Categories
গল্প

আলোর পথের মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম—শিউলিবাড়ি। গ্রামটি খুব বড় নয়। চারদিকে ধানখেত, মাঝখান দিয়ে সরু মাটির রাস্তা, দূরে তালগাছের সারি। বর্ষায় সেই রাস্তা কাদায় ভরে যায়, শীতে মাঠের ওপর সাদা কুয়াশা নামে, আর গ্রীষ্মে মাটির ফাটল ধরে।

এই গ্রামেরই ছেলে অর্ক।

অর্কের বয়স তখন মাত্র উনিশ। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তবুও অর্কের একটা অদ্ভুত স্বপ্ন ছিল—সে গ্রামের মানুষদের জন্য কিছু করবে।

কিন্তু কী করবে, সে নিজেও জানত না।

অর্ক পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য পরিবারের ছিল না। বাধ্য হয়ে সে বাজারের একটি ছোট ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ নিল।

সারাদিন তার কাজ ছিল তার জোড়া লাগানো, সুইচ বদলানো, ফ্যান সারানো, বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুতের ছোটখাটো সমস্যা ঠিক করা।

একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিল অর্ক। রাস্তার পাশে সে দেখল, গ্রামের কয়েকজন ছোট ছেলে-মেয়ে একটা ভাঙা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে বসে পড়াশোনা করছে।

অর্ক থমকে দাঁড়াল।

একটি মেয়ে বইয়ের ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে পড়ছে। আলো বলতে পাশের বাড়ি থেকে আসা সামান্য হলুদ আলো।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“এখানে বসে পড়ছিস কেন?”

একটি ছেলে বলল,

—“বাড়িতে আলো নেই কাকু।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

—“বাড়িতে আলো নেই?”

ছেলেটি মাথা নিচু করল।

—“বাবা বলেছে, এই মাসে বিল দিতে পারেনি। লাইন কেটে দিয়েছে।”

অর্ক আর কিছু বলতে পারল না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে তার ঘুম এল না।

বারবার সেই শিশুদের মুখ মনে পড়ছিল।

তার মনে হল, বিদ্যুৎ নিয়ে সে কাজ করে। তার হাতেই তো আলো জ্বালানোর কিছুটা ক্ষমতা আছে।

পরের দিন দোকানে গিয়ে সে মালিককে বলল,

—“কাকু, পুরনো কিছু তার, সুইচ, এলইডি বাল্ব যদি ফেলে দেন, আমাকে দেবেন?”

মালিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“কী করবে?”

অর্ক বলল,

—“একটা কাজ করতে চাই।”

দোকানের মালিক হাসতে হাসতে বললেন,

—“নিয়ে যা। তবে ভাঙা জিনিস দিয়ে কী করতে পারিস দেখি!”

অর্ক সেই পুরনো তার, কয়েকটি বাল্ব, কিছু সুইচ নিয়ে বাড়ি ফিরল।

পরের কয়েকদিন সে নিজের হাতে সেগুলো পরীক্ষা করতে লাগল।

তারপর এক রবিবার সে গ্রামের পরিত্যক্ত একটি গোয়ালঘর পরিষ্কার করতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল।

কেউ বলল,

—“পাগল হয়েছে ছেলেটা!”

কেউ বলল,

—“এই ঘরে পড়াশোনা হবে?”

কেউ আবার হাসল।

অর্ক কারও কথায় কান দিল না।

সে ঘরটি পরিষ্কার করল। দেওয়ালের ময়লা ঘষে তুলল। পুরনো বেঞ্চ জোগাড় করল। কয়েকটি কাঠের টুকরো দিয়ে টেবিল বানাল।

তারপর নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটি ছোট সোলার লাইট কিনল।

সন্ধ্যায় সেই ঘরে প্রথম আলো জ্বলল।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর গ্রামের শিশুদের ডাকল।

—“এসো। এখানে পড়বে।”

প্রথম দিন এসেছিল মাত্র চারজন।

দ্বিতীয় দিন সাতজন।

এক সপ্তাহের মধ্যে সেই সংখ্যা দাঁড়াল পনেরোতে।

অর্ক নিজে খুব বেশি পড়াশোনা করেনি। তাই সে গ্রামের উচ্চশিক্ষিত কয়েকজন যুবককে অনুরোধ করল, সপ্তাহে অন্তত একদিন যেন তারা এসে পড়ায়।

প্রথমে কেউ রাজি হচ্ছিল না।

অর্ক বলত,

—“টাকা দিতে পারব না। কিন্তু একটা শিশুর ভবিষ্যৎ বদলাতে পারব।”

এই কথাটা একদিন গ্রামের কলেজপড়ুয়া মেয়ে মেঘলার মনে দাগ কাটল।

মেঘলা বলল,

—“আমি সপ্তাহে তিনদিন আসব।”

তারপর এল সৌমেন। এল রাহুল। এল গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অমলবাবু।

গোয়ালঘরটা ধীরে ধীরে ছোট্ট পাঠশালায় পরিণত হল।

নাম দেওয়া হল—“আলোর পথ”

অর্ক প্রতিদিন দোকানের কাজ শেষ করে সেখানে যেত।

একদিন অমলবাবু তাকে বললেন,

—“তুই জানিস, তুই আসলে কী করছিস?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“তুই আলো জ্বালাচ্ছিস। শুধু ঘরের নয়, মানুষের ভেতরের আলো।”

অর্ক হেসে ফেলল।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কয়েক মাস পর গ্রামের রিনা নামের একটি মেয়ে অর্ককে বলল,

—“দাদা, আমি আর পড়ব না।”

অর্ক অবাক।

—“কেন?”

—“বাবা বলেছে, আমাকে এবার কাজে যেতে হবে।”

রিনার বাবা ছিলেন ভ্যানচালক। সংসারে অভাব ছিল প্রচণ্ড।

অর্ক রিনার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।

তিনি বললেন,

—“দাদা, মেয়েকে পড়িয়ে কী হবে? সংসারে তো টাকা দরকার।”

অর্ক চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“আপনি যদি চান, আমি রিনার পড়ার খরচের কিছুটা ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওকে পড়তে দিন।”

লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

—“তুমি কেন করবে?”

অর্ক বলল,

—“কারণ একদিন আমাকেও কেউ যদি সুযোগ দিত, হয়তো আজ আমি আরও দূর যেতে পারতাম। রিনার সুযোগটা যেন নষ্ট না হয়।”

রিনা আবার পড়াশোনা শুরু করল।

বছর ঘুরল।

পরীক্ষার ফল বেরোল।

রিনা গ্রামের মধ্যে প্রথম হল।

অর্কের হাতে ফলের কাগজ তুলে দিয়ে রিনা বলল,

—“দাদা, তুমি না থাকলে আমি আজ এখানে থাকতাম না।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

সে শুধু বলল,

—“এবার তুই অন্য কাউকে আলো দেখাবি।”

এরপর থেকে “আলোর পথ” শুধু পড়াশোনার জায়গা রইল না।

সেখানে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো হত। পুরনো বই সংগ্রহ করে ছোট লাইব্রেরি তৈরি হল। গ্রামের মেয়েদের জন্য সন্ধ্যায় সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা হল।

একদিন সেই গ্রামেরই কয়েকজন মানুষ অর্কের কাছে এসে বললেন,

—“আমরাও কিছু করতে চাই।”

অর্ক হাসল।

সে বুঝতে পারল, পরিবর্তন কখনও একজন মানুষের হাতে সম্পূর্ণ হয় না। একজন শুরু করে, তারপর অন্যরা পাশে এসে দাঁড়ায়।

পাঁচ বছর পর শিউলিবাড়ির চেহারা বদলে গেল।

যে শিশুরা একসময় রাস্তার ধারে অন্ধকারে পড়ত, তাদের অনেকেই কলেজে ভর্তি হয়েছে।

রিনা নার্সিং পড়ছে।

সৌরভ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

ছোট্ট পলাশ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

আর অর্ক?

সে এখনও সেই ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করে।

তবে এখন গ্রামের মানুষ তাকে শুধু দোকানের কর্মচারী হিসেবে দেখে না।

এক সন্ধ্যায় অর্ক “আলোর পথ”-এর সামনে বসেছিল। চারদিকে শিশুদের পড়ার শব্দ। মাথার ওপর সোলার বাতির আলো।

অমলবাবু পাশে এসে বসে বললেন,

—“তুই নিজের জীবনটা বদলাতে পারলি না, এই নিয়ে কখনও আফসোস হয়?”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর হাসল।

—“আমার জীবন বদলেছে কি না জানি না। কিন্তু এই গ্রামের কয়েকটা শিশুর জীবন যদি বদলে থাকে, তাহলে আমার জীবনটাও বৃথা যায়নি।”

অমলবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।

সেদিন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল।

আর শিউলিবাড়ির ছোট্ট পাঠশালার আলো অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল।

সেই আলো হয়তো খুব বড় ছিল না।

কিন্তু অন্ধকারের কাছে আলো কখনও ছোট হয় না।

কারণ একজন মানুষ যখন অন্যের পথ আলোকিত করার চেষ্টা করে, তখন তার নিজের পথও ধীরে ধীরে আলোর দিকে এগিয়ে যায়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *