Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

মহীয়সী নারী: এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী—ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অমর সাধিকা।

সংগীত এমন এক ভাষা, যার জন্য আলাদা করে কোনো শব্দকোষের প্রয়োজন হয় না। সুরের মধ্য দিয়েই মানুষ কখনও আনন্দ প্রকাশ করে, কখনও দুঃখের কথা বলে, আবার কখনও ঈশ্বরের কাছে নিজের মনের সমস্ত আকুলতা নিবেদন করে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এমনই এক অসামান্য শিল্পী ছিলেন এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, সাধনার গভীরতা এবং সংগীতের প্রতি একনিষ্ঠতা তাঁকে শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের কাছে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন মাদুরাই শানমুখবদিভু সুব্বুলক্ষ্মী। তিনি পরিচিত ছিলেন সংক্ষেপে এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী নামে। কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যেখানে শিল্পীর পরিচয় তাঁর কণ্ঠ ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত প্রতিভা তখনই মহত্ত্ব অর্জন করে, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় কঠোর অনুশীলন, বিনয় এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

সংগীতময় পরিবারে শৈশব

সুব্বুলক্ষ্মীর শৈশব কেটেছিল সংগীতের পরিবেশে। তাঁর মা শানমুখবদিভু ছিলেন বীণাবাদক। দক্ষিণ ভারতের সংগীতচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ফলে ছোটবেলা থেকেই সুব্বুলক্ষ্মীর চারপাশে ছিল সুর, তাল এবং রাগের আবহ।

শৈশবেই তাঁর সংগীতপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি শুধু গান শুনে আনন্দ পেতেন না, মন দিয়ে সুরের গঠন বুঝতে এবং তা নিজের কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করতেন।

তবে প্রতিভা থাকলেই একজন শিল্পী তৈরি হয়ে যান না। সংগীতের প্রতিটি রাগ, প্রতিটি স্বর এবং প্রতিটি অলংকার আয়ত্ত করতে প্রয়োজন দীর্ঘ সাধনা। সুব্বুলক্ষ্মী সেই সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

তাঁর মা তাঁকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা ও অনুশীলনের পরিবেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞের কাছ থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই শিক্ষাই তাঁর সংগীতজীবনের ভিত্তি মজবুত করে।

মঞ্চে আত্মপ্রকাশ

অল্প বয়সেই সুব্বুলক্ষ্মী সংগীতের মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন। কিশোরী বয়সে তাঁর পরিবেশনা সংগীতপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯২৯ সালে, মাত্র তেরো বছর বয়সে, তিনি মাদ্রাজের সংগীতজগতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

সেই সময় দক্ষিণ ভারতের সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ ছিল না। সেখানে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, কঠোর সংগীতশিক্ষা এবং শিল্পীর অসাধারণ দক্ষতার পরীক্ষা দিতে হতো। একজন তরুণী শিল্পীর পক্ষে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা ছিল আরও কঠিন।

কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মী তাঁর কণ্ঠের স্বচ্ছতা, সুরের শুদ্ধতা এবং আবেগপূর্ণ পরিবেশনার মাধ্যমে দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তাঁর গানে যেমন ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের নিয়মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, তেমনই ছিল শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা।

কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতে অবদান

কর্ণাটকী শাস্ত্রীয় সংগীত দক্ষিণ ভারতের এক সমৃদ্ধ সংগীতধারা। এই সংগীতে রাগ, তাল, স্বরবিন্যাস এবং কণ্ঠসাধনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একটি রাগের প্রকৃতি অক্ষুণ্ণ রেখে তার আবেগ ও সৌন্দর্য প্রকাশ করা শিল্পীর বড় দক্ষতার পরিচয়।

সুব্বুলক্ষ্মী এই সংগীতধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁর পরিবেশনায় ছিল অসাধারণ স্বরনিয়ন্ত্রণ। উচ্চ স্বর থেকে নিম্ন স্বরে যাওয়া, দীর্ঘ সুর ধরে রাখা এবং রাগের মেজাজ অক্ষুণ্ণ রেখে গান পরিবেশন করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ।

তাঁর সংগীতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল স্বচ্ছ উচ্চারণ এবং আবেগের সংযত প্রকাশ। তিনি কখনও কেবল কণ্ঠের কারুকার্য দেখানোর জন্য গান গাইতেন না; বরং গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

তাঁর পরিবেশিত কীর্তন, ভক্তিগীতি এবং শাস্ত্রীয় রচনাগুলি আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পায়।

শাস্ত্রীয় সংগীতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া

শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তার জটিল নিয়ম ও রাগের কাঠামো সাধারণ শ্রোতার কাছে কখনও কখনও দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মীর গানের মধ্যে এমন এক সহজ আবেদন ছিল, যা সংগীত সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও মানুষকে মুগ্ধ করত।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা বজায় রেখেও তাকে মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়।

তাঁর কণ্ঠে ভক্তিমূলক গান শুনে বহু মানুষ আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অনুভব করতেন। আবার শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে তাঁর পরিবেশনা সংগীতজ্ঞদের কাছেও ছিল সমান প্রশংসনীয়।

এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারা তাঁর অন্যতম বড় কৃতিত্ব।

‘ভজন’ ও ভক্তিগীতিতে অনন্য পরিচয়

সুব্বুলক্ষ্মীর সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভক্তিগীতি পরিবেশন। তাঁর কণ্ঠে সংস্কৃত স্তোত্র, তামিল ভক্তিগান এবং বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার আধ্যাত্মিক রচনা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর পরিবেশিত ‘বিষ্ণু সহস্রনাম’, ‘ভজ গোবিন্দম’ এবং ‘মৈত্রীং ভজতী’।

‘ভজ গোবিন্দম’-এর মতো রচনায় তিনি শুধু শব্দ উচ্চারণ করেননি; গানের দর্শন ও আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর গানে ভক্তি ছিল আন্তরিক, কিন্তু সেই ভক্তির প্রকাশ ছিল সংগীতের সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ।

১৯৬৬ সালে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাঁর পরিবেশনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতীয় সংগীতের পরিচিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে তিনি ‘মৈত্রীং ভজতী’ পরিবেশন করেন। মানবতা, শান্তি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বার্তাবাহী এই রচনা তাঁর সংগীতের আদর্শের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

চলচ্চিত্রেও প্রতিভার স্বাক্ষর

সুব্বুলক্ষ্মী শুধু সংগীতের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন এবং নিজের সংগীতপ্রতিভার পরিচয় তুলে ধরেন।

১৯৩৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তামিল চলচ্চিত্র ‘সেবা সদনম’-এ তিনি অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়ে ‘সাবিত্রী’ এবং ‘মীরা’ চলচ্চিত্রেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বিশেষ করে ১৯৪৫ সালের তামিল চলচ্চিত্র ‘মীরা’ এবং তার হিন্দি সংস্করণ তাঁকে আরও বিস্তৃত দর্শকসমাজের কাছে পরিচিত করে তোলে। এই চলচ্চিত্রে মীরাবাঈয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ও গান দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

মীরাবাঈ ছিলেন কৃষ্ণভক্তির জন্য বিখ্যাত মধ্যযুগীয় কবি। তাঁর জীবন ও ভক্তিগীতির সঙ্গে সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠ যেন এক বিশেষ সংযোগ তৈরি করেছিল।

তবে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা তাঁকে তাঁর প্রধান সাধনা থেকে বিচ্যুত করেনি। শেষ পর্যন্ত শাস্ত্রীয় সংগীত ও ভক্তিগীতিই তাঁর শিল্পীজীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে থাকে।

মহাত্মা গান্ধির প্রশংসা

সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠের আবেদন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও আকৃষ্ট করেছিল। মহাত্মা গান্ধি তাঁর সংগীতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন।

গান্ধির সঙ্গে যুক্ত ভক্তিগীতির পরিবেশনায় সুব্বুলক্ষ্মীর কণ্ঠ বিশেষভাবে পরিচিতি পায়। ‘বৈষ্ণব জন তো’ গানটির সঙ্গে তাঁর নামও বহুলভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

তাঁর সংগীত মানুষের মধ্যে মানবতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করত। রাজনৈতিক নেতা বা সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণির শ্রোতাই তাঁর গানে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পেতেন।

তাঁর কাছে সংগীত ছিল না কেবল খ্যাতি অর্জনের মাধ্যম। এটি ছিল মানুষের হৃদয়ে পৌঁছনোর এবং মানুষের মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি জাগিয়ে তোলার একটি পথ।

সমাজসেবা ও মানবকল্যাণ

সুব্বুলক্ষ্মীর জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর দানশীলতা। বিভিন্ন দাতব্য অনুষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাঁর পরিবেশনা থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মানবকল্যাণমূলক কাজে দান করা হয়েছে।

তাঁর সংগীতের জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। সেই জনপ্রিয়তাকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য বা আর্থিক লাভের জন্য ব্যবহার করেননি। মানুষের উপকারে আসতে পারে—এমন নানা উদ্যোগে তিনি নিজের শিল্পকে কাজে লাগিয়েছেন।

একজন শিল্পীর প্রকৃত মহত্ত্ব শুধু তাঁর প্রতিভায় নয়, সেই প্রতিভা তিনি কীভাবে ব্যবহার করছেন, তার মধ্যেও প্রকাশ পায়। সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন এই সত্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

পুরুষপ্রধান সংগীতজগতে এক নারীর প্রতিষ্ঠা

সুব্বুলক্ষ্মী যখন সংগীতজগতে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে শুরু করেন, তখন সমাজের বহু ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীনভাবে পেশাগত পরিচয় তৈরি করার সুযোগ সীমিত ছিল। সংগীতের মঞ্চে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জনের জন্য একজন নারীকে প্রতিভার পাশাপাশি সামাজিক বাধা এবং নানা ধরনের প্রত্যাশার সঙ্গেও লড়াই করতে হতো।

সুব্বুলক্ষ্মী নিজের শিল্পের গুণেই এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন নারী শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন সাধনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মান অর্জন করতে পারেন।

তাঁর সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের নারী সংগীতশিল্পীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায়, সামাজিক বাধা অতিক্রম করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলির একটি হলো নিজের দক্ষতা, অধ্যবসায় এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাকে ক্রমাগত উন্নত করে তোলা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান

সুব্বুলক্ষ্মীর অবদান ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে স্বীকৃত হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে তিনি পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালে পান পদ্মবিভূষণ।

১৯৭৪ সালে তিনি র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেন। সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এই স্বীকৃতির অন্যতম ভিত্তি ছিল।

১৯৯০ সালে তাঁকে ইন্দিরা গান্ধি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

১৯৯৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করে। তিনি ছিলেন এই সম্মানপ্রাপ্ত প্রথম সংগীতশিল্পী।

এই পুরস্কারগুলি শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; এগুলি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সাংস্কৃতিক গুরুত্বেরও স্বীকৃতি।

ব্যক্তিজীবনে বিনয় ও সংযম

অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করার পরও সুব্বুলক্ষ্মী তাঁর বিনয়ী স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সংগীতসাধনা, পরিবার এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

তাঁর স্বামী টি. সদাশিবম তাঁর সংগীতজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁদের দাম্পত্যজীবন এবং সংগীতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সুব্বুলক্ষ্মীর শিল্পীজীবনকে প্রভাবিত করেছিল।

খ্যাতি অনেক সময় মানুষকে আত্মপ্রচারের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সুব্বুলক্ষ্মীর পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে ছিল তাঁর গান। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, একজন প্রকৃত শিল্পীর কাজ তাঁর হয়ে কথা বলে।

তাঁর কণ্ঠ কেন আজও অমর?

২০০৪ সালের ১১ ডিসেম্বর সুব্বুলক্ষ্মী প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর সংগীত আজও জীবন্ত। রেকর্ড করা গান, আকাশবাণীর সংরক্ষিত পরিবেশনা এবং বিভিন্ন সংগীত-সংকলনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মও তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

তাঁর গান শোনার সময় বোঝা যায়, সংগীতের সৌন্দর্য কেবল কণ্ঠের মাধুর্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত থাকে সাধনা, শব্দের অর্থ বোঝার ক্ষমতা এবং শ্রোতার অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা।

তাঁর পরিবেশনা ভারতীয় সংগীতের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করেছে এবং একই সঙ্গে তাকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

আজও বহু শিক্ষার্থী তাঁর গান শুনে রাগের স্বরূপ, উচ্চারণের স্বচ্ছতা এবং আবেগের সংযম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, প্রতিভাকে বিকশিত করতে নিয়মিত অনুশীলনের বিকল্প নেই। জন্মগত ক্ষমতা একজন মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে সাফল্যে পরিণত করতে প্রয়োজন পরিশ্রম।

দ্বিতীয়ত, নিজের ঐতিহ্যকে ভালোবাসা মানে তাকে অন্যের কাছ থেকে আড়াল করে রাখা নয়। বরং তার সৌন্দর্য ও গুরুত্ব অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তৃতীয়ত, সাফল্যকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা অন্য যে কোনও ক্ষেত্রেই নিজের অর্জন সমাজের উপকারে লাগানো সম্ভব।

সবশেষে, বিনয় একজন মানুষের মহত্ত্বকে আরও উজ্জ্বল করে। সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন দেখায়, বিশ্বজোড়া সম্মান অর্জন করেও নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকা যায়।

উপসংহার

এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মী ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কণ্ঠে কর্ণাটকী সংগীতের শাস্ত্রীয় গভীরতা, ভক্তিগীতির আধ্যাত্মিকতা এবং মানবিক অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।

তিনি সংগীতকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সংগীত ছিল সাধনা, আত্মপ্রকাশ এবং মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ স্থাপনের একটি পথ।

ভারতরত্ন থেকে আন্তর্জাতিক সম্মান—বহু স্বীকৃতি তাঁর জীবনে এসেছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় রয়ে গেছে তাঁর গানের মধ্যে, যে গান আজও অসংখ্য মানুষের মনকে স্পর্শ করে।

একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর সাধনার সুর থেকে যায়। এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মীর জীবন সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রমাণ। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিষ্ঠা, বিনয় এবং ভালোবাসা দিয়ে শিল্পকে মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী করে তোলা সম্ভব।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *