Categories
অনুগল্প বিবিধ

রাত বারোটার রান্নাঘর।।

কলকাতার এক ব্যস্ত হাসপাতালের পিছনের গলিতে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান ছিল। দোকানটির নাম ‘রাতের হাঁড়ি’। দিনের বেলায় দোকানটি প্রায় বন্ধই থাকত, কিন্তু রাত দশটার পর তার আসল কাজ শুরু হত।

দোকানের মালিক ছিলেন পঞ্চান্ন বছরের শচীনবাবু। তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছেন অনেক দিন আগে। একমাত্র মেয়ে বিয়ের পর অন্য শহরে থাকে। তাই দোকানটাই ছিল তাঁর সংসার, আর রান্না ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ।

তবে শচীনবাবুর দোকানের একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর কেউ খাবার চাইলে তিনি তার কাছ থেকে টাকা নিতেন না।

প্রথম দিকে আশপাশের লোকজন ভেবেছিল, এটা হয়তো ব্যবসার প্রচারের কৌশল। কেউ কেউ ইচ্ছা করে রাত বারোটার পর এসে খাবার চাইত। কিন্তু শচীনবাবু কখনও কারও কাছে জানতে চাইতেন না, কেন সে এত রাতে এসেছে। চুপচাপ ভাত, ডাল আর তরকারি পরিবেশন করে দিতেন।

একদিন নতুন এক কর্মচারী, নাম বাবাই, দোকানে কাজে যোগ দিল। সে নিয়মটি শুনে অবাক হয়ে বলল, “কাকু, এভাবে বিনা পয়সায় খাবার দিলে আপনার লাভ হবে কী করে?”

শচীনবাবু হাঁড়ির ঢাকনা খুলতে খুলতে বললেন, “সব লাভ টাকার অঙ্কে মাপা যায় না রে।”

বাবাই কথাটা বুঝল না।

কয়েক দিন পর এক শীতের রাতে দোকানে এলেন এক মহিলা। তাঁর কোলে ছোট্ট শিশু। চোখেমুখে ক্লান্তি, কাপড়চোপড় এলোমেলো। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ইতস্তত করলেন।

শচীনবাবু তাঁকে বসতে বললেন।

মহিলা নিচু গলায় বললেন, “আমার কাছে টাকা নেই। বাচ্চাটা সারাদিন কিছু খায়নি। একটু ভাত পাওয়া যাবে?”

শচীনবাবু কোনও প্রশ্ন না করে খাবার গরম করতে শুরু করলেন। শিশুটির জন্য পাতলা খিচুড়ি বানিয়ে দিলেন, আর মহিলার সামনে রাখলেন গরম ভাত, ডাল ও আলুর তরকারি।

মহিলা খেতে খেতে কাঁদতে লাগলেন।

“কী হয়েছে?” বাবাই আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল।

মহিলা জানালেন, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সঙ্গে টাকা ছিল না। পরিচিত কেউ কাছাকাছি থাকেন না। শিশুটিকে নিয়ে কোথায় যাবেন, বুঝতে পারছিলেন না।

শচীনবাবু তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “খাওয়া শেষ করুন। তারপর আমরা এমন একটা ব্যবস্থা করব, যাতে আজ রাতে আপনারা নিরাপদে থাকতে পারেন।”

তিনি কাছের একটি মহিলা সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কর্মীরা এসে মহিলাকে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে মহিলা বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইলেন, কিন্তু শচীনবাবু শুধু বললেন, “আগে নিজের আর বাচ্চার যত্ন নিন।”

সেই রাতে বাবাই প্রথম বুঝল, রাত বারোটার রান্নাঘর শুধু খাবারের দোকান নয়।

তবু তার কৌতূহল কাটল না। একদিন সে শচীনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি এই নিয়ম শুরু করলেন কেন?”

শচীনবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর পুরোনো একটি ছবি বের করলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ মানুষ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে বসে আছেন আরেকজন, যাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ।

“ও আমার ছোট ভাই,” শচীনবাবু বললেন। “বহু বছর আগে ওর বড় একটা অস্ত্রোপচার হয়েছিল। আমি তখন কাজের খোঁজে অন্য শহরে। খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছেছিলাম, কিন্তু কয়েক রাত প্রায় কিছু না খেয়ে কাটাতে হয়েছিল। পকেটে টাকা ছিল না, বাড়ির লোকের কাছেও খবর পাঠাতে পারিনি। এক রাতে হাসপাতালের বাইরে এক অচেনা মানুষ আমাকে ভাত খাইয়েছিলেন। টাকা দিতে পারিনি বলে তিনি বলেছিলেন, ‘যেদিন পারবে, অন্য কাউকে খাইয়ো।’”

শচীনবাবু ছবিটা আবার ভাঁজ করলেন।

“সেই মানুষটির নামটাও আমি জানতে পারিনি। কিন্তু তাঁর দেওয়া খাবার আর কথাটা ভুলিনি। তাই দোকান খুলে ঠিক করেছিলাম, রাত বারোটার পর যে সত্যিই ক্ষুধার্ত অবস্থায় আসবে, তাকে খালি হাতে ফেরাব না।”

বাবাই ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

এরপর থেকে সে নিজেও রাতের রান্নাঘরের নিয়ম মেনে চলতে শুরু করল। কখনও খাবার প্যাকেট করত, কখনও পরিষ্কার থালা এগিয়ে দিত, কখনও ক্লান্ত মানুষটির পাশে বসে দুটো কথা বলত।

কয়েক মাস পরে দোকানের সামনে একটি ছোট বোর্ড লাগানো হল—

‘রাত বারোটার পর ক্ষুধার্ত হলে দরজায় কড়া নাড়ুন। সামর্থ্য থাকলে মূল্য দিন, না থাকলে নিশ্চিন্তে খেয়ে যান।’

বোর্ডটি দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়াতেন। কেউ চাল দিয়ে যেতেন, কেউ সবজি, কেউ সামান্য টাকা। শচীনবাবু কাউকে সাহায্য করতে বাধ্য করতেন না। শুধু বলতেন, “যতটুকু পারেন, ততটুকুই যথেষ্ট।”

এক বছর পর শচীনবাবুর শরীর খারাপ হল। চিকিৎসক তাঁকে বিশ্রাম নিতে বললেন। দোকান বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে বাবাই চিন্তায় পড়ল।

কিন্তু আশ্চর্যভাবে, আশপাশের কয়েকজন দোকানি এগিয়ে এলেন। কেউ রান্না করতে জানতেন, কেউ বাজার করতে, কেউ হিসাব রাখতে। তাঁরা মিলে ‘রাতের হাঁড়ি’ চালু রাখলেন।

শচীনবাবু এক সন্ধ্যায় দোকানের বাইরে বসে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর চোখে জল এসে গেল।

তিনি বুঝলেন, বহু বছর আগে এক অচেনা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক থালা ভাতের যাত্রা এখনও থামেনি।

কখনও কখনও পৃথিবীকে বদলাতে বড় কোনও ঘোষণা লাগে না। লাগে শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে একটি গরম থালা এগিয়ে দেওয়ার মতো ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত।

শিক্ষা: সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়ালে একটি ছোট ভালো কাজও বহু মানুষের জীবনে আশার আলো ছড়িয়ে দিতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *