Categories
অনুগল্প বিবিধ

ছাতার নিচে দুজন।।।

শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন সকালে দাঁড়িয়ে থাকত সুমন। তার হাতে থাকত একটা বিশাল কালো ছাতা।

সুমন ছাতা বিক্রি করত না। বরং বৃষ্টি হলেই যে কাউকে নিজের ছাতার নিচে দাঁড় করিয়ে দিত।

লোকজন হাসত।

—“নিজের ছাতার নিচে নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারো না, আবার সবাইকে জায়গা দাও!”

সুমন শুধু হাসত।

একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বাসস্ট্যান্ডে এল এক বৃদ্ধা। হাতে ওষুধের প্যাকেট, কিন্তু মাথায় কোনও ছাতা নেই।

সুমন সঙ্গে সঙ্গে ছাতাটা বাড়িয়ে দিল।

—“মা, এখানে দাঁড়ান।”

বৃদ্ধা বললেন,

—“তুমি ভিজে যাবে।”

—“আমি একটু ভিজলে কিছু হবে না।”

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলেন।

বাস এল।

বৃদ্ধা উঠে যাওয়ার আগে বললেন,

—“তোমার নাম কী?”

—“সুমন।”

—“মনে রাখব।”

সুমন হেসে বলল,

—“আমাকে মনে রাখার দরকার নেই। শুধু আজকের মতো আর কাউকে ভিজতে দেখলে ছাতার নিচে দাঁড় করিয়ে দেবেন।”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

তারপর চলে গেলেন।

কয়েকদিন পর আবার বৃষ্টি।

সুমন দেখল, বাসস্ট্যান্ডে একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা ছোট ছাতা, কিন্তু পাশে এক বৃদ্ধ লোক ভিজছেন।

কিশোর নিজের ছাতাটা বৃদ্ধের মাথার ওপর ধরল।

সুমন দূর থেকে দেখে হাসল।

পরদিন আরেকজন।

তারপর আরেকজন।

বৃষ্টির দিনে বাসস্ট্যান্ডে যেন অদ্ভুত একটা নিয়ম তৈরি হয়ে গেল।

যার ছাতা আছে, সে ছাতা ভাগ করে নেয়।

একদিন সুমন নিজেই প্রচণ্ড জ্বরে পড়ল।

সেদিন বাসস্ট্যান্ডে তার বড় কালো ছাতাটা ছিল না।

বৃষ্টি নামতেই মানুষজন একে একে জড়ো হতে লাগল।

কেউ বলল,

—“সুমন নেই?”

আরেকজন বলল,

—“ওকে তো আজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে।”

এক বৃদ্ধ লোক নিজের ছাতা মেলে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকে আমরা ওর কাজটা করব।”

সেদিন বাসস্ট্যান্ডে একজনেরও মাথায় বৃষ্টি পড়ল না।

কয়েকদিন পর সুমন সুস্থ হয়ে ফিরে এল।

বাসস্ট্যান্ডে এসে সে অবাক হয়ে গেল।

দশ-পনেরোটা মানুষ দাঁড়িয়ে।

কারও হাতে ছোট ছাতা, কারও বড়।

সবাই বৃষ্টিতে অন্য কাউকে জায়গা দিচ্ছে।

একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বললেন,

—“চিনতে পারছ?”

সুমন তাকিয়ে রইল।

তারপর চিনতে পারল।

সেই প্রথম দিনের বৃদ্ধা।

বৃদ্ধা হাসলেন।

—“তুমি বলেছিলে, আমাকে মনে রাখার দরকার নেই। কিন্তু তোমার কথাটা মনে রেখেছি।”

সুমনের চোখ ভিজে গেল।

বৃদ্ধা নিজের ছাতাটা তার হাতে দিয়ে বললেন,

—“এটা রাখো।”

সুমন বলল,

—“আমার তো ছাতা আছে।”

বৃদ্ধা বললেন,

—“এটা তোমার জন্য নয়।”

—“তাহলে?”

—“যার প্রয়োজন হবে, তার জন্য।”

সুমন ছাতাটা নিল।

সেদিন থেকে বাসস্ট্যান্ডে আরও একটা ছাতা ঝুলতে লাগল।

তার ওপর লেখা—

“যার ছাতা নেই, সে নিয়ে নিন। যার আছে, সে অন্য কাউকে জায়গা দিন।”

বছর কেটে গেল।

সুমন বুড়ো হল।

কিন্তু বৃষ্টির দিনে সেই বাসস্ট্যান্ডে এখনও ছাতাগুলো ঝুলে থাকে।

কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—

“তুমি কে?”

শুধু জিজ্ঞেস করে—

“আপনি ভিজছেন? আসুন, এখানে দাঁড়ান।”

কারণ সুমন একদিন শিখেছিল—

মানুষের পরিচয় জানার আগে তার পাশে দাঁড়ানো যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *