Categories
অনুগল্প বিবিধ

মাটির ব্যাংক।

রেললাইনের পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান চালাত বিমল।

দোকানের এক কোণে সবসময় একটা মাটির ব্যাংক রাখা থাকত। ব্যাংকটার গায়ে লাল রঙে লেখা—

“কারও স্বপ্নের জন্য।”

কেউ জানত না, এই ব্যাংকে টাকা জমে কেন।

একদিন দোকানে চা খেতে এসে স্কুলশিক্ষক অরুণবাবু জিজ্ঞেস করলেন,

—“বিমল, এটা কী?”

বিমল হেসে বলল,

—“জানি না।”

—“মানে?”

—“যে টাকা থাকে, সেটা আমার নয়। কারও দরকার হলে নিয়ে যাবে।”

অরুণবাবু অবাক হলেন।

—“কিন্তু কে নেবে?”

বিমল চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“যার সত্যিই দরকার।”

দিনের পর দিন ব্যাংকটায় কয়েন জমতে লাগল।

কেউ এক টাকা, কেউ পাঁচ টাকা, কেউ দশ টাকা ঢুকিয়ে যেত।

কেউ নাম লিখত না।

একদিন গ্রামের দরিদ্র রিকশাচালক গণেশের মেয়ে পিয়ালী স্কুলে পরীক্ষার ফি দিতে পারল না।

সে চুপচাপ স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

বিমল জানতে পেরে তাকে দোকানে ডাকল।

মাটির ব্যাংকটা হাতে নিয়ে বলল,

—“কত টাকা লাগবে?”

পিয়ালী বলল।

বিমল ব্যাংকটা ভেঙে টাকা বের করল।

পরীক্ষার ফি দেওয়া হল।

পিয়ালী কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আমি টাকা ফেরত দেব।”

বিমল বলল,

—“আমাকে নয়। যখন পারবে, অন্য কারও স্বপ্নে দিও।”

পিয়ালী মাথা নাড়ল।

বছর কেটে গেল।

পিয়ালী পড়াশোনা করে নার্স হল।

চাকরি পাওয়ার প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে সে সোজা বিমলের দোকানে এল।

বিমল তখন বৃদ্ধ।

পিয়ালী একটা বড় মাটির ব্যাংক এনে দোকানের কোণে রাখল।

তার গায়ে লিখল—

“কারও স্বপ্নের জন্য।”

বিমল অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,

—“এটা কী?”

পিয়ালী হেসে বলল,

—“আপনার পুরনো ব্যাংকের নতুন রূপ।”

বিমল চুপ করে রইল।

পিয়ালী প্রথম টাকা ব্যাংকে ফেলল।

তারপর বলল,

—“আপনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, স্বপ্নের টাকা ফেরত দিতে হয় না। অন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করতে হয়।”

বিমলের চোখ ভিজে গেল।

কয়েক মাস পর সেই ব্যাংক আবার পূর্ণ হল।

একদিন এক দরিদ্র ছাত্র এল কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাড় করতে।

ব্যাংক খুলে তার ভর্তি ফি দেওয়া হল।

তারপর আরেকজনের বই।

তারপর কারও পরীক্ষার ফি।

কারও চিকিৎসা।

কারও ট্রেনের টিকিট।

কেউ জানল না টাকা কার।

শুধু সবাই জানল—রেললাইনের ধারের ছোট্ট চায়ের দোকানে একটা মাটির ব্যাংক আছে।

সেখানে টাকা জমে না।

জমে মানুষের বিশ্বাস।

একদিন বিমল দোকানের বাইরে বসে দেখছিল, পিয়ালী এক ছোট ছেলের হাতে বই তুলে দিচ্ছে।

ছেলেটা বলল,

—“দিদি, টাকা কীভাবে শোধ করব?”

পিয়ালী হেসে বলল,

—“একদিন তুমিও কাউকে সাহায্য করবে।”

বিমল চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হল, মাটির ব্যাংকটা আসলে কখনও ভাঙেনি।

শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে তার স্বপ্নটা চলে গেছে।

কারও জীবনে আলো জ্বালানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো—সেই আলোটা নিঃশব্দে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *