Categories
গল্প

গল্প : শেষ চিঠির অপেক্ষা।।

প্রথম অধ্যায়: অপ্রত্যাশিত চিঠি
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম চন্দনপুর। গ্রামের এক প্রান্তে পুরোনো টালির ছাউনি দেওয়া বাড়িতে একা থাকতেন অনিরুদ্ধ সেন। বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে, কিন্তু মুখের রেখায় যেন আরও অনেক বছরের ক্লান্তি জমে আছে।
প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি উঠোন ঝাড়ু দিতেন, তুলসীতলায় জল দিতেন, তারপর চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে থাকতেন। তাঁর এই একঘেয়ে জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটত না।
কিন্তু একটি অভ্যাস কখনও বদলায়নি—প্রতিদিন দুপুরে তিনি গ্রামের পোস্ট অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
কারণ, তিনি অপেক্ষা করতেন একটি চিঠির।
চিঠিটি আসার কথা ছিল আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে।
গ্রামের সবাই জানত, অনিরুদ্ধ একসময় খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় তিনি ভালোবেসেছিলেন গ্রামেরই মেয়ে মাধুরীকে।
মাধুরীর চোখ ছিল গভীর নদীর মতো শান্ত। দুজনের স্বপ্ন ছিল শহরে গিয়ে সংসার গড়ার।
কিন্তু ভাগ্য তাদের জন্য অন্য গল্প লিখেছিল।
একদিন মাধুরীর পরিবার আচমকা কলকাতায় চলে যায়। যাওয়ার আগে মাধুরী অনিরুদ্ধকে বলেছিল—
“আমি তোমাকে চিঠি লিখব। তুমি অপেক্ষা করবে তো?”
অনিরুদ্ধ হেসে বলেছিলেন—
“সারা জীবন।”
সেই প্রতিশ্রুতির পর ত্রিশ বছর কেটে গেছে।
চিঠি আর আসেনি।
তবুও তিনি অপেক্ষা ছাড়েননি।
দ্বিতীয় অধ্যায়: এক বর্ষার দুপুর
সেদিন আষাঢ়ের দুপুর।
আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
অনিরুদ্ধ দরজা খুলে দেখলেন গ্রামের পোস্টম্যান শিবু দাঁড়িয়ে।
শিবুর হাতে একটি হলদেটে খাম।
“অনিরুদ্ধবাবু, আপনার নামে চিঠি এসেছে।”
কথাটা শুনে তাঁর বুক কেঁপে উঠল।
“আমার নামে?”
“হ্যাঁ।”
কাঁপা হাতে খামটি নিলেন তিনি।
খামের উপর লেখা—
অনিরুদ্ধ সেন, চন্দনপুর গ্রাম।
প্রেরকের নাম—
মাধুরী।
মুহূর্তে যেন পৃথিবী থেমে গেল।
ত্রিশ বছর পরে!
তিনি বারান্দায় বসে খাম খুললেন।
ভিতরে একটি মাত্র চিঠি।
তৃতীয় অধ্যায়: চিঠির ভাষা
চিঠিতে লেখা—
প্রিয় অনিরুদ্ধ,
জানি না এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না।
আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম চিঠি লিখব।
কিন্তু জীবন আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি।
কলকাতায় যাওয়ার কিছুদিন পর বাবার জোরে আমার বিয়ে হয়।
আমি প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু পারিনি।
তোমার ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
বহু বছর পরে আবার খুঁজে পেলাম।
তাই লিখছি।
আমি অসুস্থ।
হয়তো বেশি দিন বাঁচব না।
যদি সম্ভব হয়, একবার দেখা করতে এসো।
তোমার মাধুরী।
চিঠির শেষ লাইনে জল পড়ে কালি ছড়িয়ে গেছে।
হয়তো চোখের জল।
অনিরুদ্ধেরও চোখ ভিজে উঠল।
ত্রিশ বছরের অপেক্ষা।
অবশেষে উত্তর এসেছে।
চতুর্থ অধ্যায়: যাত্রা
পরদিনই তিনি কলকাতার ট্রেনে উঠলেন।
দীর্ঘদিন পরে এত দূরে যাচ্ছেন।
ট্রেনের জানালা দিয়ে বৃষ্টি ভেজা মাঠ দেখতে দেখতে তাঁর মনে পড়ছিল পুরোনো দিন।
কলেজের মাঠ।
মাধুরীর হাসি।
নদীর ধারে হাঁটা।
স্বপ্নের কথা।
সবকিছু যেন গতকালের ঘটনা।
কিন্তু আয়নায় মুখ দেখলেই বোঝা যায়, ত্রিশ বছর কেটে গেছে।
কলকাতায় পৌঁছে তিনি চিঠিতে লেখা ঠিকানার খোঁজ করলেন।
একটি ছোট্ট বাড়ি।
দরজায় নাম লেখা—
মাধুরী মুখার্জি।
তিনি কড়া নাড়লেন।
এক তরুণী দরজা খুলল।
“কাকে চান?”
“আমি… মাধুরী দেবীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”
তরুণীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“আপনি কি অনিরুদ্ধ কাকু?”
তিনি অবাক।
“হ্যাঁ।”
তরুণী ধীরে বলল—
“মা আপনার কথা বলতেন।”
“মা?”
“আমি মাধুরী দেবীর মেয়ে।”
অনিরুদ্ধের বুক ধক করে উঠল।
“মাধুরী কোথায়?”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“মা তিন মাস আগে মারা গেছেন।”
পঞ্চম অধ্যায়: হারিয়ে যাওয়া সময়
অনিরুদ্ধ যেন পাথর হয়ে গেলেন।
তিন মাস আগে?
তাহলে চিঠি?
মেয়েটি বলল—
“মা মৃত্যুর আগে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন সময়মতো পাঠাতে। কিন্তু নানা কারণে দেরি হয়ে গেছে।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে বসে রইলেন।
কোনো কথা বেরোল না।
মেয়েটি একটি বাক্স নিয়ে এল।
“মা এটা আপনার জন্য রেখে গেছেন।”
বাক্স খুলতেই তিনি দেখলেন—
পুরোনো ছবি।
শুকনো শিউলি ফুল।
কলেজ জীবনের স্মৃতি।
আর শতাধিক অপাঠানো চিঠি।
প্রতিটি চিঠি তাঁর নামে লেখা।
ষষ্ঠ অধ্যায়: অপ্রেরিত ভালোবাসা
রাতভর তিনি চিঠিগুলো পড়লেন।
প্রথম চিঠি লেখা ছিল ত্রিশ বছর আগে।
দ্বিতীয়টি এক বছর পরে।
তৃতীয়টি আরও পরে।
প্রতিটি চিঠিতে ছিল তাঁর কথা।
তাঁর স্মৃতি।
তাঁর প্রতি ভালোবাসা।
মাধুরী কখনও তাঁকে ভুলে যাননি।
পরিস্থিতি, দায়িত্ব, সংসার—সবকিছু তাঁকে আটকে রেখেছিল।
কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে অনিরুদ্ধ ছিলেন।
সবসময়।
একটি চিঠিতে লেখা—
অনিরুদ্ধ,
আজ আমার মেয়ের জন্মদিন।
সবাই খুব খুশি।
তবু জানো, তোমার কথা মনে পড়ছে।
তুমি কি এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছ?
আরেকটিতে—
আজ আমার চুলে প্রথম পাকা রং দেখলাম।
মনে হল সময় কত দ্রুত চলে যায়।
যদি কোনোদিন দেখা হয়, চিনতে পারবে তো?
চিঠিগুলো পড়তে পড়তে অনিরুদ্ধ কাঁদলেন।
জীবনে প্রথমবার তিনি অনুভব করলেন—
তাঁর অপেক্ষা বৃথা ছিল না।
সপ্তম অধ্যায়: শেষ দেখা
পরদিন মাধুরীর মেয়ে তাঁকে নিয়ে গেল কাছের শ্মশানের পাশে স্মৃতিফলকের কাছে।
সেখানে লেখা—
মাধুরী মুখার্জি (১৯৭১–২০২৫)
অনিরুদ্ধ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ।
মনে হল মাধুরী যেন ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি ধীরে বললেন—
“আমি এসেছি, মাধুরী।”
“দেরি হয়ে গেল।”
“ক্ষমা করো।”
বাতাস হালকা করে বয়ে গেল।
যেন অদৃশ্য কেউ উত্তর দিল—
“তুমি তো এসেছ।”
অষ্টম অধ্যায়: অপেক্ষার অবসান
গ্রামে ফিরে এসে অনিরুদ্ধ আর আগের মতো রইলেন না।
তিনি প্রতিদিন পোস্ট অফিসের দিকে তাকিয়ে থাকতেন না।
কারণ অপেক্ষা শেষ হয়েছে।
একদিন তিনি সমস্ত চিঠি একটি কাঠের বাক্সে সাজিয়ে রাখলেন।
বাক্সের উপর লিখলেন—
“অপেক্ষার ইতিহাস”
গ্রামের ছেলেমেয়েদের তিনি গল্প শোনাতেন।
ভালোবাসার গল্প।
প্রতিশ্রুতির গল্প।
অপেক্ষার গল্প।
বছরখানেক পরে এক শরৎ সকালে তিনি বারান্দায় বসে ছিলেন।
হাতে মাধুরীর প্রথম চিঠি।
মুখে শান্ত হাসি।
আকাশে সাদা মেঘ ভাসছিল।
দূরে কাশফুল দুলছিল।
সেই দিন তিনি চিরশান্তির ঘুমে চলে গেলেন।
চিঠিটি তাঁর বুকের উপর রাখা ছিল।
শেষবারের মতো যেন তিনি উত্তর পেয়েছিলেন।
উপসংহার
ভালোবাসা সবসময় একসঙ্গে থাকার নাম নয়।
কখনও কখনও ভালোবাসা হলো অপেক্ষা।
কখনও প্রতিশ্রুতি।
কখনও একটি অপাঠানো চিঠি।
আর কখনও ত্রিশ বছর পর পৌঁছে যাওয়া একটি খাম, যা প্রমাণ করে—
সময় হারিয়ে যেতে পারে, মানুষ চলে যেতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও মরে না।
সমাপ্ত 🌸

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *