।”
তোমার চুলে তখন রোদের শেষ আলো খেলছিল,
মনে হচ্ছিল কোনো কবিতা নীরবে জন্ম নিচ্ছে।
তুমি চুপচাপ পাশে বসেছিলে,
আর আমার হৃদয় হাজার গল্প লিখে যাচ্ছিল তোমাকে নিয়ে।
শেষ বিকেলের হাওয়ায় ছিল কদম ফুলের গন্ধ,
ছিল অদ্ভুত এক নরম বিষণ্নতা।
কারণ বিকেল মানেই তো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাওয়া,
তবুও সেই ফুরিয়ে যাওয়ার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা।
আমি তোমার হাতটা আলতো করে ধরেছিলাম,
তুমি কিছু বলোনি, শুধু মৃদু হেসেছিলে।
সেই হাসির মধ্যেই ছিল হাজারটা অনুভূতি,
যা আজও আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে।
সূর্যটা যখন একেবারে হারিয়ে গেল আকাশের কোণে,
তুমি ধীরে বলেছিলে,
“একদিন যদি আমি হারিয়ে যাই?”
আমি তখন নিঃশব্দে বলেছিলাম,
“তাহলে প্রতিটি শেষ বিকেলে আমি তোমাকেই খুঁজবো।”
আজও যখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে,
আমি তোমার কথাই ভাবি।
আকাশের রঙ বদলাতে দেখলে মনে হয়,
তুমি হয়তো এখনো কোথাও বসে সেই একই আকাশ দেখছো।
শেষ বিকেলের সেই ভালোবাসা
আজও আমার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি।
কারণ কিছু ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না,
তারা শুধু বিকেলের রঙ হয়ে হৃদয়ে থেকে যায় চিরকাল।
নীল শাড়ির মেয়ে।
প্রতিদিন সকাল আটটার লোকাল ট্রেনে একই মেয়েটাকে দেখত সৌরভ।
নীল শাড়ি, খোলা চুল, আর হাতে একটা সাদা ডায়েরি। জানালার পাশে বসে সে কখনো বাইরে তাকিয়ে থাকত, কখনো ডায়েরিতে কিছু লিখত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পুরো ট্রেনে এত ভিড়ের মাঝেও মেয়েটার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা ছিল। যেন সে অন্য এক জগতে থাকে।
সৌরভ প্রতিদিন ঠিক তার উল্টো দিকের সিটে বসার চেষ্টা করত। কিন্তু কোনোদিন কথা বলতে পারেনি।
একদিন সাহস করে একটা ছোট্ট কাগজে লিখল—
“আপনাকে প্রতিদিন দেখি। আপনার নীরবতাটা খুব সুন্দর।”
কাগজটা মেয়েটার ডায়েরির ভেতর আলতো করে রেখে নেমে গেল সে।
পরের দিন ট্রেনে উঠে সৌরভ অবাক।
মেয়েটা আজও সেই একই জায়গায় বসে আছে। তবে আজ তার হাতে একটা নীল খাম।
ট্রেন ছাড়তেই মেয়েটা খামটা বাড়িয়ে দিল।
কাঁপা হাতে খুলে দেখল সৌরভ।
ভেতরে লেখা—
“আমি কথা বলতে পারি না। তাই লিখেই উত্তর দিলাম… আমিও আপনাকে প্রতিদিন দেখি।”
সৌরভ জানালার বাইরে তাকাল। সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
আর ভিড়ের সেই লোকাল ট্রেনে দুটো নীরব হৃদয় প্রথমবার একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলল।
ফেলে আসা বিকেল।
বহু বছর পর আজ আবার সেই মাঠটার পাশ দিয়ে হাঁটছিল অনির্বাণ। শহর বদলেছে, রাস্তা বদলেছে, শুধু পুরোনো বটগাছটা এখনও আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এই মাঠেই প্রতি বিকেলে দেখা হতো তাদের।
মেঘলা সবসময় আগে এসে বসে থাকত। হাতে একটা গল্পের বই, চুলে হালকা বাতাস। আর অনির্বাণ দৌড়ে এসে বলত,
— “আবার এত তাড়াতাড়ি চলে এলে?”
মেঘলা হেসে বলত,
— “কিছু অপেক্ষা ভালো লাগে।”
তারপর একদিন হঠাৎ সব বদলে গেল। মেঘলার বাবার বদলি হলো অন্য শহরে। যাওয়ার আগের বিকেলে মেঘলা বলেছিল,
— “যদি কোনোদিন ফিরে আসি, এই মাঠেই তোমাকে খুঁজবো।”
তারপর কেটে গেছে বারো বছর।
আজ অফিসের কাজে হঠাৎ এই শহরে এসে অনির্বাণের মনে হলো, একবার মাঠটার কাছে যাক।
বিকেলের শেষ আলো তখন ঘাসের ওপর পড়েছে। দূরে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে।
হঠাৎ বটগাছটার নিচে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেল সে।
সাদা শাড়ি, হাতে সেই একই ধরনের বই।
মেঘলা।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তারপর মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— “দেখলে? কিছু অপেক্ষা সত্যিই ফুরোয় না।”
ডুবন্ত সূর্যের আলোয় তখন পুরোনো সেই বিকেলটা আবার ফিরে এসেছিল।