Categories
কবিতা

যুদ্ধক্ষেত্র : রাণু সরকার।

আসবে তুমি-
আমার জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে?
পথটা কিন্তু রক্তরঞ্জিত ভীতিপ্রদ বেদনাবহ,
দিন কাটে যন্ত্রণাগ্রস্ত।
রাত? সে তো নিস্তব্ধ কৃষ্ণবর্ণের ভস্ম!
পারবে তুমি আসতে?
সর্বাঙ্গ চূর্ণবিচূর্ণ–
পারবে এই হৃদয় স্পর্শ করতে?

তোমার উপস্থিতি-

এই গহন রাত তোমার উপস্থিতি কাম্য!
অসবে তুমি রক্তরঞ্জিত যুদ্ধক্ষেত্রে?

Share This
Categories
কবিতা

দামোদর ব্যারেজের কথা : মহীতোষ গায়েন।।

দামোদর ব্যারেজে সকাল১০ টা,আমরা নেমেছি একটু চা জলপানের জন্য,জল,চা খেলাম,সঙ্গে উপাদেয় চপ ও মুড়ি,পাশে তপন সেনের পানের দোকান,পান খেলাম।

তপনদার সঙ্গে কিছু গল্প হলো,তখন কুয়াশার চাদরের দফারফা করছে সূর্য,পান বেচে তপনদার মাসিক ৫০০০আয়ে ৪জনের চলে;খাদ্যসাথী প্রকল্প আছে।

আমাদের গাড়ি বাঁকুড়ার দিকে,
সংসদ সেমিনার যাব,এখানে ফিতা বিখ্যাত,কিনবো,কিন্তু বিনা পয়সায় কিনলাম তপনদার মন,তপনদাও তাই,
চরাচরে তখন বিরাজমান শান্তি।

এটাই পশ্চিমবঙ্গ,এখানে মা মাটি মানুষের প্রাণ,এখানে মণিপুর,বাংলাদেশের নির্মমতা নেই, জঙ্গলের পাশ দিয়ে গাড়ি চলছে,জানালা দিয়ে মিষ্টি হাওয়া মুখ‌ ছোঁয় প্রেমের আভা,দামোদরও মমতাময়।

————-

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

অজানার পথে এক দুপুর।

ভ্রমণ মানে শুধু স্থান বদল নয়—ভ্রমণ মানে নিজের ভেতরের মানুষটিকে একটু দূরে রেখে আসা, আর নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করা। এমনই এক অচেনা দুপুরে, ব্যস্ত শহরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম অজানার পথে।
শীতের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দিনটিতে আকাশ ছিল পরিষ্কার। ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুটে চলা মাঠ, খাল আর ছোট ছোট গ্রাম যেন চোখের সামনে এক চলমান ছবির অ্যালবাম খুলে ধরছিল। মাঝে মাঝে কাঁচা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ, কখনো লাল মাটির বাড়ি—সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ সৌন্দর্য।
গন্তব্য ছিল পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট শহর। নাম খুব পরিচিত নয়, কিন্তু শান্তি ভরা। স্টেশন থেকে নামতেই যে জিনিসটা সবচেয়ে আগে টের পেলাম, তা হলো—নীরবতা। শহরের কোলাহলের অভ্যাসে অভ্যস্ত কান যেন কিছুক্ষণের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। বাতাসে ছিল হালকা শীতের গন্ধ, আর রোদের উষ্ণ ছোঁয়া।
হেঁটে চললাম সরু রাস্তা ধরে। রাস্তার ধারে চা-দোকান, যেখানে কেটলিতে ফুটছে দুধ-চা। দোকানদার হাসিমুখে চা বাড়িয়ে দিল—সেই চায়ের স্বাদ যেন শহরের দামি ক্যাফের চেয়েও অনেক বেশি আপন। পাশেই কয়েকজন স্থানীয় মানুষ গল্পে মশগুল, তাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে জীবনের সহজ সত্যগুলো যেন ঝরে পড়ছিল।
দুপুর গড়াতেই পাহাড়ের ছায়া লম্বা হয়ে এল। একপাশে নীলচে পাহাড়, অন্য পাশে সবুজ উপত্যকা। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো—প্রকৃতি যেন নিজেই শিল্পী, আর আমরা কেবল দর্শক। মোবাইল তুলে ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু বুঝলাম—এই অনুভূতি কোনো ক্যামেরায় বন্দি করা যায় না।
ভ্রমণের আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো মানুষ। অচেনা হলেও তাদের আন্তরিকতা আপন করে নেয়। এক বৃদ্ধ মানুষ গল্প করছিলেন তাঁর জীবনের কথা—কীভাবে পাহাড় আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই কেটে গেছে তাঁর জীবন। সেই গল্পে ছিল কষ্ট, ছিল ধৈর্য, আর ছিল অদ্ভুত এক শান্তি।
সন্ধ্যা নামার আগেই ফিরে আসার পালা। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ঢুকে পড়ছে, আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে কমলা আর বেগুনিতে। মনে হলো—এই ভ্রমণ শুধু কিছু দৃশ্য নয়, কিছু অনুভূতি জমা করে দিল বুকের ভেতর।
ফিরতি পথে ভাবছিলাম—ভ্রমণ আসলে কোথাও যাওয়া নয়, বরং নিজের কাছে ফিরে আসা। ব্যস্ততার ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে এই কয়েকটা ঘণ্টা আমাকে শিখিয়ে দিল—জীবন আসলে খুব সহজ, যদি আমরা তাকে সহজভাবে দেখতে শিখি।

Share This
Categories
বিবিধ

শেখ মন্টুর গুদামে আগুন, পরিত্যক্ত সামগ্রী পুড়ে ছাই।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর লোকাল থানার অন্তর্গত কলাইকুন্ডা এলাকার শোভাপুরে সোমবার রাত আনুমানিক আটটা নাগাদ একটি গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় রশ্মি মেটালিকসের দুটি দমকল ইঞ্জিন। দমকলকর্মীদের তৎপরতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। এই ঘটনায় বড় কোনও হতাহতের খবর নেই বলে জানা গেছে।

জেলা আইএনটিটিইউসির সভাপতি গোপাল খাটুয়া জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত গুদামটি স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মন্টুর মালিকানাধীন। গুদামটিতে পরিত্যক্ত ড্রাম সহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র মজুত রাখা ছিল। আগুনে সেগুলির একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যায়।

ঘটনার জেরে এলাকায় কিছুক্ষণের জন্য আতঙ্ক ছড়ালেও দমকল বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পুলিশ ও দমকল সূত্রে জানানো হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ জানতে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

Share This
Categories
বিবিধ

৩৫তম বর্ষে পা দিয়ে ধাদিকায় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন দূরবীনের।

পশ্চিম মেদিনীপুর, নিজস্ব সংবাদদাতা:- ৪ঠা জানুয়ারি অর্থাৎ রবিবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতার ছোট আঙারিয়া দিবস। প্রত্যেক বছরের মতো তৃণমূলের তরফ থেকে শহীদ সভার আয়োজন করা হয়।এইদিন শহীদ সভার মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী, এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি তথা বিধায়ক সুজয় হাজরা,এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক প্রদ্যুৎ ঘোষ, উত্তরা সিংহ হাজরা,জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ নির্মল ঘোষ সহ জেলা ও ব্লকের এক ঝাঁক নেতৃত্ব। এই দিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে এক জোটে বিজেপি ও সিপিআইএমকে নিশানা করলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। প্রসঙ্গত ২০০১ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ছোট আঙ্গারিয়াতে গণহত্যার ঘটনা ঘটে। এই গণহত্যায় ১১ জন তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু হয় বলে দাবি করেন তৃণমূল নেতৃত্ব। আর অভিযোগ ওঠে CPI(M) এর দুষ্কৃতীদের উপর। এরপর ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রত্যেক বছর এই দিনে শহীদ স্মরণ সভা করছে তৃণমূল।

Share This
Categories
বিবিধ

সারের বাড়তি দাম ও ধলতা সমস্যা: প্রশাসনের আশ্বাসে কিছুটা আশাবাদী কৃষক, আন্দোলন প্রত্যাহার নিয়ে অপেক্ষা।

বালুরঘাট, নিজস্ব সংবাদদাতা:- এমআরপি দামে রাসায়নিক সার বিক্রি না হওয়া ও ধলতা সমস্যাকে ঘিরে চলতে থাকা কৃষক আন্দোলনের আবহে অবশেষে জেলা প্রশাসন ও কৃষি দপ্তরের সঙ্গে বৈঠকে বসেন কৃষক নেতারা। বুধবার জেলা পরিষদ ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক নবীন কুমার চন্দ্র, জেলা কৃষি আধিকারিক পার্থ মুখার্জি-সহ প্রশাসনের একাধিক কর্তা।
বৈঠক শেষে প্রশাসনের তরফে একাধিক আশ্বাস পাওয়ায় আপাতত কিছুটা আশাবাদী কৃষক মহল। যদিও আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে বলেই জানিয়েছেন কৃষক নেতারা।
কৃষক সমিতির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই জেলার বিভিন্ন সার দোকানে এমআরপি-র চেয়ে বেশি দামে রাসায়নিক সার বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জোর করে অতিরিক্ত পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। ফলে চাষের খরচ বেড়ে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। পাশাপাশি ধলতা নেওয়ার অভিযোগে ধান চাষেও ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। এই সব দাবিতেই মঙ্গলবার থেকে জেলা শাসকের দপ্তরের সামনে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্নায় বসেন কৃষক সমিতির সদস্যরা।
বৈঠকের পর কৃষক সমিতির জেলা সম্পাদক সঞ্জিত কুমার মণ্ডল জানান, তাঁদের আন্দোলনের মোট আটটি দাবি ছিল। প্রধান দাবিগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল এমআরপি দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করা। প্রশাসনের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই এমআরপি দামে সার বিক্রি শুরু হবে এবং বিষয়টি নিয়ে মাইকিংও করা হবে। পাশাপাশি সহায়ক মূল্যে ধান কেনার বিষয়েও প্রশাসন উদ্যোগী হবে বলে জানানো হয়েছে।
ধর্না প্রত্যাহারের প্রশ্নে সঞ্জিতবাবু বলেন, “আমরা আগে প্রশাসনের আশ্বাস কতটা কার্যকর হয়, তা দেখব। তারপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
প্রশাসনের এই আশ্বাসে আপাতত স্বস্তি পেলেও, প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা রূপ পায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে জেলার কৃষক

Share This
Categories
গল্প

রোদের নিচে জমে থাকা শীত।

(একটি শীতের দুপুরের প্রেমকাহিনি)

শীতের দুপুরগুলো অদ্ভুত।
সকাল যেমন কুয়াশায় ঢাকা থাকে, সন্ধে যেমন হিম হয়ে আসে—
দুপুর ঠিক তেমন নয়।
দুপুরে রোদ থাকে, অথচ শীত যায় না।
যেমন কিছু মানুষ—ভালোবাসা দেখায়, তবু দূরে থাকে।

সেদিনও এমনই এক শীতের দুপুরে,
কলকাতার উত্তর দিকের ছোট্ট পাড়াটার রাস্তায় হাঁটছিল নীলয়।

রোদ পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বাতাসে এখনো কাঁপুনি।
হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে সে ধীরে হাঁটছিল।
আজ অফিস নেই।
ছুটির দিন—তবু কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই।

হঠাৎ চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল সে।

এই দোকানটা তার খুব পরিচিত।
দু’তলা পুরনো বাড়ির নিচে, কাঠের বেঞ্চ, লোহার কেটলি,
আর সেই চেনা গন্ধ—চা, বিস্কুট, ধোঁয়া আর পুরনো সময়।

“এক কাপ লাল চা,” বলল নীলয়।

চা হাতে নিয়ে বেঞ্চে বসতেই চোখ পড়ল জানালার দিকে।
আর ঠিক তখনই—

সে দেখল মিতালীকে

অনেক বছর পর।

মিতালী জানালার ধারে বসে আছে।
হালকা বাদামি সোয়েটার, খোলা চুল, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা।
হাতের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে,
আর মুখে সেই চেনা নির্লিপ্ত ভাব।

যেন কিছুই বদলায়নি।

নীলয়ের বুকের ভেতর হঠাৎ করে কিছু একটা নড়ে উঠল।
অনেকদিন পর কেউ হঠাৎ পুরনো গান বাজিয়ে দিলে যেমন হয়।

সে নিজেও বুঝল না কেন,
পা দুটো নিজে থেকেই মিতালীর দিকে এগোল।

“মিতালী?”
স্বরে সামান্য দ্বিধা।

মিতালী তাকাল।
চোখের পাতা এক মুহূর্ত কাঁপল।
তারপর ধীরে হাসল।

“নীলয়!”

এই এক শব্দে এত স্মৃতি জমে ছিল—
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

“তুমি এখানে?”
মিতালী বলল।

“হ্যাঁ… মানে… মাঝে মাঝে আসি,”
নীলয় হালকা হেসে বলল।

“বসো,”
মিতালী সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে দিল।

নীলয় বসল।
দুজনের মাঝখানে টেবিল, দু’কাপ চা,
আর বহু বছর না বলা কথা।

তাদের শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে।
সেদিনও ছিল শীত।
তবে দুপুর নয়—সন্ধে।

সেই দিনটার কথা দুজনেই মনে রেখেছে।
কারণ সেদিনই সব শেষ হয়েছিল,
কিন্তু কেউ ঠিক করে কিছু শেষ করেনি।

“কেমন আছ?”
মিতালী জিজ্ঞেস করল।

“চলে যাচ্ছে,”
নীলয় বলল।
“তুমি?”

“আমি… ভালোই,”
একটু থেমে যোগ করল,
“মানে, থাকা যায়।”

এই ‘থাকা যায়’ কথাটার ভেতরেই মিতালীর সব কথা লুকিয়ে থাকে।
আগেও থাকত।

নীলয় জানে।

“এখন কোথায় থাকো?”
নীলয় জানতে চাইল।

“সল্টলেকে,”
“অফিস ওখানেই।”

“এখনো লেখালেখি করো?”
নীলয় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

মিতালী তাকিয়ে রইল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
“কখনো সখনো।”

এই উত্তরটার মানে নীলয় ভালো করেই বোঝে।
কখনো সখনো মানে—
মন খারাপ হলে,
শীতের দুপুরে,
অথবা পুরনো কেউ হঠাৎ সামনে এসে বসলে।

চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
তবু কেউ খেয়াল করছিল না।

বাইরে রোদ পড়েছে।
রাস্তায় মানুষজন, রিকশা, সাইকেল—সব চলছে।
কিন্তু এই টেবিলটার চারপাশে যেন সময় থেমে গেছে।

“তুমি কি বিয়ে করেছ?”
মিতালী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

নীলয় একটু থমকে গেল।
তারপর মাথা নাড়ল।

“না।”

“আমি… করেছিলাম,”
মিতালী বলল খুব আস্তে।

নীলয় জানত না কেন,
এই কথাটা শুনে তার ভেতর কোনো ব্যথা হলো না।
বরং একরকম শান্তি।

“কেমন?”
নীলয় জানতে চাইল।

মিতালী জানালার বাইরে তাকাল।
রোদের দিকে।

“শেষ হয়ে গেছে,”
বলল সে।
“কিছু জিনিস টেকে না।”

নীলয় চুপ করে থাকল।
এই কথার মানে সে বুঝতে পারে।

তাদের গল্পটা শুরু হয়েছিল কলেজে।
শীতের দুপুরে লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে।

মিতালী তখন কবিতা লিখত।
নীলয় পড়ত, শুনত, বোঝার চেষ্টা করত।

তাদের ভালোবাসা ছিল শান্ত।
কোনো নাটক নেই, কোনো চিৎকার নেই।
শুধু দুপুরের রোদ,
চায়ের কাপ,
আর দীর্ঘ নীরবতা।

সমস্যা এসেছিল তখনই—
যখন জীবনের গতি বদলাতে শুরু করেছিল।

নীলয়ের চাকরি,
মিতালীর লেখালেখি,
দুজনের আলাদা আলাদা স্বপ্ন।

তারা ঝগড়া করেনি।
শুধু কথা বলা কমে গিয়েছিল।
আর একদিন—
কথা বলা পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল।

“তোমার মনে আছে?”
মিতালী হঠাৎ বলল।
“সেই শীতের দুপুরটা?”

নীলয় হাসল।
“যেটাতে তুমি বলেছিলে—
ভালোবাসা মানে চুপ করে পাশাপাশি বসে থাকা?”

“হ্যাঁ,”
মিতালীও হাসল।
“আমি এখনো তাই ভাবি।”

নীলয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আমিও।”

দুজনেই জানত—
এই কথাটার ভেতর অনেক কিছু আছে।
কিন্তু সেগুলো আর বের করার দরকার নেই।

বাইরে রোদ একটু ঢলে পড়েছে।
শীতের দুপুর ধীরে ধীরে বিকেল হচ্ছে।

মিতালী উঠে দাঁড়াল।

“আমাকে যেতে হবে,”
বলল সে।

নীলয় মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”

দুজনেই জানত—
এই যাওয়াটা চূড়ান্ত নয়,
আবার নয়।

দরজার কাছে এসে মিতালী থামল।
একটু ভেবে বলল,
“কখনো… আবার দেখা হবে?”

নীলয় জানত,
এই প্রশ্নটার উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—
কোনোটাই পুরো সত্য নয়।

তবু বলল,
“হতে পারে।”

মিতালী হালকা হাসল।
তারপর চলে গেল।

নীলয় আবার বেঞ্চে বসল।
ঠান্ডা চা হাতে নিল।

শীতের দুপুর তখন শেষের পথে।
রোদ কমছে,
কিন্তু ভেতরের ঠান্ডা একটু কমেছে।

সে বুঝল—
কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না।
শুধু জমে থাকে।

শীতের দুপুরের মতো।
রোদের নিচে,
চুপচাপ।


✨ শেষ ✨

 

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মরক্কোর হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক শহর ফেজ—যেখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি বাজার যেন একেকটি ইতিহাসের পাতায় লেখা গল্প।

মরক্কোর ফেজ – এক হাজার বছরের ইতিহাসে মোড়া রহস্যময় প্রাচীন নগরী

মরক্কোর হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক শহর ফেজ—যেখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি বাজার যেন একেকটি ইতিহাসের পাতায় লেখা গল্প। অনেকেই এটিকে মরক্কোর “সাংস্কৃতিক রাজধানী” বলেন। আজও ফেজ শহর তার পুরনো ঐতিহ্য, শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। আরব-ইসলামিক বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নগরীকেন্দ্র হিসেবে ফেজ ভ্রমণ মানে এক ধরনের টাইম ট্রাভেল—যেখানে আধুনিকতার মাঝে হাজার বছরের পুরোনো জীবনের স্পর্শ মেলে।


ফেজ—একটি বিশ্ব ঐতিহ্যের শহর

ফেজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো Fes el-Bali, বিশ্বের সবচেয়ে বড় car-free (গাড়িমুক্ত) পুরনো শহর।
এলোমেলো সরু গলি, মসজিদ, প্রাসাদ, মাদ্রাসা, বাজার—সব মিলিয়ে এটি UNESCO World Heritage Site।
পায়ে হেঁটে ঘোরাটাই এখানে প্রধান ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

গলিগুলো এতটাই সরু এবং জটিল যে অনেক পর্যটক মজা করে বলেন, “ফেজে হারিয়ে যাওয়া এক ধরনের শিল্প!”


আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় – বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়

ফেজে এলে অবশ্যই দেখতে হবে University of Al Quaraouiyine

  • প্রতিষ্ঠিত: ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে
  • প্রতিষ্ঠাতা: ফাতিমা আল-ফিহরি (একজন অসাধারণ মুসলিম নারী শিক্ষাপ্রশাসক)
  • বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয়

চমৎকার মসজিদ, নীল–সবুজ জেলিজ মোজাইক আর শান্ত পরিবেশ এই স্থানটিকে আরও পবিত্র করে।


মেদিনা ও সুক – রঙ, গন্ধ আর জীবনের উন্মুক্ত পাঠশালা

ফেজের পুরনো সুক (বাজার) মরক্কোর ঐতিহ্যের বুকে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
এখানে দেখতে পাবেন—

  • রঙিন মশলার স্তূপ
  • মরোক্কোর ট্যাজিন-পাত্র
  • জাফরান, খেজুর ও বাদামের দোকান
  • হস্তশিল্প, ল্যাম্প, কার্পেট, চামড়াজাত দ্রব্য
  • ঐতিহ্যবাহী মেটাল ও পিতলের কারুকার্য

প্রতিটি দোকান যেন আপনাকে ডাকছে—“এসো, দেখো, স্পর্শ করো, চিনে নাও মরক্কোকে।”


চ্যার ট্যানারি – ফেজের সবচেয়ে বিখ্যাত ভ্রমণস্থল

ফেজের Chouara Tannery বিশ্ববিখ্যাত।
এটি পৃথিবীর অন্যতম পুরনো ট্যানারি, এখনও প্রাচীন পদ্ধতিতে চামড়া রঙ করা হয়।

রঙিন টবগুলো দূর থেকে দেখতে—

  • লাল, হলুদ, বাদামি, নীল
  • যেন রঙের এক বিশাল প্যালেট

এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় আপনি এক বিশাল শিল্পের কর্মশালার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।


বু ইনানিয়া মাদ্রাসা – স্থাপত্যের অপূর্ব সৃষ্টি

১৪শ শতকে নির্মিত Bou Inania Madrasa তার খোদাই করা কাঠের কাজ, সবুজ জেলিজ টাইলস, মিহি মার্বেল ও শান্ত প্রাঙ্গণের জন্য বিখ্যাত।
এখানে স্থাপত্যের নিখুঁত সৌন্দর্য দেখে মুহূর্তেই মন ভরে যাবে।


মেলাহ ও ইহুদি কোয়ার্টার

ফেজের ইতিহাস কেবল ইসলামিক ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এখানে আছে প্রাচীন Jewish Mellah

  • অনন্য স্থাপত্য
  • কাঠের বারান্দা
  • ইহুদি কবরস্থান

এ এক ভিন্ন সংস্কৃতির ছোঁয়া, যা ফেজকে বহুমাত্রিক করে তোলে।


ফেজে খাবার—সুগন্ধে ভরপুর মরক্কো

ফেজ মরক্কোর সেরা খাবারের কেন্দ্রও বলা হয়।
অবশ্যই চেখে দেখুন—

  • বিস্টিলা (B’stilla)—মিষ্টি ও লবণাক্ত স্বাদের মেলবন্ধন
  • ট্যাজিন—মরোক্কোর ঐতিহ্যবাহী ধীর-রান্না
  • কুসকুস
  • পুদিনার চা—মরোক্কান আতিথেয়তার প্রতীক

ভ্রমণের সেরা সময়

ফেজ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়—

  • মার্চ থেকে মে
  • সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর
    এসময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম থাকে।

ফেজ কেন আলাদা?

ফেজ এমন একটি শহর—
যেখানে আধুনিকতা নেই তা নয়, কিন্তু তা কখনই ইতিহাসের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায় না।
এটি মরক্কোর সাংস্কৃতিক আত্মা, যেখানে—

  • সূক্ষ্ম শিল্প
  • সমৃদ্ধ শিক্ষা
  • বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি
  • প্রাচীন জীবনযাত্রা

সবকিছু একই ছাদের নিচে।


শেষ কথা

মরক্কোর ফেজ এমন একটি ভ্রমণ স্থান, যা আপনাকে শুধু ছবি তোলার আনন্দই দেবে না, বরং ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যাবে। প্রতিটি গলি, প্রতিটি দরজা, প্রতিটি কারখানা—সবকিছুই আপনাকে বলবে মরক্কোর অতীতের গল্প।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি – নক্ষত্রের আলোয় হারিয়ে যাওয়ার এক স্বপ্নময় যাত্রা।।

সাহারা মরুভূমির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে—
অসীম বালিয়াড়ি, সোনালি রোদ, উটের কাফেলা, আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারার ঝিলিক।
মরক্কোর সাহারা এমনই এক জায়গা, যেখানে গেলে মনে হয় পৃথিবী যেন থেমে আছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে আছেন প্রকৃতির সর্বোচ্চ বিস্ময়ের সামনে।

মরুভূমির বালির ঢেউয়ের ওপর হাঁটলে বুঝবেন—এই নিঃশব্দ ভূমিও কত প্রাণবন্ত, কত রহস্যময়!


সাহারা – মরক্কোর সোনালি রত্ন

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি মূলত দু’টি বড় অংশে ভাগ—

  • মারজুগা (Merzouga) – Erg Chebbi dunes
  • জাতটি (Zagora) – Erg Chigaga dunes

এর মধ্যে মারজুগার বালিয়াড়ি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বিখ্যাত—
১০০–১৫০ মিটার উঁচু বালির পাহাড়গুলো যেন প্রকৃতির এক অদ্ভুত ভাস্কর্য!


সূর্যাস্ত – জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য

সাহারায় সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি।
মরুভূমির বুকে যখন লাল–কমলা রঙে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, তখন চারপাশ যেন সোনালি পৃথিবীতে রূপান্তরিত হয়।

বালিয়াড়ির চূড়ায় বসে এই দৃশ্য দেখা মানেই—
নিঃশব্দ পৃথিবীর মাঝে নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হওয়া।


উটের কাফেলার সঙ্গে যাত্রা

সাহারার আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে উটের পিঠে চেপে বালিয়াড়ি পেরোনোর সময়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা উটের ছন্দে মনে হবে আপনি কোনো প্রাচীন বাণিজ্যকারবানের অংশ।

গাইডরা সাধারণত নিয়ে যান—

  • সূর্যাস্ত দেখার স্থান
  • বিশেষ পর্যবেক্ষণ dune
  • রাতে ক্যাম্পে পৌঁছানোর রুট

এই যাত্রা যেন পুরোনো আরব্য রজনীর কাহিনির মতো।


তারাভরা রাত – পৃথিবীর সেরা নক্ষত্ররাজি

মরুভূমির রাতই সাহারার সবচেয়ে জাদুকরী সময়।
শহরের আলোর দূষণ নেই, কোলাহল নেই—
শুধু আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি তারার আলো।

এখানে আপনি দেখতে পাবেন—

  • মিল্কি ওয়ে
  • শুটিং স্টার
  • একেবারে স্বচ্ছ গ্যালাক্সির ধারা

ক্যাম্পে বসে মোরোক্কান সঙ্গীত আর আগুনের পাশে গাইডদের গল্প—
এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।


বেডুইন-স্টাইল ক্যাম্পে রাতযাপন

মরুভূমির অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ করে ক্যাম্পে রাত কাটানো।
এগুলো দুই রকম—

  • স্ট্যান্ডার্ড ক্যাম্প
  • লাক্সারি ক্যাম্প

লাক্সারি ক্যাম্পে পাবেন—

  • আরামদায়ক বিছানা
  • ব্যক্তিগত বাথরুম
  • মরোক্কান ডিনার
  • আগুন জ্বালিয়ে সঙ্গীত

এখানে বসে মনে হবে—মরুভূমির রাত আপনারই জন্য সাজানো।


স্যান্ডবোর্ডিং – বালির ঢেউয়ে রোমাঞ্চ

সাহারার বালিয়াড়িতে স্যান্ডবোর্ডিং একটি জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার।
বালির পাহাড় বেয়ে বোর্ডে করে নেমে আসার উত্তেজনা ভোলার নয়।


বেরবার সংস্কৃতির ছোঁয়া

মরক্কোর সাহারা অঞ্চলে বসবাসকারী বেরবার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
এখানে আপনি তাদের—

  • গান
  • লোকগাথা
  • ঐতিহ্যবাহী খাবার
  • নীল টুয়ারেগ পোশাক

সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখতে পারবেন।


ভ্রমণের সেরা সময়

সাহারা ভ্রমণের উপযুক্ত সময়:

  • অক্টোবর থেকে এপ্রিল
    এই সময় ঠান্ডা থাকে, আর মরুভূমির রাত আরামদায়ক।

অত্যাধিক গরমের সময় (জুন–আগস্ট) ভ্রমণ উপযুক্ত নয়।


সাহারা কেন বিশেষ?

  • পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমির এক অদ্ভুত সুন্দর অংশ
  • রাতের আকাশ পৃথিবীর অন্য যে কোনো জায়গার তুলনায় সবচেয়ে পরিষ্কার
  • উটের কারভান অভিজ্ঞতা
  • বালিয়াড়ির অবিরাম ঢেউ
  • নিস্তব্ধতা, শান্তি, আর প্রকৃতির বিশালতা

এ সব মিলিয়ে সাহারা এমন একটি স্থান—
যেখানে গেলে মনে হয় আপনি প্রকৃতির কোলে ফিরে এসেছেন।


শেষকথা

মরক্কোর সাহারা মরুভূমি এমন এক ভ্রমণ স্থান, যা মানুষের জীবনে অন্তত একবার অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। এখানে কোনো বিলাসিতা নেই, নেই শহরের কোলাহল—
কিন্তু আছে প্রকৃতির grand beauty, আছে নিস্তব্ধতা, আছে তারাবর্ষার রাত।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ট্যাঙ্গিয়ার (Tangier)— একটি শহর যা একই সঙ্গে রহস্যময়, ঐতিহাসিক, আধুনিক ও রোমান্টিক।

মরক্কোর উত্তরের দরজা, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনে দাঁড়ানো ট্যাঙ্গিয়ার (Tangier)
একটি শহর যা একই সঙ্গে রহস্যময়, ঐতিহাসিক, আধুনিক ও রোমান্টিক।
আফ্রিকার প্রবেশদ্বার বলা হয় এই শহরকে, আবার ইউরোপও এখান থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে!
হাওয়ার সঙ্গে লেগে থাকে সমুদ্রের লবণগন্ধ, আর পুরোনো গলির মোড়ে মোড়ে যেন লুকিয়ে থাকে শত বছরের গল্প।

চলুন, ট্যাঙ্গিয়ারের অলিগলি ঘুরে আসা যাক—একটি ভ্রমণনগরী, যা ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য সত্যিই এক অমূল্য অভিজ্ঞতা।


ট্যাঙ্গিয়ারের ইতিহাস – রাজা, কবি, গুপ্তচর আর অভিযাত্রীদের শহর

ট্যাঙ্গিয়ার ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি বড় সাম্রাজ্যই তার ছাপ রেখে গেছে—
ফিনিশীয়, রোমান, আরব, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, এমনকি ফরাসিরাও।
আর ২০শ শতকে এটি ছিল একটি ইন্টারন্যাশনাল জোন, যেখানে বাস করতেন শিল্পী, লেখক, অনুসন্ধানকারী, গুপ্তচর—সবাই।

পল বাউলস, উইলিয়াম বারোজ, মাতিস–এর মতো শিল্পীদের প্রিয় শহর ছিল ট্যাঙ্গিয়ার।
এখানে আসলে বোঝা যায় – সংস্কৃতি কত স্তর নিয়ে তৈরি হয়।


সমুদ্রকে জড়িয়ে থাকা শহর

ট্যাঙ্গিয়ারের সাদা–নীল রঙের বাড়িগুলো যেন সমুদ্রের সঙ্গে কথোপকথন করছে।
উঁচু পাহাড় থেকে শুরু করে উপকূলের রাস্তাগুলো—সবই মনোরম।

মেডিনা থেকে দূরে তাকালে দেখা যায়—
সামনে নীল আকাশ, নীচে নীল সমুদ্র, আর একসারি নৌকা ভাসছে যেন ছবির মধ্যে।


ট্যাঙ্গিয়ারের প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ

১. কাসবা (Kasbah) – রাজাদের পুরোনো দুর্গ

ট্যাঙ্গিয়ারের মাথার মুকুট এই কাসবা।
এখান থেকে শহর, সমুদ্র, এমনকি দূরের স্পেনও দেখা যায়।

এখানে রয়েছে—

  • প্রাসাদ-পরিবর্তিত Kasbah Museum
  • সুলতানদের বসবাসের নিদর্শন
  • প্রাচীন মুরিশ স্থাপত্য

পুরোনো পাথরের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় আমরা যেন অতীতে ফিরে যাচ্ছি।


২. ট্যাঙ্গিয়ার মেডিনা – গন্ধ, রঙ আর কোলাহলের শহর

মেডিনায় ঢুকলেই শুরু হয় এক অন্যরকম জগৎ।
এখানে পাবেন—

  • কার্পেট
  • ঐতিহ্যবাহী পোশাক
  • মসলা
  • রঙিন লণ্ঠন
  • হস্তশিল্প

প্রতিটি দোকান যেন একেকটা ছোট্ট গল্প।


৩. হারকিউলিস গুহা (Hercules Cave) – ইতিহাস ও মিথের মেলবন্ধন

ট্যাঙ্গিয়ারের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত এই গুহা মরক্কোর অন্যতম বিখ্যাত প্রত্নস্থান
কথিত আছে, এখানে নাকি বীর হারকিউলিস বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয়—
গুহার মুখটি আফ্রিকা মহাদেশের মানচিত্রের আকৃতির মতো!

সমুদ্রের ঢেউ গুহার ভিতরে আছড়ে পড়ার দৃশ্য সত্যিই অবিস্মরণীয়।


৪. Cap Spartel – যেখানে দুই সাগরের মিলন

এখানে দাঁড়ালে দেখা যায়—
ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মিলনরেখা।

উঁচু খাড়া পাহাড় থেকে নীচের নীল সাগর দেখতে দেখতে মনে হবে–
প্রকৃতি যেন তার সব নীল রঙ এখানে ঢেলে দিয়েছে।


৫. গ্র্যান্ড সোকার (Grand Socco) – জীবনমুখর শহরচত্বর

সন্ধ্যার দিকে এ জায়গা জমজমাট হয়ে ওঠে।
লোকজনের চলাফেরা, রাস্তার চা, তাজা খেজুর, বাদাম, আর ফুডস্টলগুলো—সব মিলিয়ে চমৎকার জীবন্ত পরিবেশ।


ট্যাঙ্গিয়ারের খাবার – সাগরের স্বাদ

এই শহরে খাবারের মূল আকর্ষণ সীফুড
তাজা মাছ, শুঁটকি ভাজার সুবাস, গ্রিল করা সার্ডিন, অক্টোপাস—এখানে সবই অসাধারণ।

অবশ্যই চেখে দেখা উচিত—

  • মরোক্কান ট্যাজিন
  • কুসকুস
  • নানান রকম সীফুড গ্রিল
  • পুদিনা চা

সামুদ্রিক বাতাসের সঙ্গে এই খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ আনন্দ দেয়।


ট্যাঙ্গিয়ারের সৈকত – শান্ত জলের আহ্বান

Tangier Beach

শহরের কাছাকাছি, পরিষ্কার বালু ও নানা ক্যাফের উপস্থিতি পর্যটকদের কাছে এটি জনপ্রিয়।

Achakar Beach

হারকিউলিস গুহার কাছে অবস্থিত।
চমৎকার ঢেউ, কম ভিড়, আর ফটোগ্রাফারদের স্বর্গ।


ট্যাঙ্গিয়ারের শিল্প ও সংস্কৃতি

এটি এমন একটি শহর, যাকে বলা হয়—
“Artists’ Muse”

বিভিন্ন যুগের শিল্পী ও লেখকেরা এখানে এসে বসবাস করেছেন, সৃষ্টি করেছেন তাদের শ্রেষ্ঠ কাজ।
মেডিনার গলি, কাসবার দেয়াল, সাগরবাতাস—সবই সৃষ্টিশীল মনকে স্পর্শ করে।


ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

ট্যাঙ্গিয়ার ঘোরার সেরা সময়—

  • মার্চ থেকে জুন
  • সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর

গরম কম থাকে, আবহাওয়া থাকে মনোরম।


ট্যাঙ্গিয়ার কেন বিশেষ?

  • আফ্রিকা ও ইউরোপের মিলনবিন্দু
  • ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমুদ্রের অনন্য মেলবন্ধন
  • রহস্যময় গুহা, পাহাড় ও মেডিনা
  • উভয় সাগরের সংযোগস্থল
  • শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণার উৎস

এক কথায়, এটি এমন একটি শহর—
যা আপনার মনে দীর্ঘদিন ধরে ছাপ রেখে যাবে।


শেষ কথা

মরক্কোর ট্যাঙ্গিয়ার এমন এক ভ্রমণস্থান, যেখানে ইতিহাস, সমুদ্র, পাহাড়, গলি, সংস্কৃতি—সবকিছুই যেন একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এ শহর একদিকে শান্ত, আবার অন্যদিকে উজ্জীবিত।
এখানে আসলে আপনি একই সঙ্গে আফ্রিকার মায়া ও ইউরোপের ছোঁয়া একসঙ্গে অনুভব করবেন।

Share This