১. রাত ১২টা ১৭ মিনিট
রাতের শেষ ট্রেনটা যখন শালবনপুর স্টেশনে ঢুকল, তখন প্ল্যাটফর্মে মাত্র চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন বৃদ্ধ চা-ওয়ালা, দু’জন রেলকর্মী আর স্টেশনের বুকিং ক্লার্ক অমলবাবু। শীতের শেষ দিকের রাত। চারপাশে হালকা কুয়াশা। দূরের সিগন্যালের লাল আলোটা কুয়াশার মধ্যে জ্বলজ্বল করছিল।
ট্রেনটির নাম ছিল নীলাচল লোকাল। প্রতিদিন রাত ১২টা ১৭ মিনিটে এটি শালবনপুর স্টেশনে পৌঁছত। তারপর কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে আবার রামপুর জংশনের দিকে চলে যেত।
সেদিনও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত।
ট্রেনটি থামতেই শেষ কামরার দরজা থেকে এক যুবক নেমে এল। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। পরনে কালো জ্যাকেট, কাঁধে বাদামি ব্যাগ। মুখে কয়েক দিনের দাড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক ক্লান্ত।
যুবকটি প্ল্যাটফর্মে পা রেখেই চারদিকে তাকাল।
তারপর সোজা স্টেশনমাস্টারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
“আপনি কি অমলবাবু?”
অমলবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
“হ্যাঁ। আপনি?”
“আমার নাম অরিন্দম রায়। আমি কলকাতা থেকে এসেছি।”
“এত রাতে? কিছু দরকার?”
অরিন্দম ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।
ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। লম্বা চুল, কপালে ছোট্ট কালো টিপ, চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
অমলবাবু ছবিটি দেখেই স্থির হয়ে গেলেন।
তাঁর হাত থেকে কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।
“এই ছবি আপনি কোথায় পেলেন?”
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, “আমার দিদি। নাম নন্দিতা রায়। সাত বছর আগে এই স্টেশন থেকে নিখোঁজ হয়েছিল।”
অমলবাবু কোনও উত্তর দিলেন না।
“পুলিশ বলেছিল, দিদি হয়তো ট্রেনে কোথাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সাত বছর ধরে আমি তাকে খুঁজছি।”
অরিন্দম ছবিটি টেবিলে রাখল।
“তিন দিন আগে আমার বাড়িতে একটি চিঠি এসেছে। চিঠিতে লেখা—নন্দিতা এই স্টেশন ছেড়ে কখনও যায়নি।”
বাইরে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা এল। স্টেশনমাস্টারের ঘরের জানলা কেঁপে উঠল।
অমলবাবু ফিসফিস করে বললেন, “আপনি চলে যান।”
অরিন্দম অবাক হয়ে তাকাল।
“কী বললেন?”
“আমি কিছু জানি না। এই ব্যাপারে আমাকে আর প্রশ্ন করবেন না।”
“কিন্তু আপনি ছবিটা দেখেই চিনেছেন!”
অমলবাবু উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি বলেছি, চলে যান!”
ঠিক সেই সময় স্টেশনের মাইক্রোফোনে কর্কশ শব্দ হলো। তারপর একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল।
“যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে, ১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যে ছেড়ে যাবে।”
অরিন্দম চমকে উঠল।
শালবনপুর স্টেশনে মাত্র তিনটি প্ল্যাটফর্ম।
১৩ নম্বর প্ল্যাটফর্ম বলে কিছু নেই।
কণ্ঠটি আবার শোনা গেল।
“অরিন্দম রায়, আপনার দিদি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। শেষ কামরায় উঠে পড়ুন।”
অরিন্দমের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
স্টেশনমাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে সে প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটল।
নীলাচল লোকাল তখনও দাঁড়িয়ে আছে। কামরাগুলোর অধিকাংশ আলো নিভে গেছে। কিন্তু শেষ কামরার একটি জানলায় হলুদ আলো জ্বলছে।
জানলার পাশে একজন মহিলা বসে আছেন।
লম্বা চুল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ।
নন্দিতা।
অরিন্দমের মনে হলো, তার পা দুটো মাটিতে আটকে গেছে।
সাত বছর ধরে যে মুখটি সে শুধু ছবিতে দেখেছে, সেই মুখ আজ তার সামনে।
মহিলাটি ধীরে জানলার দিকে মুখ ফেরালেন।
তারপর ঠোঁট নাড়লেন।
অরিন্দম স্পষ্ট বুঝতে পারল, তিনি বলছেন—
“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”
পরের মুহূর্তেই ট্রেনের সব আলো নিভে গেল।
২. সাত বছর আগের সেই রাত
অরিন্দমের মনে পড়ল সেই রাতের কথা।
তখন তার বয়স তেইশ। নন্দিতা ছিল তার একমাত্র দিদি। বাবা-মা দু’জনেই মারা গিয়েছিলেন বহু বছর আগে। ছোটবেলা থেকে দিদিই তাকে আগলে রেখেছিল।
নন্দিতা একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের কাজ করত। কাজের প্রতি তার অদ্ভুত নিষ্ঠা ছিল। রাতের ডিউটি শেষ করেও অসুস্থ রোগীদের পাশে বসে থাকত।
কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার কয়েক মাস আগে থেকে তার আচরণ বদলে গিয়েছিল।
সে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা পরীক্ষা করত। বাড়ির ফোন বাজলেই ভয় পেত। একদিন অরিন্দম দেখেছিল, দিদি পুরোনো কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলছে।
“কী পুড়িয়ে ফেলছ?”
নন্দিতা চমকে উঠে বলেছিল, “কিছু না।”
“আমার কাছেও লুকোবে?”
দিদি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “অরিন্দম, কখনও যদি আমি হঠাৎ চলে যাই, আমাকে খুঁজতে যাবি না।”
অরিন্দম হেসেছিল।
“তুমি কি সিনেমার নায়িকা? হঠাৎ চলে যাবে কেন?”
নন্দিতা হাসেনি।
“কিছু মানুষ আছে, যাদের কাছ থেকে দূরে থাকা যায় না। আবার কাছে থাকাও বিপজ্জনক।”
অরিন্দম তখন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।
সাত বছর আগে, এক নভেম্বরের রাতে নন্দিতা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। বলেছিল, হাসপাতালে অতিরিক্ত ডিউটি আছে। তারপর আর ফেরেনি।
তার মোবাইল বন্ধ। হাসপাতাল জানিয়েছিল, সে সেদিন ডিউটিতে যোগ দেয়নি। শালবনপুর স্টেশনের একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাকে রাতের শেষ ট্রেনে উঠতে দেখা গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করেছিল।
কিন্তু সেই ফুটেজের কোনও কপি অরিন্দমকে দেওয়া হয়নি।
পুলিশের তদন্ত কয়েক মাস চলেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ফাইল বন্ধ হয়ে যায়।
অরিন্দম থামেনি।
সে হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে, পুরোনো সহকর্মীদের খুঁজেছে, নন্দিতার বন্ধুদের বাড়িতে গিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকের উত্তর ছিল আলাদা, আর প্রত্যেক উত্তরেই যেন কোনও একটা অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নন্দিতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নিখোঁজ হওয়ার পরেও কয়েকবার টাকা জমা পড়েছিল।
প্রতিবার টাকা জমা পড়েছে রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।
প্রতিবার জমার উৎস ছিল—শালবনপুর রেলওয়ে বুকিং অফিস।
অরিন্দম এই তথ্য পুলিশকে জানিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, প্রযুক্তিগত ভুল।
কিন্তু একই ভুল সাত বছর ধরে চলতে পারে না।
তিন দিন আগে আসা চিঠিটি সেই কারণেই তাকে শালবনপুরে টেনে এনেছে।
চিঠিতে লেখা ছিল—
‘যদি সত্য জানতে চাও, ১৩ অক্টোবর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে শালবনপুর স্টেশনে এসো। শেষ ট্রেনটি চলে যাওয়ার আগে তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
— নন্দিতা।’
আজ ১৩ অক্টোবর।
আর কয়েক মিনিট আগেই সে তার দিদিকে ট্রেনের জানলায় দেখেছে।
৩. বন্ধ কামরার ভিতরে
ট্রেনটি হঠাৎ কেঁপে উঠল।
অরিন্দম প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দেখল, শেষ কামরার দরজা নিজে থেকেই খুলে গেছে।
ভিতরে কেউ নেই।
সে এক পা এগিয়ে গেল।
তার মনে পড়ল দিদির সতর্কবাণী—“ভাই, ট্রেনে উঠিস না।”
কিন্তু সাত বছর ধরে সে যে উত্তর খুঁজছে, তা যদি এই ট্রেনের ভিতরেই থাকে?
অরিন্দম দরজার কাছে পৌঁছতেই পেছন থেকে কেউ তার হাত চেপে ধরল।
“উঠবেন না!”
সে ঘুরে দাঁড়াল।
একজন তরুণী। বয়স আটাশ-তিরিশ। পরনে রেলওয়ের কর্মীদের মতো নীল পোশাক। গলায় পরিচয়পত্র, কিন্তু তার ওপর কোনও নাম লেখা নেই।
“আপনি কে?” অরিন্দম জিজ্ঞাসা করল।
“আমার নাম মেঘলা দত্ত। আমি এই স্টেশনে কাজ করি।”
“তাহলে ট্রেনে উঠতে বাধা দিচ্ছেন কেন?”
মেঘলা শেষ কামরার দিকে তাকাল।
“কারণ, যে ট্রেনে আপনার দিদিকে দেখেছেন, সেটি আজ প্রথমবার আসেনি।”
“মানে?”
“প্রতি বছর এই তারিখে আসে। ঠিক রাত ১২টা ১৭ মিনিটে। আর প্রত্যেকবার কেউ না কেউ শেষ কামরায় নিজের পরিচিত মানুষকে দেখতে পায়।”
অরিন্দমের মুখ শুকিয়ে গেল।
“তারপর?”
“কেউ ট্রেনে ওঠে না। যারা ওঠে, তারা আর ফিরে আসে না—এমন কথা প্রচলিত আছে।”
“এটা কি কুসংস্কার?”
“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সাত বছর আগে এই ট্রেনে আমার বাবাও উঠেছিলেন।”
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আপনার বাবাও নিখোঁজ?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“তিনি ছিলেন এই স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি আমাকে একটি কথা বলেছিলেন—কোনও দিন যদি রাতের শেষ ট্রেনটি এসে দাঁড়ায়, তার যাত্রীদের মুখের দিকে তাকাবে না।”
“কেন?”
“কারণ তাদের মধ্যে এমন মানুষও থাকতে পারে, যারা অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।”
দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।
মেঘলা অরিন্দমের হাত আরও শক্ত করে ধরল।
“এখন আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।”
ঠিক তখনই শেষ কামরার জানলায় আবার নন্দিতাকে দেখা গেল।
এবার তার পাশে আরও একজন বসে আছেন।
একজন বৃদ্ধ।
মেঘলা বৃদ্ধটিকে দেখেই হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
“বাবা…”
বৃদ্ধ ধীরে মাথা তুললেন। জানলার কাচের ওপার থেকে তাঁর চোখ সরাসরি মেয়ের দিকে।
তারপর তিনি হাত তুলে জানলার কাচে তিনবার আঘাত করলেন।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
মেঘলা কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল।
“এটা হতে পারে না। বাবা তো সাত বছর আগেই মারা গেছেন!”
অরিন্দম তার দিকে তাকাল।
“আপনি বলেছিলেন, তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের বাড়িতে তাঁর মৃত্যুসনদ এসেছে। নদীর ধারে একটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, সেটি বাবার। কিন্তু আমি কখনও মুখ দেখিনি।”
ট্রেনের ভিতর থেকে এবার একটি শিশুর কান্না ভেসে এল।
তারপর মাইক্রোফোনে সেই নারীকণ্ঠ—
“যাত্রীরা সাবধান। যাঁরা জীবিত, তাঁরা যেন মৃতদের সঙ্গে যাত্রা না করেন।”
অরিন্দমের মনে হলো, মাটির নীচ থেকে যেন ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে।
ট্রেনের দরজা বন্ধ হতে শুরু করল।
মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “এবার আর কোনও উপায় নেই।”
অরিন্দম তার দিকে তাকাল।
“কী উপায়?”
মেঘলা পকেট থেকে একটি ছোট চাবি বের করল।
“ট্রেন চলে যাওয়ার আগে আমাদের স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরে যেতে হবে। আমার বাবা সেখানে কিছু রেখে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শেষ ট্রেনের রহস্য বুঝতে হলে প্রথমে সেই ঘরের দরজা খুলতে হবে।”
৪. সিগন্যাল ঘরের নীচে
স্টেশনের পুরোনো সিগন্যাল ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ার পর সেটি আর ব্যবহার করা হয় না। ভবনটির চারদিকে আগাছা, দেওয়ালে শ্যাওলা, জানলায় ধুলো জমে আছে।
মেঘলা তালায় চাবি ঢোকাল।
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে পুরোনো কাগজ ও স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ বেরিয়ে এল।
ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল লোহার যন্ত্র। দেওয়ালে কয়েকটি পুরোনো ঘড়ি। তার নীচে একটি কাঠের টেবিল, যার ওপর ধুলো জমে আছে।
মেঘলা টেবিলের ড্রয়ার খুলল।
ভিতরে একটি চিঠি।
‘মেঘলা,
যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তার মানে শেষ ট্রেন আবার এসেছে।
আমি জানি, তুমি তোমার বাবাকে খুঁজবে। কিন্তু মনে রেখো, এই রহস্যের সঙ্গে শুধু আমার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জড়িত নয়। সাত বছর আগে যে রাতে নন্দিতা রায় নিখোঁজ হয়েছিল, সেই রাতেই স্টেশনের পুরোনো রেকর্ড থেকে একটি ট্রেনের নাম মুছে ফেলা হয়।
ট্রেনটির নম্বর ছিল ১৩০৭।
সরকারি সময়সূচিতে এই ট্রেনের কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু পুরোনো সিগন্যাল রেজিস্টারে তার উল্লেখ রয়েছে।
রাত ১২টা ১৭ মিনিটে যে ট্রেনটি আসে, সেটি নীলাচল লোকাল নয়।
এটি এমন একটি ট্রেন, যার যাত্রা কখনও নথিভুক্ত হয়নি।
এর শেষ কামরায় যে মানুষদের দেখা যায়, তারা সবাই কোনও না কোনও অসমাপ্ত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।
তাদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ, কেউ মৃত বলে ঘোষিত, আবার কেউ এমন মানুষ, যাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর কোনও দিন প্রকাশিতই হয়নি।
এই ট্রেন কোথা থেকে আসে, আমি জানি না।
কিন্তু আমি জানি, একে থামানোর চেষ্টা করলে আরও মানুষ হারিয়ে যাবে।
— তোমার বাবা।’
মেঘলা চিঠিটি পড়ে কেঁপে উঠল।
অরিন্দম বলল, “আপনার বাবা কি সত্যিই এই চিঠি লিখেছিলেন?”
“হাতের লেখা তাঁরই।”
“তাহলে তিনি জানতেন, এই ট্রেন আসবে।”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“কিন্তু তিনি জানতেন না, কেন আসে।”
অরিন্দম ঘরের চারদিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মেঝের একটি অংশে। অন্য অংশের তুলনায় সেখানে ধুলো কম।
সে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে মেঝেতে চাপ দিল।
একটি কাঠের পাত নড়ে উঠল।
পাতটি সরাতেই নীচে সিঁড়ি দেখা গেল।
অন্ধকারে নেমে গেছে সরু সিঁড়ি।
মেঘলা পিছিয়ে গেল।
“এখানে তো কোনও ঘর থাকার কথা নয়!”
অরিন্দম মোবাইলের আলো জ্বালল।
“আপনার বাবা এই পথের কথা জানতেন?”
“না।”
দু’জন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল।
নিচে ছোট একটি ঘর। দেওয়ালে পুরোনো মানচিত্র। টেবিলের ওপর কয়েকটি রেলওয়ে রেজিস্টার। এক কোণে ধাতব আলমারি।
অরিন্দম একটি রেজিস্টার খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
১৩০৭ — বিশেষ যাত্রী পরিবহণ।
পরের পাতায় যাত্রীদের নাম।
তারিখ: ১৩ অক্টোবর, সাত বছর আগে।
যাত্রী নম্বর ১: নন্দিতা রায়।
যাত্রী নম্বর ২: দেবব্রত দত্ত।
যাত্রী নম্বর ৩: অজ্ঞাতপরিচয় নারী।
যাত্রী নম্বর ৪: অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।
অরিন্দমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“মেঘলা, দেবব্রত দত্ত কি আপনার বাবার পুরো নাম?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
অরিন্দম পরের পাতাটি উল্টাল।
সেখানে লাল কালিতে একটি বাক্য লেখা।
‘যাত্রীদের কেউই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাননি।’
তার নীচে আরও একটি লাইন—
‘পরবর্তী যাত্রার তারিখ: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।’
অরিন্দম ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ১২টা ৩৬ মিনিট।
ট্রেন চলে যাওয়ার কথা ছিল অনেক আগেই।
কিন্তু ওপরের প্ল্যাটফর্ম থেকে এখনও ট্রেনের শব্দ আসছে।
তারপরই ঘরের পুরোনো টেলিফোনটি বেজে উঠল।
রিং।
রিং।
রিং।
মেঘলা ভয়ে স্থির হয়ে গেল।
অরিন্দম রিসিভার তুলল।
ওপাশ থেকে একটি নারীকণ্ঠ বলল—
“অরিন্দম, তুমি এখনও নীচে আছ?”
“কে বলছেন?”
“আমি নন্দিতা।”
অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল।
“দিদি! তুমি কোথায়?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নন্দিতা বলল—
“তুমি যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছ, সেই ঘরটা সাত বছর আগে তৈরি হয়নি।”
“মানে?”
“এই ঘর তৈরি হয়েছিল অনেক আগে। আর এই ঘরে শেষবার যে মানুষটি এসেছিলেন, তিনি তোমার বাবা।”
অরিন্দম হতবাক।
“আমাদের বাবা তো ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছিলেন!”
ওপাশে নন্দিতার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“তোমাকে সেটাই বলা হয়েছিল। কিন্তু অরিন্দম, তোমার বাবা মারা যাননি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের পিছনের দেওয়ালে একটি লোহার দরজা খুলে গেল।
দরজার ওপারে অন্ধকার সুড়ঙ্গ।
সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে ভেসে এল ট্রেনের চাকার শব্দ।
আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে একটি পুরুষকণ্ঠ—
“অরিন্দম, বাড়ি ফিরে যা।”
অরিন্দমের হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভার পড়ে গেল।
কারণ, সেই কণ্ঠ সে চিনতে পেরেছে।
সাত বছর নয়, তারও বহু আগে শৈশবের স্মৃতিতে সে এই কণ্ঠ শুনেছিল।
এটি তার বাবার কণ্ঠ।
চলবে…