শিমুলডাঙা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। ঘরের সামনে সারি সারি মাটির হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ফুলদানি আর নানা রকম পুতুল সাজানো থাকত।
সেই ঘরেই থাকতেন হরনাথ পাল।
বয়স তাঁর প্রায় সত্তর। গ্রামের সবাই তাঁকে ডাকত ‘হরনাথ কুমোর’ বলে।
ছোটবেলা থেকেই মাটি নিয়ে তাঁর কারবার। বাবা ছিলেন কুমোর, দাদুও ছিলেন কুমোর। তাঁদের হাত ঘুরে যে মাটি একসময় হাঁড়ি-কলসি হয়ে উঠত, সেই একই মাটি হরনাথের হাতেও কথা বলত।
কিন্তু সময় বদলে গিয়েছিল।
গ্রামে এখন প্লাস্টিকের বালতি, স্টিলের হাঁড়ি, অ্যালুমিনিয়ামের থালা। শহর থেকে আসা রঙিন ফুলদানি আর মাটির মতো দেখতে প্লাস্টিকের পুতুলও বাজার দখল করে নিয়েছে।
হরনাথের দোকানে তাই ক্রেতা কমে গিয়েছিল।
একদিন সকালে তিনি চাকার সামনে বসে মাটি মাখছিলেন।
তাঁর নাতনি মেঘলা এসে পাশে বসে বলল,
—দাদু, তুমি এখনও এগুলো বানাও?
হরনাথ হেসে বললেন,
—যতদিন হাত চলে, ততদিন বানাব।
—কিন্তু কেউ তো কিনতে আসে না।
হরনাথ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—সব জিনিসের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না রে।
মেঘলা বুঝতে পারল না।
—তাহলে কী দিয়ে মাপা যায়?
হরনাথ মাটির দলাটাকে চাকার ওপর রেখে বললেন,
—কতটা ভালোবাসা দিয়ে বানানো হয়েছে, সেটা দিয়ে।
মেঘলা হেসে বলল,
—ভালোবাসা দিয়ে কি সংসার চলে?
হরনাথ এবারও রাগ করলেন না।
শুধু বললেন,
—সংসার হয়তো সবসময় চলে না। কিন্তু ভালোবাসা না থাকলে মানুষটা নিজেই থেমে যায়।
মেঘলা আর কিছু বলল না।
সে চলে গেল স্কুলে।
সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় মেঘলা দেখল, গ্রামের রাস্তার পাশে কয়েকজন মহিলা পুরোনো মাটির জিনিস ফেলে দিচ্ছেন।
কেউ বলছেন,
—এগুলো রেখে কী হবে?
কেউ বলছেন,
—প্লাস্টিকেরটাই ভালো। ভাঙে না।
মেঘলা দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।
হঠাৎ তার মাথায় একটা ভাবনা এল।
সে দৌড়ে বাড়ি ফিরল।
—দাদু!
হরনাথ তখন একটা মাটির ঘোড়া বানাচ্ছিলেন।
—কী হয়েছে?
—তুমি কি শুধু হাঁড়ি-কলসি বানাতে পারো?
—আরও অনেক কিছু পারি।
—তাহলে এমন কিছু বানাও, যা গ্রামের মানুষ এখন কিনবে।
হরনাথ অবাক হয়ে তাকালেন।
—যেমন?
মেঘলা বলল,
—ছোট ছোট টব। টেবিলে রাখার ফুলদানি। নাম লেখা মাটির ফলক। বাড়ির দরজায় ঝোলানোর নকশা। স্কুলের জন্য পেনস্ট্যান্ড।
হরনাথ কিছুক্ষণ মেঘলার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
—তুই তো আমার চেয়েও বড় কুমোর হয়ে গেলি!
পরদিন থেকেই কাজ শুরু হল।
হরনাথ মাটি তৈরি করতেন। মেঘলা নকশা আঁকত।
প্রথমে তারা ছোট ছোট টব বানাল।
তারপর সেই টবের গায়ে মেঘলা পাখি, ফুল, পাতা, নদী, গ্রামের বাড়ি—নানা ছবি আঁকল।
একটার গায়ে লিখল—
‘শিমুলডাঙা।’
আরেকটায়—
‘মাটির ঘরে মাটির ভালোবাসা।’
হরনাথ অবাক হয়ে বললেন,
—এত সুন্দর লিখতে শিখলি কোথায়?
মেঘলা বলল,
—স্কুলে।
তারপর দুজনে মিলে তৈরি করল কিছু মাটির পেনস্ট্যান্ড।
পেনস্ট্যান্ডের গায়ে ছোট করে লেখা—
‘স্বপ্ন লিখে রাখো।’
মেঘলা এগুলো নিয়ে স্কুলে গেল।
প্রথমে বন্ধুরা হাসল।
রাহুল বলল,
—এগুলো আবার কে কিনবে?
মেঘলা বলল,
—কেউ না কিনলে তুই একটা নিয়ে যা।
রাহুল একটা পেনস্ট্যান্ড হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখল।
—কত?
—পঞ্চাশ টাকা।
রাহুল পকেট থেকে টাকা বের করে বলল,
—ঠিক আছে। এটা আমার।
সেদিন প্রথমবার মেঘলার হাতে নিজের বানানো জিনিসের টাকা এল।
সে বাড়ি ফিরে দাদুর হাতে টাকা দিয়ে বলল,
—দেখো!
হরনাথ টাকাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তার চোখে জল চলে এল।
—দাদু, তুমি কাঁদছ?
—না রে।
—মিথ্যে বলছ।
হরনাথ মুখ ফিরিয়ে বললেন,
—অনেকদিন পর মনে হল, আমার মাটিরও এখনও মূল্য আছে।
কিন্তু সমস্যাটা তখনও শেষ হয়নি।
গ্রামে মাটির জিনিস তৈরির লোক ছিল আরও দু-তিনটি পরিবার। তাদের অনেকেই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছিল।
মেঘলা একদিন বলল,
—দাদু, তুমি একা কেন বানাবে?
—মানে?
—সবাইকে নিয়ে বানাও।
হরনাথ হেসে বললেন,
—কে আসবে?
মেঘলা বলল,
—আমি ডাকব।
পরদিন সে গ্রামের কুমোরপাড়ায় গেল।
বৃদ্ধ নিতাই কাকু, সরস্বতী পিসি, কমলা মাসি—অনেকেই তার কথা শুনে প্রথমে হাসলেন।
কেউ বললেন,
—এখন আর মাটির জিনিস চলে না।
মেঘলা বলল,
—চলে না, কারণ আমরা নতুনভাবে বানাই না।
সবাই চুপ করে গেল।
সে বলল,
—আমরা শুধু হাঁড়ি বানাব না। আমরা গল্প বানাব মাটিতে। গ্রামের নাম লিখব। মানুষের নাম লিখব। বাড়ির জন্য সাজানোর জিনিস বানাব। স্কুলের জন্য বানাব। মেলায় বিক্রি করব।
সরস্বতী পিসি বললেন,
—কিন্তু বিক্রি হবে?
মেঘলা উত্তর দিল,
—চেষ্টা না করলে জানব কী করে?
শেষ পর্যন্ত কয়েকজন রাজি হলেন।
শুরু হল নতুন কাজ।
কেউ বানাল মাটির পাখি।
কেউ বানাল ছোট ঘোড়া।
কেউ বানাল গাছের টব।
কেউ বানাল দেওয়ালে ঝোলানোর মুখোশ।
আর মেঘলা প্রত্যেকটির সঙ্গে ছোট্ট কাগজে লিখে দিতে লাগল—
‘শিমুলডাঙার মাটি থেকে তৈরি।’
কয়েক সপ্তাহ পরে গ্রামের স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল।
মেঘলা প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলল,
—স্যার, আমরা মাটির জিনিসের একটা স্টল করতে চাই।
প্রধান শিক্ষক রাজি হলেন।
অনুষ্ঠানের দিন স্কুলের মাঠে যখন স্টল বসানো হল, তখন কেউ ভাবেনি এত মানুষ সেখানে ভিড় করবে।
একজন শহর থেকে আসা মহিলা একটা মাটির ফুলদানি হাতে নিয়ে বললেন,
—এটা কে বানিয়েছে?
মেঘলা বলল,
—আমাদের গ্রামের মানুষ।
—অনলাইনে বিক্রি করেন?
মেঘলা মাথা নাড়ল।
—না।
মহিলা বললেন,
—করা উচিত। খুব সুন্দর জিনিস।
সেদিন অনেক জিনিস বিক্রি হল।
হরনাথ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখলেন, উঠোনে আবার মাটির জিনিস সাজানো হচ্ছে।
কিন্তু এবার সেগুলো বিক্রি করার জন্য নয়।
পরের দিনের অর্ডারের জন্য।
তিনি চুপ করে বসে রইলেন।
মেঘলা এসে বলল,
—কী হল?
হরনাথ বললেন,
—একটা কথা বলব?
—বলো।
—তুই আমার কাজটা বাঁচাসনি।
—তাহলে?
হরনাথ মাটির একটা দলা হাতে নিয়ে বললেন,
—তুই আমাদের গ্রামের একটা নাম বাঁচিয়েছিস।
মেঘলা হেসে বলল,
—নাম আবার মাটিতে থাকে নাকি?
হরনাথ বললেন,
—থাকে।
তারপর মাটির দলাটা মেঘলার হাতে দিয়ে বললেন,
—মানুষ চলে যায়। বাড়ি ভেঙে যায়। বাজার বদলে যায়। কিন্তু মানুষ যদি তার নিজের মাটিকে মনে রাখে, তাহলে তার নাম কখনও পুরোপুরি হারায় না।
মেঘলা মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হল, এই সাধারণ মাটির মধ্যে সত্যিই যেন একটা গল্প লুকিয়ে আছে।
এক বছর পর শিমুলডাঙায় একটা ছোট্ট মাটির শিল্পকেন্দ্র তৈরি হল।
সেখানে গ্রামের কুমোররা কাজ করতেন। স্কুলের ছেলেমেয়েরা এসে শিখত। শহর থেকে মানুষ আসত জিনিস কিনতে।
দরজার ওপরে মাটির ফলকে লেখা ছিল—
‘মাটির গন্ধে নিজের নাম খুঁজে নাও।’
নিচে ছোট করে লেখা—
‘প্রতিষ্ঠাতা: হরনাথ পাল
সহযোগী: শিমুলডাঙার মানুষ
প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা: মেঘলা।’
হরনাথ সেই ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন।
একদিন মেঘলা বলল,
—দাদু, আমার নাম এত বড় করে লিখেছ কেন?
হরনাথ হেসে বললেন,
—কারণ তুই আমাকে শিখিয়েছিস, পুরোনো জিনিসকে বাঁচাতে হলে শুধু তাকে আঁকড়ে ধরে থাকলে হয় না। তাকে নতুন করে ভালোবাসতে হয়।
মেঘলা মাটির চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
—আর তুমি আমাকে শিখিয়েছ, মাটিকে যতবার আকার দাও, ততবার নতুন কিছু জন্ম নিতে পারে।
চাকা ঘুরছিল।
মাটি ঘুরছিল।
আর শিমুলডাঙার বাতাসে ভেসে আসছিল ভেজা মাটির সেই চেনা গন্ধ।
যে গন্ধে লুকিয়ে ছিল একটি পরিবারের ইতিহাস, একটি গ্রামের পরিচয়, আর একটি ছোট্ট মেয়ের বড় হয়ে ওঠার গল্প।