কাঁকড়াঝোড় গ্রামের প্রাথমিক স্কুলটা ছিল খুব ছোট।
দুটো ঘর, একটা টিনের ছাউনি, সামনে খেলার মাঠ আর মাঠের এক কোণে একটা পুরোনো কুয়ো।
কিন্তু সেই কুয়োটাই ছিল স্কুলের সবচেয়ে বড় ভরসা।
স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সেই কুয়োর জলেই হাত-মুখ ধুত, শিক্ষকরা সেই জল খেতেন, রান্নার জন্যও সেই জল ব্যবহার হতো।
সমস্যা হল, এক বছর বর্ষা ঠিকমতো না হওয়ায় কুয়োর জল কমতে শুরু করল।
শীতের শুরুতেই একদিন সকালে দেখা গেল—
কুয়ো প্রায় শুকিয়ে গেছে।
প্রধান শিক্ষক হরিদাসবাবু সবাইকে ডেকে বললেন,
—“জল খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হবে।”
ক্লাস থ্রি-র ছাত্র অর্ক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
সে হাত তুলে বলল,
—“স্যার, জল আসবে না?”
হরিদাসবাবু একটু হেসে বললেন,
—“আসবে। বৃষ্টি হলে আবার কুয়ো ভরে যাবে।”
অর্ক বলল,
—“কিন্তু বৃষ্টি যদি না হয়?”
প্রধান শিক্ষক কোনো উত্তর দিলেন না।
পরদিন থেকেই স্কুলে জল নিয়ে নিয়ম তৈরি হল।
প্রতিটি ক্লাসে একটা করে কলসি।
কলসির জল শেষ হয়ে গেলে আর জল দেওয়া হবে না।
প্রথম দুদিন সবাই নিয়ম মেনে চলল।
তৃতীয় দিন দুপুরে রান্নাঘরের দিদিমণি এসে বললেন,
—“স্যার, জল নেই।”
হরিদাসবাবু বললেন,
—“কুয়ো থেকে আনুন।”
—“কুয়োতেও নেই।”
সবাই চুপ।
অর্ক তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখল, কয়েকজন ছাত্র খালি বোতল হাতে বাড়ির দিকে যাচ্ছে।
তার মাথায় একটা প্রশ্ন এল—
“স্কুলে জল নেই, কিন্তু আমরা কি কিছু করতে পারি না?”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অর্ক নিজের মাকে বলল,
—“মা, আমাদের স্কুলে জল নেই।”
মা বললেন,
—“জানি। তোমার স্যার আজ বাজার থেকে জল কিনে এনেছেন।”
অর্ক বলল,
—“জল কিনে তো সবসময় স্কুল চলবে না।”
মা বললেন,
—“তাহলে কী করবে?”
অর্ক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—“জল জমাব।”
পরদিন সে স্কুলে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে গেল।
তার গায়ে লিখল—
“বৃষ্টির জল”।
বন্ধুরা হাসতে লাগল।
—“বৃষ্টি তো নেই!”
অর্ক বলল,
—“আজ নেই। কিন্তু একদিন আসবে।”
তারপর সে প্রধান শিক্ষকের কাছে গেল।
—“স্যার, ছাদের জল জমিয়ে রাখা যায়?”
হরিদাসবাবু অবাক হয়ে বললেন,
—“যায় তো। কিন্তু কীভাবে?”
অর্ক বলল,
—“আমি জানি না। আমরা সবাই মিলে শিখব।”
প্রধান শিক্ষক হাসলেন।
—“ঠিক আছে। শিখে এসো।”
অর্ক বাড়ি গিয়ে বাবার পুরোনো মোবাইলে ইন্টারনেট ঘেঁটে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ছবি দেখতে লাগল।
সে বুঝল, ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে জল নামিয়ে বড় ট্যাঙ্কে জমিয়ে রাখা যায়।
পরদিন সে ছবিগুলো স্কুলে নিয়ে এল।
শিক্ষকরা দেখলেন।
একজন শিক্ষক বললেন,
—“আইডিয়াটা খারাপ নয়।”
কিন্তু সমস্যা হল টাকা।
ট্যাঙ্ক কিনতে হবে।
পাইপ লাগাতে হবে।
ফিল্টার বানাতে হবে।
স্কুলের তহবিলে এত টাকা নেই।
অর্ক বলল,
—“সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে না।”
—“তাহলে?”
—“আগে জল জমাব। পরে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা করব।”
শিক্ষকরা রাজি হলেন।
গ্রামের কয়েকজন অভিভাবকও এগিয়ে এলেন।
কেউ পুরোনো ড্রাম দিলেন।
কেউ পাইপ দিলেন।
কেউ শ্রম দিলেন।
একজন মিস্ত্রি বললেন,
—“টাকা লাগবে না। স্কুলের জন্য কাজ করব।”
কয়েকদিনের মধ্যে স্কুলের ছাদের এক কোণে একটা অস্থায়ী জল সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেল।
কিন্তু তখনও বৃষ্টি নেই।
অর্ক প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকাত।
একদিন দুপুরে হঠাৎ কালো মেঘ জমল।
সবাই ছুটে মাঠে বেরিয়ে এল।
তারপর বৃষ্টি।
প্রথমে টুপটাপ।
তারপর ঝমঝম।
ছাদের জল পাইপ বেয়ে ড্রামে পড়তে শুরু করল।
অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
—“জল! জল জমছে!”
ছাত্রছাত্রীরা হাততালি দিল।
সেদিন স্কুলে যেন উৎসব হয়ে গেল।
একটা ড্রাম ভরল।
তারপর আরেকটা।
বৃষ্টি থামার পর হরিদাসবাবু ড্রামের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“এই জল কতদিন চলবে?”
অর্ক বলল,
—“যত্ন করে ব্যবহার করলে অনেকদিন।”
কিন্তু অর্ক এখানেই থামল না।
সে বুঝেছিল, শুধু জল জমালেই হবে না।
জল অপচয়ও বন্ধ করতে হবে।
সে স্কুলে একটা নতুন নিয়ম চালু করল—
“শেষ কলসি পর্যন্ত জল বাঁচাও।”
হাত ধোয়ার সময় কল খোলা রাখা যাবে না।
বোতল ধোয়ার জল গাছের গোড়ায় দিতে হবে।
মিড-ডে মিলের বাসন ধোয়ার শেষ জল দিয়ে স্কুলের বাগান পরিষ্কার করতে হবে।
প্রথমে সবাই নিয়ম মানত না।
অর্ক রাগ করত না।
শুধু বলত,
—“একটু জল বাঁচালেও সেটা কারও না কারও কাজে লাগবে।”
কয়েক মাস পর স্কুলের পাশে একটা ছোট বাগান তৈরি হল।
জল সংরক্ষণের কারণে সেই বাগানেও নিয়মিত জল দেওয়া সম্ভব হল।
গাছ বড় হতে লাগল।
একদিন জেলা থেকে একজন আধিকারিক স্কুল পরিদর্শনে এলেন।
তিনি দেখলেন—
স্কুলে বড় কোনো ভবন নেই,
দামী কোনো সরঞ্জাম নেই,
কিন্তু ছাদের পাশে জল সংগ্রহের ব্যবস্থা আছে।
তিনি প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেন,
—“এটা কে করেছে?”
হরিদাসবাবু অর্ককে সামনে নিয়ে এলেন।
—“ও।”
আধিকারিক অর্ককে জিজ্ঞেস করলেন,
—“তুমি কেন এটা করতে চেয়েছিলে?”
অর্ক বলল,
—“স্যার, জল না থাকলে স্কুলে পড়াশোনা করা যায় না। তাই জলটাকেও পড়াশোনার মতোই গুরুত্ব দিতে হবে।”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”
অর্ক একটু ভেবে বলল,
—“জানি না।”
—“কেন?”
—“আমি আগে বড় হয়ে উঠি। তারপর ঠিক করব।”
সবাই হেসে ফেলল।
কয়েক বছর পর সেই স্কুলে নতুন বড় জলাধার তৈরি হল।
বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা আরও ভালো করা হল।
গ্রামের আরও তিনটি স্কুল সেই পদ্ধতি অনুসরণ করল।
একদিন পুরোনো কুয়োটার পাশে দাঁড়িয়ে হরিদাসবাবু অর্ককে বললেন,
—“মনে আছে, একদিন তুই জিজ্ঞেস করেছিলি—বৃষ্টি না হলে কী হবে?”
অর্ক হাসল।
—“মনে আছে।”
—“তখন তোকে উত্তর দিতে পারিনি।”
অর্ক বলল,
—“এখন পারেন?”
প্রধান শিক্ষক বললেন,
—“হ্যাঁ।”
—“কী?”
হরিদাসবাবু বললেন,
—“বৃষ্টি কখন হবে, সেটা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বৃষ্টি হলে তার এক ফোঁটাও নষ্ট হতে দেব কি না—সেটা আমাদের হাতে।”
অর্ক মাথা নাড়ল।
পুরোনো কুয়োর পাশে তখন নতুন একটা কলসি রাখা।
কলসির গায়ে লেখা—
“জল শেষ হওয়ার আগে জলের মূল্য বুঝতে শেখো।”
সেই কলসিটাই ছিল স্কুলের শেষ কলসি নয়।
বরং—
নতুন করে জলকে সম্মান করার প্রথম কলসি।