গ্রামের শেষ মাথায় টিনের চালের একটা ছোট ঘর। জানালার পাশে বসে প্রতিদিন সেলাই মেশিন চালাতেন জহুরা খালা।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘর থেকে ভেসে আসত—
খটখট… খটখট… খটখট…
গ্রামের মানুষ জানত, জহুরা খালা কাপড় সেলাই করেন।
কিন্তু কেউ জানত না, তিনি শুধু কাপড় জোড়েন না—মানুষের ভাঙা স্বপ্নও জোড়েন।
একদিন তাঁর কাছে এল রিমি।
বয়স মাত্র চৌদ্দ।
হাতে ছেঁড়া স্কুলের পোশাক।
রিমি মাথা নিচু করে বলল,
—“খালা, এটা একটু ঠিক করে দেবেন? নতুন জামা কেনার টাকা নেই।”
জহুরা খালা জামাটা হাতে নিয়ে বললেন,
—“কাল নিয়ে যাস।”
রিমি অবাক হয়ে বলল,
—“কত টাকা লাগবে?”
—“তুই পড়াশোনা করিস?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে টাকা লাগবে না।”
পরদিন জামাটা সুন্দর করে সেলাই করে দিলেন তিনি।
রিমি যাওয়ার সময় জহুরা খালা তাকে একটা খাতা দিলেন।
—“এতে কী?”
—“তোর পড়ার খাতা। শেষ হলে আবার আসবি।”
এভাবেই রিমি প্রায়ই তাঁর কাছে আসতে লাগল।
কখনও জামা সেলাই, কখনও বই, কখনও শুধু গল্প।
একদিন রিমি জিজ্ঞেস করল,
—“খালা, আপনি এত কাজ করেন কেন?”
জহুরা খালা মেশিন চালাতে চালাতে বললেন,
—“আমার মেয়েটা ছিল।”
রিমি চুপ করে গেল।
—“ছিল?”
—“হ্যাঁ। খুব পড়তে চাইত। কিন্তু আমাদের তখন টাকা ছিল না। একদিন অসুখে চলে গেল।”
সেলাই মেশিনের শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল।
জহুরা খালা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—“তখন ঠিক করেছিলাম, আমার কাছে যদি কেউ পড়তে চায়, তাকে যতটা পারি সাহায্য করব।”
রিমি কিছু বলল না।
শুধু জহুরা খালার হাতটা ধরে রইল।
বছর কেটে গেল।
রিমি কলেজে পড়তে গেল। তারপর নার্সিং প্রশিক্ষণ নিল।
একদিন সে খবর পেল, জহুরা খালা খুব অসুস্থ।
সে ছুটে এল।
ঘরের কোণে সেলাই মেশিনটা পড়ে আছে।
রিমি মেশিনটার ওপর হাত রাখল।
—“খালা, এটা আর চালান না?”
জহুরা খালা দুর্বল হাসলেন।
—“চোখ আর আগের মতো নেই।”
রিমি বলল,
—“তাহলে এবার আমি চালাব।”
জহুরা খালা অবাক।
—“তুই?”
রিমি মেশিনে বসে প্যাডেল চাপল।
খটখট… খটখট…
বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।
—“আমার মেয়ের মতোই শব্দ হচ্ছে।”
রিমি হেসে বলল,
—“আপনার মেয়ের স্বপ্নটা তো এখনও বেঁচে আছে।”
কয়েক বছর পর গ্রামের সেই ছোট ঘরটা বদলে গেল।
সেখানে তৈরি হল একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
নাম—
“আলো সেলাই কেন্দ্র”
দরিদ্র মেয়েরা সেখানে বিনা খরচে সেলাই শেখে।
নিজেদের পোশাক বানায়।
তারপর কাজও পায়।
দরজার পাশে পুরনো সেলাই মেশিনটা এখনও রাখা আছে।
প্রথম দিন রিমি নিজে মেশিনটা পরিষ্কার করে তার ওপর একটা ছোট কাগজ লাগিয়ে দিল—
“যে হাত একদিন সাহায্য পেয়েছিল, সেই হাতই আজ অন্যকে সাহায্য করবে।”
জহুরা খালা তখন আর হাঁটতে পারেন না।
তবু প্রতিদিন বিকেলে চেয়ারে বসে মেয়েদের কাজ দেখেন।
ঘরজুড়ে আবার সেই পুরনো শব্দ—
খটখট… খটখট… খটখট…
একদিন এক কিশোরী জহুরা খালাকে জিজ্ঞেস করল,
—“খালা, এই মেশিনটা এত পুরনো হয়েও ফেলে দেননি কেন?”
জহুরা খালা মৃদু হেসে বললেন,
—“এই মেশিন শুধু কাপড় সেলাই করেনি মা।”
তিনি চারপাশে তাকালেন।
—“এটা অনেকগুলো জীবনকে জোড়া দিয়েছে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।
ভেতরে সেলাই মেশিনের শব্দ চলছে।
আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অনেক মেয়ের স্বপ্নের শব্দ।
কখনও একটি ছোট সাহায্যও বৃথা যায় না—সঠিক হাতে পৌঁছালে তা একদিন অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ সেলাই করে দেয়।