বর্ষা এলেই কানাইপুর গ্রামের একটা রাস্তা অচল হয়ে যেত।
গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে স্কুল পর্যন্ত যেতে হলে মাঝখানে একটা সরু খাল পার হতে হত। শীতকালে খালটায় সামান্য জল থাকত। কিন্তু বর্ষায় সেটাই হয়ে উঠত ছোট্ট নদী।
খালের ওপর ছিল বাঁশের একটা পুরোনো সাঁকো।
সাঁকোটা এতটাই নড়বড়ে ছিল যে, একসঙ্গে দুজন উঠলে কেঁপে উঠত।
গ্রামের মানুষ তবু সেটাই ব্যবহার করত।
কারণ অন্য রাস্তা দিয়ে গেলে প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরতে হত।
গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ছিলেন অমলেন্দু মাস্টার।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
প্রতিদিন তিনি সাইকেল নিয়ে সেই সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতেন।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে তিনি দেখলেন, সাঁকোর একটা বাঁশ ভেঙে গেছে।
তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।
সামনে স্কুলের দিকে যাওয়ার পথ।
পেছনে গ্রামের মানুষ।
কেউ সাঁকো পার হতে সাহস করছে না।
ঠিক তখন একটা ছোট ছেলে ছাতা মাথায় নিয়ে এসে দাঁড়াল।
নাম তার শুভ।
শুভ বলল,
—“মাস্টারমশাই, আজ স্কুল বন্ধ?”
অমলেন্দু বললেন,
—“আজ নয়। কিন্তু এই সাঁকো দিয়ে যাওয়া যাবে না।”
শুভ মুখ নিচু করল।
—“তাহলে আজও পড়া হবে না?”
অমলেন্দু তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“পড়া বন্ধ হবে কেন?”
শুভ অবাক।
—“স্কুলে তো যেতে পারব না।”
মাস্টারমশাই হাসলেন।
—“স্কুল একটা ঘর নয়, শুভ। যেখানে শেখা হয়, সেটাই স্কুল।”
সেদিন অমলেন্দু মাস্টার গ্রামের একটা খালি গোয়ালঘরে ছাত্রদের নিয়ে ক্লাস করলেন।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে তিনি অঙ্ক পড়ালেন।
শিশুরা মাটিতে কাঠি দিয়ে হিসাব করল।
কেউ পুরোনো খবরের কাগজে বাংলা লিখল।
শুভ খুব আনন্দ পেল।
ক্লাস শেষে সে বলল,
—“মাস্টারমশাই, আমরা কি নিজেরাই সাঁকোটা ঠিক করতে পারি?”
অমলেন্দু একটু হেসে বললেন,
—“সাঁকো ঠিক করা এত সহজ নয়।”
শুভ বলল,
—“তাহলে শিখব।”
মাস্টারমশাই তার মাথায় হাত রাখলেন।
—“ঠিক আছে। আগে দেখবি, তারপর ভাববি।”
পরদিন বৃষ্টি একটু কমল।
অমলেন্দু মাস্টার কয়েকজন গ্রামবাসীকে নিয়ে সাঁকো দেখতে গেলেন।
দেখা গেল, শুধু একটা বাঁশ নয়—সাঁকোর বেশ কয়েকটা অংশ পচে গেছে।
একজন বলল,
—“এবার নতুন সাঁকো করতে হবে।”
আরেকজন বলল,
—“টাকা কোথায়?”
তৃতীয়জন বলল,
—“পঞ্চায়েতকে বলতে হবে।”
কথা চলল।
কিন্তু কাজ শুরু হল না।
শুভ দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
সেদিন রাতে সে বাবাকে বলল,
—“বাবা, বাঁশ কিনতে কত টাকা লাগে?”
বাবা অবাক।
—“কেন?”
—“সাঁকো বানাব।”
বাবা হেসে বললেন,
—“তুই একা সাঁকো বানাবি?”
শুভ বলল,
—“একা না। সবাই মিলে।”
পরদিন শুভ স্কুলে একটা খাতা নিয়ে এল।
খাতার প্রথম পাতায় লিখল—
“আমাদের সাঁকো।”
তার নিচে লিখল—
“যে যতটা পারে সাহায্য করবে।”
কেউ টাকা দিতে পারবে।
কেউ বাঁশ দিতে পারবে।
কেউ দড়ি।
কেউ শ্রম।
শুভ খাতা নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে শুরু করল।
প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
একজন বলল,
—“এই কাজ বড়দের। তুই পড়াশোনা কর।”
শুভ বলল,
—“পড়াশোনা করতেই তো সাঁকোটা দরকার।”
কথাটা শুনে লোকটি চুপ করে গেল।
সে দশটা বাঁশ দেওয়ার কথা বলল।
তারপর আরেকজন বলল,
—“আমি দড়ি দেব।”
কেউ বলল,
—“আমি শ্রম দেব।”
একজন বৃদ্ধ বললেন,
—“আমার কাছে টাকা নেই। কিন্তু আমি সারাজীবন বাঁশ কাটার কাজ করেছি। আমি কাজটা দেখিয়ে দেব।”
শুভর খাতার পাতায় একের পর এক নাম উঠতে লাগল।
অমলেন্দু মাস্টারও পিছিয়ে থাকলেন না।
তিনি গ্রামের যুবকদের নিয়ে পরিকল্পনা করলেন।
কোথায় খুঁটি বসবে, কীভাবে বাঁশ বাঁধা হবে, কতটা উঁচু করতে হবে—সব হিসাব করা হল।
তিন দিন পর কাজ শুরু হল।
সকাল থেকে গ্রামের মানুষ খালে নেমে কাজ করছে।
কেউ বাঁশ কাটছে।
কেউ দড়ি বাঁধছে।
কেউ পুরোনো কাঠ সরাচ্ছে।
শুভও পাশে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট কাজ করছে।
তার হাতে ফোস্কা পড়ে গেল।
মা বললেন,
—“থাম। তোর হাত কেটে যাবে।”
শুভ বলল,
—“আর একটু।”
মা বললেন,
—“তুই এত কষ্ট করছিস কেন?”
শুভ বলল,
—“আমাদের স্কুলে যেতে হবে।”
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
এক সপ্তাহ পর নতুন সাঁকো তৈরি হল।
আগেরটার চেয়ে শক্ত।
চওড়াও একটু বেশি।
সাঁকোর দুই পাশে বাঁশের হাতল লাগানো হল।
উদ্বোধনের দিন গ্রামের সবাই জড়ো হল।
অমলেন্দু মাস্টার বললেন,
—“এই সাঁকো শুধু বাঁশ আর দড়ি দিয়ে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে সবার ইচ্ছায়।”
তারপর তিনি শুভকে সামনে ডাকলেন।
শুভ লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়াল।
মাস্টারমশাই বললেন,
—“প্রথম ভাবনাটা কার ছিল?”
সবাই বলল,
—“শুভর।”
অমলেন্দু হাসলেন।
—“তাহলে প্রথমে ও-ই পার হবে।”
শুভ ধীরে ধীরে সাঁকোর ওপর পা রাখল।
এক পা।
দুই পা।
তারপর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিচের খালের দিকে তাকাল।
জল তখনও স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সাঁকো নড়ল না।
শুভ ওপারে পৌঁছে ফিরে তাকাল।
তার চোখে আনন্দ।
সে চিৎকার করে বলল,
—“মাস্টারমশাই! হয়েছে!”
অমলেন্দু বললেন,
—“হ্যাঁ। কারণ সবাই মিলে করেছে।”
সেই দিন থেকে বর্ষায় আর স্কুল বন্ধ হল না।
ছাত্রছাত্রীরা সাঁকো পার হয়ে স্কুলে যেতে লাগল।
কয়েক মাস পর পঞ্চায়েতের উদ্যোগে সেখানে আরও শক্ত কাঠামোর একটা ছোট সেতু তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হল।
কিন্তু গ্রামের মানুষ পুরোনো সাঁকোটা ভাঙতে দিল না।
তারা সেটাকে রেখে দিল।
তার পাশে একটা ছোট কাঠের ফলক লাগানো হল—
“এই সাঁকো আমাদের শিখিয়েছে—যে পথ ভেঙে যায়, সেই পথের জন্য অপেক্ষা না করে কখনও কখনও নিজেদের হাতেই নতুন পথ তৈরি করতে হয়।”
বহু বছর পরে শুভ বড় হল।
সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল।
তারপর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করল।
একদিন নিজের অফিসে বসে সে পুরোনো গ্রামের একটা ছবি দেখছিল।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে—
একটা সরু বাঁশের সাঁকো।
তার ওপর দিয়ে কয়েকজন স্কুলছাত্র যাচ্ছে।
ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে শুভ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তার সহকর্মী জিজ্ঞেস করল,
—“কী দেখছেন?”
শুভ বলল,
—“আমার প্রথম সেতু।”
সহকর্মী অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি তো এত বড় বড় সেতু বানিয়েছেন!”
শুভ মৃদু হেসে বলল,
—“ওগুলো পেশা। এটা ছিল স্বপ্ন।”
তারপর সে জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি পড়ছিল।
শুভর মনে হল, জীবনের প্রথম সেতুটা আসলে খালের ওপর তৈরি হয়নি।
তৈরি হয়েছিল মানুষের মনে।
একজন ছোট ছেলে দেখেছিল একটা ভাঙা পথ।
অন্যরা দেখেছিল সমস্যা।
সে দেখেছিল—
সম্ভাবনা।
আর সেই সম্ভাবনাকে সত্যি করেছিল পুরো একটা গ্রাম।