শেষ স্টেশনের আগে
দ্বিতীয় পর্ব — অপরাধীর মুখ
রাতটা অর্কের আর কাটল না।
মাধবপুর স্টেশনের কাছে একটা ছোট হোটেলে সে ঘর নিয়েছিল। ঘরের দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ, জানলার বাইরে অন্ধকার মাঠ, আর দূরে রেললাইনের ওপর ঝুলে থাকা একটা হলুদ বাতি।
টেবিলের ওপর লাল ডায়েরিটা খোলা।
শেষ পাতায় লেখা কথাগুলো বারবার পড়ছিল অর্ক।
“ওকে মেরেছিলে তুমি।”
লেখাটা তার নিজের হাতের লেখার মতো। অথচ সে জানে, কথাটা সে লেখেনি।
মেঘলা।
নামটা মাথার মধ্যে ঘুরছিল।
বারো বছর আগে নাকি মেয়েটি মারা গেছে। তার মৃত্যুর সঙ্গে অর্কের সম্পর্ক রয়েছে। অথচ অর্কের স্মৃতিতে মেঘলা নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সে ফোনে মাকে কল করল।
প্রথমবার কেউ ধরল না।
দ্বিতীয়বারও নয়।
তৃতীয়বার ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো গলা ভেসে এল।
“হ্যালো, অর্ক? এত রাতে?”
“মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
“কী হয়েছে?”
“আমি কি ছোটবেলায় কখনও মাধবপুরে থাকতাম?”
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।
অর্ক ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কল কাটা যায়নি।
“মা?”
“হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”
“তুমি আগে উত্তর দাও।”
“তুই তো কলকাতাতেই বড় হয়েছিস।”
“আমি সেটা জানি। কিন্তু তার আগে?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তোর বাবা কাজের সূত্রে অনেক জায়গায় যেতেন। তুইও ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে দু-একবার গিয়েছিলি।”
“মাধবপুরে?”
এবার নীরবতা আরও দীর্ঘ হল।
তারপর মা বললেন,
“এই নামটা কোথায় শুনলি?”
অর্কের বুকের ভেতর কেমন যেন হল।
“মানে তুমি জায়গাটা চেনো?”
“অর্ক, এখন রাত হয়েছে। এসব কথা পরে হবে।”
“মা, মেঘলা কে?”
ওপাশে একটা শব্দ হল। যেন কারও হাত থেকে কাচের গ্লাস পড়ে গেল।
“কী বললি?”
“মেঘলা। মেঘলা নামে কাউকে তুমি চিনতে?”
মা কাঁপা গলায় বললেন,
“তুই মাধবপুরে আছিস?”
অর্ক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
“হ্যাঁ! আর তুমি আমাকে বলবে, আমি বারো বছর আগে কী করেছিলাম?”
মা কাঁদতে শুরু করলেন।
“বাড়ি ফিরে আয়, অর্ক।”
“কেন?”
“দয়া করে। ওই জায়গায় আর থাকিস না।”
“মেঘলার কী হয়েছিল?”
মা কিছুক্ষণ কাঁদলেন। তারপর বললেন,
“সব প্রশ্নের উত্তর পেলে সব সময় ভালো হয় না।”
“আমার উত্তর চাই।”
“তোর বাবা তোকে বাঁচানোর জন্য অনেক কিছু লুকিয়েছিলেন।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“বাবা কী লুকিয়েছিলেন?”
কিন্তু মা আর উত্তর দিলেন না।
ফোন কেটে গেল।
অর্ক কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে জানলার কাছে গেল।
দূরের রেললাইন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে হল, মাঠের মাঝখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
একটা মেয়ে।
সাদা পোশাক।
খোলা চুল।
মেঘলা।
অর্ক চোখের পলক ফেলল।
মেয়েটি নেই।
শুধু বাতাসে ভেসে এল একটা অস্পষ্ট শব্দ—
“কাল এসো।”
পরদিন সকাল আটটা।
অর্ক আবার স্টেশনে গেল।
চায়ের দোকান খুলেছে। বৃদ্ধ দোকানদার মাটির উনুনে জল বসিয়েছেন।
অর্ককে দেখেই বললেন,
“কাল রাতে ঘুম হয়নি, তাই না?”
অর্ক বসে পড়ল।
“আপনি আমাকে সব বলেননি।”
“সব কথা কি একদিনে বলা যায়?”
“মেঘলার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?”
বৃদ্ধ চায়ের কেটলি নামিয়ে রাখলেন।
“বারো বছর আগে মাধবপুরে একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল। একটা মেয়ে রেললাইনে পড়ে মারা যায়।”
“পুলিশ কী বলেছিল?”
“দুর্ঘটনা।”
“আর আপনি কী মনে করেন?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ অর্কের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আমি মনে করি, মেয়েটা কাউকে বাঁচাতে গিয়েছিল।”
“কাকে?”
“একটা ছেলেকে।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
“আমাকে?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।
অর্ক এবার টেবিলের ওপর ছবিটা রাখল।
ছবিতে ছোট্ট অর্ক আর মেঘলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
“এই ছবিটা কোথায় পেয়েছিলেন?”
“তোর বাবা দিয়েছিলেন।”
“আমার বাবা?”
“হ্যাঁ। দুর্ঘটনার কয়েক মাস আগে।”
“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”
“অনেক বছর ধরে।”
“তাঁর নাম বলুন।”
বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত এক ছায়া নেমে এল।
“সুব্রত সেন।”
অর্ক চমকে উঠল।
তার বাবার নাম সুব্রত সেন। তিনি বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলেন—পরিবারের কাছে সেটাই বলা হয়েছিল।
অর্কের বয়স তখন সতেরো।
একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে মা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু বৃদ্ধ বলছেন, বাবার সঙ্গে মাধবপুরের যোগাযোগ ছিল।
অর্ক ধীরে ধীরে বলল,
“আমার বাবা কি মেঘলাকে চিনতেন?”
“খুব ভালো করে।”
“কী সম্পর্ক ছিল তাঁদের?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“মেঘলার বাবা ছিলেন তোর বাবার বন্ধু। দু’জনে একসঙ্গে রেলওয়ের একটা প্রকল্পে কাজ করতেন। পরে সেই প্রকল্পে বড়সড় অনিয়ম ধরা পড়ে।”
“কী ধরনের অনিয়ম?”
“রেললাইনের নিরাপত্তা নিয়ে। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছিল। কয়েকটা রিপোর্টও বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
অর্ক বলল,
“তার সঙ্গে মেঘলার মৃত্যুর সম্পর্ক কী?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
“মেঘলা সেই অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছিল।”
দুপুরের দিকে অর্ক পুরনো স্টেশনমাস্টারের ঘর খুঁজে পেল।
ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। দরজায় মরচে ধরা তালা।
স্টেশনের এক কর্মচারীর সাহায্যে দরজা খোলা হল।
ভেতরে ধুলোর স্তর।
একটা ভাঙা টেবিল।
দেয়ালে বিবর্ণ সময়সূচি।
কোণে কয়েকটা পুরনো রেজিস্টার।
অর্ক ঘরটা ছবি তুলতে লাগল।
হঠাৎ টেবিলের নিচে তার চোখে পড়ল একটা ছোট ধাতব বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা—
M. SEN — PERSONAL RECORDS
অর্ক বাক্সটা খুলল।
ভেতরে কয়েকটি ছবি, পুরনো পরিচয়পত্র এবং একটা ছোট ক্যাসেট।
ক্যাসেটের গায়ে লেখা—
“অর্কের জন্য। যখন ও সব জানতে চাইবে।”
অর্কের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে স্টেশনের কর্মচারীকে একটা পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ারের খোঁজ করতে বলল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর একটা যন্ত্র পাওয়া গেল।
ক্যাসেট ঢোকানো হল।
প্রথমে শোঁ-শোঁ শব্দ।
তারপর একজন পুরুষের গলা।
“অর্ক, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝব আমি তোকে সত্যিটা বলতে পারিনি।”
অর্কের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
এটা তার বাবার গলা।
“তুই এখন হয়তো বড় হয়ে গেছিস। হয়তো মাধবপুরের নামও ভুলে গেছিস। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—মেঘলা তোর শত্রু ছিল না।”
অর্ক চোখ বন্ধ করল।
বাবার গলা আবার ভেসে এল।
“তোর আর মেঘলার বন্ধুত্বটা খুব গভীর ছিল। তুই ওকে নিজের পরিবারের একজনের মতো ভালোবাসতিস। ওর বাবা মারা যাওয়ার পর তুই ওর পাশে দাঁড়িয়েছিলি।”
ক্যাসেটের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“কিন্তু শেষের দিকে তুই বদলে যেতে শুরু করেছিলি। তুই কিছু একটা আবিষ্কার করেছিলি। তারপর থেকে তোর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যায়।”
অর্কের মনে অস্পষ্ট কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটা ঘর।
কয়েকটা কাগজ।
মেঘলার রাগী মুখ।
নিজের চিৎকার।
কিন্তু দৃশ্যগুলো আবার মিলিয়ে গেল।
বাবার গলা চলতে থাকল।
“যদি কখনও মনে হয় তুই মেঘলাকে আঘাত করেছিলি, তাহলে আগে সম্পূর্ণ ঘটনাটা জানিস। স্মৃতি সব সময় মিথ্যে বলে না, কিন্তু অসম্পূর্ণ স্মৃতি মানুষকে ভুল অপরাধী বানাতে পারে।”
তারপর একটা দীর্ঘ বিরতি।
“আর একটা কথা। রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে যে ট্রেনটা আসে, সেটাকে খুঁজতে যাস না। ওটা কোনও ভূতের ট্রেন নয়। ওটা একটা অসমাপ্ত ঘটনার স্মৃতি।”
ক্যাসেট থেমে গেল।
অর্ক অনেকক্ষণ নড়ল না।
তারপর প্লেয়ারটা আবার চালাল।
কিন্তু আর কোনও শব্দ নেই।
শুধু ফিতের ঘোরার আওয়াজ।
অর্ক বাক্সের ভেতর থেকে একটা ছবি বের করল।
ছবিতে তার বাবা, মেঘলার বাবা এবং আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তৃতীয় মানুষটির মুখের ওপর কালো কালি দিয়ে দাগ টানা।
ছবির পেছনে লেখা—
“যে লোকটা শেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”
সন্ধ্যা নামতেই অর্ক স্টেশন ছেড়ে বেরোল না।
সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজ আবার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করবে।
কিন্তু এবার সে শুধু ছবি তুলবে না।
ট্রেনে উঠবে।
সত্যিটা জানবে।
রাত ১০টা ৫৫।
বৃদ্ধ দোকানদার তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“আজও থাকবি?”
“হ্যাঁ।”
“কাল যা দেখেছিস, সেটা যথেষ্ট নয়?”
“না।”
বৃদ্ধ একটা ছোট টর্চ এগিয়ে দিলেন।
“তাহলে এটা রাখ।”
অর্ক টর্চটা নিল।
“আপনি জানেন ট্রেনটা কোথায় যায়?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
“শেষ স্টেশনে।”
“কোন স্টেশন?”
“যে স্টেশনের নাম কেউ জানে না।”
অর্ক হেসে ফেলল।
“এটা আবার কেমন কথা?”
বৃদ্ধ বললেন,
“ট্রেনে ওঠার আগে তোর টিকিট লাগবে না। কিন্তু নামার সময় একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”
“কী প্রশ্ন?”
“তুই কাকে বাঁচাতে চাস?”
অর্ক কিছু বলল না।
বৃদ্ধ চলে যাওয়ার আগে বললেন,
“আর মনে রাখিস—ট্রেনের ভেতরে কোনও যাত্রীকে তার নাম জিজ্ঞেস করবি না।”
“কেন?”
বৃদ্ধ পিছন ফিরে তাকালেন।
“কারণ যে নিজের নাম ভুলে গেছে, সে অন্যের নামও নিয়ে নিতে পারে।”
রাত ১১টা ৪০।
অর্ক পুরনো লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে।
ক্যামেরা প্রস্তুত।
রেকর্ডার চালু।
লাল ডায়েরি পকেটে।
হঠাৎ দূরে হুইসেল।
তারপর আলো।
ট্রেন আসছে।
এবার অর্ক ভয় পেল না।
ট্রেন এসে থামল।
দরজা খুলল।
শেষ কামরায় মেঘলা দাঁড়িয়ে।
তার মুখে আজ আর কান্না নেই।
“তুমি এসেছ,” মেঘলা বলল।
অর্ক মাথা নাড়ল।
“আমাকে সত্যিটা জানতে হবে।”
“সত্যি জানলে তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো।”
“কেন?”
মেঘলা উত্তর দিল না।
সে হাত বাড়িয়ে দিল।
অর্ক ট্রেনে উঠল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
জানলার বাইরে মাধবপুর পিছিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—কিছুক্ষণ পর বাইরের দৃশ্য বদলে গেল।
ধানখেত নেই।
গাছ নেই।
বাড়ি নেই।
শুধু অসংখ্য আলো।
যেন ট্রেনটা সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
কামরায় কয়েকজন যাত্রী বসে।
একজন বৃদ্ধ সংবাদপত্র পড়ছেন।
একজন মহিলা জানলার বাইরে তাকিয়ে।
একটি ছোট ছেলে মেঝেতে খেলনা গাড়ি চালাচ্ছে।
তাদের প্রত্যেকের মুখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
অর্ক মেঘলাকে ফিসফিস করে বলল,
“এরা কারা?”
“যারা কোনও একটা মুহূর্তে আটকে গেছে।”
“মানে?”
“কারও জীবনের শেষ দেখা। কারও বলা হয়নি এমন কথা। কারও ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু সে যায়নি।”
অর্ক বলল,
“তুমি এখানে কেন?”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
“তুমি কি সত্যিই মনে করতে পারছ না?”
অর্ক মাথা নাড়ল।
মেঘলা জানলার পাশে বসে পড়ল।
“তাহলে শোনো।”
সে বলতে শুরু করল।
“বারো বছর আগে তুমি আমার কাছে এসেছিলে। তোমার কাছে কিছু নথি ছিল। তুমি জানতে পেরেছিলে, রেললাইনের নিরাপত্তা নিয়ে যে অনিয়ম হয়েছিল, তার পেছনে একজন বড় কর্মকর্তা ছিল। তোমার বাবা সেই সত্যি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।”
“তারপর?”
“তুমি নথিগুলো লুকিয়ে রেখেছিলে। আমি সেগুলো খুঁজে পাই। আমরা ঠিক করি, পরদিন সকালে সেগুলো পুলিশের হাতে তুলে দেব।”
“তাহলে আমাকে ওকে মারার কথা কেন লেখা?”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
“কারণ সেই রাতে তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি।”
অর্ক চুপ করে রইল।
মেঘলা বলল,
“তুমি ভেবেছিলে, আমি নথিগুলো চুরি করেছি। তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছিলে। তারপর আমি স্টেশনে চলে আসি।”
“তারপর কী হয়েছিল?”
মেঘলা জানলার বাইরে তাকাল।
“তারপর ট্রেন আসে।”
“কিন্তু ওই লাইন তো বন্ধ ছিল!”
“সেই রাতেই প্রথমবার ট্রেনটা এসেছিল।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
“তুমি ট্রেনে উঠেছিলে?”
“না।”
“তাহলে?”
মেঘলা বলল,
“আমি তোমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।”
ঠিক তখনই ট্রেনের আলো নিভে গেল।
সমস্ত কামরা অন্ধকার।
একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।
তারপর ঘোষণার মতো একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“পরবর্তী স্টেশন—শেষ স্টেশন। যাত্রীরা নিজেদের স্মৃতি প্রস্তুত রাখুন।”
অর্ক মেঘলার হাত ধরল।
“আমাকে সব বলো।”
মেঘলা তার হাত সরিয়ে দিল।
“আমি সব বলতে পারব না।”
“কেন?”
“কারণ শেষ স্টেশনে পৌঁছলে তোমাকেই মনে করতে হবে।”
ট্রেনের গতি বেড়ে গেল।
জানলার বাইরে এবার একটা দৃশ্য ফুটে উঠল।
বারো বছর আগের মাধবপুর।
রাত ১১টা ৪৭।
একই প্ল্যাটফর্ম।
একই আলো।
একই ট্রেন।
আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর অর্ক।
তার হাতে একটা লোহার রেঞ্চ।
সামনে মেঘলা।
মেঘলা চিৎকার করছে—
“অর্ক, থামো!”
কিশোর অর্ক রাগে কাঁপছে।
“তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ!”
মেঘলা বলছে,
“আমি তোমাকে বাঁচাতে চাই!”
তারপর দূরে একটা ট্রেনের আলো।
মেঘলা অর্ককে ধাক্কা দিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেয়।
নিজে পিছলে পড়ে যায় লাইনের ওপর।
ট্রেনের হুইসেল।
চিৎকার।
আলো।
তারপর অন্ধকার।
অর্ক দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।
“না! না!”
মেঘলা তার পাশে বসে পড়ল।
“তুমি আমাকে মারোনি, অর্ক।”
অর্ক কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“কিন্তু আমি তো তোমার সঙ্গে ঝগড়া করেছিলাম!”
“হ্যাঁ।”
“আমি তোমাকে সন্দেহ করেছিলাম!”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে?”
মেঘলার চোখে জল এল।
“তুমি আমাকে আঘাত করোনি। তুমি শুধু সত্যিটা বুঝতে পারোনি।”
অর্ক মাথা তুলল।
“তাহলে তোমার মৃত্যুটা দুর্ঘটনা ছিল?”
মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই ট্রেনের দরজা খুলে গেল।
বাইরে একটা স্টেশন।
কোনও নাম নেই।
কোনও ঘড়ি নেই।
কোনও আলো নেই।
শুধু একটা বেঞ্চে বসে আছে একজন বৃদ্ধ মানুষ।
তার হাতে একটা ফাইল।
মেঘলা ফিসফিস করে বলল,
“ওই মানুষটাই জানে আসলে কী হয়েছিল।”
অর্ক ট্রেন থেকে নামল।
বৃদ্ধ মানুষটি মুখ তুললেন।
অর্কের বুকের ভেতর সবকিছু থেমে গেল।
কারণ মানুষটি তার বাবা।
সুব্রত সেন।
যে মানুষকে সে বারো বছর আগে মৃত বলে জেনেছিল।
বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
“অর্ক।”
অর্ক দৌড়ে গেল।
“বাবা!”
কিন্তু বাবাকে জড়িয়ে ধরার আগেই সুব্রত হাত তুলে থামালেন।
“এখনও সময় হয়নি।”
“আপনি বেঁচে আছেন?”
“এই প্রশ্নের উত্তর তুই এখনও সহ্য করতে পারবি না।”
“মেঘলার কী হয়েছিল?”
সুব্রত ফাইলটা এগিয়ে দিলেন।
“এটা পড়।”
অর্ক ফাইল খুলল।
ভেতরে রেলওয়ের নথি।
কয়েকটি ছবি।
একটা পুলিশ রিপোর্ট।
আর একটি নাম—
দেবব্রত রায়।
ছবিতে সেই তৃতীয় মানুষটি।
যার মুখে কালো কালি দিয়ে দাগ টানা ছিল।
অর্ক মুখ তুলল।
“এই লোকটা কে?”
সুব্রত বললেন,
“এই লোকটাই ট্রেনটা পাঠিয়েছিল।”
অর্ক স্তব্ধ।
“কেন?”
বাবা ধীরে ধীরে বললেন,
“কারণ মেঘলা এমন একটা প্রমাণ পেয়েছিল, যা প্রকাশ পেলে অনেক মানুষ জেলে যেত।”
“তাহলে মেঘলাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
সুব্রত উত্তর দেওয়ার আগেই স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হল—
“শেষ যাত্রার সময় হয়েছে। একজন যাত্রীকে এখানেই থাকতে হবে।”
অর্ক ঘুরে তাকাল।
মেঘলা ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে।
তার মুখে শান্ত হাসি।
সুব্রত বললেন,
“এবার তোর সিদ্ধান্ত।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
“তুই সত্যিটা নিয়ে ফিরে যাবি, নাকি মেঘলাকে সঙ্গে নিয়ে যাবি?”
অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“আমাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো না।”
“কেন?”
“কারণ আমি বারো বছর ধরে এই ট্রেনে আছি। আমি আর আগের পৃথিবীর মানুষ নই।”
অর্কের চোখে জল।
“আমি তোমাকে আবার হারাতে চাই না।”
মেঘলা বলল,
“তাহলে আমাকে হারানোর সত্যিটা সবাইকে জানাও।”
ট্রেনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।
অর্ক বাবার দিকে ফিরল।
“আমি কীভাবে ফিরব?”
সুব্রত তার হাতে ফাইলটা দিয়ে বললেন,
“শেষ স্টেশনের আগে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
বাবা তার চোখের দিকে তাকালেন।
“তুই কি নিজের স্মৃতিকে বিশ্বাস করবি, নাকি প্রমাণকে?”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
মেঘলা জানলার ওপার থেকে তাকিয়ে রইল।
অর্ক দৌড়ে ট্রেনের পেছনে ছুটল।
“মেঘলা!”
মেয়েটি কাঁচে হাত রাখল।
তারপর ঠোঁট নেড়ে বলল—
“দেবব্রত রায়কে খুঁজে বের করো।”
ট্রেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
অর্ক একা দাঁড়িয়ে রইল নামহীন স্টেশনে।
তার হাতে ফাইল।
মাথার ভেতর হাজার প্রশ্ন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল—
যদি মেঘলা তাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা যায়, তাহলে বারো বছর ধরে এই ট্রেন চালাচ্ছে কে?
আর তার বাবা যদি বেঁচে থাকেন, তাহলে এত বছর কোথায় ছিলেন?
ঠিক তখনই স্টেশনের বেঞ্চে একটা মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
অর্ক ফোনটা তুলে নিল।
স্ক্রিনে লেখা—
মা।
সে কল ধরল।
ওপাশ থেকে মায়ের কান্নাভেজা গলা—
“অর্ক, তুই কি তোর বাবার সঙ্গে দেখা করেছিস?”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“মা, তুমি জানো বাবা বেঁচে আছেন?”
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“তোর বাবা বেঁচে নেই, অর্ক।”
“আমি তাঁকে নিজের চোখে দেখেছি!”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর মা বললেন,
“তুই যাঁকে দেখেছিস, তিনি তোর বাবা নন।”
অর্কের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
আর ঠিক তখনই নামহীন স্টেশনের ঘড়িতে প্রথমবার সময় দেখা গেল।
রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
ঘড়ির নিচে নতুন একটি লাইন জ্বলে উঠল—
“শেষ যাত্রার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হচ্ছে।”
চলবে…