নীরব সাক্ষী
তৃতীয় পর্ব — শেষ সাক্ষ্য
প্রতাপ মজুমদারের হাত থেকে ছবিটা নেওয়ার পর ঈশানী কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
ছবির মানুষগুলোকে সে একে একে চিনত।
দেবাশিস রায়।
তার বাবা অরুণ সেন।
হরিপদ পাল।
কিন্তু চতুর্থ মানুষটি—
তার মা, সুচরিতা সেন।
ঈশানী ছোটবেলা থেকেই জানত, তার মা খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা।
তখন ঈশানীর বয়স মাত্র সাত।
বাবা কখনও সেই দুর্ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেননি।
ঈশানীও বড় হয়ে আর জিজ্ঞাসা করেনি।
কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো—
তার মায়ের মৃত্যু কি সত্যিই দুর্ঘটনা ছিল?
প্রতাপ মজুমদার চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ঈশানী ছবিটা শক্ত করে ধরে বলল,
“আপনি আমার মাকে চিনতেন?”
“চিনতাম।”
“কতটা?”
“যতটা একজন মানুষ আরেকজন মানুষের গোপন কথা জানলে তাকে চেনে।”
“আমার মা কী জানতেন?”
প্রতাপ কোনও উত্তর দিলেন না।
বরং বললেন,
“এই প্রশ্নের উত্তর তোমার আমার কাছে নয়, হরিপদের কাছে পাওয়া উচিত।”
“হরিপদ কোথায়?”
“আমি জানি না।”
ঈশানী তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
“আপনি জানেন।”
প্রতাপ হালকা হাসলেন।
“জানা আর প্রমাণ করা এক জিনিস নয়।”
তারপর তিনি দরজার দিকে হাঁটতে লাগলেন।
ঈশানী বলল,
“আমার বাবাকে কে মেরেছিল?”
প্রতাপ থেমে গেলেন।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বললেন—
“তোমার বাবা অনেকদিন ধরে নিজেই মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছিলেন।”
“মানে?”
“কারণ তিনি জানতেন, একদিন তোমাকে সব বলতে হবে।”
তারপর তিনি চলে গেলেন।
ঈশানী জানত—
এই মানুষটি এখনও সব সত্যি বলেনি।
সেদিন রাতেই ঈশানী বাবার বাড়িতে ফিরে এল।
মায়ের পুরনো জিনিসপত্র খুঁজতে শুরু করল।
পুরনো কাপড়।
ছবি।
চিঠি।
বই।
একটা কাঠের বাক্স।
বাক্সের নিচে একটি পুরনো ডায়েরি পেল।
মলাটে লেখা—
“সুচরিতা”
ঈশানীর হাত কেঁপে উঠল।
মা ডায়েরি লিখতেন!
প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা ব্যক্তিগত কথা।
তারপর ২০১১ সালের জুন মাসের একটি তারিখ।
১০ জুন।
“দেবাশিস আজ আমাকে বলেছে, জমির কাগজে বড় জালিয়াতি হয়েছে। অরুণকে জানাতে বলেছে।”
পরের পৃষ্ঠা—
১২ জুন।
“অরুণ বলছে, ব্যাপারটা শুধু জমির নয়। সরকারি নথি বদলানো হয়েছে।”
আরও একটি পৃষ্ঠা—
১৪ জুন।
“আজ প্রথমবার বুঝলাম, আমরা বিপদে পড়েছি।”
ঈশানী পড়তে পড়তে শিউরে উঠল।
তারপর—
১৬ জুন।
পাতাটা প্রায় ছিঁড়ে গেছে।
মাত্র কয়েকটি শব্দ পড়া যায়—
“আজ রাতে দেবাশিসের সঙ্গে দেখা হবে। অরুণকে বলেছি যেন আমাকে অনুসরণ না করে।”
তারপর কিছু নেই।
ঈশানী পরের পৃষ্ঠায় গেল।
সেটা ফাঁকা।
তারপর সরাসরি—
২০ জুন।
“আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু অরুণকে সত্যি বলতে পারিনি।”
ঈশানীর চোখ আটকে গেল।
মা ২০১১ সালের ২০ জুনও বেঁচে ছিলেন।
কিন্তু তার মা মারা গিয়েছিলেন কবে?
২৩ জুন।
তাহলে ২০ জুন থেকে ২৩ জুনের মধ্যে কী ঘটেছিল?
পরদিন ঈশানী মাধবী রায়ের কাছে গেল।
ডায়েরির কয়েকটি পৃষ্ঠা সঙ্গে নিয়েছিল।
মাধবী পড়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—
“তোমার মা সব জানতেন।”
“কী?”
“দেবাশিস যে জমির কাগজ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল, তার আসল কারণ ছিল অন্য।”
“কী কারণ?”
মাধবী ধীরে বললেন—
“ওই জমিতে একটা পুরনো স্কুল ছিল।”
ঈশানী অবাক।
“স্কুল?”
“হ্যাঁ। নদীর ধারের শ্রমিকদের স্কুল। জমিটা অধিগ্রহণের সময় কয়েকজন পরিবারকে উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি নথিতে স্কুলটির অস্তিত্বই মুছে ফেলা হয়।”
“কে করেছিল?”
“যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল।”
“প্রতাপ মজুমদার?”
মাধবী মাথা নাড়লেন।
“প্রতাপ একা ছিল না।”
“তাহলে?”
“তোমার বাবা প্রমাণ পেয়েছিলেন যে সরকারি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা, কিছু ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী মানুষ মিলে পুরো জমির নথি বদলেছিল।”
ঈশানী বলল,
“তাহলে দেবাশিস তাদের বিরুদ্ধে যেতে চেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“আর তাই তাঁকে মেরে ফেলা হয়?”
মাধবী এবার বললেন,
“সম্ভবত।”
“সম্ভবত?”
“কারণ আমি খুনটা দেখিনি।”
ঈশানী থেমে গেল।
“আপনি কী দেখেছিলেন?”
মাধবী জানলার বাইরে তাকালেন।
“আমি দেখেছিলাম তোমার মা দৌড়ে আমার বাড়িতে এসেছিলেন।”
“কবে?”
“দেবাশিসের মৃত্যুর পর।”
“তখন?”
“তিনি বলেছিলেন—‘হরিপদকে খুঁজে বের করুন। সে সব দেখেছে।’”
সন্ধ্যায় ঈশানী নদীর দিকে গেল।
হরিপদের বাড়ির সামনে আবার দাঁড়াল।
এইবার দরজা বন্ধ।
কিন্তু ভেতর থেকে ক্ষীণ শব্দ আসছে।
ঈশানী দরজায় ধাক্কা দিল।
“হরিপদ কাকু?”
কোনও উত্তর নেই।
আবার ধাক্কা।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
হরিপদ দাঁড়িয়ে।
চোখে ক্লান্তি।
ঈশানী বলল,
“আপনি আমাকে এতদিন কেন এড়িয়ে চলেছেন?”
হরিপদ চুপ।
“আমার মা কী জানতেন?”
হরিপদের মুখ বদলে গেল।
তিনি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে গেলেন।
তারপর একটা কাঠের চেয়ারে বসে পড়লেন।
কালো খাতাটা খুললেন।
কিন্তু এবার লিখলেন না।
প্রথমবার ঈশানীর সামনে কথা বললেন।
“তোমার মা সত্যিটা জানতেন।”
ঈশানী বসে পড়ল।
“কী সত্যি?”
হরিপদ বললেন,
“দেবাশিস বাবুকে খুন করার রাতে আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। কিন্তু সবটা দেখিনি।”
“আপনি কী দেখেছিলেন?”
“একজন মানুষকে।”
“প্রতাপ?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
“না।”
ঈশানী স্তব্ধ।
“তাহলে কে?”
হরিপদ বললেন—
“তোমার বাবা।”
ঈশানী যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
“আমার বাবা?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তিনি তো দেবাশিসকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন!”
“গিয়েছিলেন।”
“তাহলে?”
“তোমার বাবা যখন ঘরে ঢোকেন, দেবাশিস তখনও জীবিত ছিলেন।”
“তারপর?”
“দুজনের মধ্যে তর্ক হয়।”
“কিসের?”
“প্রমাণ নিয়ে।”
“কোন প্রমাণ?”
হরিপদ ধীরে বললেন—
“জমির নথি নয়।”
তিনি একটু থামলেন।
“আরও বড় কিছু।”
ঈশানীর গলা শুকিয়ে গেল।
“কী?”
“একটা নামের তালিকা।”
“কাদের?”
“যারা সরকারি জমি দখলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।”
ঈশানী বলল,
“তাহলে সেটা কোথায়?”
হরিপদ তার কালো খাতার ভেতর থেকে একটি পুরনো কাগজ বের করলেন।
“এটাই সেই তালিকার শেষ কপি।”
ঈশানী কাগজটা নিল।
কয়েকটি নাম।
কয়েকজন ব্যবসায়ী।
দুজন সরকারি আধিকারিক।
একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি।
আর একেবারে নিচে—
অরুণ সেন।
ঈশানীর চোখ স্থির হয়ে গেল।
“আমার বাবা?”
হরিপদ বললেন,
“তোমার বাবা তালিকায় নিজের নাম দেখে বুঝেছিলেন, কেউ তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”
“কে?”
“দেবাশিস।”
ঈশানী উঠে দাঁড়াল।
“না। এটা অসম্ভব।”
হরিপদ শান্ত গলায় বললেন,
“দেবাশিসের কাছে প্রমাণ ছিল তোমার বাবা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত।”
ঈশানী মাথা নাড়ল।
“আমার বাবা এমন করতে পারেন না।”
“তোমার বাবা করেননি।”
হরিপদ বললেন,
“তাঁর নাম নকল করে ঢোকানো হয়েছিল।”
“কে করেছিল?”
“প্রতাপ।”
ঈশানী আবার বসে পড়ল।
হরিপদ বললেন,
“তোমার বাবা সেটা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।”
“তারপর?”
“দেবাশিস তাঁকে বিশ্বাস করেননি।”
“তাহলে সেই রাতে কী হয়?”
হরিপদ চোখ বন্ধ করলেন।
“তর্কের মধ্যে হঠাৎ গুলির শব্দ হয়।”
ঈশানী নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
“কে গুলি করেছিল?”
“আমি দেখিনি।”
“আপনি বলেছিলেন আপনি সব দেখেছিলেন!”
“সব নয়।”
“তাহলে কে?”
হরিপদ বললেন,
“ঘরের দরজা দিয়ে তোমার মা ঢুকেছিলেন।”
ঈশানীর বুক কেঁপে উঠল।
“মা?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
“তিনি দেবাশিসের পাশে গিয়ে দাঁড়ান।”
“দেবাশিস তখন?”
“মাটিতে পড়ে।”
“আর বাবা?”
“তোমার বাবা তখন বন্দুকটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে।”
ঈশানীর চোখে জল এসে গেল।
“আমার বাবা কি তাঁকে গুলি করেছিলেন?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
“না।”
“তাহলে?”
“বন্দুকটা তাঁর হাতে দেওয়া হয়েছিল।”
“কে দিয়েছিল?”
হরিপদ উত্তর দিলেন না।
ঈশানী বুঝল—
আসল রহস্য এখনও বাকি।
হরিপদ অবশেষে বললেন,
“তোমার মা বন্দুকটা নিয়ে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন তোমার বাবাকে।”
“কেন?”
“কারণ তিনি জানতেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুলিশ আসবে।”
“পুলিশকে কে খবর দিয়েছিল?”
“প্রতাপ।”
ঈশানীর মাথায় যেন সবকিছু ধীরে ধীরে জোড়া লাগতে লাগল।
প্রতাপ দেবাশিসকে হত্যা করে।
তারপর অরুণকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে।
সুচরিতা সেটা বুঝতে পারে।
হরিপদ ঘটনাটা দেখে ফেলে।
তারপর—
তিনজনকেই চুপ করিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়।
ঈশানী বলল,
“আমার মা কীভাবে মারা গেলেন?”
হরিপদ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“দুর্ঘটনায় নয়।”
ঈশানীর চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
“তাহলে?”
“তোমার মা আমাকে শেষবার দেখা করেছিলেন ২২ জুন।”
“তারপর?”
“তিনি বলেছিলেন, প্রমাণ তিনি নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়েছেন।”
“কোথায়?”
“তোমার বাবার কাছে।”
“তারপর?”
“পরদিন তাঁর গাড়ি নদীর ধারে পাওয়া যায়।”
ঈশানী ফিসফিস করে বলল,
“মাকে মেরে ফেলা হয়েছিল?”
হরিপদ মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ।”
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি।
হরিপদ উঠে আলমারির কাছে গেলেন।
সেখান থেকে একটা পুরনো ক্যাসেট বের করলেন।
“এটা তোমার মায়ের।”
ঈশানী ক্যাসেটটা হাতে নিল।
“এতে কী আছে?”
“তোমার মা মৃত্যুর আগে রেকর্ড করেছিলেন।”
ঈশানী পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ারে সেটি চালাল।
কিছুক্ষণ শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর—
সুচরিতার কণ্ঠ।
দুর্বল।
কাঁপা।
কিন্তু স্পষ্ট।
“যদি কেউ এই রেকর্ড শুনে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর নেই।”
ঈশানীর চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল।
রেকর্ডে তার মা বলছেন—
“অরুণ নির্দোষ। দেবাশিসও নির্দোষ। আসল অপরাধীরা তাদের নাম ব্যবহার করেছে।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“আমি যে নথি পেয়েছি, তাতে শুধু প্রতাপ মজুমদারের নাম নেই।”
ঈশানী সামনে ঝুঁকে এল।
“আরও দুজন আছে।”
তারপর একটি নাম উচ্চারিত হলো।
ঈশানী যেন বজ্রাহত।
নামটি—
শালুকপুরের তৎকালীন পুলিশ আধিকারিক, রণজিৎ ঘোষ।
আর দ্বিতীয় নাম—
সরকারি ভূমি দপ্তরের আধিকারিক, অমল দত্ত।
রেকর্ডের শেষ অংশে সুচরিতা বললেন—
“কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যি হল, প্রতাপকে আমি একা দেখিনি।”
কণ্ঠ থেমে গেল।
আবার শুরু হলো—
“সেদিন রাতে তাঁর সঙ্গে যে মানুষটি এসেছিল, তাকে আমি চিনতাম।”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
তারপর—
“সে আমার খুব কাছের মানুষ।”
রেকর্ড হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ঈশানী হতভম্ব।
“কে?”
হরিপদ কোনও উত্তর দিলেন না।
ঈশানী বারবার ক্যাসেটটা রিওয়াইন্ড করল।
শেষ শব্দগুলো আবার শুনল—
“সে আমার খুব কাছের মানুষ।”
তারপর হঠাৎ ঈশানীর মনে পড়ল—
মায়ের ডায়েরিতে ১৬ জুনের সেই লাইন।
“অরুণকে বলেছি যেন আমাকে অনুসরণ না করে।”
কেন?
কারণ মা হয়তো জানতেন—
যে মানুষটির সঙ্গে তিনি দেখা করতে যাচ্ছেন, তাকে বাবা চিনতেন।
পরদিন ঈশানী আদালতে গেল।
সরাসরি পুরনো রেকর্ডরুমে।
সে ২০১১ সালের পুলিশ রিপোর্ট আবার খুলল।
একটি জায়গায় তার চোখ আটকে গেল।
দেবাশিসের মৃত্যুর রাতে ঘটনাস্থলে প্রথম যে পুলিশ অফিসার পৌঁছেছিলেন—
রণজিৎ ঘোষ।
কিন্তু রিপোর্টে আরেকটি নাম ছিল।
সহকারী অফিসার হিসেবে—
সুব্রত সেন।
ঈশানীর বুক কেঁপে উঠল।
সেন।
একই পদবি।
সে ফাইলের পরের পাতাগুলো উল্টে দেখল।
সুব্রত সেনের পরিচয়—
অরুণ সেনের ছোট ভাই।
ঈশানীর কাকা।
যিনি ২০১১ সালের পর হঠাৎ চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন।
ঈশানী এতদিন ভেবেছিল—
কাকা ব্যবসা করতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু নথি বলছে—
সুব্রত সেন তদন্তকারী দলের সদস্য ছিলেন।
আর সেই রাতের পরই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।
ঈশানী সেদিনই কাকার পুরনো নম্বর খুঁজে বের করল।
অনেক কষ্টে বিদেশের একটি নম্বর পেল।
ফোন করল।
কেউ ধরল না।
দ্বিতীয়বার।
তৃতীয়বার।
চতুর্থবার—
ফোন ধরল একজন বৃদ্ধ পুরুষ।
“হ্যালো?”
ঈশানীর গলা কেঁপে উঠল।
“কাকা?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
“ঈশানী?”
“হ্যাঁ।”
“তুই এত বছর পর ফোন করলি?”
“আপনি আমাকে একটা কথা বলবেন?”
“কী?”
“২০১১ সালের ১৬ জুন রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর কাকা ধীরে বললেন—
“তোর বাবা কি তোকে সব বলে গেছে?”
“না।”
“তাহলে শোন।”
ঈশানী ফোনটা শক্ত করে ধরল।
কাকার গলা কাঁপছিল।
“দেবাশিস রায়কে প্রতাপ মজুমদার খুন করেনি।”
ঈশানীর বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
“তাহলে কে?”
কাকা বললেন—
“আমি।”
ঈশানী নিস্তব্ধ।
“কী বলছেন?”
“আমি গুলি করিনি।”
“তাহলে?”
“আমি সেই রাতের সবকিছু দেখেছিলাম।”
“আপনি কী দেখেছিলেন?”
কাকার গলা আরও নিচু হয়ে গেল।
“প্রতাপের সঙ্গে যে মানুষটি এসেছিল…”
তিনি থামলেন।
তারপর বললেন—
“সে ছিল তোমার মা।”
ঈশানী ফোনটা হাত থেকে ফেলে দিতে দিতে সামলে নিল।
“না…”
কাকা বললেন—
“তোর মা খুনি ছিল না।”
“তাহলে?”
“সে এসেছিল দেবাশিসকে সতর্ক করতে।”
“তারপর?”
“তারপর এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা তোমার বাবা তোকে কখনও বলেনি।”
“কী?”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর কাকার শেষ কথা—
“দেবাশিসকে যে গুলি করেছিল, সে ছিল প্রতাপের লোক নয়।”
“তাহলে কে?”
“তুই যার ওপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করিস…”
লাইন কেটে গেল।
ঈশানী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—
কাকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে?
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
মাত্র তিনটি শব্দ—
“হরিপদকে বাঁচাও।”
ঈশানী দৌড়ে নদীর ধারের বাড়ির দিকে গেল।
কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখল—
দরজা খোলা।
ঘর ফাঁকা।
মেঝেতে পড়ে আছে হরিপদের কালো খাতা।
শেষ পাতায় কাঁপা হাতে লেখা—
“শেষ সাক্ষী আমি নই।”
তার নিচে—
“ঈশানী।”
ঈশানী স্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—
এতদিন সে অন্যদের সাক্ষ্য খুঁজছিল।
কিন্তু আসল সাক্ষী হয়তো সে নিজেই।
কারণ সাত বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর আগের রাতে—
সে কিছু একটা দেখেছিল।
যে স্মৃতিটা তার বাবা ইচ্ছা করে তার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
ঈশানী চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ একটি দৃশ্য ভেসে উঠল।
বৃষ্টি।
একটি গাড়ি।
মা দরজা খুলে তাকে বলছেন—
“কাউকে বলবি না, মা।”
আর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ।
ঈশানী চোখ খুলল।
তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।
কারণ এত বছর পর সে সেই মুখটা মনে করতে পেরেছে।
মানুষটি—
তার বাবা অরুণ সেন।
কিন্তু বাবা তো বলেছিলেন তিনি সেদিন বাড়িতেই ছিলেন।
ঈশানী বুঝল—
তার বাবা হয়তো তাকে বাঁচানোর জন্যই মিথ্যে বলেছিলেন।
আর সত্যিটা ছিল আরও ভয়ংকর।
২০১১ সালের সেই রাতে—
তার মা খুন হননি।
তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন।
আর অরুণ সেন তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
কিন্তু কেন?
কোথায়?
আর এত বছর পর তিনি কোথায়?
ঈশানী কালো খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
তারপর শেষ পাতার নিচে আরেকটি ক্ষীণ লেখা দেখতে পেল।
সে আলোয় নিয়ে পড়ল—
“যদি সত্যিই জানতে চাও, পুরনো নদীঘাটে এসো। একা।”
নিচে কোনও নাম নেই।
শুধু একটি তারিখ—
আগামীকাল।
ঈশানী জানত না, আগামীকাল নদীঘাটে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
কিন্তু এবার সে পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়।
কারণ সত্যি যতই ভয়ংকর হোক—
নীরবতার চেয়ে সত্যি সবসময় কম ভয়ংকর।
— সমাপ্ত —