Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

পি. কে. থ্রেসিয়া: সেতু-সড়ক নির্মাণের জগতে ভারতের এক পথিকৃৎ মহীয়সী নারী।

একটা সময় ছিল, যখন ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিংকে মূলত পুরুষদের পেশা হিসেবেই দেখা হত। মেয়েরা উচ্চশিক্ষা নিলেও প্রকৌশল, নির্মাণ, সরকারি জনপথ বা সেতু নির্মাণের মতো ক্ষেত্রকে তাঁদের কর্মজীবনের স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে ভাবা হত না।

বিশেষ করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে একজন নারীকে শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চলত না—তাঁকে মাঠে কাজ করতে হত, নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব নিতে হত, শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করতে হত এবং সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামলাতে হত।

এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই উঠে এসেছিলেন পি. কে. থ্রেসিয়া।

১৯২৪ সালে কেরলে জন্ম নেওয়া থ্রেসিয়া College of Engineering, Guindy-তে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন এবং ১৯৪৪ সালে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে কেরল Public Works Department-এ দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়ে ১৯৭১ সালে তিনি রাজ্যের Chief Engineer হন। বিভিন্ন সূত্র তাঁকে ভারতের প্রথম মহিলা Chief Engineer হিসেবে উল্লেখ করে।

তাঁর জীবন শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি ভারতের পরিকাঠামো নির্মাণের ইতিহাসে নারীর প্রবেশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন

পি. কে. থ্রেসিয়ার জন্ম ১২ মার্চ ১৯২৪ সালে কেরলে। তাঁর পরিবার ছিল কৃষিনির্ভর।

তাঁর বাবা-মা মেয়ের শিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে কেরলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নারীদের সামনে নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ছিল।

থ্রেসিয়ার আগ্রহ ছিল প্রকৌশলে।

কেরলের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মহিলাদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত থাকায় তিনি তৎকালীন মাদ্রাজের College of Engineering, Guindy (CEG)-তে ভর্তি হন।

সেখানেই তিনি A. Lalitha এবং Leelamma George-এর সঙ্গে পড়াশোনা করেন। এই তিনজন ছিলেন CEG-এর প্রথমদিকের মহিলা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ১৯৪৪ সালে তাঁরা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

একটি মজার অথচ সময়ের বাস্তবতা তুলে ধরা ঘটনা হল—তাঁদের ডিগ্রি সার্টিফিকেটের ছাপা ফর্মে যেখানে সাধারণত ‘He’ লেখা থাকত, সেখানে সেটি কেটে ‘She’ লিখতে হয়েছিল বলে তাঁদের সম্পর্কে প্রকাশিত উপকরণে উল্লেখ রয়েছে।

এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যেই সেই সময়ের পুরুষ-প্রধান প্রকৌশল জগতের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৪৪: কর্মজীবনের শুরু

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জনের পর থ্রেসিয়া তৎকালীন Kingdom of Cochin-এর Public Works Commission-এ Section Officer হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তখনও ভারত স্বাধীন হয়নি।

অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি Assistant Construction Engineer হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল Mulakunnathukavu-এর TB Sanatorium-এর নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি শুধু অফিসে বসে নকশা তৈরির কাজ নয়। নির্মাণের বাস্তব পরিস্থিতি, উপকরণের মান, শ্রমিকদের কাজ, সময়সীমা এবং প্রকল্পের খরচ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়।

একজন নারী হিসেবে সেই সময়ে এই পেশায় কাজ করা ছিল আরও কঠিন।

কিন্তু থ্রেসিয়া ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে জায়গা তৈরি করেন।

ধাপে ধাপে দায়িত্ব বৃদ্ধি

সরকারি প্রকৌশল বিভাগে তাঁর কর্মজীবন ক্রমশ এগোতে থাকে।

১৯৫৬ সালে তিনি Executive Engineer হন এবং Ernakulam-এ দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি প্রায় নয় বছর কাজ করেন।

এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি Superintending Engineer পদে উন্নীত হন এবং Kozhikode Roads and Buildings-এর দায়িত্ব পান।

এগুলি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত দায়িত্ব।

একজন Superintending Engineer-কে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় জানলেই চলত না। একাধিক প্রকল্প, অর্থ বরাদ্দ, কর্মী পরিচালনা এবং নির্মাণের গুণমান—সবকিছুর ওপর নজর রাখতে হত।

থ্রেসিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে পরবর্তী বড় দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করে।

১৯৭১: Chief Engineer

১৯৭১ সালে তাঁর কর্মজীবনে আসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

তাঁকে Kerala Public Works Department-এর Chief Engineer করা হয়।

এই পদে তিনি আট বছরের মতো সময় কাজ করেন এবং ভারতের সরকারি প্রকৌশল ব্যবস্থায় একজন মহিলা হিসেবে শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব সামলানোর নজির তৈরি করেন।

তাঁর এই নিয়োগের গুরুত্ব শুধু ‘প্রথম মহিলা’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

Chief Engineer হিসেবে তাঁকে বিশাল পরিমাণ সরকারি নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়েছিল। রাস্তা, সেতু, সরকারি ভবন এবং অন্যান্য জনপরিকাঠামোর প্রকল্প তাঁর দায়িত্বের আওতায় ছিল।

একজন নারী সেই সময়ে এমন একটি বড় প্রযুক্তিগত প্রশাসনিক পদে কাজ করছেন—এটাই ছিল একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

সেতু নির্মাণে বড় ভূমিকা

থ্রেসিয়ার কর্মজীবনের সঙ্গে সেতু নির্মাণের একটি বিশেষ সম্পর্ক ছিল।

তাঁর Chief Engineer থাকার সময় কেরলে প্রতিবছর বহু নতুন সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত একটি প্রকৌশল-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর দায়িত্বকালে বছরে প্রায় ৩৫টি নতুন সেতু কমিশন করা হত।

কেরলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলে সেতুর গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়।

নদী, খাল, জলাভূমি ও পাহাড়ি এলাকার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি সেতু শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করে না। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহণ, বাজারে পৌঁছনো, হাসপাতাল ও স্কুলে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

তাই থ্রেসিয়ার কাজের প্রভাব কেবল প্রকৌশল দপ্তরের নথিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

রাস্তা নির্মাণে নতুন চিন্তা

থ্রেসিয়ার কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাস্তা নির্মাণে নতুন উপকরণ ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা।

তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত জীবনীমূলক উপকরণে rubberised bitumen ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।

রাস্তা নির্মাণের প্রযুক্তি তখনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল।

আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, যানবাহনের চাপ এবং রাস্তার স্থায়িত্ব—সবকিছু বিবেচনা করে উপযুক্ত নির্মাণপদ্ধতি নির্বাচন করতে হত।

প্রকৌশলকে শুধু বইয়ের জ্ঞান হিসেবে না দেখে বাস্তব সমস্যার সমাধানের উপায় হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল এই ধরনের কাজের মূল উদ্দেশ্য।

হাসপাতাল ও জনপরিকাঠামো

থ্রেসিয়ার দায়িত্ব শুধু রাস্তা ও সেতুতে সীমাবদ্ধ ছিল না।

সরকারি পরিকাঠামোর বিভিন্ন প্রকল্প, যার মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণও ছিল, তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এখানে তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝা যায়।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অনেক সময় মানুষের চোখের আড়ালে থাকে। মানুষ একটি হাসপাতাল ব্যবহার করে, একটি সেতু পার হয় বা একটি রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালায়; কিন্তু সেই অবকাঠামো তৈরি করার পেছনে যে প্রকৌশলী, পরিকল্পনাকারী ও কর্মীদের দীর্ঘ পরিশ্রম থাকে, তা সাধারণত দৃশ্যমান হয় না।

