পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেগুলোকে প্রথম দেখায় বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নের মতো মনে হয়। স্বচ্ছ নীল জল, চুনাপাথরের বিশাল পাহাড়, সবুজ জঙ্গল, সাদা বালির সৈকত এবং ছোট ছোট দ্বীপের সারি—ফিলিপাইনের পালাওয়ান তেমনই একটি বিস্ময়কর ভ্রমণস্থল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্র ফিলিপাইনের পশ্চিম অংশে অবস্থিত পালাওয়ান একটি দীর্ঘ ও সরু দ্বীপপ্রধান প্রদেশ। এর চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ, উপসাগর, প্রবালপ্রাচীর এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতিপ্রেমী, সমুদ্রপ্রেমী, ফটোগ্রাফার এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে পালাওয়ান বহুদিন ধরেই আকর্ষণের কেন্দ্র।
পালাওয়ানের সৌন্দর্য শুধু সৈকতে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে ভূগর্ভস্থ নদী, প্রাচীন চুনাপাথরের পাহাড়, ম্যানগ্রোভ বন, প্রবালপ্রাচীর, মাছের ঝাঁক এবং শান্ত দ্বীপজীবন।
এই অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র El Nido, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর Puerto Princesa। এছাড়া Coron অঞ্চলও ডাইভিং ও দ্বীপভ্রমণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়।
পালাওয়ান ভ্রমণ মানে যেন সমুদ্রের এক বিশাল নীল বইয়ের প্রতিটি পাতা উল্টে দেখা।
পালাওয়ানের প্রথম পরিচয়
পালাওয়ানকে মানচিত্রে দেখলে বোঝা যায় এটি একটি দীর্ঘ দ্বীপপুঞ্জের মতো। এর পশ্চিমে দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্বদিকে সুলু সাগরের বিস্তৃত জলভাগ।
এখানে প্রকৃতির বৈচিত্র্য অসাধারণ। কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও পাহাড়, কোথাও শান্ত উপসাগর, আবার কোথাও প্রবালপ্রাচীর ঘেরা স্বচ্ছ সমুদ্র।
দ্বীপের অনেক অংশ এখনও তুলনামূলকভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধরে রেখেছে। ফলে বড় শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে চাইলে পালাওয়ান বিশেষ আকর্ষণীয়।
পুয়ের্তো প্রিন্সেসা
পালাওয়ান ভ্রমণের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হল Puerto Princesa।
এটি পালাওয়ান প্রদেশের রাজধানী এবং দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র।
শহরটি তুলনামূলকভাবে শান্ত। এখানে বাজার, রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং পর্যটনসেবা রয়েছে।
Puerto Princesa-র সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হল এখান থেকে সহজে Puerto Princesa Subterranean River National Park-এ যাওয়া যায়।
ভূগর্ভস্থ নদী
পালাওয়ানের অন্যতম বিস্ময় হল Puerto Princesa Underground River।
এটি একটি বিশাল চুনাপাথরের গুহার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী। নৌকায় করে গুহার ভেতরে প্রবেশ করলে চারপাশের অন্ধকার, পাথরের স্তম্ভ, ঝুলন্ত শিলার গঠন এবং জলের শব্দ মিলিয়ে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হয়।
গুহার ভেতরের বিভিন্ন শিলার আকৃতি কখনও কোনও প্রাণী, কখনও কোনও মানুষের মুখ বা অন্য কোনও পরিচিত আকৃতির মতো মনে হতে পারে। তবে এগুলো প্রকৃতির দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি।
গুহার ভেতর আলো সীমিত রাখা হয়, যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।
ভূগর্ভস্থ নদীর প্রকৃতি
Underground River-এর বিশেষত্ব শুধু গুহা নয়। নদী, চুনাপাথরের ভূপ্রকৃতি, বন এবং উপকূলীয় পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল।
এখানে বাদুড়সহ বিভিন্ন প্রাণীর উপস্থিতি দেখা যায়।
গুহার মধ্যে নৌকা চালানোর সময় গাইডরা বিভিন্ন শিলা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য দেন।
এই ভ্রমণ অন্য ধরনের কারণ এখানে সমুদ্রের নীল জলের বদলে পৃথিবীর ভেতরের এক অন্ধকার ও প্রাচীন জগতের সঙ্গে পরিচয় হয়।
এল নিডো
পালাওয়ানের নাম উঠলে El Nido-র কথা অবশ্যই বলতে হয়।
এল নিডো তার চুনাপাথরের পাহাড়, নীল-সবুজ জল এবং অসংখ্য ছোট দ্বীপের জন্য বিখ্যাত।
নৌকায় করে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়ার সময় চারপাশে বিশাল পাথুরে পাহাড় দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে সবুজ গাছপালা এবং নিচে স্বচ্ছ জল—দৃশ্যটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
এল নিডোতে সাধারণত island hopping বা দ্বীপভ্রমণ পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
দ্বীপভ্রমণের অভিজ্ঞতা
একটি ছোট নৌকায় করে সকালে যাত্রা শুরু করা যায়।
নৌকা ধীরে ধীরে উপসাগরের নীল জলের মধ্যে এগিয়ে যায়। চারপাশে কখনও খাড়া চুনাপাথরের পাহাড়, কখনও ছোট নির্জন দ্বীপ।
কোনও দ্বীপে নেমে সাদা বালির সৈকতে হাঁটা যায়। অন্য কোথাও নৌকা থামিয়ে স্নরকেলিং করা যায়।
একটি দিনের দ্বীপভ্রমণের মধ্যেই প্রকৃতির এত বৈচিত্র্য দেখা যায় যে প্রতিটি স্থান আলাদা মনে হয়।
বিগ লেগুন
El Nido-র বিখ্যাত স্থানগুলোর মধ্যে Big Lagoon অন্যতম।
উঁচু চুনাপাথরের পাহাড়ের মাঝখানে শান্ত জলরাশি যেন একটি প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি করেছে।
জলের রং সূর্যের আলো ও গভীরতার সঙ্গে বদলে যায়। কোথাও হালকা সবুজ, কোথাও নীল, কোথাও গভীর নীল।
কায়াক নিয়ে এই অঞ্চলে ঘোরার অভিজ্ঞতা বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে।
স্মল লেগুন
নামেই বোঝা যায়, Small Lagoon তুলনামূলকভাবে ছোট জলভাগ। কিন্তু এর সৌন্দর্য কোনও অংশে কম নয়।
চুনাপাথরের পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ছোট একটি প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে গেলে শান্ত জলরাশি দেখা যায়।
কায়াক বা ছোট নৌকায় এই অঞ্চলে ঘোরার সময় মনে হয় যেন কোনও গোপন প্রাকৃতিক জগতে প্রবেশ করা হয়েছে।
সিক্রেট লেগুন
El Nido-র আরেকটি আকর্ষণ Secret Lagoon।
এখানে একটি ছোট প্রাকৃতিক প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে যেতে হয়। জোয়ার ও পরিবেশের অবস্থার ওপর অভিজ্ঞতা পরিবর্তিত হতে পারে।
এই ধরনের স্থানগুলোর সৌন্দর্য রক্ষা করতে পর্যটকদের স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
শিমিজু দ্বীপ
El Nido-র island hopping-এর সময় বিভিন্ন ছোট দ্বীপে যাওয়া যায়। তাদের মধ্যে Shimizu Island পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
স্বচ্ছ জল, প্রবাল এবং মাছের উপস্থিতির কারণে স্নরকেলিংয়ের জন্য এই ধরনের দ্বীপগুলো জনপ্রিয়।
জলের নিচে তাকালে রঙিন মাছের চলাচল এবং প্রবালের গঠন দেখা যায়।
নাকপান বিচ
El Nido-র কাছে Nacpan Beach দীর্ঘ বালুকাবেলার জন্য পরিচিত।
অন্যদিকে কিছু ছোট দ্বীপের বিচ যেখানে পাহাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ, Nacpan-এর সৈকত তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ ও প্রশস্ত।
সকালে বা বিকেলের দিকে এখানে হাঁটা এবং সমুদ্র দেখা খুবই মনোরম।
কোরন
পালাওয়ানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র Coron।
বিশেষ করে ডাইভিং, স্নরকেলিং এবং নৌভ্রমণের জন্য Coron বিখ্যাত।
এখানেও চুনাপাথরের পাহাড়, উপসাগর এবং স্বচ্ছ জল দেখা যায়।
তবে El Nido ও Coron-এর প্রকৃতির ধরন এক নয়। দুটোরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
কোরনের লেক
Coron অঞ্চলের কিছু লেক চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা।
Kayangan Lake পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। পাহাড়ের ওপর উঠে নিচের নীল জল দেখার দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর।
তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে লেকের কাছে যাওয়া যায়।
জলের স্বচ্ছতা এবং চারপাশের পাহাড়ি পরিবেশ এটিকে আলাদা করে তোলে।
বারাকুডা লেক
Barracuda Lake-ও Coron-এর একটি পরিচিত স্থান।
এখানে পানির তাপমাত্রায় স্তরভেদে পার্থক্য অনুভূত হতে পারে। ডাইভিং ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের জন্য এটি আকর্ষণীয়।
তবে যেকোনও ডাইভিং বা পানির কার্যক্রম করার আগে প্রশিক্ষিত গাইড ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।
জাপানি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ
Coron বিশ্বের ডাইভিংপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া কয়েকটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষের কাছে ডাইভিং করা যায়।
সমুদ্রের নিচে প্রবালের সঙ্গে মিশে থাকা পুরনো জাহাজের কাঠামো ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অদ্ভুত মিলন তৈরি করেছে।
তবে এসব স্থান সংরক্ষিত ঐতিহাসিক ও সামুদ্রিক সম্পদ। তাই ডাইভিংয়ের সময় কোনও বস্তু ছোঁয়া বা ক্ষতি করা উচিত নয়।
স্নরকেলিং
পালাওয়ানে স্নরকেলিং অন্যতম জনপ্রিয় কার্যক্রম।
মুখে মাস্ক ও স্নরকেল লাগিয়ে পানির নিচে তাকালেই অন্য একটি পৃথিবী দেখা যায়।
রঙিন মাছ, প্রবাল এবং স্বচ্ছ জল ভ্রমণকারীদের দীর্ঘ সময় পানির নিচের দৃশ্য দেখতে উৎসাহিত করে।
তবে প্রবাল ছোঁয়া বা তার ওপর পা রাখা উচিত নয়। প্রবালপ্রাচীর অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সামান্য ক্ষতিও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডাইভিং
অভিজ্ঞ ডাইভারদের জন্য পালাওয়ান অসাধারণ একটি গন্তব্য।
বিশেষ করে Coron অঞ্চলে বিভিন্ন ডাইভ সাইট রয়েছে।
তবে সমুদ্রের গভীরে ডাইভিং করার আগে প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া, পানির অবস্থা এবং স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
পালাওয়ানের প্রবালপ্রাচীর
পালাওয়ানের সামুদ্রিক পরিবেশে প্রবালপ্রাচীরের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রবাল শুধু সুন্দর নয়; এটি বহু সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল।
ছোট মাছ, সামুদ্রিক জীব এবং নানা ধরনের প্রাণী প্রবালপ্রাচীরের ওপর নির্ভর করে।
পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবেশ রক্ষা করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যানগ্রোভ বন
পালাওয়ানের বিভিন্ন অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে।
ম্যানগ্রোভ উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো বহু মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল।
কিছু অঞ্চলে কায়াক করে ম্যানগ্রোভের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
জলের ওপর নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, আর দুই পাশে গাছের শিকড় ও সবুজ পাতার জটিল কাঠামো দেখা যায়।
পালাওয়ানের বন্যপ্রাণী
পালাওয়ানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও পাখি রয়েছে।
দ্বীপটির কিছু স্থানীয় প্রাণীও রয়েছে, যাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
বনে হাঁটার সময় বন্যপ্রাণী দেখার চেষ্টা করা গেলেও তাদের কাছাকাছি যাওয়া বা খাবার দেওয়া উচিত নয়।
প্রকৃতির মধ্যে পর্যটকের ভূমিকা হওয়া উচিত পর্যবেক্ষকের মতো।
পালাওয়ানের সৈকত
পালাওয়ানের সৈকতের বৈচিত্র্য অসাধারণ।
কোথাও সাদা বালি, কোথাও পাথুরে উপকূল, কোথাও পাহাড়ের নিচে ছোট সৈকত।
কিছু সৈকতে পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক বেশি, আবার কিছু জায়গায় শান্ত পরিবেশ পাওয়া যায়।
সকালের সমুদ্র এবং বিকেলের সমুদ্রের রংও আলাদা।
সূর্যাস্ত
পালাওয়ানে সূর্যাস্ত দেখা একটি আলাদা অভিজ্ঞতা।
দিগন্তের দিকে সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যায়। আকাশের রং বদলে যেতে থাকে। সমুদ্রের জলে সেই রঙের প্রতিফলন পড়ে।
নৌকার ওপর বসে সূর্যাস্ত দেখা গেলে চারপাশে শুধু সমুদ্র, আকাশ এবং দূরের দ্বীপ—এই সরল দৃশ্যই অসাধারণ মনে হয়।
পালাওয়ানের খাবার
ফিলিপাইনের খাবারে চাল, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের সসের ব্যবহার দেখা যায়।
পালাওয়ানে সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় তাজা মাছ ও সামুদ্রিক খাবারের বৈচিত্র্য পাওয়া যায়।
Adobo ফিলিপাইনের অন্যতম পরিচিত খাবার। মাংস বা অন্যান্য উপাদান সয়া সস, ভিনেগার ও মশলা দিয়ে রান্না করা হয়।
Sinigang টক স্বাদের একটি জনপ্রিয় স্যুপজাতীয় খাবার।
এছাড়া গ্রিল করা মাছ, চিংড়ি ও বিভিন্ন সামুদ্রিক খাবারও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
ফল হিসেবে আম, আনারস, কলা এবং অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল সহজেই পাওয়া যায়।
দ্বীপে রাতের জীবন
পালাওয়ানের অনেক অঞ্চলে বড় শহরের মতো ব্যস্ত রাতের জীবন নেই।
বরং সমুদ্রের ধারে বসে শান্ত পরিবেশ উপভোগ করাই এখানে বেশি আকর্ষণীয়।
রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে তারাভরা আকাশ দেখা যায়। শহরের আলো কম থাকায় কিছু দ্বীপে রাতের আকাশ বিশেষভাবে সুন্দর হতে পারে।
স্থানীয় মানুষের জীবন
পালাওয়ানের বহু মানুষের জীবন সমুদ্র ও প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।
মাছ ধরা, নৌকা চালানো, পর্যটন এবং স্থানীয় ব্যবসা মানুষের জীবিকার অংশ।
দ্বীপে ভ্রমণের সময় স্থানীয় জীবনযাত্রার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
ছবি তোলার আগে মানুষের অনুমতি নেওয়া এবং স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন থাকা ভালো ভ্রমণ আচরণের অংশ।
পরিবেশ সংরক্ষণ
পালাওয়ানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক পরিবেশ।
কিন্তু অতিরিক্ত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য, প্রবাল ক্ষতি এবং অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন এই পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই পর্যটকদের কয়েকটি বিষয় মনে রাখা উচিত—
সমুদ্রে প্লাস্টিক না ফেলা, প্রবাল না ছোঁয়া, বন্যপ্রাণীকে খাবার না দেওয়া, নির্ধারিত এলাকায় থাকা এবং স্থানীয় পরিবেশবিধি মেনে চলা।
একটি সুন্দর পর্যটনস্থলকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষত রাখার দায়িত্ব পর্যটকেরও রয়েছে।
পালাওয়ান ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
পালাওয়ানে ভ্রমণের জন্য শুষ্ক ও তুলনামূলক স্থিতিশীল আবহাওয়ার সময় অনেক পর্যটকের কাছে সুবিধাজনক।
তবে দ্বীপ অঞ্চলের আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বৃষ্টি বা ঝড়ের কারণে নৌভ্রমণ বাতিলও হতে পারে।
তাই ভ্রমণের আগে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা এবং পরিকল্পনায় কিছুটা নমনীয়তা রাখা ভালো।
ভারত থেকে পালাওয়ান
ভারত থেকে পালাওয়ান যেতে সাধারণত আন্তর্জাতিক বিমানপথে ফিলিপাইনের বড় শহরে পৌঁছে সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে Puerto Princesa বা Coron অঞ্চলের দিকে যেতে হয়।
ফ্লাইট রুট সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই বুকিংয়ের আগে বর্তমান বিমানসংযোগ যাচাই করা উচিত।
ফিলিপাইনে প্রবেশের ভিসা ও অন্যান্য নিয়মও ভারতীয় নাগরিকদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।
সাত দিনের পালাওয়ান ভ্রমণ পরিকল্পনা
প্রথম দিন: Puerto Princesa
শহরে পৌঁছে হোটেলে বিশ্রাম নেওয়া যায়।
বিকেলে স্থানীয় বাজার বা শহরের আশপাশ ঘুরে দেখা যেতে পারে।
দ্বিতীয় দিন: Underground River
পুরো দিন রাখা যায় Puerto Princesa Underground River-এর জন্য।
গুহা, নদী, বন এবং উপকূলীয় প্রকৃতি মিলিয়ে দিনটি বিশেষ হবে।
তৃতীয় দিন: El Nido
Puerto Princesa থেকে El Nido-র দিকে যাত্রা করা যায়।
পৌঁছে বিকেলে শহরের আশপাশ ও সৈকত ঘুরে দেখা যেতে পারে।
চতুর্থ দিন: Island Hopping
Big Lagoon, Small Lagoon, বিভিন্ন সৈকত ও স্নরকেলিংয়ের জন্য পুরো দিন রাখা যায়।
পঞ্চম দিন: আরও সমুদ্র
আরেকটি island-hopping রুট বেছে নিয়ে নতুন দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও সৈকত দেখা যেতে পারে।
বিকেলে সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়।
ষষ্ঠ দিন: Coron
সময় ও পরিবহন পরিকল্পনা অনুযায়ী Coron-এর দিকে যাত্রা করা যেতে পারে।
পৌঁছে বিশ্রাম এবং স্থানীয় পরিবেশ উপভোগ করা যায়।
সপ্তম দিন: Kayangan Lake ও আশপাশ
Kayangan Lake, উপসাগর এবং সুযোগ অনুযায়ী স্নরকেলিং বা ডাইভিং করা যেতে পারে।
তারপর ফেরার যাত্রা শুরু করা যায়।
কতদিন সময় দরকার?
শুধু Puerto Princesa ও Underground River দেখতে চাইলে কয়েক দিনই যথেষ্ট হতে পারে।
El Nido যোগ করলে আরও কয়েক দিন দরকার।
আর Coron-ও যুক্ত করলে অন্তত এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় রাখলে ভ্রমণ তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ হয়।
পালাওয়ান এমন জায়গা যেখানে খুব দ্রুত ঘুরে যাওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে প্রকৃতি উপভোগ করাই বেশি আনন্দদায়ক।
পালাওয়ান কেন বিশেষ
পৃথিবীর অনেক পর্যটনকেন্দ্রে সমুদ্র আছে, পাহাড় আছে, জঙ্গল আছে। কিন্তু পালাওয়ানের বিশেষত্ব হল এই সবকিছু একসঙ্গে এবং অত্যন্ত কাছাকাছি পাওয়া যায়।
একদিকে সাদা সৈকত, অন্যদিকে চুনাপাথরের পাহাড়। পাহাড়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে গুহা। সমুদ্রের নিচে রয়েছে প্রবালপ্রাচীর। জঙ্গলে রয়েছে নানা ধরনের প্রাণী। আর দ্বীপের মাঝখানে রয়েছে মানুষের ছোট ছোট বসতি।
এই পুরো পরিবেশ পালাওয়ানকে একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক জাদুঘরের মতো করে তুলেছে।
শেষ কথা
পালাওয়ান এমন একটি ভ্রমণস্থল, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটি বিশাল ছবি এঁকেছে।
নীল সমুদ্রের ওপর ছোট নৌকা, তার চারপাশে চুনাপাথরের পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে সবুজ জঙ্গল, নিচে প্রবালের জগৎ এবং দূরে সাদা বালির সৈকত—এই দৃশ্য চোখে দেখার পর সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
Puerto Princesa-এর ভূগর্ভস্থ নদী আমাদের পৃথিবীর গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। El Nido শেখায় সমুদ্রের সৌন্দর্য কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে। Coron দেখায় ইতিহাস ও সামুদ্রিক প্রকৃতি কীভাবে একই জায়গায় পাশাপাশি থাকতে পারে।
সবশেষে, পালাওয়ানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো একটাই—প্রকৃতি যত সুন্দর, তার প্রতি আমাদের দায়িত্বও তত বেশি।
সমুদ্রের জল, প্রবালপ্রাচীর, জঙ্গল, পাহাড় এবং দ্বীপগুলো যদি যত্নে রক্ষা করা যায়, তবে আগামী প্রজন্মও কোনও এক সকালে পালাওয়ানের নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে একই বিস্ময় অনুভব করতে পারবে।
========== শেষ ==========