Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা : অবহেলিত বই।।

আলমারির এক কোণেতে ধুলো মেখে বই, কেউ তো তাকে খোলে না আর, সঙ্গী যেন কেউ নেই।

পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে কত অজানা দেশ, রাজা-রানি, পাহাড়-নদী, কত জীবনের রেশ।

কত লেখক রাত জেগে লিখেছেন তার কথা, কত ভাবনা, কত অনুভব, কত সুখের ব্যথা।

তবু আজ সে একলা পড়ে নীরব ঘরের কোণে, মোবাইলের রঙিন পর্দা টানে সবার মনে।

একদিন এক শিশু এসে বইটি হাতে নিল, প্রথম পাতার অক্ষরগুলো নতুন করে চিনল।

পাতার পরে পাতা উল্টে খুলল বিস্ময়-দ্বার, ছোট্ট মনে স্বপ্ন জাগল, বাড়ল জানার ভার।

বইটি যেন হাসল সেদিন, পেল নতুন প্রাণ, জ্ঞান যে কখনও বুড়ো হয় না, এ তারই প্রমাণ।

এসো আবার বইয়ের কাছে, খুলি মনের দ্বার, বইয়ের পাতায় খুঁজে পাব পৃথিবী অপার।

যে বই আজ অবহেলিত, সেও সম্পদ এক, তার নীরবতার গভীর মাঝে জ্ঞান রয়েছে অনেক।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

যে বীজ থেকে জন্ম নিয়েছিল হাজার মানুষের সাহস।

পূর্ব মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত এক গ্রাম শ্যামপুর। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা চাষবাসের ওপর নির্ভরশীল। কারও জমিতে ধান হয়, কেউ ফুল চাষ করেন, আবার কেউ শীতের মরশুমে নানা ধরনের সবজি ফলিয়ে সংসার চালান। বছরের পর বছর তাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকেন।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে গ্রামের কৃষকদের মুখে হাসি কমে আসছিল। কখনো বীজের দাম বেড়ে যাচ্ছিল, কখনো বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছিল না, আবার কখনো ফসল ভালো হলেও বিক্রির সময় ন্যায্য দাম মিলছিল না। ছোট চাষিদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ। ধার করে চাষ শুরু করে ফসল বিক্রির পরও অনেকের হাতে তেমন টাকা থাকত না।

সেই গ্রামেই বাস করত চব্বিশ বছরের মেয়ে ইরা। কলকাতায় কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সে চাকরির চেষ্টা করছিল। শহরে থেকে যাওয়ার সুযোগও তার সামনে ছিল। কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে তাকে গ্রামে ফিরতে হয়েছিল।

ইরার বাবা নিবারণবাবু ছিলেন সামান্য জমির চাষি। নিজের জমিতে ধান চাষ করার পাশাপাশি তিনি কিছু সবজিও ফলাতেন। মেয়ের পড়াশোনার জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছিলেন। তাই ইরা চাইত, একদিন বাবার সমস্ত পরিশ্রমের মূল্য ফিরিয়ে দিতে।

কিন্তু গ্রামে ফিরে সে বুঝতে পারল, শুধু নিজের বাবার সমস্যার সমাধান করলেই চলবে না। একই সমস্যায় ভুগছেন আশপাশের অসংখ্য কৃষক।

একদিন সকালে ইরা বাবার সঙ্গে জমিতে গিয়েছিল। নিবারণবাবু মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা শুকনো চারাগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এত টাকা দিয়ে বীজ কিনলাম। তার ওপর সার, সেচের খরচ। সব মিলিয়ে যা খরচ হয়েছে, ফসল বিক্রি না হলে কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।”

ইরা মাটির কাছ থেকে একটি শুকিয়ে যাওয়া চারা তুলে নিল।

“বাবা, তোমরা কি প্রতি মরশুমে একইভাবে নতুন বীজ কেনো?”

“কিনব না কেন? চাষ করতে গেলে বীজ তো লাগবেই।”

“গত বছরের ফসল থেকে ভালো বীজ আলাদা করে রাখো না?”

নিবারণবাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “সব বীজ সব সময় রাখা যায় না মা। কোন জাতের বীজ রাখতে হবে, কীভাবে শুকোতে হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে—সেসব জানা দরকার। ভুল করলে বীজ নষ্ট হবে, তখন আরও ক্ষতি।”

ইরা বুঝতে পারল, এখানে শুধু অর্থের সমস্যা নয়, প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও পরিকল্পনার অভাবও রয়েছে।

সেই দিন থেকেই সে গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কারা কোন ফসল চাষ করেন, কোন বীজ ভালো ফলন দেয়, কোন জাত স্থানীয় আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে পারে—সব তথ্য একটি খাতায় লিখে রাখল।

কয়েকজন অভিজ্ঞ কৃষকের কাছ থেকে সে জানল, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা একসময় নিজেদের জমির উপযোগী বীজ যত্ন করে সংরক্ষণ করতেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে বীজ বিনিময়েরও প্রচলন ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস হারিয়ে গিয়েছে।

ইরা সিদ্ধান্ত নিল, গ্রামে একটি ছোট্ট বীজভান্ডার তৈরি করবে।

তার পরিকল্পনা ছিল সহজ। যে কৃষকদের কাছে ভালো মানের বীজ রয়েছে, তাঁরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কিছু বীজ জমা রাখবেন। বীজের নাম, সংগ্রহের সময়, ফসলের ধরন এবং সংরক্ষণের পদ্ধতি লিখে রাখা হবে। পরবর্তী মরশুমে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য কৃষকেরা সেখান থেকে বীজ নিতে পারবেন। ফসল ওঠার পর তাঁরা নির্ধারিত পরিমাণ বীজ ফেরত দেবেন।

এতে কৃষকদের প্রতিবার বাজার থেকে সমস্ত বীজ কিনতে হবে না। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উপযোগী কিছু জাতও সংরক্ষিত থাকবে।

কিন্তু পরিকল্পনাটি শুনে গ্রামের সবাই উৎসাহিত হলেন না।

গ্রামের প্রভাবশালী চাষি মহাদেববাবু বললেন, “এসব বইয়ের কথা দিয়ে চাষ হয় না। বীজভান্ডার বানিয়ে কী হবে? বীজেরও তো মেয়াদ আছে। ঠিকমতো রাখতে না পারলে সব নষ্ট হবে।”

আরেকজন বললেন, “যে মেয়ে এত দিন শহরে পড়েছে, সে গ্রামের চাষিদের শেখাবে?”

ইরা কথাগুলো শুনে কষ্ট পেলেও তর্ক করল না।

সে জানত, কৃষকের কাছে বীজ শুধু একটি বস্তু নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সারা বছরের পরিশ্রম, পরিবারের খাবার এবং ঋণ শোধের আশা। তাই প্রমাণ ছাড়া কাউকে নতুন ব্যবস্থার ওপর ভরসা করতে বলা ঠিক হবে না।

সে প্রথমে নিজের বাড়ির একটি শুকনো ঘর পরিষ্কার করল। জানালার ফাঁক বন্ধ করল, তাক তৈরি করল এবং বীজ রাখার উপযোগী পরিষ্কার পাত্র জোগাড় করল। অভিজ্ঞ কৃষকদের সাহায্যে কয়েকটি ফসলের বীজ বেছে নিল। কৃষি দপ্তরের পরামর্শ নিয়ে বীজ শুকোনো, সংরক্ষণ এবং অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা করার নিয়ম শিখল।

প্রতিটি পাত্রে নাম ও তারিখ লিখে রাখা হলো। কোন বীজ কত দিন রাখা যাবে, কোনটির নিয়মিত পরীক্ষা দরকার, সেসবও নথিভুক্ত করা হলো।

কাজটি সহজ ছিল না। কখনো আর্দ্রতার সমস্যা দেখা দিল, কখনো একটি পাত্রে পোকা পাওয়া গেল। ইরা বুঝতে পারল, শুধু উৎসাহ থাকলেই হবে না; নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।

একদিন সে গ্রামের দশজন কৃষককে নিয়ে একটি ছোট সভা করল। সেখানে সে নিজের পরিকল্পনার কথা আবার বলল।

“আমি কাউকে বলছি না যে সব বীজ কেনা বন্ধ করে দিন। আমি চাই, যেসব বীজ নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব, সেগুলো আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ব্যবহার করি। আর যে বীজের গুণমান নিয়ে সন্দেহ থাকবে, তা দিয়ে চাষ করব না।”

কৃষক হরিপদবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “বীজ ভালো কি না বুঝব কীভাবে?”

ইরা কয়েকটি বীজ নিয়ে দেখাল, কীভাবে ছোট নমুনা থেকে অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা করা যায়। সে আরও বুঝিয়ে দিল, পরীক্ষায় ভালো ফল এলেও জমির উপযোগিতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং স্থানীয় কৃষি পরামর্শ বিবেচনা করা জরুরি।

তার ব্যাখ্যা শুনে কয়েকজন কৃষক আগ্রহী হলেন।

প্রথম মরশুমে মাত্র সাতজন কৃষক বীজভান্ডারে বীজ জমা দিলেন। তাঁদের মধ্যে নিবারণবাবুও ছিলেন। তিনি নিজের জমিতে ভালো ফলন পাওয়া একটি সবজির জাতের বীজ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করলেন।

পরবর্তী মরশুমে সেই বীজের কিছু অংশ নিয়ে চাষ করলেন পাশের গ্রামের কৃষক শশাঙ্কবাবু। তাঁর জমিতে ফলন ভালো হলো। তিনি ইরার কাছে এসে বললেন, “তোমার ব্যবস্থায় আমার বীজ কেনার খরচ কিছুটা কমেছে। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, দরকারের সময় বীজের জন্য অন্যের কাছে অসহায় হয়ে দাঁড়াতে হয়নি।”

কথাটি ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে।

এরপর আরও কৃষক বীজভান্ডারে যোগ দিলেন। কেউ ধানের স্থানীয় জাতের বীজ দিলেন, কেউ বিভিন্ন সবজির বীজ। তবে ইরা সবাইকে সতর্ক করত—সব বীজ সব পরিবেশে উপযোগী নয়, আর কোনো জাতের বীজ সংরক্ষণ করলেই যে প্রতি বছর একই ফলন হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

বীজভান্ডারের কাজের পাশাপাশি ইরা একটি হিসাবের খাতাও চালু করল। কে কত বীজ জমা দিলেন, কে কতটা নিলেন, ফেরত দেওয়ার সময় কতটা দিলেন—সব পরিষ্কারভাবে লেখা থাকত। এতে কারও মনে সন্দেহ তৈরি হলো না।

একদিন জেলা কৃষি দপ্তরের এক কর্মী গ্রামে এলেন। ইরার উদ্যোগের কথা শুনে তিনি বীজ সংরক্ষণের নিরাপত্তা, রোগমুক্ত বীজ নির্বাচন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ নিয়ে পরামর্শ দিলেন। তাঁর সাহায্যে গ্রামের কয়েকজন কৃষক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশ নিলেন।

সময়ের সঙ্গে বীজভান্ডারটি গ্রামের পরিচিত একটি উদ্যোগ হয়ে উঠল।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটল মানুষের মনোভাবে।

আগে কোনো কৃষকের ফসল নষ্ট হলে প্রতিবেশীরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এখন তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলতেন, কী ভুল হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করতেন এবং পরের মরশুমে কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায় তা নিয়ে আলোচনা করতেন।

এক বছর বর্ষার শুরুতে প্রবল বৃষ্টিতে কয়েকজন কৃষকের বীজ রাখার ঘরে জল ঢুকে পড়ল। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বৃদ্ধ কৃষক রমেশবাবু। বহু যত্নে রাখা তাঁর বেশ কিছু বীজ নষ্ট হয়ে গেল।

খবর পেয়ে ইরা ও বীজভান্ডারের সদস্যরা ছুটে এলেন। তাঁরা প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত বীজ আলাদা করলেন, যাতে অন্য বীজ দূষিত না হয়। তারপর সংরক্ষিত মজুত থেকে পরীক্ষিত বীজের একটি অংশ রমেশবাবুকে দেওয়া হলো। অবশ্য যে ফসলের জন্য উপযুক্ত বীজ পাওয়া গেল না, তার ক্ষেত্রে তাঁরা কৃষি দপ্তরের পরামর্শ নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা করলেন।

রমেশবাবুর চোখে জল এসে গেল।

“আমার নিজের ঘরে বীজ রাখলে হয়তো সব হারিয়ে ফেলতাম। কিন্তু তোমরা সবাই মিলে থাকার জন্য আবার শুরু করার সুযোগ পেলাম।”

ইরা তাঁর হাত ধরে বলল, “এই বীজভান্ডার শুধু আমার নয়, আমাদের সবার। একজনের ক্ষতি যেন সবাই মিলে কিছুটা সামলাতে পারি, সেটাই তো উদ্দেশ্য।”

কয়েক বছর পর গ্রামের বীজভান্ডার আরও বড় হলো। গ্রামের মহিলারাও এতে যুক্ত হলেন। তাঁরা বীজ বাছাই, নথি সংরক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের কাজে অংশ নিলেন। তরুণেরা ডিজিটাল তালিকা তৈরি করল, যাতে সহজে জানা যায় কোন ধরনের বীজ কতটা মজুত রয়েছে।

ইরা বুঝতে পারল, একটি ছোট উদ্যোগ তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন তা একজন মানুষের ওপর নির্ভর করে থাকে না। সবাই দায়িত্ব ভাগ করে নিলে উদ্যোগটি মানুষের নিজস্ব সম্পদ হয়ে ওঠে।

একদিন গ্রামের একটি সভায় মহাদেববাবু উঠে দাঁড়ালেন। সেই মানুষটিই একসময় ইরার পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি বললেন, “আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, এ কাজ করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু এখন বুঝছি, লাভ শুধু টাকার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে শিখেছি। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতারও যে এত মূল্য আছে, সেটাও নতুন করে বুঝেছি।”

সভা শেষে নিবারণবাবু মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“তুই শহরে চাকরি করতে পারতিস,” তিনি বললেন। “কখনো কি মনে হয়, গ্রামে থেকে ভুল করেছিস?”

ইরা হাসল।

“না বাবা। আমি শহরকে ছেড়ে দিইনি, আবার গ্রামকেও পিছনে ফেলিনি। এখানে থেকে কাজ করছি বলে নতুন অনেক কিছু শিখতে পারছি। তবে আমারও আরও শিখতে হবে।”

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

সন্ধ্যায় ইরা বীজভান্ডারের দরজা বন্ধ করার আগে তাকগুলোর দিকে তাকাল। ছোট ছোট পাত্রের মধ্যে রাখা বীজগুলো বাইরে থেকে দেখতে প্রায় একই রকম। অথচ প্রতিটির মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা—কোনোটি থেকে ধানগাছ জন্মাবে, কোনোটি থেকে সবুজ লাউয়ের লতা, আবার কোনোটি থেকে উঠবে লাল টমেটো।

ইরা জানত, বীজ নিজে থেকে কোনো বিপ্লব ঘটায় না। তার জন্য দরকার জ্ঞান, যত্ন, সঠিক পরিকল্পনা এবং মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রম।

তবু প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরুতে এমনই একটি ছোট বীজ থাকে—যাকে প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয় না, অথচ সঠিক পরিবেশ পেলে সেই বীজ থেকেই জন্ম নিতে পারে নতুন ভবিষ্যৎ।

শ্যামপুরের মানুষ তাই আর বীজভান্ডারটিকে শুধু বীজ রাখার ঘর বলে ডাকতেন না। তাঁদের কাছে সেটি ছিল বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি, নিজেদের জ্ঞানকে সম্মান করার শিক্ষা এবং একসঙ্গে এগিয়ে চলার সাহসের প্রতীক।

গল্পের শিক্ষা: আত্মনির্ভরতা মানে একা সবকিছু করা নয়; বরং নিজের জ্ঞান ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তার ভিত্তি হয় সততা, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং পারস্পরিক বিশ্বাস।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

কাচের জানালায় আটকে থাকা আকাশ।

মহিষাদলের ছোট্ট বাজারের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো চশমার দোকান। দোকানের নাম—‘দৃষ্টিপথ’। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, এই ছোট্ট দোকানের ভেতরে কত মানুষের পৃথিবী নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠত।

দোকানটির মালিক ছিলেন অরুণবাবু। বয়স প্রায় ষাট। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কপালে কয়েকটি গভীর ভাঁজ, আর কথাবার্তায় অদ্ভুত এক মমতা। তিনি শুধু চশমা বিক্রি করতেন না, মানুষের চোখের সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনের কথাও শুনতেন।

তাঁর একমাত্র মেয়ে নন্দিতা কলকাতায় পড়াশোনা করত। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একজন আলোকচিত্রী হওয়ার। পৃথিবীর নানা রং, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, বৃষ্টিভেজা রাস্তা কিংবা জানালার পাশে বসে থাকা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ—সবকিছুর মধ্যেই সে খুঁজে পেত গল্প।

কিন্তু অরুণবাবুর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম।

তিনি চাইতেন, নন্দিতা পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরে দোকানের দায়িত্ব নিক। তাঁর যুক্তি ছিল, এত বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসাটি একদিন বন্ধ হয়ে গেলে সবকিছু হারিয়ে যাবে।

নন্দিতা বাবাকে ভালোবাসত। কিন্তু নিজের স্বপ্নটাকেও সে অস্বীকার করতে পারত না।

একদিন রাতে বাবার সঙ্গে তার তুমুল তর্ক হয়ে গেল।

“বাবা, আমি সারাজীবন চশমার দোকানে বসে থাকতে পারব না। আমি ছবি তুলতে চাই। নিজের কাজ দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে চাই।”

অরুণবাবু চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।

“ছবি তুলে জীবন চলে?” তিনি ধীরে ধীরে বললেন। “শখ আর জীবিকার মধ্যে পার্থক্য আছে, নন্দিতা।”

“তুমি কখনো আমার কাজটা বুঝতেই চাওনি!”

কথাটা বলে নন্দিতা নিজের ঘরে চলে গেল।

পরদিন সকালে সে কলকাতায় ফিরে গেল। যাওয়ার সময় বাবাকে কিছু বলল না। অরুণবাবুও তাকে আটকাননি।

শুধু দোকানের কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের চলে যাওয়া দেখেছিলেন।

তারপর থেকে বাবা-মেয়ের কথাবার্তা কমতে লাগল। ফোনে প্রয়োজনীয় কথা হতো, কিন্তু সেই কথার মধ্যে আর আগের মতো হাসি থাকত না।

নন্দিতা কলকাতায় একটি ছোট সংবাদমাধ্যমে ছবি তোলার কাজ পেল। বেতন বেশি ছিল না। তবু প্রতিদিন নতুন কিছু দেখার সুযোগ পেয়ে সে খুশি ছিল।

একদিন তাকে শহরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে ছবি তুলতে পাঠানো হলো। সেখানে গিয়ে তার পরিচয় হলো সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার সঙ্গে। নাম কমলা দেবী।

কমলা দেবী জানালার পাশে বসে প্রতিদিন আকাশ দেখতেন। তাঁর চোখে ছানি পড়েছিল। দূরের গাছ, পাখি, এমনকি নিজের সামনে রাখা ফুলের পাপড়িগুলোও তিনি স্পষ্ট দেখতে পেতেন না।

নন্দিতা ছবি তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল, “আপনি সব সময় জানালার পাশে বসে থাকেন কেন?”

বৃদ্ধা হেসে বললেন, “এখান থেকে আকাশটা দেখা যায়। যদিও এখন আর আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পাই না।”

“আপনার বাড়ির লোকেরা আপনাকে দেখতে আসেন?”

কমলা দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

“ছেলে বিদেশে থাকে। ব্যস্ত মানুষ। বউমা সংসার সামলায়। আমি এখানে ভালোই আছি। কাউকে দোষ দিয়ে কী হবে বলো?”

নন্দিতা বুঝতে পারল, বৃদ্ধা কথার আড়ালে নিজের একাকিত্ব লুকিয়ে রাখছেন।

ছবি তোলার কাজ শেষ করে সে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু কমলা দেবীর কথাগুলো তার মনে থেকে গেল।

কয়েক দিন পর নন্দিতা আবার সেখানে গেল। এবার তার হাতে ছিল একটি ছোট ক্যামেরা এবং কিছু সময়।

সে বৃদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলল, তাঁদের পুরোনো দিনের গল্প শুনল, তাঁদের প্রিয় গান, হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস আর অপূর্ণ ইচ্ছের কথা জানল। বুঝতে পারল, অনেক মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়—কেউ মন দিয়ে তাঁদের কথা শুনুক, সেই অভাবের।

তার তোলা ছবিগুলোর একটি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হলো। প্রদর্শনীর নাম দিল—‘জানালার ওপারে’।

সেখানে ছিল বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের ছবি। প্রতিটি ছবির সঙ্গে তাঁদের নিজের ভাষায় লেখা কয়েকটি বাক্য।

কমলা দেবীর ছবির নিচে লেখা ছিল—

‘আকাশ প্রতিদিন একই থাকে না। কখনো রোদ, কখনো মেঘ। তবু জানালার সামনে বসে থাকি, কারণ মনে হয়, পৃথিবী এখনও আমার সঙ্গে কথা বলছে।’

প্রদর্শনীতে প্রচুর মানুষ এলেন। কেউ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন, কেউ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের জন্য বই ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

একজন প্রবীণ চক্ষু চিকিৎসকও প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন। তিনি নন্দিতার কাজ দেখে মুগ্ধ হলেন।

“তুমি শুধু ছবি তোলোনি,” তিনি বললেন, “তুমি মানুষের না-বলা কথাগুলোকে দৃশ্যমান করেছ।”

কথাটা নন্দিতার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।

এর কয়েক সপ্তাহ পরে তার কাছে একটি ফোন এল। ফোনের ওপারে ছিলেন অরুণবাবু।

“তোর ছবির প্রদর্শনীর কথা শুনলাম,” তিনি বললেন।

নন্দিতা অবাক হয়ে গেল। “তুমি জানলে কী করে?”

“তোর এক স্কুলের বন্ধু খবরের কাগজে ছবিটা দেখেছে। আমাকে পাঠিয়েছে।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অরুণবাবু বললেন, “ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে।”

নন্দিতার বুকের মধ্যে জমে থাকা অভিমান যেন একটু নরম হলো।

“ধন্যবাদ, বাবা।”

“একটা কথা বলব?”

“বলো।”

“তুই কি এই রবিবার বাড়ি আসতে পারবি? দোকানে একটু কাজ আছে।”

নন্দিতা জানত, বাবা সহজে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন না। তাই সে বুঝল, এই ফোনের আড়ালে অন্য কোনো কথা রয়েছে।

রবিবার সকালে সে বাড়ি ফিরল।

দোকানে ঢুকেই দেখল, অরুণবাবু একটি পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে বসে আছেন। বাক্সের মধ্যে বহু বছরের চশমার ফ্রেম, স্ক্রু, ছোট যন্ত্রপাতি আর কিছু ছবি রাখা।

“এগুলো কী?” নন্দিতা জিজ্ঞেস করল।

অরুণবাবু একটি বিবর্ণ ছবি তুলে দিলেন তার হাতে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ অরুণবাবু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটি পুরোনো ক্যামেরা।

নন্দিতা অবাক হয়ে তাকাল।

“তোমার ক্যামেরা ছিল?”

“ছিল। তোর দাদুর কাছ থেকে লুকিয়ে ছবি তুলতাম। একবার একটা স্থানীয় পত্রিকায় আমার তোলা ছবি ছাপাও হয়েছিল।”

“তাহলে তুমি আমাকে কখনো বলোনি কেন?”

অরুণবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছিল। তারপর ছবি তোলাটা বন্ধ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম, আমার যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অন্তত তুই নিরাপদ একটা জীবন পাবি। তাই তোকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার সাহস পাইনি।”

নন্দিতা বাবার পাশে বসে পড়ল।

“নিরাপদ জীবন চাই, বাবা। কিন্তু নিজের পছন্দের কাজটাও করতে চাই। দুটো কি একসঙ্গে সম্ভব নয়?”

অরুণবাবু মেয়ের দিকে তাকালেন।

“হয়তো সম্ভব। আমি শুধু নিজের ভয়টাকে তোর ভবিষ্যৎ ভেবে বসেছিলাম।”

সেদিন তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ কথা হলো। কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব পরিকল্পনা তৈরি হলো। নন্দিতা নিজের কাজ চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন দোকানে এসে বাবাকে সাহায্য করবে। অরুণবাবুও দোকানের পুরোনো হিসাব ও কাজকর্ম তাকে শেখাবেন।

কয়েক মাস পর ‘দৃষ্টিপথ’ দোকানে একটি নতুন ব্যবস্থা চালু হলো। দোকানের এক পাশে ছোট্ট একটি কোণ তৈরি করা হলো, যেখানে মানুষ তাঁদের পুরোনো চশমা মেরামত করাতে পারবেন এবং প্রয়োজনে কম খরচে চোখ পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থার খোঁজ পাবেন। নন্দিতা দোকানের কাজের ছবি তুলে স্থানীয় মানুষদের কাছে সেই পরিষেবার খবর পৌঁছে দিতে লাগল।

একদিন এক দরিদ্র বৃদ্ধ এলেন। তাঁর চশমার একটি ডাঁটি ভেঙে গিয়েছিল। নতুন চশমা কেনার সামর্থ্য তাঁর ছিল না।

অরুণবাবু চশমাটি হাতে নিয়ে বললেন, “দেখি, মেরামত করা যায় কি না।”

বৃদ্ধটি উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কত টাকা লাগবে?”

অরুণবাবু হেসে বললেন, “আগে দেখি আপনার পৃথিবীটাকে আবার পরিষ্কার করা যায় কি না। টাকার কথা পরে হবে।”

নন্দিতা পাশ থেকে বাবার ছবি তুলল।

ছবিটি তোলার পর সে কাচের জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বিকেলের আকাশ। সূর্যের আলো দোকানের কাচে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

তার মনে হলো, এত দিন সে ভেবেছিল, বাবার দোকান তার স্বপ্নের পথে একটি বাধা। অথচ সেই দোকানের জানালা দিয়েই সে জীবনের নতুন অর্থ দেখতে শিখেছে।

চশমার কাচ মানুষের দৃষ্টিকে স্পষ্ট করে। কিন্তু মনের জানালায় জমে থাকা ভয়, অভিমান আর ভুল ধারণাগুলো সরাতে হলে দরকার বোঝাপড়া।

সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে অরুণবাবু মেয়েকে বললেন, “তোর ক্যামেরায় আমার একটা ছবি তুলবি?”

নন্দিতা হেসে ক্যামেরা তুলল।

“কেমন ছবি চাই, বাবা?”

অরুণবাবু কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “এমন ছবি, যেখানে আমাকে শুধু একজন চশমার দোকানদার বলে মনে হবে না।”

“তাহলে কেমন?”

“একজন মানুষ, যে অনেক দেরিতে হলেও নিজের মেয়ের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে।”

ক্যামেরার পর্দায় অরুণবাবুর মুখ ফুটে উঠল। চোখে চশমা, ঠোঁটে মৃদু হাসি, আর জানালার ওপারে বিস্তৃত আকাশ।

নন্দিতা ছবিটির নাম দিল—‘দৃষ্টির বাইরে’।

কারণ সে জানত, পৃথিবীকে স্পষ্ট করে দেখতে শুধু চোখের কাচ পরিষ্কার করলেই হয় না। কখনো কখনো নিজের মনের কাচটাও পরিষ্কার করতে হয়।

গল্পের শিক্ষা

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু নিজের ভয়কে সন্তানের স্বপ্নের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রজন্মের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে; আন্তরিক কথোপকথন ও পারস্পরিক সম্মান সেই দূরত্ব কমাতে পারে। আর জীবনের কোনো স্বপ্ন দেরিতে পূরণ হলেও তার সৌন্দর্য একেবারে হারিয়ে যায় না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

নীল খামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাতটি স্বপ্ন।

১. পুরোনো আলমারির গোপন রহস্য

দক্ষিণবঙ্গের একটি ছোট্ট শহরে থাকত অন্বেষা। সে একাদশ শ্রেণিতে পড়ত। বই পড়তে, পুরোনো জিনিস ঘাঁটতে আর অজানা গল্প খুঁজে বের করতে তার ভীষণ ভালো লাগত। অন্যরা যখন অবসর সময়ে মোবাইলে ব্যস্ত থাকত, অন্বেষা তখন কখনও পুরোনো বইয়ের দোকানে, কখনও বাড়ির ছাদের ঘরে সময় কাটাত।

একদিন বাড়িতে রং করার কাজ চলছিল। ঘরের জিনিসপত্র সরাতে গিয়ে অন্বেষা ঠাকুমার পুরোনো কাঠের আলমারির পেছনে একটি ছোট বাক্স খুঁজে পেল। বাক্সটির ওপর ধুলোর পুরু আস্তরণ। ঢাকনা খুলতেই দেখা গেল, তার ভেতরে কয়েকটি পুরোনো ছবি, একটি কালো হয়ে যাওয়া কলম এবং সাতটি নীল খাম।

প্রতিটি খামের ওপর আলাদা করে একটি করে নাম লেখা ছিল। সঙ্গে ছিল একটি করে তারিখ।

খামগুলো বেশ পুরোনো। কাগজের রং হলদেটে হয়ে গিয়েছে, কিন্তু লেখাগুলো এখনও স্পষ্ট।

প্রথম খামের ওপর লেখা—‘সুধা, ১৯৮৭’।

দ্বিতীয়টিতে—‘মালতী, ১৯৮৮’।

এভাবে সাতটি খামে সাতটি নাম।

অন্বেষা ভাবল, এগুলো নিশ্চয়ই ঠাকুমার পুরোনো চিঠি। কিন্তু ঠাকুমার নাম তো সরলা দেবী। এই সাতজন কে?

সে বাক্সটি নিয়ে ঠাকুমার কাছে গেল।

“ঠাকুমা, এগুলো কার চিঠি?”

সরলা দেবী চশমাটা চোখে তুলে খামগুলোর দিকে তাকালেন। তাঁর মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। অনেকক্ষণ পরে তিনি বললেন, “এগুলো চিঠি নয় শুধু, দিদিভাই। এগুলো সাতটি অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।”

অন্বেষার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

“কীসের স্বপ্ন?”

ঠাকুমা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “অনেক বছর আগের কথা। তখন আমাদের গ্রামে মেয়েদের পড়াশোনা করা সহজ ছিল না। এই খামগুলোর প্রত্যেকটি মেয়ের জীবনে এমন কিছু ঘটেছিল, যা তাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারত।”

২. প্রথম নীল খাম

ঠাকুমা প্রথম খামটি হাতে নিলেন।

“সুধা ছিল আমার সহপাঠী। অঙ্কে অসাধারণ ভালো ছিল। শিক্ষকরা বলতেন, সুযোগ পেলে সে অনেক দূর যেতে পারবে। কিন্তু মাধ্যমিকের পর তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।”

অন্বেষা অবাক হয়ে বলল, “তাহলে সে পড়াশোনা করতে পারেনি?”

“প্রথমে পারেনি। কিন্তু সে পড়া ছাড়তে চায়নি। একদিন আমাকে একটি চিঠি লিখেছিল। তাতে বলেছিল, সংসারের কাজের ফাঁকে সে বই পড়ে, আর সুযোগ পেলেই ছোটদের অঙ্ক শেখায়।”

চিঠিটি খুলে অন্বেষা পড়ল।

সুধা লিখেছিল, সে চায় গ্রামের মেয়েদের জন্য একটি ছোট পড়ার ঘর তৈরি করতে। সেখানে মেয়েরা স্কুলের বই পড়বে, অঙ্ক শিখবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবে। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল তার।

কিন্তু চিঠির শেষে লেখা ছিল—‘আমি জানি না, আমার স্বপ্ন কোনো দিন পূর্ণ হবে কি না। তবু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করিনি।’

অন্বেষা চুপ করে গেল।

“ঠাকুমা, সুধা কি পরে পড়াশোনা করতে পেরেছিল?”

সরলা দেবী মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি না। বিয়ের পরে সে অন্য শহরে চলে গিয়েছিল। আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।”

অন্বেষার মনে প্রশ্ন জাগল—একটি মানুষ এত বড় স্বপ্ন দেখেছিল, অথচ তার গল্প কোথাও লেখা নেই কেন?

৩. সাতটি নাম, সাতটি জীবন

সেদিন রাতে অন্বেষা সাতটি খাম একে একে পড়ল। প্রতিটি চিঠিতে ছিল আলাদা একটি স্বপ্ন।

মালতী হতে চেয়েছিল নার্স। অসুস্থ মানুষের সেবা করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসুবিধায় প্রশিক্ষণে ভর্তি হতে পারেনি।

রেণু ছবি আঁকতে ভালোবাসত। সে চেয়েছিল নিজের আঁকা ছবি দিয়ে একটি প্রদর্শনী করতে। অথচ তার পরিবারের ধারণা ছিল, ছবি আঁকা দিয়ে জীবনে কিছু করা যায় না।

কমলা গ্রামের শিশুদের পড়াতে চাইত। কিন্তু নিজের পড়াশোনাই মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে অন্যদের শেখানোর সুযোগ পায়নি।

ফরিদা সেলাইয়ের কাজ জানত। সে চেয়েছিল কয়েকজন মহিলাকে একসঙ্গে নিয়ে একটি ছোট কর্মদল তৈরি করতে, যাতে তাঁরা নিজেদের উপার্জন করতে পারেন।

লাবণ্য গান লিখত। তার ইচ্ছা ছিল নিজের লেখা গান একদিন মঞ্চে শোনাবে। কিন্তু লোকে কী বলবে, সেই ভয়ে সে কাউকে নিজের লেখা দেখাত না।

আর শেষ খামটি ছিল বিনোদিনীর। সে চেয়েছিল গ্রামের মেয়েরা যেন নিজেদের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারে। তার চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমরা অনেক সময় নিজেদের কথা বলার আগেই ভাবি, আমাদের কথা কেউ শুনবে না। যদি একদিন এমন একটা জায়গা হয়, যেখানে সবাই মন দিয়ে শুনবে, তাহলে কত ভালো হতো।’

সাতটি চিঠি পড়ে অন্বেষার মনে হলো, এগুলো শুধু অতীতের গল্প নয়। তার আশপাশেও হয়তো এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের স্বপ্ন কোনো না কোনো কারণে থেমে গিয়েছে।

পরদিন সকালে সে ঠাকুমাকে বলল, “আমি এই সাতজনের খোঁজ করতে চাই।”

সরলা দেবী অবাক হলেন।

“এত বছর পরে তাদের খুঁজে পাবি?”

“জানি না। কিন্তু চেষ্টা না করলে জানব কী করে?”

ঠাকুমা মৃদু হাসলেন।

“চেষ্টা কর। তবে মনে রাখিস, কারও জীবনের গল্প জানতে হলে তার সম্মতি আর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সম্মান রাখতে হবে।”

৪. খোঁজ শুরু

অন্বেষা প্রথমে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। সে কাউকে চিঠি পড়ে শোনানোর আগে অনুমতি নিত। কেউ নাম শুনে পুরোনো ঘটনা মনে করতে পারতেন, কেউ আবার কিছুই জানতেন না।

একজন বৃদ্ধা জানালেন, সুধার বিয়ে হয়েছিল পাশের জেলার একটি শহরে। তবে পরিবারের বর্তমান ঠিকানা তাঁর জানা নেই।

আরেকজন বললেন, মালতী পরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করতেন বলে শুনেছেন। কিন্তু তিনি এখন কোথায় থাকেন, তা নিশ্চিত নন।

অন্বেষা একটি খাতায় তথ্য লিখে রাখত। কোনো অনুমানকে সত্যি বলে লিখত না। যে তথ্য নিশ্চিত নয়, তার পাশে প্রশ্নচিহ্ন দিত।

তার স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা এই উদ্যোগের কথা শুনে সাহায্য করলেন। তিনি বললেন, “তুমি চাইলে এই কাজটিকে স্থানীয় ইতিহাসের একটি ছোট প্রকল্প হিসেবে সাজাতে পারো। তবে জীবিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের আগে অবশ্যই তাঁদের অনুমতি নেবে।”

অন্বেষা একটি পরিকল্পনা তৈরি করল। সে শুধু সাতজনকে খুঁজবে না; তাঁদের জীবনে কী ঘটেছিল, তাঁরা পরে নিজেদের ইচ্ছেমতো কোনো কাজ করতে পেরেছিলেন কি না, তা জানতে চাইবে।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। প্রথম দিকে তেমন কোনো সাফল্য এল না।

বন্ধুদের কেউ কেউ বলল, “এত পুরোনো চিঠি নিয়ে পড়ে আছিস কেন? এতে তোর কী লাভ হবে?”

অন্বেষা উত্তর দিল, “সব কাজের লাভ টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কখনও কখনও একটা গল্প খুঁজে পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।”

৫. অপ্রত্যাশিত একটি ফোন

একদিন স্কুলের শিক্ষিকা অন্বেষাকে জানালেন, গ্রামের এক প্রবীণ শিক্ষক সুধার পরিবারের একটি পুরোনো যোগাযোগের সূত্র জানেন। সেই সূত্র ধরে সুধার নাতনির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো।

অন্বেষা প্রথমে নিজের পরিচয় দিল। তারপর জানাল, তার কাছে সুধা নামের একজনের বহু বছরের পুরোনো চিঠি রয়েছে।

ফোনের অন্য প্রান্তে কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল।

তারপর তরুণী বললেন, “আমার ঠাকুমার নাম সুধা। তিনি ছোটবেলায় অঙ্ক পড়াতে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু আপনার কাছে যে চিঠি আছে, সেটা কীভাবে পেলেন?”

অন্বেষা পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করল। সে চিঠির ছবি পাঠানোর আগে অনুমতি চাইল। সুধার নাতনি সম্মতি দিলেন।

কয়েক দিন পরে তিনি আবার ফোন করলেন।

“ঠাকুমা চিঠিটা দেখে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। তিনি বলছেন, এত বছর পর নিজের সেই লেখাগুলো আবার দেখবেন, ভাবেননি।”

অন্বেষার হৃদয় আনন্দে ভরে গেল।

সুধার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগও হলো। বয়সের ভারে তাঁর কণ্ঠ দুর্বল, কিন্তু স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো।

তিনি বললেন, “আমি সত্যিই পড়ার ঘর করতে চেয়েছিলাম। নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। তবে পরে ছেলেমেয়েদের অঙ্ক শেখাতাম। সংসারের কাজের ফাঁকে আশপাশের কয়েকটি মেয়েকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছি।”

অন্বেষা জিজ্ঞাসা করল, “আপনার স্বপ্ন কি তাহলে কিছুটা পূরণ হয়েছিল?”

সুধা হেসে বললেন, “হ্যাঁ, পুরোটা হয়তো হয়নি। কিন্তু আমি যতটা পেরেছি, করেছি। তখন বুঝিনি, সেই ছোট্ট কাজটাও একদিন কারও মনে থাকতে পারে।”

অন্বেষা অনুভব করল, এত দিন সে ভেবেছিল স্বপ্ন হয় পূর্ণ হয়, নয়তো ব্যর্থ হয়। কিন্তু জীবনের সত্যিটা তার চেয়ে অনেক বড়।

কখনও স্বপ্ন অন্য রূপে পূরণ হয়। কখনও তার সামান্য অংশও অন্য কারও জীবনে আলো হয়ে ওঠে।

৬. আরও কিছু দরজা খুলল

সুধার পরিবারের মাধ্যমে অন্বেষা আরও কয়েকটি সূত্র পেল। মালতীর মেয়ে জানালেন, তাঁর মা নার্সিং প্রশিক্ষণ নিতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

রেণুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেল, তিনি পেশাদার শিল্পী হননি। কিন্তু সারা জীবন ছবি আঁকতেন। তাঁর বাড়ির দেওয়ালে এখনও নিজের হাতে আঁকা অনেক ছবি রয়েছে।

কমলা বহু বছর ধরে বাড়ির আশপাশের শিশুদের পড়াতেন। কেউ স্কুলের পড়ায় পিছিয়ে পড়লে তাঁকে ডেকে নেওয়া হতো।

ফরিদা সেলাইয়ের কাজ করে নিজের পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন। পরে তিনি আশপাশের কয়েকজন মহিলাকেও কাজ শিখিয়েছিলেন।

লাবণ্যের লেখা গানগুলোর কিছু খাতা তাঁর পরিবারের কাছে সংরক্ষিত ছিল। তবে সেগুলো প্রকাশ করার ইচ্ছা তাঁর পরিবারের ছিল না। অন্বেষা তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করল। গানগুলো কারও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করল না।

বিনোদিনীর সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া গেল। তাঁর চিঠিতে যে স্বপ্নের কথা লেখা ছিল, সেটুকুই অন্বেষার কাছে রয়ে গেল।

অন্বেষা বুঝল, সব গল্পের শেষ খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। তবু সেই অজানার প্রতি সম্মান রাখাও জরুরি।

৭. স্বপ্নের প্রদর্শনী

অন্বেষা সিদ্ধান্ত নিল, সাতটি চিঠির গল্প নিয়ে স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করবে। তবে চিঠিগুলোর আসল কপি কাউকে দেখানো হবে না। যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তাঁদের সম্মতিতে নির্বাচিত অংশ ব্যবহার করা হবে। যাঁরা অনুমতি দেননি বা যাঁদের খোঁজ পাওয়া যায়নি, তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হবে না।

প্রদর্শনীর নাম রাখা হলো—‘অসমাপ্ত নয়, অন্য পথে চলা স্বপ্ন’।

প্রতিটি অংশে থাকবে একটি স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের পথে বাধা এবং মানুষটি জীবনে যে কাজগুলো করতে পেরেছেন তার বিবরণ। কোনো ব্যক্তির জীবনকে ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখানো হবে না।

প্রদর্শনীর দিন স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা উপস্থিত হলেন। সরলা দেবীও এলেন।

প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর অন্বেষার হাত ধরে বললেন, “তুই শুধু পুরোনো চিঠিগুলো খুঁজে বের করিসনি। তুই আমাদের সময়ের মানুষদেরও নতুন করে চিনতে শিখেছিস।”

একজন ছাত্রী প্রদর্শনী দেখে বলল, “আমি বড় হয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চাই। কিন্তু বাড়িতে সবাই বলে, আমার পক্ষে হবে না। এই গল্পগুলো পড়ে মনে হচ্ছে, চেষ্টা করার অধিকারটা অন্তত আমার আছে।”

অন্বেষা তার কথা শুনে বলল, “নিজের স্বপ্নের জন্য চেষ্টা করবি। তবে বাধা এলে সাহায্য চাইতেও দ্বিধা করবি না। সবকিছু একা সামলাতে হবে, এমন নয়।”

অনুষ্ঠানের শেষে একটি বোর্ড রাখা হয়েছিল। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা লিখতে পারত—তাদের নিজের স্বপ্ন কী।

কেউ লিখল চিকিৎসক হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ কৃষিবিজ্ঞানী, কেউ আবার ছোট ব্যবসা শুরু করতে চায়। একজন লিখল, ‘আমি চাই, বড় হয়ে এমন একজন মানুষ হব, যার কাছে অন্যরা নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে।’

অন্বেষা শেষ বাক্যটি পড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

৮. অষ্টম খাম

প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরে অন্বেষা বাক্সটি আবার গুছিয়ে রাখছিল। তখন ঠাকুমা বললেন, “দাঁড়া, তোকে আর একটা জিনিস দেখাই।”

তিনি আলমারির ভেতর থেকে একটি সাদা খাম বের করলেন। তাতে কোনো নাম লেখা ছিল না।

“এটা কী?” অন্বেষা জিজ্ঞাসা করল।

ঠাকুমা মৃদু হেসে বললেন, “এটা আমার নিজের চিঠি। অনেক বছর আগে লিখেছিলাম। কাউকে পাঠাইনি।”

অন্বেষা অবাক হয়ে গেল।

সরলা দেবী বললেন, “আমিও একসময় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ায় আর পারিনি। সেই সময় নিজের মনের কথা লিখে রেখেছিলাম। পরে জীবন অন্য পথে এগিয়েছে। তোর দাদুর সঙ্গে সংসার করেছি, সন্তানদের বড় করেছি, নিজের মতো করে সুখও পেয়েছি। কিন্তু সেই পুরোনো ইচ্ছেটা কোথাও রয়ে গিয়েছিল।”

অন্বেষা খামটি খুলতে চাইল না। সে ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি চাও আমি এটা পড়ি?”

সরলা দেবী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “এখন নয়। হয়তো কোনো দিন তোকে নিজেই পড়ে শোনাব। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমার কথাগুলোও একদিন বলা দরকার।”

অন্বেষা ঠাকুমার হাত ধরল।

“তুমি চাইলে এখনও নতুন কিছু শিখতে পারো। আমি তোমাকে সাহায্য করব।”

সরলা দেবী হেসে বললেন, “তাহলে হয়তো আমার স্বপ্নেরও একটা নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।”

সেদিন রাতে অন্বেষা নিজের ডায়েরিতে লিখল—

‘সব স্বপ্নের পূরণ একরকম হয় না। কেউ নিজের স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছায়, কেউ মাঝপথে নতুন পথ খুঁজে পায়, কেউ আবার অন্যের জীবনে স্বপ্নের বীজ বুনে যায়। তাই কোনো মানুষের গল্পকে শুধু সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না।’

বাক্সটি আবার আলমারিতে রাখা হলো। সাতটি নীল খাম আর একটি সাদা খাম—সবই রয়ে গেল যত্নে।

কিন্তু অন্বেষার কাছে সেগুলো আর শুধু পুরোনো কাগজ ছিল না। সেগুলো ছিল সময়ের ওপার থেকে আসা সাতটি জীবনের ডাক, যা তাকে শিখিয়েছিল—মানুষের স্বপ্নের মূল্য শুধু তার পূর্ণতায় নয়, সেই স্বপ্নের জন্য বেঁচে থাকা প্রতিটি চেষ্টাতেও।

শিক্ষা: জীবনের সব স্বপ্ন ঠিক যেভাবে কল্পনা করা হয়, সেভাবে পূরণ হয় না। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালেও নতুন পথ খুঁজে নেওয়া যায়। অন্যের স্বপ্নকে সম্মান করা, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের মর্যাদা রক্ষা করা—এসবও মানুষের বড় দায়িত্ব।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

যে ছেলেটি পরাজয়ের ভেতর থেকে জয়ের নতুন মানে খুঁজে পেয়েছিল।

১. স্বপ্নের প্রথম দৌড়

পশ্চিম মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রামে থাকত সুমন নামে এক কিশোর। ছোটবেলা থেকেই দৌড়ের প্রতি তার অদ্ভুত টান ছিল। গ্রামের মেঠো পথ, ধানখেতের আল, স্কুলের মাঠ—সবই ছিল তার অনুশীলনের জায়গা।

সকালে অন্যরা যখন ঘুম থেকে উঠত, সুমন তখন বাড়ির পেছনের পথ ধরে দৌড়াতে বেরিয়ে পড়ত। কখনও খালি পায়ে, কখনও পুরোনো জুতো পরে। তার স্বপ্ন ছিল একদিন বড় ক্রীড়াবিদ হওয়ার।

কিন্তু সুমনের পরিবারের অবস্থা খুব ভালো ছিল না। বাবা ছোট একটি দোকান চালাতেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। নতুন জুতো কেনা কিংবা নিয়মিত প্রশিক্ষণের খরচ বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন ছিল।

তবু সুমন থামেনি।

স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক প্রশান্তবাবু তার দৌড় দেখে একদিন বলেছিলেন, “তোমার গতি ভালো। কিন্তু শুধু দ্রুত দৌড়ালেই হবে না। শরীরের যত্ন, নিয়মিত অনুশীলন, বিশ্রাম আর সঠিক কৌশল—সবকিছুর প্রয়োজন।”

সুমন মন দিয়ে কথাগুলো শুনেছিল।

সেই বছর জেলাস্তরের দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ এল। স্কুল থেকে নির্বাচিত কয়েকজন ছাত্রের মধ্যে সুমনের নামও ছিল।

খবরটি শুনে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।

বাড়ি ফিরে মাকে বলল, “মা, এবার যদি ভালো করতে পারি, তাহলে হয়তো আরও বড় প্রতিযোগিতায় যাওয়ার সুযোগ পাব।”

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “ভালো করবি, এই আশা রাখি। তবে মনে রাখিস, ফল যা-ই হোক, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবি।”

সুমন তখন মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল, সে জিতবেই।

২. যে দিন সবকিছু বদলে গেল

প্রতিযোগিতার দিন ভোরে সুমন স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে রওনা দিল। তার পরনে ছিল সাধারণ ক্রীড়ার পোশাক। জুতোর তলা কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও সে যত্ন করে সেগুলো পরিষ্কার করে নিয়েছিল।

প্রতিযোগিতার মাঠে পৌঁছে সে দেখল, অন্য অনেক প্রতিযোগীর পোশাক ও সরঞ্জাম তার চেয়ে ভালো। কেউ নিয়মিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুশীলন করে, কেউ অভিজ্ঞ কোচের কাছে দৌড় শেখে।

সুমনের বুকের ভেতর একটু ভয় ঢুকে পড়ল।

প্রশান্তবাবু তাকে বললেন, “অন্যদের দিকে তাকিয়ে নিজের শক্তি ভুলে যেয়ো না। নিজের দৌড়ে মন দাও।”

প্রথম দৌড়ে সুমন ভালো করল। সে পরবর্তী পর্যায়ে উঠে গেল। তার আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, জয় যেন হাতের নাগালে।

কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার আগে হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেল। মাঠের ওপর হালকা বৃষ্টি পড়ল। দৌড় শুরুর আগে সুমন উত্তেজনায় ঠিকমতো নিজেকে শান্ত করতে পারল না।

বাঁশি বাজতেই সে জোরে ছুটল। প্রথম কয়েক মুহূর্তে এগিয়েও গেল। কিন্তু মাঝপথে তার গতি কমে এল। অন্য প্রতিযোগীরা একে একে তাকে পেরিয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত সুমন চতুর্থ হলো।

একটি পদকও পেল না।

ফল ঘোষণার পর অন্যরা যখন আনন্দে ছবি তুলছিল, সুমন তখন মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত দিনের অনুশীলন, ভোরবেলার দৌড়, কষ্ট করে প্রস্তুতি—সবকিছু যেন বৃথা হয়ে গেল।

প্রশান্তবাবু কাছে এসে বললেন, “আজ তুমি জিততে পারোনি। কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ মানেই তোমার পথ শেষ নয়।”

সুমন কোনো উত্তর দিল না।

তার চোখে তখন শুধু ব্যর্থতার ছবি।

৩. বাড়ি ফেরার নীরবতা

বাড়ি ফিরে সুমন জুতোর জোড়া এক কোণে ছুড়ে রেখে দিল। পরদিন সকালে সে আর দৌড়াতে বেরোল না।

মা বুঝতে পারলেন, ছেলের মন ভেঙে গেছে। কিন্তু তিনি সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দিতে গেলেন না। শুধু খাবার এগিয়ে দিয়ে পাশে বসে রইলেন।

কিছুক্ষণ পরে সুমন নিজেই বলল, “মা, আমি পারলাম না। সবাই আমার চেয়ে ভালো। আমার দিয়ে কিছু হবে না।”

মা শান্ত গলায় বললেন, “তুই কি শুধু পদক পাওয়ার জন্য দৌড়াতে শুরু করেছিলি?”

সুমন চুপ করে রইল।

“মনে করে দেখ, প্রথম যেদিন মাঠে দৌড়ে এসে বলেছিলি, বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে তোর ভালো লাগে—সেদিন কি কোনো পদক ছিল?”

সুমনের সেই দিনের কথা মনে পড়ল। তখন সে শুধু দৌড়াতে ভালোবাসত। নিজের গতি বাড়ানোর আনন্দই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বড়।

মা বললেন, “জেতার স্বপ্ন দেখবি। কিন্তু একটা প্রতিযোগিতার ফল দিয়ে নিজের সব ক্ষমতার বিচার করবি না।”

কথাগুলো সুমনের ভালো লাগলেও তার কষ্ট পুরোপুরি কমল না।

পরবর্তী কয়েক দিন সে মাঠে গেল না। বন্ধুরা ডাকতে এলেও নানা অজুহাত দেখাল।

তার মনে হতে লাগল, আবার দৌড়াতে গেলে যদি আবার হেরে যায়?

এক সন্ধ্যায় সে পুরোনো জুতোর দিকে তাকিয়ে রইল। জুতোর ক্ষয়ে যাওয়া তলায় যেন তার সমস্ত পরিশ্রম জমে ছিল।

অবশেষে সে জুতো তুলে পরিষ্কার করল। কিন্তু পরদিন মাঠে যাওয়ার সাহস তখনও হলো না।

৪. এক অচেনা মানুষের শিক্ষা

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সুমন দেখল, গ্রামের মাঠের পাশে এক বৃদ্ধ মানুষ ছোট কয়েকটি ছেলেমেয়েকে শরীরচর্চা শেখাচ্ছেন। বৃদ্ধের নাম নিত্যানন্দবাবু। তিনি একসময় জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর গ্রামের শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে ব্যায়াম শেখাতেন।

সুমন আগে তাঁকে দেখেছে, কিন্তু কখনও কথা বলেনি।

সেদিন নিত্যানন্দবাবু তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাকলেন।

“তুমি কি দৌড়াও?”

সুমন মাথা নাড়ল।

“কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছ?”

“নিয়েছিলাম। চতুর্থ হয়েছি।”

বৃদ্ধ হাসলেন। “চতুর্থ হওয়া কি খুব খারাপ?”

সুমন বিরক্ত হয়ে বলল, “জিততে না পারলে ভালো কী?”

নিত্যানন্দবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি জানো, দৌড়ের সময় তোমার শরীর কীভাবে কাজ করে? কতটা শক্তি শুরুতে খরচ করা উচিত? শ্বাসের ছন্দ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়?”

সুমন মাথা নাড়ল।

“তাহলে তুমি শুধু দৌড়ে হারোনি। তুমি এমন কিছু বিষয়ও জানতে পেরেছ, যেগুলো শেখা বাকি।”

বৃদ্ধ তাকে পরদিন সকালে মাঠে আসতে বললেন।

সুমন প্রথমে দ্বিধা করলেও পরদিন চলে এল।

নিত্যানন্দবাবু তাকে কোনো কঠিন প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু করলেন না। প্রথমে তার দৌড়ের ভঙ্গি দেখলেন, তারপর ওয়ার্ম-আপ, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার গুরুত্ব বোঝালেন।

তিনি বললেন, “প্রতিযোগিতায় শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই হয় না। নিজের ভুল অভ্যাসের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়।”

সুমন প্রথমবার বুঝতে পারল, শুধু ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়। সঠিক পদ্ধতিতে শেখারও প্রয়োজন আছে।

৫. পরিশ্রমের নতুন অধ্যায়

পরবর্তী কয়েক মাস সুমনের জীবন বদলে গেল।

সে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অনুশীলন করতে লাগল। কোনো দিন দৌড়, কোনো দিন হালকা ব্যায়াম, কোনো দিন বিশ্রাম। নিত্যানন্দবাবু তাকে বুঝিয়ে দিলেন, শরীর ব্যথা করলে জোর করে অনুশীলন করা উচিত নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং বিশ্রামও প্রশিক্ষণের অংশ।

সুমন একটি খাতায় নিজের অনুশীলনের হিসাব রাখতে শুরু করল।

কতক্ষণ দৌড়াল, কোন জায়গায় গতি কমল, কখন শ্বাস নিতে অসুবিধা হলো—সব লিখে রাখত। প্রতি সপ্তাহে আগের নোটের সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখত।

প্রথম দিকে উন্নতি খুব ধীর ছিল। কখনও মনে হতো, এত পরিশ্রম করেও তেমন কিছু হচ্ছে না।

কিন্তু এবার সে প্রতিদিন শুধু জয়ের কথা ভাবত না। নিজের আগের দিনের চেয়ে সামান্য ভালো করার লক্ষ্য রাখত।

একদিন নিত্যানন্দবাবু বললেন, “তোমার লক্ষ্য শুধু দ্রুত দৌড়ানো নয়। নিজের শরীরকে বোঝা, ভুল থেকে শেখা আর ধারাবাহিক থাকা—এই তিনটিও তোমার কাজ।”

সুমন স্কুলের পড়াশোনার সময়ও ঠিক করে নিল। সে বুঝেছিল, খেলাধুলার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অন্য দায়িত্ব অবহেলা করলে চলবে না।

মাঝে মাঝে বন্ধুরা মাঠে এসে তার অনুশীলন দেখত। কেউ উৎসাহ দিত, কেউ মজা করে বলত, “এবার কিন্তু পদক চাই!”

সুমন হাসত।

“পদক চাই। তবে এবার আমি জানি, শুধু পদকের জন্য অনুশীলন করছি না।”

৬. দ্বিতীয় প্রতিযোগিতা

পরের বছর আবার জেলাস্তরের দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন হলো। সুমন এবারও স্কুল থেকে নির্বাচিত হলো।

প্রতিযোগিতার দিন মাঠে দাঁড়িয়ে তার আগের বছরের কথা মনে পড়ছিল। সেই হতাশা, সেই কান্না, সেই জুতো ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মুহূর্ত—সব মনে পড়ল।

তবে এবার সে নিজের মধ্যে একটি পরিবর্তন অনুভব করল।

সে জানত, প্রতিযোগিতায় অনেক ভালো দৌড়বিদ এসেছে। কেউ তাকে হারাতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনায় সে আর ভেঙে পড়ছিল না।

দৌড় শুরুর আগে সে নিজের প্রস্তুতির ওপর মন দিল।

বাঁশি বাজল।

সুমন ছুটতে শুরু করল। এবার সে শুরুতেই সব শক্তি খরচ করল না। নিজের গতি ধরে রাখল, শ্বাসের ছন্দে মন দিল এবং শেষ পর্যায়ে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করল।

শেষ কয়েক মিটার ছিল ভীষণ কঠিন। পা ভারী হয়ে আসছিল। দর্শকদের চিৎকার কানে ভেসে আসছিল।

সে শেষ পর্যন্ত দৌড় শেষ করল।

ফল ঘোষণার সময় সুমন দেখল, সে দ্বিতীয় হয়েছে।

এক মুহূর্তের জন্য তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।

তারপর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে পদক পেয়েছে!

কিন্তু সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল অন্য জায়গায়। সে নিজের সময়ও আগের বছরের তুলনায় উন্নত করেছে।

নিত্যানন্দবাবু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আজ তুমি শুধু দ্বিতীয় হওনি। তুমি শিখেছ কীভাবে নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করতে হয়।”

সুমন পদকটি হাতে নিয়ে বলল, “স্যার, গত বছর চতুর্থ হয়ে আমি ভেবেছিলাম, সব শেষ। আজ বুঝছি, ওই পরাজয়টাই আমাকে নতুন করে শিখতে বাধ্য করেছিল।”

৭. জয়ের অন্য মানে

সুমন পরবর্তীকালে আরও প্রতিযোগিতায় অংশ নিল। কোনো দিন জিতল, কোনো দিন হারল। সব সময় পদক এল না। কখনও অসুস্থতার কারণে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে হলো, কখনও অন্যদের কাছে হেরে গেল।

কিন্তু এবার সে আর একটি ফলাফলকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলত না।

একদিন গ্রামের কয়েকজন ছোট ছেলে তার কাছে এসে বলল, “দাদা, আমরা দৌড় শিখতে চাই। কিন্তু আমরা যদি হেরে যাই?”

সুমন তাদের মাঠে নিয়ে গেল।

সে বলল, “হারার ভয় থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ভয়ে চেষ্টা বন্ধ করে দিলে শেখার সুযোগটাই হারিয়ে যাবে। তোমরা আগে নিয়মিত অনুশীলন করো। শরীরের যত্ন নাও, অন্যদের সম্মান করো, আর নিজের উন্নতি লক্ষ্য করো।”

একটি ছেলে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কি সব সময় জিততে চাও না?”

সুমন হেসে বলল, “অবশ্যই চাই। কিন্তু এখন জানি, জেতা মানে শুধু অন্যকে পেছনে ফেলা নয়। নিজের ভুল বুঝে তাকে শুধরে নেওয়া, হতাশার পর আবার শুরু করা, আর আগের চেয়ে ভালো হওয়ার চেষ্টা করাও এক ধরনের জয়।”

বিকেলের আলো তখন মাঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ছেলেগুলো দৌড়াতে শুরু করল। সুমন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিতে লাগল।

তার হাতে তখনও সেই পুরোনো জুতোর জোড়া ছিল। নতুন জুতো কেনার সামর্থ্য হয়েছে তার, তবু পুরোনো জুতো দুটো সে ফেলে দেয়নি।

কারণ ওই জুতোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—পরাজয় কখনও কখনও পথ বন্ধ করে না; বরং ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক পথে হাঁটতে শেখায়।

সুমন সেদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “ধন্যবাদ সেই প্রথম পরাজয়কে। তুমি আমাকে শিখিয়েছিলে, থেমে যাওয়া আর হেরে যাওয়া এক কথা নয়।”

শিক্ষা: জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে। একটি পরাজয় দিয়ে নিজের যোগ্যতা বিচার করা উচিত নয়। ভুল বিশ্লেষণ করে, সঠিক পরামর্শ নিয়ে এবং নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে গেলে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে। প্রকৃত জয় হলো—পড়ে যাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানো।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রীর জন্য যে মেয়েটি অপেক্ষা করেছিল।

১. স্টেশনের শেষ বেঞ্চ

ছোট্ট শহর শালবনীর প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো রেলস্টেশন। স্টেশনটির নাম ছিল শালবনী রোড। দিনে কয়েকটি লোকাল ট্রেন সেখানে থামত। সকালবেলায় অফিসযাত্রীদের ভিড়, দুপুরে প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম, আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার মানুষের ব্যস্ততা—এই ছিল স্টেশনটির পরিচিত ছবি।

স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটি কাঠের বেঞ্চ ছিল। রং উঠে গিয়েছিল, এক পাশে সামান্য ফাটলও ধরেছিল। তবু বেঞ্চটি ছিল মায়া নামের এক তরুণীর কাছে বিশেষ প্রিয়।

মায়ার বাবা রেলওয়েতে কাজ করতেন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে স্টেশনে আসার অভ্যাস ছিল তার। বাবা ট্রেনের সময়সূচি দেখাতেন, সিগন্যালের অর্থ বোঝাতেন, আর বলতেন, “রেলস্টেশন শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না, মায়া। কত মানুষের গল্প এখানে এসে মিলিত হয়, আবার আলাদা হয়ে যায়।”

বাবা অবসর নেওয়ার পরও মায়া মাঝেমধ্যে স্টেশনে আসত। সে এখন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পড়াত। স্কুল ছুটির পরে কখনও ট্রেন ধরত, কখনও শুধু প্ল্যাটফর্মে বসে মানুষের যাতায়াত দেখত।

একদিন বর্ষার সন্ধ্যায় সে বেঞ্চটির কাছে এক বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখল। তাঁর পরনে ধূসর পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো চামড়ার ব্যাগ। বারবার ঘড়ি দেখছিলেন তিনি।

মায়া কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাউকে খুঁজছেন, কাকু?”

বৃদ্ধ একটু চমকে তাকালেন।

“না মা, একজনের জন্য অপেক্ষা করছি।”

“কোন ট্রেনে আসবেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু দূরের রেললাইনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেদিন শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পরও তিনি কিছুক্ষণ বসে ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে চলে গেলেন।

মায়া ভাবল, হয়তো কোনো আত্মীয়ের আসার কথা ছিল।

কিন্তু পরের দিনও বৃদ্ধকে সেই একই বেঞ্চে দেখা গেল।

২. প্রতিদিনের অপেক্ষা

দিন যেতে লাগল। বৃদ্ধ প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় স্টেশনে আসতেন। কখনও পাঁচটা নাগাদ, কখনও তারও আগে। হাতে সেই চামড়ার ব্যাগ, চোখে একই অপেক্ষা।

মায়া একদিন সাহস করে তাঁর পাশে বসল।

“কাকু, আপনার নামটা জানতে পারি?”

“অমলেন্দু দত্ত। সবাই অমল বলেই ডাকত।”

“আপনি কি এই শহরেই থাকেন?”

“একসময় থাকতাম। এখন মেয়ের বাড়িতে থাকি, অন্য জেলায়।”

“তাহলে প্রতিদিন এখানে আসেন কেন?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“একটা মানুষ আসবে বলে কথা দিয়েছিল।”

মায়া আর প্রশ্ন করল না। সে বুঝতে পারল, বিষয়টি শুধু ট্রেনের সময়সূচির নয়। বৃদ্ধের অপেক্ষার সঙ্গে কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

কয়েক দিন পরে মায়া জানতে পারল, অমলবাবু বহু বছর আগে এই স্টেশনের কাছেই একটি ছোট বইয়ের দোকান চালাতেন। দোকানটি এখন আর নেই। তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছেন অনেক বছর আগে। তাঁদের একমাত্র ছেলে চাকরির জন্য দূরে চলে গিয়েছিল। পরে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগও কমে আসে।

কিন্তু বৃদ্ধের অপেক্ষার কারণ তখনও মায়ার কাছে স্পষ্ট হলো না।

একদিন স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে অমলবাবুর ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম পড়ে গেল। মায়া সেটি তুলে দিতে গিয়ে দেখল, খামের ওপর লেখা একটি নাম—‘অরুণ’।

বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি খামটি নিয়ে নিলেন।

“এটা আমার ছেলের নাম,” তিনি বললেন।

মায়া শান্তভাবে বলল, “আপনি কি ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন?”

অমলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। অনেক বছর আগে সে বলেছিল, একদিন এই স্টেশনে ফিরে আসবে। বলেছিল, বাবাকে নিয়ে আবার সেই পুরোনো বইয়ের দোকানের জায়গাটা দেখতে যাবে।”

“কবে বলেছিল?”

“প্রায় আঠারো বছর আগে।”

মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।

আঠারো বছর ধরে একটি প্রতিশ্রুতির জন্য অপেক্ষা!

৩. যে ভুল বোঝাবুঝি বড় হয়ে উঠেছিল

অমলবাবু ধীরে ধীরে নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন।

অরুণ ছোটবেলায় পড়াশোনায় ভালো ছিল। বইয়ের দোকানে বসে বাবার সঙ্গে গল্প করত। বড় হয়ে সে শহরের বাইরে পড়তে যায়, তারপর চাকরি পায়। অমলবাবু চাইতেন ছেলে কাছাকাছি থাকুক। কিন্তু অরুণের স্বপ্ন ছিল বড় শহরে কাজ করার।

এই নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হতো।

একদিন অরুণ চাকরির কাজে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। অমলবাবু রাগ করে বলেছিলেন, “যেতে চাইলে যাও। নিজের ইচ্ছেমতো জীবন কাটাও। আমার কথা আর ভাবতে হবে না।”

কথাটি রাগের মাথায় বলা হলেও অরুণ গভীরভাবে আঘাত পেয়েছিল।

সে চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, “একদিন ফিরে আসব, বাবা। তখন তোমার রাগ কমে যাবে।”

অমলবাবু ভেবেছিলেন, ছেলে কয়েক মাসের মধ্যেই ফিরবে। কিন্তু দিন পেরিয়ে বছর হয়ে গেল। প্রথমে চিঠি আসত, পরে ফোন। তারপর যোগাযোগ ক্রমশ কমে গেল।

অমলবাবুও অভিমানে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি।

অনেক বছর পরে ছেলের পুরোনো চিঠিগুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, নিজের জেদে তিনি সম্পর্কটাকে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তখন ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের পুরোনো নম্বরটি আর কাজ করত না। পরিচিত ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়েও উত্তর পাননি।

তারপর একদিন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শুনেছিলেন, অরুণ নাকি শালবনী রোড স্টেশনে ফিরে আসার কথা বলেছিল—কোনো একদিন, কোনো এক সন্ধ্যায়।

সেই থেকে অমলবাবু অপেক্ষা শুরু করেছিলেন।

মায়া মন দিয়ে সব শুনল। তারপর বলল, “কাকু, আঠারো বছর অনেকটা সময়। শুধু অপেক্ষা করলে তো হবে না। আপনি কি আরেকবার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন?”

বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন।

“কীভাবে নেব মা? ওর পুরোনো ঠিকানা নেই। কোথায় থাকে, জানি না। আর যদি সে আর আসতেই না চায়?”

মায়া বলল, “আপনি জানেন না, সে আসতে চায় কি না। তাই বলে ধরে নেওয়া যায় না যে সে আসবে না।”

৪. অপেক্ষার বদলে খোঁজ

পরদিন মায়া অমলবাবুকে জানাল, সে তাঁকে সাহায্য করতে চায়। তবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ করা বা ছড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তারা পরিচিত আত্মীয়দের মাধ্যমে খোঁজ নেবে, পুরোনো চিঠিতে থাকা তথ্য দেখবে এবং প্রয়োজনে পরিবারের সম্মতিতেই যোগাযোগের চেষ্টা করবে।

অমলবাবু প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না।

“যদি ও আমাকে দেখতে না চায়?”

মায়া বলল, “তাহলে সেই সিদ্ধান্তও আপনাকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু আগে তো জানতে হবে, সে কী চায়।”

অমলবাবুর মেয়ে রূপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। রূপা বাবার অপেক্ষার কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। সে জানত, বাবা ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান, কিন্তু এত দিন ধরে স্টেশনে অপেক্ষা করছেন, তা জানত না।

রূপা পুরোনো কাগজপত্র খুঁজে দেখল। একটি চিঠিতে অরুণের কর্মস্থলের নাম ছিল। প্রতিষ্ঠানটি এখন অন্য নামে পরিচিত হলেও পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়া গেল।

কয়েক সপ্তাহ চেষ্টা করার পর অরুণের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো।

প্রথম ফোনটি করলেন রূপা। অরুণ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর শুধু বলেছিল, “বাবা কি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছেন?”

রূপা কেঁদে ফেলেছিল।

“বাবা রাগ করে আছেন কি না, জানি না। তবে তিনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

অরুণ কিছুক্ষণ পর বলেছিল, “আমি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবার কথাটা মনে পড়ত। ভাবতাম, হয়তো উনি আমাকে আর দেখতে চান না। তারপর কাজ, সংসার, নানা দায়িত্বের মধ্যে সময় চলে গেল। যত দিন গেছে, ফোন করার সাহস তত কমেছে।”

দুই দিকেই ছিল অভিমান। কেউই জানত না, অন্যজনও অপেক্ষা করছে।

রূপা বাবার সঙ্গে কথা বলে অরুণকে জানাল, তিনি চাইলে বাড়িতে আসতে পারেন। অমলবাবু প্রথমে কিছু বললেন না। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “ওকে বলিস, আমি আর রাগ করে নেই।”

৫. যে সন্ধ্যায় ট্রেন থামল

অরুণ আসার দিন ঠিক হলো শনিবার।

সেই দিন সকাল থেকেই অমলবাবু অস্থির ছিলেন। বারবার ব্যাগ খুলে পুরোনো খামটি দেখছিলেন। মায়া বিকেলে স্টেশনে এসে তাঁকে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখল।

“আজ কি খুব ভয় লাগছে, কাকু?” সে জিজ্ঞাসা করল।

অমলবাবু মৃদু হাসলেন।

“ভয়ও লাগছে, আনন্দও হচ্ছে। এত বছর পরে কী বলব, বুঝতে পারছি না।”

মায়া বলল, “যা সত্যি, সেটাই বলবেন। কখনও কখনও একটা ‘কেমন আছিস?’ অনেক বছরের দূরত্ব কমিয়ে দেয়।”

সন্ধ্যার ট্রেনের ঘোষণা হলো। দূরে হেডলাইট দেখা গেল। ট্রেন ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।

যাত্রীরা নামতে শুরু করলেন।

একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। মুখে সময়ের ছাপ, চুলে পাক ধরেছে। তিনি প্ল্যাটফর্মে নেমে চারদিকে তাকালেন।

অমলবাবু বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

কেউ এগিয়ে যেতে পারছিল না।

আঠারো বছরের অভিমান, না বলা কথা, ভুল বোঝাবুঝি—সব যেন কয়েক মুহূর্তে তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।

অবশেষে অরুণ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, “বাবা…”

অমলবাবুর ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“এত দেরি করলি কেন, রে?”

অরুণ মাথা নিচু করে বলল, “ভয় পেয়েছিলাম, বাবা। ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করবে না।”

অমলবাবু ছেলের হাত ধরলেন।

“আমিও তোকে ডাকিনি। আমারও ভুল হয়েছে।”

তারপর আর কোনো কথা হলো না। বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

মায়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখও ভিজে উঠেছিল।

সেদিন শেষ ট্রেনটি কিছুক্ষণ আগেই ছেড়ে গেছে। তবু অমলবাবুর আর কোনো অপেক্ষা ছিল না।

৬. ফিরে পাওয়া সময়

অরুণ কয়েক দিন বাবার কাছে থাকল। তারা পুরোনো বইয়ের দোকানের জায়গায় গেল। সেখানে এখন একটি ছোট ওষুধের দোকান হয়েছে। দোকানের মালিকের অনুমতি নিয়ে অমলবাবু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা বললেন।

অরুণ বাবার কাছে জানতে চাইল, “তুমি এত বছর এখানে আসতে?”

অমলবাবু সত্যি কথাটা বললেন।

“হ্যাঁ। ভাবতাম, একদিন হয়তো তুই হঠাৎ এসে দাঁড়াবি।”

অরুণ বাবার হাত শক্ত করে ধরল।

“আমাকে একবার ফোন করতে পারতে।”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “তুইও তো পারতিস।”

দুজনেই হেসে ফেললেন। সেই হাসির মধ্যে অনুশোচনা ছিল, আবার নতুন করে শুরু করার স্বস্তিও ছিল।

অরুণ বাবাকে নিজের শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু অমলবাবু বললেন, তিনি আপাতত শালবনীতেই থাকবেন। নিজের পরিচিত পরিবেশ, পুরোনো বন্ধু আর রেলস্টেশন ছেড়ে যেতে তাঁর মন চাইছিল না।

তবে এবার আর সম্পর্কটা দূরে রইল না। অরুণ নিয়মিত ফোন করতে শুরু করল। মাসে অন্তত একবার বাবার কাছে আসার চেষ্টা করত। রূপার সঙ্গেও তার যোগাযোগ বাড়ল।

মায়ার উদ্যোগে স্টেশনের বেঞ্চটির কাঠামো পরীক্ষা করে রেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেটি মেরামত করা হলো। বেঞ্চের পাশে ছোট একটি ফলক লাগানো হলো—

‘এই বেঞ্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কথা বলার জন্য কখনও কখনও দেরি হয়ে যায়, কিন্তু সম্পর্কের দরজা খোলা থাকলে ফিরে আসার পথও তৈরি হয়।’

অমলবাবু ফলকটি দেখে বললেন, “মা, তুই আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছিস।”

মায়া মাথা নাড়ল।

“আমি শুধু খোঁজ নেওয়ার কথা বলেছিলাম, কাকু। ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা আপনাদের দুজনেরই।”

৭. অপেক্ষার আসল অর্থ

এরপরও মায়া মাঝে মাঝে স্টেশনে আসত। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের সেই বেঞ্চে এখন অমলবাবু বসতেন ঠিকই, কিন্তু আর কারও জন্য অনিশ্চিত অপেক্ষা নিয়ে নয়।

কখনও অরুণের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন, কখনও ট্রেনের সময় দেখে বাড়ি ফিরতেন। তাঁর চোখে আগের মতো অস্থিরতা আর ছিল না।

একদিন মায়া জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, এত দিন অপেক্ষা করে আপনি কী শিখলেন?”

অমলবাবু কিছুক্ষণ ভাবলেন।

“শিখেছি, মানুষ অনেক সময় রাগের কারণে চুপ করে থাকে। ভাবে, অন্যজন আগে কথা বলুক। তারপর সেই নীরবতাই দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একটা ফোন, একটা চিঠি, কিংবা ছোট্ট একটা প্রশ্ন—‘কেমন আছিস?’—হয়তো অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।”

মায়া স্টেশনের দিকে তাকাল। একটি ট্রেন এসে থামল, আবার ছেড়ে গেল। কেউ নামল, কেউ উঠল। কারও চোখে আনন্দ, কারও মুখে ক্লান্তি, কেউ বিদায় জানাল, কেউ ফিরে এল।

সে বুঝল, রেলস্টেশন শুধু যাত্রার শুরু বা শেষ নয়। কখনও কখনও এটি মানুষের ভুল বুঝতে পারার, সম্পর্কের মূল্য উপলব্ধি করার এবং নতুন করে ফিরে আসার জায়গাও।

অমলবাবু ধীরে ধীরে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

“চল মা, আজ বাড়ি যাই।”

মায়া হাসল।

সেদিন শেষ ট্রেনের জন্য আর কাউকে অপেক্ষা করতে হয়নি। কারণ যে মানুষটির জন্য অপেক্ষা ছিল, সে ফিরে এসেছিল। আর তার থেকেও বড় কথা, দুজন মানুষ নিজেদের ভুল স্বীকার করে আবার একে অপরের কাছে ফিরে আসার সাহস পেয়েছিল।

শিক্ষা: অভিমান কখনও কখনও মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু নীরবতা সব সমস্যার সমাধান নয়। সম্পর্কের মূল্য থাকলে প্রথম পদক্ষেপ নিতে ভয় পেয়ো না। ক্ষমা চাওয়া কিংবা খোঁজ নেওয়া দুর্বলতা নয়—এগুলোই সম্পর্ককে নতুন জীবন দেওয়ার সাহস।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

নীল খামের ভেতর পৃথিবী।

শালবনের ছোট্ট গ্রামটিতে ডাকঘর ছিল না। চিঠি পাঠাতে হলে মানুষকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের বাজারে যেতে হতো। অথচ গ্রামের অধিকাংশ মানুষই ছিলেন বয়স্ক, আর অনেকেরই দূরে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না।

এই সমস্যার কথা প্রথম বুঝেছিলেন গ্রামের তরুণী মেঘলা। তিনি শহরে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। গ্রামের পুরোনো পঞ্চায়েত ভবনের একটি ঘরকে ছোট পাঠকেন্দ্রে পরিণত করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু বইয়ের অভাব, অর্থের অভাব এবং মানুষের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে কাজ এগোচ্ছিল না।

একদিন পাঠকেন্দ্রের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি কাঠের একটি বাক্স পেলেন। বাক্সের মধ্যে ছিল কয়েকটি পুরোনো পোস্টকার্ড, কিছু খাম এবং নীল রঙের একটি মোটা খাম। খামটির গায়ে লেখা—‘যাঁদের কথা দূরে পৌঁছয় না, তাঁদের জন্য।’

ভেতরে ছিল একটি হাতে লেখা আবেদনপত্র।

লেখক ছিলেন গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক হরিপদবাবু। তিনি বহু বছর আগে গ্রামের মানুষের হয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি লিখতেন। কারও জমির কাগজের সমস্যা, কারও ভাতার আবেদন, কারও সন্তানকে অন্য স্কুলে ভর্তি করার অনুরোধ—সবই তাঁর হাত ধরে ঠিক জায়গায় পৌঁছত।

চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল, ‘একটি গ্রামে শুধু রাস্তা থাকলেই হয় না। সেই গ্রামের মানুষের কথা বাইরে পৌঁছনোর পথও থাকতে হয়। একদিন যদি কেউ এই বাক্স খুঁজে পায়, তবে সে যেন মানুষের কথাগুলো হারিয়ে যেতে না দেয়।’

মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।

পরদিন তিনি গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। জানতে পারলেন, হরিপদবাবু শুধু চিঠি লিখতেন না, তিনি প্রত্যেক আবেদনকারীর সমস্যার বিবরণও একটি খাতায় লিখে রাখতেন। সেই খাতা আর পাওয়া গেল না, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তাঁর কাজের গল্প রয়ে গিয়েছিল।

মেঘলা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি গ্রামের মানুষের জন্য একটি ‘জনকথা কেন্দ্র’ তৈরি করবেন। সেখানে মানুষ নিজের সমস্যা লিখিয়ে রাখতে পারবেন, প্রয়োজনীয় আবেদনপত্রের খসড়া তৈরি করতে পারবেন এবং কোন সরকারি দপ্তরে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, তার তথ্য পাবেন।

শুরুতে মাত্র চারজন এলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিধবা সরস্বতী দেবী, কৃষক নিতাই এবং দুই তরুণ শ্রমিক।

সরস্বতী দেবী নিজের বার্ধক্যভাতার আবেদনের অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন। নিতাই জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর জমির মাটির পরীক্ষা কোথায় করানো যায়। দুই শ্রমিক জানতে চেয়েছিলেন, শহরে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি কীভাবে তৈরি করতে হবে।

মেঘলা তাঁদের কথা শুনলেন। প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা কাগজে লিখলেন। কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কোন নথি লাগবে এবং কীভাবে আবেদন জমা দিতে হবে, তা বুঝিয়ে দিলেন। যেসব বিষয়ে তাঁর নিশ্চিত জ্ঞান ছিল না, সেগুলোর উত্তর অনুমান করে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেন।

ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়ে পড়ল।

কেউ জমির নথি নিয়ে এলেন, কেউ স্কুলের বৃত্তির ফর্ম নিয়ে, কেউ আবার শুধু জানতে চাইলেন, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে।

মেঘলা বুঝলেন, মানুষের শুধু সাহায্য দরকার নয়; দরকার এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রশ্ন করতে লজ্জা পেতে হয় না।

তাই পাঠকেন্দ্রের এক পাশে তিনি একটি বড় বোর্ড লাগালেন। তার শিরোনাম দিলেন—‘আপনার প্রশ্ন লিখুন’। নাম না লিখেও প্রশ্ন জমা দেওয়া যেত। প্রতি সপ্তাহে তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে উত্তর সংগ্রহ করে বোর্ডে টাঙিয়ে দিতেন।

একদিন সেখানে একটি প্রশ্ন এল—‘আমার মেয়ে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু বাড়ির সবাই বলছে মেয়েদের এত দূর পড়তে যাওয়ার দরকার নেই। আমি কী করব?’

প্রশ্নটির পাশে কোনও নাম ছিল না।

মেঘলা সেদিন কোনও বক্তৃতা দিলেন না। তিনি মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ, কাছাকাছি বিদ্যালয়ের তথ্য, যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং শিক্ষাবৃত্তির নিয়ম নিয়ে একটি ছোট তথ্যপত্র তৈরি করলেন। পরের সপ্তাহে সেই তথ্যপত্র পড়তে এসে গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন।

কয়েক মাসের মধ্যে জনকথা কেন্দ্রটি গ্রামের পরিচিত জায়গা হয়ে উঠল। সেখানে এখন শুধু আবেদনপত্র লেখা হতো না, মানুষ অন্যের সমস্যার কথাও শুনতেন। কেউ পড়তে না জানলে অন্য কেউ তাঁকে কাগজের লেখা বুঝিয়ে দিতেন। কেউ সরকারি দপ্তরে যাওয়ার পথ না জানলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি পথ দেখিয়ে দিতেন।

একদিন জেলা প্রশাসনের একটি দল গ্রামে এসে কেন্দ্রটির কাজ দেখল। তারা মেঘলাকে জানাল, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও সুসংগঠিত করা যেতে পারে। মেঘলা সেই সুযোগ গ্রহণ করলেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিলেন, তথ্যের উৎস যাচাই করার নিয়ম তৈরি করলেন এবং ব্যক্তিগত নথি নিরাপদে রাখার ব্যবস্থাও করলেন।

এক বছর পরে গ্রামের পাঠকেন্দ্রে একটি ছোট অনুষ্ঠান হলো। হরিপদবাবুর স্মরণে নীল খামটি কাচের বাক্সে রাখা হলো। তার পাশে লেখা হলো—

‘একটি চিঠি কখনও কখনও শুধু খবর বহন করে না, মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় তার নিজের কণ্ঠস্বর।’

অনুষ্ঠান শেষে সরস্বতী দেবী মেঘলার কাছে এসে বললেন, “আগে ভাবতাম, এসব কাজ বড় বড় অফিসের লোকেরাই শুধু করতে পারেন। এখন বুঝি, ঠিক পথটা চিনিয়ে দেওয়ার জন্য একজন মন দিয়ে শুনতে জানেন—এমন মানুষও দরকার।”

মেঘলা হাসলেন। তাঁর মনে হলো, হরিপদবাবুর নীল খামটি কোনও রহস্যের বাক্স ছিল না। সেটি ছিল একটি অসমাপ্ত কাজের স্মারক।

আর সেই কাজের অর্থ ছিল—কেউ যেন শুধু না জানার কারণে নিজের অধিকার, সুযোগ কিংবা স্বপ্ন থেকে দূরে সরে না থাকেন।

সেদিন সন্ধ্যায় জনকথা কেন্দ্র বন্ধ করার আগে মেঘলা বাক্সে একটি নতুন নীল খাম রাখলেন। তার ওপর লিখলেন—

‘আগামী দিনের প্রশ্নগুলোর জন্য।’

কারণ তিনি জানতেন, মানুষের প্রশ্ন কোনও দিন শেষ হয় না। আর যত দিন প্রশ্ন থাকবে, তত দিন উত্তর খোঁজার পথও খোলা রাখা দরকার।

শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে সব সমস্যার সমাধান নিজে করে দেওয়া নয়; বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় সুযোগ এবং নিজের কথা বলার সাহস দিয়ে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ বাতির নিচে।

শহরের পুরোনো পাড়াটিতে সন্ধ্যা নামলেই একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোহার খুঁটির মাথায় লাগানো বাতিটি জ্বলে উঠত, আর তার হলুদ আলোয় ফুটপাতের ছোট্ট অংশটুকু যেন আলাদা একটি পৃথিবী হয়ে উঠত।

সেই আলোয় প্রতিদিন বসতেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী অমরেশবাবু। তাঁর হাতে থাকত একটি ছোট যন্ত্রের বাক্স, পাশে কয়েকটি তার, ব্যাটারি আর নানা রকম সুইচ। পথচারীরা তাঁকে দেখে ভাবত, বৃদ্ধ মানুষটি বুঝি নিজের মনেই কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

কিন্তু অমরেশবাবুর কাজ ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি এমন একটি সংকেতবাতি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন, যা আগুন লাগলে কিংবা অন্য কোনো বিপদের সময় শুধু আলো জ্বালিয়ে নয়, স্পর্শের মাধ্যমেও মানুষকে সতর্ক করতে পারবে।

কয়েক বছর আগে একটি বহুতলে আগুন লাগার ঘটনায় তিনি দেখেছিলেন, প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে অনেকে সতর্কবার্তা শুনতে পাননি। আবার ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া করিডরে সাধারণ আলোও যথেষ্ট সাহায্য করেনি। সেই ঘটনা তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল—বিপদের সংকেত কি এমন হতে পারে না, যা চোখে দেখা যায়, কানে শোনা যায় এবং হাতের স্পর্শেও অনুভব করা যায়?

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ পরীক্ষা।

প্রথম দিকে তাঁর তৈরি যন্ত্র বারবার বিফল হতো। কখনও আলো ঠিকমতো জ্বলত না, কখনও কম্পনের সংকেত এত দুর্বল হতো যে বোঝাই যেত না। একদিন পরীক্ষার সময় ব্যাটারি গরম হয়ে যন্ত্রের একটি অংশ নষ্ট হয়ে গেল।

পাশের বাড়ির কলেজপড়ুয়া মেয়ে ইরা বিষয়টি দেখে বলল, “অমরেশকাকু, এত বয়সে এইসব না করে বিশ্রাম নিলেই তো পারেন! এখন কত আধুনিক যন্ত্র বেরিয়েছে।”

অমরেশবাবু হেসে উত্তর দিলেন, “আধুনিক যন্ত্র অনেক আছে, ইরা। কিন্তু যাদের সত্যিই দরকার, তাদের প্রত্যেকের কাছে কি সেগুলো পৌঁছেছে?”

ইরা আর কথা বাড়াল না।

কয়েক দিন পরে সে আবার এল। এবার তার হাতে কলেজের একটি প্রকল্পের খাতা। সে জানাল, তাদের বিভাগে বৈদ্যুতিক সার্কিট নিয়ে কাজ হচ্ছে। অমরেশবাবুর পরীক্ষায় সে সাহায্য করতে চায়।

দুজন মিলে নতুন করে কাজ শুরু করল।

ইরা যন্ত্রটির বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করত, আর অমরেশবাবু বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে কম বিদ্যুৎ খরচ করে দীর্ঘক্ষণ সংকেত চালু রাখা যায়। তাঁরা একটি ছোট মডেল তৈরি করলেন। বিপদের সংকেত এলে লাল আলো দ্রুত জ্বলবে, একটি শব্দসংকেত বাজবে এবং হাত দিয়ে ধরা যায় এমন একটি অংশ নির্দিষ্ট ছন্দে কেঁপে উঠবে।

তবে তাঁরা বুঝতে পারলেন, শুধু যন্ত্র বানালেই হবে না। জরুরি অবস্থায় মানুষকে কীভাবে সেটি ব্যবহার করতে হবে, সেটাও সহজভাবে জানাতে হবে।

ইরা কয়েকটি চিত্র আঁকল। অমরেশবাবু নির্দেশনাগুলো এমনভাবে সাজালেন, যাতে বেশি পড়াশোনা না জানা মানুষও ছবির সাহায্যে বুঝতে পারেন। তাঁরা এলাকার একটি কমিউনিটি হলে মডেলটি পরীক্ষা করার অনুমতি চাইলেন।

প্রথম প্রদর্শনীর দিন হলঘরে অনেক মানুষ এসেছিলেন। কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ সন্দেহ নিয়ে।

অমরেশবাবু বোতাম টিপতেই লাল আলো জ্বলে উঠল। শব্দসংকেতের সঙ্গে হাতলটিও কেঁপে উঠল।

সামনের সারিতে বসা এক তরুণী হাতলটি ছুঁয়ে বললেন, “আমি শব্দ শুনতে পাই না। কিন্তু এই কম্পনটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি।”

তাঁর কথায় ঘরটি মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে গেল।

ইরা বুঝতে পারল, এত দিন তারা যে যন্ত্র তৈরি করছিল, তার গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন মানুষের কাছেও সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে, যাদের জন্য সাধারণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

এরপর তাঁরা স্থানীয় অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বিশেষজ্ঞরা নকশাটি পরীক্ষা করে কিছু পরিবর্তনের পরামর্শ দিলেন। অমরেশবাবু ও ইরা সেই পরামর্শ অনুযায়ী মডেলটি উন্নত করলেন। তাঁরা এটাও নিশ্চিত করলেন যে যন্ত্রটি যেন প্রচলিত অগ্নিসতর্কীকরণ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অনুমোদিত নিরাপত্তাব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কাজটি সহজ ছিল না। অর্থের অভাব ছিল, অনুমতির প্রয়োজন ছিল, আর পরীক্ষা ছাড়া কোনো যন্ত্রকে মানুষের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করাও সম্ভব ছিল না। তবু তাঁরা থামলেন না।

কয়েক মাস পরে একটি সামাজিক সংস্থা তাঁদের প্রকল্পে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। পরীক্ষিত মডেলটি একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রদর্শনের সুযোগ পেল। সেখানে মানুষ জরুরি অবস্থায় নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার অনুশীলন করার সময় বিভিন্ন ধরনের সংকেত সম্পর্কে জানল।

প্রদর্শনী শেষে ইরা অমরেশবাবুকে বলল, “কাকু, আপনি না থাকলে আমি হয়তো ভাবতাম প্রকৌশল মানে শুধু যন্ত্র বানানো।”

অমরেশবাবু তাঁর ছোট্ট বাক্সটি বন্ধ করতে করতে বললেন, “যন্ত্রের সাফল্য তার জটিলতায় নয়, মানুষের কাজে লাগার মধ্যে। তবে মানুষের নিরাপত্তার জন্য বানানো প্রতিটি জিনিসের আগে পরীক্ষা, সতর্কতা আর দায়িত্ব থাকা চাই।”

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় মোড়ের পুরোনো বাতিটি জ্বলে উঠেছিল। তার নিচে দাঁড়িয়ে অমরেশবাবু কিছুক্ষণ আলোটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি জানতেন, তাঁর তৈরি মডেল পৃথিবীর সব বিপদ দূর করতে পারবে না। তবু এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করেছেন, যা বিপদের মুহূর্তে আরও কয়েকজন মানুষকে সতর্ক হতে সাহায্য করতে পারে।

আর কখনও কখনও, কয়েক মুহূর্ত আগে সতর্ক হয়ে যাওয়াই জীবন বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট।

শিক্ষা: প্রকৃত উদ্ভাবন শুধু নতুন কিছু তৈরি করা নয়; মানুষের বাস্তব সমস্যা বুঝে, নিরাপত্তা ও দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে তার সমাধানের চেষ্টা করাই প্রকৃত সাফল্য।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অদৃশ্য সেতুর ওপারে।

শীতলপুরের ছোট্ট আদালত ভবনটির সামনে প্রতিদিন সকাল থেকেই মানুষের ভিড় জমত। কেউ জমির বিবাদ নিয়ে আসতেন, কেউ পারিবারিক সমস্যার সমাধান চাইতেন, আবার কেউ দূর গ্রামের পথ পেরিয়ে আসতেন নিজের অধিকার বুঝে নিতে। কিন্তু সেই আদালতে অনেক মানুষের একটি বড় সমস্যা ছিল—তাঁরা নিজেদের কথা ঠিকভাবে বোঝাতে পারতেন না।

কেউ অন্য ভাষায় কথা বলতেন, কেউ আঞ্চলিক উপভাষায়, আবার কেউ ভয়ে কিংবা সংকোচে নিজের বক্তব্য গুছিয়ে বলতে পারতেন না।

সেই আদালতেই কাজ করতেন অনির্বাণ সেন। তিনি ছিলেন একজন ভাষান্তরকারী। তাঁর কাজ ছিল এক ভাষার কথা অন্য ভাষায় অনুবাদ করা। কিন্তু অনির্বাণ মনে করতেন, শব্দের অনুবাদ করলেই মানুষের মনের কথা অনুবাদ করা যায় না।

একদিন আদালতে এলেন পাহাড়ঘেঁষা একটি গ্রামের বৃদ্ধা লাচমি হাঁসদা। তাঁর জমির সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ চলছিল। গ্রামের ভাষায় তিনি বিচারকের সামনে অনেক কথা বললেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য আদালতের কর্মীরা ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলেন না।

একজন কর্মী বিরক্ত হয়ে বললেন, “উনি কী বলতে চাইছেন, একটু সংক্ষেপে বলুন। এত কথা শুনে সময় নষ্ট হচ্ছে।”

লাচমি চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখে জল এসে জমল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো কীভাবে অপরিচিত মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন।

অনির্বাণ তাঁর পাশে গিয়ে বসলেন।

“আপনি ধীরে ধীরে বলুন। আপনার কথা শোনার জন্যই তো আমরা এখানে আছি।”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন। তিনি জানালেন, তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার আগে জমির সীমানা নিয়ে যে চিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন, প্রতিবেশী সেটি সরিয়ে দিয়েছেন। জমিটুকুই তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

অনির্বাণ তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শুনলেন। শুধু শব্দের অর্থ নয়, কোথায় বৃদ্ধা থেমে যাচ্ছেন, কোন কথাটি বলতে গিয়ে তাঁর গলা কেঁপে উঠছে, সেসবও লক্ষ করলেন। তারপর আদালতের প্রচলিত ভাষায় তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরলেন।

বিচারক বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শুনলেন এবং প্রয়োজনীয় নথি ও জমির সীমানা যাচাই করার নির্দেশ দিলেন।

আদালত থেকে বেরিয়ে লাচমি অনির্বাণের হাত ধরে বললেন, “আজ মনে হলো, আমার কথাগুলোও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।”

সেদিন কথাটি অনির্বাণের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গেল।

তিনি বুঝলেন, ভাষার অমিল শুধু কথাবার্তার সমস্যা নয়; এর কারণে মানুষ কখনও কখনও নিজের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।

পরের কয়েক মাস তিনি নিজের উদ্যোগে একটি ছোট প্রকল্প শুরু করলেন। আশপাশের বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারেন, এমন স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁদের নিয়ে তৈরি করলেন একটি ভাষা-সহায়তা দল। আদালতে আসা মানুষদের জন্য একটি তালিকা তৈরি হলো—কোন ভাষায় সাহায্য দরকার, কোন স্বেচ্ছাসেবী সেই ভাষা জানেন, কীভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

প্রথমদিকে অনেকেই উদ্যোগটিকে গুরুত্ব দেননি।

একজন সহকর্মী বলেছিলেন, “এত ঝামেলা করে কী হবে? আদালতের কাজ আদালতই করবে।”

অনির্বাণ শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “বিচার পাওয়ার দরজাটা সবার জন্য খোলা থাকলেই হয় না। সেই দরজা দিয়ে ঢোকার পথটাও সবার জানা দরকার।”

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। দূর গ্রামের মানুষ নিজেদের বক্তব্য জানাতে সাহস পেলেন। ভাষার কারণে ভুল বোঝাবুঝি কমল। বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও বুঝতে পারলেন, সঠিক ভাষান্তর সময় নষ্ট করে না, বরং ভুল কমায়।

একদিন জেলা প্রশাসনের একটি সভায় অনির্বাণকে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা বলতে আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি কোনো পুরস্কার বা প্রশংসার কথা বললেন না। শুধু লাচমির ঘটনার কথা তুলে ধরে বললেন, “একজন মানুষের কথা বুঝতে না পারা আর তাঁর কথা শোনার চেষ্টা না করা—দুটি এক জিনিস নয়। ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা আলাদা হতে পারে না।”

সভায় উপস্থিত এক তরুণ আধিকারিক তাঁর কথা শুনে নিজের এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতেও ভাষা-সহায়তার ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দিলেন। পরে সেই উদ্যোগ অন্য কয়েকটি সরকারি দপ্তরেও ছড়িয়ে পড়ল।

বছরখানেক পর লাচমি আবার আদালতে এলেন। এবার জমির সীমানা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তিনি নিজের বক্তব্য বুঝিয়ে বলতে পেরেছিলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিতে পেরেছিলেন।

আদালত ভবনের বাইরে অনির্বাণকে দেখে তিনি হাসলেন।

“বাবা, তুমি আমার জমি ফিরিয়ে দাওনি। তুমি আমাকে নিজের কথা বলার পথটা দেখিয়েছ।”

অনির্বাণ বললেন, “পথটা আপনারই ছিল, লাচমি মাসি। শুধু মাঝখানে একটা সেতুর দরকার ছিল।”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন। তাঁর চোখে এবার আর অসহায়তার জল ছিল না; ছিল নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অনির্বাণ ভাবলেন, পৃথিবীতে কত রকম সেতু রয়েছে—কাঠের, লোহার, পাথরের। কিন্তু এমন কিছু সেতুও আছে, যেগুলো চোখে দেখা যায় না। একটি মনোযোগী কান, একটি ধৈর্যশীল মন, কিংবা সঠিক সময়ে বলা কয়েকটি সম্মানজনক কথা দিয়েও সেই সেতু তৈরি করা যায়।

আর সেই সেতুর ওপারেই অপেক্ষা করে থাকে মানুষের অধিকার, আত্মবিশ্বাস এবং সম্মান।

শিক্ষা: মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাকে নিজের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ দেওয়া শুধু সহানুভূতি নয়, তার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ বিকেলের রং।

শহরের এক পুরোনো পাড়ায় থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তাঁর দিনগুলো কেমন যেন নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। সকালে খবরের কাগজ পড়া, দুপুরে সামান্য খাওয়াদাওয়া, আর বিকেলে বাড়ির বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষজনকে দেখা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন।

একদিন বিকেলে পাশের বাড়িতে নতুন ভাড়াটে এল। বাড়িটিতে উঠল দশ বছরের মেয়ে তিতলি, তার মা এবং ছোট ভাই। তিতলি ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাদিন তার মুখে নানা প্রশ্ন, চোখে নতুন কিছু জানার কৌতূহল।

বাড়ির বারান্দায় শশাঙ্কবাবুকে একা বসে থাকতে দেখে তিতলি একদিন জিজ্ঞাসা করল, “দাদু, আপনি রোজ এখানে বসে কী দেখেন?”

শশাঙ্কবাবু একটু হেসে বললেন, “মানুষ দেখি, পাখি দেখি, আর বিকেলের আকাশ দেখি।”

“আকাশ দেখে কী হয়?”

“রং বদলাতে দেখি।”

তিতলি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আকাশ তো রোজই নীল! আবার রং বদলায় কী করে?”

শশাঙ্কবাবু অবাক হলেন। বহুদিন পরে কেউ তাঁকে এমন সহজ অথচ গভীর একটি প্রশ্ন করেছিল। তিনি তিতলিকে বোঝালেন, সূর্য ডোবার সময় আলো ও মেঘের অবস্থার কারণে আকাশে নানা রং দেখা যায়। তিতলি মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল, “কাল থেকে আমিও আপনার সঙ্গে আকাশ দেখব!”

পরদিন বিকেলে সে একটি ছোট খাতা ও রঙিন পেনসিল নিয়ে হাজির হল। আকাশে যে রং দেখল, খাতায় আঁকল। কোনও দিন কমলা, কোনও দিন গোলাপি, কোনও দিন ধূসর মেঘের ফাঁকে সোনালি আলো।

শশাঙ্কবাবু প্রথমে শুধু তিতলির আঁকা দেখতেন। পরে তিনিও খাতায় ছোট ছোট নোট লিখতে শুরু করলেন—কোন দিন আকাশ পরিষ্কার ছিল, কোন দিন বাতাসে মেঘ ভেসে এসেছিল, কোন দিন সূর্যাস্তের রং ছিল অন্য রকম।

এভাবেই তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।

একদিন তিতলি স্কুল থেকে মন খারাপ করে ফিরল। ছবির প্রতিযোগিতায় সে পুরস্কার পায়নি। তার সহপাঠীর আঁকা ছবি নির্বাচিত হয়েছে। তিতলি নিজের খাতা বন্ধ করে বলল, “আমি আর ছবি আঁকব না। আমার ছবি ভালো নয়।”

শশাঙ্কবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের ঘর থেকে বহু পুরোনো একটি ছবি নিয়ে এলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ রেলকর্মী পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটির রং অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে।

“এটা কে?” তিতলি জানতে চাইল।

“আমি। চাকরির প্রথম দিকে একবার পাহাড়ে গিয়েছিলাম। তখন ছবি তুলতে খুব ভালোবাসতাম।”

“আপনি কি ছবি আঁকতেন?”

“চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমার আঁকা কোনও ছবিই তখন খুব ভালো হত না। একবার এক বন্ধু বলেছিল, আমার হাতে নাকি শিল্পীর গুণ নেই। তারপর ধীরে ধীরে আঁকা ছেড়ে দিয়েছিলাম।”

তিতলি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে আপনি আর আঁকেননি কেন? আপনার বন্ধুর কথা কি সত্যি ছিল?”

শশাঙ্কবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “সেটাই তো বুঝতে পারিনি। অন্যের একটি কথাকে নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিয়েছিলাম।”

তিনি তিতলির খাতা খুলে দেখলেন। সেখানে আঁকা সূর্যাস্তের ছবিগুলো নিখুঁত ছিল না। কোথাও রং ছড়িয়ে গেছে, কোথাও মেঘের আকার ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। কিন্তু প্রতিটি ছবিতে আলাদা একটি অনুভূতি ছিল।

তিনি বললেন, “একটি প্রতিযোগিতা ঠিক করে দিতে পারে না তুমি কতটা ভালো ছবি আঁকতে পারো। পুরস্কার একটি দিনের ফলাফল। শেখা আর চেষ্টা অনেক দিনের যাত্রা।”

তিতলি কিছুক্ষণ ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নতুন একটি পাতা খুলে আবার আঁকতে শুরু করল।

এরপর থেকে শুধু তিতলি নয়, শশাঙ্কবাবুও ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি বাজার থেকে নতুন রং কিনলেন। প্রথম কয়েক দিন তাঁর হাত কাঁপত, রেখা বেঁকে যেত। তবু তিনি থামলেন না।

কয়েক মাস পরে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিশুদের আঁকা ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হল। তিতলি সেখানে নিজের সূর্যাস্তের ছবিটি জমা দিল। শশাঙ্কবাবুও জমা দিলেন তাঁর আঁকা একটি ছবি—পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা এক বৃদ্ধের সামনে বিস্তৃত রঙিন আকাশ।

ছবিটি দেখে অনেকে থমকে দাঁড়ালেন। ছবিতে খুব নিখুঁত কারিগরি ছিল না, কিন্তু একাকিত্বের মধ্যে নতুন করে বাঁচার আনন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

তিতলি কোনও পুরস্কার পেল না, শশাঙ্কবাবুও পেলেন না। তবু অনুষ্ঠান শেষে দুজনের মুখেই হাসি ছিল।

সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে তিতলি বলল, “দাদু, আজ পুরস্কার না পেয়েও আমার খুব ভালো লাগছে।”

শশাঙ্কবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কারণ আজ তুমি অন্যের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করোনি। নিজের আনন্দটাকে নিজেই চিনতে পেরেছ।”

সূর্য তখন দিগন্তের আড়ালে নেমে যাচ্ছিল। আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল কমলা আর বেগুনির মিশ্র আলো। তিতলি খাতা খুলে আঁকতে শুরু করল। পাশে বসে শশাঙ্কবাবুও রং মেলাতে লাগলেন।

সেদিন তাঁরা বুঝেছিলেন, জীবনের বিকেল মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও শেষ বিকেলের আলোতেই নতুন শুরুর সবচেয়ে সুন্দর রং ফুটে ওঠে।

শিক্ষা: অন্যের মতামত বা একটি ব্যর্থতার কারণে নিজের আগ্রহকে শেষ করে দেওয়া উচিত নয়। সাফল্যের আনন্দ শুধু পুরস্কার পাওয়ায় নয়, শেখার পথে এগিয়ে চলা এবং নিজের কাজের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

Share This