Categories
উপন্যাস

শেষ স্টেশনের আগে (প্রথম পর্ব)।

প্রথম পর্ব — যে ট্রেনটি সময়মতো আসে না

স্টেশনটার নাম মাধবপুর।

ছোট্ট স্টেশন।

দু’দিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু ধানখেত।

স্টেশনের পেছনে একটা পুরনো শিমুলগাছ।

সামনে চায়ের দোকান।

দুটি প্ল্যাটফর্ম।

একটা ফুটওভারব্রিজ।

আর একটা রেললাইন, যেটা বহু বছর ধরে ব্যবহার হয় না।

সেই লাইনটার দিকে কেউ যায় না।

কারণ গ্রামের লোকেরা বলে—

ওই লাইনে রাতের পর একটা ট্রেন আসে।

ট্রেনটা কোনও সময়সূচিতে নেই।

কোনও রেলওয়ে মানচিত্রে নেই।

কোনও টিকিট কাউন্টারে তার টিকিট বিক্রি হয় না।

তবু প্রতি বছর একই রাতে—

রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে—

দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়।

তারপর পুরনো লাইনের ওপর আলো দেখা যায়।

আর ট্রেনটা এসে থামে ঠিক স্টেশনের শেষ প্রান্তে।

মাত্র তিন মিনিট।

তারপর চলে যায়।

প্রথমবার এই গল্প শুনে অর্ক হেসেছিল।

“ভূতের ট্রেন?”

স্টেশনের চায়ের দোকানের বৃদ্ধ বলেছিল,

“ভূতের নয়।”

“তাহলে?”

“যারা ট্রেনে ওঠে, তাদের কেউ কেউ আর আগের মানুষ থাকে না।”

অর্ক হেসে বলেছিল,

“এটা আরও ভয়ের গল্প।”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দেয়নি।

শুধু চায়ের কাপটা তার সামনে রেখে বলেছিল,

“তুমি এবার বাড়ি যাও।”

অর্ক কাপটা হাতে নিয়ে বলেছিল,

“আমি এখানে থাকব।”

“আজ?”

“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।

“আজ তো সেই রাত।”

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিল।

রাত ১০টা ৫২।

আর এক ঘণ্টারও কম।

সে তখনও জানত না—

এই এক ঘণ্টা তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এক ঘণ্টা হতে চলেছে।


অর্ক কলকাতার একটা ছোট সংবাদপত্রে ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করত।

তার বিশেষত্ব ছিল পরিত্যক্ত জায়গার ছবি তোলা।

পুরনো কারখানা।

বন্ধ সিনেমা হল।

পরিত্যক্ত রেলস্টেশন।

পুরনো সেতু।

ভাঙা বাড়ি।

মানুষের ফেলে যাওয়া জায়গাগুলো তাকে টানত।

তার মতে—

“একটা জায়গা যখন খালি হয়ে যায়, তখন তার আসল গল্প বেরিয়ে আসে।”

তিন মাস আগে সে মাধবপুর স্টেশনের কথা জানতে পারে।

একজন পুরনো রেলকর্মী তাকে বলেছিল,

“স্টেশনের একটা লাইন বন্ধ হয়ে আছে।”

অর্ক জিজ্ঞেস করেছিল,

“কেন?”

লোকটা বলেছিল,

“ওই লাইনে একসময় রাতের একটা ট্রেন চলত।”

“এখন?”

“এখন চলে না।”

“তবু?”

লোকটা বলেছিল,

“সব ট্রেন বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু যাত্রা শেষ হয় না।”

সেই কথাটা অর্কের মাথায় আটকে গিয়েছিল।

সে ঠিক করেছিল মাধবপুরে যাবে।

কিন্তু যাওয়ার আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল।

তার অফিসের পুরনো ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে সে একটা ছবি পেয়েছিল।

ছবিতে মাধবপুর স্টেশন।

বছর—

২০০৪।

ছবির একেবারে ডানদিকে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ে।

সাদা পোশাক।

চুল খোলা।

মুখটা স্পষ্ট নয়।

ছবির পেছনে হাতে লেখা—

“রাত ১১:৪৭-এর আগে কাউকে বিশ্বাস করো না।”

অর্ক ছবিটা দেখে অবাক হয়েছিল।

কারণ হাতের লেখাটা তার পরিচিত।

তার নিজের হাতের লেখা।

কিন্তু সে নিশ্চিত—

২০০৪ সালে তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।


রাত ১১টা ১০।

স্টেশনে এখন কেউ নেই।

চায়ের দোকান বন্ধ।

স্টেশনমাস্টারের ঘরেও আলো নেই।

শুধু প্ল্যাটফর্মের কয়েকটা হলুদ বাতি জ্বলছে।

অর্ক ক্যামেরা সেট করল।

তার সঙ্গে একটা অডিও রেকর্ডারও আছে।

সে পুরনো লাইনের দিকে তাকাল।

লাইনটা মরচে পড়া।

ঘাসে ঢেকে গেছে।

কোথাও কোথাও রেললাইনের ওপর গাছের শিকড় উঠে এসেছে।

এখানে ট্রেন আসার কোনও সম্ভাবনাই নেই।

অর্ক নিজের মনে বলল,

“আজ সব রহস্যের সমাধান হবে।”

তারপর ফোনে সময় দেখল।

১১:২১।

হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।

Unknown Number

এখানে এসো না।

অর্ক মেসেজটা পড়ে হাসল।

রিপ্লাই করল—

কেন?

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

কারণ তুমি আগেও এসেছিলে।

অর্কের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে লিখল—

আমি এই প্রথম এলাম।

উত্তর এল—

তুমি মনে করতে পারছ না।

অর্ক আর কোনও উত্তর দিল না।

ফোনটা পকেটে রেখে ক্যামেরার দিকে মন দিল।


১১টা ৩২।

হঠাৎ দূরে একটা আলো দেখা গেল।

অর্ক চমকে উঠল।

আলোটা খুব ছোট।

দূরে।

রেললাইনের বাঁক ঘুরে যেন এগিয়ে আসছে।

সে ক্যামেরা হাতে নিল।

জুম করল।

আলোটা বড় হচ্ছে।

কিন্তু কোনও ট্রেনের শব্দ নেই।

একেবারেই নেই।

অর্ক অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

১১টা ৩৮।

আলো আরও কাছে।

এবার সে ট্রেনের একটা অবয়ব দেখতে পেল।

পুরনো দিনের ট্রেন।

কালো ধোঁয়া নেই।

শব্দ নেই।

কিন্তু ট্রেন আসছে।

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে ক্যামেরার শাটার টিপতে লাগল।

একটা।

দুটো।

তিনটে।

হঠাৎ ক্যামেরার স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

ব্যাটারি পুরো চার্জ থাকা সত্ত্বেও।

তারপর অডিও রেকর্ডার নিজে থেকে চালু হয়ে গেল।

একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল—

“অর্ক, এবারও দেরি করলি।”

অর্ক জমে গেল।

কণ্ঠটা তার নিজের।


১১টা ৪৪।

ট্রেন এখন প্ল্যাটফর্মের সামনে।

অদ্ভুত ব্যাপার—

ট্রেনের জানলায় আলো জ্বলছে।

কিন্তু কোনও যাত্রী দেখা যাচ্ছে না।

শুধু শেষ কামরার একটা জানলার সামনে একজন দাঁড়িয়ে।

একজন মেয়ে।

সাদা পোশাক।

খোলা চুল।

অর্ক ছবিটার কথা মনে করল।

২০০৪ সালের সেই ছবি।

একই মেয়ে।

সে ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মের কিনারায় এগিয়ে গেল।

মেয়েটি জানলার ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে।

তারপর হাত তুলল।

অর্কের দিকে ইশারা করল।

অর্ক বুঝতে পারল না কেন।

মেয়েটা ঠোঁট নাড়ল।

কোনও শব্দ শোনা গেল না।

অর্ক আরও কাছে গেল।

এইবার সে স্পষ্ট দেখতে পেল—

মেয়েটার হাতে একটা ছোট্ট লাল ডায়েরি।

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

কারণ তার নিজের ব্যাগের ভেতরেও ঠিক একই রকম একটা লাল ডায়েরি ছিল।

যেটা সে কখনও ব্যবহার করেনি।

ডায়েরিটা সে পেয়েছিল তার মায়ের পুরনো জিনিসপত্রের মধ্যে।

কেন যেন সেটা সবসময় সঙ্গে রাখত।

অর্ক ডায়েরিটা বের করল।

ট্রেনের মেয়েটা মাথা নাড়ল।

তারপর নিজের ডায়েরিটা খুলল।

অর্কও খুলল।

প্রথম পাতায় কিছু লেখা ছিল না।

দ্বিতীয় পাতায়ও না।

তৃতীয় পাতায়—

আজকের তারিখ।

আর নিচে একটা বাক্য।

“আজ রাত ১১:৪৭-এ তুমি আমাকে চিনতে পারবে।”

অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

সে মেয়েটার দিকে তাকাল।

ট্রেনের দরজা খুলে গেল।

১১:৪৬।

এক মিনিট বাকি।

মেয়েটা দরজায় দাঁড়িয়ে।

অর্ক বুঝতে পারল না সে কেন এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু তার পা যেন নিজেরাই নড়ছে।

সে ট্রেনের সিঁড়িতে পা রাখল।

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে বৃদ্ধ চায়ের দোকানদারের চিৎকার—

“অর্ক!”

অর্ক ফিরে তাকাল।

বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

তার মুখে আতঙ্ক।

“ট্রেনে উঠো না!”

অর্ক বলল,

“কেন?”

বৃদ্ধ চিৎকার করল,

“কারণ ওটা তোমার জন্য আসেনি!”

অর্কের পা থেমে গেল।

মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর প্রথমবার কথা বলল।

“এসো।”

অর্ক ফিসফিস করে বলল,

“তুমি কে?”

মেয়েটি বলল,

“যাকে তুমি বারো বছর আগে হারিয়েছিলে।”

অর্ক স্তব্ধ।

“আমি তো তোমাকে চিনি না।”

মেয়েটির চোখে জল এসে গেল।

সে বলল,

“তাই তো আবার আমাকে খুঁজতে এসেছ।”

ঠিক তখনই—

১১:৪৭।

ট্রেনের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।

মেয়েটা জানলার ওপারে।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

অর্ক দৌড়ে ট্রেনের পাশে ছুটতে লাগল।

“থামো!”

মেয়েটা জানলার কাঁচে হাত রাখল।

তার ঠোঁট নড়ল।

এবার অর্ক স্পষ্ট শুনতে পেল—

“তুমি আমাকে মেরোনি, অর্ক।”

অর্ক থমকে গেল।

ট্রেন অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

কিন্তু যাওয়ার আগে শেষ কামরার জানলায় একটা শব্দ লেখা রয়ে গেল।

কুয়াশার ওপর আঙুল দিয়ে লেখা—

“আগামীকাল আবার এসো।”


রাত ১২টা ১০।

স্টেশন আবার আগের মতো।

পুরনো লাইন।

নীরবতা।

অর্ক প্ল্যাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে।

তার হাতে লাল ডায়েরি।

বৃদ্ধ চায়ের দোকানদার ধীরে ধীরে কাছে এল।

“আমি তোকে সাবধান করেছিলাম।”

অর্ক বলল,

“ও মেয়েটা কে?”

“জানি না।”

“মিথ্যে বলছেন।”

“আমি জানি না।”

“২০০৪ সালের ছবিতে ও ছিল।”

বৃদ্ধ চুপ।

“ও আমাকে বলল, আমি ওকে বারো বছর আগে হারিয়েছিলাম।”

বৃদ্ধ এবার অর্কের দিকে তাকাল।

“বারো বছর আগে তুই কোথায় ছিলি?”

অর্ক বলল,

“কলকাতায়।”

বৃদ্ধ মাথা নাড়ল।

“তুই ভুল বলছিস।”

“আমি?”

“বারো বছর আগে তুই এখানেই ছিলি।”

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

“অসম্ভব।”

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটা পুরনো ছবি বের করল।

ছবিতে একটা ছোট ছেলে।

বয়স পাঁচ-ছয়।

তার পাশে সেই মেয়েটি।

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

ছোট ছেলেটার মুখ—

তার নিজের মুখ।

ছবির পেছনে লেখা—

“অর্ক ও মেঘলা — মাধবপুর, ২০১৪।”

অর্কের মাথা ঘুরতে লাগল।

“মেঘলা?”

বৃদ্ধ বলল,

“ওর নাম মেঘলা।”

“ও কোথায়?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলল,

“মেঘলা বারো বছর আগে মারা গেছে।”

অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কীভাবে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিল না।

অর্ক আবার জিজ্ঞেস করল,

“কীভাবে মারা গেছে?”

বৃদ্ধ এবার খুব নিচু গলায় বলল,

“ওই ট্রেনের নিচে।”

অর্কের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।

দূরে কোথাও আবার ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

কিন্তু পুরনো লাইনটা—

চোখের সামনে—

সম্পূর্ণ ফাঁকা।

অর্ক ধীরে ধীরে লাল ডায়েরিটা খুলল।

নতুন একটা বাক্য সেখানে লেখা হয়েছে।

আগে ছিল না।

কালো কালিতে।

“অর্ক, তুমি যদি সত্যিই সব মনে করতে চাও, তাহলে আগামীকাল ট্রেনে উঠবে।”

তার নিচে—

“কারণ মেঘলার মৃত্যুটা দুর্ঘটনা ছিল না।”

অর্কের বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।

আর শেষ পাতায় লেখা—

“ওকে মেরেছিলে তুমি।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *