শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি অদ্ভুত বাড়ি। বাড়িটির মালিক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অমিয় সেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একাই থাকতেন। বাড়িটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার দরজা সব সময় পরিচিত মানুষদের জন্য খোলা থাকত।
অমিয়বাবুর একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। কেউ তাঁর বাড়িতে এলে তাঁকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হত—“আজ তুমি কি কোনও মিথ্যে কথা বলেছ?”
প্রশ্নটি শুনে অনেকেই অস্বস্তিতে পড়তেন। কেউ হেসে উড়িয়ে দিতেন, কেউ বলতেন, “এত ছোটখাটো মিথ্যে আবার মনে রাখে কে?”
অমিয়বাবু শান্তভাবে উত্তর দিতেন, “মিথ্যে ছোট না বড়, সেটা পরে বিচার করা যাবে। আগে স্বীকার করতে শেখো।”
একদিন তাঁর বাড়িতে এলেন পাশের পাড়ার কলেজপড়ুয়া সৌরভ। সে খুব আত্মবিশ্বাসী ছেলে। বন্ধুদের মধ্যে তার পরিচয় ছিল—সে কখনও হার মানে না, কখনও ভুল স্বীকার করে না।
অমিয়বাবুর প্রশ্ন শুনে সে হেসে বলল, “না, আমি মিথ্যে বলি না।”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না। শুধু তাকে বসতে দিলেন।
চা খেতে খেতে সৌরভ জানতে পারল, অমিয়বাবু একসময় কলেজে দর্শন পড়াতেন। অবসরের পর তিনি তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসেন, বিশেষ করে যারা নিজেদের জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় থাকে।
সৌরভ সেদিন নিজের সাফল্যের গল্প করল। কলেজে সে ভালো ফল করেছে, বিতর্কে পুরস্কার পেয়েছে, বন্ধুমহলে সবাই তাকে সম্মান করে।
অমিয়বাবু মন দিয়ে শুনলেন। তারপর শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি কখনও কাউকে নিজের ভুলের জন্য দোষী করেছ?”
সৌরভ একটু থেমে বলল, “সবাই তো করে।”
“আমি সবার কথা জিজ্ঞাসা করিনি,” বৃদ্ধ বললেন। “তোমার কথা জানতে চেয়েছি।”
সৌরভের মুখটা শক্ত হয়ে গেল। সে প্রসঙ্গ বদলে বাড়ি থেকে চলে এল।
কয়েক দিন পর কলেজে একটি সমস্যা দেখা দিল। একটি দলগত প্রকল্পে সৌরভের দায়িত্ব ছিল তথ্য সংগ্রহ করা। সে কাজটি ঠিকমতো করেনি। জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসতেই সে দলের অন্য সদস্যদের বলেছিল, তথ্যগুলো সম্পূর্ণ। কিন্তু শিক্ষক কাজ পরীক্ষা করতে গিয়ে ভুল ধরলেন। পুরো দল নম্বর হারানোর আশঙ্কায় পড়ল।
বন্ধু অনির্বাণ রেগে বলল, “তুই আগে সত্যিটা বললে আমরা অন্য ব্যবস্থা করতে পারতাম। এখন সবাই বিপদে পড়েছি।”
সৌরভ প্রথমে বলতে চাইল, অন্যদেরও দোষ আছে। কিন্তু কথাটা মুখে আসতেই তার মনে পড়ল অমিয়বাবুর প্রশ্ন।
সেদিন রাতে সে দীর্ঘক্ষণ নিজের ঘরে বসে রইল। অবশেষে দলের সবাইকে ফোন করে স্বীকার করল, কাজটি সে ঠিকমতো করেনি এবং মিথ্যে বলে ভুল ঢাকতে চেয়েছিল।
বন্ধুরা প্রথমে রেগে গেলেও পরে একসঙ্গে বসে কাজটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল। তারা শিক্ষককে সত্যিটা জানাল। নম্বর কিছু কম পেল, কিন্তু প্রকল্পটি জমা দিতে পারল।
পরদিন সৌরভ আবার অমিয়বাবুর বাড়িতে গেল।
“স্যার, আমি মিথ্যে বলেছিলাম,” সে বলল। “ভেবেছিলাম, ভুল স্বীকার করলে সবাই আমাকে ছোট ভাববে। কিন্তু লুকোতে গিয়ে আরও বড় সমস্যা তৈরি করেছি।”
অমিয়বাবু চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, “ভুল করা মানুষের স্বভাব। কিন্তু ভুলকে আড়াল করতে গিয়ে আমরা নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে যাই।”
সৌরভ জিজ্ঞাসা করল, “তাহলে কি সব সময় সব কথা সবাইকে বলে দিতে হবে?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। “সততা মানে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সব কথা সবাইকে জানানো নয়। সততা মানে যেখানে তোমার কথা বা কাজের দায়িত্ব আছে, সেখানে ইচ্ছা করে কাউকে ভুল পথে চালিত না করা। আর ভুল হলে তা শুধরে নেওয়ার সাহস রাখা।”
সৌরভ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
বাড়ি ফেরার সময় অমিয়বাবু তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। দরজার পাশে ছোট একটি কাঠের ফলকে লেখা ছিল—
‘সত্য কথা বলার সাহসের চেয়েও বড় সাহস হলো, নিজের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো।’
সৌরভ সেই বাক্যটি পড়ে থামল। তার মনে হল, এত দিন সে অন্যদের কাছে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছে, অথচ নিজের দুর্বলতাগুলোকে চিনতেই চায়নি।
এরপর থেকে সে কখনও ভুল করেনি, এমন নয়। কিন্তু ভুল হলে অজুহাত দেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করত—সে কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করছে, নাকি শুধু নিজের সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছে?
বছর কয়েক পরে সৌরভ একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করল। সেখানে একদিন তার অধীনে কাজ করা নতুন কর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব ভুল করে ফেলল। ভয়ে ছেলেটি বিষয়টি লুকোতে চাইছিল।
সৌরভ তাকে বকাঝকা না করে বলল, “ভুলটা এখনই জানালে আমরা ঠিক করার সুযোগ পাব। কিন্তু লুকিয়ে রাখলে সমস্যা বাড়বে। সত্যি বলার জন্য তোমাকে শাস্তি দেওয়া হবে না; বরং আমরা একসঙ্গে সমাধান খুঁজব।”
ছেলেটির মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
সৌরভ সেদিন বুঝল, অমিয়বাবুর বাড়িতে শেখা শিক্ষাটি শুধু নিজের জীবনের জন্য নয়। অন্যদেরও এমন পরিবেশ দেওয়া জরুরি, যেখানে মানুষ ভুল স্বীকার করতে ভয় পায় না।
শিক্ষা: সততা মানে কখনও ভুল না করা নয়; নিজের ভুল স্বীকার করে তার দায় নেওয়া এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করাই প্রকৃত সততা।