হুগলি জেলার ছোট্ট শহর শ্রীরামপুর। শহরের পুরোনো বাজারের এক কোণে ছিল একটি ছোট্ট ঘড়ির দোকান—”সময় ঘর”। দোকানটির মালিক ছিলেন হেমন্ত মিত্র। বয়স প্রায় সত্তর। শহরের মানুষ তাঁকে শুধু ঘড়ি মেরামতকারীর জন্য নয়, একজন সৎ ও নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবেও চিনত।
হেমন্তবাবুর দোকানে দেওয়াল ঘড়ি, হাতঘড়ি, পকেট ঘড়ি—কত রকমের ঘড়িই না ছিল! কেউ বলত, তাঁর হাতে নাকি বন্ধ ঘড়িও আবার চলতে শুরু করে।
একদিন বিকেলে দোকানে এল এক তরুণ। তার নাম অর্ণব। হাতে একটি পুরোনো রুপোর পকেট ঘড়ি।
— “কাকু, এটা কি ঠিক করা যাবে?”
হেমন্তবাবু ঘড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
ঘড়ির পেছনে খোদাই করা ছিল—
“অজিতের জন্য, ভালোবাসা রইল — বাবা। ১৯৬৮”
হেমন্তবাবুর চোখে যেন পুরোনো দিনের ছায়া নেমে এল।
তিনি ধীরে বললেন,
— “এই ঘড়িটা কোথায় পেলে?”
অর্ণব জানাল, সে এটি একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে কিনেছে। ঘড়িটি চলছিল না, কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর বলে তার ভালো লেগেছিল।
হেমন্তবাবু বললেন,
— “ঘড়িটা ঠিক করতে পারব। তবে এর একটা গল্প আছে।”
অর্ণব আগ্রহ নিয়ে সামনে বসল।
পঞ্চাশ বছরের পুরোনো স্মৃতি
১৯৬৮ সালে এই শহরেই থাকতেন স্কুলশিক্ষক শচীনবাবু। তাঁর একমাত্র ছেলে অজিত কলেজে পড়ত। জন্মদিনে শচীনবাবু ছেলেকে এই পকেট ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন,
— “সময়ের দাম শিখে নাও। হারানো সময় আর ফিরে আসে না।”
অজিত ঘড়িটি সবসময় সঙ্গে রাখত।
কিন্তু একদিন কলকাতায় চাকরির সাক্ষাৎকারে যাওয়ার পথে ট্রেনে তার ব্যাগ চুরি হয়ে যায়।
ব্যাগের সঙ্গে হারিয়ে যায় বাবার দেওয়া সেই ঘড়িও।
অজিত বহু খোঁজ করেছিলেন, কিন্তু আর খুঁজে পাননি।
একটি অসমাপ্ত ইচ্ছা
হেমন্তবাবু জানালেন, অজিত তাঁর ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন।
কয়েক বছর আগে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার আগে অজিত বলেছিলেন,
— “জানিস হেমন্ত, বাবার দেওয়া ঘড়িটা আর একবার যদি হাতে পেতাম!”
কথাটা বলতে বলতেই তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল।
হেমন্তবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “আজ এত বছর পরে সেই ঘড়ি আবার ফিরে এসেছে।”
অর্ণব বলল,
— “তাহলে এটি তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
খোঁজের শুরু
দুজন মিলে অজিতবাবুর পরিবারের খোঁজ শুরু করলেন।
জানা গেল, তাঁর মেয়ে মেঘলা এখন কলকাতায় একজন চিকিৎসক।
হেমন্তবাবু ফোন করে সব কথা জানালেন।
মেঘলা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
পরদিনই তিনি শ্রীরামপুরে চলে এলেন।
হেমন্তবাবুর হাতে ঘড়িটি দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
— “এটাই বাবার সেই ঘড়ি!”
তিনি আলতো করে ঘড়িটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
ঘড়ির কাঁটা আবার চলল
হেমন্তবাবু খুব যত্ন করে ঘড়িটি পরিষ্কার করলেন।
ভেতরের মরচে ধরা যন্ত্রাংশ বদলালেন।
কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আস্তে করে চাবি ঘুরিয়ে দিলেন।
টিক… টিক… টিক…
পঞ্চাশ বছর পরে ঘড়িটি আবার চলতে শুরু করল।
দোকানের ভেতর সবাই যেন নিঃশব্দে সেই শব্দ শুনছিল।
মেঘলা ফিসফিস করে বললেন,
— “মনে হচ্ছে বাবা আবার কথা বলছেন।”
সময়ের আসল মূল্য
মেঘলা ঘড়িটি নিয়ে যাওয়ার আগে বললেন,
— “কাকু, এর দাম কত?”
হেমন্তবাবু হেসে মাথা নাড়লেন।
— “এই ঘড়ির দাম টাকায় মাপা যায় না। এটা একজন বাবার ভালোবাসা।”
মেঘলা জোর করেও তাঁকে টাকা দিতে পারলেন না।
শুধু প্রণাম করে বললেন,
— “আজ আপনি শুধু একটি ঘড়ি নয়, আমাদের পরিবারের একটি স্মৃতি ফিরিয়ে দিলেন।”
শেষ অধ্যায়
কয়েক মাস পরে মেঘলা শহরের জাদুঘরে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন—
“সময়ের স্মৃতি”।
সেখানে পকেট ঘড়িটির পাশে একটি ছোট্ট লেখা ছিল—
“কিছু জিনিসের মূল্য তার দামে নয়, তার স্মৃতিতে।”
হেমন্তবাবু প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ হয়তো কোনো ঘড়ি মেরামত করা নয়, বরং মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে আবার জীবন্ত করে তোলা।
দোকানে ফিরে তিনি দেওয়ালে একটি নতুন বাক্য টাঙালেন—
“ঘড়ি সময় বলে, আর স্মৃতি শেখায়—সময়কে ভালোবাসতে।”
সেদিন বিকেলে দোকানের বাইরে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল।
দেওয়ালঘড়িগুলো একসঙ্গে টিকটিক শব্দ করছিল।
হেমন্তবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “সময় কখনও থেমে থাকে না। কিন্তু ভালোবাসা সময়কে হার মানিয়ে দেয়।”
সমাপ্ত। ⏰❤️
Categories
গল্প : হারিয়ে যাওয়া ঘড়ি।