শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল ‘রূপম’ সিনেমা হল।
একসময় সেখানে প্রতিদিন ভিড় হতো। এখন বহু বছর ধরে বন্ধ। দরজায় তালা, পোস্টারগুলো ছিঁড়ে গেছে, জানালার কাচে ধুলো জমেছে।
তবু প্রতি শনিবার রাতে হলটির প্রজেকশন ঘরের জানালায় একটি ক্ষীণ আলো দেখা যেত।
এলাকার সবাই জানত।
কেউ জানত না আলোটা জ্বালায় কে।
চায়ের দোকানের মালিক শম্ভু বলত,
—“ভূত-টুত হবে।”
কেউ বিশ্বাস করত, কেউ হাসত।
কিন্তু ষোলো বছরের রুদ্র বিশ্বাস করত না।
এক শনিবার রাতে সে লুকিয়ে সিনেমা হলের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে অন্ধকার।
পুরনো চেয়ার, ছেঁড়া পর্দা, মেঝেতে ধুলো।
হঠাৎ ওপর থেকে প্রজেক্টরের শব্দ এল।
রুদ্র সিঁড়ি বেয়ে উঠল।
প্রজেকশন ঘরের দরজা আধখোলা।
ভেতরে এক বৃদ্ধ বসে পুরনো ফিল্ম চালাচ্ছেন।
রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি কে?”
বৃদ্ধ ঘুরে তাকালেন।
—“আমার নাম হরেন। এই হলের প্রজেক্টর চালাতাম।”
—“কিন্তু হল তো বন্ধ!”
—“হল বন্ধ হয়েছে। সিনেমা নয়।”
রুদ্র পর্দার দিকে তাকাল।
সেখানে কোনও সিনেমা চলছে না।
দেখা যাচ্ছে পুরনো কিছু ছবি—একটি পরিবার, কিছু শিশু, গ্রামের রাস্তা, স্কুলের মাঠ।
রুদ্র জিজ্ঞেস করল,
—“এগুলো কী?”
হরেনবাবু বললেন,
—“এই শহরের স্মৃতি।”
তিনি একটা পুরনো অ্যালবাম খুললেন।
—“এই হল যখন চলত, মানুষ সিনেমা দেখতে আসত। কিন্তু আমি ক্যামেরা দিয়ে তাদেরও ছবি তুলতাম। যারা আর নেই, তাদের ছবি অন্তত বেঁচে থাকুক।”
রুদ্র চুপ করে গেল।
হরেনবাবু একটা ছবিতে আঙুল রাখলেন।
—“ওকে চিনিস?”
ছবিতে এক তরুণী হাসছিল।
রুদ্র বলল,
—“আমার ঠাকুমা!”
হরেনবাবু মৃদু হাসলেন।
—“তোর ঠাকুমা একবার এখানে সিনেমা দেখতে এসে আমাকে বলেছিল, ‘আমার একটা ছবি তুলে রাখবেন? একদিন যদি আমি না থাকি, কেউ যেন মনে রাখে।’”
রুদ্রের চোখ ভিজে গেল।
সেদিন রাতেই সে ঠিক করল, এই আলো আর নিভতে দেওয়া যাবে না।
পরদিন বন্ধুদের নিয়ে পুরনো হল পরিষ্কার করতে শুরু করল।
তারপর এলাকার মানুষও এগিয়ে এল।
কেউ পুরনো ছবি দিল, কেউ পুরনো পোস্টার, কেউ স্মৃতির গল্প।
কয়েক মাস পর ‘রূপম’ সিনেমা হল আবার খুলল।
সিনেমা দেখানোর জন্য নয়।
স্মৃতি দেখানোর জন্য।
প্রতি শনিবার রাতে সেখানে এলাকার পুরনো ছবি প্রদর্শিত হতে লাগল।
বৃদ্ধরা এসে নিজেদের তরুণ বয়স দেখতেন।
ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের পুরনো ছবি চিনত।
কেউ হাসত, কেউ কাঁদত।
উদ্বোধনের দিন হরেনবাবু প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রুদ্র এসে বলল,
—“কাকু, আজ আলোটা আপনি জ্বালাবেন।”
হরেনবাবু মাথা নাড়লেন।
—“না। আজ তুই জ্বালাবি।”
রুদ্র সুইচ টিপল।
পুরনো প্রজেক্টর গুঞ্জন করে উঠল।
পর্দায় প্রথম ছবি ভেসে উঠল—
এক তরুণী।
রুদ্রের ঠাকুমা।
হরেনবাবু ধীরে ধীরে বললেন,
—“দেখলি? মানুষ চলে যায়। কিন্তু ভালোবাসা যদি কেউ ধরে রাখে, তাহলে তাদের আলো থেকে যায়।”
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
—“তাহলে এই হল আর কখনও বন্ধ হবে না।”
হরেনবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—“যতদিন মানুষ স্মৃতি মনে রাখতে চায়, ততদিন কোনও আলো সত্যিই নিভে যায় না।”
সেই রাত থেকে ‘রূপম’-এর প্রজেকশন ঘরের আলো আর শুধু একটা বাতি ছিল না।
তা হয়ে উঠেছিল হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরে পাওয়ার আলো।