নদীর ধারে একটা ছোট্ট গ্রাম—শিমুলিয়া।
গ্রামের একপাশে ধানের জমি, অন্যপাশে পুরোনো পুকুর। পুকুরের ধারে একটা ভাঙাচোরা মাটির ঘর। সেই ঘরেই থাকতেন হরনাথ কুমোর।
সারা জীবন মাটি দিয়ে জিনিস বানিয়েছেন তিনি।
হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ভাঁড়—যা চাইবেন, হরনাথ বানিয়ে দিতে পারতেন।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ কমে গিয়েছিল।
প্লাস্টিক আর অ্যালুমিনিয়ামের জিনিস বাজার দখল করে নিয়েছিল।
হরনাথের ছেলে শহরে চলে গেছে।
বউমাও যেতে চায়।
শুধু নাতনি মেঘলা দাদুর সঙ্গে থেকে গেছে।
মেঘলার বয়স চৌদ্দ।
সে পড়াশোনায় ভালো।
কিন্তু তার সবচেয়ে ভালো লাগত দাদুর কাজ দেখতে।
দাদু যখন কাদা মাটি নিয়ে চাকার ওপর বসতেন, মেঘলা পাশে বসে তাকিয়ে থাকত।
চাকা ঘুরত।
মাটি ঘুরত।
আর ধীরে ধীরে একটা আকার তৈরি হতো।
মেঘলার মনে হতো, দাদু যেন মাটির ভিতর থেকে কোনো গল্প বের করে আনছেন।
একদিন মেঘলা জিজ্ঞেস করল,
—“দাদু, মাটি কথা বলতে পারে?”
হরনাথ হেসে বললেন,
—“সব মাটি কথা বলে না।”
—“কোন মাটি কথা বলে?”
—“যে মাটিকে মন দিয়ে ছোঁয়া যায়।”
মেঘলা কথাটা মনে রাখল।
কয়েকদিন পর স্কুলে একটা বিজ্ঞান প্রদর্শনী হওয়ার কথা ঘোষণা হল।
সবাইকে নিজেদের তৈরি কোনো জিনিস নিয়ে যেতে হবে।
কেউ আগ্নেয়গিরি বানাবে।
কেউ সৌরজগত।
কেউ বৈদ্যুতিক সার্কিট।
মেঘলা বাড়ি ফিরে দাদুকে বলল,
—“আমি কী বানাব?”
দাদু বললেন,
—“তুই যা খুশি বানাস।”
মেঘলা বলল,
—“আমি মাটির কিছু বানাব।”
দাদু মাথা নাড়লেন।
—“মাটির জিনিস বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে?”
মেঘলা বলল,
—“কেন নয়?”
সে দাদুর কাছে জানতে চাইল, মাটির পাত্র কীভাবে তৈরি হয়।
দাদু মাটি দেখালেন।
মাটি প্রথমে ভিজিয়ে রাখতে হয়।
তারপর কাদা মাখতে হয়।
তারপর মাটি থেকে পাথর, কাঁকর সরাতে হয়।
তারপর চাকার ওপর বসিয়ে আকার দিতে হয়।
তারপর শুকোতে হয়।
শেষে আগুনে পোড়াতে হয়।
মেঘলা হঠাৎ বলল,
—“দাদু, মাটির হাঁড়ি ঠান্ডা থাকে কেন?”
হরনাথ বললেন,
—“মাটির গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। জল সেই ছিদ্র দিয়ে খুব সামান্য বাইরে বেরোয়। সেই জল বাষ্প হয়ে যাওয়ার সময় তাপ নিয়ে যায়।”
মেঘলার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“তাহলে মাটির হাঁড়ি একটা প্রাকৃতিক ঠান্ডা রাখার পাত্র!”
দাদু হেসে বললেন,
—“তুই তো আমার থেকেও বেশি বুঝে ফেলেছিস।”
মেঘলা সেদিন থেকেই কাজ শুরু করল।
সে একটা ছোট মাটির পাত্র বানাল।
পাত্রের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র রাখল।
তারপর তার ওপর একটা ঢাকনা তৈরি করল।
ভিতরে জল রাখল।
পাশে একটা সাধারণ কাচের বোতলে একই পরিমাণ জল রাখল।
দুটোই একই জায়গায় রাখল।
এক ঘণ্টা পর তাপমাত্রা মাপল।
দেখল মাটির পাত্রের জল তুলনামূলক ঠান্ডা।
সে সব তথ্য খাতায় লিখে রাখল।
পরদিন স্কুলে নিয়ে গেল।
বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন,
—“তুমি এটা নিজে পরীক্ষা করেছ?”
মেঘলা বলল,
—“হ্যাঁ স্যার। দাদুর কাছ থেকে মাটি সম্পর্কে শিখেছি।”
শিক্ষক বললেন,
—“তাহলে প্রদর্শনীতে তুমি শুধু জিনিসটা দেখাবে না। এর পেছনের বিজ্ঞানও বোঝাবে।”
মেঘলা খুব খুশি হল।
কিন্তু প্রদর্শনীর আগের দিন বড় সমস্যা হল।
মেঘলার বানানো পাত্রটা ভেঙে গেল।
সে সেটাকে হাতে নিয়ে বসে পড়ল।
চোখে জল।
দাদু কাছে এসে বললেন,
—“কী হয়েছে?”
মেঘলা পাত্রটা দেখাল।
—“সব শেষ।”
দাদু বললেন,
—“মাটি ভেঙেছে। তোর কাজ ভাঙেনি।”
—“কিন্তু কাল প্রদর্শনী।”
হরনাথ চাকার কাছে বসে বললেন,
—“আবার বানাবি।”
—“আজ রাতে?”
—“রাত যতই হোক।”
মেঘলা দাদুর পাশে বসল।
চাকা ঘুরতে শুরু করল।
মাটি নরম করা হল।
আবার পাত্র তৈরি হল।
কিন্তু এবার দাদু মেঘলাকে বললেন,
—“আগেরটার ভুল কোথায় হয়েছিল?”
মেঘলা ভালো করে দেখল।
—“দেয়াল খুব পাতলা করেছিলাম।”
—“তাহলে?”
—“এবার একটু মোটা করব।”
দাদু হাসলেন।
—“এই তো বিজ্ঞান।”
রাত অনেক হল।
পাত্র তৈরি হয়ে গেল।
কিন্তু শুকোনোর সময় খুব কম।
দাদু চুল্লির পাশে বসে রইলেন।
সকালে পাত্রটা আগুনে পোড়ানো হল।
মেঘলা ভয়ে দাঁড়িয়ে।
যদি আবার ভেঙে যায়?
কিছুক্ষণ পর চুল্লি ঠান্ডা হল।
দাদু ধীরে ধীরে পাত্রটা বের করলেন।
অক্ষত।
মেঘলা আনন্দে দাদুকে জড়িয়ে ধরল।
পরদিন স্কুলে প্রদর্শনী।
অনেক সুন্দর মডেল এসেছে।
মেঘলা তার মাটির পাত্রটা টেবিলে রাখল।
তার পাশে কাচের বোতল।
একজন বিচারক এসে জিজ্ঞেস করলেন,
—“এটা কী?”
মেঘলা বলল,
—“প্রাকৃতিকভাবে জল ঠান্ডা রাখার একটা সহজ পদ্ধতি।”
তারপর সে পরীক্ষার ফল দেখাল।
কীভাবে মাটির ছিদ্র দিয়ে সামান্য জল বাইরে বেরিয়ে বাষ্পীভূত হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাপ কমে—সহজ ভাষায় বোঝাল।
বিচারকরা মন দিয়ে শুনলেন।
একজন জিজ্ঞেস করলেন,
—“এই পাত্র কোথা থেকে শিখলে?”
মেঘলা বলল,
—“আমার দাদুর কাছ থেকে।”
—“তোমার দাদু কী করেন?”
—“কুমোর।”
বিচারক হেসে বললেন,
—“তাহলে তোমার বিজ্ঞান বইয়ের একটা অংশ তোমার বাড়িতেই আছে।”
মেঘলা হাসল।
প্রদর্শনী শেষে মেঘলা পুরস্কার পেল।
কিন্তু সে পুরস্কারটা নিজের কাছে রাখল না।
বাড়ি ফিরে দাদুর হাতে তুলে দিয়ে বলল,
—“এটা তোমার।”
হরনাথ অবাক।
—“আমার কেন?”
—“কারণ মাটির কথা তুমি না শেখালে আমি এটা জানতে পারতাম না।”
দাদু পুরস্কারটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“জানিস, আমি এতদিন ভাবতাম আমার কাজ একদিন শেষ হয়ে যাবে।”
মেঘলা বলল,
—“কেন?”
—“কারণ সবাই এখন অন্য জিনিস ব্যবহার করে।”
মেঘলা বলল,
—“কাজ শেষ হয় না দাদু। শুধু কাজের নতুন ব্যবহার খুঁজে নিতে হয়।”
হরনাথ নাতনির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
—“তুই তাহলে আমার কাজ বাঁচিয়ে দিলি?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
—“না। তুমি আমাকে শিখিয়েছ বলে আমি শুধু বুঝলাম—মাটির ভিতরে এখনও অনেক কথা লুকিয়ে আছে।”
কয়েকদিন পর মেঘলা স্কুলে একটা ছোট কর্মশালা করল।
দাদুকে নিয়ে গেল।
হরনাথ ছাত্রছাত্রীদের দেখালেন কীভাবে মাটি দিয়ে পাত্র তৈরি করতে হয়।
বাচ্চারা চাকা ঘুরিয়ে মাটি ধরল।
কেউ পাত্র বানাল।
কেউ বানাল ছোট পাখি।
কেউ বানাল প্রদীপ।
হরনাথের মুখে বহুদিন পর আবার সেই পুরোনো হাসি ফুটে উঠল।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে মেঘলা বলল,
—“দাদু, আজ মাটি অনেক কথা বলল।”
হরনাথ বললেন,
—“কী বলল?”
মেঘলা একটু ভেবে উত্তর দিল,
—“বলল, পুরোনো জিনিসকে ফেলে দেওয়ার আগে তার ভিতরের গল্পটা একবার শুনে দেখো।”
দাদু হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
—“ঠিক বলেছিস।”
পুকুরের জলে তখন সন্ধ্যার আকাশের আলো পড়েছে।
দূরে কুমোরের ঘরে চাকা থেমে গেছে।
কিন্তু মাটির গন্ধে যেন নতুন একটা গল্প শুরু হয়েছে।
কারণ কিছু শব্দ মুখে উচ্চারণ করতে হয় না।
কিছু শব্দ—
মাটির নিচেই লুকিয়ে থাকে।