Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে ছেলেটি প্রশ্ন করতে শিখেছিল।।

পলাশপুর গ্রামের স্কুলে অর্ণব নামে একটি ছেলে পড়ত। সে পড়াশোনায় খারাপ ছিল না, কিন্তু ক্লাসে কখনও প্রশ্ন করত না। শিক্ষক কোনও বিষয় বুঝিয়ে দিলে অন্যরা প্রশ্ন করত, নিজেদের সন্দেহ দূর করত। অর্ণব চুপচাপ খাতায় লিখে নিত, যদিও অনেক কিছুই তার কাছে পরিষ্কার হত না।

তার সহপাঠীরা ভাবত, অর্ণব খুব বুদ্ধিমান। কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্য রকম। সে ভয় পেত—প্রশ্ন করলে যদি সবাই হাসে! যদি শিক্ষক মনে করেন, সে কিছুই বোঝে না!

একদিন গণিতের ক্লাসে শিক্ষক সমীকরণ বোঝাচ্ছিলেন। অর্ণবের কিছুতেই হিসাবটা মিলছিল না। তবু সে হাত তুলল না। বাড়ি ফিরে বই খুলে বসে রইল, কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে পারল না।

পরদিন খাতা জমা দিতে গিয়ে শিক্ষক তার ভুলগুলো দেখলেন।

“অর্ণব, তুমি কোথায় আটকে গিয়েছিলে?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।

অর্ণব মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, বুঝতে পারিনি।”

“তাহলে ক্লাসে জিজ্ঞাসা করোনি কেন?”

ছেলেটি ইতস্তত করে বলল, “সবাই হাসবে ভেবেছিলাম।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ব্ল্যাকবোর্ডে বড় করে লিখলেন—‘আমি জানি না’।

তিনি বললেন, “এই কথাটা বলতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বরং না জেনেও জানার ভান করাটা শেখার পথে বড় বাধা।”

ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা চুপ করে শুনছিল।

শিক্ষক আরও বললেন, “আজ থেকে এই ক্লাসে যে সবচেয়ে ভালো প্রশ্ন করবে, তাকে আমি পুরস্কার দেব। তবে প্রশ্নের উত্তর জানা থাকতেই হবে, এমন নয়। প্রশ্নটি হতে হবে সত্যিকারের কৌতূহল থেকে করা।”

ক্লাসে হাসির রোল উঠল। কেউ বলল, “তাহলে তো অনেক পুরস্কার পাব!”

কিন্তু অর্ণবের মনে কথাগুলো গভীরভাবে দাগ কাটল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে নিজের চারপাশের জিনিস নিয়ে ভাবতে শুরু করল। আকাশ নীল কেন? গাছের পাতা সবুজ কেন? বৃষ্টির আগে বাতাসের গন্ধ বদলে যায় কেন? সব প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল না। সে একটি খাতায় প্রশ্নগুলো লিখে রাখল।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে প্রথম প্রশ্নটি করল—“স্যার, আকাশ নীল দেখায় কেন?”

কয়েকজন সহপাঠী মুচকি হাসল। অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিন্তু শিক্ষক হাসলেন না। তিনি সহজ ভাষায় আলো ও বায়ুমণ্ডলের কথা বোঝালেন।

অর্ণবের মনে হল, প্রশ্ন করার পর সে ছোট হয়ে যায়নি। বরং নতুন কিছু জানতে পেরেছে।

এরপর তার অভ্যাস বদলে গেল। কোনও বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে সে প্রশ্ন করত। বই পড়ার সময় নতুন শব্দ পেলে তার অর্থ খুঁজত। কখনও শিক্ষক উত্তর দিতেন, কখনও বলতেন, “এটা আমরা পরের ক্লাসে আলোচনা করব।” অর্ণব তখন নিজেই তথ্য খুঁজে দেখার চেষ্টা করত।

একদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল। ছাত্রছাত্রীদের এমন একটি প্রকল্প তৈরি করতে হবে, যা দৈনন্দিন জীবনের কোনও সমস্যা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

অর্ণব প্রথমে ভেবেছিল, সে পারবে না। কিন্তু তার প্রশ্নের খাতাটি খুলতেই একটি বিষয় চোখে পড়ল—গ্রামের স্কুলে গরমের দিনে পানীয় জল ঠান্ডা রাখার সহজ উপায় কী হতে পারে?

সে শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করল। তারপর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে মাটির পাত্র, ভেজা কাপড় ও বাতাসের সাহায্যে জল তুলনামূলক ঠান্ডা রাখার একটি ছোট পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করল। তারা বিভিন্ন সময়ে জলের তাপমাত্রা মেপে ফলাফল লিখে রাখল। সব পরীক্ষা সমান ফল দেয়নি, কিন্তু সেই ব্যর্থতাগুলো থেকেও তারা অনেক কিছু শিখল।

প্রদর্শনীর দিন বিচারকেরা তাদের প্রকল্প দেখে নানা প্রশ্ন করলেন। অর্ণব এবার ভয় পেল না। যে প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল, সে ব্যাখ্যা করল। আর যে উত্তর জানা ছিল না, সেখানে সোজাসুজি বলল, “এটা আমরা এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব।”

বিচারকদের একজন হেসে বললেন, “নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারাও বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।”

অর্ণবদের প্রকল্প প্রথম পুরস্কার পায়নি। কিন্তু তারা বিশেষ প্রশংসা পেয়েছিল নিজেদের পর্যবেক্ষণ ও সৎভাবে ফলাফল জানানোর জন্য।

বাড়ি ফিরে অর্ণব খাতার শেষ পাতায় লিখল—

‘প্রশ্ন করলে সব সময় উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন না করলে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার পথটাই বন্ধ হয়ে যায়।’

বহু বছর পরে অর্ণব যখন একজন বিজ্ঞানশিক্ষক হল, তখন তার শ্রেণিকক্ষে একটি নিয়ম ছিল—কোনও প্রশ্নকে হাসির বিষয় করা যাবে না। কারণ সে জানত, কখনও কখনও একটি ছোট প্রশ্নই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দরজা খুলে দেয়।

শিক্ষা: না জানার কথা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়। কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তর খোঁজার ধৈর্যই প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *