Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কবি নজরুল ইসলামের ভূমিকা : কামনা দেব।।।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে কবি নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে।  আর যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ  করে দ্বিখণ্ডিত হয়, তখন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের বয়স মাত্র  ৪৮ বছর দুই মাস ৯ দিন ।

কবি নজরুল ইসলামের কাব্যজীবন ,সাহিত্য ও গান তাঁর সৃষ্টি বিশ্লেষণে দেখা যায় কবি নজরুল ইসলামকে দলগত কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কখনোই বিদ্রোহী বলা যায় না। প্রকৃতপক্ষে কবি নজরুল ইসলাম কোন রাজনৈতিক দলের ছিলেন না বা  বিদ্রোহী দলও গঠন করেননি বা কোনো বিদ্রোহী সন্ত্রাসী দলে যোগদানও করেন নাই।
তৎকালীন সময়ে কবির সবচেয়ে নিকটের বন্ধু ছিলেন  ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মুজফর আহম্মেদ।  কবি তাঁর সংস্পর্শে থেকেও কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন নাই।

কবিকে আত্মাভিমানী বললে ভুল বা কখনোই অত্যুক্তি হবে না, যদি বা কবি নজরুল তাত্ত্বিক বা দার্শনিক হিসেবে গণ্য নন, কিন্তু তাঁর সাম্যবাদী, ঈশ্বর, মানুষ, পাপ, বারাঙ্গনা, নারী, কুলি-মজুর প্রভৃতি কবিতায় সুস্পষ্টভাবে অভেদ মানবতত্ত্ব এবং সাম্যবাদী চৈতন্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে তাঁর মানবিক সংশোধনের প্রাচুর্যই বেশি চোখে পড়ে।
কবির নান্দনিক কাব্যিক শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর অভিমান ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে , দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের কারণে।
তাই বোধকরি তাকে বিদ্রোহ কবি বলে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর রচনাসমগ্র বিশ্লেষণ করলে চোখে পড়ে যে,তিনি একাধারে বিদ্রোহের উন্মাদনা তৎসঙ্গে অন্যধারে প্রেমের অবাধ্য আকুতি।
এই পরস্পরবিরোধী দ্বৈত অবস্থানের চৌম্বিকতায় একপর্যায়ে লক্ষ্যণীয় সৃষ্টি কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা..যেমন,
আমি চির দুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ,
আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!…আমি দুর্বার ,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার।
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়মকানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি নাকো কোন আইন…

বৃটিশরাজের আমলাতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় রাজা-প্রজার এতই ব্যবধান যে সাধারণত রাজার সম্মান ছিল ঈশ্বরেরই সমকক্ষ তৎসঙ্গে রাজকর্মচারীরা নিজেদেরকে রাজার প্রতিভূ অর্থাৎ জনগণের তথা প্রজার প্রভু বলে মনে করত নিজেদের আর তাদের আচার-আচরণও ছিল রাজন্যবর্গসুলভ। নজরুল এই অবস্থানকে কটাক্ষ করে লিখেছেন সেই কথাগুলো এবং উপসংহারে ঘোষণা করেছিলেন ,–
গণতন্ত্রের জয়,বন্ধু, এমনি হয়-
জনগণ হ’ল যুদ্ধে বিজয়ী,রাজার গাহিল জয়!
প্রজারা যোগায় খোরাক- পোশাক,
কি বিচার বলিহারি,
প্রজার কর্মচারী নন তাঁরা রাজার কর্মচারী!
মোদেরি বেতনভোগী চাকরেরে সালাম করিব মোরা,
ওরে পাবলিক সার্ভেন্টদের আয় দেখে যাবি তোরা!..

এরপর নজরুল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন,-
“-এ আশা মোদের দুরাশাও নয়,সেদিন সুদূরও নয়,
সমবেত রাজ-কণ্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়।”

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মূলত বিদ্রোহী কবি। তার বিদ্রোহ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। আর সেই বিদ্রোহকে কেন্দ্র করেই তার স্বাধীনচেতা হৃদয়ের আগুন প্রজ্বলিত হয়েছিল আপন পরাধীন দেশের স্বাধীনতা কামনায়। এমন সরাসরি স্বাধীনতার প্রবক্তা হওয়া সেই আমলে আর কোনো কবির পক্ষে সেকালে সম্ভব হয়নি। কারণ, প্রভু ইংরেজরা অসন্তুষ্ট হবেন এমন কোনো কথা উচ্চারণ করার।
অথচ সেই সময় বিশের দশকে কবি নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকা বের করেছেন তখন সংবাদপত্রে “স্বাধীনতা”র কথা বলা রীতিমতো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে কংগ্রেসের জাঁদরেল নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে অটোনমি বা স্বায়ত্তশাসন আর সেলফ গভর্নমেন্টের কথা বললেন, ঋষি অরবিন্দও তাই বলেছিলেন, আর স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও বলেছিলেন।
অথচ ১৯২১ সালের শেষ সপ্তাহে আহমেদাবাদে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে প্রখ্যাত ঊর্দু কবি ফজলুল হাসান হসরৎ মোহানী তার বক্তব্যে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করেছিলেন।

১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর নজরুল ইসলামের সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার ১ম বর্ষ ১৩শ সংখ্যায় “ধূমকেতুর পথ” প্রবন্ধে সেদিন লিখেছিলেন,
–“সর্বপ্রথম ধূমকেতু পত্রিকাতেই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চাওয়া হয়েছিল। লিখেছিলেন, —
“স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা ও শাসনভার সমস্তই থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশি মোড়লীর অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশান ভূমিতে পরিণত করেছেন তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে বোঁচকা পুটুলি বেঁধে সাগর পাড়ে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন করলে শুনবো না। তাদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো যে, আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষে করার কুবুদ্ধিটুকুকে ওদের দূর করতে হবে।”

সেইসময় সংবাদপত্রে এমন দুঃসাহসিক স্বাধীনতা ঘোষণার কথা উচ্চারণ, বোধ করি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

নজরুল ইসলামের লড়াই ছিল সমাজে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায়।তাই কবির সাহিত্যে সকল বঞ্চিত ব্যথিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে ছিল আপসহীন সংগ্রামে অধিকার সমন্বিত।
নজরুল ইসলাম নিঃস্বার্থ সাম্যবাদের আলো জ্বালিয়ে জগতকে আলোকিত করতে চেয়েছিলেন।

কবি নজরুল ছিলেন জ্ঞানবান সাম্যবাদী মানুষ যার লড়াই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যেখানে মানুষের জ্ঞানালোকিত স্বাধীনতা থাকবে অবাধ ও পক্ষপাত বিবর্জিত। যেখানে অন্যায়ের কণাটুকুও ঠাঁই পাবে না মনুষ্যত্বের আধারে। নজরুলের সাম্যে ধর্ম-বর্ণ শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থায় সব মানুষ সমান, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য নেই, যেখানে ধর্মের ব্যবধান নেই, কোনো বিভেদ নেই বর্ণের…
“গাহি সাম্যের গান
বুকে বুকে হেথা তাজা সুখ ফোটে,
মুখে মুখে তাজা প্রাণ।
বন্ধু এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র ধনী,
হেথা পায় নাকো’ কেহ খুদ ঘাঁটা,কেহ দুধ-সর-ননী।

ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপটে তিনি সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে ভারতের দুই বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায় তথা হিন্দু ও মুসলমান যদি একতাবদ্ধ হয়ে একদেহে একই স্বার্থে স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয় তাহলে বৈরী অমানবিক শক্তি নস্যাৎ হতে বাধ্য। তাই তিনি গান বেঁধেছিলেন ,–
“কাণ্ডারী হুঁশিয়ার”
দুর্গম গিরি কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীতে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার।
এখানে আরো লিখেছেন–
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডরী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।”

বিদেশি শত্রুর মোকাবেলা করতে হলে চাই জাতির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। তাই স্বাধীনতার পক্ষে কবি নজরুল ইসলাম চেয়েছিলেন, সমগ্র জাতি তথা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ঐকান্তিক মিলন।

১৯২৬ সালের এপ্রিল মাসে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে নজরুল সামরিক কায়দায় যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলেন তাদের সমবেত কণ্ঠে উদ্বোধনী সঙ্গীতও ছিল এই “কান্ডারী হুঁশিয়ার”।

আজ আমরা সাম্যের গান শুধুই মুখে গাই বলি। হৃদয় থেকে গাই না …!!

গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ,
অভেদ ধর্ম জাতি;
সব দেশে, সব কালে,
ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

সব শেষে আবারো বলি আমাদের সুমতি হোক্ আমরা আমাদের জীবনে কবি নজরুলের সত্য-সুন্দর , সাম্য আদর্শকে উপজীব্য করে বাঁচতে শিখি, মানুষকে ভালোবাসতে শিখি আর মানুষের অধিকারকে লুণ্ঠিত লাঞ্ছিত না করে যথার্থ সম্মান করতে শিখি । তবেই আমরা যেমন গৌরবান্বিত হবো, তেমনি প্রকৃত শ্রদ্ধাজ্ঞাপনও করা হবে কবির প্রতি …

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাংলা সিনেমার জগতে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় এক কিংবদন্তির নাম।

বাংলা সিনেমার জগতে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় এক অতি পরিচিত নাম।  সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়  একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী যিনি বাংলা সিনেমায় তাঁর কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন। বহু অভিনেতার সঙ্গে তিনি অভিনয় করে তাঁর দক্ষতার পরিচয় রেখে গিয়েছেন। রঞ্জিত মল্লিক, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায় এবং দীপঙ্কর দে-র মতো অভিনেতাদের সাথে তাঁর অন-স্ক্রিন জুটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যা মানুষের হৃদয়ে আজও দাগ কেটে রয়েছে।

কর্মজীবন—–

সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৪৯ সালে।অভিনয়ের প্রতি ছিলো তাঁর অমোঘ টান। ১৯৭২ সালে
শ্রীমতি সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের প্রথম চলচ্চিত্র “আজকের নায়ক”  মুক্তি পেয়েছিল।  তাঁর অভিনয় দক্ষতা দর্শক-প্রশংসা পেয়েছে । অনাবিল অভিনয়র মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর অভিনীত কয়েকটি উল্লেখ্যযোগ্য বই হলো – অগ্নিশ্বর, শ্রীকান্তের উইল, দেবদাস, ওগো বধূ সুন্দরী, দেবী চৌধুরাণী, বসন্ত বিলাপ – যা আজও অমর হয়ে রয়েছে। তিনি প্রায় ৪০০ টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। নীচে আমরা দেখে নেবো তাঁর অভিনিত ছবি গুলির নাম—

অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা—-

আমি ও মা, নটি বিনোদিনী, তপস্যা, ৩ভ্রান্ত পথিক, ক্রান্তিকাল, পেন্নাম কলকাতা, অহংকার, গড়মিল, ব্যবধান, মহাপীঠ তারাপীঠ, অভিসার, অপরাহৃ-এর আলো, বিদায়, প্রতীক, আগমন, আগুন, ওরা চারজন, অবৈধ, সাথী, পারমিতার এক দিন, সপ্তমী, প্রতিরোধ, মেজ বৌ, মোহিনী, কলঙ্কিনী নায়িকা, অমর কন্টক, দাবার চাল, স্বর্ণময়ীর ঠিকানা, মহামিলন, ডাক্তার বৌ, পরিনতি, স্বর্গ সুখ, আমার পৃথিবী, ভালোবাসা ভালোবাসা, তিল থেকে তাল, মিলন তিথী, বৈকুন্ঠের উইল, সোনার সংসার, দিদি, অগ্নি শুদ্ধি, মোহনার দিকে, দাদামণি, সম্পত্তি, ইন্দিরা, জীবন মরণ, অর্পিতা, অভিনয় নয়, সংসারের ইতিকথা, প্রায়শ্চিত্ত, অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, প্রফুল্ল, মায়ের আশীর্বাদ, বদনাম, কপাল কুন্ডলা, ন্যায়ের অন্যায়, দেবদাস, মান অভিমান, তিলোত্তমা, তুশি, ডাক দিয়ে যাই, ময়না, বনসারি, সন্ধ্যার রাগ, এই পৃথিবী পান্থ নিয়াস, মন্ত্রমুগ্ধ, এক যে ছিলো দেশ, দত্তা, রাগ অনুরাগ, অগ্নিশ্বর, ছেড়া তামসুখ, বিকেলে ভোরের ফুল, দেবী চৌধুরাণী, সঙ্গিনী, বসন্ত বিলাপ, আজকের নায়ক, ওগো বধূ সুন্দরী, স্বামী স্ত্রী, বৈশাখী মেঘ, প্রিয়তমা, সমাধান, শ্রীকান্তের উইল, নৌকাডুবি, চিরন্তন, গণদেবতা প্রভৃতি ।

পুরস্কার——-

অভিনয়ের জন্য তিনি বেশকিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন–

বিজয়ী – বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন – দেবী চৌধুরানীর পক্ষে সেরা সহায়ক অভিনেত্রীর পুরস্কার (১৯৭৫);  বিজয়ী – বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন – অন্বেষণ – এর জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার (১৯৮৬); বিজয়ী – ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পূর্ব – বৈশাখী মেঘ – সেরা অভিনেত্রী।

২১ মে ২০০৩ সালে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রী প্রয়াত হন।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা

এক মায়ের সংগ্রামের কহানী।

এমন মায়ের সংগ্রাম আপনারা আগে শোনেননি। নিজের নয় বছরের মেয়েকে ঝকঝকে একটা ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পেট্রোল পাম্পে কাজ করছেন ২৭ বছরের মা। উপলক্ষ একটাই, মেয়ের শিক্ষা। বাঁকুড়ার তীব্র দাবদাহ, গনগনে আগুন ছুটেছে বেশ কিছুদিন। এবার পালা বৃষ্টির। তবে গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে প্রতিদিন বাসে করে বাঁকুড়া শহরের গোবিন্দনগর পেট্রোল পাম্পে কাজ করতে আসছেন টুম্পা সিংহ। মাঝে মাঝে এই পেট্রোল পাম্পেই মেয়েকে নিয়ে আসেন টুম্পা। এখানেই বসে পড়াশোনা করে টুম্পার কন্যা আয়ুশী সিংহ। কেন এই কাজ করছেন টুম্পা? একজন নারী হয়েও পেট্রোল পাম্পের চাকরি করছেন বলে কি সমাজের কাছে কোনও কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে? উত্তরে টুম্পা বলেন, “বাড়িতে বাবা মা রয়েছেন, আয়ুশীকে বড় করে তোলাই আমার লক্ষ। কষ্ট হলেও আমাকে কাজ করতে হবে। সবাই মোটামুটি মুখ চেনা হয়ে গেছে, মানুষ আমার কাজকে ছোট না করে বরঞ্চ উৎসাহ যোগায়।”

পেট্রোল পাম্প এর ওনার নিবেদিতা বিশ্বাস জানান, টুম্পার বাড়িতে তার বাবার দোকান থেকে যা আয় হয় তাতে খাবার খরচই ভাল ভাবে যোগান দেওয়া সম্ভব নয়। সেই কারণেই মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করার জন্য টুম্পা কাজের সন্ধানে আসেন এই পেট্রোল পাম্পে। তার পর থেকেই কাজ শুরু করেছেন টুম্পা। পেট্রোল পাম্পের ওনার নিবেদিতা বিশ্বাস আরও বলেন যে, “আমি এই ফাইটিং স্পিরিটটাকে কুর্নিশ জানাই।”

একজন মা পেট্রোল পাম্পে কাজ করছেন। সেই ছবি যেন আরও বেশি করে অনুপ্রেরণা যোগায় মহিলাদের। প্রায় নিয়মিত গোবিন্দনগর এলাকার এই পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসেন বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজের নার্সিং স্টাফ নিবেদিতা খাঁ। তিনি বলেন, “এত প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন যুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন এই দিদি। এই লড়াই সত্যিই অপ্রিসিয়েবেল।” এছাড়াও পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা আরও এক স্থানীয় বাসিন্দা ভানু বিশ্বাস বলেন, “পৃথিবীতে এর উদাহরণ বিরল। একজন মা তার সন্তানকে শিক্ষিত করতে যে কাজ করছে এরকম আর কোথাও হয়নি।”
বাঁকুড়ার টুম্পা সিংহ যেন সেই সব মেয়েরই জলন্ত উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাসন্তী দেবী: ব্রিটিশ শাসন বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়িকা।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য নাম বাসন্তী দেবী। বাসন্তী দেবী  ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ কারাগারে কারারুদ্ধ প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী নারী। বাসন্তী দেবী মন ও মানসিকতায় পৌরাণিক সতীনারীদের চারিত্রিক মহত্বটি যেমন অনুকরণীয় মনে করতেন; তেমনি গার্গী, মৈত্রেয়ীদের মতো চারিত্রিক দৃঢ়তায় বুদ্ধি দিয়ে আপন যুক্তি তুলে ধরার ক্ষমতাও রাখতেন। এ-দুইয়ের মেলবন্ধনে তিনি অনন্যা।তিনি একাধারে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্নী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় সংগ্রামী। সংগ্রামের জন্য কারাবরণ করেছেন। অন্দর ছেড়ে অবগুন্ঠণ ছেড়ে উপনিষদের বিদুষীদের মতো পুরুষের সমকক্ষ হয়ে সহকর্মী হয়ে দেশমুক্তির সাধনা করে গেছেন।

বাসন্তী দেবী ২৩ মার্চ ১৮৮০ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম বরদানাথ হালদার ও মাতার নাম হরিসুন্দরী দেবী। তার পিতা ছিলেন আসামের বিজনি ও অভয়াপুরী এস্টেটের দেওয়ান।  দশ বছর বয়েসে তিনি দার্জিলিংয়ের লরেটে কনভেন্টে শিক্ষার জন্যে ভর্তি হন। ১৮৯৬ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে বিবাহ হয়।
১৮৯৪ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে দুজনের তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। দেশবন্ধু ও তার তিন সন্তান- দুই কন্যা, অপর্ণা ও কল্যাণী ও একপুত্র চিররঞ্জন।


তার স্বামীর অনুসরণে, বাসন্তী দেবী আইন অমান্য আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনের মতো বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরের বছর, তিনি দাসের বোন ঊর্মিলা দেবী এবং সুনিতা দেবীর সাথে যোগ দেন।  নারী কর্মীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র “নারী কর্ম মন্দির” প্রতিষ্ঠা করুন।  ১৯২০-২১ সালে, তিনি জলপাইগুড়ি থেকে তিলক স্বরাজ ফান্ডের জন্য স্বর্ণের অলঙ্কার এবং ২০০০ টি স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ধর্মঘট এবং বিদেশী পণ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানায়।  কলকাতায়, পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবকের ছোট দলকে কলকাতার রাস্তায় খাদি, হাতে কাটা কাপড় বিক্রি করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল।  দাস, যিনি স্থানীয় আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তার স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে এমন একটি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  সুভাষ চন্দ্র বসুর সতর্কতা সত্ত্বেও দেবী রাস্তায় নেমেছিলেন যে এটি তাকে গ্রেফতার করতে ব্রিটিশদের উস্কে দেবে।  যদিও তাকে মধ্যরাতে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তার গ্রেপ্তার ব্যাপক আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছিল।  কলকাতার দুটি কারাগার বিপ্লবী স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা পূর্ণ ছিল এবং আরও সন্দেহভাজনদের আটক করার জন্য দ্রুত আটক শিবির তৈরি করা হয়েছিল।  ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর পুলিশ দাস ও বসুকে গ্রেপ্তার করে।


দাসের গ্রেপ্তারের পর, বাসন্তী দেবী তার সাপ্তাহিক প্রকাশনা বাঙ্গালার কথা (বাংলার গল্প) এর দায়িত্ব নেন।  তিনি ১৯২১-২২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন।  ১৯২২ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম সম্মেলনে তার বক্তৃতার মাধ্যমে,  তিনি তৃণমূল আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিলেন।  ভারতের চারপাশে ভ্রমণ, তিনি ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা করার জন্য শিল্পের সাংস্কৃতিক বিকাশকে সমর্থন করেছিলেন।
দাস যেহেতু সুভাষ চন্দ্র বসুর রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন, বসন্তী দেবীর প্রতি বসন্তের খুব শ্রদ্ধা ছিল।  ১৯২৫ সালে দাসের মৃত্যুর পর, বসু দেবীর সাথে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সন্দেহ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়।  সুভাষ চন্দ্র বসুর ভ্রাতৃপ্রতিম ভাতিজি কৃষ্ণ বোস বাসন্তী দেবীকে তাঁর “দত্তক মা” এবং তাঁর জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহিলার একজন হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন, বাকি তিনজন হলেন তাঁর মা প্রভাবতী, তাঁর ভগ্নিপতি বিভাবতী (শেরতের স্ত্রী)  চন্দ্র বসু) এবং তার স্ত্রী এমিলি শেঙ্কল।
তার স্বামীর মতো, বাসন্তী দেবীও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।  ১৯২৮ সালে, ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রায় তার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলের বিরুদ্ধে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হওয়ার কয়েকদিন পর মারা যান।  এর পর বাসন্তী দেবী লাজপত রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ভারতীয় যুবকদের উদ্বুদ্ধ করেন।
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর, বাসন্তী দেবী সামাজিক কাজ চালিয়ে যান।  বাসন্তী দেবী কলেজ, কলকাতার প্রথম মহিলা কলেজ যা সরকারের অর্থায়নে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার নামে নামকরণ করা হয়েছিল।  ১৯৭৩ সালে, তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন।
বাসন্তী দেবী ৭ মে ১৯৭৪ মৃত্যুবরণ করেন।

।।তথ্য ঋণ : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবপেজ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

বাংলা থিয়েটারে তারা সুন্দরীর অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

তারা সুন্দরী, একজন খ্যাতনামা বাঙালি মঞ্চ অভিনেত্রী, গায়িকা এবং নৃত্যশিল্পী, থিয়েটারের জগতে একটি অমোঘ ছাপ রেখে গেছেন। ১৮৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন, মঞ্চে তার যাত্রা শুরু হয় সাত বছর বয়সে। স্টার থিয়েটারে “চৈতন্য লীলা” নাটকে একটি ছেলের চরিত্রে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই প্রথম দিকের সূচনা হয়েছিল বিনোদিনী দাসীর পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলা থিয়েটারের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, যা একটি উজ্জ্বল কর্মজীবনের সূচনা করে।
তেরো বছর বয়সে, তারা সুন্দরী ইতিমধ্যে “চৈতন্য লীলা” এবং গোপীতে চৈতন্যের ভূমিকা সহ উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলি চিত্রিত করেছিলেন। তার অভিনয়গুলি কেবল অভিনয় নয় বরং তিনি যে চরিত্রগুলি অভিনয় করেছিলেন তার একটি মূর্ত প্রতীক, তার অতুলনীয় অভিনয় দক্ষতার জন্য তিনি নাট্যসমরাগিনী উপাধি অর্জন করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে “চন্দ্রশেখর” নাটকে তার সবচেয়ে প্রশংসিত ভূমিকাগুলির মধ্যে একটি ছিল শৈবালিনী, যা তাকে ব্যাপক খ্যাতি এনে দেয়।
১৮৯৭ সালে, তিনি অমরেন্দ্রনাথ দত্তের নেতৃত্বে ক্লাসিক থিয়েটারে যোগ দেন এবং এর প্রধান অভিনেত্রী হন। এই পরিবর্তনটি তার কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা তাকে অমৃতলাল মিত্রের কাছ থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দত্তের নির্দেশনায় তার অভিনয় দক্ষতা পরিমার্জিত করার সুযোগ দিয়েছিল। তার নৈপুণ্যের প্রতি তারা সুন্দরীর নিবেদন তাকে অসংখ্য নাটকে অভিনয় করতে দেখেছিল, ১৯২২ সাল পর্যন্ত তার অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মোহিত করেছিল।
যাইহোক, ১৯২২ সালে তার ছেলের মৃত্যুর সাথে একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পরে, তারা সুন্দরী মঞ্চ থেকে অবসর নেন এবং একটি আশ্রমে ধর্মীয় কার্যকলাপে জড়িত থাকার জন্য ভুবনেশ্বরে চলে যান। বাংলা থিয়েটারের একজন অকুতোভয় গিরিশ চন্দ্র ঘোষ তাকে ফিরে আসতে রাজি না করা পর্যন্ত তিনি কলকাতার মঞ্চে ফিরে আসেন। অবসর থেকে বেরিয়ে আসার পর তার প্রথম ভূমিকা ছিল “দুর্গেশনন্দিনী” নাটকে।
উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক—
চৈতন্য লীলা, সরলা, চন্দ্রশেখর, দুর্গেশনন্দিনী,হরিশচন্দ্র, রিজিয়া, বলিদান, জানা, শ্রী দুর্গা।
বাংলা মঞ্চে তারা সুন্দরীর অবদান ছিল গভীর। তিনি বাংলা মঞ্চ নাটকের প্রথম দিকে শিশির কুমার ভাদুড়ির মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের সাথে কাজ করেছেন, থিয়েটারে শ্রেষ্ঠত্বের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তারা সুন্দরী ১৯ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে মারা যান, কিন্তু বাংলা থিয়েটারে একজন অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব হিসাবে তার উত্তরাধিকার প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

অনুরূপা দেবী : বাঙালি নারী সাহিত্যিক ও সংস্কারকের চিরায়িত অবদান।

অনুরূপা দেবী, ৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৮২ সালে কলকাতার শ্যামবাজার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন, ব্রিটিশ ভারতে একজন অগ্রগামী বাঙালি নারী ঔপন্যাসিক, ছোট গল্প লেখক, কবি এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হন। তার সাহিত্যিক অবদান, ১৯১১ সালে তার প্রথম উপন্যাস “পশ্যপুত্র” প্রকাশের দ্বারা চিহ্নিত, তাকে লাইমলাইটে ছড়িয়ে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে “মন্ত্রশক্তি” (১৯১৫), “মহনিষা” (১৯১৯), এবং “মা” (১৯২০), যা তাকে প্রথম নারী কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে একজন করে তোলে যিনি বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব অর্জন করেন। সেই সময়ের সাহিত্য ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের গভীরে প্রোথিত একটি পরিবারে প্রস্থ দেবীর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তার বাবা মুকুন্দদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং লেখক, আর তার মা ছিলেন ঘনসুন্দরী দেবী। ভূদেব মুখোপাধ্যায় এবং নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাহিত্যিকরা ছিলেন তার পিতৃপুরুষ এবং তার খালা ইন্দিরা দেবী ছিলেন আরেকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব।

শৈশবে শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, প্রস্থ দেবীর শিক্ষা শুরু হয় বাড়িতে, তার পরিবারের তত্ত্বাবধানে। তার খালা সুরুপা দেবীর আবৃত্তির মাধ্যমে তিনি মহাকাব্য, রামায়ণ এবং মহাভারতের সাথে পরিচিত হন, যা তার সাহিত্য সাধনার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। সাহিত্যের এই প্রথম দিকের এক্সপোজার, শেখার জন্য তার সহজাত আবেগের সাথে মিলিত হয়ে, তাকে সংস্কৃত এবং হিন্দিতে আয়ত্ত করতে এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনে প্রবেশ করতে সক্ষম করে। রাণী দেবী ছদ্মনামে প্রকাশিত তার প্রথম গল্পের মাধ্যমে প্রস্থ দেবীর সাহিত্য জীবন শুরু হয়, কুন্টলিন পুরস্কার জিতেছিল। তার প্রথম উপন্যাস, “তিলকুঠি”, ১৯০৪ সালে নাভানুর ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এটি ছিল ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত “পশ্যপুত্র”, যা তাকে সাহিত্য জগতে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তার সাহিত্যিক কৃতিত্বের বাইরে, প্রস্থ দেবী গভীরভাবে সামাজিক সংস্কারের সাথে জড়িত ছিলেন, বিশেষ করে নারীর অধিকার এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে। তিনি কাশী এবং কলকাতায় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি মহিলা কল্যাণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৩০ সালে, তিনি মহিলা সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তাকে বাংলায় নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে চিহ্নিত করে। প্রস্থ দেবীর জীবন ১৯ এপ্রিল, ১৯৫৮ সালে শেষ হয়েছিল, কিন্তু একজন লেখক এবং সংস্কারক হিসাবে তার উত্তরাধিকার অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

অনুরূপা দেবীর প্রারম্ভিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ভারতীয় মহাকাব্যের সমৃদ্ধিতে ভরা সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারে তার উল্লেখযোগ্য অবদান তাকে বহুমুখী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখায়। নারীর মর্যাদা উন্নীত করার জন্য তার নিবেদনের সাথে মিলিত হয়ে তার সময়ের সামাজিক অবস্থার প্রতিফলনকারী আখ্যান বুনতে তার ক্ষমতা তার গল্পকে শুধু ব্যক্তিগত বিজয়ের গল্প নয় বরং সামাজিক অগ্রগতির আখ্যান করে তোলে। অনুরূপা দেবীর জীবন এবং কাজ উচ্চাকাঙ্ক্ষী লেখক এবং সমাজ সংস্কারকদের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হিসাবে রয়ে গেছে, যা পরিবর্তনের জন্য সাহিত্য এবং সক্রিয়তার শক্তিকে চিত্রিত করে।

অনুরূপা দেবী ৩৩টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার অন্যান্য জনপ্রিয় উপন্যাসগুলি হল বাগ্দত্তা (১৯১৪), জ্যোতিঃহারা (১৯১৫), মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), মহানিশা (১৯১৯), মা (১৯২০), উত্তরায়ণ ও পথহারা (১৯২৩)। তার লেখা মন্ত্রশক্তি, মহানিশা, মা, পথের সাথী (১৯১৮) ও বাগ্দত্তা নাটকে রূপান্তরিত হয়েছিল। জীবনের স্মৃতিলেখা তার অসমাপ্ত রচনা।তার অন্যান্য বইগুলি হল: রামগড় (১৯১৮), রাঙাশাঁখা (১৯১৮) বিদ্যারত্ন (১৯২০), সোনার খনি (১৯২২), কুমারিল ভট্ট (১৯২৩), সাহিত্যে নারী, স্রষ্ট্রী ও সৃষ্টি (১৯৪৯), বিচারপতি ইত্যাদি।

সম্মাননা—–

প্রথম প্রকাশিত গল্পের জন্য কুন্তলীন পুরস্কার লাভ; শ্রীভারতধর্ম মহামন্ডল থেকে “ধর্মচন্দ্রিকা” উপাধি লাভ (১৯১৯); শ্রীশ্রীবিশ্বমানব মহামন্ডল থেকে “ভারতী” উপাধি লাভ (১৯২৩); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ (১৯৩৫); ভুবনমোহিনী দাসী স্বর্ণপদক লাভ (১৯৪১); কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লীলা লেকচারার পদে অধিষ্ঠিত (১৯৪৪)।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

অমর সুরের জাদুকরী : যূথিকা রায়ের সঙ্গীত জীবনের উত্থান ও সাফল্যের কাহিনী।

যুথিকা রায়, একজন প্রখ্যাত বাংলা ভজন গায়ক, ভারতীয় সঙ্গীতের দৃশ্যে একটি অমোঘ চিহ্ন রেখে গেছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে, রয়ের ব্যতিক্রমী প্রতিভা হিন্দি এবং বাংলা উভয় সিনেমাতেই উজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়েছে, যা ভক্তিমূলক স্তোত্র এবং ৩০০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রের পটভূমিতে অবদান রেখেছে। আমতা, হাওড়ায় জন্মগ্রহণ করেন, তবে মূলত সেনহাটি, খুলনা, বাংলাদেশের, রায়ের সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয় কলকাতার চিৎপুরে, 1930 সালে তার বাবার চাকরির দাবিতে সেখানে স্থানান্তরিত হওয়ার পর। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার অনুরাগকে স্বীকার করে, রায় বরানগরে জ্ঞানরঞ্জন সেনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

তার সম্ভাবনা শীঘ্রই কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা স্বীকৃত হয়, যার ফলে ১৯৩০ সালে তার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড, ‘স্নিগ্ধ শ্যাম বেণী বর্ণ’, যা প্রকাশিত না হওয়া সত্ত্বেও, তার চূড়ান্ত সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে। রায়ের কর্মজীবন একটি উল্লেখযোগ্য মোড় নেয় যখন প্রণব রায় ‘রাগা ভোরের যুথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারা আমি পথ হারে’ গানগুলি রচনা করেন, যা ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে। এই প্রশংসা একটি সমৃদ্ধ কর্মজীবনের জন্য মঞ্চ তৈরি করে, অবশেষে ভারত সরকার থেকে ১৯৭২ সালে তাকে মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী অর্জন করে।

ভক্তিমূলক ভজন এবং আধুনিক গান সহ রায়ের ভাণ্ডার বিশাল ছিল, যার মধ্যে ১৭৯ টি রেকর্ড রয়েছে। গভীর আধ্যাত্মিক আবেগ জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা তাকে মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর প্রিয় করে তোলে, গান্ধী তাকে ‘মীরাবাই’ উপাধি দিয়েছিলেন। তার অবদান শুধু রেকর্ডিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সিংহলী এবং পূর্ব আফ্রিকা সহ ভারত জুড়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে পারফর্ম করেছেন এবং প্রধান ভারতীয় শহরগুলি থেকে রেডিও সম্প্রচারে অংশ নিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে, রামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মশতবর্ষ স্মরণে, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম এবং কমল দাশগুপ্ত দ্বারা রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য ভক্তিমূলক গান গেয়েছিলেন।

তার অসংখ্য রেকর্ডিংয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘এনি বর্ষা চেলা আগল’ এবং ‘তুমি যে রাধা হেদা শ্যাম’-এর মতো গান, যা একজন গায়ক হিসেবে তার বহুমুখীতা এবং গভীরতা প্রদর্শন করে। তার জীবন, ব্রহ্মচর্য এবং সঙ্গীতে নিবেদিত, ৯৩ বছর বয়সে ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪-এ কলকাতার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্টাতে শেষ হয়েছিল। ভারতে ভজন গানে অগ্রগামী হিসেবে যুথিকা রায়ের উত্তরাধিকার অতুলনীয়, তার কণ্ঠ ভক্ত ও সঙ্গীতপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত ও অনুরণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

একজন বিপ্লবী নারীর গল্প : পারুল মুখার্জির অবদান ও ত্যাগ।

পারুল মুখার্জি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে খোদাই করা একটি নাম, তিনি ছিলেন সাহস ও সংকল্পের আলোকবর্তিকা। পারুলবালা মুখার্জি হিসেবে ১৯১৫ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন, ঢাকায় শিকড় সহ, তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। তার জীবনের যাত্রা, সাহসিকতা এবং স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দ্বারা চিহ্নিত, অগ্নি যুগে একজন বিপ্লবী হিসাবে তার ভূমিকার একটি প্রাণবন্ত ছবি আঁকা।

পারুলের পরিবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিমজ্জিত ছিল, তার বাবা গুরুপ্রসন্ন মুখার্জি এবং মা মনোরমা দেবীর সাথে, তার প্রাথমিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। তার ছোট বোন ঊষা মুখার্জি এবং বড় ভাই অমূল্য মুখার্জি সহ তার ভাইবোনরাও স্বাধীনতার লড়াইয়ে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত পরিবেশে এই লালনপালন তার বিপ্লবী উদ্যোগের বীজ বপন করেছিল।

তিনি তার পিতামহের আদর্শ দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা তাকে অল্প বয়সে রাজনীতির জগতে প্ররোচিত করেছিল। পূর্ণানন্দ দাশগুপ্তের নির্দেশনায় গুপ্ত বিপ্লবী পার্টির সাথে তার যোগসাজশ এই কারণে তার প্রতিশ্রুতিকে দৃঢ় করে। পারুল ব্রিটিশ শনাক্তকরণ এড়াতে শান্তি, নীহার, আরতি এবং রানীর মতো বিভিন্ন উপনামের অধীনে কাজ করত, শুধুমাত্র কয়েকজন তার আসল পরিচয় সম্পর্কে অবগত।

1935 সালে, তার গোপন কার্যকলাপের কারণে তাকে উত্তর 24 পরগণার গোয়ালাপাড়ার টিটাগড়ের একটি গোপন অস্ত্রের ঘাঁটিতে গ্রেফতার করা হয়। সেই বছরের শেষের দিকে, টিটাগড় ষড়যন্ত্র মামলায় তার জড়িত থাকার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পুরুষ সমকক্ষদের পাশাপাশি তিনি বিচারের মুখোমুখি হন। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বোমা এবং বিস্ফোরক তৈরিতে পারুলের দক্ষতা বিপ্লবী কারণের প্রতি তার উত্সর্গ প্রদর্শন করে।

1939 সালে তার মুক্তির পর, পারুল তার বিপ্লবী প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে একাকীত্বের পথ বেছে নেন। তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন, বিপ্লবী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যা তার জীবনকে পরিচালিত করেছিল। পারুল মুখার্জি 20 এপ্রিল, 1990-এ মারা যান, তিনি স্থিতিস্থাপকতা এবং অটুট দেশপ্রেমের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

পারুল মুখার্জির গল্প ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের অবদানের একটি প্রমাণ, যা প্রায়শই ছাপিয়ে যায় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। তার জীবন স্বাধীনতার চেতনা এবং ভারতের মুক্তির জন্য অগণিত ব্যক্তিদের দ্বারা করা আত্মত্যাগের উদাহরণ দেয়। আমরা তাকে স্মরণ করার সাথে সাথে, আমরা একজন অমিমাংসিত নায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি যার কর্মগুলি আমাদের জাতির ইতিহাসের গতিপথকে গঠনে সহায়ক ছিল।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

সাধনা বসু: অভিনয় ও নৃত্যে বাংলা সংস্কৃতির এক অমর সংযোজন।

বাংলা মঞ্চ এবং প্রারম্ভিক সবাক সিনেমার আলোকিত সাধনা বোস, ভারতে পারফর্মিং আর্টে তার উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য পালিত হচ্ছেন। ২০শে এপ্রিল, ১৯১৪-এ একটি বিশিষ্ট পরিবারে জন্মগ্রহণকারী, সাধনা শিল্পকলায় তার যাত্রা প্রায় পূর্বনির্ধারিত ছিল, তার প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বংশের জন্য ধন্যবাদ। তার শিক্ষা এবং পারফরম্যান্সের প্রথম দিকের যাত্রা একটি ক্যারিয়ারের জন্য মঞ্চ তৈরি করে যা পরবর্তীতে তাকে একজন নেতৃস্থানীয় অভিনেত্রী এবং একজন অগ্রগামী নৃত্যশিল্পী হিসাবে দেখাবে, যা মঞ্চ এবং পর্দা উভয় ক্ষেত্রেই একটি অদম্য চিহ্ন রেখে যায়।

ব্যারিস্টার সরল চন্দ্র সেন এবং নির্মলা সেনের কন্যা, সাধনা শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে মূল্যবান এমন একটি পরিবারের তিন কন্যার মধ্যে মধ্যম সন্তান ছিলেন। লোরেটো কনভেন্টে যাওয়ার আগে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে শুরু হয়েছিল, যা তার দাদার উত্তরাধিকারের প্রতি সম্মতি ছিল। এই প্রথম দিকের বছরগুলিতে, তাদের মায়ের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, সাধনা এবং তার বোনেরা বিশানি নামে একটি নাচ-গানের দল গঠন করেছিল, তাদের নতুন প্রতিভা প্রদর্শন করেছিল।

ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মধু বসুর নেতৃত্বে কলকাতা আর্ট প্লেয়ার্সে যোগদানের মাধ্যমে সাধনের কর্মজীবনের সূচনা হয়। ১৯২৮ সালে আলিবাবা নাটকে একটি ছোট ভূমিকার মাধ্যমে তার মঞ্চে আত্মপ্রকাশ ঘটে অল্প বয়সে। এটি বসুর সাথে একটি ফলপ্রসূ সহযোগিতার সূচনা করে, ১৯৩০ সালে তাদের বিবাহের সমাপ্তি ঘটে। একজন অভিনেত্রী হিসাবে সাধনের দক্ষতাকে আলিবাবার ১৯৩৭ সালের চলচ্চিত্র অভিযোজনে তার প্রধান ভূমিকার সাথে আরও দৃঢ় করা হয়েছিল, যা একটি বাণিজ্যিক সাফল্য এবং তার ক্যারিয়ারের একটি হাইলাইট হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল।

যাইহোক, সাধনের উত্তরাধিকার তার নৃত্যের নতুনত্বের সাথে জটিলভাবে আবদ্ধ। বিভিন্ন ধ্রুপদী ফর্ম জুড়ে উল্লেখযোগ্য গুরুদের দ্বারা প্রশিক্ষিত, তিনি একটি অনন্য আধুনিক ফর্ম তৈরি করার জন্য ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় নৃত্যের সাথে ব্যালে যোগ করেছিলেন যা দর্শকদের বিমোহিত করেছিল। উদয় শঙ্করের নির্দেশনায় বুখ এবং ওমর খৈয়ামের মতো মঞ্চ ব্যালেতে তার অভিনয় তার শৈল্পিক দৃষ্টি এবং দক্ষতার প্রমাণ।

মধু বোস এবং সাধনা বোসের জুটি এরপরে বেশ কয়েকটি সফল চলচ্চিত্র প্রদান করে, যার মধ্যে সাধনের ভূমিকা অভিনয় (১৯৩৮), কুমকুম (১৯৪০), এবং রাজনর্তকি (১৯৪২) ছিল। পরেরটি দ্য কোর্ট ড্যান্সার শিরোনামের একটি ইংরেজি অভিযোজনও দেখেছিল, যা একটি বিস্তৃত দর্শকদের কাছে তার প্রতিভা প্রদর্শন করে। সাধনের প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে প্রসারিত হয়েছিল, যার মধ্যে প্রখ্যাত কথক শিল্পী শোবনা নারায়ণও ছিলেন, যিনি সাধনাকে তার পরামর্শদাতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
চলচ্চিত্রপঞ্জী—-
আলিবাবা (১৯৩৭; বাংলা), অভিনয় (১৯৩৮; বাংলা), কুমকুম (১৯৪০; বাংলা ও হিন্দী), রাজনর্তকী (১৯৪১; বাংলা, হিন্দী ও ইংরেজি), মীনাক্ষী (১৯৪২; বাংলা ও হিন্দী), পয়ঘাম (১৯৪৩; হিন্দী), শঙ্কর পার্বতী (১৯৪৩; হিন্দী), বিষ কন্যা (১৯৪৩; হিন্দী), নিলম (১৯৪৫; হিন্দী), ভোলা শঙ্কর (১৯৫১; হিন্দী), ফর লেডিজ্ ওনলি (১৯৫১; হিন্দী), নন্দ কিশোর (১৯৫১; হিন্দী), শিন শিনাকি বুবলা বু (১৯৫২; হিন্দী), শেষের কবিতা (১৯৫৩; বাংলা), মা ও ছেলে (১৯৫৪; বাংলা), বিক্রমোর্বশী (১৯৫৪; বাংলা)।
১৯৬৯ সালে মধু বোসের মৃত্যুর পর আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, ভারতীয় নৃত্য ও সিনেমার অগ্রগামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সাধনের উত্তরাধিকার টিকে আছে। তার অবদান শুধু বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যেই নৃত্যকে উন্নত করেনি বরং ভবিষ্যতের শিল্পীদের জন্যও নজির স্থাপন করেছে। সাধনা বোসের জীবনযাত্রা 3 অক্টোবর, ১৯৭৩-এ শেষ হয়েছিল, কিন্তু তার শৈল্পিক প্রচেষ্টা অনেকের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত ও মোহিত করে চলেছে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

স্মরণে শকুন্তলা দেবী, ভারতীয় লেখক এবং মানব ক্যালকুলেটর। 

শকুন্তলা দেবী  একজন ভারতীয় লেখিকা এবং মানব গণনাকারী ছিলেন।  তাঁকে বলা হয় ‘মানব কম্পিউটার’।  ১৯৮২ সালে তাঁর অসাধারণ কম্পিউটিং ক্ষমতার জন্য ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ অন্তর্ভুক্ত হন।  একজন লেখক হিসাবে, তিনি উপন্যাস, গণিত, ধাঁধা এবং জ্যোতির্বিদ্যার বই সহ বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন।
শকুন্তলা দেবীর জন্ম বেঙ্গালুরুতে এক কন্নড় ব্রাহ্মণ পরিবারে।  তিনি ৪ নভেম্বর, ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শৈশবকালে, শকুন্তলার অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং সংখ্যার দক্ষতা তাঁর পিতার দ্বারা উপেক্ষিত ছিল।  যদিও তাঁর বয়স মাত্র তিন বছর, তিনি বিভিন্ন তাস খেলার সাথে পরিচিত হন।  শকুন্তলার বাবা সার্কাসের দলে ছিলেন।  দল ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন ‘রোড শো’ শুরু করেন তিনি।  তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না।  মাত্র ছয় বছর বয়সে শকুন্তলা মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয় দেন।  শকুন্তলা ১৯৪৪ সালে তাঁর বাবার সাথে লন্ডনে চলে আসেন। তারপর ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি ভারতে চলে আসেন।
শকুন্তলা দেবীর এই অসাধারণ শক্তির প্রকাশ ঘটলে তিনি তা সারা বিশ্বে প্রদর্শন করতে শুরু করেন।  তাঁর প্রদর্শনী ১৯৫০ সালে ইউরোপে এবং ১৯৭৬ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সফরের সময়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্থার জেসন তাঁকে নিয়ে গবেষণা করেন।  তিনি শকুন্তলা দেবীর মানসিক ক্ষমতা নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করেন।  জেসন তাঁর একাডেমিক জার্নালে ১৯৯০ সালে লিখেছিলেন, ৬১,৬২৯,৮৭৫ এর ৩ বর্গমূল এবং ১৭০,৮৫৯,৩৭৫ এর ৭ বর্গমূল দেওয়া হয়েছে, জেসন তাঁর নোটবুকে সেগুলি লেখার আগে শকুন্তলা দেবী ৩৯৫ এবং ১৫ হিসাবে উত্তর দিয়েছেন।
২০১৩ সালের ৪ নভেম্বরে তার ৮৪ তম জন্ম দিবসে গুগল তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিশেষ ডুডল তৈরি করে। ২০২০ সালে আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র শকুন্তলা দেবী (চলচ্চিত্র) মুক্তি পায়।
মৃত্যু—
কিছু দিন ধরে হার্ট এবং কিডনির সমস্যায় লড়াই করার পর ২১ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে, শকুন্তলা দেবী ৮৩ বছর বয়সে ব্যাঙ্গালোরে শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় মারা যান।
।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This