Categories
গল্প

বৃষ্টিভেজা বিকেল।।

প্রথম অধ্যায় : সেই বিকেলের বৃষ্টি
শ্রাবণের শেষ দিক। সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। কালো মেঘে ঢেকে আছে চারদিক। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে, যেন আকাশ নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকোতে পারছে না।
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট শহর তমলুকে থাকত সৌম্য। স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একেবারে একা।
বাবা-মা দুজনেই কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। ছোট্ট একটি বাড়ি, কিছু বই আর স্কুল—এই ছিল তার পৃথিবী।
সেদিন স্কুল ছুটি হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো।
মুষলধারে।
রাস্তাঘাট মুহূর্তে জলে ভরে গেল।
ছাত্রছাত্রীরা একে একে বাড়ি চলে গেল। সৌম্যও বেরোতে যাচ্ছিল, এমন সময় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলাকে দেখতে পেল।
নীল রঙের শাড়ি।
হাতে একটি ভেজা ছাতা।
মুখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা।
সৌম্য এগিয়ে গিয়ে বলল—
“আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?”
মহিলা একটু চমকে তাকালেন।
“না… আসলে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছি।”
“তাহলে স্টাফরুমে বসতে পারেন।”
মহিলা মৃদু হেসে বললেন—
“ধন্যবাদ।”
সেদিন সৌম্য জানত না, এই বৃষ্টিভেজা বিকেল তার জীবন বদলে দিতে চলেছে।
দ্বিতীয় অধ্যায় : পরিচয়
স্টাফরুমে বসে কথাবার্তা শুরু হলো।
মহিলার নাম অন্বেষা।
তিনি কলকাতা থেকে এসেছেন।
একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন।
কিছু পুরোনো লোককাহিনি সংগ্রহের কাজে এই অঞ্চলে এসেছিলেন।
সৌম্য অবাক হয়ে বলল—
“আজকালও কেউ লোককাহিনি নিয়ে কাজ করে?”
অন্বেষা হেসে বলল—
“গল্প না থাকলে মানুষ বাঁচে কীভাবে?”
কথাটা শুনে সৌম্যের ভালো লাগল।
কারণ সেও গল্প ভালোবাসত।
বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ ছিল না।
তাই তারা অনেকক্ষণ গল্প করল।
সাহিত্য।
রবীন্দ্রনাথ।
বিভূতিভূষণ।
জীবনানন্দ।
আর জীবন।
তৃতীয় অধ্যায় : একটি পুরোনো ডায়েরি
পরদিনও অন্বেষা স্কুলে এল।
আসলে তার গবেষণার জন্য কিছু তথ্য দরকার ছিল।
সৌম্য তাকে সাহায্য করতে লাগল।
একদিন স্কুলের পুরোনো লাইব্রেরি ঘাঁটতে গিয়ে তারা একটি ডায়েরি খুঁজে পেল।
ডায়েরিটি প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো।
লেখকের নাম—
অমিয় মুখোপাধ্যায়।
একজন শিক্ষক।
ডায়েরিতে লেখা ছিল একটি অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি।
একজন শিক্ষক।
একজন সংগীতশিল্পী।
আর একটি বৃষ্টিভেজা বিকেল।
অন্বেষা বলল—
“দেখো, গল্প যেন কখনও শেষ হয় না। শুধু মানুষ বদলে যায়।”
সৌম্য ডায়েরির পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো, অতীত যেন বর্তমানের সঙ্গে কথা বলছে।
চতুর্থ অধ্যায় : বন্ধুত্ব
দিন গড়াতে লাগল।
অন্বেষার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল এক সপ্তাহে।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহে গড়াল।
তারপর তিন সপ্তাহে।
সৌম্য ও অন্বেষার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হলো।
তারা নদীর ধারে হাঁটত।
চায়ের দোকানে বসে গল্প করত।
পুরোনো মন্দির ঘুরে দেখত।
একদিন সন্ধ্যায় অন্বেষা বলল—
“তুমি কখনও শহরে যাওয়ার কথা ভাবোনি?”
সৌম্য মাথা নাড়ল।
“না। এখানে আমার ছাত্ররা আছে।”
“তুমি অদ্ভুত মানুষ।”
“ভালো না খারাপ?”
“ভালো।”
অন্বেষা হেসে ফেলল।
সৌম্যও।
পঞ্চম অধ্যায় : লুকিয়ে থাকা কষ্ট
কিন্তু অন্বেষার হাসির আড়ালে কিছু একটা লুকিয়ে ছিল।
সৌম্য তা বুঝতে পারত।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কি কোনো কষ্ট লুকিয়ে রাখছ?”
অন্বেষা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“আমার বিয়ে হয়েছিল।”
সৌম্য অবাক।
“হয়েছিল?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে স্বামী একটি দুর্ঘটনায় মারা যান।”
চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
“তারপর?”
“তারপর কাজ। শুধু কাজ।”
সেদিন প্রথমবার অন্বেষার চোখে জল দেখল সৌম্য।
ষষ্ঠ অধ্যায় : বিদায়ের খবর
একদিন অন্বেষা জানাল—
“আমাকে কলকাতায় ফিরতে হবে।”
সৌম্যের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
যেন হঠাৎ কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।
“কবে?”
“আগামী সপ্তাহে।”
সৌম্য কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন রাতে ঘুম এল না।
সে বুঝতে পারল—
অন্বেষা শুধু বন্ধু হয়ে থাকেনি।
তার জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে।
সপ্তম অধ্যায় : আবার বৃষ্টি
বিদায়ের আগের দিন।
আবার বৃষ্টি নামল।
ঠিক প্রথম দিনের মতো।
আকাশ ভেঙে পড়া বৃষ্টি।
সৌম্য ও অন্বেষা স্কুলের সেই পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর অন্বেষা বলল—
“জানো, এই কয়েকটা দিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল।”
সৌম্য মৃদু হেসে বলল—
“আমারও।”
“তাহলে এত চুপ কেন?”
সৌম্য উত্তর দিল না।
কারণ কিছু কথা ভাষায় বলা যায় না।
অষ্টম অধ্যায় : অপ্রকাশিত কথা
পরদিন স্টেশনে অন্বেষাকে বিদায় জানাতে গেল সৌম্য।
ট্রেন আসতে এখনও কয়েক মিনিট বাকি।
অন্বেষা বলল—
“একটা কথা বলবে?”
“কী?”
“তুমি কি আমাকে মিস করবে?”
সৌম্য হেসে বলল—
“প্রতিদিন।”
অন্বেষা চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
“আমিও।”
ট্রেন ঢুকে পড়ল।
কিন্তু ঠিক ওঠার আগে অন্বেষা ফিরে দাঁড়াল।
“সৌম্য?”
“হ্যাঁ?”
“আমি আবার আসব।”
নবম অধ্যায় : এক বছরের অপেক্ষা
এক বছর কেটে গেল।
তারা ফোনে কথা বলত।
চিঠি লিখত।
মাঝে মাঝে দেখা হতো।
কিন্তু দূরত্ব রয়ে গেল।
এরপর একদিন অন্বেষা হঠাৎ জানাল—
“আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।”
সৌম্য অবাক।
“কেন?”
“কারণ আমি আর পালাতে চাই না।”
“মানে?”
“আমি তমলুকে আসছি।”
দশম অধ্যায় : নতুন শুরু
শরতের এক সকালে অন্বেষা স্থায়ীভাবে তমলুকে চলে এল।
একটি ছোট প্রকাশনা কেন্দ্র শুরু করল।
সৌম্য পাশে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো।
একদিন সেই একই স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্বেষা বলল—
“মনে আছে? প্রথম দিন এখানেই আমাদের দেখা হয়েছিল।”
সৌম্য হেসে বলল—
“আর বৃষ্টিও হচ্ছিল।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বৃষ্টি আমাদের জন্য শুভ।”
“হয়তো।”
দুজনেই হেসে উঠল।
উপসংহার
জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কখনও কখনও খুব সাধারণভাবে শুরু হয়।
একটি বৃষ্টি।
একটি অপেক্ষা।
একটি কথোপকথন।
আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন গল্প।
সৌম্য ও অন্বেষার গল্প প্রমাণ করে—
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে ঠিক সময়ে।
যখন আমরা ভাবি সব শেষ,
ঠিক তখনই তারা নতুন শুরুর দরজা খুলে দেয়।
আর তাই আজও যখন শ্রাবণের বৃষ্টি নামে, তমলুকের সেই পুরোনো স্কুলের বারান্দা যেন ফিসফিস করে বলে—
“সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো শুরু হয় এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।”
সমাপ্ত। ☔❤️

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *