১. রাত ১১টা ৪৭
শীতের রাত। ছোট্ট রেলস্টেশনটির নাম শালবনি রোড। দিনের বেলাতেও সেখানে খুব বেশি লোকজন থাকে না, আর রাত নামলে স্টেশনটি যেন পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
প্ল্যাটফর্মের এক প্রান্তে একটি হলুদ বাতি অনিয়মিতভাবে জ্বলছে। স্টেশনমাস্টারের ঘরের সামনে পুরোনো দেয়ালঘড়িটা আটকে আছে রাত এগারোটা সাতচল্লিশ মিনিটে। রেললাইনের ওপারে বিস্তীর্ণ ধানখেত। তার পরেই শাল, পিয়াল আর সেগুনের ঘন জঙ্গল।
স্টেশনের শেষ ট্রেনটি রাত বারোটা দশে আসে। ট্রেনটির নাম কেউ জানে না, কারণ রেলওয়ের সময়সূচিতে ওই ট্রেনের কোনও উল্লেখ নেই। অথচ গত পনেরো বছর ধরে শালবনি রোডের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করে আসছেন, প্রতি অমাবস্যার রাতে ট্রেনটি আসে।
ট্রেনটিতে ওঠা যায়।
কিন্তু নামা যায় না।
এই গল্পটা প্রথম শুনেছিল অর্ক সেন। কলকাতার একটি সংবাদপত্রে কাজ করা ছাব্বিশ বছরের সাংবাদিক। ভূতপ্রেতের গল্পে তার বিশ্বাস ছিল না। মানুষের ভয়, গুজব আর অপরাধের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখতেই সে বেশি আগ্রহী ছিল।
একদিন অফিসে বসে পুরোনো সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘাঁটতে গিয়ে সে একটি খবর পায়।
শিরোনাম ছিল—‘রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ কলেজছাত্রী, সাত বছরেও সন্ধান নেই।’
নিখোঁজ মেয়েটির নাম মেঘলা রায়। বয়স তখন একুশ। শালবনি রোড স্টেশন থেকে শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর আচমকা আলো নিভে যায়। আলো ফিরে এলে মেয়েটি উধাও।
পুলিশ প্রথমে অপহরণের সন্দেহ করেছিল। পরে তদন্তে কোনও সূত্র না মেলায় মামলাটি ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু অর্ককে আকৃষ্ট করেছিল খবরটির নিচে থাকা একটি ছোট্ট বাক্য।
একজন রেলকর্মী নাকি বলেছিলেন, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে মেঘলা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল—
“শেষ ট্রেনটা কি মৃত মানুষদেরও বাড়ি পৌঁছে দেয়?”
অর্ক খবরটির কাটিং নিয়ে বসেছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
‘মেঘলাকে খুঁজতে চাইলে আজ রাতেই শালবনি রোডে এসো। বারোটা দশের ট্রেন মিস কোরো না।’
বার্তার শেষে আরেকটি লাইন।
‘তবে মনে রেখো, ট্রেনের মধ্যে নিজের নাম শুনলে উত্তর দেবে না।’
অর্ক প্রথমে ভেবেছিল, কোনও পাঠক তাকে বোকা বানাচ্ছে। তবু বার্তাটি মুছে ফেলল না।
রাতেই সে শালবনি রোডের উদ্দেশে রওনা দিল।
২. স্টেশনমাস্টারের সতর্কবাণী
রাত এগারোটা কুড়ি।
স্টেশনে পৌঁছে অর্ক দেখল, টিকিট কাউন্টার বন্ধ। প্ল্যাটফর্মে এক বৃদ্ধ চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। স্টেশনমাস্টারের ঘরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে।
অর্ক দরজায় টোকা দিল।
ভেতর থেকে গম্ভীর গলা শোনা গেল, “কে?”
“আমি কলকাতা থেকে এসেছি। একটা পুরোনো নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে খোঁজ করছি।”
দরজা খুললেন প্রায় ষাট বছরের এক ব্যক্তি। পরনে ধূসর সোয়েটার, চোখে মোটা কাচের চশমা।
“নাম?”
“অর্ক সেন।”
লোকটি নাম শুনে অদ্ভুতভাবে তাকালেন।
“তোমার আসার কথা ছিল না।”
অর্ক চমকে উঠল।
“আপনি আমাকে চেনেন?”
“না। কিন্তু তোমার নামটা শুনেছি।”
“কার কাছে?”
লোকটি কোনও উত্তর দিলেন না। ঘরের মধ্যে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা রেজিস্টার বন্ধ করে দিলেন।
“আমি হরিপদ দত্ত। এই স্টেশনের স্টেশনমাস্টার। কী জানতে চাও?”
অর্ক মেঘলা রায়ের ছবিটি বের করল।
ছবিটি দেখে হরিপদের মুখের রং বদলে গেল।
“এটা কোথায় পেলে?”
“পুরোনো সংবাদপত্রে। মেয়েটি সাত বছর আগে এখান থেকে নিখোঁজ হয়েছিল।”
হরিপদ দীর্ঘক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ও নিখোঁজ হয়নি।”
“তাহলে?”
“ও ট্রেনে উঠেছিল।”
“কোন ট্রেনে?”
হরিপদ জানালার বাইরে তাকালেন। দূরে রেললাইনের ওপর কুয়াশা জমতে শুরু করেছে।
“যে ট্রেনের কোনও সময়সূচি নেই।”
অর্ক হেসে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, একটা ভূতের ট্রেন এসে মেয়েটিকে নিয়ে গেছে?”
“আমি কী বলছি, সেটা বড় কথা নয়। তুমি কী দেখবে, সেটাই বড় কথা।”
হরিপদ টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো টিকিট বের করলেন। কাগজটি হলদে হয়ে গেছে। তাতে কোনও গন্তব্যের নাম নেই। শুধু একটি তারিখ এবং সময় লেখা।
১৫ অক্টোবর, রাত ১২টা ১০।
অর্ক টিকিটটি হাতে নিতেই তার শরীরের মধ্যে অদ্ভুত একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
তারিখটি আজকের।
“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”
“প্রতি অমাবস্যার রাতে প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকে। কখনও একটি, কখনও দুটি। গত সাত বছর ধরে আমি এগুলো জমিয়ে রেখেছি।”
“যাত্রীরা কারা?”
হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন, “যারা কোথাও পৌঁছতে পারেনি।”
অর্ক প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, এমন সময় স্টেশনের বাইরে থেকে একটি দীর্ঘ বাঁশির শব্দ ভেসে এল।
কিন্তু রেললাইনে কোনও ট্রেন নেই।
হরিপদ তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে দিলেন।
“এখনই চলে যাও।”
“কেন?”
“কারণ ট্রেন আসার আগে প্ল্যাটফর্মে যারা থাকে, তাদের মধ্যে সবাই যাত্রী নয়।”
“আপনি কী দেখেছেন?”
হরিপদ অর্কের হাত চেপে ধরলেন।
“আমি একবার আমার স্ত্রীকে দেখেছিলাম।”
অর্ক থেমে গেল।
“আপনার স্ত্রী?”
“বারো বছর আগে মারা গেছেন। এক রাতে আমি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঠিক বারোটা দশে একটা ট্রেন এল। জানালার পাশে বসে আমার স্ত্রী আমাকে ডাকছিলেন। বলছিলেন, ‘হরি, বাড়ি চলো।’”
হরিপদের চোখে জল জমল।
“আমি ট্রেনে উঠতে যাচ্ছিলাম। তখন একজন অচেনা লোক পিছন থেকে আমাকে টেনে সরিয়ে দেয়। ট্রেন চলে যাওয়ার পর লোকটাকে আর খুঁজে পাইনি।”
“আপনি কি জানেন, লোকটা কে ছিল?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
“না। শুধু যাওয়ার আগে একটা কথা বলেছিল—যে মানুষকে তুমি হারিয়েছ, সে যদি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে, তবে তোমাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইবে না।”
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল, “মেঘলা কেন ওই ট্রেনে উঠেছিল?”
হরিপদ ছবিটা টেবিলে রেখে বললেন, “কারণ সে কাউকে খুঁজছিল।”
“কাকে?”
“তার ছোট ভাইকে।”
৩. মেঘলার ডায়েরি
রাত এগারোটা চল্লিশ।
অর্ক প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। হরিপদ তাকে একটি ঠিকানা দিয়েছিলেন। স্টেশন থেকে হাঁটাপথে দশ মিনিট দূরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। মেঘলা নিখোঁজ হওয়ার আগে সেখানে থাকত।
বাড়িটির সামনের দরজা তালাবন্ধ ছিল না। ভেতরে ধুলো জমে আছে। ভাঙা চেয়ার, পুরোনো বই, দেওয়ালে ছেঁড়া ক্যালেন্ডার।
দ্বিতীয় ঘরের আলমারির নিচে অর্ক একটি ডায়েরি খুঁজে পেল।
প্রথম পাতায় লেখা—
‘আমার নাম মেঘলা রায়। যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তবে জেনে রেখো, আমি পাগল নই। আমি যা দেখেছি, তা সত্যি।’
পরের পাতাগুলোয় ছিল একটি পরিবারের গল্প।
মেঘলার বাবা মারা গিয়েছিলেন যখন তার বয়স দশ। মা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল তার ওপর। তার ছোট ভাই নীলের বয়স তখন মাত্র সাত।
নীল ছিল অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে। সে প্রায়ই বলত, রাতে জানালার বাইরে কেউ তাকে ডাকছে। একদিন সে মেঘলাকে জানিয়েছিল, সে স্বপ্নে একটি ট্রেন দেখে। ট্রেনের প্রতিটি কামরায় বসে থাকে এমন সব মানুষ, যাদের সে কোনও দিন দেখেনি।
মেঘলা এসব কথা বিশ্বাস করত না।
কিন্তু নীলের মৃত্যুর পর তার বিশ্বাস বদলে যায়।
ডায়েরির একটি পাতায় লেখা—
‘নীল মারা যাওয়ার পর সবাই বলেছিল, ওকে বাঁচানো যেত না। নদীতে পড়ে যাওয়ার সময় কেউ নাকি ওকে দেখতে পায়নি। কিন্তু আমি জানি, ও নদীতে পড়েনি। মৃত্যুর আগের রাতে ও আমাকে বলেছিল, বারোটা দশের ট্রেন ওকে নিয়ে যেতে এসেছে।’
অর্কের হাত থেমে গেল।
পরের পাতায় আরও লেখা ছিল—
‘আমি সেদিন রাতে জানালার বাইরে একটি ট্রেন দেখেছিলাম। আমাদের বাড়ির সামনে কোনও রেললাইন নেই। তবু ট্রেনটা দাঁড়িয়ে ছিল। নীল জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে হাসছিল। আমি ওকে টেনে সরিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরদিন সকালে ও নিখোঁজ হয়ে গেল।’
এর পরের পাতাগুলো ফাঁকা।
শেষ পাতায় লেখা ছিল মাত্র একটি বাক্য—
‘আমি নীলকে ফিরিয়ে আনব, যদি তার জন্য আমাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে হয়।’
অর্ক ডায়েরিটি বন্ধ করল।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে শিশুর হাসির শব্দ এল।
সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে সাত-আট বছরের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নীল রঙের জামা, হাতে একটি খেলনা ট্রেন।
“আপনি দিদিকে খুঁজছেন?” ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
অর্কের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
“তোমার নাম কী?”
“নীল।”
“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
ছেলেটি হেসে বলল, “আমি তো এখানেই থাকি।”
“তোমার দিদি কোথায়?”
নীল খেলনা ট্রেনটিকে মেঝেতে নামিয়ে দিল।
“দিদি আমাকে নিতে আসবে। আজ রাতেই।”
“কোথা থেকে?”
ছেলেটি জানালার দিকে তাকাল।
“শেষ ট্রেন থেকে।”
অর্ক এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু তার পা যেন মেঝেতে আটকে গেল।
নীল ধীরে ধীরে দরজার বাইরে চলে গেল।
অর্ক তার পিছু নিল।
বাইরে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো খেলনা ট্রেন।
ট্রেনটির গায়ে ছোট্ট করে লেখা—
১২:১০
৪. যে ট্রেনের কোনও গন্তব্য নেই
রাত এগারোটা আটান্ন।
অর্ক আবার স্টেশনে ফিরে এল। প্ল্যাটফর্মের সব আলো নিভে গেছে। শুধু শেষ মাথার হলুদ বাতিটা জ্বলছে।
হরিপদ কোথাও নেই।
টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। সাদা শাড়ি, খোলা চুল, হাতে একটি ছোট স্যুটকেস।
অর্ক কাছে যেতেই মেয়েটি মুখ তুলল।
সে মেঘলা রায়।
সাত বছর আগে যে মেয়েটি নিখোঁজ হয়েছিল, সে ঠিক আগের মতোই তরুণী। মুখে বয়সের কোনও ছাপ নেই।
“আপনি অর্ক সেন?” মেঘলা জিজ্ঞেস করল।
অর্ক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“আপনি আমাকে চেনেন?”
“আপনি আমাকে খুঁজতে এসেছেন।”
“আপনি সাত বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।”
মেঘলা মৃদু হাসল।
“আপনাদের পৃথিবীতে সাত বছর কেটে গেছে। আমার কাছে কেটেছে মাত্র সাত রাত।”
অর্ক কিছু বলতে পারল না।
“আপনি কোথায় ছিলেন?”
“এমন একটা জায়গায়, যেখানে মানুষ সময়ের মধ্যে আটকে থাকে। কেউ নিজের অতীত ছাড়তে পারে না, কেউ ভবিষ্যতে পৌঁছতে পারে না।”
“আপনি কি ওই ট্রেনে উঠেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল, “আমার ভাইকে খুঁজতে।”
“নীল?”
মেঘলা চমকে উঠল।
“আপনি নীলের নাম জানলেন কীভাবে?”
অর্ক ডায়েরির কথা বলল। পরিত্যক্ত বাড়ির কথা বলল। নীলকে দেখার কথাও জানাল।
মেঘলার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আপনি নীলকে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ। সে বলেছে, আজ রাতে আপনি তাকে নিতে আসবেন।”
মেঘলা কাঁপতে শুরু করল।
“না। ওর এখানে আসার কথা নয়।”
“কেন?”
“কারণ নীল মারা যায়নি।”
অর্ক হতবাক।
“কিন্তু ডায়েরিতে তো—”
“আমি জানি, সবাই ভেবেছিল ও মারা গেছে। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম, ওকে ওই ট্রেনে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি ওকে বাঁচাতে ট্রেনে উঠেছিলাম। তারপর থেকে আমি আর ফিরে আসতে পারিনি।”
“আপনি যদি ট্রেনে উঠেই থাকেন, তাহলে এখন এখানে কীভাবে?”
মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে রেললাইনের ওপর আলো দেখা গেল।
একটি ট্রেন আসছে।
কিন্তু তার কোনও শব্দ নেই।
চাকা রেলের ওপর ঘষা খাচ্ছে না। ইঞ্জিন থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে না। জানালার ভেতরে অসংখ্য মুখ। কেউ বৃদ্ধ, কেউ তরুণ, কেউ শিশু। তাদের কেউ কথা বলছে না। সবাই যেন একই দিকে তাকিয়ে আছে।
ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
প্রথম কামরার দরজা খুলে গেল।
ভেতর থেকে একজন টিকিট পরীক্ষক নেমে এলেন। তাঁর পোশাক বহু পুরোনো আমলের। মাথায় কালো টুপি, হাতে ধাতব টিকিট পাঞ্চার।
তিনি অর্কের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার টিকিট?”
অর্ক পকেট থেকে হরিপদের দেওয়া টিকিটটি বের করল।
লোকটি টিকিটের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “আপনার জন্য আসন রাখা আছে।”
“আমি তো টিকিট কাটিনি।”
“সব যাত্রীর টিকিট কাটতে হয় না।”
“ট্রেনটা কোথায় যাবে?”
টিকিট পরীক্ষক মৃদু হাসলেন।
“যেখানে আপনার যাওয়া উচিত ছিল।”
অর্ক পিছিয়ে গেল।
“আমি কোথাও যাব না।”
লোকটি মাথা নাড়লেন।
“আপনি ইতিমধ্যেই যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন।”
ঠিক তখন ট্রেনের ভেতর থেকে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“দিদি!”
মেঘলা কেঁপে উঠল।
দ্বিতীয় কামরার জানালায় নীল দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই খেলনা ট্রেন। মুখে আগের মতোই হাসি।
“দিদি, তুমি এসেছ!”
মেঘলা ছুটে গেল।
“নীল! তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে কত খুঁজেছি!”
নীল জানালার কাচে হাত রাখল।
“দিদি, দরজাটা খোলো। আমি বাড়ি যাব।”
মেঘলা দরজার হাতল ধরতেই টিকিট পরীক্ষক তার পথ আটকালেন।
“একটু অপেক্ষা করুন।”
“আমার ভাইকে নামতে দিন!”
“আপনার ভাই নামতে পারবে। কিন্তু তার বদলে কাউকে উঠতে হবে।”
“কী বলছেন আপনি?”
টিকিট পরীক্ষক এবার অর্কের দিকে তাকালেন।
“একজন যাত্রীকে নামাতে হলে, আরেকজনকে তার জায়গা নিতে হয়।”
অর্কের বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।
মেঘলা বুঝতে পারল, এতদিন ধরে যে শর্ত থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে, আজ আবার তার সামনে সেই শর্ত এসে দাঁড়িয়েছে।
“না,” সে বলল। “এবার আমি কাউকে যেতে দেব না।”
টিকিট পরীক্ষক শান্ত গলায় বললেন, “আপনি সাত বছর আগে একই কথা বলেছিলেন।”
মেঘলা থমকে গেল।
“কী বললেন?”
“আপনি যখন প্রথম এই ট্রেনে উঠেছিলেন, তখনও একজনকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি জানতেন না, এই ট্রেন শুধু মৃতদের বহন করে না। এটি তাদেরও বহন করে, যারা নিজেদের জীবনের কোনও একটি মুহূর্তে হারিয়ে গেছে।”
অর্ক জিজ্ঞেস করল, “আপনি আসলে কে?”
টিকিট পরীক্ষক নিজের টুপি খুললেন।
তার মুখ দেখে অর্কের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।
লোকটির মুখ হুবহু তার বাবার মতো।
কিন্তু অর্কের বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে।
লোকটি বললেন, “অর্ক, এতদিন পরে এলি?”
অর্কের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“বাবা?”
টিকিট পরীক্ষক মৃদু হাসলেন।
“চিনতে পেরেছিস?”
মেঘলা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ট্রেনের জানালার ওপারে নীলের হাসি মিলিয়ে গেছে। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মুখ।
সেই মুখটি অর্কের নিজের।
কিন্তু চোখ দুটো বন্ধ।
টিকিট পরীক্ষক অর্কের হাতে একটি নতুন টিকিট দিলেন।
টিকিটে লেখা—
যাত্রী: অর্ক সেন।
গন্তব্য: শেষবারের মতো দেখা।
ফেরার সময়: নির্ধারিত নয়।
অর্ক মাথা তুলে তাকাল।
ট্রেনের সব জানালায় এখন তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে।
কেউ হাসছে।
কেউ কাঁদছে।
কেউ ঠোঁট নেড়ে বলছে—‘ফিরে আয়।’
আর সবচেয়ে শেষ কামরার জানালায় দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট ছেলে। তার বয়স আট বছর। সে অর্কের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।
ছেলেটি অর্কের নিজের শৈশবের মুখ।
তার ঠোঁট নড়ল।
“দাদা, এবার তুমি আমাকে ফেলে যাবে না তো?”
অর্কের মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা শুরু হল।
সে বুঝতে পারল, এই ট্রেন শুধু মেঘলার ভাইকে নয়, তাকেও কোথাও নিয়ে যেতে এসেছে।
কিন্তু কোথায়?
আর কেন তার মৃত বাবা এই ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক?
ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
টিকিট পরীক্ষক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করলেন—
“বারোটা দশ। যাত্রা শুরু হচ্ছে।”
ট্রেনটি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
মেঘলা অর্কের হাত চেপে ধরল।
“আপনি ট্রেনে উঠবেন না। আপনার নাম যে টিকিটে লেখা থাকে, সে আর আগের মানুষ হয়ে ফিরতে পারে না।”
অর্ক তার দিকে তাকাল।
“তাহলে আপনার ভাইকে কীভাবে বাঁচাব?”
মেঘলার চোখে জল এসে গেল।
“সেটাই তো আমি সাত বছর ধরে খুঁজছি।”
ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছাড়তে শুরু করেছে।
শেষ কামরার জানালায় দাঁড়ানো ছোট্ট অর্ক এবার কাচে হাত ঠুকতে লাগল।
তার মুখে আতঙ্ক।
সে চিৎকার করছে, কিন্তু শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
অর্ক হঠাৎ নিজের হাতের দিকে তাকাল।
তার মুঠোর মধ্যে থাকা টিকিটটি ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে।
টিকিটের পেছনে নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠল—
“যে যাত্রী নিজের অতীতকে চিনতে পারবে না, সে চিরকাল এই ট্রেনেরই যাত্রী হয়ে থাকবে।”
অর্ক জানত, তাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
ট্রেনটি প্রায় প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দিয়েছে।
সে মেঘলার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে উঠল শেষ কামরার দিকে।
ঠিক দরজার সামনে পৌঁছে সে দেখল, কামরার ভেতরে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।
বাবা হাত বাড়িয়ে বললেন, “আয়, অর্ক। তোকে একটা কথা বলতে হবে।”
অর্ক দরজার সামনে থমকে গেল।
বাবার মুখে সেই পরিচিত হাসি।
কিন্তু তাঁর চোখে জল।
“তুই যদি এই ট্রেনে উঠিস, তাহলে জানতে পারবি, তোর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কী হয়েছিল।”
অর্কের বুকের মধ্যে যেন কেউ ছুরি বসিয়ে দিল।
ছোট ভাই?
তার তো কোনও ছোট ভাই ছিল না।
অন্তত, তার স্মৃতিতে ছিল না।
ট্রেনটি আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। প্ল্যাটফর্মের আলো দূরে সরে যাচ্ছে।
বাবা আবার বললেন, “তোর মা তোকে একটা কথা লুকিয়ে রেখেছিল। তুই একা জন্মাসনি, অর্ক।”
অর্কের পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল।
“আপনি কী বলছেন?”
বাবা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“তোর সঙ্গে যে ছেলেটি জন্মেছিল, সে আজও তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”
ঠিক তখনই ট্রেনের শেষ কামরার ভেতর থেকে সেই শিশুটির কান্না শোনা গেল।
“দাদা, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো!”
অর্ক এক পা এগিয়ে গেল।
আর তার পিছনে, অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মেঘলা চিৎকার করে উঠল—
“না! ওই ট্রেনের মধ্যে আপনার ভাই নেই!”
অর্ক ঘুরে তাকাল।
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“কারণ আপনার ভাইকে আমি সাত বছর আগে নিজের চোখে কবর দিয়েছি!”
ট্রেনের দরজা তখনও খোলা।
বাবার হাত তখনও বাড়ানো।
আর কামরার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটি এবার মুখ তুলে এমনভাবে হাসল, যেন সে অর্ককে বহু জন্ম ধরে চেনে।
তারপর ছেলেটি বলল—
“দাদা, ওকে বিশ্বাস কোরো না। মেঘলাই আমাকে মেরেছিল।”
চলবে…