প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু গাছ লাগানো কিংবা বন রক্ষা করা নয়। কখনও কখনও প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ হয়ে ওঠে এমন একটি প্রাণীর পাশে দাঁড়ানো, যাকে অধিকাংশ মানুষ অবহেলা করে। এমনই এক অবহেলিত পাখির জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন অসমের বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী ড. পূর্ণিমা দেবী বর্মন। তাঁর লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে ‘হাড়গিলা’—ইংরেজিতে Greater Adjutant Stork নামে পরিচিত এক বিরল ও বিপন্ন পাখি।
একসময় এই বিশাল পাখিটিকে অসমের বহু মানুষ অশুভ বলে মনে করতেন। তার অদ্ভুত চেহারা, আবর্জনা ও মৃত প্রাণীর অবশেষ খাওয়ার স্বভাব এবং মানুষের বসতবাড়ির কাছাকাছি বড় গাছে বাসা বাঁধার কারণে পাখিটিকে অনেকেই অপছন্দ করতেন। বাসা বাঁধার গাছ কেটে ফেলা হতো, জলাভূমি নষ্ট করা হতো। ফলে পাখিটির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে পূর্ণিমা দেবী বর্মন শুধু গবেষণাগারে বসে সমস্যাটি পর্যবেক্ষণ করেননি। তিনি মানুষের কাছে গিয়েছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, মহিলাদের সংগঠিত করেছেন এবং তৈরি করেছেন এক অসাধারণ নারী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন—‘হাড়গিলা আর্মি’।
ছোটবেলার ভালোবাসা থেকে জীবনের লক্ষ্য
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। পরবর্তীকালে তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণার পথে এগিয়ে যান। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাণিবিদ্যা ও বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানের অধ্যয়ন।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় যখন তিনি অসমের গ্রামীণ অঞ্চলে হাড়গিলার বাস্তব অবস্থা দেখতে শুরু করেন।
তখন এই পাখির সংখ্যা দ্রুত কমছিল। বড় গাছ কেটে ফেলার কারণে বাসা তৈরির জায়গা কমে যাচ্ছিল। জলাভূমি ও আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছিল। একইসঙ্গে মানুষের ভুল ধারণা পাখিটির জন্য আরও বড় বিপদ তৈরি করছিল।
পূর্ণিমা বুঝতে পারেন, শুধু পাখিকে উদ্ধার করে সমস্যার সমাধান হবে না। যে মানুষের বাড়ির গাছে পাখি বাসা বাঁধে, সেই মানুষকেই প্রথমে বোঝাতে হবে কেন পাখিটিকে রক্ষা করা জরুরি।
এই উপলব্ধিই তাঁর কাজের ধরন বদলে দেয়।
হাড়গিলা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
Greater Adjutant Stork বা হাড়গিলা একটি বড় আকারের মৃতভোজী পাখি। মৃত ও পচনশীল জৈব পদার্থ খাওয়ার মাধ্যমে এই পাখি প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
কিন্তু মানুষের চোখে যে প্রাণীটি কুৎসিত বা বিরক্তিকর মনে হতে পারে, প্রকৃতির কাছে তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই পূর্ণিমার আন্দোলনের অন্যতম মূল কথা।
তিনি মানুষকে বোঝাতে চেয়েছেন—কোনও প্রাণী দেখতে সুন্দর হলেই শুধু তাকে রক্ষা করা উচিত নয়। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে।
হাড়গিলার ক্ষেত্রে এই বার্তাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ পাখিটি মানুষের বসতির কাছাকাছি বাসা বাঁধে এবং তার বাসা রক্ষার জন্য মানুষের সহযোগিতা অপরিহার্য।
একটি পাখিকে বাঁচানোর জন্য মানুষের মন বদল
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত পাখির সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া।
অসমের কামরূপ জেলার দাদারা, পাচারিয়া ও সিঙ্গিমারি অঞ্চলে তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। সেখানে হাড়গিলা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হয়।
যে পাখিকে একসময় অনেকে অশুভ মনে করতেন, ধীরে ধীরে সেই পাখিই হয়ে ওঠে গ্রামের গর্ব।
