Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমাজ দিবস, জানুন দিনটির গুরুত্ব এবং কেন পালিত হয়।

বিশ্ব টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সোসাইটি ডে (ডব্লিউটিআইএসডি) এর উদ্দেশ্য হল ইন্টারনেট এবং অন্যান্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) ব্যবহার সমাজ ও অর্থনীতিতে এবং সেইসাথে সেতু করার উপায়গুলি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করা।  ওয়ার্ল্ড টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সোসাইটি দিবস হল একটি আন্তর্জাতিক দিন যা ২০০৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কের আন্টালিয়াতে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন প্লেনিপোটেনশিয়ারি কনফারেন্স দ্বারা ঘোষিত হয়, যা প্রতি বছর ১৭ মে পালিত হয়।

 

 ইতিহাস—

 

 বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস–

 

১৮৬৫ সালের ১৭ মে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠার স্মরণে দিনটি আগে ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি ১৯৭৩ সালে মালাগা-টোরেমোলিনোসে প্লেনিপোটেনশিয়ারি কনফারেন্স দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
এই দিনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইন্টারনেট এবং নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আনা সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করা।  এটি ডিজিটাল বিভাজন কমাতে সাহায্য করাও লক্ষ্য করে।

 

 বিশ্ব তথ্য সমাজ দিবস–

ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন সোসাইটি দিবস ছিল একটি আন্তর্জাতিক দিবস যা ২০০৫ সালে তিউনিস-এ ইনফরমেশন সোসাইটির ওয়ার্ল্ড সামিটের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন দ্বারা ১৭ মে ঘোষণা করা হয়েছিল।

 

বিশ্ব তথ্য সমাজ দিবস একটি আন্তর্জাতিক দিবস। তিউনিসে অনুষ্ঠিত ২০০৫ তথ্য সমাজের উপর বিশ্ব সম্মেলনের পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত একটি প্রস্তাবনার মাধ্যমে ১৭ মে এই দিবস হিবেসে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি পূর্বে ১৭ মে, ১৮৬৫ সালে, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠার স্মৃতিরক্ষা বিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৭৩ সালে মালাগা-টরেমোলিনসে অয়োজিত এক পূর্ণক্ষমতাপ্রাপ্ত সম্মেলনে প্রবর্তিত হয়।
এই দিবসের প্রধান প্রতিপাদ্য ইন্টারনেট এবং নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সঙ্ঘটিত সামাজিক পরিবর্তনের বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এছাড়াও ডিজিটাল ডিভাইড হ্রাস করার লক্ষ্যেও কাজ করে থাকে।

 বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমাজ দিবস–

২০০৬ সালের নভেম্বরে, তুরস্কের আন্টালিয়ায় আইটিইউ প্লেনিপোটেনশিয়ারি কনফারেন্সে ১৭ মে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সোসাইটি দিবস হিসাবে উভয় ঘটনা উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

হালনাগাদ রেজোলিউশন ৬৮ সদস্য রাষ্ট্র এবং সেক্টর সদস্যদের প্রতি বছর উপযুক্ত জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দিবসটি উদযাপন করার জন্য আমন্ত্রণ জানায়:

কাউন্সিল দ্বারা গৃহীত থিমের উপর উদ্দীপক প্রতিফলন এবং ধারণা বিনিময়

সমাজের সমস্ত অংশীদারদের সাথে থিমের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক

থিমের অন্তর্নিহিত বিষয়গুলির উপর জাতীয় আলোচনার প্রতিফলন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা, যা আইটিইউ এবং এর বাকি সদস্যদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে

 

আগের সব বিষয়—-

 

১৯৬৯ ইউনিয়নের ভূমিকা ও কার্যক্রম।

১৯৭০ টেলিযোগাযোগ এবং প্রশিক্ষণ।

১৯৭১ মহাকাশ ও টেলিযোগাযোগ।

১৯৭২ বিশ্ব টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক।

১৯৭৩ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

১৯৭৪ টেলিযোগাযোগ এবং পরিবহন।

১৯৭৫ টেলিযোগাযোগ এবং আবহাওয়াবিদ্যা।

১৯৭৬ টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য।

১৯৭৭ টেলিযোগাযোগ এবং উন্নয়ন।

১৯৭৮ রেডিও যোগাযোগ।

১৯৭৯ মানবজাতির সেবায় টেলিযোগাযোগ।

১৯৮০ গ্রামীণ টেলিকম।

১৯৮১ টেলিযোগাযোগ এবং স্বাস্থ্য।

১৯৮২ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

১৯৮৩ এক বিশ্ব, এক নেটওয়ার্ক।

১৯৮৪ টেলিকমিউনিকেশন: একটি বিস্তৃত দৃষ্টি।

১৯৮৫ টেলিকম উন্নয়নের জন্য ভাল।

১৯৮৬ পার্টনার অন দ্য মুভ।

১৯৮৭ টেলিকম সমস্ত দেশে পরিষেবা দেয়।

১৯৮৮ ইলেকট্রনিক যুগে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বিস্তার।

১৯৮৯ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

১৯৯০ টেলিযোগাযোগ এবং শিল্প উন্নয়ন।

১৯৯১ টেলিযোগাযোগ এবং মানব নিরাপত্তা।

১৯৯২ টেলিযোগাযোগ এবং মহাকাশ: Xintiandi।

১৯৯৩ টেলিযোগাযোগ এবং মানব উন্নয়ন।

১৯৯৪ টেলিযোগাযোগ এবং সংস্কৃতি।

১৯৯৫ টেলিযোগাযোগ এবং পরিবেশ।

১৯৯৬ টেলিযোগাযোগ এবং ক্রীড়া।

১৯৯৭ টেলিযোগাযোগ এবং মানবিক সহায়তা।

১৯৯৮ টেলিকম ট্রেড।

১৯৯৯ ই-কমার্স।

২০০০ মোবাইল কমিউনিকেশন।

২০০১ ইন্টারনেট: চ্যালেঞ্জ, সুযোগ এবং সম্ভাবনা।

২০০২ মানুষকে ডিজিটাল ডিভাইড ব্রিজ করতে সাহায্য করা।

২০০৩ সমস্ত মানবজাতিকে যোগাযোগে সহায়তা করা।

২০০৪ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি: টেকসই উন্নয়নের পথ।

২০০৫ একটি ন্যায্য তথ্য সোসাইটি তৈরি করতে পদক্ষেপ নিন।

২০০৬ অগ্রসর বিশ্ব সাইবার নিরাপত্তা।

২০০৭ আইসিটি পরবর্তী প্রজন্মকে উপকৃত করুক।

২০০৮ আইসিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপকার করতে দিন। এবং সমস্ত লোককে আইসিটি সুযোগগুলি উপভোগ করতে দিন।

২০০৯ শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা রক্ষা করুন।

২০১০ আইসিটি শহুরে জীবনকে উন্নত করে।

২০১১ আইসিটি গ্রামীণ জীবনকে উন্নত করে।

২০১২ তথ্য যোগাযোগ এবং মহিলা।

২০১৩ আইসিটি এবং সড়ক নিরাপত্তার উন্নতি।

২০১৪ ব্রডব্যান্ড টেকসই উন্নয়ন প্রচার করে।

২০১৫ টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি: উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি।

২০১৬ আইসিটি উদ্যোক্তা প্রচার এবং সামাজিক প্রভাব প্রসারিত করুন।

২০১৭ বিগ ডেটা বিকাশ করুন এবং প্রভাব বিস্তার করুন।

২০১৮ সমস্ত মানবজাতির সুবিধার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহার প্রচার করুন।

২০১৯ মানককরণের ব্যবধানকে সংকুচিত করা।

২০২০ সংযোগ লক্ষ্য ২০৩০: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের প্রচারের জন্য ICT ব্যবহার করা।

২০২১ চ্যালেঞ্জিং সময়ে ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা।

২০২২ বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং আবার স্বাস্থ্য।

 

উল্লেখ্য,  ইন্টারনেট এবং অন্যান্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (ICT) ব্যবহার সমাজ ও অর্থনীতিতে এবং সেইসাথে ডিজিটাল বিভাজন দূর করার উপায়গুলি নিয়ে আসতে পারে সেই সম্ভাবনার সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করার জন্য প্রতি বছর বিশ্ব টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সোসাইটি দিবস পালিত হয়।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

ডিজিটাল যুগে শিক্ষা ও জ্ঞানের হালহকিকৎ : দিলীপ রায়।

আমরা জানি, প্রাত্যহিক জীবনের চালিকা শক্তি হচ্ছে জ্ঞান ও শিক্ষা । এখন দেখা যাক জ্ঞান ও শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি  ?  শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তনির্হিত শক্তি ও সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত ও প্রস্ফুটিত হয় এবং জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয় । এই জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ  তার সমাজকেও সমৃদ্ধ করে । শিক্ষা ব্যক্তি ও সমষ্টির জ্ঞান, সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা, চরিত্র ও মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটায় । আবার অনেকের মতে, বিদ্যা হলো একটা পুস্তকে আবদ্ধ, একটি জ্ঞানের শিখা মাত্র । আর জ্ঞান হলো সেই শিখা থেকে অসংখ্য শিখা হয়ে আলোকিত হওয়ার উপায় । শিখার আলোয় চারিদিকে আলোকিত হয় । জ্ঞান বলতে কোনো বিষয় সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা থাকাকে  বোঝায় । দর্শন শাস্ত্রের জ্ঞান নিয়ে যে অংশটি আলোচনা করে তাকে আবার  জ্ঞানতত্ত্ব  বলে ।
সম্ভবত আমার মতো অনেকের মনেই  প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক,  “প্রযুক্তিঃ আশীর্বাদ না অভিশাপ ?” প্রচণ্ড  গতিতে  প্রযুক্তির  ব্যবহার  বাড়ছে । প্রযুক্তির অকল্পনীয় উন্নয়ন বলতে গেলে সব  কিছুকে সম্ভব করে হাতের নাগালে  এনে দিয়েছে । আগে প্রযুক্তির ব্যবহার কম ছিল । প্রযুক্তির লভ্যতা ও ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল সমাজের নির্দিষ্ট কিছু মানুষের  মধ্যে । একটা ফোন করতে মানুষ ছুটতেন পিসিও বুথে । আরও কিছুদিন আগে দুই শব্দে মৃত্যু খবর জানাতে ছুটতে হতো দূরের পোস্ট অফিসে,  টেলিগ্রাম করার জন্য ।  মানি অর্ডারের মাধ্যমে গ্রামে গঞ্জে টাকা পাঠানোর রেওয়াজ সেদিনও ছিল । ট্রেনের টিকিট, ব্যাঙ্ক, সিনেমা, বিল মেটানো, সবক্ষেত্রেই লম্বা লাইন  । এমনও দেখা গেছে কলকাতার জিপিও’র পাশে  কয়লা ঘাটের রেলের সংরক্ষিত কাউন্টারে ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য রাত থেকে লাইন দিতে হতো । বর্তমানে  পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন  ঘটেছে ।  প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের জীবনযাত্রার ছবিটার আমূল পরিবর্তন করে  দিয়েছে । এইজন্য জেগে উঠেছে “ডিজিটাল ইন্ডিয়া” যার প্রভাব ভৌগলিক সীমানাকেও ছাপিয়ে গেছে ।  জানা যায়, ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সারা বিশ্বে  তুলে ধরার লক্ষ্যে এই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কর্মসূচি ।
( ২ )
এখানে উল্লেখ থাকে যে, ডিজিটাইজেশনের দিকে ভারতের দ্রুতগতির  যাত্রা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং গত দুই দশক ধরে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন সামগ্রী ও ডেটা সহজে নাগালের মধ্যে আসায়  শিক্ষা ক্ষেত্রে   EdTech এর  দ্রুত উত্থান ও গ্রহণযোগ্যতার পথ সুগম হয়েছে । ভারতের  EdTech ক্ষেত্র, বিশ্বের বৃহত্তম শিক্ষাপ্রযুক্তি ক্ষেত্রগুলির অন্যতম । আমরা জানি, EdTech হলো শিক্ষাদান ও শিক্ষা গ্রহণের উন্নয়ন ঘটাতে প্রযুক্তি, অর্থাৎ সফটওয়্যার এবং/অথবা হার্ডওয়্যারের ব্যবহার । EdTech অ্যাপ ডাউনলোড করা স্মার্টফোন এখন শিক্ষার সমার্থক হয়ে উঠেছে । শ্রেণীকক্ষ এখন ইট-সিমেন্টের চৌহদ্দী ছাড়িয়ে ক্লিক এবং পোর্টালে স্থানান্তরিত । দূর-দূরান্তে থাকা, আধুনিক সুবিধাবঞ্চিত পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে EdTech গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং এই ভূমিকার জন্য  আগামীদিনে EdTech ক্ষেত্রের বিকাশ অব্যাহত থাকবে ।
শুধুমাত্র পড়ুয়ারাই  নয়, শিক্ষকরাও আকর্ষণীয় শিক্ষণগত অনুশীলনের মাধ্যমে EdTech থেকে উপকৃত হচ্ছেন, তাঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও উন্নত হচ্ছে । ইন্টারঅ্যাকটিভ হোয়াইটবোর্ড, শিক্ষামূলক ভিডিও, এবং অন্যান্য ডিজিটাল সম্পদের সুবাদে পড়ুয়াদের শিক্ষাগ্রহণ আরও মনোগ্রাহী হয়ে উঠছে ।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে জন্ম নেওয়া  ও বেড়ে ওঠা মানুষ ছোটবেলা থেকে ইন্টারনেট এবং কম্পিউটারে সড়গড় । প্রযুক্তির সাথে তাদের হরিহর আত্মা । এরা বড় হয়ে উঠছে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, ইত্যাদিকে ঘিরে । এখানে বলা বাহুল্য, ডিজিটাল প্রযুক্তি তাদের জীবনের একটা  স্বাভাবিক অঙ্গ । তারা সহজ-সাবলীল্ভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে  কাজে লাগায় । তাই এসব তরুন-তরুনীদের মাথা থেকে বের হয় অনেক ধরনের উদ্ভাবন  । তবে এটা ঘটনা, ফোনাফুনি, ইমেল, টেক্সটিং ও টুইটের হাত ধরে এরা বুঁদ হয়ে আছে । বর্তমান প্রজন্মের মানুষেরা সহজেই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে ।  পুরানো ধ্যান ধারণার বাবা-মায়ের মতো নয়, তারা তাদের কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বেশী আগ্রহী ।
ভারতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির প্রভাব এখন অনেক সুগভীর । শোনা যায়, এই বছরের জানুয়ারীতে সংখ্যায় প্রায় আট বিলিয়ন লেনদেন হয়েছে ডিজিটাল প্রথায় । প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে দ্রুত কীভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে ভারত তার নজিরবিহীন উদাহরণ রেখেছে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে । ভারত চায় সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার উপর আধারিত এই কর্মপন্থা অন্য দেশেও অনুসৃত হোক । কারণ এই পন্থা উদ্ভাবনমূলক কর্মসূচীসমূহের আঁতুরঘর হয়ে ওঠার এবং দরিদ্র দেশগুলির উত্থানের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে ।
( ৩ )
এবার আবার আসছি বিদ্যা, শিক্ষা ও জ্ঞান  প্রসঙ্গে । ব্যক্তিগত ও জাতীয় নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, বিজ্ঞান ভিত্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করে  শিক্ষার্থীদের মননে, কর্মে ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপন সৃষ্টি করা । সুতরাং মূল্যবোধ তৈরী করা এই মুহূর্তে সময়োচিত ও  আশুকর্তব্য ।  জ্ঞানের উৎস নিয়ে দার্শনিকদের ভিন্ন ভিন্ন মত । উল্লেখযোগ্য চারটি মত —– বুদ্ধিবাদ, অভিজ্ঞতাবাদ, বিচারবাদ ও স্বজ্ঞাবাদ । বুদ্ধিবাদ অনুসারে বুদ্ধিই যথার্থ জ্ঞান লাভের মাধ্যম বা উৎস । ডেকার্ট, লিবনিজ, প্রমুখ দার্শনিক বুদ্ধিবাদের সমর্থক । অভিজ্ঞতাবাদ অনুসারে, ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা জ্ঞানলাভের উৎস । লক, বার্কলি, হিউম প্রমুখ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক । বিচারবাদ অর্থ — বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়েই জ্ঞানের উৎপত্তি । কান্ট  এই মতবাদের সমর্থক । স্বজ্ঞা বা সাক্ষাৎ প্রতীতিই যথার্থ জ্ঞান লাভের উৎস । দার্শনিক বার্গসোঁ স্বজ্ঞাবাদের প্রবক্তা ।  অন্যদিকে বিদ্যা প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞান, শিক্ষা, দর্শন, বা কোনো বাস্তব জ্ঞানের  ক্ষেত্রে “সঠিক জ্ঞান” বোঝায় যা বিতর্কিত বা খণ্ডন করা অসম্ভব  ! যার অর্থ হলো বিবেচনা করা, সন্ধান করা, জানা, অর্জন করা বা বোঝা । অনেকের মতে বিদ্যা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য — মানুষ হওয়া । আবার অনেকে বিদ্যা অর্জন অন্য অর্থে বুঝে থাকেন । আমরা বুঝি বিদ্যা অর্থ শিক্ষা ।  দুটি দৃষ্টিকোন থেকে শিক্ষার উদ্দেশ্যকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে । একটি ব্যক্তিক, অপরটি সমষ্টিক বা রাষ্ট্রীক দৃষ্টি ভঙ্গি ।  ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি একটি পুরাতন প্রবাদ বাক্য- “লেখা পড়া করে যেই / গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই”- দিয়েই সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কেননা ঐ প্রবাদ বাক্যের মর্মার্থ আমাদের দেশের মানুষের মানসভূমে গভীর ভাবে শিকড় বিস্তৃত করে আছে । মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকের চিন্তা  আরও সংকীর্ণ ও আত্মকেন্দ্রিক । অধিকাংশ বাবা-মা তাদের মেয়েকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠান একটাই উদ্দেশে,  যাতে শিক্ষিত ও ভাল অর্থ উপার্জকারী পাত্র শিকার করা যায় ।  তবে অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে । পারিবারিক সংস্কৃতির উপর এটি নির্ভর করে । তা ছাড়া বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, নারী শিক্ষার কলেবর  ঊর্ধ্বগতি !  কিন্তু ধনী-গরীব নির্বিশেষে এই সংকীর্ণ  চিন্তা পরিহার করার সময় এসেছে । নারীরা  এখন “মহলের” অলঙ্কার ‘মহিলা’ নয়; নারীরা এখন অনেক উন্নত-মনস্ক  মানুষ । দেশের উন্নয়নের নিরিখে  তারাও পুরুষদের সম-মর্যাদার ।  “Education is the method of civilization” “শিক্ষাই সভ্যতার বাহন ।” সভ্যতার অগ্রসরতা মানেই মানব সমাজের বিকাশ । আধুনিক যুগে প্রতি রাষ্ট্রের একটি শিক্ষানীতি থাকে এবং সেই  অনুসারে শিক্ষা পদ্ধতিকে সাজানো হয় । আমাদের দেশেও একাধিক শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে । আমাদের জাতীয় শিক্ষা নীতির (NEP, 2020)  উদ্দেশ্য হচ্ছে , বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু হ্রাস করে প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং অভিজ্ঞতা শিক্ষার উপর বৃহত্তর ফোকাস  ।
সর্বশেষে এটাই বলা যায়,  শিক্ষার  অন্যতম  লক্ষ্য হলো জ্ঞানার্জন । জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই মানুষের বিভিন্ন দিকে দক্ষতা বাড়ে । মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশলাভ তখনই ঘটে যখন জ্ঞানার্জন সম্ভব  । জ্ঞান  অর্জন করলে  যেমন ব্যক্তির মানসিক  উন্নতিসাধন  হয়  তেমনই ব্যবহারিক  দিকেও প্রভূত উন্নতিসাধন ঘটে । সুতরাং প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক,  শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রবহমান অটুট  থাকবে  নিজস্ব মহিমায় ।

 

(তথ্যসূত্র ও ছবি: সংগৃহীত ও যোজনা ০২ & ০৫/২৩)

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

একটি শিশুর বেড়ে ওঠা থেকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আজ ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ পরিষদের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৯৪ সালকে আন্তর্জাতিক পরিবার বর্ষ ঘোষণা করেছিল। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে একটি পরিবারের ভূমিকা কি তা আমরা সকালেই জানি। একটি শিশুর বেড়ে ওঠা থেকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবার এমন একটি সমাজিক বন্ধন যা একটি ব্যক্তিকে জীবনের চলার পথে সমূহ ঝড় ঝঞ্ঝা প্রতিহত করতে সহযোগিতা করে। তাই এ ক্ষেত্রে যৌথ পরিবারের ভূমিকা আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারন সুখে দুঃখে সকলকে একসঙ্গে না হোক কাউকে না কাউকে পাশে পাওয়া যায়। নিজেদের সুখ দুঃক্ষ গুলো ভাগ করে নেওয়া যায়। কিন্তু দুক্ষের বিষয় হলো এই যে  যতো দিন যাচ্ছে ততই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হচ্ছে পরিবার। কর্মের আর ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে আমরা নিজেদের ক্রমেই ভাগে ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। বঞ্চিত হচ্ছি, পরিবারের ছোটদের কিংবা নব প্রজন্ম কে বঞ্চিত করছি যৌথ পরিবারের আসল সুখ থেকে।

 

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে  মনে হচ্ছে একান্নবর্তী কিংবা যৌথ পরিবারের ধারণা যেন এখন ‘সেকেলে’ হয়ে গেছে। বিশেষ করে, শহুরে জীবন ব্যবস্থায় এই ব্যাপারটি চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা যেন ছুটে চলেছি  সুখ নামক এক অসুখের পেছনে। একা থাকব একা পরব, আমি আমার সন্তান আমার বৌ এই যেন একটা গন্ডি তৈরি করছি সকলে। কিন্তু ভুলে যাচ্ছি প্রকৃত সুখ কি সেটা ভাবতে বা বুঝতে। যৌথ পরিবারে হয়তো মতগত বিভিন্ন পার্থক্য থাকে, আর এটাই সভাবিক। কিন্তু যৌথ বা একান্নবর্তি পরিবারের মধ্যে যে সুযোগ সুবিধা গুলো থাকে সেটাও আমাদের ভাবতে হবে। কিন্তু দিন দিন জেনে আমরা সেই ভাবনা থেকে সরে আসছি। এর ফলও ভুক্তে হচ্ছে ক্ষুদ্র পরিবার গুলোকে। হঠাৎ অসুখ বিসুখ,  বিপদে আপদে বা বিপর্যয়ে সেই সমস্যা গুলো প্রকট হয়ে ওঠে। আমরা বুঝি না প্রতিটা অনু পরিবারও একদিন বড় হবে। সন্তান বড় হবে, তার বিয়ে হবে, তার সন্তান হবে এই ভাবেই। আর, আমরা কেবল ভাংতেই আছি!!

 

আমরা জানি পরিবার মানেই হচ্ছে মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা, দিদি, দাদু, দিদা, কাকা, কাকি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস।  আমাদের সমাজব্যবস্থায় পরিবারের এই ধারণা প্রচলিত অতীত থেকেই। কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে, আমরা যেন ততোই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছি। যেন ক্রমেই ‘স্বামী-স্ত্রী-সন্তানে’ই সীমাবদ্ধ করে ফেলছি আমরা পরিবারকে। সেখানে মা-বাবা কিংবা দাদা-দাদীর কোন স্থান নেই। মা-বাবাকে হয়তো গ্রামের বাড়িতে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গ-অসহায় জীবন। আবার অনেক মা-বাবার ঠিকানা হচ্ছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’। এর থেকে বড় যান্ত্রনার অর কি হতে পারে ! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে একান্নবর্তী কিংবা যৌথ পরিবারের ধারণা যেন এখন ‘সেকেলে’ হয়ে গেছে। বিশেষ করে, শহুরে জীবন ব্যবস্থায় এই ব্যাপারটি চরম আকার ধারণ করেছে।  রক্তের বন্ধন মানেই পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে অকৃত্রিম সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তা অটুট রাখা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের চিরায়ত সমাজ ব্যবস্থায় সুন্দর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, সুন্দর পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের সকল সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বন্ধুর মতো হলে পারিবারিক নানা জটিল সমস্যা ও মোকাবেলা করা যায়। সকলের এগিয়ে চলার পথ হয় মসৃণ।  তাই যৌথ পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার মানসিকতা সৃষ্টির লক্ষে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

 

তবে সুপ্রাচীন কাল থেকে যে যৌথ পরিবারে চিত্র সারাবাংলা জুড়ে ছিল এখন তা অনেকটাই ম্লান। শহুরে জীবনে অনেক আগেই বিলীন হয়েছে যৌথ পরিবারের চিত্র। আগে গ্রামে কিছু যৌথ পরিবার দেখা গেলেও এখন তাও নেই। কেউ ইচ্ছে করে কিংবা কেউ কর্মের তাগিদে ভেঙে দিচ্ছে যৌথ পরিবারের ধারনা গুলো। বংশ মর্যাদা এমনকি ঐতিহ্যের পরিবারেও বিলীন একত্রে বাস করার ইতিহাস। যা দেখতে এক সময় মনুষ অভ্যস্থ ছিল তা এখন স্বপনের মতন। হয়তো সিনেমার পর্দায় কেবল ভেসে ওঠবে গল্পের মতো অতিতের ইতিহাস।

নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কির মতে – “পরিবার হল একটি গোষ্ঠী বা সংগঠন আর বিবাহ হল সন্তান উৎপাদন ও পালনের একটি চুক্তি মাত্র”। সামনার ও কেলারের মতে- ‘পরিবার হল ক্ষুদ্র সামাজিক সংগঠন, যা কমপক্ষে দু’ পুরুষকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে”- এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে বোঝা যায়, বিবাহপ্রথার আগেও সমাজে পরিবারের সৃষ্টি হয়েছিল- কারণ এ সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার আগে থেকেই মানুষ দলবদ্ধ জীবনযাত্রা করত যা পারিবারিক জীবনযাপনের স্বাক্ষরবহ। তবে বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন সংস্কৃতির পরিবারের ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ নানামুখী ধারা যে কারণে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে এর গঠন ও অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। যে শিশুটি ভবিষ্যতের নাগরিক, তার মনোজগত প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধারা কেমন, কী ধরনের প্রথা-রীতিনীতি, এ সবের উপর ভিত্তি করে তার জীবনভঙ্গি গড়ে ওঠে। তাই শিশুর সুষ্ঠু পারিবারিক শিক্ষা শৈশব তথা শিশুর মন তথা সাদা কাগজের পাতায় যে ছাপ রাখে, তা ওর পরবর্তী জীবনে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় যেমন কিছু সংবিধান আছে তেমনি পারিবারিক সংবিধানও থাকা দরকার। যেমন পরিবারের সবার সঙ্গে সদ্ভাব গড়ে তোলা, সাংসারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিথ্যে না বলা, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করা, নির্দিষ্ট সময়ে ঘরে ফেরা, নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করা, মিথ্যেকে ঘৃণা করা এবং মানবিক মূল্যবোধগুলোর চর্চার মাধ্যমে অন্তরকে বিকশিত করা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের সমাজে প্রচলিত যৌথ পরিবারে পারস্পরিক সম্প্রীতি গভীর হয়, অটুট থাকে। অসুখ বিসুখসহ নানা সমস্যায় একে অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এতে অনেক বড় সমস্যাও সমাধান হয়ে যায় অতি সহজে। সময়ের তাগিদে যৌথ পরিবার কিংবা পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার বিষয়টি যখন এই সমাজে ক্রমান্বয়ে গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আজকের এই আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। আসুন আমরা সেই ভাবনাকে বুকে নিয়ে আবার একি সূত্রে আবদ্ধ হই ।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

 

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

আজ ‘মা দিবস’, জানব দিনটি পালনের ইতিহাস ও তাৎপর্য।

জীবনের কোনও মুহূর্তেই ‘মা’-কে বাদ দিয়ে ভাবা যায় না। এই একটা শব্দ মনে অনেক শক্তি যোগায়, যা সকল প্রকার বাধাকে কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট। মা ছাড়া জীবন অচল, নিঃসঙ্গ যাত্রায় প্রতিটি মূহূর্ত নির্জন, জীবনে মায়ের প্রয়োজনীয়তা অসীম, মায়ের আশীর্বাদেই কঠিন পরিস্থিতিও হয় সহজ। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার পৃথিবী জুড়ে পালিত হয় ‘মাদার্স ডে’। যদিও প্রতিটি দিন মায়ের জন্য সমান, কিন্তু মাতৃ দিবস এমন একটি দিন, যেদিন শিশুরা তাদের মায়ের এই একটি দিন বিশেষ তৈরি করতে চায়। এই খুশি উপলক্ষে মাতৃ দিবসে  মা-কে শুভেচ্ছা জানান। এই বছর এই বিশেষ দিনটি পড়েছে ১৪ মে।

 

মা দিবস হল পরিবার বা ব্যক্তির মাকে সম্মান করার একটি দিন, সেইসাথে মাতৃত্ব, মাতৃত্বের বন্ধন এবং সমাজে মায়েদের প্রভাব তা স্মরণ করা । তবে এটি বিশ্বের অনেক অংশে বিভিন্ন দিনে পালিত হয়, সাধারণত মার্চ বা মে মাসে।  এটি অনুরূপ উদযাপনের পরিপূরক, পরিবারের সদস্যদের সম্মান করে, যেমন ফাদার্স ডে, ভাই-বোন দিবস এবং দাদা-দাদি দিবস।

 

ঠিক কবে থেকে পালিত হচ্ছে মাতৃ দিবস? এর ইতিহাসই বা কী? এই সম্পর্কে অনেক ভিন্ন মতামত রয়েছে। একাংশের মতে প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানদের মধ্যেই মাকে শ্রদ্ধা জানাতে এই বিশেষ উদযাপনের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় প্রথম। তারা মাতৃদেবী রিয়া এবং সাইবেলের সম্মানে উৎসবের আয়োজন করে। অন্যদিকে কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাতৃদিবস উদযাপন হয় প্রথম। ১৯০৮ সালে মার্কিন কর্মী আনা জার্ভিস প্রথম এই দিন উদযাপন করেন।আনা জার্ভিস তাঁর মা, অ্যান রিভস জার্ভিসের সঙ্গে থাকতেন। এমনকি তিনি কখনও বিয়েও করেননি। মায়ের মৃত্যুর পর, আনা জার্ভিস তাঁরই স্মরণে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং বলা হয় যে এখান থেকেই মাতৃ দিবসের সূচনা হয়েছিল।আনা জার্ভিস ছিলেন একজন শান্তি কর্মী যিনি গৃহযুদ্ধের সময় আহত সৈন্যদের যত্ন নেওয়ার জন্য মাতৃ দিবস ওয়ার্ক ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আনা জার্ভিস তার পরিবার এবং দেশের প্রতি তার মায়ের উত্সর্গ এবং আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছিলেন এই দিনটির মাধ্যমে। আনা জার্ভিসের প্রয়াসেই মাতৃ দিবস বা মাদার’স ডে ১৯১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারী স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার গোটা বিশ্বে মাতৃ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

 

বেশিরভাগ দেশেই মা দিবস হল একটি সাম্প্রতিক রীতি, যা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ছুটির দিনটির রীতি অনুসারে চলে এসেছে। যখন অন্যান্য বহু দেশ ও সংস্কৃতি এটিকে গ্রহণ করে তখন এই দিনটিকে একটি অন্য মাত্রা দেওয়া হয়, বিভিন্ন পর্বের (ধর্মীয়, ঐতিহাসিক বা পৌরানিক) সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, এবং একটি একদমই অন্য দিন বা বিভিন্ন দিনে এটিকে পালন করা হয়।
কিছু কিছু দেশে বহু আগে থেকেই মাতৃত্বের প্রতি উৎসর্গিত কয়েকটি অনুষ্ঠান ছিল এবং সেইসব অনুষ্ঠানে মার্কিন মা দিবসের মত মায়েদের কার্নেশন (গোলাপী ফুল) এবং আরো অন্য উপহার দেওয়া হত।
অনুষ্ঠান পালনের রীতিটি অনেক রকম। অনেক দেশে মা দিবস পালন না করলে এটিকে প্রায় একটি অপরাধ গণ্য করা হয়। অনেক দেশে আবার মা দিবস একটি স্বল্প-পরিচিত উৎসব যা মূলত প্রবাসী মানুষেরা পালন করে থাকে বা বিদেশী সংস্কৃতি হিসাবে মিডিয়া সম্প্রচার করে থাকে (U.K বা যুক্তরাজ্যে দীপাবলী পালনের মত)।

 

যদিও কিছু দেশে মা উদযাপনের বহু-শতাব্দীর ইতিহাস রয়েছে, তবে ছুটির আধুনিক আমেরিকান সংস্করণটি ২০ শতকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল অ্যানা জার্ভিসের উদ্যোগে, যিনি প্রথম মা দিবসের পূজার আয়োজন করেছিলেন এবং  ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে উদযাপন, যেটি আজ আন্তর্জাতিক মা দিবসের মন্দির হিসেবে কাজ করে।  এটি হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান মা এবং মাতৃত্বের অনেক ঐতিহ্যবাহী উদযাপনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, যেমন গ্রীক কাল্ট থেকে সাইবেলে, মাতৃদেবতা রিয়া, হিলারিয়ার রোমান উত্সব, বা অন্যান্য খ্রিস্টান ধর্মযাজক মাদারিং  রবিবার উদযাপন (মাদার চার্চের ছবির সঙ্গে যুক্ত)।  যাইহোক, কিছু দেশে, মা দিবস এখনও এই পুরানো ঐতিহ্যের সমার্থক।  মা দিবসের আমেরিকান সংস্করণটি খুব বেশি বাণিজ্যিকীকরণের জন্য সমালোচিত হয়েছে।  জার্ভিস নিজেই, যিনি একটি লিটারজিকাল পালন হিসাবে উদযাপন শুরু করেছিলেন, এই বাণিজ্যিকতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং প্রকাশ করেছিলেন যে এটি তার উদ্দেশ্য ছিল না।  এর প্রতিক্রিয়ায়, কনস্ট্যান্স অ্যাডিলেড স্মিথ ইংরেজিভাষী বিশ্বের অন্যান্য অনেক অংশে মাতৃত্বের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞার স্মারক হিসেবে মাদারিং সানডে-এর পক্ষে সফলভাবে ওকালতি করেছেন।

 

আধুনিক ছুটির দিনটি প্রথম পালিত হয় ১৯০৭ সালে, যখন আনা জার্ভিস পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে প্রথম মা দিবসের উপাসনা করেন।  অ্যান্ড্রু’স মেথডিস্ট চার্চ এখন আন্তর্জাতিক মা দিবসের মন্দিরটি ধারণ করে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসকে একটি স্বীকৃত ছুটিতে পরিণত করার জন্য তার প্রচারণা শুরু হয়েছিল ১৯০৫ সালে, যে বছর তার মা অ্যান রিভস জার্ভিস মারা যান।  অ্যান জার্ভিস ছিলেন একজন শান্তি কর্মী যিনি আমেরিকান গৃহযুদ্ধের উভয় পক্ষের আহত সৈন্যদের যত্ন নিতেন এবং জনস্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানের জন্য মাদার্স ডে ওয়ার্ক ক্লাব তৈরি করেছিলেন।  তিনি এবং অন্য একজন শান্তি কর্মী এবং ভোটাধিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাওয়ে একটি “শান্তির জন্য মা দিবস” তৈরি করার জন্য জোর দিয়েছিলেন যেখানে মায়েরা জিজ্ঞাসা করবেন যে তাদের স্বামী এবং ছেলেরা আর যুদ্ধে নিহত হবেন না।  এটি একটি সরকারী ছুটি হওয়ার ৪০ বছর আগে, ওয়ার্ড হাউ ১৮৭০ সালে তার মাদার্স ডে ঘোষণা করেছিলেন, যা “আন্তর্জাতিক প্রশ্নের বন্ধুত্বপূর্ণ মীমাংসা, শান্তির মহান এবং সাধারণ স্বার্থ” প্রচার করার জন্য সমস্ত জাতীয়তার মায়েদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানায়।  আনা জার্ভিস এটিকে সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন এবং সমস্ত মাকে সম্মান জানাতে একটি দিন নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে একজন মা হলেন “সেই ব্যক্তি যিনি আপনার জন্য বিশ্বের যে কারও চেয়ে বেশি করেছেন”।

১৯০৮ সালে, ইউ.এস. কংগ্রেস মাদার্স ডেকে একটি সরকারী ছুটিতে পরিণত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, মজা করে যে তাদেরও একটি “শাশুড়ি দিবস” ঘোষণা করতে হবে।  যাইহোক, আনা জার্ভিসের প্রচেষ্টার কারণে, ১৯১১ সাল নাগাদ সমস্ত মার্কিন রাজ্য ছুটি পালন করে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবসকে স্থানীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় (প্রথমটি হল ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, জার্ভিসের হোম স্টেট, ১৯১০ সালে)।  ১৯১৪ সালে, উড্রো উইলসন একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন যেটি মা দিবসের নামকরণ করে, যা মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার অনুষ্ঠিত হয়, মায়েদের সম্মানের জন্য একটি জাতীয় ছুটির দিন হিসাবে।
যদিও জার্ভিস, যিনি মা দিবসকে একটি লিটারজিকাল পরিষেবা হিসাবে শুরু করেছিলেন, উদযাপনটি প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন, তিনি ছুটির বাণিজ্যিকীকরণে বিরক্ত হয়েছিলেন এবং এটি “হলমার্ক হলিডে” শব্দগুচ্ছের সাথে যুক্ত হয়েছিল।  ১৯২০ এর দশকের গোড়ার দিকে, হলমার্ক কার্ড এবং অন্যান্য কোম্পানিগুলি মা দিবসের কার্ড বিক্রি করা শুরু করেছিল।  জার্ভিস বিশ্বাস করতেন যে কোম্পানিগুলি মা দিবসের ধারণাকে ভুল ব্যাখ্যা করেছে এবং শোষণ করেছে এবং ছুটির জোর অনুভূতির উপর ছিল, লাভ নয়।  ফলস্বরূপ, তিনি মা দিবস বয়কট সংগঠিত করেন এবং জড়িত কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেন।  জার্ভিস যুক্তি দিয়েছিলেন যে উপহার এবং আগে থেকে তৈরি কার্ড কেনার পরিবর্তে লোকেদের তাদের ভালবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে তাদের মায়েদের প্রশংসা ও সম্মান করা উচিত।  জার্ভিস ১৯২৩ সালে ফিলাডেলফিয়াতে একটি ক্যান্ডি মেকারদের কনভেনশনে এবং ১৯২৫ সালে আমেরিকান ওয়ার মাদারদের একটি সভায় প্রতিবাদ করেছিলেন। এই সময়ের মধ্যে, কার্নেশনগুলি মা দিবসের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং অর্থ সংগ্রহের জন্য আমেরিকান যুদ্ধের মায়েদের দ্বারা কার্নেশন বিক্রি করা ক্ষুব্ধ হয়েছিল।  জার্ভিস, যাকে শান্তি নষ্ট করার জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল।
ব্রিটেনে, কনস্ট্যান্স অ্যাডিলেড স্মিথ মাদারিং সানডে-এর পক্ষে ওকালতি করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, এটি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান একটি খ্রিস্টান ধর্মযাজক উদযাপন যেখানে বিশ্বস্তরা গির্জায় যান যেটিতে তারা বাপ্তিস্মের ধর্মানুষ্ঠান পেয়েছিলেন, একটি সমতুল্য উদযাপন হিসেবে।  তিনি মাদার চার্চ, ‘পৃথিবী ঘরের মা’, মেরি, যিশুর মা এবং মাদার নেচার উদযাপনের মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন।  তার প্রচেষ্টা ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং ইংরেজি-ভাষী বিশ্বের অন্যান্য অংশে সফল হয়েছিল।

 

তাই, আন্তর্জাতিক মাদার’স ডে বা মাতৃ দিবস প্রতিটি শিশুর জন্য একটি বিশেষ দিন। বছরের এই বিশেষ দিনটি প্রত্যেক সন্তান ও মায়ের জন্য এক বিশেষ দিন। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা  জানাতে পালিত হয় দিনটি। এই দিনে, শিশু, তরুণ এবং বৃদ্ধ, তাদের মায়েদের উপহার, ফুল, কার্ড দিয়ে বা বিশেষ খাবার বা কার্যকলাপের জন্য তাদের নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাদের ভালবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। মায়ের আদরে যে আরাম, ভরসা আছে, তা আর পৃথিবীর কারও আদরে নেই।

পৃথিবীতে সবাই বদলে যায়, কিন্তু বদলায় না মা। মা দিবসে পৃথিবীর সকল মা কে তাই জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালোবাসা।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য — প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি :  দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

“দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম,
হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম ।“
সুকান্ত ভট্টাচার্য

প্রথমেই বলে রাখি, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বলা হয় গণমানুষের কবি । অসহায়-নিপীড়িত, নির্যাতিত, সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তাঁর কবিতার মূল বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী-মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরূদ্ধে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কলম ছিল সক্রিয় । তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে শোষণ-বঞ্চনার বিরূদ্ধে অভিব্যক্তি । তিনি চেষ্টা করেছেন কবিতার মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে । সর্বক্ষণ তাঁর শ্যেন দৃষ্টি ছিল মানবতার জয়ের দিকে । অসুস্থতা এমনকি অর্থাভাব তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি । তাঁর মানবিক বোধ অবিস্মরণীয় । মানুষের কল্যাণ করা ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান । মানবিক চেতনায় উদ্‌বুদ্ধ হয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন । সেই কারণে আজও আমাদের কাছে তিনি নমস্য কবি ।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৫আগস্ট, ১৯২৬ এবং মৃত্যু ১৩ মে, ১৯৪৭ । তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ঠিক দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে । বাংলা সাহিত্যের নিরিখে তিনি ছিলেন তরুন কবি । তাঁর কবিতার পটভূমি মূলত মার্কসবাদী ভাবধারার এবং প্রগতিশীল চেতনার প্রেক্ষাপটে ।
বাবা ছিলেন নিবারন ভট্টাচার্য এবং মা সুনীতি দেবী । কালীঘাটের মহিম হালদার স্ট্রিটে মাতামহের বাড়িতে তাঁর জন্ম । তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল অবিভক্ত ফরিদপুর জেলার অর্থাৎ বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার, উনশিয়া গ্রামে । তিনি স্কুলে পড়ার সময় ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন । আর তা ছাড়া বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে । এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু । তাঁর জীবনে বাল্যবন্ধু অরুণাচল বসুর প্রভাব অবর্ণনীয় । অরুণাচল বসুর মা কবি সরলা বসু । তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে পুত্রস্নেহে ভালবাসতেন । সুকান্ত ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলেও সরলা বসু তাঁকে সেই অভাব কিছুটা পূরণ করে দিয়েছিলেন । কবির জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়িতে । সেই বাড়িটি এখনও অক্ষত আছে । শোনা যায়, পাশের বাড়িটিতে এখনও বসবাস করেন সুকান্তের একমাত্র জীবিত ভাই বিভাস ভট্টাচার্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরূদ্ধে কলম ধরেন । ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন । সেই বছর আকাল নামক একটি সংকলন গ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।
আট-নয় বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন । স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা “সঞ্চয়ে” একটি ছোট্ট হাসির গল্প দিয়ে প্রথম আত্মপ্রকাশ । তারপর কয়েকদিন পরে তাঁর লেখা বিবেকান্দের জীবনী প্রথম ছাপার মুখ দেখে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে । মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন । এটি পরে ‘হরতাল’ বইতে সংকলিত হয় । এখানে জানিয়ে রাখি, পাঠশালাতে পড়ার সময়ে ‘ধ্রুব’ নাটকের নাম ভূমিকায়‍ অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য । সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্য বন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরেকটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন । সেই সময় হাতে লেখা দেওয়াল পত্রিকার প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো । বেশীর ভাগ দেওয়াল পত্রিকা স্টেশনের প্লাটফর্মে সাটানো থাকত, যাতে বেশী মানুষ পড়তে পারেন । অরুণাচল বসু তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন ।
মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত ভট্টাচার্য কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন । সুকান্ত ভট্টাচার্য কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা “ দৈনিক স্বাধীনতার” (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন । সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরূদ্ধে প্রতিবাদি কন্ঠস্বর ফুটে ওঠে । গণমানুষের প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রত্যেকটি কবিতায় । তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য: ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি । পরবর্তী কালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয় ।
পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯৪৭ সালের ১৩ মে কলকাতায় মারা যান । মাত্র একুশ বৎসর বয়সে প্রতিভাধর কবির দেহাবসান ঘটে । স্বল্প বয়সে কবির দেহাবসান ঘটলেও সামান্য কয়েকবছরে অত্যাশ্চর্য কবিত্ব শক্তির পরিচয় দিয়ে গেছেন যেটা আজও আমাদের মধ্যে অমলিন । (তথ্যসূত্র: সংগৃহীত)
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ৭৭তম প্রয়াণ দিবসে আমার শতকোটি প্রণাম ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল : দ্যা লেডি উইথ দ্যা ল্যাম্প।

আজ আন্তর্জাতিক মিডওয়াইফ বা ধাত্রী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় আজ ভারতেও পালন করা হচ্ছে দিবসটি। নার্সিং এমন একটি পেশা যা সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত। এ পেশার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিকভাবে কোন রোগী বা ব্যক্তির স্বাস্থ্য পুণরুদ্ধার এবং জীবনযাত্রার গুরুত্বতা তুলে ধরা হয়। এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত, দক্ষ কিংবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি নার্স বা সেবিকা নামে পরিচিত। প্রধানতঃ নারীরাই নার্সিং পেশার সাথে জড়িত থাকেন। তবে এখন অনেক পুুুরুষেও এই পেশার সাথে যুুুুক্ত হচ্ছেন। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের জন্মদিন কে স্মরণীয় করে রাখতে আজকের দিনটি অর্থাৎ আন্তৰ্জাতিক ধাত্রী দিবস সমগ্র বিশ্বে প্ৰতিবছর ১২ মে তারিখে পালন করা হয়। ১৮২০ সালের এই তারিখে আধুনিক নার্সিং পরিষেবার মাৰ্গদৰ্শক ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্ম হয়েছিল। এই দিবস পালনের মাধ্যমে সম্মান জানানো হয় সেই নারীকে যিনি তার কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন – নার্সিং একটি পেশা নয় সেবা। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের প্ৰতি শ্ৰদ্ধা জানাবার সাথে বিশ্বের ধাত্রীদের রোগীদের প্ৰতি দেওয়া স্বাস্থ্যসেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্ৰকাশ করা হয়।

ইতিহাস—

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর জন্মদিন কে আন্তৰ্জাতিক ধাত্রী দিবস হিসেবে পালিত হয়। তিনি ছিলেন আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, একজন লেখিকা এবং পরিসংখ্যানবিদ। যিনি দ্যা লেডি উইথ দ্যা ল্যাম্প নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮২০ সালের ১২ মে মাসে ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।
ছোটবেলা থেকে তার স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়া। কিন্তু তখনকার সময়ে নার্সিংকে সম্মানের চোখে দেখা হতো না। এছাড়া তার পিতা-মাতা চাননি ফ্লোরেন্স নার্স হোক। তাই ফ্লোরেন্সকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়। কেননা তার নিজ বাড়িতে তার স্বপ্নটি পূরণ করা সম্ভব ছিলনা।
১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালান। যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবদান রাখে।লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশারূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং । ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সাথে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় নার্সিংয়ের উপর বইও লিখেছেন। ১৮৮৩ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদক প্রদান করেন। প্রথম নারী হিসাবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি। এ ছাড়াও ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’। যার মধ্যেমে সম্মান জানানো হয় এক নারীকে যিনি তার কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন- নার্সিং একটি পেশা নয় সেবা। ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।

 

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে নার্সিং ইতিহাসে বৈপ্লবিক উন্নয়ন ও পরিবর্তন ঘটেছিল। এতে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পেশাদারী পর্যায়ে নার্সিংয়ের পরিধি এবং নীতিমালা প্রণয়ন ও বিশ্লেষণপূর্বক তার প্রণীত নোটস অন নার্সিং গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
পেশাদারী পর্যায়ে এ পেশার মানোন্নয়নে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নার্স ব্যক্তিত্বরূপে ম্যারি সীকোল, এগনেস এলিজাবেথ জোন্স এবং লিন্ডা রিচার্ড ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন। ম্যারি সীকোল ক্রিমিয়ায় কাজ করেছেন; এগনেস এলিজাবেথ জোন্স ও লিন্ডা রিচার্ডস গুণগত মানসম্পন্ন নার্সিং বিদ্যালয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে প্রতিষ্ঠা করেন। তন্মধ্যে – লিন্ডা রিচার্ডস আমেরিকার প্রথম পেশাদার ও প্রশিক্ষিত নার্সরূপে ১৮৭৩ সালে বোস্টনের নিউ ইংল্যান্ড হসপিটাল ফর উইম্যান এন্ড চিল্ড্রেন থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন।
বিশ্বের ১ম দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ে নার্সদেরকে নিবন্ধিত করা হয়। ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯০১ সালে নার্সেস রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট প্রণীত হয়। এলেন ডাফার্টি ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রথম নিবন্ধিত নার্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্যরূপে নর্থ ক্যারোলাইনায় নার্সিং লাইসেন্স ল ১৯০৩ সালে গৃহীত হয়। ১৯৯০-এর দশকে নার্সদেরকে ঔষধ দেয়া, ডায়াগনোস্টিক, প্যাথলজি পরীক্ষাসহ রোগীদেরকে প্রয়োজনে অন্য পেশাদারী স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের কাছে স্থানান্তরের অনুমতি দেয়া হয়।

 

আন্তর্জাতিক ধাত্রী পরিষদ বা ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ নার্সেস (আইসিএন) ১৯৬৫ সাল থেকে এই দিনটি উদযাপন করে আসছে। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণ বিভাগের একজন কর্মকর্তা ডরোথি সাদারল্যান্ড প্রস্তাব করেন যে প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার “ধাত্রী দিবস” ঘোষণা করবেন; তবে তিনি তা অনুমোদন করেননি।
১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে, ১২ মে দিনটি উদযাপনের জন্য নির্বাচিত হয় কারণ এটি আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মবার্ষিকী। প্রতি বছর, আইসিএন আন্তর্জাতিক নার্স দিবসের কিট প্রস্তুত এবং বিতরণ করে। কিটে সর্বত্র নার্সদের ব্যবহারের জন্য শিক্ষাগত এবং উন্মুক্ত তথ্য উপকরণ রয়েছে।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আমার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ :: অরূপ কুমার ভট্টাচার্য্য।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ও বাঙালির শৈল্পিক অহঙ্কারের সৌধে অনিবার্যভাবে বিরাজমান। বাংলার সামাজিক উত্থান-পতনের এক যুগ সন্ধিক্ষণে তাঁর জন্ম। ঐতিহ্যবাহী কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সন্তান হিসেবে রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোর অতিক্রান্ত হয়েছে জ্ঞানচর্চার এক নির্মল পরিবেশের মধ্যে। মহর্ষি পিতার উপনিষদ চর্চা বালক বয়সেই রবীন্দ্রমানস-গঠনে প্রতিফলন ঘটে এবং সেই শিক্ষাকে তাঁর সমস্ত সত্তায় আত্মস্থ করে নেন। বাল্যকালের সেই উপনিষদিক শিক্ষার আলো সারাজীবন তাঁকে পথ দেখিয়েছে। উপনিষদে যে সত্যের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন সেই সত্যেরই উজ্জ্বল প্রভা তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল। তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্য সাধনা, মেধা ও শ্রমে নিজেই ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করেছেন যা তাঁকে বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। নিজের বিরাট সৃষ্টিশীল ক্ষমতা তাঁকে এক যুগোত্তীর্ণ মহাপুরুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। বাংলা সাহিত্যে হাতে গোনা যে ক’জন বড় মাপের খ্যাতিসম্পন্ন লেখক আছেন তার মধ্যে একজন অন্যতম পুরোধা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবিভক্ত বাংলায় নবজাগরণের মধ্যাহ্নে রবি কিরণের উন্মেষ ঘটেছিল। সেই থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে সত্য ও সুন্দরের ফলগুধারার মতো বহমান এবং সমগ্র বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা সাহিত্যজগতে হিমাদ্রির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন এক অলৌকিক ঐশ্বর্য নিয়ে। বাঙালির সমৃদ্ধ ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বহুলাংশ জুড়েই আছেন ধীমান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বাঙালি তাই তার প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি সংশয়ে আশ্রয় নেয় সেই রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবীন্দ্রনাথ নিজের সমৃদ্ধ সাহিত্য চর্চার পরিধি দিয়ে বিস্তৃত করেছেন গোটা বাংলা সাহিত্যের পরিসর। আমরা তাঁকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় অভিষিক্ত করেছি। রবীন্দ্রনাথের সাফল্যের এই ক্রম-উত্তরণ কিন্তু একদিনে ঘটেনি। এক লহমায় তিনি ‘বিশ্বকবি’ বা ‘কবিগুরু’ অভিধায় ভূষিত হননি। সমগ্র রবীন্দ্র জীবন ও সৃষ্টির পিছনে রয়েছে তাঁর সৃষ্টির দীর্ঘ অবিশ্রান্ত পথ চলা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তাঁর রচনা চির নতুন ও চিরকালের, কারণ তিনি জগৎ ও জীবনকে দেখেছেন বর্তমানের দৃষ্টির সীমানায়। যে দৃষ্টি তৈরি হয়েছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দর্শনের সমন্বিত অন্তর্দৃষ্টি থেকে। তাই তিনি সব সময়ই আজকের রবীন্দ্রনাথ। বাঙালির যাপিত জীবনাচরণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। জীবনের প্রভাত থেকে অন্তিমলগ্ন তিনি বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা; সব্যসাচী লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুর স্রষ্টা, গায়ক, সমালোচক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অনন্য। তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে, বিপুল সৃষ্টিসম্ভারে বদলে দিয়েছেন বাঙালির মানসজগত এবং বাংলাকে দিয়েছেন বিশ্ব পরিচিতি। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান। একে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। আমাদের শিল্প-সাহিত্য, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি, জীবন- চেতনায় রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই অপরিহার্য। আমাদের জীবনের সঙ্গে, চেতনার সঙ্গে, মননের সঙ্গে, আন্দোলনে, ভাষার মাধুর্যে, দেশপ্রেমে সৃষ্টিশীল কর্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আমাদের প্রাণের টানে, জীবনের টানে, চেতনার টানে, শিল্প ও সাহিত্যের টানে রবীন্দ্রনাথের কাছে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হবে শিল্পের আরাধনায়। তাঁর কবিতার ছন্দ, বাণী ও সুর আমাদের হৃদয়ে বুলিয়ে দেয় শান্তির শুভ্র পরশ। অনন্ত অসীমের সেই অসামান্য রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা প্রার্থনায় নতজানু হই, সমর্পিত হই, পরম বিশ্বাসে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের কবি, প্রেমের কবি, জীবনের কবি, প্রকৃতির কবি, গানের কবি সর্বোপরি মানুষের ভালোবাসার কবি হয়ে চেতনার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে অপার্থিব আনন্দলোকে আনন্দের বিস্তৃৃতি ঘটিয়েছেন। তিনি বাঙালি হয়েও চিন্তা-চেতনায় আধুনিক ও আন্তর্জাতিক বোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তাঁর শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ছড়া, কবিতা কিংবা বড়দের জন্য লেখা কবিতা, গান, গল্প-উপন্যাসে আমরা বাঙালির সহজ সরল জীবনকে তুলে ধরতে দেখি। তাঁর নানা কাব্যগীতিতে আমরা প্রেম সৌন্দর্য, রোমান্টিক ভাবনা, আধ্যাত্মিক কল্পনার চিন্তাধারা পরিলক্ষিত হতে দেখি। রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ গল্প উপন্যাস এখনো আমাদের সৃজনশীল মনকে আন্দোলিত করে। আমরা রাবীন্দ্রিক চরিত্রগুলোকে চলচ্চিত্র ও মঞ্চে রাজা ও রানী, বিসর্জন, রক্তকরবী, চিত্রাঙ্গদা, চিরকুমার সভা, বাল্মিকী প্রতিভা, তাসের দেশ, ডাকঘর, রাজা, মুক্তধারা, অচলায়তন, শাপমোচন, শেষের কবিতা, সফল সঞ্চায়ন দেখি; তখন আমরা নিজেরা কিছুটা রাবীন্দ্রিক হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। রবীন্দ্রনাথ আছেন বাঙালির হৃদয় জুড়ে তাঁর সৃষ্টির উৎসারণে কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, মঞ্চনাটক, টিভি নাটক, নৃত্যনাট্য, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত এবং বাংলার সমগ্র সংস্কৃতিতে। তিনি তাঁর মানবীয় উচ্চ ভাবনা-চেতনা আর মানুষের চিরায়ত অনুভূতি ভাষার সৌকর্য সাধন আর নিপুণ শৈল্পিক উপস্থাপনার মাধ্যমে কাব্য-সঙ্গীত-প্রবন্ধ-গল্পে আর চিত্রকলায় রূপায়িত করে মানুষের চেতনাকে শানিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ব্যাপকতা বিশ্বজুড়ে শিখরস্পর্শী প্রতিভায় উদ্ভাসিত যা বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বকীয়তায় ছড়িয়েছে রবির আলো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনকে শিল্পবোধ থেকেই অনুভব করেছেন। আর সেজন্য তাঁর শিল্প-সৃষ্টি প্রায়শই জীবনসংলগ্ন। তিনি কাব্য, গল্প, উপন্যাস, সঙ্গীত, নাটককে জীবনের প্রতিভাষে সিঞ্চিত করেছেন। যা রূপালঙ্কার, প্রতীক ও বিমূর্ততার দ্যোতনায় হয়েছে উজ্জ্বল। সব মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। দেড়শ বছর পেরিয়েও কবি আমাদের মাঝে তাই চিরজাগরুক হয়ে আছেন।

সমগ্র বাঙালির মানস জগতে রবীন্দ্রনাথ চিরকালীন আবেগ, প্রেরণায় জাগ্রত থাকবেন এবং বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির আলোর দিশারি হয়ে আলো ছড়াবেন যুগ থেকে যুগান্তরে। তাঁর সৃষ্টি, তাঁর স্বপ্ন আর জীবন দর্শন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে সত্য ও সুন্দরের।

——————————————————————————-

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

বৃন্দাবনের পথে শ্রীজাহ্নবার অদ্ভুত লীলা : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

শ্রীনিত‍্যানন্দের দ্বিতীয়া পত্নী ঈশ্বরী শ্রীজাহ্নবাদেবী প্রথম বার যখন বৃন্দাবন গমন করেন সেটা ছিল সম্ভবতঃ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দের (১৪৮২ শকাব্দ) মাঘ মাস। সহযাত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ‘প্রেমবিলাস’ গ্রন্থরচনাকার নিত্যানন্দ দাস, উদ্ধারণ দত্ত প্রমুখ। আর দ্বিতীয়বার ব্রজে পদার্পণ করেন ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে (১৫০৪ শকাব্দ) খেতু্রীর উৎসবের পরে। সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন পদকর্তা গোবিন্দ দাস, জ্ঞানদাস, ভাস্কর নয়ন মিশ্র, পরমেশ্বর দাস প্রমুখ। দ্বিতীয়বার যাত্রাপথে জাহ্নবা মাতা অনেক অলৌকিক লীলা প্রদর্শন করেন। পথের মধ্যে রাত্রিযাপন কালে এক গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন যখন, সেসময় স্থানীয় কিছু নিন্দুক গ্রামবাসী লক্ষ্য করেন যে, সঙ্গীরা সকলে এক রমণীর (জাহ্নবাদেবীর) চরণে প্রণত হচ্ছেন। এ ঘটনায় তাঁরা অত্যন্ত আশ্চর্য ও ক্ষুব্ধ হলেন। কারণ চন্ডীদেবীর পরিবর্তে কোন মানুষীর চরণে শরণাগত হয়েছিল সঙ্গীরা সকলে। তাই তাঁরা গ্রাম মধ‍্যস্থ চন্ডীমন্ডপে চন্ডীমাতার কাছে নালিশ করলেন যে, যারা দেবীর পরিবর্তে মানুষের চরণে পতিত হয় তাদের যেন তিনি সংহার করেন অবিলম্বে। শাস্তি বিধান অত্যন্ত প্রয়োজন। এমন বলে যখন তাঁরা নিদ্রায় গেলেন তখন ক্রোধিত দেবী চণ্ডী তাঁদেরকে স্বপ্নাদেশ দিলেন –“জাহ্নবাকে নারীজ্ঞানে অবহেলা করছো তো, তোমাদের মুণ্ডছেদন করবো আমি ! মহিমা না জেনে ধিক্কার করছো তাঁর! মানুষী জ্ঞান করছো! কিন্তু তিনি আমারও প্রণম‍্য। কাল প্রভাতেই অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমাভিক্ষা চাইবে তাঁর কাছে। না হলে, আমি তোমাদের সংহার করবো।” নিন্দুকেরা সকলে পরদিবস প্রভাতেই মাতার চরণে পড়লেন। দোষ স্বীকার করে ক্ষমাভিক্ষা চাইলেন। ঈশ্বরী জাহ্নবা সন্তান জ্ঞানে সকলকে কাছে টেনে নিয়ে কৃপা করলেন। প্রত‍্যক্ষদর্শী নিত্যানন্দ দাসের বিবরণ অনুযায়ী এমন আরও এক অলৌকিক লীলা করেন জাহ্নবা ঠাকুরাণী পথে।

কুতুবুদ্দিন নামক এক দস‍্যুদলপতি নিজের সঙ্গীদের নিয়ে রাতে ডাকাতি করতে আসেন যে গৃহে জাহ্নবা মাতা তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই গৃহেই। কিন্তু, ডাকাতদল সারারাত ধরে ঘুরেও পথ খুঁজে পেলেন না গৃহে প্রবেশের। গৃহের চারিদিকে বিশালাকার ভয়ংকর সব সর্প ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গৃহের দিকে এগোতেই ছুটে আসছিল সর্পরা দংশন করতে। রাত্রি শেষ হয়ে গেল, কিন্তু প্রতীক্ষা ব্যর্থ হল। কিছুই করতে পারলেন না তাঁরা। শেষরাত্রে দৈববাণী হল—-“ঠাকুরাণীই তোমাদের জব্দ করলেন।” কুতুবুদ্দীন তাঁর সঙ্গীসাথীসমেত মাতার চরণে শরণ নিয়ে ক্ষমা চাইলেন। জাহ্নবাদেবী নামপ্রেম দিয়ে তাঁদের অযাচিত কৃপা করলেন।
এভাবে, পথে নানা পতিত উদ্ধার লীলা করতে করতে জাহ্নবা মাতা গণসমেত শুভাগমন করলেন মথুরায়। সেখান থেকে ব্রজে। শ্রীজীব গোস্বামী জাহ্নবাদেবী ও তাঁর সঙ্গীদের বাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। ঈশ্বরীর আগমনে বৃন্দাবনের গোস্বামীবৃন্দ যারপরনাই আনন্দিত হলেন। গোপাল ভট্ট, ভূগর্ভ গোস্বামী, লোকনাথ গোস্বামী, মধু পন্ডিত, কৃষ্ণদাস ব্রহ্মচারী প্রমুখ মহাজনরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করলেন। জাহ্নবা মাতা যে কতখানি সম্ভ্রম-সম্মান নিজ গুণে বৃন্দাবনের গোস্বামীবৃন্দের থেকে অর্জন করেছিলেন তার দৃষ্টান্ত স্বরূপ দুটি উদাহরণ দেওয়া যায় –(১) ঈশ্বরীর দ্বিতীয়বার বৃন্দাবন আগমনের পূর্বে যখন শ্রীনিবাস আচার্য বৃন্দাবন থেকে গৌড়ে গমন করবেন, তখন শ্রীগোপাল ভট্ট তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তিনি যেন গৌড়ে ফিরে জাহ্নবা মাতাকে বৃদ্ধ গোপাল ভট্টের খেদোক্তির কথা জানান –“ঈশ্বরীর পদযুগ না দেখিনু আর।” (প্রেমবিলাস , ৬ বিলাস)। আসলে অসুস্থ গোপাল ভট্টের বয়স হয়েছিল। তাই তাঁর শঙ্কা ছিল যে জাহ্নবা মাতার চরণ দর্শনের সৌভাগ্য বোধহয় আর এ জীবনে হবে না তাঁর। তাই তিনি অমন বিলাপ করেছিলেন।
(২) যখন প্রথমবার জাহ্নবা মাতা ব্রজে যান তখন রাধাকুণ্ড নিবাসী রঘুনাথ দাস গোস্বামীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পর্ব ঘটেনি। তাই তিনি দ্বিতীয়বার ব্রজে আসছেন শুনে চলচ্ছক্তিরহিত বৃদ্ধ দাস গোস্বামীজী নিজে প্রেরণ করেন শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ ও অন্যান্য বৈষ্ণববৃন্দকে , যাতে তাঁরা ব্রজ থেকে সসম্মানে জাহ্নবা মাতাকে রাধাকুণ্ডে নিয়ে আসেন। জাহ্নবাদেবী কৃপাদর্শন দান করে ধন্য করবেন দাস গোস্বামীজীকে তাহলে।
রন্ধন পটিয়সী দেবী জাহ্নবা বৃন্দাবনে আপন হস্তে ভোগ রন্ধন করে শ্রীগোবিন্দ, গোপীনাথ, মদনমোহন,রাধাদামোদর ও রাধারমণ –এই ছয় বিগ্রহকেই ভোগ নিবেদন করতেন। তারপর সেই প্রসাদামৃত ব্রজবাসীদের বিতরণ করে দিতেন। সকলেই সে সুস্বাদু প্রসাদ আস্বাদন করে ধন্য হতেন, তৃপ্ত হতেন।

ঈশ্বরী শ্রীজাহ্নবার রাতুল চরণে অধমা রাধাবিনোদিনীর ভক্তিপূর্ণ প্রাণের প্রণতি নিবেদিত হল ।

সমাপ্ত

Share This
Categories
প্রবন্ধ

অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য : ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী, মৃত্যু দিবস স্মরণে।

ভূমিকা—

 

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাট্লে দেখা যাবে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন আমাদের দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খল মুক্ত করার জন্য। কিন্তু এখনো অনেকেই জানে না অনেকের নাম। কত শহীদ এর আত্মত্যাগের ঘটনা রয়ে গেছে অন্তরালে।  এখন আমরা জানব  ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য  সম্পর্কে কিছু কথা।

 

বিপ্লবী জীবন—-

 

এবার আমরা জানব অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য’র বিপ্লব জীবনের কর্মকান্ড নিয়ে কিথা। আমরা সকলেই জানি  আলিপুর বোমা মামলার সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা।

কলকাতার ৩২ নং মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে একটি বোমা তৈরির স্থান ছিলো। সেই মুরারিপুকুরের ঘটনায় আলিপুর বোমা মামলার আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করে ১৯০৯ সনের মে মাসে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পরে দণ্ডাদেশ হ্রাস পাওয়ায় ১৯১৫ সনের মে মাসে মুক্তি পান। ১৯২০ সনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দেন ও নারায়ণ পত্রিকা পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। এছাড়াও বিজলী, আত্মশক্তি ও ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট প্রভৃতি পত্রিকার সংগেও যুক্ত ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ হচ্ছে রণসজ্জায় জার্মানি, স্বরাজসাধনা, মুক্তিসাধনা, জার্মানি প্রবাসীপত্র, ইউরোপে ভারতীয় বিপ্লবের সাধনা প্রভৃতি।

 

আলিপুর বোমা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিগণ—

৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজাফফরপুর, বিহারে রাত সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যা করেন ক্ষুদিরাম বসু। সেই ঘটনার পর আলিপুর বোমা মামলা শুরু হয়। ১৯০৯ সালের ৬ মে আলিপুর বোমা মামলার রায় দেয়া হয়। রায়ে বিচারক বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তকে মৃত্যুদণ্ড দেন। উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র কানুনগো, বিভূতিভূষণ সরকার, বীরেন্দ্র সেন, সুধীর ঘোষ, ইন্দ্রনাথ নন্দী, অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল, ইন্দুভূষণ রায়ের, দ্বীপান্তর দণ্ড হয়। পরেশ মৌলিক, শিশির ঘোষ, নিরাপদ রায় ১০ বছর দ্বীপান্তর দণ্ড, অশোক নন্দী, বালকৃষ্ণ হরিকোণে, শিশির কুমার সেন ৭ বছর দ্বীপান্তর দণ্ড এবংকৃষ্ণ জীবন সান্যাল ১ বছর কারাদণ্ড প্রাপ্ত হন। আপিলে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তের মৃত্যুদণ্ড রহিত হয় এবং তার বদলে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড হয়। অরবিন্দ ঘোষ মুক্তি পান এবং অনেকের সাজা হ্রাস করা হয়।

 

স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ—–

 

কলকাতার ৩২ নং মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে একটি বোমা তৈরির স্থান ছিলো। সেই মুরারিপুকুরের ঘটনায় আলিপুর বোমা মামলার আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করে ১৯০৯ সনের মে মাসে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পরে দণ্ডাদেশ হ্রাস পাওয়ায় ১৯১৫ সনের মে মাসে মুক্তি পান। ১৯২০ সনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দেন ও নারায়ণ পত্রিকা পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন।

 

রচিত গ্রন্থ—-

 

এছাড়াও বিজলী, আত্মশক্তি ও ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট প্রভৃতি পত্রিকার সংগেও যুক্ত ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থ হচ্ছে রণসজ্জায় জার্মানি, স্বরাজসাধনা, মুক্তিসাধনা, জার্মানি প্রবাসীপত্র, ইউরোপে ভারতীয় বিপ্লবের সাধনা প্রভৃতি।

 

মৃত্যু—-

 

১০ মে, ১৯৬২ সালে মহান এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রয়াণ ঘটে।

 

।।তথ্য ঋণ: উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবপেজ।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ব্রতচারী নিয়ে দুটি কথা : দিলীপ রায়।

আজ ১০ই মে, ব্রতচারী দিবস ৷ ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্তের জন্মদিনকে স্মরণে-সম্মানে আজকের দিনটি ব্রতচারী দিবস হিসাবে পালিত হয় বা হচ্ছে । ব্রত শব্দের অর্থ তপস্যা ও সংযমের সংকল্প । বিশেষ ব্রত নিয়ে যারা চলে , তারাই ব্রতচারী । তাই ব্রতচারীদের ব্রত পালন করার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে — সত্যনিষ্ঠা, সংযম, অধ্যবসায় ও আত্মনির্ভরতা । মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্রতচারীদেরকে – জ্ঞান , শ্রম , সত্য , ঐক্য ও আনন্দের সাথে জীবনযাপন । বাঙালির দৈহিক-মানসিক গঠন এবং নৈতিক বোধ উন্নয়নের ভাবনা থেকে গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত প্রাসঙ্গিক নৃত্য-গীত অবলম্বন করে গুরুসদয় দত্ত ১৯৩২ সালে ব্রতচারী আন্দোলনের সূত্রপাত করেন । ব্রতচারী আন্দোলন হচ্ছে একটি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের আন্দোলন । আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ভারতের নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয়চেতনা ও নাগরিকত্ববোধ । গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারণের শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হবার শিক্ষা ।
এবার আমরা গুরুসদয় দত্ত সম্বন্ধে কিছু জানার চেষ্টা করি । ব্রতচারী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত ১৮৮২ সালের ১০ মে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । গুরুসদয় দত্ত সাত বছরে পিতৃহারা, চোদ্দ বছরে মাতৃহারা হয়ে জেঠুর কাছে মানুষ হন । বালক বয়স থেকে গুরুসদয় দত্ত ছিলেন দুরন্ত , নির্ভীক আর একই সঙ্গে হৃদয়বান । ছোট বেলা থেকেই তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । প্রয়োজনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যাত্রাণে, অগ্নি নির্বাপনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তেন । গ্রামের মাইনর স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু । তারপর সিলেট শহরের ইংরাজি মাধ্যম স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং মেধানুসারে তিনি অসম প্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন । কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করে তিনি বিলেত যান । ১৯০৪ সালে তিনি আই.সি.এস. পাশ করেন এবং মেধা তালিকার সপ্তম স্থান অধিকার করেন । তিনি ছিলেন সরকারি কর্মচারি । জেলাশাসক, কালেক্টর, কৃষি ও শিল্প বিভাগের সচিব হিসাবে কাজ করেছেন । সরোজ নলিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় । ১৯৪০ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন ।
১৯৩২ সালে তিনি ব্রতচারী প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯৩৪ সালে ব্রতচারী সমিতি এবং ১৯৪১ সালে কলকাতার জোকায় ব্রতচারী গ্রাম স্থাপন করেন । ব্রতচারী আন্দোলনে কেউ সামিল হতে চাইলে তিনটি উক্তি স্বীকার করে নিতে হতঃ-
১। আমি বাংলাকে ভালবাসি
২। আমি বাংলার সেবা করব
৩। আমি বাংলার ব্রতচারী
গুরুসদয় দত্ত সারাজীবন লোকশিল্প আর সংস্কৃতির সন্ধানে প্রবৃত্ত ছিলেন । তিনি রায়বেঁশে (রায়বেঁশে হচ্ছে পুরুষদের দ্বারা লোকযুদ্ধ নৃত্যের একটি ঘরানা), কাঠি, ধামাল, ঝুমুর, ব্রত, ঢালিনৃত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন । ব্রতচারীদের মধ্যে তিনি “প্রবর্তক জী” নামে খ্যাত ছিলেন । ব্রতচারীদের অভিবাদন-ভঙ্গি, মাতৃভাষা প্রীতি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, প্রফুল্লভাব, অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে । রবীন্দ্রনাথ সহ তৎকালীন সময়ের বহু বিখ্যাত ব্যক্তি গুরুসদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রতচারী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন । তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যেগুলো বর্তমানে দুর্লভ । গ্রাম পুনর্গঠন , সমবায় প্রথায় চাষ, লোকশিল্প সংগ্রহ, ম্যাগাজিন প্রকাশ সহ তিনি নানান কাজের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন । লোকসাহিত্য গবেষক, লেখক, স্বদেশপ্রেমী গুরুসদয় দত্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪১ সালের ২৫ জুন পরলোক গমন করেন । এখনও তাঁর লোক ঐতিহ্যের সন্ধান বাঙালি জাতিকে আত্ম-আবিষ্কারের পথে চালিত করে । তাঁর জন্মদিনে শতকোটি প্রণাম । (তথ্যসূত্র: সংগৃহীত)
——০——–

Share This