কৃষ্ণপুর গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটা রেললাইন।
লাইনটার এপারে বাজার, স্কুল আর বেশিরভাগ বাড়ি।
ওপারে কয়েকটা ছোট পাড়া।
রেললাইন পার হতে হলে একটা পুরোনো লেভেল ক্রসিং ব্যবহার করতে হয়।
সেই ক্রসিংয়ের পাশে ছোট্ট একটা ঘরে থাকতেন নিতাই।
তিনি রেলওয়ের কর্মী ছিলেন। বহু বছর ধরে ট্রেন আসার আগে গেট বন্ধ করা আর ট্রেন চলে গেলে গেট খুলে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ।
গ্রামের সবাই তাঁকে চিনত।
কেউ বলত নিতাইকাকা।
কেউ বলত গেটকাকু।
নিতাই সবসময় একটা লাল পতাকা সঙ্গে রাখতেন।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল একটা পুরোনো ঘড়ি।
ঘড়িটা তাঁর বাবার।
বাবাও একসময় রেলের কাজ করতেন।
নিতাই বলতেন,
—“এই ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না। আমাকে দায়িত্বের কথা মনে করায়।”
নিতাইয়ের একটা মেয়ে ছিল—তুলি।
তুলি পড়াশোনায় খুব ভালো।
কিন্তু তার স্কুল ছিল রেললাইনের এপারে।
বাড়ি ওপারে।
প্রতিদিন তাকে লেভেল ক্রসিং পার হতে হত।
নিতাই মেয়েকে বারবার বলতেন,
—“গেট বন্ধ থাকলে কখনও পার হবি না।”
তুলি বলত,
—“আমি জানি বাবা।”
একদিন সকালে তুলি স্কুলে যাওয়ার সময় দেখল গেট বন্ধ।
সে দাঁড়িয়ে রইল।
পাশে কয়েকজন মানুষ অপেক্ষা করছে।
একজন যুবক বলল,
—“ট্রেন আসতে এখনও সময় আছে। চলুন, পাশ দিয়ে চলে যাই।”
তুলি মাথা নাড়ল।
—“না।”
যুবক হাসল।
—“তুমি তো বেশ নিয়ম মানো!”
তুলি বলল,
—“আমার বাবা গেট বন্ধ করলে তার মানে নিশ্চয়ই কারণ আছে।”
নিতাই দূর থেকে সব দেখছিলেন।
তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
কিন্তু কয়েক মাস পর সমস্যা শুরু হল।
রেললাইনের ওপর দিয়ে চলাচল বেড়ে গেল।
ক্রসিংয়ে গাড়ির লাইন পড়ত।
মানুষ অধৈর্য হয়ে উঠত।
অনেকে গেট বন্ধ থাকা অবস্থায় পাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত।
নিতাই বারবার বাধা দিতেন।
কেউ রাগ করত।
কেউ গালাগাল দিত।
কেউ বলত,
—“এত নিয়ম করলে আমাদের সময় নষ্ট হয়।”
নিতাই শান্তভাবে বলতেন,
—“আপনাদের সময়ের দাম আছে। কিন্তু জীবনের দাম তার চেয়েও বেশি।”
একদিন বিকেলে এক বাইক আরোহী গেটের নিচ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
নিতাই দৌড়ে গিয়ে তাকে থামালেন।
লোকটি রেগে বলল,
—“আপনি কে আমাকে আটকানোর?”
নিতাই বললেন,
—“আমি সেই মানুষ, যে চায় আপনি বাড়ি ফিরে আপনার পরিবারের সঙ্গে দেখা করুন।”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বাইক পিছিয়ে নিল।
সেদিন রাতে তুলি বাবাকে বলল,
—“বাবা, সবাই তোমার ওপর রাগ করে। তুমি কষ্ট পাও না?”
নিতাই জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—“পাই।”
—“তাহলে?”
—“কাজের সময় মানুষের রাগ দেখলে কাজ ছেড়ে দিলে চলবে?”
তুলি বলল,
—“তুমি কখনও অন্য কাজ করতে চাওনি?”
নিতাই হেসে বললেন,
—“চেয়েছিলাম।”
—“কী কাজ?”
—“শিক্ষক হতে।”
তুলি অবাক।
—“তাহলে হওনি কেন?”
নিতাই বললেন,
—“সব স্বপ্ন নিজের জন্য হয় না। কিছু স্বপ্ন অন্যের নিরাপত্তার জন্যও হয়।”
তুলি কিছু বলল না।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হল।
বৃষ্টিতে রেললাইনের পাশের মাটি ধসে গেল।
কিন্তু সেটা চোখে বোঝা যাচ্ছিল না।
সন্ধ্যার দিকে নিতাই দূর থেকে একটা অস্বাভাবিক শব্দ শুনলেন।
রেললাইনের দিকে তাকিয়ে তাঁর সন্দেহ হল।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে লাল পতাকা হাতে নিয়ে দৌড়ে গেলেন।
কিছু দূরে গিয়ে দেখলেন, লাইনের একটা অংশের নিচের মাটি সরে গেছে।
তিনি বুঝলেন—
এখান দিয়ে ট্রেন গেলে বড় বিপদ হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হল, ট্রেন আসতে বেশি সময় নেই।
নিতাই দৌড়ে সিগন্যালের দিকে গেলেন।
তারপর লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে লাল পতাকা উঁচিয়ে ধরলেন।
ট্রেনের হর্ন শোনা গেল।
দূরে আলো দেখা গেল।
নিতাই প্রাণপণে পতাকা নাড়তে লাগলেন।
ট্রেনের গতি কমল।
আরও কমল।
অবশেষে ট্রেন থেমে গেল।
ট্রেনের চালক ও কর্মীরা নেমে এলেন।
তারা লাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখে অবাক।
একজন বললেন,
—“আর একটু এগিয়ে গেলে বড় দুর্ঘটনা হতে পারত।”
নিতাই কিছু বললেন না।
শুধু দূরে তাকিয়ে রইলেন।
পরদিন খবর ছড়িয়ে পড়ল।
গ্রামের মানুষ বুঝল—
যে মানুষটাকে তারা প্রতিদিন গেট বন্ধ করার জন্য বিরক্ত করত, সেই মানুষই তাদের জীবন রক্ষা করেছে।
বাজারের সেই যুবকও এল।
যে একদিন নিতাইকে বলেছিল,
“আপনি কে আমাকে আটকানোর?”
সে নিতাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“কাকু, সেদিন আমি ভুল বলেছিলাম।”
নিতাই হেসে বললেন,
—“ভুল সবাই করে। বুঝতে পারাটাই বড় কথা।”
কয়েকদিন পর গ্রামের স্কুলে নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান হল।
তুলিকে মঞ্চে ডাকা হল।
শিক্ষক বললেন,
—“তোমার বাবা যে কাজ করেন, তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”
তুলি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছেন, নিয়ম কখনও কখনও আমাদের স্বাধীনতা কমায় না—আমাদের জীবন বাঁচায়।”
সবাই হাততালি দিল।
নিতাই পিছনে বসে ছিলেন।
তাঁর চোখে জল।
বছর কয়েক পর তুলি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল।
সে রেলওয়ে নিয়ে পড়াশোনা করতে চাইল।
একদিন বাবাকে বলল,
—“আমি রেলের কাজ করব।”
নিতাই অবাক।
—“কেন?”
তুলি বলল,
—“তুমি যে কাজটা সারাজীবন করেছ, সেটা আমি আরও ভালোভাবে করতে চাই।”
নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—“তোর নিজের স্বপ্ন আছে।”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে সেটাই কর।”
তুলি হেসে বলল,
—“আমার স্বপ্নের শুরু তো তোমার কাছ থেকেই।”
বহু বছর পর কৃষ্ণপুরের সেই পুরোনো লেভেল ক্রসিং বদলে গেল।
সেখানে তৈরি হল ছোট্ট একটা রেলওয়ে ওভারব্রিজ।
আর নিতাই অবসর নিলেন।
অবসরের দিন তুলি বাবার হাতে সেই পুরোনো ঘড়িটা দেখল।
ঘড়ি তখনও চলছে।
তুলি বলল,
—“বাবা, এত পুরোনো ঘড়ি এখনও রাখো?”
নিতাই বললেন,
—“সময় পুরোনো হয় না।”
—“ঘড়ি তো নষ্টও হতে পারে।”
—“হতে পারে। কিন্তু সময়ের মূল্য ভুলে গেলে মানুষই নষ্ট হয়।”
তুলি বাবার হাত ধরল।
দূরে একটা ট্রেন চলে গেল।
রেললাইনের ওপারে সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
নিতাই কিছুক্ষণ ট্রেনটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“দেখলি? ট্রেন চলে যায়। মানুষও একদিন চলে যায়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া দায়িত্বটা থেকে যায়।”
তুলি বাবার পুরোনো ঘড়িটা হাতে নিল।
সেদিন সে বুঝেছিল—
তার বাবা শুধু রেলগেট পাহারা দেননি।
তিনি পাহারা দিয়েছেন মানুষের বাড়ি ফেরার পথ।
আর সেই কারণেই কৃষ্ণপুরের মানুষ বহু বছর পরেও তাঁকে মনে রেখেছিল—
রেললাইনের ওপারে থাকা সেই ছোট্ট ঘরের মানুষ হিসেবে, যিনি নিজের জীবনকে অন্যের নিরাপত্তার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।