নয়নপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকতেন হেমাঙ্গিনী।
বয়স তাঁর প্রায় সত্তর। স্বামী বহু বছর আগে চলে গেছেন। একমাত্র ছেলে শহরে থাকে। বছরে একবার আসে, তাও দু-এক দিনের জন্য।
হেমাঙ্গিনীর সংসার ছোট।
একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসী মঞ্চ, পাশে একটা পুরোনো আমগাছ আর উঠোনের কোণে মাটির চুল্লি।
কিন্তু তাঁর একটা কাজ ছিল, যেটা তিনি কখনও ছাড়েননি।
প্রতি বছর কার্তিক মাসে তিনি মাটির প্রদীপ বানাতেন।
শুধু নিজের জন্য নয়।
পুরো গ্রামের জন্য।
ছোটবেলায় তাঁর মা তাঁকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে নদীর পাড়ের মাটি ছেঁকে, জল মিশিয়ে, হাতের তালু দিয়ে ছোট ছোট প্রদীপ তৈরি করতে হয়।
হেমাঙ্গিনী সেই কাজই করে আসছেন পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
কিন্তু এবার সমস্যা হল।
গ্রামের মানুষ মাটির প্রদীপ কেনে না।
সবাই বাজার থেকে রঙিন বৈদ্যুতিক আলো কিনে আনে।
একদিন পাশের বাড়ির ছেলে রনি এসে বলল,
—“ঠাম্মি, আপনি এত প্রদীপ বানান কেন?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“আলো জ্বালাব বলে।”
রনি হেসে বলল,
—“এগুলো দিয়ে কতটুকু আলো হবে?”
হেমাঙ্গিনী একটা প্রদীপ হাতে নিয়ে বললেন,
—“একটা প্রদীপ পুরো ঘর আলোকিত করতে পারে না। কিন্তু অন্ধকারের কাছে প্রথম প্রতিবাদটা করে।”
রনি কথাটা বুঝল না।
সেই বছর পুজোর পর হেমাঙ্গিনী প্রদীপ বানানো শুরু করলেন।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাটি কাদা করতেন।
তারপর একে একে প্রদীপ বানাতেন।
রনি স্কুল থেকে ফিরে মাঝে মাঝে পাশে বসত।
একদিন সে বলল,
—“আমি বানাতে পারি?”
—“পারিস।”
রনি একটা প্রদীপ বানানোর চেষ্টা করল।
প্রথমটা ভেঙে গেল।
দ্বিতীয়টা বেঁকে গেল।
তৃতীয়টা কেমন যেন হাঁড়ির মতো হয়ে গেল।
হেমাঙ্গিনী হেসে বললেন,
—“প্রদীপ বানানো সহজ নয়।”
রনি বলল,
—“আলো জ্বালানোও কি কঠিন?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“প্রদীপ বানানোর চেয়ে আলো জ্বালানো কঠিন।”
—“কেন?”
—“কারণ প্রদীপে তেল আর সলতে লাগে। কিন্তু মানুষের জীবনে আলো জ্বালাতে লাগে মন।”
কয়েকদিন পর গ্রামের বাজারে খবর এল—
এবার বড় ব্যবসায়ীরা শহর থেকে নতুন ধরনের LED আলো এনেছে।
দোকানে ভিড়।
সবাই আলো কিনছে।
হেমাঙ্গিনীর প্রদীপ পড়ে রইল।
একটাও বিক্রি হল না।
সন্ধ্যায় তিনি প্রদীপগুলো ঘরে এনে রাখলেন।
রনি দেখল তাঁর মুখটা বিষণ্ণ।
সে বলল,
—“ঠাম্মি, তুমি কি আর প্রদীপ বানাবে না?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“হয়তো এটাই শেষ বছর।”
রনি চুপ করে রইল।
সেদিন রাতে সে বাড়ি গিয়ে একটা খাতা বের করল।
খাতার প্রথম পাতায় লিখল—
“হেমাঙ্গিনী ঠাম্মির প্রদীপ বাঁচাতে হবে।”
পরদিন স্কুলে সে বন্ধুদের নিয়ে কথা বলল।
—“আমরা সবাই মিলে ঠাম্মির প্রদীপ কিনব।”
একজন বলল,
—“কেন?”
রনি বলল,
—“কারণ এগুলো শুধু প্রদীপ নয়। এগুলো একটা মানুষের পঞ্চাশ বছরের কাজ।”
বন্ধুরা রাজি হল।
তারা নিজেরা টাকা জমাল।
কেউ পাঁচ টাকা।
কেউ দশ টাকা।
কেউ বিশ টাকা।
তারপর তারা হেমাঙ্গিনীর কাছে গেল।
—“ঠাম্মি, আপনার সব প্রদীপ আমরা কিনব।”
হেমাঙ্গিনী অবাক।
—“তোমরা এত প্রদীপ নিয়ে কী করবে?”
রনি বলল,
—“গ্রামের সবাইকে দেব।”
কিন্তু এত প্রদীপ কেনার মতো টাকা তাদের ছিল না।
তখন স্কুলের শিক্ষকও এগিয়ে এলেন।
তিনি বললেন,
—“শুধু কিনে দিলে হবে না। আমরা নিজেরাই এগুলো বিক্রি করব।”
ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের বাড়ি বাড়ি গেল।
বলল,
—“এবার একটা করে মাটির প্রদীপ জ্বালান।”
কেউ কিনল।
কেউ দুটো নিল।
কেউ দশটা।
কেউ বলল,
—“আমরা LED-ই জ্বালাব।”
রনি বলল,
—“LED জ্বালান। তার সঙ্গে একটা প্রদীপও জ্বালান।”
কথাটা অনেকের ভালো লাগল।
ধীরে ধীরে সব প্রদীপ বিক্রি হয়ে গেল।
হেমাঙ্গিনীর মুখে আবার হাসি ফুটল।
উৎসবের সন্ধ্যায় গ্রামের দৃশ্য বদলে গেল।
প্রতিটি বাড়ির দরজায় একটা করে মাটির প্রদীপ।
কোথাও দুইটা।
কোথাও দশটা।
পাকা বাড়ি, মাটির বাড়ি, দোকান, স্কুল—সব জায়গায় ছোট ছোট প্রদীপ জ্বলছে।
হেমাঙ্গিনী নিজের উঠোনে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন।
রনি এসে বলল,
—“ঠাম্মি, কেমন লাগছে?”
তিনি বললেন,
—“মনে হচ্ছে আমার মা আবার ফিরে এসেছে।”
রনি বুঝতে পারল না।
—“তোমার মা?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“হ্যাঁ। ছোটবেলায় আমার মা এমনই করে পুরো উঠোনে প্রদীপ জ্বালাতেন।”
কিছুক্ষণ তিনি চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“ভাবিনি আবার এমন দিন দেখব।”
সেই রাতে গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একটা ঘোষণা করলেন।
আগামী বছর থেকে স্কুলে “মাটির আলো কর্মশালা” হবে।
হেমাঙ্গিনী সেখানে শিশুদের প্রদীপ বানানো শেখাবেন।
রনি বলল,
—“ঠাম্মি, তুমি রাজি?”
হেমাঙ্গিনী হাসলেন।
—“যতদিন হাত চলে, ততদিন শেখাব।”
পরের বছর সত্যিই স্কুলে কর্মশালা শুরু হল।
শুধু প্রদীপ নয়—
শিশুরা মাটির খেলনা, ছোট পাত্র, পাখি, ফুল—অনেক কিছু বানাতে শিখল।
হেমাঙ্গিনীর কাজ আবার ফিরে এল মানুষের জীবনে।
তারপর গ্রামের মহিলারাও যোগ দিলেন।
তাঁরা মাটির জিনিস বানিয়ে বাজারে বিক্রি করতে শুরু করলেন।
একটা ছোট্ট প্রদীপ একটা নতুন জীবিকার দরজা খুলে দিল।
বছর দুয়েক পর হেমাঙ্গিনীর ছেলে শহর থেকে ফিরে এল।
বাড়িতে ঢুকেই দেখল উঠোনে সারি সারি মাটির প্রদীপ শুকোচ্ছে।
সে অবাক হয়ে বলল,
—“মা, তুমি এখনও এসব করছ?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“এখন একা করি না। গ্রামের ছেলেমেয়েরা করে।”
ছেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—“মা, তুমি আমাকে আগে কখনও বলোনি যে এত বড় একটা কাজ করছ।”
হেমাঙ্গিনী হেসে বললেন,
—“আমি তো শুধু প্রদীপ বানিয়েছি। বড় কাজটা করেছে ওরা।”
সে রনির দিকে তাকাল।
রনি তখন কয়েকজন শিশুকে মাটি দিয়ে প্রদীপ বানানো শেখাচ্ছিল।
ছেলে বলল,
—“তুমি ঠিকই বলেছিলে মা। আলো ছোট হলেও তার দাম বড়।”
বহু বছর পরে হেমাঙ্গিনী আর প্রদীপ বানাতে পারতেন না।
হাত কাঁপত।
চোখেও আগের মতো দেখতে পেতেন না।
একদিন উৎসবের সন্ধ্যায় রনি—তখন সে কলেজে পড়ে—একটা প্রদীপ নিয়ে তাঁর কাছে এল।
—“ঠাম্মি, এটা চিনতে পারো?”
হেমাঙ্গিনী হাত দিয়ে প্রদীপটা ছুঁয়ে বললেন,
—“এটা তো খুব সুন্দর।”
রনি বলল,
—“আমি বানিয়েছি।”
—“তুই?”
—“হ্যাঁ।”
তারপর রনি প্রদীপে তেল ঢেলে সলতে জ্বালাল।
প্রদীপের ছোট্ট আলো হেমাঙ্গিনীর মুখে পড়ল।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
মৃদুস্বরে বললেন,
—“এবার আমি নিশ্চিন্ত।”
রনি বলল,
—“কেন?”
হেমাঙ্গিনী বললেন,
—“কারণ আমি যে আলোটা পেয়েছিলাম, সেটা তোকে দিয়ে যেতে পেরেছি।”
বাইরে তখন পুরো গ্রাম আলোয় ভেসে গেছে।
বড় বড় বৈদ্যুতিক আলোও জ্বলছে।
তার মাঝেও প্রতিটি বাড়ির দরজায় জ্বলছে একটা ছোট মাটির প্রদীপ।
সেই ছোট্ট আলো যেন বলে দিচ্ছে—
আলো বড় না ছোট, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হল—অন্ধকারের সময় তুমি আলো জ্বালাতে চেয়েছিলে কি না।
আর নয়নপুর গ্রামের সেই শেষ প্রদীপটি আজও জ্বলে।
একজন বৃদ্ধার হাতের কাজ হয়ে নয়,
এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া এক বিশ্বাস হয়ে।