শহরের ব্যস্ত মোড়ে একটা পুরনো বাসস্ট্যান্ড ছিল। টিনের ছাউনি, ভাঙা বেঞ্চ আর পাশে একটা ছোট্ট পান-সিগারেটের দোকান।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে বসত এক বৃদ্ধ—নন্দলাল।
তিনি কারও অপেক্ষায় বসে থাকতেন না।
তবু প্রতিদিন একই সময়ে এসে একই বেঞ্চে বসতেন।
একদিন প্রবল বৃষ্টি নামল।
বাসস্ট্যান্ডে মানুষ ছুটে এসে ভিড় করল। ছাউনির নিচে জায়গা নেই।
একটি ছোট ছেলে ভিজতে ভিজতে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা স্কুলব্যাগ।
নন্দলাল নিজের জায়গা ছেড়ে তাকে বসতে দিলেন।
—“এখানে বস।”
ছেলেটা বলল,
—“আপনি?”
—“আমি তো বৃষ্টিতে বসতেই ভালোবাসি।”
ছেলেটা হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর নন্দলাল জিজ্ঞেস করলেন,
—“বাড়ি কোথায়?”
ছেলেটা একটা পাড়ার নাম বলল।
—“বাবা আসবে?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
—“বাবা নেই।”
নন্দলাল আর কিছু বললেন না।
বাস এলো।
ছেলেটা উঠে যাওয়ার সময় নন্দলাল বললেন,
—“কাল আবার দেখা হবে?”
ছেলেটা হেসে বলল,
—“হবে।”
পরদিন সত্যিই সে এল।
তারপর প্রায় প্রতিদিন।
ছেলেটার নাম ছিল শুভ।
শুভ স্কুলের গল্প করত। নন্দলাল তাঁর পুরনো দিনের গল্প বলতেন।
একদিন শুভ জিজ্ঞেস করল,
—“আপনি এখানে একা বসে থাকেন কেন?”
নন্দলাল অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“আমার একটা ছেলে ছিল।”
—“কোথায়?”
—“দূরে।”
—“আসেন না?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—“কখনও কখনও মানুষ দূরে চলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা দূরে যায় না।”
শুভ কথাটা বুঝতে পারেনি।
এক শীতের সকালে নন্দলাল আর এলেন না।
পরপর তিনদিন।
শুভ চিন্তায় পড়ে গেল।
সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল।
দোকানদার বলল,
—“শুনেছি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।”
শুভ হাসপাতালে ছুটে গেল।
নন্দলাল তাকে দেখে অবাক।
—“তুই এখানে?”
শুভ বলল,
—“আপনি তো বলেছিলেন, কাল দেখা হবে।”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
কয়েকদিন পর নন্দলাল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।
কিন্তু সেদিন বাসস্ট্যান্ডে এসে তিনি দেখলেন, বেঞ্চের পাশে একটা নতুন ছোট্ট কাঠের ছাউনি তৈরি হয়েছে।
শুভ আর এলাকার কয়েকজন ছেলে সেটি বানিয়েছে।
তার ওপর লেখা—
“যে কেউ অপেক্ষা করলে, এখানে বসতে পারবেন।”
নন্দলাল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
শুভ বলল,
—“আপনি তো আমাকে একদিন আপনার জায়গা দিয়েছিলেন। এবার আমরা সবাই মিলে আপনার জন্য একটা জায়গা বানালাম।”
নন্দলাল বেঞ্চে বসে পড়লেন।
তারপর পকেট থেকে একটা পুরনো ছবি বের করলেন।
ছবিতে এক তরুণ ছেলে।
তিনি ছবিটা শুভকে দেখিয়ে বললেন,
—“এটাই আমার ছেলে।”
শুভ জিজ্ঞেস করল,
—“সে কোথায়?”
নন্দলাল ধীরে বললেন,
—“অনেক বছর আগে বিদেশে চলে গেছে। তারপর আর যোগাযোগ নেই।”
শুভ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“একদিন হয়তো ফিরে আসবে।”
নন্দলাল হাসলেন।
—“তুই এখনও এত বিশ্বাস করিস?”
শুভ বলল,
—“আপনি তো আমাকে শিখিয়েছেন—অপেক্ষা মানে আশা ছেড়ে দেওয়া নয়।”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
শুধু শুভর মাথায় হাত রাখলেন।
কয়েক মাস পরে এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাসস্ট্যান্ডে একজন অচেনা মানুষ এসে দাঁড়াল।
চোখে ক্লান্তি, হাতে পুরনো ব্যাগ।
সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,
—“নন্দলালবাবু কি এখনও এখানে বসেন?”
দোকানদার দূরের বেঞ্চটার দিকে দেখিয়ে বলল,
—“ওই যে।”
লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
নন্দলাল তাকালেন।
কয়েক সেকেন্ড যেন সময় থেমে রইল।
তারপর বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন,
—“তুই?”
ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,
—“বাবা।”
বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেল।
শুভ দূরে দাঁড়িয়ে হাসছিল।
নন্দলাল ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন,
—“অনেক দেরি করলি।”
ছেলে কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল,
—“কিন্তু ফিরেছি তো।”
নন্দলাল চোখ বন্ধ করলেন।
বছরের পর বছর যে বেঞ্চে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন, সেদিন সেই বেঞ্চেই তাঁর অপেক্ষার শেষ হল।
আর শুভ বুঝল—
কখনও কখনও কাউকে আশ্রয় দেওয়া মানে শুধু তাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচানো নয়; তার ভেতরের আশাটাকেও বাঁচিয়ে রাখা।