একটি কলম কখনও শুধু সংবাদ লেখে না। কখনও সেই কলম সমাজের অন্যায়কে সামনে আনে, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আবার কখনও মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা বাধা ও বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন। ভারতের সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন তেমনই এক প্রতিবাদী কণ্ঠ।
গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন কর্ণাটকের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মী। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বৈষম্য, জাতপাতের বিভাজন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁর লেখালেখির জন্য। তাঁর সম্পাদিত কন্নড় সাপ্তাহিক পত্রিকা গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিত।
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যু গোটা দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের গুরুত্ব নিয়ে গভীর আলোচনা সৃষ্টি করে।
গৌরী লঙ্কেশের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পক্ষে কথা বলা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়—অনেক সময় তা সামাজিক সাহসেরও পরীক্ষা।
পরিবার ও শৈশবের প্রভাব
গৌরী লঙ্কেশের জন্ম ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি কর্ণাটকে। তাঁর বাবা পি. লঙ্কেশ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কন্নড় লেখক, কবি, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি লঙ্কেশ পত্রিকে নামে একটি প্রভাবশালী কন্নড় সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পি. লঙ্কেশের লেখালেখিতে সমাজের প্রচলিত ধারণা, বৈষম্য এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা ছিল। তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা কর্ণাটকের সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে গৌরী লঙ্কেশ ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। তবে নিজের সাংবাদিক পরিচয় তিনি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে তোলেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের মতাদর্শ, অভিজ্ঞতা ও কাজের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
তিনি সাংবাদিকতাকে শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সংবাদমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সমাজের প্রান্তিক মানুষের সমস্যা তুলে ধরা এবং ক্ষমতাবানদের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ
গৌরী লঙ্কেশ পেশাগত জীবনে সাংবাদিকতা দিয়ে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট। তিনি মনে করতেন, সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারি ঘোষণা বা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রকাশ করা নয়; সেই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা, সিদ্ধান্তের প্রভাব বিশ্লেষণ করা এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।
একজন সাংবাদিকের কাছে তথ্য সংগ্রহ, সূত্র যাচাই, নিরপেক্ষভাবে ঘটনা বোঝার চেষ্টা এবং পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গৌরী লঙ্কেশের লেখালেখিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের সরাসরি বিশ্লেষণ দেখা যেত।
তিনি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থান তাঁকে যেমন সমর্থন এনে দেয়, তেমনই বিরোধিতা ও বিতর্কের মুখেও দাঁড় করায়।
গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে: একটি প্রতিবাদী সংবাদমাধ্যম
বাবা পি. লঙ্কেশের মৃত্যুর পর গৌরী লঙ্কেশ লঙ্কেশ পত্রিকে-র সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং পরে নিজের সম্পাদনায় গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকে প্রকাশ করেন।
কন্নড় ভাষায় প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থানের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। এতে সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের বৈষম্য, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং মানবাধিকারের মতো বিষয় স্থান পেত।
আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনেক সময় জাতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় যথেষ্টভাবে উঠে আসে না। অথচ স্থানীয় ভাষার সংবাদপত্র সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গৌরী লঙ্কেশের পত্রিকা সেই পরিসরে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিল। তিনি সংবাদমাধ্যমকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর সমালোচনা করা যায় এবং প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা সামনে আনা যায়।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান
গৌরী লঙ্কেশের সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা। তিনি ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানো, সামাজিক বিভাজন তৈরি করা এবং ভিন্নমতের মানুষকে শত্রু হিসেবে দেখানোর প্রবণতার বিরোধিতা করতেন।
ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুভাষিক দেশে সামাজিক সম্প্রীতি গণতান্ত্রিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।
কিন্তু যখন ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক সংঘাতের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজে অবিশ্বাস ও বৈরিতা বাড়তে পারে। গৌরী লঙ্কেশ তাঁর লেখায় এই ধরনের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন।
তাঁর অবস্থানের কারণে তিনি রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে দেখতেন, অন্যদিকে তাঁর সমালোচকেরা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করতেন।
গণতান্ত্রিক সমাজে মতের বিরোধিতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো ব্যক্তির মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তাঁর নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা জরুরি—গৌরী লঙ্কেশের জীবন ও মৃত্যু এই প্রশ্নটিকে বিশেষভাবে সামনে নিয়ে আসে।
জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই
ভারতীয় সমাজে জাতপাতের বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, জীবিকা ও মর্যাদাকে প্রভাবিত করেছে। সংবিধান আইনের চোখে সমতা এবং অস্পৃশ্যতার অবসানের কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন অঞ্চলে বৈষম্যের নানা রূপ দেখা যায়।
গৌরী লঙ্কেশ সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। তিনি দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং সমতার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতেন।
তাঁর সাংবাদিকতার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু বড় রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখেননি; সেই ঘটনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের সম্পর্ক কী, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।
একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষ কতটা মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি গৌরী লঙ্কেশের কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
লেখালেখি ও রাজনৈতিক বিতর্ক
গৌরী লঙ্কেশের লেখালেখি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তাঁর বক্তব্য ও সম্পাদকীয় অনেক পাঠকের কাছে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। আবার তাঁর অবস্থানের বিরোধিতাও ছিল।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মতামতধর্মী লেখা এবং তথ্যভিত্তিক সংবাদ এক জিনিস নয়। সম্পাদকীয়তে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেতে পারে, কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই ও যথার্থতা অপরিহার্য। একইভাবে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রেও যুক্তি, প্রমাণ এবং জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ।
গৌরী লঙ্কেশের কাজ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তাঁর ওপর প্রাণঘাতী হামলার কোনো গণতান্ত্রিক বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। রাজনৈতিক মতভেদ কিংবা লেখার বিরোধিতা কখনও সহিংসতার যুক্তি হতে পারে না।
তাঁর জীবন এই বিষয়টিও সামনে আনে যে, গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জনপ্রিয় মতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; অস্বস্তিকর বা ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করে এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর: এক মর্মান্তিক ঘটনা
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বেঙ্গালুরুতে নিজের বাড়ির সামনে গৌরী লঙ্কেশকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের বহু মানুষ তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানান।
ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়।
একজন সাংবাদিক যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখার কারণে প্রাণ হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে তা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন কাজের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হলে সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লিখতে দ্বিধা বোধ করতে পারেন। এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জানার অধিকারেও।
গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ড তাই ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসরে এক গভীর ক্ষত হিসেবে স্মরণ করা হয়।
বিচারপ্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
গৌরী লঙ্কেশের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একাধিক অভিযুক্তের নাম উঠে আসে এবং মামলাটি দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়। এই মামলায় সংগঠিত সহিংসতা, মতাদর্শগত বিদ্বেষ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বহু প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে।
এ ধরনের মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচার এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে আইনের শাসন বজায় থাকা প্রয়োজন।
গৌরী লঙ্কেশের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার ও সমর্থকেরা ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলেছে।
এই হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা শুধু সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেন জরুরি?
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বলতে বোঝায়—সাংবাদিকেরা যেন ভয়, হুমকি বা অন্যায় চাপ ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করতে পারেন। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। ভুল তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা কিংবা যাচাই না করা অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার নীতির পরিপন্থী।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যম সরকারের কাজ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এই প্রশ্ন তোলার ক্ষমতাই জনজবাবদিহি বাড়াতে সাহায্য করে।
যদি সাংবাদিকেরা সমালোচনার জন্য হুমকি বা সহিংসতার শিকার হন, তাহলে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি সামনে আসার সুযোগ কমে যেতে পারে।
গৌরী লঙ্কেশের জীবন এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর কাজ নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপদে কাজ করার অধিকার এবং সহিংসতামুক্ত সমাজের দাবি সর্বজনীন গুরুত্ব বহন করে।
নতুন প্রজন্মের কাছে গৌরী লঙ্কেশের শিক্ষা
গৌরী লঙ্কেশের জীবন থেকে নতুন প্রজন্ম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারে।
প্রথমত, প্রশ্ন করার সাহস থাকা দরকার। কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত শুধু ক্ষমতাবান ব্যক্তি বলেছেন বলে তা যাচাই না করে মেনে নেওয়া উচিত নয়। যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয় বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভিন্নমতকে সম্মান করতে হবে। মতের অমিল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কারও বক্তব্যের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু তাঁর ওপর হুমকি বা সহিংসতা চালানো কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। জাতপাত, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে কাউকে ছোট করে দেখা মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী।
চতুর্থত, সংবাদ পড়ার সময় তথ্য যাচাই করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি বক্তব্য সত্য নয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র, প্রমাণ এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করে মত গঠন করা উচিত।
পঞ্চমত, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু ভোট দেওয়াই নয়, সমাজের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা, শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
উপসংহার
গৌরী লঙ্কেশ ছিলেন একজন সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সামাজিক প্রতিবাদের কণ্ঠ। তিনি সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর লেখালেখি বহু মানুষের কাছে প্রতিবাদ ও সামাজিক সচেতনতার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর হত্যাকাণ্ড ভারতের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।
কোনো সাংবাদিকের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু তথ্য প্রকাশ, প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষমতার সমালোচনা করার অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। কারণ, ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া না হলে গণতান্ত্রিক আলোচনা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গৌরী লঙ্কেশের স্মৃতি তাই শুধু একজন সাংবাদিকের স্মৃতি নয়; এটি সত্য অনুসন্ধান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায় এবং নির্ভীক নাগরিকতার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার এক স্থায়ী আহ্বান।