পাখির বাসা যে গাছে, সেই গাছের মালিকদেরও conservation-এর অংশ করে তোলা হয়। মানুষকে বোঝানো হয়, গাছ কেটে ফেললে শুধু একটি পাখির বাসা ধ্বংস হয় না—একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক চক্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই কাজের মধ্য দিয়ে পূর্ণিমা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন—পরিবেশ সংরক্ষণকে মানুষের জীবন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে স্থানীয় মানুষকেও সেই উদ্যোগের অংশীদার করতে হবে।
‘হাড়গিলা আর্মি’—নারীদের এক অনন্য বাহিনী
পূর্ণিমার উদ্যোগের সবচেয়ে অনন্য দিক হল ‘হাড়গিলা আর্মি’।
এটি কোনও সামরিক বাহিনী নয়। এটি স্থানীয় নারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি grassroots conservation movement। এই নারীরা হাড়গিলা সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করেন, বাসা ও পাখির খোঁজ রাখেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজনে আহত বা পড়ে যাওয়া ছানাদের উদ্ধারে সহযোগিতা করেন।
এই আন্দোলন পরিবেশ সংরক্ষণকে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
যে নারীরা হয়তো আগে গ্রামের সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে খুব বেশি দৃশ্যমান ছিলেন না, তাঁরাই ধীরে ধীরে পরিবেশ রক্ষার দূত হয়ে উঠেছেন।
পূর্ণিমার মডেলের সৌন্দর্য এখানেই—তিনি শুধু পাখিকে বাঁচাতে চাননি; পাখিকে কেন্দ্র করে একটি সামাজিক আন্দোলন তৈরি করেছেন।
২০১৭ সালে Whitley Fund for Nature-এর Whitley Award পাওয়ার সময় তাঁর প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল আরও বহু মহিলাকে এই সংরক্ষণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাঁদের জীবিকা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।
কুসংস্কার থেকে গর্বের প্রতীকে
হাড়গিলাকে ঘিরে সামাজিক ধারণার পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ।
কোনও মানুষ যদি বিশ্বাস করেন একটি পাখি অশুভ, তাহলে শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে সেই ধারণা বদলানো সবসময় সম্ভব নয়। তাই পূর্ণিমা স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণকে যুক্ত করেছেন।
গ্রামীণ অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, নাটক, রান্নার প্রতিযোগিতা, শিশুদের বিভিন্ন কর্মসূচি—বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তিনি হাড়গিলা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছেন।
ফলে সংরক্ষণ আর বাইরের কোনও সংস্থার চাপানো বিষয় থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের নিজের বিষয়।
এভাবেই হাড়গিলা ধীরে ধীরে ‘অশুভ পাখি’ থেকে ‘আমাদের পাখি’তে পরিণত হয়েছে।
গবেষণা ও মাঠের কাজ—দুইয়ের সমন্বয়
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিজ্ঞান ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে ব্যবহার করা।
তিনি শুধু সচেতনতা কর্মসূচি করেননি; হাড়গিলার বাসস্থান, প্রজনন, বাসা তৈরির গাছ, জলাভূমি এবং পরিবেশগত সমস্যার বিষয়েও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
হাড়গিলার সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে জলাভূমি ধ্বংস, বাসা তৈরির গাছের অভাব এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের প্রভাব রয়েছে। পাখিটি আবর্জনা খাওয়ার কারণে দূষণও উদ্বেগের বিষয়।
তাই সংরক্ষণ মানে শুধু পাখিকে রক্ষা করা নয়—তার সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের কাজ আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি পেয়েছে।
২০১৭ সালে তিনি Whitley Award লাভ করেন। এই পুরস্কারটি তাঁর অসমের হাড়গিলা সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মহিলাদের সংগঠিত করার কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পুরস্কারের সঙ্গে প্রকল্পের জন্য £35,000 অর্থায়নও ছিল।
২০১৮ সালের ৮ মার্চ রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁকে Nari Shakti Puraskar-ও প্রদান করা হয়।
তবে তাঁর কাজ এখানেই থেমে থাকেনি।
২০২৪ সালে তিনি আবার Whitley Gold Award লাভ করেন। Whitley Fund for Nature-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বে অসমে হাড়গিলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং নারী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
যে সাফল্য শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না
সংরক্ষণ প্রকল্পের সাফল্য সাধারণত পাখির সংখ্যা, বাসার সংখ্যা বা সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ দিয়ে মাপা হয়।
কিন্তু পূর্ণিমা দেবী বর্মনের সাফল্যের একটি বড় অংশ সংখ্যায় ধরা যায় না।
একটি গ্রামে যখন মানুষ একটি পাখির বাসা কেটে ফেলার বদলে সেটিকে রক্ষা করতে শেখে, সেটিও সাফল্য।
একজন গ্রামীণ মহিলা যখন নিজের পরিচয় শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একজন conservation worker হিসেবেও দেখতে শুরু করেন, সেটিও সাফল্য।
একটি শিশু যখন হাড়গিলাকে দেখে ভয় না পেয়ে তার সম্পর্কে জানতে চায়, সেটিও সাফল্য।
আর একটি প্রাণী যখন মানুষের কাছে অশুভ প্রতীক থেকে গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়—তখন সেটি কেবল একটি পাখির জয় নয়; মানুষের চিন্তার পরিবর্তনেরও জয়।
নারীর শক্তিকে প্রকৃতি রক্ষার শক্তিতে পরিণত করা
পূর্ণিমার কাজের মধ্যে নারী ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষার কাজে নারীদের অংশগ্রহণকে তিনি শুধু ‘সহযোগিতা’ হিসেবে দেখেননি। তাঁদের নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে এসেছেন।
হাড়গিলা আর্মির মহিলারা নিজেদের এলাকায় সচেতনতা তৈরি করছেন, অন্যদের বোঝাচ্ছেন, পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করছেন। Whitley Fund for Nature-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই নারী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এখন ১০,০০০-এরও বেশি মহিলাকে যুক্ত করেছে।
এই মডেল পৃথিবীর অন্যান্য পরিবেশগত সমস্যার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের জীবন আমাদের শেখায়, বড় পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হয় না।
একজন মানুষও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন।
তবে সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে মানুষকে সঙ্গে নিতে হয়।
তিনি দেখিয়েছেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে মানুষের জীবিকা, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
আজ যখন জলাভূমি ভরাট হচ্ছে, গাছ কাটা হচ্ছে এবং বহু প্রজাতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, তখন পূর্ণিমার কাজ আমাদের সামনে একটি ভিন্ন পথ দেখায়।
সেই পথের নাম—ভালোবাসা, বিজ্ঞান, মানুষের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় নেতৃত্ব।
উপসংহার
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের গল্প আসলে শুধু একটি বিপন্ন পাখির গল্প নয়।
এটি একজন নারীর গল্প, যিনি একটি অবহেলিত প্রাণীর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন।
এটি এমন এক আন্দোলনের গল্প, যেখানে গ্রামের মহিলারা পরিবেশের রক্ষক হয়ে উঠেছেন।
এটি মানুষের ভুল ধারণাকে সচেতনতায় বদলে দেওয়ার গল্প।
আর সর্বোপরি, এটি প্রমাণ করে যে প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা যখন বিজ্ঞান ও মানুষের শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অসম্ভব বলেও কিছু থাকে না।
হাড়গিলা আজও বিপন্ন। তার লড়াই শেষ হয়নি। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি শক্তিশালী সমাজ তৈরি হয়েছে—যার অন্যতম নির্মাতা পূর্ণিমা দেবী বর্মন।
একসময়ের অপছন্দের পাখিকে তিনি শিখিয়েছেন মানুষের ভালোবাসা পেতে। আর মানুষকে শিখিয়েছেন—প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভবিষ্যৎকেই রক্ষা করা।
পূর্ণিমা দেবী বর্মনের জীবন তাই এক গভীর বার্তা দেয়—
একটি পাখিকে বাঁচানোর চেষ্টা কখনও কখনও একটি সমাজের চিন্তাধারাকেই বদলে দিতে পারে।