প্রথম অধ্যায়: যে স্টেশনে সব ট্রেন থামে না
পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট রেলস্টেশন— শিউলিবাড়ি। মানচিত্রে স্টেশনটির নাম থাকলেও খুব কম ট্রেন সেখানে থামত। দিনে মাত্র চারটি লোকাল ট্রেন। স্টেশন চত্বরের পাশে একটি পুরোনো বটগাছ, একটি চায়ের দোকান, আর একটি ছোট্ট বুকস্টল।
স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ছিলেন অমল চক্রবর্তী। বয়স প্রায় ষাট। চাকরির শেষ বছর চলছে। স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগেই। একমাত্র ছেলে বিদেশে চাকরি করে। তাই স্টেশনই ছিল তাঁর পরিবার।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যার ট্রেনের অপেক্ষায় তিনি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে শীতের ছোঁয়া।
লোকাল ট্রেনটি এসে থামল।
কয়েকজন যাত্রী নামল।
সবাই চলে গেল।
শুধু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রইলেন।
সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চাদর, হাতে পুরোনো চামড়ার স্যুটকেস।
লোকটির চোখে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।
অমলবাবু এগিয়ে গিয়ে বললেন,
— “কোথায় যাবেন?”
লোকটি মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি একজনের অপেক্ষায় এসেছি।”
— “কার?”
— “যিনি এখনও জানেন না যে আমি এসেছি।”
কথাটা শুনে অমলবাবু অবাক হয়ে গেলেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়: অদ্ভুত অতিথি
স্টেশনে রাত কাটানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
অমলবাবু লোকটিকে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে গেলেন।
খাওয়ার সময় তিনি জানতে চাইলেন,
— “আপনার নাম?”
লোকটি উত্তর দিলেন,
— “নিরঞ্জন।”
— “কোথা থেকে এসেছেন?”
— “অনেক দূর থেকে।”
— “কোন শহর?”
নিরঞ্জন আবারও শুধু হাসলেন।
সেই হাসির মধ্যে যেন বহু বছরের ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন,
— “এই স্টেশনটা বদলায়নি।”
অমলবাবু অবাক।
এই মানুষটি আগে এখানে এসেছিলেন?
কিন্তু তিনি তো কোনোদিন দেখেননি!
তৃতীয় অধ্যায়: পুরোনো ছবির রহস্য
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে নিরঞ্জনের চোখ পড়ল দেওয়ালে টাঙানো একটি পুরোনো ছবিতে।
ছবিটি ছিল প্রায় চল্লিশ বছরের পুরোনো।
স্টেশনের কর্মীদের দলগত ছবি।
নিরঞ্জন ছবির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ছবির এক যুবকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,
— “এঁর নাম ছিল রমেশ দত্ত। খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন।”
অমলবাবুর শরীর কেঁপে উঠল।
রমেশ দত্ত ছিলেন তাঁর আগের স্টেশনমাস্টার।
কিন্তু তিনি তো প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে মারা গেছেন!
নিরঞ্জন এত কিছু জানলেন কীভাবে?
চতুর্থ অধ্যায়: হারিয়ে যাওয়া চিঠি
স্টেশনের পুরোনো রেকর্ডরুমে বহু বছরের ফাইল জমে ছিল।
নিরঞ্জন হঠাৎ বললেন,
— “ওখানে একটি লাল রঙের টিনের বাক্স আছে।”
অমলবাবু অবাক হয়ে বললেন,
— “আপনি জানলেন কীভাবে?”
তবুও দুজনে মিলে রেকর্ডরুমে গেলেন।
ধুলোমাখা তাকের এক কোণে সত্যিই ছিল একটি লাল টিনের বাক্স।
ভেতরে পুরোনো কাগজপত্রের সঙ্গে একটি খাম।
খামের ওপর লেখা—
“ফিরে এলে খুলবে।”
চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।
প্রাপক—
নিরঞ্জন সেন।
অমলবাবু বিস্ময়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকালেন।
— “এটা তো আপনারই নাম!”
নিরঞ্জন কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।
পঞ্চম অধ্যায়: ত্রিশ বছরের অপেক্ষা
চিঠিটি লিখেছিলেন রমেশ দত্ত।
তাতে লেখা ছিল—
“নিরঞ্জন,
যদি কোনোদিন ফিরে আসো, জেনে নিও—তোমার মা শেষ দিন পর্যন্ত তোমার অপেক্ষা করেছেন।
তিনি তোমাকে কখনও দোষ দেননি।
শুধু বলতেন, একদিন আমার ছেলে ফিরবেই।”
চিঠি পড়ে নিরঞ্জনের চোখ ভিজে উঠল।
ধীরে ধীরে তিনি নিজের গল্প বলতে শুরু করলেন।
যুবক বয়সে কাজের খোঁজে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
বিদেশে চাকরি পান।
তারপর একের পর এক সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন।
চিঠিপত্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ফিরে আসতে আসতে কেটে যায় ত্রিশ বছর।
কিন্তু যখন তিনি দেশে ফেরেন—
তখন আর মা বেঁচে নেই।
ষষ্ঠ অধ্যায়: মায়ের বাড়ি
অমলবাবু নিরঞ্জনকে নিয়ে গেলেন তাঁর গ্রামের বাড়িতে।
বাড়িটি এখন ভাঙাচোরা।
উঠোনে একটি আমগাছ।
দরজায় মরচে ধরা তালা।
পাশের বাড়ির বৃদ্ধা সরলা দেবী নিরঞ্জনকে দেখে কেঁদে ফেললেন।
— “তুই নিরঞ্জন?”
— “হ্যাঁ কাকিমা…”
— “তোর মা শেষ দিন পর্যন্ত সন্ধ্যেবেলা দরজায় বসে থাকত। বলত—’আমার ছেলে আজ আসবে।'”
নিরঞ্জনের আর নিজেকে সামলানো গেল না।
তিনি মাটিতে বসে কাঁদতে লাগলেন।
সপ্তম অধ্যায়: নতুন সিদ্ধান্ত
কয়েকদিন পরে নিরঞ্জন বাড়িটি মেরামত করানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
কিন্তু নিজের থাকার জন্য নয়।
তিনি গ্রামের শিশুদের জন্য সেখানে একটি ছোট্ট পাঠাগার গড়ে তুলবেন।
মায়ের নামে।
“সুবর্ণা স্মৃতি পাঠাগার”।
অমলবাবু বললেন,
— “এটাই তোমার মায়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ হতো।”
নিরঞ্জন মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি অনেক দেরি করেছি। অন্তত এখন কিছু ভালো কাজ করতে চাই।”
অষ্টম অধ্যায়: বিদায়
এক মাস পরে পাঠাগারের উদ্বোধন হলো।
গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা নতুন বই হাতে নিয়ে হাসছে।
নিরঞ্জনের চোখে জল।
অমলবাবু বললেন,
— “এবার কোথায় যাবে?”
নিরঞ্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এবার কোথাও পালাব না।”
“যে মানুষ নিজের শিকড় খুঁজে পায়, তার আর দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।”
সেদিন সন্ধ্যায় সেই ছোট্ট স্টেশনে আবার একটি ট্রেন এসে থামল।
নিরঞ্জন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কিন্তু এবার তিনি কোনো অচেনা যাত্রী নন।
তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসা একজন মানুষ।
উপসংহার
পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা কখনও কখনও এক শহর থেকে আরেক শহরে নয়।
বরং নিজের অতীতের কাছে ফিরে আসার যাত্রা।
যে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে,
যে মানুষ হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে সম্মান করতে শেখে,
সে-ই প্রকৃত অর্থে বাড়ি ফেরে।
শিউলিবাড়ি স্টেশনের সেই অচেনা যাত্রী তাই শিখিয়ে গেল—
সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা আর ভালোবাসা কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।
সমাপ্ত। 🚉📖
Categories
অচেনা স্টেশনের যাত্রী।