থ্রেসিয়ার কর্মজীবন সেই অদৃশ্য পরিশ্রমের ইতিহাসেরই অংশ।

“ইঞ্জিনিয়ারের জীবন…”

থ্রেসিয়াকে নিয়ে প্রকাশিত একটি লেখায় তাঁর একটি মন্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে—ইঞ্জিনিয়ারের জীবনকে তিনি নারীদের জন্য অসম্ভব কঠিন বলে মনে করতেন না।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়।

নারীদের অনেক পেশা থেকে দূরে রাখার একটি প্রচলিত যুক্তি ছিল—কাজটি নাকি তাঁদের জন্য খুব কঠিন।

কিন্তু থ্রেসিয়ার কর্মজীবন দেখিয়েছিল, একজন নারীও প্রযুক্তিগত জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৃহৎ সরকারি প্রকল্পের নেতৃত্ব দিতে পারেন।

অবসর নিলেও থামেননি

১৯৭৯ সালে তিনি Kerala Public Works Department থেকে অবসর নেন।

তবে তাঁর পেশাগত জীবন সেখানেই পুরোপুরি শেষ হয়নি। অবসরের পর তিনি Taj Engineers-এর সঙ্গে পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত হন বলে জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ কয়েক দশকের সরকারি অভিজ্ঞতাকে তিনি পরবর্তী সময়েও প্রকৌশল ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছিলেন।

১৯৪৪ সালে যে কর্মজীবনের শুরু, তা প্রায় ৩৫ বছরের দীর্ঘ সরকারি চাকরির মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালে শেষ হয়।

একজন নারী, একটি প্রজন্ম

পি. কে. থ্রেসিয়ার সময়ের সঙ্গে আজকের প্রকৌশল শিক্ষার পরিবেশের অনেক পার্থক্য রয়েছে।

আজ দেশের বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিপুল সংখ্যক মহিলা পড়াশোনা করেন। সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার কিংবা অন্যান্য প্রকৌশল শাখায় নারীদের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে।

কিন্তু এই পরিবর্তন একদিনে ঘটেনি।

থ্রেসিয়ার মতো প্রাথমিক প্রজন্মের মহিলা প্রকৌশলীরা যখন কলেজে ঢুকেছিলেন, তখন তাঁদের নিজেদের উপস্থিতিই ছিল একটি নতুন ঘটনা।

তাঁদের পথ চলার ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রকৌশল পেশাটি আরও পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

তিন পথিকৃৎ নারী প্রকৌশলী

পি. কে. থ্রেসিয়ার নাম A. Lalitha এবং Leelamma George-এর সঙ্গেও বিশেষভাবে যুক্ত।

তিনজন একই সময়ে College of Engineering, Guindy-তে পড়াশোনা করেছিলেন এবং নারী প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে তাঁদের নাম গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তাঁদের কর্মক্ষেত্রের পথ এক ছিল না।

ললিতা বিদ্যুৎ প্রকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ কর্মজীবন গড়েন, Leelamma George সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কাজ করেন, আর থ্রেসিয়া কেরলের সরকারি Public Works Department-এ ক্রমশ উচ্চপদে উঠে Chief Engineer হন।

একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু হলেও তাঁদের প্রত্যেকের পথ আলাদা ছিল।

কেন তাঁর গল্প গুরুত্বপূর্ণ?

পি. কে. থ্রেসিয়ার জীবনের গুরুত্ব শুধু এই কারণে নয় যে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছেছিলেন।

তাঁর কাজের প্রকৃতি ছিল এমন, যার ফল সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করে।

একটি রাস্তা দিয়ে মানুষ চলেছে।

একটি সেতু দিয়ে নদী পার হয়েছে।

একটি সরকারি ভবন ব্যবহার করেছে।

একটি হাসপাতালের পরিষেবা পেয়েছে।

এই সমস্ত পরিকাঠামোর সঙ্গে প্রকৌশলীদের কাজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

থ্রেসিয়া সেই বৃহৎ জনপরিকাঠামো ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন।

তাঁর গল্প তাই ‘একজন মহিলা সফল হলেন’—এই সরল বাক্যের চেয়ে অনেক বড়।

এটি দেখায়, কোনও পেশায় প্রথম কয়েকজন নারী প্রবেশ করলে তাঁদের কাজের প্রভাব ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উত্তরাধিকার

পি. কে. থ্রেসিয়া ১৮ নভেম্বর ১৯৮১ সালে মারা যান। তাঁর জীবনকাল খুব দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু কর্মজীবন ছিল বিস্তৃত।

১৯৪৪ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় প্রবেশ থেকে ১৯৭১ সালে Chief Engineer হওয়া পর্যন্ত তাঁর পথটি ছিল ধাপে ধাপে তৈরি।

তিনি কোনও শর্টকাটে শীর্ষে পৌঁছননি।

প্রতিটি পদে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়েছেন।

তাঁর জীবনের এই ধারাবাহিকতা আজও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ প্রকৌশল শুধু ডিগ্রির বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দায়িত্ব, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং মানুষের প্রয়োজন বোঝার ক্ষমতা।

উপসংহার

পি. কে. থ্রেসিয়ার জীবনের দিকে তাকালে একটি সেতুর কথা মনে পড়ে।

সেতু যেমন দুই প্রান্তকে যুক্ত করে, তাঁর কর্মজীবনও যেন দুই সময়কে যুক্ত করেছে—একদিকে সেই সময়, যখন প্রকৌশল ছিল পুরুষ-প্রধান পেশা; অন্যদিকে সেই ভবিষ্যৎ, যেখানে নারীরাও বড় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে পারবেন।

তিনি ১৯৪৪ সালে যখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, তখন নারী প্রকৌশলী ছিলেন হাতে গোনা।

প্রায় তিন দশক পরে ১৯৭১ সালে তিনি কেরলের Chief Engineer-এর দায়িত্ব নেন।

এই যাত্রাপথের মধ্যে রয়েছে রাস্তা, সেতু, হাসপাতাল, সরকারি নির্মাণ এবং অসংখ্য প্রকল্পের বাস্তব ইতিহাস।

কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার শুধু নির্মিত অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হলো—প্রকৌশল কোনও লিঙ্গের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়।

যোগ্যতা, শিক্ষা, পরিশ্রম এবং দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে একজন নারীও এমন একটি ক্ষেত্রের নেতৃত্ব দিতে পারেন, যে ক্ষেত্র একসময় তাঁর জন্য প্রায় বন্ধ বলেই মনে করা হত।

পি. কে. থ্রেসিয়া সেই দরজা খুলে প্রবেশ করেছিলেন।

তারপর নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের মাধ্যমে সেই পথটি আরও দৃশ্যমান করে গিয়েছেন।

আজ ভারতের অসংখ্য তরুণী যখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, রাস্তা-সেতু ডিজাইন করছেন, বড় নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করছেন কিংবা সরকারি প্রকৌশল বিভাগে দায়িত্ব নিচ্ছেন—তখন ইতিহাসের অনেকটা পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রথম দিকের পথিকৃৎ নারীদের কথা মনে রাখা প্রয়োজন।

পি. কে. থ্রেসিয়া তাঁদেরই একজন—ভারতের প্রকৌশল ইতিহাসের এক দৃঢ়, নীরব এবং গুরুত্বপূর্ণ নাম।

তথ্যসূত্র: College of Engineering, Guindy-র প্রাক্তন মহিলা প্রকৌশলীদের ইতিহাসসংক্রান্ত উপকরণ, P. K. Thressia-র জীবনীভিত্তিক গবেষণা এবং Kerala Public Works Department-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *