লাল সাইকেলের স্বপ্ন।
সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত বারো বছরের মেয়ে ঝিলিক। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসীতলা, পাশে কয়েকটা কলাগাছ আর বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধানখেত—এই ছিল তার পৃথিবী। ঝিলিক পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত। কিন্তু গ্রামের স্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন ভোরে উঠে তাকে হেঁটে স্কুলে যেতে হত। বর্ষার দিনে কাদা পেরিয়ে, গ্রীষ্মে ধুলো […]
মাটির হাঁড়িতে আঁকা স্বপ্ন।
নদীর ধারে ছোট্ট একটা গ্রাম—কুমোরডাঙা। গ্রামের নামের মতোই এই গ্রামের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটির কাজ করে আসছিল। কারও হাতে তৈরি হত হাঁড়ি, কারও হাতে কলসি, কারও হাতে প্রদীপ কিংবা মাটির পুতুল। সেই গ্রামেরই মেয়ে ছিল মাধবী। ছোটবেলা থেকেই মাটির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। অন্য শিশুরা যখন পুতুল নিয়ে খেলত, মাধবী তখন মায়ের পাশে বসে […]
আলোর পথের মানুষ।
পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম—শিউলিবাড়ি। গ্রামটি খুব বড় নয়। চারদিকে ধানখেত, মাঝখান দিয়ে সরু মাটির রাস্তা, দূরে তালগাছের সারি। বর্ষায় সেই রাস্তা কাদায় ভরে যায়, শীতে মাঠের ওপর সাদা কুয়াশা নামে, আর গ্রীষ্মে মাটির ফাটল ধরে। এই গ্রামেরই ছেলে অর্ক। অর্কের বয়স তখন মাত্র উনিশ। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। […]
মাটির ঘ্রাণে যে স্বপ্ন।।
পশ্চিম মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—নাম কুসুমডাঙা। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল কয়েকটি কুমোরের বাড়ি। বর্ষায় কাদা, শীতে ধুলো আর গ্রীষ্মে ফেটে যাওয়া মাটির রাস্তা—এই ছিল তাদের জীবন। সেই গ্রামেরই ছেলে নীলয়। বয়স মাত্র চৌদ্দ। তার বাবা হরিপদ কুমোর। সারাদিন মাটির সঙ্গে লড়াই করে সংসার চালাতেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুকুরপাড়ের মাটি সংগ্রহ করা, তা ছেঁকে নেওয়া, […]
আমগাছের নিচে রাখা স্বপ্ন।।
গ্রামের নাম মাধবপুর। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু মাটির রাস্তা, আর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল একটি আমগাছ—যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো পাহারাদার। গাছটির নিচে একটি ভাঙা পাথরের বেঞ্চ ছিল। গ্রামের মানুষ বলত, গাছটি নাকি একশো বছরেরও বেশি পুরোনো। কেউ জানত না কে গাছটি লাগিয়েছিল। তবে গ্রামের সবাই জানত, সেই […]
চায়ের দোকানের শেষ বেঞ্চ।
ভোরের কুয়াশায় তখনও গ্রামের রাস্তা পুরোপুরি দেখা যায়নি। দূরের বাঁশবাগান থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছিল। বাজারের দিকে যাওয়া মাটির রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছিল। দোকানটির নাম কেউ জানত না। সবাই বলত—“হরেনের চায়ের দোকান।” দোকানের মালিক হরেনবাবুর বয়স প্রায় ষাট। মাথার চুল সাদা হয়ে এসেছে। সারাদিন চা বানানো, বিস্কুট বিক্রি আর গ্রামের […]
লাল সিগন্যালের মানুষ।
মাধবপুর থেকে একটু দূরে ছিল একটি ছোট রেলস্টেশন। স্টেশনের নাম শিউলিডাঙা। সেখানে দিনে মাত্র কয়েকটি লোকাল ট্রেন থামত। স্টেশনটি এতটাই ছোট যে অনেক সময় ট্রেনের কামরার অর্ধেক যাত্রীও জানত না, তারা কোন স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। স্টেশনের পাশেই ছিল একটি রেলগেট। সেই গেটের দায়িত্বে ছিলেন নিতাইবাবু। বয়স প্রায় পঞ্চান্ন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করা, ট্রেন […]
পুকুরের জলে দেখা আকাশ।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। গ্রামের চারপাশে হালকা কুয়াশা। পাখির ডাকের সঙ্গে দূরে কোথাও মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছে। মাধবপুর গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় পুকুর। পুকুরটির নাম রায়পুকুর। একসময় এই পুকুরে সারাবছর জল থাকত। গ্রামের মানুষ স্নান করত, মাছ ধরত, গরু জল খেত। বর্ষার জল জমিয়ে রাখার কারণে গরমকালেও পুকুরটি শুকিয়ে যেত না। কিন্তু […]
ডাকবাক্সের ভেতর যে স্বপ্নগুলো ছিল।
চন্দনপুর গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ডাকঘর ছিল। লাল রঙের দেওয়াল, টিনের ছাদ আর দরজার পাশে ঝুলে থাকা পুরোনো একটি ডাকবাক্স। ডাকঘরটির পোস্টম্যান ছিলেন গোপালবাবু। বয়স ষাটের কাছাকাছি। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কারও চিঠি, কারও মানিঅর্ডার, কারও সরকারি কাগজ—সবকিছু ঠিক মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবাসত। কারণ […]
গল্প : নদীর ওপারের আলো।।
পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—চরনদী। গ্রামের একদিকে বিস্তীর্ণ নদী, অন্যদিকে ধানক্ষেত। বর্ষাকালে নদী ফুলে-ফেঁপে উঠলে গ্রামের সঙ্গে পাশের শহরের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। নদীর ওপারে ছিল একটি ছোট হাসপাতাল। তাই গ্রামের মানুষের কাছে নদী শুধু জলধারা নয়—জীবন-মরণের সীমানা। সেই নদীতে নৌকা চালাতেন গদাধর মাঝি। বয়স ষাটের বেশি। তাঁর ছোট্ট কাঠের নৌকার নাম ছিল “আলো”। নৌকার […]