বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ছিল চাঁদপুর। গ্রামের শেষ মাথায় একটা ছোট্ট টিনের দোকান। দোকানের সামনে ঝোলানো থাকত কয়েকটা পুরোনো সাইকেলের টায়ার, দু-তিনটে মরচে ধরা চাকা আর একটা লোহার পাম্প।
দোকানের মালিক গোপাল।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
গ্রামের সবাই তাকে ডাকত—গোপাল মিস্ত্রি বলে।
সাইকেল সারানোই ছিল তার পেশা।
কারও চেন ছিঁড়লে গোপাল।
টায়ার ফুটো হলে গোপাল।
ব্রেক নষ্ট হলে গোপাল।
কিন্তু গোপালের দোকানে একটা জিনিস ছিল, যেটা অন্য কোনো দোকানে ছিল না।
একটা ছোট্ট পিতলের সাইকেলের ঘণ্টি।
ঘণ্টিটা পুরোনো।
রং উঠে গেছে।
তবু শব্দটা ছিল পরিষ্কার—
টিং… টিং…
প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার আগে গোপাল ঘণ্টিটা একবার বাজাতেন।
তারপর কাজ শুরু করতেন।
একদিন গ্রামের স্কুলের ছাত্র রাহুল তার ভাঙা সাইকেল নিয়ে দোকানে এল।
—“কাকু, সাইকেলটা ঠিক করে দিন।”
গোপাল সাইকেলটা উল্টে রেখে বললেন,
—“চেন খুলে গেছে। কাল নিয়ে যাস।”
রাহুল মাথা নিচু করল।
—“কাল হলে হবে না কাকু।”
—“কেন?”
—“কাল পরীক্ষা।”
গোপাল একটু চুপ করে রইলেন।
রাহুল প্রতিদিন এই সাইকেলেই চার কিলোমিটার দূরের স্কুলে যায়।
হেঁটে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে।
গোপাল বললেন,
—“দে দেখি।”
তিনি চেনটা হাতে নিয়ে কাজ শুরু করলেন।
পনেরো মিনিট পর সাইকেল ঠিক।
রাহুল পকেট থেকে টাকা বের করতেই গোপাল হাত তুলে বললেন,
—“রাখ।”
—“কিন্তু টাকা?”
—“পরীক্ষা দিয়ে ভালো করে পাশ করিস। সেটাই টাকা।”
রাহুল হেসে চলে গেল।
সেদিন থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
যে ছাত্রের সাইকেল নষ্ট, সে গোপালের দোকানে আসত।
কারও টাকার অভাব থাকলে গোপাল বিনা পয়সায় সারিয়ে দিতেন।
কেউ টাকা পরে দেবে বললে বলতেন,
—“আগে পড়াশোনা কর।”
কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষ এটা নিয়ে হাসাহাসি করত।
একদিন চায়ের দোকানে বসে একজন বলল,
—“গোপাল, তোর দোকান না দাতব্য প্রতিষ্ঠান?”
সবাই হেসে উঠল।
গোপালও হাসলেন।
—“সাইকেল সারাই করি, মানুষের ভবিষ্যৎ না।”
লোকটি বলল,
—“তাহলে এত ফ্রি সারাস কেন?”
গোপাল উত্তর দিলেন,
—“কারণ একটা সাইকেল ঠিক করতে যত টাকা লাগে, একটা ছেলের স্কুল ছুটে গেলে তার ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি।”
কথাটা কেউ আর বাড়াল না।
কয়েক বছর কেটে গেল।
রাহুল বড় হল।
স্কুল শেষ করে শহরে পড়তে গেল।
তারপর একদিন সে গোপালের দোকানে ফিরে এল।
গায়ে পরিষ্কার শার্ট, হাতে একটা ব্যাগ।
গোপাল চিনতে একটু সময় নিলেন।
—“কে?”
রাহুল হেসে বলল,
—“কাকু, আমার সাইকেলটা মনে আছে?”
গোপাল হেসে উঠলেন।
—“ওই লাল সাইকেল?”
—“হ্যাঁ।”
রাহুল বলল,
—“আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি।”
গোপালের চোখ চকচক করে উঠল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ।”
তারপর রাহুল পকেট থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল।
—“এটা আপনার জন্য।”
গোপাল বাক্স খুললেন।
ভেতরে একটা নতুন সাইকেলের ঘণ্টি।
পুরোনোটার মতোই দেখতে।
কিন্তু একেবারে নতুন।
রাহুল বলল,
—“আপনার ওই পুরোনো ঘণ্টিটা অনেকদিন ধরে দেখেছি। ভাবলাম, এবার একটা নতুন ঘণ্টি দিই।”
গোপাল হেসে বললেন,
—“পুরোনোটা ফেলে দেব?”
রাহুল মাথা নাড়ল।
—“না। ওটা থাক।”
গোপাল পুরোনো ঘণ্টিটার দিকে তাকালেন।
—“কেন?”
রাহুল বলল,
—“ওটার শব্দেই তো আমার স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো শুরু হয়েছিল।”
গোপাল কিছু বললেন না।
শুধু চোখ মুছলেন।
তারপর নতুন ঘণ্টিটা দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিলেন।
সেদিন বিকেলে গ্রামের আরও কয়েকজন ছেলে দোকানে এল।
তাদের সাইকেলের অবস্থা খুব খারাপ।
গোপাল বললেন,
—“সবগুলো রেখে যা।”
একজন বলল,
—“কাকু, টাকা নেই।”
গোপাল হেসে বললেন,
—“কে টাকা চাইল?”
ছেলেটা বলল,
—“কিন্তু আপনি তো—”
—“আগে স্কুলে যা।”
তারপর তিনি নতুন ঘণ্টিটা বাজালেন।
টিং… টিং…
শব্দটা পুরো দোকানে ছড়িয়ে পড়ল।
রাহুল পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে বলল,
—“কাকু, আপনি এখনও একই রকম আছেন।”
গোপাল বললেন,
—“মানুষ বদলায়।”
—“আপনি বদলাননি।”
—“বদলেছি।”
রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।
গোপাল বললেন,
—“আগে ভাবতাম সাইকেল সারাই করি। এখন বুঝি, আমি আসলে রাস্তা খুলে দিই।”
—“কীসের রাস্তা?”
—“যে রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে স্কুলে যায়। যে রাস্তা দিয়ে কেউ নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যায়।”
রাহুল চুপ করে গেল।
সন্ধ্যা নেমেছে।
দোকানের সামনে একে একে কয়েকটা সাইকেল দাঁড়িয়ে।
কেউ টায়ার ফুলিয়ে নিচ্ছে।
কেউ ব্রেক পরীক্ষা করছে।
কেউ ঘণ্টি বাজিয়ে দেখছে।
আর গোপাল একটার পর একটা সাইকেল ঠিক করে চলেছেন।
রাহুল যাওয়ার আগে বলল,
—“কাকু, একটা কথা বলব?”
—“বল।”
—“আপনার দোকানের একটা নাম দেওয়া উচিত।”
গোপাল হেসে বললেন,
—“কী নাম?”
রাহুল একটু ভেবে বলল,
—“স্বপ্নের সাইকেল।”
গোপাল হেসে মাথা নাড়লেন।
দোকানের পুরোনো টিনের ওপর পরদিন সত্যিই একটা নতুন বোর্ড লাগল—
স্বপ্নের সাইকেল
সাইকেল সারাই হয়, স্বপ্ন থামতে দেওয়া হয় না।
তার নিচে ঝুলতে থাকল সেই পুরোনো পিতলের ঘণ্টি।
আর তার পাশে নতুন ঘণ্টি।
দুটো ঘণ্টিই বাতাসে দুলত।
কখনও পুরোনোটার শব্দ শোনা যেত—
টিং…
কখনও নতুনটার—
টিং… টিং…
আর প্রতিটি শব্দ যেন বলত—
“চলতে থাকো।”